শওকত সাহেব
শওকত সাহেবের মৃত্যু হয়েছিল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা সতেরো মিনিটে।
এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডাক্তার কাগজে পরিষ্কার করে লিখেছিলেন, Brought Dead। তার নিচে নিজের নাম লিখে সই করেছিলেন। সইটা অবশ্যি এমন ছিল যে দেখে মনে হয় পিঁপড়া বিষ খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে মারা গেছে।
দুর্ঘটনাটাও ছোটখাটো ছিল না।
গুলিস্তানের মোড়ে একটি বাস ব্রেক ফেল করে প্রথমে একটি প্রাইভেট কারে ধাক্কা দেয়, তারপর ফুটপাতে উঠে তিনজন মানুষকে চাপা দেয়। শওকত সাহেব ছিলেন তিনজনের একজন। অন্য দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। শওকত সাহেবকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তাঁর শ্বাস ছিল না, নাড়ি ছিল না, শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
মৃত মানুষের যেসব লক্ষণ থাকার কথা, সবই ছিল।
সমস্যা হলো, রাত সাড়ে আটটায় তিনি চোখ মেলে বললেন,
—এক কাপ চা পাওয়া যাবে?
তাঁর পাশে তখন এক তরুণ ডাক্তার বসে মোবাইলে নাটক দেখছিলেন। মৃতদেহ পাহারা দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না, তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তারপরও বসে ছিলেন। হাসপাতালের অন্য কোথাও বসার জায়গা পাওয়া যায়নি।
শওকত সাহেবের কথা শুনে ডাক্তার প্রথমে মোবাইলের দিকে তাকালেন। তাঁর ধারণা হলো, নাটকের কোনো চরিত্র চা চেয়েছে।
শওকত সাহেব আবার বললেন,
—চায়ে চিনি কম দেবেন। আমার ডায়াবেটিস আছে।
ডাক্তার এবার মৃত মানুষের দিকে তাকালেন।
মৃত মানুষও তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।
ডাক্তার একবার বললেন,
—আল্লাহ!
তারপর চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন।
শওকত সাহেব ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। তাঁর মাথায় ব্যথা, বুকে ব্যথা, বাঁ পায়ে ব্যথা। সমস্ত শরীরেই কমবেশি ব্যথা আছে। শুধু ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে কোনো ব্যথা নেই। ব্যাপারটা তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হলো। এত বড় দুর্ঘটনায় শরীরের একটি অংশ সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবে কেন?
তিনি কনিষ্ঠ আঙুলটি নাড়াতে নাড়াতে বললেন,
—ডাক্তার সাহেব, আপনি মেঝেতে শুয়ে আছেন কেন?
ডাক্তার উত্তর দিলেন না।
তিনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন।
শওকত সাহেবকে নিয়ে হাসপাতালে দ্বিতীয় দফা হৈচৈ শুরু হলো। প্রথম দফা হৈচৈ হয়েছিল তাঁকে মৃত ঘোষণার সময়। দ্বিতীয় দফা হলো তাঁর বেঁচে ওঠার পর।
একজন নার্স দূর থেকে তাঁকে দেখে চিৎকার দিলেন। একজন ওয়ার্ডবয় দৌড়ে পালাতে গিয়ে কাচের দরজায় ধাক্কা খেল। জরুরি বিভাগের অধ্যাপককে বাসা থেকে ডেকে আনা হলো। তিনি শওকত সাহেবের চোখে আলো ফেললেন, বুকে স্টেথোস্কোপ রাখলেন, নাড়ি দেখলেন। তারপর বললেন,
—ইন্টারেস্টিং।
শওকত সাহেব বললেন,
—কোনটা ইন্টারেস্টিং?
অধ্যাপক বললেন,
—আপনার জীবিত থাকাটা।
—জীবিত থাকা ইন্টারেস্টিং কেন?
—কারণ আপনি মারা গিয়েছিলেন।
শওকত সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—মারা গেলে কি চা খেতে ইচ্ছা করে?
অধ্যাপক এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না।
তিন দিন হাসপাতালে রেখে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো। অনেক পরীক্ষা করা হয়েছে। সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইসিজি, ইকো, রক্ত পরীক্ষা। পরীক্ষায় বড় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। শুধু তাঁর মাথার পেছনে ছয়টি সেলাই পড়েছে এবং বাঁ পায়ের পেশিতে আঘাত আছে।
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় তরুণ ডাক্তারটি তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর নাম ডা. রিফাত। যে রাতে শওকত সাহেব চা চেয়েছিলেন, তিনিই চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছিলেন।
রিফাত নিচু গলায় বললেন,
—স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—করুন।
—আপনি যখন মারা গিয়েছিলেন, তখন কিছু দেখেছিলেন?
—কী দেখব?
—আলো। লম্বা টানেল। মৃত আত্মীয়স্বজন। এই জাতীয় কিছু।
শওকত সাহেব বললেন,
—আমি একটা বাস দেখেছি।
রিফাত আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
—বাস?
—হ্যাঁ। ছয় নম্বর বাস। বাসটা আমার দিকে আসছিল।
—তারপর?
—তারপর কিছু মনে নেই।
রিফাত হতাশ হলো। মৃত্যুর ওপারের জগতের খবর নিতে এসে ঢাকা শহরের বাসের খবর পাওয়া আনন্দের বিষয় না।
হাসপাতালের গেট থেকে শওকত সাহেব রিকশা নিলেন।
তাঁর বাসা মগবাজারে। তিনি ভেবেছিলেন, বাসায় পৌঁছামাত্র তাঁর স্ত্রী মুনিরা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে জড়িয়ে ধরবে। তাঁর দুই মেয়ে, রিমি ও তুলি, বাবাকে ঘিরে থাকবে। ছোট ছেলে নাবিল হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে বাবা ফিরে এসেছেন।
মানুষ তার নিজের ফিরে আসার দৃশ্য কল্পনা করতে ভালোবাসে। সেই কল্পনায় সবাই তাকে খুব ভালোবাসে।
বাসার সামনে পৌঁছে শওকত সাহেব প্রথম ধাক্কাটি খেলেন।
বাড়ির গেটে কালো কাপড় বাঁধা। দেওয়ালে সাদা কাগজে লেখা:
মরহুম শওকত আলীর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল।
শুক্রবার বাদ আসর।
নিজের নামের আগে ‘মরহুম’ শব্দটি দেখতে তাঁর কেমন যেন লাগল। শব্দটি খারাপ না। বরং সম্মানজনক। তারপরও জীবিত অবস্থায় নিজের নামের আগে মরহুম দেখতে ভালো লাগে না।
গেটের কাছে বাড়ির দারোয়ান হাশেম বসেছিল। শওকত সাহেবকে দেখে তার মুখ হাঁ হয়ে গেল।
শওকত সাহেব বললেন,
—গেট খোলো।
হাশেম গেট খুলল না। সে বিড়বিড় করে বলল,
—লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা…
—কী হয়েছে?
হাশেম এবার উচ্চস্বরে চিৎকার দিল,
—ভাবি! ভাবি! সর্বনাশ হইছে!
শওকত সাহেব বিরক্ত হলেন।
—সর্বনাশ কী হয়েছে? আমি বাসায় এসেছি।
হাশেম গেটের চেয়ার ছেড়ে পেছাতে লাগল। পেছাতে পেছাতে বলল,
—আপনে বাসায় আইছেন, এইটাই তো সর্বনাশ।
মুনিরা দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পরনে সাদা শাড়ি। চোখ ফোলা। মাথার চুল এলোমেলো। তিনি কিছুক্ষণ স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন।
শওকত সাহেব বললেন,
—মুনিরা, আমি বেঁচে আছি।
মুনিরা কোনো উত্তর দিলেন না।
—ডাক্তাররা ভুল করেছিল। এই ধরনের ভুল হয়। খুব বেশি না, মাঝে মাঝে হয়।
মুনিরা মুখ থেকে হাত নামালেন। তাঁর চোখে ভয়। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ নেই।
তিনি খুব আস্তে বললেন,
—তুমি কে?
শওকত সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
—আমি কে মানে? আমি শওকত।
—শওকত মারা গেছে।
—মারা গিয়েছিলাম। পরে বেঁচে উঠেছি।
মুনিরা কাঁপা গলায় বললেন,
—মরা মানুষ বেঁচে ওঠে না।
—আমি উঠেছি।
মুনিরা বারান্দা থেকে সরে গেলেন।
শওকত সাহেব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। হাশেম তাঁকে ঢুকতে দিচ্ছে না। নিজের বাড়িতে ঢোকার জন্য দারোয়ানের অনুমতির প্রয়োজন হবে, এই সম্ভাবনা তিনি কখনো বিবেচনা করেননি।
তিনি কঠিন গলায় বললেন,
—হাশেম, গেট খোলো।
হাশেম কান্না কান্না গলায় বলল,
—স্যার, আমি গরিব মানুষ। আমার দুইটা বাচ্চা আছে।
—তোমার বাচ্চা থাকার সঙ্গে গেট খোলার সম্পর্ক কী?
—আপনে যদি আমার ঘাড় মটকান?
শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
—আমি জীবিত থাকতেও কারও ঘাড় মটকাইনি। মারা গিয়ে এই অভ্যাস কেন হবে?
শেষ পর্যন্ত বড় মেয়ে রিমি নিচে নেমে এল। তার সঙ্গে আরও চারজন আত্মীয়। সবার হাতে কিছু না কিছু আছে। কারও হাতে তসবিহ, কারও হাতে ঝাড়ু, একজনের হাতে ক্রিকেট ব্যাট।
শওকত সাহেব বললেন,
—ক্রিকেট ব্যাট কেন?
তাঁর শ্যালক বাবলু বলল,
—সাবধানতার জন্যে।
—কার সাবধানতা?
বাবলু উত্তর দিল না।
রিমি বাবার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। খুব কাছাকাছি না। নিরাপদ দূরত্ব রেখে। সে বলল,
—বাবা, তুমি সত্যিই বাবা?
—না। আমি পাশের বাসার করিম সাহেব। তোমাদের সঙ্গে রসিকতা করতে এসেছি।
রিমি কেঁদে ফেলল।
শওকত সাহেব নরম গলায় বললেন,
—কাঁদছিস কেন?
—তুমি বাবার মতো করেই কথা বলছ।
—আমি তোর বাবা বলেই বাবার মতো কথা বলছি।
রিমি বলল,
—তোমার ছায়া আছে?
—অবশ্যই আছে।
সবাই মাটির দিকে তাকাল।
বিকেলের আলোয় শওকত সাহেবের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে। ছায়া দেখে কারও ভয় কমল না। বরং বাবলু বলল,
—জিনদেরও ছায়া থাকে।
শওকত সাহেব বললেন,
—এই তথ্য তুমি কোথায় পেয়েছ?
—ইউটিউবে।
ইউটিউবের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। শওকত সাহেব গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। হাশেম বাধা দিল না। সে গেটের পাশে বসে কাঁদতে শুরু করেছে।
বাড়িতে ঢুকে শওকত সাহেব বুঝলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে অনেক কিছু বদলে গেছে।
বসার ঘরের দেয়ালে তাঁর বড় একটি ছবি। ছবিতে তিনি পাঞ্জাবি পরে হাসছেন। ছবির চারপাশে রজনীগন্ধার মালা। নিচে ধূপ জ্বলছে।
তিনি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
—ছবিটা ভালো হয়েছে।
কেউ জবাব দিল না।
—কোথা থেকে বড় করিয়েছ?
মুনিরা দূর থেকে বললেন,
—পুরোনো পাসপোর্টের ছবি।
—পাসপোর্টের ছবিতে তো আমি হাসি নাই।
—স্টুডিওর লোক হাসি বসিয়ে দিয়েছে।
শওকত সাহেব আবার ছবির দিকে তাকালেন। প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে। মৃত মানুষের মুখেও হাসি বসিয়ে দেওয়া যায়।
তিনি বললেন,
—ছবিটা নামাও।
মুনিরা আঁতকে উঠে বললেন,
—না!
—না কেন?
—ছবিটা থাক।
—জীবিত মানুষের ছবিতে মালা দিয়ে রাখবে?
মুনিরা চুপ করে গেলেন।
শওকত সাহেব নিজের শোবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেওয়া।
—আমার ঘরে তালা কেন?
মুনিরা বললেন,
—তোমার জিনিসপত্র যেমন ছিল তেমন রাখা হয়েছে।
—তালা খোলো।
—আজ না।
—আজ না কেন?
মুনিরা বললেন,
—হুজুর আসবেন। তিনি আগে দেখবেন।
—হুজুর আমার শোবার ঘর দেখবেন কেন?
—তুমি সত্যিই তুমি কি না, সেটা বুঝবেন।
শওকত সাহেব বসার ঘরের সোফায় বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়স্বজন আরও পেছনে সরে গেল।
তিনি বললেন,
—কেউ এক কাপ চা দাও।
কেউ নড়ল না।
—তিন দিন হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতালের চা মুখে দেওয়া যায় না। নিজের বাসায় এসে এক কাপ চা পাব না?
ছোট মেয়ে তুলি রান্নাঘরের দিকে গেল। মুনিরা তাকে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। তুলি থেমে গেল।
শওকত সাহেব বললেন,
—কী বললে?
—কিছু না।
—চায়ে লবণ দিতে বলেছ?
মুনিরা চমকে উঠলেন।
শওকত সাহেব হেসে বললেন,
—ভূতকে নাকি লবণ খাওয়ালে ধরা পড়ে, তাই না?
কেউ হাসল না।
এই প্রথম শওকত সাহেবের মনে হলো, ঘটনাটা মজার নয়।
রাতে তাঁকে শোবার ঘরে ঢুকতে দেওয়া হলো না। বসার ঘরের সোফায় বিছানা করা হলো। সবাই দরজা-জানালা বন্ধ করে নিজেদের ঘরে চলে গেল। যাওয়ার আগে বাবলু বসার ঘরের চার কোণে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিল।
শওকত সাহেব বললেন,
—আমার গায়ে ফুঁ দেবে না?
বাবলু কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—দূর থেকে দেব?
—দরকার নেই।
রাত বারোটার দিকে বাড়ি নিঃশব্দ হয়ে গেল।
শওকত সাহেবের ঘুম এল না। দুর্ঘটনার দৃশ্য বারবার মনে পড়ছে। বাসটা তাঁর দিকে ছুটে আসছে। ড্রাইভারের মুখ দেখা যাচ্ছে। লোকটির মুখে কোনো ভয় নেই, বরং বিরক্তি। যেন ব্রেক ফেল করা বাসের সামনে দাঁড়িয়ে শওকত সাহেব অন্যায় করেছেন।
তিনি উঠে পানি খেলেন। তারপর দেয়ালে ঝোলানো নিজের ছবির সামনে দাঁড়ালেন।
ছবির শওকত হাসছে।
আসল শওকত হাসছে না।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
—তোমার অবস্থা আমার চেয়ে ভালো। অন্তত কেউ তোমাকে সন্দেহ করছে না।
ছবির শওকত হাসতেই থাকল।
পরদিন শুক্রবার।
সকালে হুজুর এলেন। তাঁর নাম মাওলানা কুদ্দুস। বয়স চল্লিশের মতো। গোল মুখ। ছোট ছোট চোখ। হাতে একটি কালো ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর কী আছে বোঝা গেল না।
তিনি ঘরে ঢুকে শওকত সাহেবকে সালাম দিলেন।
শওকত সাহেব সালামের উত্তর দিলেন।
মাওলানা কুদ্দুস বললেন,
—আপনি কেমন আছেন?
—ভালো।
—মৃত্যুর পর ভালো থাকা সহজ কথা না।
—আমি মারা যাইনি।
—লোকজন বলছে মারা গিয়েছিলেন।
—লোকজন অনেক কিছুই বলে।
হুজুর মাথা নাড়লেন।
—এই কথা ঠিক।
শওকত সাহেব কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। অন্তত একজন যুক্তির কথা বলছে।
হুজুর বললেন,
—আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।
—করুন।
—আপনার স্ত্রীর ডাকনাম কী?
—মুনা।
মুনিরা পেছন থেকে বললেন,
—ঠিক বলেছে।
—বড় মেয়ের জন্মের সময় কী হয়েছিল?
—হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। জেনারেটর চালু হতে সাত মিনিট লেগেছিল। মুনিরা ভেবেছিল বাচ্চা বদলে দিয়েছে।
রিমি কাঁদতে শুরু করল।
হুজুর আরও কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। সব উত্তরই ঠিক। তিনি শেষে বললেন,
—স্মৃতির দিক থেকে উনি শওকত সাহেবই।
মুনিরা বললেন,
—জিন মানুষের সব স্মৃতি জানতে পারে না?
হুজুর চিন্তিত মুখে বললেন,
—পারে।
শওকত সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন,
—তাহলে প্রশ্ন করলেন কেন?
হুজুর বললেন,
—নিয়ম রক্ষার জন্যে।
এরপর কালো ব্যাগ থেকে তিনি একটি আয়না, আতরের শিশি, লাল সুতা এবং একটি কাঁচা ডিম বের করলেন।
শওকত সাহেব বললেন,
—ডিম দিয়ে কী হবে?
—পরীক্ষা।
—সিদ্ধ করবেন?
হুজুর গম্ভীর হয়ে গেলেন।
—আপনি রসিকতা করবেন না।
—আমি জীবিত থাকতে রসিকতা করতাম। এখন বন্ধ করব কেন?
হুজুর ডিমটি শওকত সাহেবের মাথার চারপাশে তিনবার ঘুরিয়ে একটি বাটিতে ভাঙলেন। স্বাভাবিক ডিম। কুসুম হলুদ, সাদা অংশ স্বচ্ছ।
সবাই ঝুঁকে দেখল।
বাবলু বলল,
—ডিমটা কেমন যেন।
শওকত সাহেব বললেন,
—কাঁচা ডিম এমনই হয়।
হুজুর দীর্ঘ সময় ডিমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
—বিষয়টা জটিল।
জটিল বিষয় নিয়ে তিনি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, সাত দিন শওকত সাহেবকে নজরে রাখতে হবে। তিনি কী খান, কখন ঘুমান, আয়নায় তাঁর চেহারা দেখা যায় কি না, কুকুর তাঁকে দেখে ডাকে কি না, সব লিখে রাখতে হবে।
নাবিলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো খাতা রাখার।
প্রথম দিনের হিসাব সে লিখল:
সকাল ৯টা ১২ মিনিট: বাবা দুইটা রুটি খেয়েছেন।
সকাল ৯টা ২৫ মিনিট: বাবা হাঁচি দিয়েছেন।
সকাল ১০টা: আয়নায় বাবাকে দেখা গেছে।
সকাল ১০টা ১৭ মিনিট: পাশের বাসার কুকুর বাবাকে দেখে ডাকেনি। বিষয়টি সন্দেহজনক।
শওকত সাহেব খাতাটা পড়ে বললেন,
—কুকুরটা আমাকে চেনে। আমাকে দেখে ডাকবে কেন?
নাবিল বলল,
—অচেনা কিছু দেখলেও ডাকত।
—তার মানে আমি চেনা।
—অথবা খুব অচেনা।
যুক্তিটা শওকত সাহেব বুঝলেন না।
পরবর্তী কয়েক দিনে তাঁর জীবন অদ্ভুত হয়ে উঠল।
মুনিরা তাঁর জন্য আলাদা প্লেট রাখলেন। সেই প্লেট রান্নাঘরে নেওয়া হয় না। বারান্দায় ধোয়া হয়।
রিমি বাবার সঙ্গে কথা বলে দরজার আড়াল থেকে।
তুলি মাঝে মাঝে কাছে আসে, কিন্তু হাত বাড়ালেই পিছিয়ে যায়।
নাবিল রাতে তাঁর ঘুমানোর ভিডিও করে।
হাশেম গেট খুলে দেয়, তবে চোখ বন্ধ করে রাখে।
পাড়ার লোকজন নানা অজুহাতে তাঁকে দেখতে আসে। কেউ বলে শরীরের খবর নিতে এসেছে, কেউ বলে হাসপাতালের ঘটনা শুনতে এসেছে। সবাই নিরাপদ দূরত্বে বসে। চা খেয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে,
—চেহারা তো হুবহু।
যেন মানুষের মৃত্যুর পর চেহারায় সামান্য পরিবর্তন হওয়া উচিত।
অফিসে ফোন করে শওকত সাহেব জানলেন, তাঁর পদে সাময়িকভাবে অন্য একজনকে বসানো হয়েছে। হিসাব বিভাগ থেকে তাঁর মৃত্যুজনিত সুবিধার কাগজ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বললেন,
—আমি তো বেঁচে আছি।
ওপাশের কর্মকর্তা বললেন,
—স্যার, কাগজে আপনি মৃত।
—কাগজ ঠিক করো।
—মৃত্যু সনদ বাতিল না হলে সম্ভব না।
—মৃত্যু সনদ কীভাবে বাতিল হবে?
—যে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেছেন, তিনি লিখবেন যে আপনি মৃত নন।
—তিনি তো জানেন।
—জানা আর লেখা এক বিষয় না, স্যার।
সরকারি নিয়মে জীবিত হওয়া মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।
এক সপ্তাহ পর শওকত সাহেব বুঝলেন, মানুষ তাঁকে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি থেকে সুবিধাও নিচ্ছে।
মুনিরার বড় ভাই জমির কাগজপত্র নিয়ে এলেন। বললেন,
—তুমি তো এখন আইনগতভাবে মৃত। তোমার সই চলবে কি না সন্দেহ। তারপরও কয়েকটা জায়গায় সই করে রাখো।
শওকত সাহেব বললেন,
—কেন?
—পরিবারের ভালোর জন্যে।
অফিসের সহকর্মী আজমল এল। বলল,
—স্যার, আপনার টেবিলটা আপাতত আমি ব্যবহার করছি। আপনি ফিরলে সমস্যা হবে। আপনার শরীরও দুর্বল। কিছুদিন বিশ্রাম নিন।
—কতদিন?
—দুই-তিন বছর।
বীমা কোম্পানি থেকে লোক এল। মৃত্যু দাবির টাকা প্রায় প্রস্তুত। শওকত সাহেব বেঁচে থাকলে টাকা পাওয়া যাবে না।
লোকটি মুনিরাকে আলাদা ডেকে বলল,
—বিষয়টা চেপে রাখলে ভালো হতো।
শওকত সাহেব পাশের ঘর থেকে সব শুনলেন।
সেদিন রাতে তিনি প্রথম বুঝলেন, সবাই তাঁকে ভূত ভাবছে বলে শুধু ভয় পাচ্ছে না। কেউ কেউ চাইছে তিনি সত্যিই ভূত হয়ে থাকুন।
কারণ মৃত মানুষ ঝামেলা করে না।
মৃত মানুষ সম্পত্তির ভাগ চায় না, অফিসে ফিরে আসতে চায় না, বীমার টাকা আটকে দেয় না। মৃত মানুষ দেয়ালে ছবি হয়ে থাকে। বিশেষ দিনে তার জন্য দোয়া হয়। তাকে নিয়ে ভালো কথা বলা সহজ।
জীবিত মানুষ অনেক বেশি অসুবিধাজনক।
সেই রাতে শওকত সাহেব শোবার ঘরের তালা ভেঙে ঢুকলেন।
ঘর প্রায় আগের মতোই আছে। আলমারির ওপরে তাঁর ঘড়ি। টেবিলে চশমা। বালিশের নিচে তিনি যে গোয়েন্দা উপন্যাসটি পড়ছিলেন, সেটাও আছে। বুকমার্ক আটকে আছে সাতচল্লিশ নম্বর পাতায়।
শুধু একটি জিনিস বদলেছে।
খাটের পাশে মেঝেতে তাঁর কাপড়চোপড়, পুরোনো কাগজপত্র, জুতা, বই আলাদা করে রাখা। যেন এগুলো শিগগিরই সরিয়ে ফেলা হবে।
তিনি খাটে বসে বইটি খুললেন।
সাতচল্লিশ নম্বর পাতায় একটি বাক্যের নিচে পেন্সিলের দাগ:
মৃতেরা ফিরে আসে না। ফিরে এলে জীবিতদের জীবন এলোমেলো হয়ে যায়।
শওকত সাহেব অনেকক্ষণ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাইরে মুনিরার গলা শোনা গেল।
—শওকত?
তিনি উত্তর দিলেন না।
মুনিরা আবার ডাকলেন,
—তুমি ঘরে আছ?
—হ্যাঁ।
—দরজা বন্ধ করেছ কেন?
—ঘুমাব।
মুনিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোমার কি আমাদের ওপর রাগ হয়েছে?
শওকত সাহেব বললেন,
—না।
—তাহলে কথা বলছ না কেন?
—মৃত মানুষের বেশি কথা বলা ঠিক না।
দরজার ওপাশে কোনো শব্দ হলো না।
অনেকক্ষণ পর খুব নিচু গলায় মুনিরা বললেন,
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
শওকত সাহেব বই বন্ধ করলেন।
—এখনো পাও।
—পাই।
—কিসের ভয়?
মুনিরা বললেন,
—তুমি সত্যিই ফিরে এসেছ কি না, সেই ভয়। আবার মনে হয়, তুমি ফিরে এসে যদি দেখো আমরা তোমাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছি, তখন কী হবে?
শওকত সাহেব দরজা খুললেন।
মুনিরা দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা শাড়ি পরা। হাতে শওকত সাহেবের পুরোনো নীল পাঞ্জাবি।
তিনি বললেন,
—এটা কেন?
—কাল তোমার দোয়া মাহফিল ছিল। পাঞ্জাবিটা গরিব কাউকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। দিতে পারিনি।
—কেন?
—গন্ধটা তোমার মতো।
শওকত সাহেব পাঞ্জাবিটি হাতে নিলেন। বললেন,
—আমি কি ভেতরে আসতে পারি?
প্রশ্নটা শুনে মুনিরার চোখে পানি এসে গেল।
নিজের ঘরে ঢোকার জন্য স্বামী স্ত্রীর অনুমতি চাইছে।
মুনিরা মাথা নাড়লেন।
সেই রাতে বহুদিন পর তাঁরা একই খাটে শুলেন। মাঝখানে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। মুনিরা খাটের এক প্রান্তে, শওকত সাহেব অন্য প্রান্তে।
গভীর রাতে শওকত সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল।
ঘরে অন্ধকার। জানালার পর্দা দিয়ে রাস্তার বাতির হালকা আলো ঢুকছে।
তিনি অনুভব করলেন, মুনিরা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন।
—ঘুমাওনি?
—না।
—কী দেখছ?
মুনিরা বললেন,
—তোমার শ্বাস পড়ছে কি না দেখছি।
শওকত সাহেব হাত বাড়িয়ে স্ত্রীর হাত ধরলেন। মুনিরার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।
তিনি বললেন,
—শ্বাস পড়ছে।
মুনিরা তাঁর বুকের ওপর হাত রাখলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—হৃদপিণ্ডও চলছে।
—চলবে না কেন?
মুনিরা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে স্বামীর কাছে সরে এলেন। মাথা রাখলেন তাঁর বুকে।
শওকত সাহেব বুঝলেন, ভয় পুরোপুরি যায়নি। হয়তো কোনোদিন যাবে না।
পরদিন ভোরে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তিনি হাঁটতে বের হলেন।
রাস্তা ফাঁকা। আকাশ মেঘলা। রাতের বৃষ্টিতে গাছের পাতা চকচক করছে। দূরে একটি কুকুর তাঁকে দেখে লেজ নাড়ল। এই সেই কুকুর, যে তাঁকে দেখে ডাকেনি।
শওকত সাহেব কুকুরটির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
—তুই কি বুঝতে পারিস আমি বেঁচে আছি?
কুকুরটি হাই তুলল।
—না বুঝলেও সমস্যা নেই। মানুষও বুঝতে পারছে না।
তিনি হাঁটতে হাঁটতে দুর্ঘটনার জায়গায় গেলেন।
গুলিস্তানের সেই মোড়ে এখন গাড়ি চলছে, মানুষ রাস্তা পার হচ্ছে, দোকান খুলছে। ফুটপাতের এক পাশে তিনজন মৃত মানুষের স্মরণে ছোট একটি পোস্টার লাগানো।
তিনজনের ছবির মধ্যে তাঁর ছবিও আছে।
তিনি পোস্টারের সামনে দাঁড়ালেন।
একজন চা-ওয়ালা বলল,
—স্যার, চা খাবেন?
শওকত সাহেব বললেন,
—খাব।
—চিনি কেমন?
—কম।
চা-ওয়ালা চা বানাতে বানাতে পোস্টারের দিকে তাকাল। তারপর শওকত সাহেবের দিকে তাকাল। আবার পোস্টারের দিকে তাকাল।
তার হাত থেমে গেল।
—স্যার…
—কী?
—পোস্টারের লোকটা আপনার মতো।
শওকত সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন। চা আগুনগরম। চমৎকার হয়েছে।
তিনি বললেন,
—লোকটা আমি।
চা-ওয়ালা কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
—ও আচ্ছা।
সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শওকত সাহেব অবাক হলেন।
—তুমি ভয় পাচ্ছ না?
চা-ওয়ালা বলল,
—ভয় পাইয়া লাভ কী, স্যার? সকালবেলা বেচাকেনা শুরু করছি। ভূত হইলেও চায়ের দাম দশ টাকা দিতে হবে।
শওকত সাহেব হাসলেন।
দুর্ঘটনার পর এই প্রথম তিনি প্রাণ খুলে হাসলেন।
চা শেষ করে দশ টাকার নোট দিলেন। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। বাস চলছে। হর্ন বাজছে। মানুষ ছুটছে। এই শহরে কে জীবিত, কে মৃত, কে জীবিত থেকেও মৃতের মতো, তা নিয়ে কারও ভাবার সময় নেই।
শওকত সাহেবের মনে হলো, তিনি ফিরে এসেছেন।
হাসপাতাল থেকে না।
মৃত্যুর কাছ থেকেও না।
তিনি ফিরে এসেছেন মানুষের ভয়, সুবিধা, স্মৃতি এবং ভুলে যাওয়ার ভেতর থেকে।
বাড়ির সামনে এসে দেখলেন হাশেম গেট খুলে দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার চোখ বন্ধ না।
হাশেম লজ্জিত গলায় বলল,
—স্যার, হাঁটতে গেছিলেন?
—হ্যাঁ।
—চা খাইছেন?
—খেয়েছি।
হাশেম বলল,
—ভাবি আপনার জন্যে চা বানাইছে।
শওকত সাহেব থমকে দাঁড়ালেন।
—আমার জন্যে?
—জে স্যার। চিনি কম দিছে।
তিনি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
দোতলার বারান্দায় মুনিরা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর গায়ে আর সাদা শাড়ি নেই। হালকা নীল রঙের একটি শাড়ি পরেছেন। শওকত সাহেবের খুব পরিচিত শাড়ি। বিবাহবার্ষিকীতে তিনি কিনে দিয়েছিলেন।
মুনিরা বললেন,
—চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
শওকত সাহেব সিঁড়ির দিকে এগোলেন।
দেয়ালে তাঁর মালা দেওয়া ছবিটি তখনো ঝুলছে। মালা শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে।
তিনি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মুনিরাকে বললেন,
—এটা নামাবে না?
মুনিরা বললেন,
—আজ নামাব।
—আজ কখন?
—চা খাওয়ার পর।
শওকত সাহেব মাথা নাড়লেন।
কিছু কিছু কাজ সঙ্গে সঙ্গে করতে নেই।
মৃত মানুষের ছবি নামাতেও সময় লাগে।


