বুদ্ধদেব গুহের একটা গল্পে পড়েছিলাম, হবহু মনে নেই তবে স্মৃতি থেকে কোট করছি: “যে-জীবনে অপত্য আছে, টায়-টায় দেওয়া-নেওয়ার, ভাঁড়ার থেকে প্রতিসকালে মেপে-জুপে রসদ বের করার ঠিকঠাক দাম্পত্যও আছে, কিন্তু যে-জীবনে কোনো অবকাশ নেই, যতি নেই, সেখানে ‘প্রেম’ বন্ধ দেরাজের মধ্যে, বহুদিন আগে দু-জনেরই অলক্ষ্যে নেংটি ইঁদুরের মতো কবে পচে গেছে।”
আমার কাছে এমন জীবনে প্রেমের অবস্থা শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির পুরোনো ছাতার মতো হয়। ছাতাটা আছে। দরকারের সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও খুলতে গেলে একটা শিক ভাঙা।
দাম্পত্যের শুরুর দিনগুলোয় এসব কথা মাথাতেই আসে না। তখন মানুষ বড় আশাবাদী, বিশেষ করে যারা নতুন করে সংসার বেঁধেছে। সেই দিনগুলোয় মনে হয়, পাশে বসে থাকা এই মানুষটার সঙ্গে বোধহয় আজন্ম কথা বললেও ফুরোবে না। এই পৃথিবীতে এত কথা যে জমা ছিল, তা কে জানত! হয়তো বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয়েছে গল্প, রাত দুটো গড়িয়ে তিনটে বাজতে চলল, তবু শেষ নেই।
আরেকজন বলছে, “তারপর আর কী!”
তারপর আবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
বিয়ের কয়েক বছর পরে সেই “তারপর?” কথাটার চরিত্র বদলে যায়।
“তারপর বাজার থেকে আলু আনছ?”
“তারপর ছেলেটাকে কোচিং থেকে কে আনবে?”
“তারপর ইলেকট্রিক বিল টপআপ করেছ?”
এইভাবে প্রেমের ব্যাকরণ বদলাতে থাকে। আগে যে ক্রিয়াপদের সঙ্গে হৃদয় জড়িত ছিল, পরে তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় বাজারের ব্যাগ, স্কুলবাস, ইনস্যুরেন্স, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আর রান্নাঘরের নষ্ট একজস্ট ফ্যান।
আমি অনেকের সংসার দেখেছি। নিজেরটাও কম দেখিনি। সংসার জিনিসটা ভারি আশ্চর্য। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় স্বামী, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে একখানা পরিবার। ভেতরে ঢুকলে দেখবেন একটা ক্ষুদ্র মন্ত্রণালয় চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় আছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় আছে।
শিক্ষা দপ্তর আছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ আছে।
পরিবহণ আছে।
এবং সব মন্ত্রণালয়ের ফাইল শেষ পর্যন্ত সাধারণত একজন মানুষের টেবিলেই এসে পড়ে।
সকালে উঠে একজন জিজ্ঞেস করছে, “দুধ আছে?”
দ্বিতীয়জন, “আমার সাদা শার্টটা কই?”
তৃতীয়জন, “আজ আমার প্রজেক্ট জমা।”
চতুর্থজন কেবল কান্না করছে। তার এখনও ভাষা হয়নি, কিন্তু দাবিদাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট।
এইসবের মাঝখানে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যারা কোনো এক সন্ধ্যায় একে অন্যের হাত ধরে ভেবেছিল, আমরা দুজন মিলে জীবন কাটাব।
জীবনও খুব ভদ্রভাবে বলেছিল, “অবশ্যই। আগে এই কাপড়গুলো ভাঁজ করে রাখো।”
অপত্য এসে সংসারকে পূর্ণ করে, এ-কথা সত্যি। একই সঙ্গে অপত্য সংসারের ঘড়ির কাঁটা এমনভাবে ঘুরিয়ে দেয় যে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের সময়টা কোথায় গেল, মাঝে মাঝে তার জিডি করতে ইচ্ছে হয়।
সন্তান ছোট থাকলে রাত তার।
ঘুম তার।
জ্বর তার।
কাশি তার।
দাঁত ওঠা তার।
স্কুলে গেলে সকাল তার।
হোমওয়ার্ক তার।
প্রজেক্ট তার।
সকার প্র্যাকটিস তার।
নাচের ক্লাস তার।
বন্ধুর জন্মদিন তার।
বড় হলে উদ্বেগও তার।
সে কখন ফিরবে?
কাদের সঙ্গে গেছে?
ফোন ধরছে না কেন?
পরীক্ষা কেমন হল?
কলেজে কী হবে?
তারপর একদিন দেখা যায়, বাবা-মা দুজনেই সন্তানের জীবন পরিচালনা করতে করতে নিজেদের যৌথ জীবনের ম্যানেজার হয়ে গেছেন। প্রেমিক-প্রেমিকা পরিচয়টা পুরোনো ভোটার আইডির মতো কোথাও আছে, কিন্তু কেউ আর ব্যবহার করে না।
সংসারে দেওয়া-নেওয়াও চলে। খুব নিয়ম করে চলে।
তুমি আজ বাচ্চাকে নিয়ে যাও, আমি ফিরিয়ে আনব।
তুমি রান্না করো, আমি বাসন তুলছি।
তুমি মর্টগেজ দাও, আমি গ্রোসারি করি।
তুমি শনিবার ঘুমাও, রবিবার আমি একটু দেরি করে উঠব।
এগুলো খারাপ কিছু নয়। বরং এগুলো ছাড়া সংসার টেকে না।
সমস্যা হয় যখন পুরো সম্পর্কটাই একসময় হিসাবের খাতায় ঢুকে পড়ে।
“আমি এত কিছু করি।”
“আমিও তো কম করি না।”
“গত সপ্তাহে তোমার জন্য আমি…”
“তার আগের সপ্তাহে আমি কী করেছিলাম ভুলে গেছ?”
এইখানে দাম্পত্য একটু ভয়ানক জায়গায় পৌঁছায়। ভালোবাসা তখন অডিটের সামনে বসে আছে, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট চশমা নামিয়ে বলছে, “আপনার রসিদ?”
প্রেমের আবার রসিদ থাকে নাকি!
প্রেমের বড় অংশই তো অপচয়।
অকারণে চা বানিয়ে দেওয়া।
কোনও প্রয়োজন ছাড়াই ফোন করা।
বাজারে গিয়ে মনে পড়ল, মানুষটা এই বিস্কুটটা পছন্দ করে, কিনে আনা।
রাতে ঘুম আসছে না দেখে পাশে বসা।
কোনও কথা নেই, তবু একসঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা।
এইসবের কোনও উৎপাদনশীল মূল্য নেই।
এই যুগে প্রেমের দশা হয়েছে বড় করুণ। সবকিছুতেই এখন আমাদের ‘প্রোডাক্টিভিটি’ বা উৎপাদনশীলতা চাই। হাঁটলে পরে গুনে দেখতে হবে ক-পা ফেললাম, ঘুমানোর পরে জানতে হবে তার স্কোর কত, এমনকি বই পড়ার সময়ও গুডরিডসের চ্যালেঞ্জের হিসাব মেলাতে হয়। এই যে মাপজোকের সভ্যতা, এখানে ভালোবাসা থেকেও মানুষ এখন হাতেনাতে কোনো লাভ বা ফলাফল আশা করে।
এই রকম একটা সভ্যতায় প্রেম বেচারা বড় অসুবিধায় পড়ে।
কারণ প্রেমের সবচেয়ে দরকারি কাজগুলোর অধিকাংশই অকাজ।
একদিন বিকেলে দুজনে বসে চা খাচ্ছেন। কেউ ফোন দেখছে না। কোনও জরুরি আলোচনা নেই। আধঘণ্টা ধরে পাশের বাড়ির লোকের একটা হাস্যকর কাণ্ড নিয়ে গল্প হচ্ছে।
এটাই হয়তো সেদিনের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কিন্তু ক্যালেন্ডারে লেখা যায় না।
আমাদের পুরোনো দিনের বাড়িগুলোয় একটা জিনিস ছিল, আজকাল কমে গেছে। বিকেল।
বিকেল মানে দিনের মাঝখানে এক আশ্চর্য বিরতি। অফিস থেকে কেউ ফিরেছে, কেউ স্নান করেছে, বারান্দায় চেয়ার পড়েছে, চা এসেছে। পাশের বাড়ির ছাদ থেকে কেউ ডাকছে। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নেই।
এখন সেই বিকেলকে আমরা মেরে ফেলেছি।
সকাল কাজের।
দুপুর কাজের।
সন্ধ্যা বাচ্চার।
রাত ফোনের।
তারপর শোবার আগে স্বামী-স্ত্রী দুজন পাশাপাশি শুয়ে আছেন, কিন্তু প্রত্যেকের মুখের সামনে আলাদা আলাদা একটা উজ্জ্বল পর্দা।
একই বিছানায় দুই মহাদেশ।
একজন রিল দেখছে।
আরেকজন খবর।
মাঝে আধহাত দূরত্ব।
কিন্তু সেই আধহাত অনেক সময় বঙ্গোপসাগরের চেয়েও চওড়া।
কেউ হয়তো বলল, “ঘুমাবে না?”
উত্তর এল, “এই তো।”
এই “এই তো” বড় সাংঘাতিক কথা। এর কোনও সময়সীমা নেই।
পাঁচ মিনিটও হতে পারে।
পঁয়তাল্লিশ মিনিটও।
বিবাহিত জীবনে বহু প্রেম এই “এই তো”-র মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ো হয়ে যায়।
একটা সময় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন আর ঝগড়াও হয় না।
এটাই বরং বেশি চিন্তার।
ঝগড়া অন্তত জানান দেয় যে, একজন আরেকজনের কাছ থেকে কিছু আশা করছে।
একেবারে নিখুঁত শান্তি অনেক সময় কবরস্থানেও থাকে।
দুজন মানুষ সংসার চালাচ্ছে সুন্দরভাবে। সকালে কে আগে উঠবে জানা আছে। কে কফি বানাবে জানা আছে। বাচ্চার স্কুলের ইমেল কে দেখবে জানা আছে। ট্যাক্স কে ফাইল করবে জানা আছে। কার কোন পাশে ঘুমানোর জায়গা, তাও স্থির।
শুধু কেউ আর কাউকে জিজ্ঞেস করে না, “তোমার মন কেমন?”
অথবা জিজ্ঞেস করলেও উত্তর শোনার সময় নেই।
“কেমন আছ?”
“ভালো।”
ব্যস।
আমরা “ভালো” শব্দটাকে কী ভয়ানক কাজে লাগাই! একটা মানুষের সমস্ত ক্লান্তি, ক্ষোভ, একাকিত্ব, ভয়, অপ্রাপ্তি চার অক্ষরের মধ্যে ভরে দিলাম।
ভা-লো।
ফাইল ক্লোজড।
এভাবে দিনের পর দিন গেলে একসময় প্রেম কোথায় থাকে?
আমি বলব, থাকে।
কিন্তু ব্যবহারের বাইরে চলে যায়।
আমাদের পুরোনো বাড়িতে একটা কাঠের দেরাজ ছিল। ভেতরে কত কী! পুরোনো দলিল, একটা ভাঙা ঘড়ি, দুটো চিঠি, কারও স্কুলের সার্টিফিকেট, কে জানে কোন যুগের চাবি। কোনও জিনিস ফেলা হয়নি। আবার কোনও জিনিস ব্যবহারও হয় না।
দাম্পত্যের প্রেমও অনেক সংসারে ওই দেরাজে গিয়ে ওঠে।
দুজনেই জানে কোনও একদিন ব্যাপারটা ছিল।
একদিন এই মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতাম।
একদিন ওর ফোন এলেই বুকের মধ্যে কিছু একটা হত।
একদিন ওর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়াতাম।
একদিন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হাত ধরেছিলাম।
তারপর?
তারপর জীবন।
ভাঁড়ার।
বাজার।
বাচ্চা।
ঋণ।
অফিস।
বুড়ো মা-বাবা।
ডাক্তারের রিপোর্ট।
স্কুলের টিউশন।
ভাঙা ওয়াশিং মেশিন।
গাড়ির সার্ভিস।
জীবন একে একে সব চেয়ার দখল করে বসেছে।
প্রেম বেচারা দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ বলল না, “বসুন।”
শেষে সে নিজেই দেরাজে ঢুকে দরজা টেনে দিল।
এই মৃত্যুর আবার কোনও নির্দিষ্ট দিন নেই।
কেউ বলতে পারবে না, ১৭ মার্চ রাত সাড়ে নটায় প্রেম মারা গেল।
মৃত্যুটা ধীরে হয়।
আজ কথা হল না।
কালও হল না।
একদিন একটা কথা বলতে গিয়েও বলা হল না।
একদিন অভিমান হয়েছিল, পরে মনে হল থাক।
একদিন কাছাকাছি আসার ইচ্ছে হয়েছিল, শরীর খুব ক্লান্ত।
আরেকদিন শরীর প্রস্তুত, মন নেই।
আরেকদিন মনও আছে, বাচ্চা পাশের ঘরে জেগে।
এইভাবে প্রেমের ওপর ছোট ছোট স্থগিতাদেশ পড়ে।
আজ নয়।
কাল।
এই সপ্তাহটা যাক।
বাচ্চার পরীক্ষা শেষ হোক।
প্রজেক্টটা শেষ হোক।
ছুটি এলে যাব।
তারপর ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে দেখা গেল আরও বেশি ক্লান্তি। বিমান ধরো, ব্যাগ টানো, ছবি তোলো, কোথায় খাব ঠিক করো, বাচ্চাদের ঝগড়া থামাও।
ফিরে এসে মনে হল, আহা, বাড়িতে থাকলেই ভালো হত।
একসময় মানুষ বুঝতেই পারে না, তারা প্রেম হারিয়েছে, না প্রেম করার অভ্যাস হারিয়েছে।
দুটো কিন্তু এক কথা নয়।
অনেক দাম্পত্যে আমি মনে করি প্রেম পুরোপুরি মরে না। ওপর থেকে ধুলো পড়ে। ব্যবহার না করতে করতে দরজায় মরচে ধরে।
তারপর কখনও কোনও অদ্ভুত ঘটনায় সেই পুরোনো মানুষটার দেখা পাওয়া যায়।
হয়তো একজন অসুস্থ হল।
অন্যজন সারারাত পাশে বসে আছে।
হয়তো অনেক বছর পরে সন্তানরা বাইরে চলে গেল।
হঠাৎ বাড়ি চুপ।
ডাইনিং টেবিলে দুজন।
কথা নেই।
এই নীরবতার মধ্যেই একজন অন্যজনকে নতুন করে দেখতে শুরু করল।
চুল পেকে গেছে।
চোখের পাশে রেখা।
হাতের চামড়া বদলে গেছে।
কিন্তু কোনও একটা চেনা ভঙ্গি রয়ে গেছে।
কাপটা ধরার ভঙ্গি।
হাসার সময় মাথা একটু কাত করা।
সেই মানুষটাই তো!
যার জন্য একসময় এত কাণ্ড হয়েছিল।
তখন মাঝেমধ্যে দেরাজটা খুলে যায়।
দেখা যায়, ভেতরে সব পচে যায়নি।
কিছু চিঠি এখনও পড়া যায়।
এই কারণেই দাম্পত্যের বড় বড় রোম্যান্টিক উৎসবগুলোকে আমি খুব একটা আমল দিই না। ক্যালেন্ডার মেনে রেস্তোরাঁয় যাওয়া, একগুচ্ছ গোলাপ কেনা কিংবা ঝকঝকে সব উপহার—এসব শুনতে ভালো ঠিকই। কিন্তু প্রেমের আয়ু যে এইসব জাঁকজমকের ফাইলে সই করে বাঁচে, তা আমার অন্তত মনে হয় না।
বরং আমি ভয় পাই সেই সংসারকে যেখানে দুজন মানুষের কারও আর সময় নেই।
কারণ সম্পর্কের খাবার সময়।
অবকাশ।
মনোযোগ।
একটু ফালতু থাকা।
আমাদের সমাজে ফালতু থাকার খুব বদনাম। আমরা বলি, সময় নষ্ট করছ।
কিন্তু কিছু সময় নষ্ট না করলে সম্পর্ক তৈরি হয় না।
বন্ধুত্বও না।
প্রেমও না।
সন্তানের সঙ্গে স্মৃতিও না।
জীবনের সবচেয়ে মনে থাকা মুহূর্তগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনও কাজ ছিল না।
এক সন্ধ্যায় ছাদে বসেছিলাম।
একদিন বৃষ্টিতে আটকে গিয়েছিলাম।
এক রাতে অনেক কথা হয়েছিল।
একদিন পথ ভুল করেছিলাম।
এক সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠে একসঙ্গে চা খেয়েছিলাম।
এইসব অকাজের মুহূর্ত দিয়েই তো জীবন পরে মনে রাখার মতো হয়।
আর আমরা যদি প্রতিদিনের ভাঁড়ার থেকে চাল-ডাল-তেল-নুনের সঙ্গে সময়টুকুও মেপে মেপে বের করি, একসময় দাম্পত্যে সব থাকবে, শুধু উদ্বৃত্ত কিছু থাকবে না।
প্রেম উদ্বৃত্তেই বাঁচে।
দায়িত্ব পালন করার পরেও যে মিনিট দশেক পড়ে থাকে।
অভিমান করার পরেও যে হাতটা এগিয়ে যায়।
ক্লান্তির পরেও যে প্রশ্নটা করা হয়, “চা খাবা?”
কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও যে দুজন পাশাপাশি বসে থাকে।
সে-জীবনে বাচ্চারা ভালো থাকবে, বিল সময়মতো দেওয়া হবে, বাড়ির ছাদ ফুটো হলে মিস্ত্রি আসবে, ফ্রিজে সবজি থাকবে। সমাজও দেখে বলবে, “বেশ সংসার।”
কিন্তু সেই সংসারের কোনও এক বন্ধ দেরাজে প্রেম পড়ে থাকতে পারে।
অনেকদিন কেউ খুলে দেখেনি।
অন্ধকার।
ধুলো।
পুরোনো গন্ধ।
তার মধ্যে নেংটি ইঁদুর কুটকুট করে কাগজ কাটছে।
আর দুজন মানুষ পাশের ঘরে বসে সংসারের আগামী সপ্তাহের সময়সূচি মিলিয়ে নিচ্ছে।
“মঙ্গলবার তুমি পারবে?”
“না, আমার মিটিং।”
“বুধবার?”
“ওর সকার।”
“বৃহস্পতিবার?”
“ডেন্টিস্ট।”
“শুক্রবার?”
দুজনেই একটু ভাবে।
শুক্রবার আপাতত ফাঁকা।
তবে নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই।
জীবন বসে আছে।
সে নিশ্চয়ই ততক্ষণে কিছু একটা ঠিক করে ফেলবে।



