সমস্যাটা ভয়াবহ
আমাকে যারা মোটামুটি চেনেন, তারা জানেন আমি অল্পবিস্তর বইটই পড়ি। এখন এই ‘অল্পবিস্তর’ কথাটা একটু বিপজ্জনক। কারণ একজনের কাছে অল্প মানে মাসে একটা বই, আরেকজনের কাছে বছরে তিনটে বই পড়ে ডিসেম্বর মাসে ফেসবুকে “এই বছরে আমার পড়া বই” লিখে একটা জমকালো তালিকা। আমার অল্পটা একটু অন্যরকম।
কতটা অন্যরকম, সেটা অনেকে ঠিক ঠাওর করতে পারেন না।
আমি দিনে গড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা পড়ি। আবার দু-তিন ঘণ্টা লিখি। কোনও কোনও দিন পড়া একটু বেশি হয়, লেখা কম। কোনও দিন একটা বই এমনভাবে ঘাড় ধরে বসিয়ে রাখে যে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দুটো। তখন নিজের সঙ্গে নিজের একটা ছোটখাটো মিটিং হয়।
আমি বলি, ঘুমানো দরকার।
মাথা বলে, ঠিক।
চোখ বলে, আর দশ পাতা।
তারপর সেই দশ পাতা চল্লিশ পাতা হয়ে যায়।
বইয়ের ব্যাপারে আমার চরিত্র বহুদিন ধরেই সন্দেহজনক।
অনেকে প্রতিদিন আট-দশ ঘণ্টা অফিস করেন। কেউ ব্যবসা করেন। কেউ দোকানে বসেন। কেউ হাসপাতালে ডিউটি করেন। কেউ গাড়ি চালান। কেউ সারাদিন হিসাবের খাতা, কম্পিউটার, ক্লায়েন্ট, মিটিং, ফোনকল নিয়ে থাকেন। আমার জীবনের একটা বড় অংশও কাজের মধ্যেই কাটে। তারপর যে সময়টা বেঁচে থাকে, তার একটা বিরাট অংশ আমি বইকে দিয়ে দিয়েছি।
অনেকে জিজ্ঞেস করেন, এত পড়েন কী করে?
প্রশ্নটা শুনলে আমার একটু হাসি পায়। কেউ যদি প্রতিদিন চার ঘণ্টা নেটফ্লিক্স দেখে, তাকে সাধারণত কেউ জিজ্ঞেস করে না, ভাই এত নেটফ্লিক্স দেখেন কী করে? কেউ যদি সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, রিলস, শর্টস, খবর, ক্রিকেট, নাটক আর অন্যের জীবন নিয়ে পড়ে থাকে, তাকেও আমরা মোটামুটি স্বাভাবিক মানুষ বলেই ধরে নিই।
কিন্তু চার ঘণ্টা বই পড়লে ব্যাপারটা একটু অলৌকিক হয়ে যায়।
যেন আমি বই পড়ি না, পদ্মাসনে বসে হিমালয়ের গুহায় তপস্যা করি।
আসলে ব্যাপারটা খুব সাধারণ। মানুষ যার জন্য সময় রাখে, সময়টা শেষ পর্যন্ত তার কাছেই জমা হয়।
আমার কাছে পড়া শখের চেয়ে একটু বেশি কিছু। শখ বললে আমি আপত্তি করব না, কিন্তু কথাটা পুরো ব্যাপারটাকে ধরে না। আমি পড়াকে ইনভেস্টমেন্ট মনে করি। শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার ইনভেস্টমেন্ট। নিজের মাথার ভেতর একটু জায়গা বানিয়ে রাখার ইনভেস্টমেন্ট। পৃথিবীর হট্টগোল থেকে মাঝেমধ্যে নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়ানোর ইনভেস্টমেন্ট।
জীবনে টাকা দরকার। এ নিয়ে কোনও রোমান্টিকতা আমার নেই। বাজারে গিয়ে দস্তয়েভস্কির উদ্ধৃতি দিলে মুদি দোকানদার চাল দেবে না। বিদ্যুতের বিলের সঙ্গে ভার্জিনিয়া উলফের একটা প্রবন্ধ স্ট্যাপল করে পাঠালেও কোম্পানি বিশেষ আবেগাপ্লুত হবে না। সুতরাং টাকা প্রয়োজনীয় জিনিস।
তবে একটা বয়সের পরে আমার মনে হয়েছে, সব টাকা আরও টাকা বানানোর কাজে লাগাতে হবে, এমন কোনও ঐশী বিধান নেই।
আমার টাকা মাঝে মাঝে বইয়ের পেছনে ছোটে।
আমি টাকার পেছনে দৌড়াই কম, টাকা সুযোগ পেলেই বইয়ের দোকানে গিয়ে আত্মহত্যা করে।
কখনও একটা নতুন বই বেরিয়েছে, কিনলাম। কখনও পুরোনো সংস্করণ চোখে পড়ল, সেটাও চাই। কখনও একই বইয়ের আরেকটা অনুবাদ পাওয়া গেল। তখন মনের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে এক প্রবল যুক্তিবাদী মানুষ জন্ম নেয়। সে আমাকে বোঝায়, আগের অনুবাদ আর এই অনুবাদ এক জিনিস কী করে হবে? কিনতেই হবে।
কিনে ফেলি।
তারপর বাড়িতে এসে দেখি একই বইয়ের তিনটে সংস্করণ আগে থেকেই আছে।
তখন সেই যুক্তিবাদী মানুষটি নিঃশব্দে পালিয়ে যায়।
তবে বই কেনার সঙ্গে বই পড়ার সম্পর্ক সবসময় একরকম নয়। বই কেনাও আলাদা আনন্দ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বই খুলে তার ভেতরে ঢুকতে হয়। তাক সাজিয়ে রাখলে লাইব্রেরি হয়, পাঠক হওয়া যায় না।
আমি পড়ি প্রধানত কৌতূহল থেকে।
দুনিয়ায় লক্ষ লক্ষ লেখক। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ বসে বসে কী সব ভেবে গেছে! কেউ ঈশ্বর নিয়ে ভেবেছে। কেউ ঈশ্বর নেই কেন সেটা নিয়ে ভেবেছে। কেউ প্রেম নিয়ে লিখেছে। কেউ যুদ্ধ নিয়ে। কেউ রাষ্ট্র, ন্যায়, মৃত্যু, যৌনতা, স্মৃতি, ইতিহাস, বিপ্লব, পরিবার, নিঃসঙ্গতা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ভাষা, শরীর, আত্মা, ক্ষমতা, শোষণ, সুখ, দুঃখ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, লোকটা কী ভাবল?
প্লেটো কী ভেবেছিলেন?
এরিস্টটল তার সঙ্গে কোথায় একমত হলেন না?
মঁতেন নিজের ঘরে বসে মানুষের স্বভাব নিয়ে কী দেখলেন?
দস্তয়েভস্কি মানুষের অপরাধের ভেতরে কী পেলেন?
ভার্জিনিয়া উলফ একটা সাধারণ দিনের মধ্যে কীভাবে এত গভীর জল দেখতে পেলেন?
জয়েস কেন একটা লোকের ডাবলিন শহরে একদিনের হাঁটাচলাকে মহাকাব্যের চেহারা দিলেন?
রবীন্দ্রনাথ প্রেম নিয়ে এত লিখেও প্রেমকে শেষ পর্যন্ত ধরতে পারলেন কি?
আমি জানি না।
তাই পড়ি।
আমার নিজের মাথা একটা মাথা। তার ক্ষমতা সীমিত। নিজের অভিজ্ঞতাও সীমিত। আমি একটা জীবনই পেয়েছি। কিন্তু বইয়ের একটা মজার ক্ষমতা আছে, নিজের এক জীবনের ভেতর বসে হাজার জীবন একটু একটু করে ছুঁয়ে দেখা যায়।
আপনি যুদ্ধ না করেও যুদ্ধের ভিতরের ভয় চিনতে পারেন।
কারাগারে না গিয়েও বন্দিত্বের মানসিকতা বুঝতে পারেন।
উনিশ শতকের রাশিয়ায় জন্ম না নিয়েও সেখানকার মানুষের দুশ্চিন্তার পাশে বসতে পারেন।
প্রাচীন এথেন্সে না থেকেও সক্রেটিসের সঙ্গে হাঁটতে পারেন।
মৃত মানুষদের সঙ্গে কথা বলার এর চেয়ে ভদ্র ব্যবস্থা আর কে করেছে!
বই খুললেই মৃত লোকেরা আবার কথা বলা শুরু করে।
কেউ দুহাজার বছর আগে মারা গেছে, তবু পৃষ্ঠা খুলে বলছে, শোনো, মানুষ সম্পর্কে আমার একটা কথা আছে।
আমি বলি, বলেন।
এই আলাপটাই আমার ভালো লাগে।
তাই আমি পড়াকে কখনও সময় নষ্ট বলে ভাবতে পারিনি। বরং আমার জীবনের সবচেয়ে কার্যকর সময়গুলোর অনেকটাই পড়ার টেবিলে গেছে। পড়া আমাকে সবসময় জ্ঞানী করেছে, এমন দাবি করলে বইয়েরাই সম্ভবত আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবে। অনেক পড়েও মানুষ যথেষ্ট বোকা থাকতে পারে। আমি তার জীবন্ত প্রমাণ।
তবে পড়া একটা সুবিধা দিয়েছে।
নিজের বোকামিটা একটু দ্রুত ধরা পড়ে।
আজ যে বিষয়ে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত দিলাম, কাল দুটো ভালো বই পড়ার পর দেখি ব্যাপারটা এত সোজা না। আরেকটা দিক আছে। আরেকটা ইতিহাস আছে। আরেকটা মানুষের অভিজ্ঞতা আছে।
এই ধাক্কাটা দরকার।
মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা সম্ভবত তখনই, যখন সে মনে করে তার জানা শেষ।
বই প্রতিদিন এসে সেই অহংকারে ছোট্ট একটা আলপিন ফুটিয়ে দেয়।
বলে, দাঁড়াও মশাই, আরও কথা আছে।
আমার তাই পড়াশোনা শেষ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না। একটা বই পড়লে পাঁচটা বইয়ের নাম পাই। সেই পাঁচটা পড়তে গিয়ে পঁচিশটা নতুন দরজা খুলে যায়। পঁচিশটার মধ্যে দশটা কিনি। দশটার মধ্যে তিনটা সঙ্গে সঙ্গে পড়ি। বাকি সাতটা তাকের ওপর বসে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন ব্যাংকের ঋণ আদায়ের লোক।
একটা অদ্ভুত অপরাধবোধও কাজ করে।
বইটা কিনেছি তিন বছর আগে। এখনও পড়িনি।
বই আমাকে কিছু বলে না।
চুপচাপ থাকে।
এই চুপ করে থাকাটাই আরও ভয়ংকর।
তবে এত পড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার, সেটা টাকা বলে আমার মনে হয় না।
টাকা থাকলে বই কেনা সহজ হয়, অবশ্যই। আজকাল অনেক বই লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়, ই-বুক পাওয়া যায়, পুরোনো বই পাওয়া যায়, সস্তা সংস্করণ পাওয়া যায়। জ্ঞান অর্জনের দরজা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি খোলা।
আসল সংকট অন্য জায়গায়।
ধৈর্য।
একটা জায়গায় বসে থাকা।
একটা জটিল বাক্য দ্বিতীয়বার পড়া।
বুঝিনি স্বীকার করে আবার আগের পাতায় ফেরা।
একটা বই প্রথম পঞ্চাশ পাতা আনন্দ না দিলেও তার সঙ্গে থাকা।
লেখককে অন্তত নিজের যুক্তিটা দাঁড় করানোর সুযোগ দেওয়া।
আমাদের এই ক্ষমতাটা খুব দ্রুত কমছে।
আমরা এখন কয়েক সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নিই কোন জিনিস আমাদের ভালো লাগবে। আঙুলের একটা সোয়াইপে মানুষ, খবর, শিল্প, মতামত, সম্পর্ক সব বদলে ফেলি। দশ সেকেন্ডের ভিডিও যদি প্রথম দুই সেকেন্ডে টানতে না পারে, চলে গেল। লেখার প্রথম অনুচ্ছেদে যদি বিস্ফোরণ না ঘটে, পাঠক অন্যদিকে।
আমাদের মন এখন যেন সারাক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেতরে ঢুকবে, কিন্তু জুতো খোলার ধৈর্য নেই।
বই এই জায়গায় বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক।
সে আপনার মনোরঞ্জনের দায়িত্ব নেয় না। সে বলে, আমার কাছে যদি আসতে চাও, বসো।
সময় দাও।
মন দাও।
একটু ধীর হও।
আমি যা বলছি তার সঙ্গে লড়ো।
প্রয়োজনে আমাকে অপছন্দ করো।
কিন্তু আগে পড়ো।
এই ধৈর্যের শিক্ষাটাই আমার কাছে বইয়ের বড় উপহার।
একটা বড় উপন্যাস পড়তে পড়তে বুঝেছি মানুষের বিচার তাড়াতাড়ি করা যায় না। একটা ইতিহাসের বই আমাকে শিখিয়েছে কোনও ঘটনার একটাই কারণ থাকে না। দর্শন শিখিয়েছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে হয়। কবিতা শিখিয়েছে সব অনুভূতির ব্যাখ্যা হয় না। বিজ্ঞান শিখিয়েছে সুন্দর ধারণাও প্রমাণ ছাড়া টেকে না। জীবনী শিখিয়েছে যাদের আমরা দূর থেকে বিরাট মানুষ ভাবি, তারাও সকালে উঠে দাঁত মাজতেন, ভুল করতেন, ঈর্ষা করতেন, ভয় পেতেন, প্রেমে বোকা হতেন।
ফলে পৃথিবীটা একটু সহনীয় লাগে।
নিজের জীবনটাও।
কারণ তখন বুঝি, আমার উদ্বেগ একেবারে নতুন আবিষ্কার নয়। আমার প্রেম, ভয়, ব্যর্থতা, অহংকার, ক্ষতি, একাকিত্ব, বয়স বাড়ার আতঙ্ক, মৃত্যুচিন্তা, এসব নিয়ে মানুষ বহুদিন ধরেই বসে আছে।
আমি সেই দীর্ঘ লাইনের আরেকজন মাত্র।
এ উপলব্ধি আমার কাছে শান্তির।
এই কারণেই বলি, পড়া আমার বিনিয়োগ।
কোনও স্টকের বিনিয়োগ নয়। রিটার্নের হিসাবও বছরে দশ শতাংশ করে করা যায় না।
এর লাভ মাঝে মাঝে বোঝা যায় রাত তিনটায়, যখন কোনও দুশ্চিন্তায় ঘুম হয় না, অথচ বইয়ের একটা পুরোনো বাক্য মনে পড়ে।
কখনও বোঝা যায় ঝগড়ার সময়, যখন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে চুপ থাকতে পারি।
কখনও বোঝা যায় কাউকে বিচার করার আগে, যখন মনে হয় লোকটার গল্পটা তো আমি জানি না।
কখনও বোঝা যায় নিজের জীবনের কোনও ক্ষতিকে মহাপ্রলয় মনে হলে, ইতিহাস এসে কাঁধে হাত রেখে বলে, মানুষ এর চেয়েও অনেক কিছু পার হয়ে গেছে।
এই রিটার্ন ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা যায় না।
তবু জমে।
চুপচাপ জমে।
আর একটা বয়সের পরে মানুষ বুঝতে শুরু করে, শান্তিতে থাকতে পারাও সম্পদ।
আমার কাছে বই সেই সম্পদের একটা উৎস।
তাই পড়ি।
চার-পাঁচ ঘণ্টা।
কখনও বেশি।
তারপর দু-তিন ঘণ্টা লিখি। কারণ এত মানুষের কথা শুনে নিজেরও দুটো কথা বলতে ইচ্ছে করে। এত লেখকের মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ানোর পর নিজের মাথার ভেতরের আসবাবপত্রও একটু নাড়াচাড়া করতে হয়।
আমি জানি সবার এই সময় নেই। কারও ছোট বাচ্চা আছে, কারও দুটো চাকরি, কারও সংসারের দায়িত্ব, কারও অসুস্থ মানুষ দেখাশোনা করতে হয়। জীবন সবার হাতে একই পরিমাণ অবসর তুলে দেয় না।
আমার হাতে যতটুকু সুযোগ আছে, আমি সেটা পড়ার পেছনে খরচ করি।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন খুব বেশি বড় নয়।
আর পৃথিবীতে বই অনেক বেশি।
সমস্যাটা ভয়াবহ।
আমার পড়ার তালিকা যত বড় হচ্ছে, আয়ু তত কমছে।
এ এক অসম প্রতিযোগিতা।
তবু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
দেখি কে জেতে।


