আমাদের সমাজে মারামারি খুব স্বাভাবিক, আদরটাই সন্দেহজনক
সন্দেহ জিনিসটা বড় মজার।
বিশেষ করে অন্যের ভালো কিছু দেখলে আমাদের সন্দেহটা বড় তাড়াতাড়ি জেগে ওঠে। নিজের জীবনে ভালো কিছু ঘটলে অবশ্য সন্দেহ হয় না। ধরুন, লটারিতে আমি দশ লাখ টাকা পেয়ে গেলাম। তখন আমার মনে হবে, ভগবান দেরিতে হলেও বিচার করেছেন। অথচ পাশের বাড়ির হরিপদবাবু দশ লাখ টাকা পেলে আমি প্রথমেই বলব, “কী একটা ঘাপলা আছে।”
মানুষের চরিত্রের এই জায়গাটা আমাকে বরাবরই খুব আনন্দ দেয়। আনন্দ বলছি এই কারণে যে, রাগ করলে তো সারাদিন রাগ করেই কাটাতে হবে। তার চেয়ে ব্যাপারটাকে একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখুন, খুব ভালো কমেডি।
কেউ হঠাৎ অনেক টাকা করেছে।
সঙ্গে সঙ্গে রায় বেরিয়ে গেল, “ঘুষ খায়।”
কেউ পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে।
“প্রশ্ন আগে পাইছিল।”
কেউ অফিসে খুব দ্রুত উন্নতি করেছে।
“বসের সঙ্গে নিশ্চয়ই বিশেষ খাতির।”
কেউ সুন্দর বাড়ি করেছে।
“ব্যাংকের টাকা।”
কেউ ভালো গাড়ি কিনেছে।
“কিস্তিতে কিনসে।”
কিস্তিতে কিনলেও যেন গাড়িটা গাড়ি থাকে না।
কেউ স্ত্রীকে খুব ভালোবাসে।
“ন্যাকা।”
কেউ স্বামীকে নিয়ে ফেসবুকে দুটো ভালো কথা লিখেছে।
“দেখো দেখো, বেশি সুখ দেখাইতেছে। নিশ্চয়ই ভিতরে গণ্ডগোল।”
আমাদের সমাজে সুখের প্রকাশও সন্দেহজনক।
আপনি যদি চুপচাপ দুঃখ করেন, মানুষ আপনার দুঃখ বিশ্বাস করবে। একটু প্রকাশ্যে সুখী হলেই আশপাশের লোকের কপালে ভাঁজ পড়ে যাবে।
“এত সুখ আসে কই থেইক্যা?”
সুখটা যেন কাস্টমস পার হয়ে এসেছে। কাগজপত্র পরীক্ষা করা দরকার।
প্রেমের ব্যাপারেও একই।
একজন মানুষ তার প্রেমিকাকে একটু বেশি ভালোবাসে, খোঁজ নেয়, ফুল দেয়, তার পছন্দের খাবার মনে রাখে, সকালে উঠে “খেয়েছ?” লিখে পাঠায়।
লোকজন বলে, “এ্যাহ, ন্যাকা!”
আমাদের সমাজে মারামারি খুব স্বাভাবিক, আদরটাই সন্দেহজনক।
স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে রাস্তায় ঝগড়া করছে, কেউ ফিরে তাকাবে না। স্বামী যদি স্ত্রীর হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়, পাশের মানুষ তাকাবে।
ভাবটা এমন, “কী ব্যাপার?”
আমার ধারণা আমরা আদরের চেয়ে অত্যাচয়ের সঙ্গে বেশি পরিচিত বলেই হয়তো আদর দেখলে একটু অস্বস্তি হয়।
আর শিল্পসাহিত্যের জগতে তো সন্দেহের আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
কেউ ভালো কবিতা লিখেছে।
“নকল।”
কোথা থেকে নকল?
তা কেউ জানে না।
কিন্তু নকল।
কারণ লোকটা এত ভালো লিখবে কেন?
কেউ সুন্দর গল্প লিখেছে।
“হুমায়ূন আহমেদ হইবার চায়।”
কেউ একটু কঠিন ভাষায় লিখেছে।
“বুদ্ধিজীবী সাজে।”
সহজ ভাষায় লিখেছে।
“সস্তা লেখা।”
বেশি লিখেছে।
“প্রচার চায়।”
কম লিখেছে।
“ভাব নেয়।”
নির্ভুল লিখেছে।
“এ আই”।
মোটামুটি লেখকের বাঁচার রাস্তা নাই।
আপনি রবীন্দ্রনাথের মতো লিখলে নকল, রবীন্দ্রনাথের মতো না লিখলে অযোগ্য। মাঝখানে কোথাও একটা জায়গা থাকার কথা, কিন্তু সেই জায়গাটার জমির দলিল এখনও পাওয়া যায়নি।
একবার একটা ঘটনা শুনেছিলাম। ঘটনাটা আমার খুব প্রিয়।
সাবিনা ইয়াসমিন আর নিলুফার ইয়াসমিন দুই বোন ঘরে বসে গান গাইছেন।
এখন ভাবুন দৃশ্যটা।
দুই অসাধারণ কণ্ঠের মানুষ নিজেদের ঘরে গান করছেন। জানলা খোলা থাকতে পারে। বিকেলের আলো। পাড়ার গলি দিয়ে একজন ভদ্রলোক যাচ্ছেন।
ভদ্রলোক লিখলাম ভদ্রতার খাতিরে। ভদ্রতা কোথায় ছিল, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।
তিনি গান শুনতে শুনতে গলি দিয়ে যাচ্ছেন। তারপর একটা মন্তব্য ছুড়ে দিলেন,
“ইস্, সাবিনা ইয়াসমিন হইবার চায়!”
এখন এই জায়গায় এসে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস খানিকটা থমকে দাঁড়ায়।
কারণ যিনি গান করছেন, তিনিই সাবিনা ইয়াসমিন।
কিন্তু ভদ্রলোকের কী দোষ?
তিনি জীবনে এত নকল মানুষ দেখেছেন যে আসল মানুষ দেখলেও নকল মনে হয়েছে।
এই ঘটনা আমার কাছে প্রায় দর্শনের পর্যায়ে পড়ে।
আমরা অনেক সময় আসল জিনিস চিনতে পারি না, কারণ আমাদের মাথার ভেতরে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত তৈরি থাকে।
আমাদের বিশ্বাস, অসাধারণ কিছু আমাদের আশপাশে ঘটতে পারে না।
বিখ্যাত মানুষ দূরে থাকবে।
প্রতিভাবান মানুষ বইয়ের পাতায় থাকবে।
সৎ মানুষ ইতিহাসে থাকবে।
বড় শিল্পী টেলিভিশনের ভিতরে থাকবে।
আমার পাশের বাড়িতে থাকবে কেন?
আমার স্কুলের বন্ধু এত সফল হবে কেন?
আমার সঙ্গে একই অফিসে কাজ করা ছেলেটা এত ভালো লিখবে কেন?
আমাদের পাড়ার মেয়েটা এত সুন্দর গান করবে কেন?
এই “কেন” থেকেই সন্দেহের জন্ম।
আমরা মানুষের সাফল্যের কারণ খোঁজার আগে শর্টকাট খুঁজি।
কারণ সাফল্যের প্রকৃত কারণ বেশ অস্বস্তিকর।
হরিপদ যদি সত্যিই আমার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে থাকে?
যে ছেলেটা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে, সে যদি সত্যিই রাত জেগে পড়ে থাকে?
যে লেখক ভালো লিখছে, সে যদি সত্যিই দশ বছর ধরে পড়ে, লিখে, কেটে, আবার লিখে নিজের ভাষা তৈরি করে থাকে?
যে ব্যবসায়ী সফল, সে যদি সত্যিই আমার চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে থাকে?
তাহলে আমাকে নিজের জীবনটার দিকেও একটু তাকাতে হয়।
সেটা খুব সুখকর কাজ নয়।
তার চেয়ে বলে দিলাম, “ঘুষ।”
ব্যস।
সমস্যার সমাধান।
লোকটার সাফল্যও ব্যাখ্যা হয়ে গেল, আমার আত্মসম্মানও রক্ষা পেল।
মনোবিজ্ঞানে এর সঙ্গে “self-serving bias”, “social comparison”, “envy”, “cognitive dissonance” জাতীয় অনেক শব্দ জুড়ে দেওয়া যায়। মানুষের মন নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়। অন্যের সাফল্য কখনও কখনও সেই মর্যাদাকে হুমকি দেয়। বিশেষ করে যাকে আমরা নিজের সমপর্যায়ের মনে করি, তার সাফল্য আমাদের বেশি অস্বস্তি দেয়।
এলন মাস্কের টাকা দেখে পাড়ার মজনু মিয়ার খুব একটা ঘুম নষ্ট হয় না।
কিন্তু পাশের বাড়ির জামাল সাহেব নতুন গাড়ি কিনলে মজনু মিয়ার রাতের ঘুম চলে যেতে পারে।
কারণ এলন মাস্ক আর মজনু মিয়ার মধ্যে তুলনার দূরত্ব অনেক। জামাল সাহেব তো গত বছরও তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে চা খেয়েছে।
এখন জামাল গাড়ি কিনল কী করে?
এখানেই মানুষের মনে অঙ্ক শুরু হয়।
আমার বেতন এত।
ওর বেতনও তো কাছাকাছি।
আমি গাড়ি কিনতে পারি নাই।
ও কিনল।
অতএব…
ঘুষ।
এই “অতএব” মানুষের মন খুব দ্রুত বসায়।
গণিতের শিক্ষক দেখলে অবশ্য নম্বর কেটে দিতেন, কারণ মাঝখানের প্রমাণ নাই।
আরেকটা ব্যাপার আছে, অপূর্ণতার বোধ।
মানুষ যখন নিজের জীবনে একটা অভাব খুব গভীরভাবে অনুভব করে, অন্যের সেই প্রাপ্তি তার ভেতরে ব্যথা তৈরি করতে পারে।
যে মানুষ ভালোবাসা পায়নি, সে কখনও কখনও অন্যের ভালোবাসা দেখে বিরক্ত হয়।
যার নিজের সংসার ভালো যাচ্ছে না, সে অন্যের সুখী সংসারকে অভিনয় মনে করতে পারে।
যে নিজের প্রতিভা নিয়ে হতাশ, সে অন্যের প্রতিভাকে নকল বলে উড়িয়ে দিতে পারে।
যে নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট, সে অন্যের আনন্দের মধ্যে ফাঁক খুঁজে বেড়ায়।
সব ঈর্ষা অবশ্য প্রকাশ্য নয়।
ঈর্ষা বড় শিক্ষিত জিনিস।
সে টাই পরে আসে।
সে সরাসরি বলে না, “আমি তোমাকে হিংসা করছি।”
সে বলে,
“ভালোই তো, তবে…”
এই “তবে” শব্দটার পরে অনেক খুনখারাবি হয়।
“বইটা ভালোই লিখেছে, তবে…”
“মেয়েটা সুন্দরই, তবে…”
“ব্যবসা ভালোই করছে, তবে…”
“ওদের সংসার ভালোই, তবে…”
এরপর যে কথাটা আসে, সেটা সাধারণত প্রথম কথাটাকে খুন করার জন্যই যথেষ্ট।
আমাদের আরেকটা প্রবণতা আছে, যেটাকে বলা যায় “tall poppy syndrome”। যে মাথাটা একটু উঁচু হয়ে উঠল, সেটাকেই আগে কাটতে ইচ্ছে করে।
একসঙ্গে দশজন মোটামুটি থাকলে আমাদের খুব শান্তি।
একজন হঠাৎ একটু ভালো করতে শুরু করলেই অস্বস্তি।
সে কিছু না বলেও বলে,
“সম্ভব।”
এই “সম্ভব” শব্দটা ভয়ংকর।
কারণ তখন আর ভাগ্যকে পুরো দোষ দেওয়া যায় না।
তবে সন্দেহেরও দরকার আছে।
সবকিছু বিশ্বাস করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ইতিহাসে প্রতারণা আছে, নকল আছে, মিথ্যা আছে, প্রচারণা আছে।
চাঁদে মানুষ গেছে শুনে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। বিজ্ঞান প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কবিতা নকল কি না, সে বিষয়ে প্রমাণ খোঁজাও দরকার। কারও বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলাও নাগরিক দায়িত্ব হতে পারে।
সমস্যাটা প্রশ্নে নয়।
সমস্যা হয় যখন উত্তর খোঁজার আগেই রায় দিয়ে দিই।
সন্দেহ তখন অনুসন্ধানের হাতিয়ার থাকে না, চরিত্রহত্যার ছুরি হয়ে যায়।
বৈজ্ঞানিক সন্দেহ বলে, “প্রমাণ দেখি।”
ঈর্ষাপ্রসূত সন্দেহ বলে, “প্রমাণ লাগবে না, আমি জানি।”
এই দুটির পার্থক্য খুব বড়।
একজন সত্য খুঁজছে।
আরেকজন নিজের অস্বস্তির জন্য একটা গল্প বানাচ্ছে।
আমাদের সমাজে আবার ব্যর্থতার প্রতি এক ধরনের কোমলতা আছে, সাফল্যের প্রতি কড়াকড়ি।
আপনি দশবার ফেল করলে মানুষ বলবে,
“আহারে, চেষ্টা কর।”
একবার প্রথম হলেই বলবে,
“কীভাবে?”
আপনি ব্যবসায় সব হারালে সবাই সহানুভূতি দেবে।
ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে জিজ্ঞেস করবে,
“টাকা কোথা থেকে?”
আপনার প্রেম ভেঙে গেলে মানুষ পাশে বসবে।
প্রেমটা দশ বছর ভালো থাকলে কেউ কেউ মনে মনে অপেক্ষা করবে,
“দেখি কতদিন।”
মানুষ বোধহয় ট্র্যাজেডিকে বিশ্বাস করতে শেখে সহজে।
সুখের ক্ষেত্রে তার প্রমাণ লাগে।
এখানে সোশ্যাল মিডিয়া এসে ব্যাপারটাকে আরও মজার করেছে।
এখন আমরা সারাদিন অন্যের জীবনের ট্রেলার দেখি।
কারও ভ্রমণ।
কারও বই।
কারও প্রেম।
কারও বিয়ে।
কারও নতুন চাকরি।
কারও নতুন বাড়ি।
কারও সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
নিজের জীবনের পুরো সিনেমার সঙ্গে আমরা অন্যের দুই মিনিটের ট্রেলার তুলনা করি।
তারপর মন খারাপ হয়।
তারপর একটা আত্মরক্ষামূলক মন্তব্য করি,
“সব দেখানো।”
হতে পারে।
কিছুটা দেখানো নিশ্চয়ই।
মানুষ তো বিয়ের ছবিতে ঝগড়ার ছবি দেয় না।
কিন্তু তাই বলে সব সুখ মিথ্যে হয়ে যায় না।
সব সাফল্য প্রতারণা হয়ে যায় না।
সব প্রেম অভিনয় হয়ে যায় না।
সব প্রতিভা নকল হয়ে যায় না।
কখনও কখনও মানুষ সত্যিই ভালো লেখে।
সত্যিই ভালো গান গায়।
সত্যিই ভালোবাসে।
সত্যিই পরিশ্রম করে।
সত্যিই সৎ থাকে।
সত্যিই ভাগ্যবানও হয়।
এই সম্ভাবনাটুকু মেনে নেওয়া আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
আর অন্যের সাফল্যে আনন্দ করতে পারা একটা আশ্চর্য স্বাধীনতা।
কারণ তখন পৃথিবী আর প্রতিযোগিতার মাঠ থাকে না।
অন্যের আলো আমার আলো কমায় না।
আমাদের সমস্যাটা বোধহয় এইখানেই।
আমরা আলোকে অনেক সময় মোমবাতি ভাবি।
একজনেরটা জ্বললে মনে করি আমারটা নিভে যাবে।
আসলে জ্ঞান, সৌন্দর্য, প্রতিভা, ভালোবাসা, সাফল্য এইসব জিনিসের হিসাব একটু অন্যরকম।
পাশের মানুষটা ভালো গান গাইলে আমার গলা খারাপ হয়ে যায় না।
বন্ধু বই লিখলে আমার কলম শুকিয়ে যায় না।
কারও সংসারে ভালোবাসা থাকলে আমার ভাগের ভালোবাসা কমে যায় না।
কারও টাকা হলে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেয় না।
তবু মন মাঝে মাঝে হিসাব করে।
মানুষের মন তো।
বড় বদমাশ জিনিস।
তাকে মাঝে মাঝে ধরে বলতে হয়,
“চুপ। লোকটাকে একটু ভালো থাকতে দে।”
আর যদি কোনোদিন গলি দিয়ে যেতে যেতে কারও ঘর থেকে অসাধারণ গান শুনতে পান, একটু দাঁড়াবেন।
ভালো করে শুনবেন।
তারপর মন্তব্য করার আগে নামটা জেনে নেবেন।
কে জানে, যাকে আপনি বলবেন,
“সাবিনা ইয়াসমিন হইবার চায়,”
ঘরের ভিতর থেকে হয়তো সত্যিই সাবিনা ইয়াসমিন বেরিয়ে এসে বলবেন,
“ভাই, চেষ্টা তো বহুদিন ধরেই করতেছি।”


