ভবিষ্যতের সুর, বর্তমানের কান
আমরা ভবিষ্যতের যে সংগীতই কল্পনা করি না কেন, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের বর্তমান সময়, সীমাবদ্ধ কল্পনা এবং পরিচিত কানেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।
কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার সূচনালগ্নেই এক গভীর দৃশ্যমানতা আমাদের আচ্ছন্ন করে। মনে হয় কাহিনিটি কেবল পাঠ্য নয়; বরং তা দেখা, শোনা বা অনুভবের এক সামগ্রিক অভিজ্ঞতা। এই নির্মিত জগতের গভীরে যা সবকিছুকে নিভৃতে একসূত্রে গেঁথে রাখে, তা হলো এর নিজস্ব সুর ও অন্তর্লীন সংগীত। এই শব্দরাশি হয়ত সচরাচর অনালোচিত থেকে যায়, কিন্তু এরাই ভবিষ্যতের সেই কাল্পনিক পৃথিবীকে প্রাণবন্ত করে তোলে, দেয় নিশ্বাস নেওয়ার স্পন্দন।
‘দ্য ফিফথ এলিমেন্ট’ (The Fifth Element) সিনেমার সেই উড়ন্ত যানের ভেতরে দিভা প্লাভালাগুনার (Diva Plavalaguna) কণ্ঠ থেকে যে সুর ধ্বনিত হয়, তা কি কেবলই ভিনগ্রহের কোনো শব্দ? নাকি তা আমাদের ধ্রুপদি অপেরারই এক সুদূরপ্রসারী ও বিবর্তিত রূপ? একইভাবে, ‘স্টার ওয়ার্স’ (Star Wars)-এর সেই কুখ্যাত ক্যান্টিনা; যেখানে ধুলোবালি আর রহস্যময় সব অবয়ব ঘিরে থাকে; সেখানে যে সুর বাজে, তা অনেকটা আমাদের লোকজ উৎসবের আমেজ দেয়, যদিও স্থানটি এক ভিন্ন মহাজাগতিক পরিমণ্ডল।
এই ধরনের সুরধারাকে ‘ডাইজেটিক মিউজিক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি নিছক দর্শকের বিনোদনের জন্য কোনো আবহ সংগীত নয়, বরং গল্পের চরিত্ররাও সরাসরি তা অনুভব করে। ফলে এটি কেবল পটভূমি হিসেবে কাজ করে না, বরং একটি কাল্পনিক জগৎ বিনির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। একটি সভ্যতা শব্দকে কীভাবে গ্রহণ করে, তার মাধ্যমেই ফুটে ওঠে সেই সমাজের মানসিক গড়ন, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব।
জেমস উইয়েরজবিকি সায়েন্স ফিকশনের সংগীতকে একটি সরল অথচ অস্বস্তিকর দ্বন্দ্বে বিভক্ত করেছেন: একদিকে যা সম্পূর্ণ নতুন, জাগতিক অভিজ্ঞতার অতীত ও অচেনা; অন্যদিকে যা চিরচেনা ও মাটির ঘ্রাণমাখা পৃথিবীর নিরবচ্ছিন্ন সুর। এই বিভাজনটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর অন্তরালে এক গভীর সংকট লুকিয়ে আছে; যদি আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয় কেবল পরিচিত সুরেই অভ্যস্ত থাকে, তবে আমরা সেই সম্পূর্ণ “অচেনা” সুর সৃষ্টি করব কীভাবে?
এর অনিবার্য ফলস্বরূপ, আমরা ভবিষ্যতের জন্য যা কম্পোজ করি, তা মূলত আমাদের বর্তমানেরই এক কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। আমরা ভবিষ্যৎকে ঠিক যেভাবে কল্পনা করি, সুরের জাল বুনি সেই সীমাবদ্ধ ধারণা থেকেই। ফলত, এক সময়ের সেই তথাকথিত “অচেনা” সুর কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেকেলে কোনো ফ্যাশনের মতো ম্লান ও পুরোনো হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের সুরের এই চিরন্তন জটিলতা সাহিত্যের পাতায় দীর্ঘকাল ধরেই বিদ্যমান। ১৬২৩ সালে ফ্রান্সিস বেকন তাঁর “The New Atlantis”-এ “sound houses”-এর এক অনন্য রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি এমন সব সুর ও ধ্বনির কল্পনা করেন যা পরিচিত কোনো স্কেলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা পশুপাখির কণ্ঠস্বর কিংবা মানবভাষাকে অনুকরণ করেও এক অন্যতর মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়।
এর প্রায় এক শতাব্দী পর জনাথন সুইফট তাঁর “Gulliver’s Travels”-এ এক ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি সুরের গাণিতিক বর্ণনায় না গিয়ে পরিবেশের মাধ্যমে পাঠকের মনে শব্দের প্রতিবিম্ব তৈরি করেন। যেমন বিশালদেহী Brobdingnagians-দের ষাট ফুট লম্বা কিবোর্ডে লাঠি দিয়ে বাদ্য বাজানোর দৃশ্যে তিনি সরাসরি শব্দের অনুভূতি ব্যাখ্যা করেন না, বরং দৃশ্যপটের বর্ণনা দিয়ে পাঠকের কল্পনার ওপর নির্ভর করেন। একইভাবে Laputa-র উন্নত সভ্যতার মহাজাগতিক সংগীতের ক্ষেত্রেও তিনি এক রহস্যময় অস্পষ্টতা বজায় রাখেন। মূলত এই অস্পষ্টতাই পাঠকের কল্পনাকে ডানা মেলার সুযোগ করে দেয়, যেখানে ভবিষ্যতের সুর তার নিজস্ব মহিমায় ধরা দেয়।
অলডাস হাক্সলির পদ্ধতিটি এখানে কিছুটা ব্যতিক্রম। Brave New World-এ তিনি সুরের বর্ণনায় যথেষ্ট প্রযুক্তিগত হয়ে ওঠেন; A flat major-এর গম্ভীর ধ্বনি, পাঁচ-চারের ছন্দ, diminuendo কিংবা darkened seconds; তার এই বর্ণনাগুলো পড়লে মনে হতে পারে আমরা কোনো শব্দ প্রকৌশলীর পর্যবেক্ষণ পাঠ করছি। আবার লেনিনা সিনেমা হলে যে আবহ সংগীত শোনে, তার বর্ণনাতেও তিনি ব্যবহার করেছেন বিচিত্র সব অভিধা; কখনো সেই শব্দ অতি গভীর, কখনো বাঁশির মতো শূন্যগর্ভ, আবার কখনো তা তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মথিত। এই সমস্ত উপাদান মিলে একটি শ্রবণযোগ্য জগৎ বা সাউন্ডস্কেপ তৈরি করার চেষ্টা থাকলেও, তা শেষাবধি ভাষাগত কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
পরবর্তীকালে মেরি ডোরিয়া রাসেল কিংবা আর্থার সি ক্লার্কের মতো লেখকদের রচনায় আমরা ভিনগ্রহের সংগীতের চিত্রায়ণ দেখতে পাই। সেখানে তারা জটিল ছন্দ এবং এমন এক মায়াবী কণ্ঠস্বরের অবতারণা করেন যা কখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আবার কখনো মিলিয়ে যায়। এই সুর সৌন্দর্য আর সত্যের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটায় বলে তারা উল্লেখ করেছেন। তবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এই বর্ণনাগুলো আসলে সুরের সরাসরি রূপায়ণ নয়, বরং তার এক প্রকার পরোক্ষ ইঙ্গিত মাত্র।
চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে এই ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে সাউন্ড ডিজাইনারদের সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল মূলত যন্ত্র বা প্রযুক্তির বিচিত্র সব যান্ত্রিক ধ্বনি; যেমন ব্লিপ-ব্লুপ বা বিপ-টোন; তৈরি করার ওপর। ভিনগ্রহের প্রাণীরা কোন ধরনের সংগীত পছন্দ করে কিংবা সুদূর ভবিষ্যতের মানুষেরা কী ধরনের গান গায়, তা নিয়ে তখন বিশেষ কোনো উদ্ভাবনী চিন্তা ছিল না। এক্ষেত্রে ‘Forbidden Planet’ ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী উদাহরণ; সেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর আগের এক প্রাচীন সভ্যতার রেকর্ডকৃত সুরের দেখা মেলে, যদিও তা কোনো জীবন্ত সংগীত নয় বরং ছিল স্রেফ এক ঐতিহাসিক নিদর্শন বা আর্টিফ্যাক্ট।
পরবর্তীকালে ষাট ও সত্তরের দশকে এসে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ‘Star Trek’-এ স্পকের লায়ার বাজানো, ‘Barbarella’-র সেই ইলেকট্রনিক লাউঞ্জ মিউজিক, কিংবা ‘A Clockwork Orange’-এ বিটোফেনের সুরের সিন্থেটিক রূপান্তর; সব মিলিয়ে এক নতুন সাউন্ডস্কেপ তৈরি হয়। এছাড়াও ‘The Omega Man’-এর মিউট্যান্টদের গুরুগম্ভীর চ্যান্ট, ‘Zardoz’-এর ধর্মীয় আবহযুক্ত স্তোত্র, ‘Logan’s Run’-এর ডিস্কো ও মলের ঝলমলে সুরধারা, ‘Star Wars’-এর বিখ্যাত ক্যান্টিনা ব্যান্ড থেকে শুরু করে ‘Doctor Who’-এর সান্ধ্যকালীন সংগীত; এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্মাতারা ভবিষ্যতের জন্য একদম নতুন কোনো শব্দ বা সুর সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন ঠিকই, কিন্তু অবধারিতভাবে তাদের হাতের কাছে থাকা প্রচলিত অনুষঙ্গগুলোকেই সেই নির্মাণে ব্যবহার করতে হয়েছিল।
এর ফলে একটি মৌলিক সমস্যা থেকেই যায়; এই সুরগুলো শুনতে যতই অদ্ভুত বা বৈচিত্র্যময় হোক না কেন, এগুলো আসলে আমাদের পরিচিত জগতের সীমানাকে অতিক্রম করতে পারে না। যেমন ‘দ্য ফিফথ এলিমেন্ট’ সিনেমার ডিভা প্লাভালাগুনার চরিত্রটি বাহ্যিকভাবে ভিনগ্রহের মনে হলেও, তার গায়ন শৈলীর মূলে রয়েছে চিরচেনা অপেরা, মানুষের চেনা স্কেল এবং পরিচিত সব আবেগ। তাই এই সুরগুলো কখনোই পুরোপুরি অচেনা বা ‘এলিয়েন’ হয়ে উঠতে পারে না।
জেমস উইয়েরজবিকি এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, যখন আপনি এই কাল্পনিক সুরগুলোকে বাস্তবে রূপ দেন বা সিনেমায় ব্যবহার করেন, তখন আপনি সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় আটকে ফেলেন। এর ফলে সুরটির অসীম সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায় এবং তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ফ্রান্সিস বেকন বা জনাথন সুইফটের মতো লেখকরা যেমন সুরের বর্ণনাকে কিছুটা অস্পষ্ট রেখেছেন, সেটি পাঠককে নিজের মতো করে শব্দ কল্পনা করার স্বাধীনতা দেয়। এই অস্পষ্টতার কারণেই প্রতিটি মানুষের মনে সেই সুরের আবেদন ভিন্ন ভিন্ন ও স্বতন্ত্র সংগীতের মতো বেজে ওঠে।
সায়েন্স ফিকশনের মূল দ্বন্দ্বটি এখানেই নিহিত; এটি একদিকে সবকিছুকে দৃশ্যমান, শ্রবণযোগ্য এবং স্পর্শযোগ্য করার চেষ্টা করে, কিন্তু সংগীতের মতো বিমূর্ত বিষয়কে সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে গেলেই তার অন্তর্নিহিত রহস্য ও জাদু হারিয়ে যায়।
আমরা ভবিষ্যতের যে সংগীতই কল্পনা করি না কেন, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের বর্তমান সময়, সীমাবদ্ধ কল্পনা এবং পরিচিত কানেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। যা সত্যিই অজানার সুর, তাকে আমরা কেবল আবছা ইশারা করতে পারি, তবে পূর্ণাঙ্গভাবে শোনাতে ব্যর্থ হই।



