I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
ইউরোপীয় সাহিত্যের এমন কিছু ধ্রুপদী সৃষ্টি রয়েছে, যেগুলোর পাঠপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণা আগে থেকেই যেন বাঁধাধরা হয়ে থাকে—বইটির পাতা খোলার পূর্বেই আমরা ধরে নিই সেখানে কী মিলবে। এই ধরণের পূর্বনির্ধারিত ধারণার ফাঁদে পড়ার অন্যতম বড় ও বিপজ্জনক উদাহরণ সম্ভবত ডন কিহোতে। স্প্যানিশ সাহিত্যিক মিগেল দে সার্ভান্তেস সাভেদ্রার এই কালজয়ী উপন্যাসের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মতিচ্ছন্ন বয়স্ক অভিজাত মানুষের ছবি। মধ্যযুগের কাল্পনিক নাইটদের বীরত্বগাথা পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে যিনি নিজের সুস্থ বিচারবুদ্ধি হারিয়ে বসেছেন; একটি কৃশকায় ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বিশ্বজয়ে বেরিয়েছেন; সামান্য সরাইখানাকে ধরে নিচ্ছেন সুরক্ষিত দুর্গ, রূপসী রাজকন্যা ভেবে বসছেন সাধারণ এক গ্রাম্য তরুণীকে, আর হাওয়াকলকে দানব কল্পনা করে উদ্যত বর্শা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। এই পথচলায় তাঁর ছায়াসঙ্গী সাঞ্চো পানসা—এক স্থূলবুদ্ধির কিন্তু ঘোর বাস্তবমুখী অনুচর, যিনি কখনো তাঁর উন্মাদ মনিবকে সংবরণ করার চেষ্টা করেন, আবার কখনোবা মনিবের সেই অদ্ভুত আবেশের সুযোগে নিজের বৈষয়িক ফায়দাটুকু গুছিয়ে নিতে ভোলেন না।
আমরা হাসি।
সার্ভান্তেসও আমাদের হাসান।
কিন্তু শুধু কি হাসালেন?
একটি উপন্যাসের প্রথম ভাগ প্রকাশিত হলো ১৬০৫ সালে, দ্বিতীয় ভাগ ১৬১৫ সালে। মাঝখানের এই সময়টিতে স্পেনে কী ঘটছে? কোন রাষ্ট্রের মধ্যে বসে সার্ভান্তেস লিখছেন? কারা দেশ থেকে উৎখাত হচ্ছে? কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বই পরীক্ষা করছে, মতবাদ পরীক্ষা করছে, মানুষের বিশ্বাস পরীক্ষা করছে? এবং কেন এমন একটি উপন্যাসের মধ্যে, যেখানে অধিকাংশ পাঠক প্রধানত পাগল নাইটের কীর্তিকলাপ দেখতে ব্যস্ত, হঠাৎ এসে দাঁড়ায় রিকোতে নামের এক নির্বাসিত মানুষ?
সেখানেই হাসিটা একটু থামিয়ে রাখা দরকার।
১
রিকোতে একজন মরিস্কো।
অর্থাৎ তাঁর পূর্বপুরুষ মুসলমান ছিলেন, খ্রিস্টীয় স্পেনে তাঁদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ তাঁদের পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য নাগরিক বলে গ্রহণ করেনি। বহু প্রজন্ম ধরে একই দেশে বসবাস করেও তাঁরা রয়ে গেলেন সন্দেহের মানুষ। ধর্মান্তর যথেষ্ট হলো না, ভাষা সন্দেহজনক, পোশাক সন্দেহজনক, খাদ্যাভ্যাস সন্দেহজনক, পারিবারিক স্মৃতি সন্দেহজনক। শেষ পর্যন্ত রাজা তৃতীয় ফিলিপের আমলে মরিস্কোদের স্পেন থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হলো ১৬০৯ সালে এবং পরবর্তী কয়েক বছরে তা কার্যকর হলো।
সার্ভান্তেসের দ্বিতীয় ডন কিহোতে প্রকাশিত হচ্ছে তারই অব্যবহিত পরে। তাই তথ্যটা মনে রাখুন।
সাঞ্চো একদিন রাস্তায় তাঁর পুরনো প্রতিবেশী রিকোতের সঙ্গে দেখা করলেন। রিকোতে তখন জার্মান তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি ইতালি হয়ে জার্মানিতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে এমন একটি সমাজের সন্ধান পেয়েছিলেন যেখানে, তাঁর ভাষায়, মানুষ তুলনামূলকভাবে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে এবং বিবেকের স্বাধীনতা কিছুটা বেশি। এখন তিনি গোপনে আবার স্পেনে প্রবেশ করেছেন। কেন? নিজের সম্পদের জন্য।
দেশত্যাগের আগে তিনি প্রচুর ধন গোপন করে রেখে গিয়েছিলেন। এখন সেটি উদ্ধার করবেন। সাঞ্চোকে সাহায্য করতে বললেন। সাঞ্চো অস্বীকার করলেন, কিন্তু পুরনো প্রতিবেশীকে ধরিয়েও দিলেন না। সার্ভান্তেসের মূল পাঠে ধনটি বাড়ির বাগানে নয়, গ্রামের বাইরে কোথাও গোপন করা হয়েছিল। এই ছোট তথ্যটিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপন্যাসে রিকোতে কোনো কিংবদন্তির মুসলমান নন, তিনি একজন বাস্তব মানুষ, যিনি পালাবার আগে ভেবেছেন অর্থ কোথায় লুকোবেন, স্ত্রী-কন্যা কোথায় যাবে, কোন দেশে আশ্রয় পাওয়া যাবে, কীভাবে আবার ফিরে এসে সম্পত্তি উদ্ধার করা সম্ভব হবে। ভেবে দেখুন, একটি দেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আর কতখানি বাস্তব হতে পারে?
রিকোতে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ফিরে আসেননি। কোনো হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে আসেননি। তিনি তাঁর টাকা চান। তাঁর পরিবারকে চান। তাঁর মেয়েকে চান। তাঁর সেই জীবনের অবশিষ্টাংশ চান, যেটা রাষ্ট্রের একটি ঘোষণায় হঠাৎ বিদেশ হয়ে গেছে। দেশ থেকে মানুষকে তাড়ানো যায়। মানুষের স্মৃতি থেকে দেশটাকে তাড়ানো যায় কী করে?
২
এই রিকোতে-পর্বটিই আমাকে সার্ভান্তেসের উপন্যাস নতুন করে পড়তে বাধ্য করে। কারণ আমরা যদি শুধু রাষ্ট্রের ভাষা শুনি, তাহলে মরিস্কো বহিষ্কার একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। নিরাপত্তা, ধর্মীয় ঐক্য, রাষ্ট্রীয় স্থিতি, সন্দেহজনক জনগোষ্ঠী, সম্ভাব্য অন্তর্ঘাত, এইসব যুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র সবসময়ই তার কঠোরতম সিদ্ধান্তকে সুসংহত ভাষায় প্রকাশ করতে জানে। কিন্তু রাষ্ট্র যাকে “সমস্যা” বলে, উপন্যাস তাকে মানুষ করে দেখাতে পারে। এখানেই সাহিত্যের বিপদ।
সরকারি ফরমান বলবে, এরা চলে যাবে। উপন্যাস জিজ্ঞেস করবে, যাবে কোথায়?
ফরমান বলবে, এরা আমাদের নয়। উপন্যাস দেখাবে, লোকটির প্রতিবেশী সাঞ্চো তাকে চিনে ফেলেছে।
ফরমান বলবে, এদের শিকড় সন্দেহজনক। রিকোতে বলবেন, আমার ঘর তো এখানেই ছিল।
সার্ভান্তেসের রিকোতে এমনকি বহিষ্কারের সরকারি যুক্তিও আংশিকভাবে স্বীকার করেন, নিজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিপজ্জনক লোক ছিল বলে মন্তব্য করেন। আবার একই মানুষ বলেন তাঁর পরিবার নিরপরাধ, তাঁর স্ত্রী ও কন্যা খ্রিস্টান, তাঁদের প্রতি দয়া করা উচিত। অর্থাৎ লেখক আমাদের হাতে খুব সহজ কোনো রাজনৈতিক পুস্তিকা তুলে দেননি। তাঁর বক্তব্য দ্ব্যর্থক, কখনো রাষ্ট্রের ভাষা উচ্চারণ করছে, আবার তার পাশেই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে বিধ্বস্ত মানুষের মুখটি বসিয়ে দিচ্ছে। রিকোতে ও তাঁর কন্যা আনা ফেলিক্সের কাহিনীতে বহিষ্কারের মানবিক মূল্য এমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সরকারি ন্যায়বিচারের ভাষা আর একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
কেন সার্ভান্তেস এই দ্বৈত পদ্ধতি গ্রহণ করলেন? এখানে আর একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তিনি এমন এক দেশে বসে লিখছেন যেখানে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপর সরাসরি আক্রমণ সাহিত্যিক কৌতুকের মতো নিরীহ ব্যাপার ছিল না।
৩
স্পেনীয় ইনকুইজিশনের কথা আমরা জানি। কিন্তু “ইনকুইজিশন ছিল” এই সাধারণ তথ্যটি বললে সার্ভান্তেসের সমস্যাটা বোঝা যায় না। বই প্রকাশের পূর্বে অনুমোদন, নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা, ধর্মবিরুদ্ধ বক্তব্যের অনুসন্ধান, মতাদর্শগত শুদ্ধতার দাবি, এসব তখন লেখকের দৈনন্দিন বাস্তবতা। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের স্পেনে লেখকেরা প্রায়ই বিপজ্জনক মতামতকে সরাসরি না বলে কৌতুক, বিদ্রূপ, বহুস্বরে কথা বলা, কাল্পনিক বর্ণনাকারী এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের আড়ালে প্রকাশ করতেন। ডন কিহোতে-কে এই “subversive tradition”-এর অংশ হিসেবেও পড়া হয়েছে।
সুতরাং উপন্যাসের হাসি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। হাসিটা কাকে নিয়ে? শুধু ডন কিহোতের পাগলামিকে? নাকি এমন এক সমাজকেও নিয়ে যেখানে প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং বাস্তব সত্যের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে?
ডন কিহোতে যা দেখেন তা বাস্তব নয়। হাওয়াকলকে দৈত্য দেখেন। সরাইখানাকে দুর্গ দেখেন। কিন্তু তাঁর চারপাশের তথাকথিত সুস্থ সমাজটি কি সবসময় বাস্তবকে ঠিক নামে ডাকে?
রাষ্ট্র বলে ধর্মান্তরিত নাগরিকও বিপজ্জনক। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বলে কোন বই মানুষ পড়তে পারবে।
সমাজ বলে জন্মের কারণে একদল মানুষ চিরকাল সন্দেহভাজন থাকবে। তারপর সবাই মিলে একজন মানুষকে পাগল বলে হাসছে, কারণ তিনি জিনিসকে ভুল নামে ডাকেন।
কী আশ্চর্য!
এই কারণেই ডন কিহোতে-র বই পোড়ানোর বিখ্যাত ঘটনাটিও নতুন অর্থ নেয়। ডন কিহোতের বন্ধুরা মনে করলেন তাঁর উন্মাদনার কারণ তাঁর বই। অতএব বই পরীক্ষা করা হবে, ভালো বই থাকবে, ক্ষতিকর বই পুড়িয়ে দেওয়া হবে। দৃশ্যটি কৌতুককর। কিন্তু সেই সময়ের স্পেনীয় পাঠকের কাছে বই পরীক্ষা করে কোনটি ধ্বংস হবে আর কোনটি বাঁচবে, এই বিষয়টি নিছক কল্পনা ছিল না। ইনকুইজিশনের বই-নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতার সঙ্গে এই দৃশ্যের সাদৃশ্য অস্বীকার করা কঠিন। কিছু সমালোচক তাই এখানে ধর্মীয় সেন্সরশিপের তীব্র ব্যঙ্গ দেখেছেন। অবশ্য এখানেই সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
সার্ভান্তেসের “আসল লক্ষ্য ক্যাথলিক চার্চ” ছিল, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলে দিলে আবার আমরা সেই একই ভুল করবো যার বিরুদ্ধে এতক্ষণ আপত্তি করছি। লেখকের অন্তর খুলে দেখে আসার উপায় আমাদের নেই। আধুনিক গবেষণাতেও এ বিষয়ে ঐকমত্য নেই। একদিকে সার্ভান্তেসের ব্যঙ্গ, সেন্সরশিপ-বিরোধী ইঙ্গিত এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা নিয়ে শক্তিশালী গবেষণা আছে। অন্যদিকে এমন গবেষকও আছেন যাঁরা তাঁর রচনাকে প্রাথমিক আধুনিক ক্যাথলিক আধ্যাত্মিকতার ভিতরেই দেখতে চান এবং মনে করেন তাঁর বিদ্রূপকে সরাসরি চার্চ-বিরোধিতা বলে পড়া অতিসরলীকরণ।
তাহলে?
আমাদের কাজ তাঁর গোপন ধর্মবিশ্বাসের সার্টিফিকেট লেখা নয়। আমরা বরং দেখি, তিনি কী লিখেছেন।
৪
তিনি এমন একটি স্পেন লিখেছেন যেখানে মানুষ নিজের দেশেই অপর হয়ে যেতে পারে। এটা সামান্য কথা নয়।
রিকোতে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ইউরোপ ঘুরছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা বারবার ফিরছে স্পেনে। তাঁর পরিবার ছিন্নভিন্ন। অর্থ মাটির নিচে। পরিচয় বিপজ্জনক। মাতৃভূমিতে ফিরতে হলে ছদ্মবেশ ধারণ করতে হচ্ছে। যে দেশের নাগরিক ছিলেন, সেই দেশেই এখন তাঁর উপস্থিতি অবৈধ।
এই অংশ পড়লে আজকের পাঠকের মনে প্যালেস্টাইনের কথা আসতে পারে।
আসাই স্বাভাবিক।
তবে ইতিহাসের দুটি ঘটনাকে এক করে ফেলা উচিত নয়। স্পেনের মরিস্কো বহিষ্কার এবং প্যালেস্টাইনের বাস্তুচ্যুতি ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর, ভিন্ন আইনগত ও সামরিক ইতিহাসের ঘটনা। তবু মানুষের অভিজ্ঞতার কিছু রেখা কখনো কখনো ভয়ঙ্করভাবে একে অন্যকে স্পর্শ করে। বাড়ি হারানো, ভূমি থেকে উৎখাত হওয়া, সম্পত্তি ফেলে যাওয়া, প্রজন্মের স্মৃতিতে বাড়ির অবস্থান ধরে রাখা, অন্য দেশে বাস করেও পুরনো বাড়িকেই নিজের বাড়ি ভাবা, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রের ভাষায় নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা, এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে এমন এক মানবিক সাদৃশ্য আছে যা পাঠকের মনে অন্য ইতিহাসকে জাগিয়ে তুলতেই পারে।
সাহিত্যের অদ্ভুত ক্ষমতা এখানেই। সার্ভান্তেস প্যালেস্টাইনের কথা ভাবেননি। তাঁর ভাবার প্রশ্নই নেই।
কিন্তু একজন আধুনিক পাঠক রিকোতের মুখে যখন শুনছেন নির্বাসনের পরেও সে নিজের পুরনো জীবন ভুলতে পারেনি, তখন তাঁর মনে বর্তমান পৃথিবীর অন্য বাস্তুচ্যুত মানুষের ছবি জেগে উঠতে পারে। সেই প্রতিক্রিয়া পাঠকের। লেখকের নয়।
এ পার্থক্যটুকু না রাখলে সাহিত্যপাঠ ইতিহাসের অপব্যবহারে পরিণত হয়। কিন্তু পার্থক্য রেখেও প্রশ্নটি থাকে।
মানুষের “বাড়ি” কে নির্ধারণ করে?
রাজা?
আইন?
ধর্ম?
সীমানা?
নাকি যে মানুষটি শত শত বছরের পারিবারিক জীবন, ভাষা, প্রতিবেশী, কবর, সম্পদ, স্মৃতি এবং শৈশব নিয়ে সেই মাটির সঙ্গে যুক্ত, তারও কিছু বলার আছে?
৫
সার্ভান্তেসের আর একটি কৌশল আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয়। তিনি সরাসরি কথা বলেন না। একটি চরিত্রকে দিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলান, আর সেই চরিত্রের জীবনকেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন।
রিকোতে বহিষ্কারকে একেবারে অন্যায় বলেন না।
কিন্তু তাঁকেই দেখুন।
তিনি কেন ফিরে এলেন?
যে দেশ তাঁকে বহিষ্কার করেছে, সেই দেশেই কেন তাঁর সম্পদ?
সেই দেশেই কেন তাঁর পরিচিত মানুষ?
সাঞ্চো কেন তাঁকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারছেন?
তাঁরা যদি চিরকাল বিদেশি হয়ে থাকেন, তাহলে এই পরিচিতির উৎস কোথায়?
যদি স্পেন তাঁদের দেশ না হয়, তবে রিকোতের “ফিরে আসা” কথাটির অর্থ কী?
মানুষ তো সেখানে ফিরে আসে যেখান থেকে সে গেছে।
এইখানেই রাষ্ট্রীয় ভাষার মধ্যে একটি ফাটল দেখা দেয়।
আরও আশ্চর্য, রিকোতে বলেন জার্মানিতে তিনি তুলনামূলকভাবে “libertad de conciencia”, বিবেকের স্বাধীনতা, পেয়েছিলেন। যে উপন্যাস এমন একটি বাক্য লিখছে, যে দেশের লেখক ধর্মীয় সেন্সরশিপের পরিবেশে বসে লিখছেন, সেই বাক্যকে নিছক ভ্রমণবৃত্তান্ত বলে পাশ কাটানো একটু কঠিন।
কিন্তু সার্ভান্তেস এখানেও নিজের মাথাটি নিরাপদে রাখলেন। তিনি কোথাও দাঁড়িয়ে বললেন না, “স্পেন অসহিষ্ণু রাষ্ট্র।” বললেন একজন নির্বাসিত মরিস্কোর মুখ দিয়ে। সুবিধেটা এখানেই। লেখক চাইলে বলতে পারেন, এ তো আমার কথা নয়, রিকোতের কথা।
আর পাঠক?
পাঠক বুঝে নেবেন যতটুকু বোঝার।
৬
এই কারণেই ডন কিহোতে-র হাস্যরসের নেপথ্যে এক গভীর সুর বেজে ওঠে। উপন্যাসটি যে কেবল পুরনো বীরত্বগাথার অসারতা ও মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনাকে বিদ্রূপ করে তা নয়, সাহিত্য কীভাবে মানুষের বাস্তবতার বোধকে বদলে দিতে পারে তাও উন্মোচন করে। তবে এর মূল অভিঘাত অন্য জায়গায়—এটি ক্রমাগত প্রশ্ন তোলে: কে বাস্তবকে সংজ্ঞায়িত করছে, কার বয়ানে গল্পটি রচিত হচ্ছে, আর সত্যের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনই বা আসছে কার কাছ থেকে?
এমনকি উপন্যাসটির কথকতাও সোজা নয়।
সার্ভান্তেস নিজেকে কখনো মূল ইতিহাসের লেখক হিসেবেও হাজির করেন না। তিনি যেন আরবি ভাষায় লিখিত সিদে হামেতে বেনেঙ্গেলি নামের এক মুসলমান ইতিহাসবিদের রচনা অনুবাদ করিয়ে আমাদের পড়াচ্ছেন। এক খ্রিস্টীয় স্পেনের জাতীয় কাহিনীর মধ্যে বসে একজন কাল্পনিক মুসলমান ইতিহাসবিদকে সত্যের উৎস বানিয়ে দেওয়া নিছক সাহিত্যিক কৌতুক মাত্র কি? হতে পারে।
কিন্তু কেন একজন মুসলমান? জানতে ইচ্ছে হয়।
যে সমাজে মুসলমান বংশোদ্ভূত মানুষদের উপস্থিতিই সন্দেহজনক, সেই সমাজের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক চরিত্রের “ইতিহাস” লিখছেন একজন মুসলমান লেখক, আর খ্রিস্টান সার্ভান্তেস যেন তাঁর সম্পাদক ও পরিবেশক। মজা আছে। কিন্তু মজাটা নিরীহ নয়।
এই বহুস্তরীয় বর্ণনার মধ্যেই সার্ভান্তেস নিজেকে নিরাপদ রাখেন। কোনো বক্তব্যই সহজে তাঁর গলায় বাঁধা যায় না। ডন কিহোতে এক কথা বলেন, সাঞ্চো আর এক কথা, বর্ণনাকারী তৃতীয় কথা, তথাকথিত আরবি ইতিহাসবিদ চতুর্থ কথা। সত্যটি কোথায়?
পাঠকের উপর দায়িত্ব পড়লো।
ঠিক এখানেই সেন্সরশিপের যুগে সাহিত্য তার একটি বিশেষ ভাষা তৈরি করে। সে সরাসরি দরজা না ভেঙ্গে , দেয়ালের মধ্যে এতগুলো দরজা আঁকে যে কোনটি সত্যিকার দরজা আর কোনটি ছবি, প্রহরী নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়।
৭
একই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যাথলিক চার্চের ভূমিকা মূল্যায়ন করা যুক্তিযুক্ত। উপন্যাসটিতে ক্যাথলিক পরিভাষা, খ্রিস্টান নৈতিক আদর্শ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মযাজকদের সুস্পষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়। সার্ভান্তেসের নিজের জীবনও ক্যাথলিক স্পেনের সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; লেপান্তোর যুদ্ধে তিনি খ্রিস্টান ‘হোলি লিগ’-এর অংশ হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে তৎকালীন ঐতিহাসিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে তাঁকে আধুনিককালের ধর্মবিরোধী স্বাধীনচেতা মুক্তমনা হিসেবে চিত্রিত করা সঙ্গত নয় ।
কিন্তু তাই বলে চার্চ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ধর্মীয় ভণ্ডামি বা ইনকুইজিশনের সংস্কৃতিকে তিনি বিদ্রূপ করেননি, এমন সিদ্ধান্তও নিরাপদ নয়। বই পোড়ানোর দৃশ্য থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতীক ও কর্তৃত্বের নানা ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে সমালোচকেরা এই প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি জপমালার কিছু ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পর্তুগিজ ইনকুইজিশনের আপত্তির ইতিহাস আছে।
তাহলে ছবিটা কী দাঁড়ায়? সার্ভান্তেস সম্ভবত কোনো এক লাইনের চিন্তক নন। ঠিক মানুষ যেমন এক লাইনের হয় না। তিনি একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী স্পেনের সন্তান, যুদ্ধবীর, ক্যাথলিক সমাজের মানুষ, রাষ্ট্রের কর্মচারী, কারাবন্দি, আলজিয়ার্সে মুসলমান শাসকদের হাতে পাঁচ বছর বন্দিজীবন কাটানো একজন প্রাক্তন দাস, এবং একজন ঔপন্যাসিক যিনি ক্ষমতার ভাষার আড়ালে মানুষকে দেখতে জানতেন।
এই সব অভিজ্ঞতা এক ব্যক্তির মধ্যে একসঙ্গে ছিল। সেজন্য তাঁর উপন্যাসেও বিরোধ থাকবে। থাকাই স্বাভাবিক।
৮
আমার কাছে রিকোতের কাহিনীটির সবচেয়ে বড় কথা তাঁর লুকোনো স্বর্ণ নয়। তাঁর লুকোনো দেশ।
মানুষটি জার্মানিতে বাড়ি নিয়েছেন, কিন্তু স্পেনকে ছাড়তে পারেননি। তাঁর পরিবার আলজিয়ার্সে, তিনি স্পেনে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। রাষ্ট্র তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করেছে “মরিস্কো” বলে। অথচ সাঞ্চোর কাছে তিনি প্রথমে কী?
প্রতিবেশী।
এই ছোট শব্দটিই রাষ্ট্রের বিশাল শ্রেণিবিভাগকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক সম্পর্ক হয় না। দৈনন্দিন সম্পর্ক হয়। দেখা হয়। কথা হয়। লেনদেন হয়। ঝগড়া হয়। বন্ধুত্ব হয়। তার মেয়ে কত সুন্দর, গ্রামের মানুষ জানে। সে কোথায় থাকে, মানুষ জানে। কে কার আত্মীয়, জানা আছে। একদিন একটি ফরমান এলো। লোকটি বিদেশি হয়ে গেল। এটা কি এত সহজ? আইনে হয়তো সহজ। মানুষের স্মৃতিতে নয়।
এইখানেই ডন কিহোতে চারশো বছরের দূরত্ব অতিক্রম করে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। যে উপন্যাসকে আমরা একজন হাস্যকর বীরপুরুষের ব্যর্থ অভিযানের গল্প বলে পড়ি, তার ভেতরে গৃহচ্যুতি, ধর্মীয় পরিচয়, সেন্সরশিপ, রাষ্ট্রীয় শক্তি, জাতিগত সন্দেহ, বিবেকের স্বাধীনতা এবং ইতিহাস কে লিখবে সেই প্রশ্নগুলো নীরবে চলতে থাকে।
তাই প্রথম পাঠে আমরা হাওয়াকল দেখি। দ্বিতীয় পাঠে হয়তো স্পেনকে দেখি। আর একটু গভীরে গেলে দেখি একটি রাষ্ট্রকে, যে মানুষকে বলছে তুমি এখানকার নও, এবং একজন মানুষকে, যে সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে সেই দেশেই ফিরে এসেছে নিজের মাটির নিচে পোঁতা সম্পদ উদ্ধার করতে।
কেন? অর্থের জন্য নিশ্চয়ই। কিন্তু শুধু অর্থ? যদি শুধু অর্থই হতো, তবে তাঁর কথার মধ্যে দেশ হারানোর সেই বিষণ্ণতা আসে কোথা থেকে? সার্ভান্তেস উত্তর দেননি। উত্তর না দেওয়াটাই হয়তো তাঁর উত্তর।
কারণ একবার রিকোতেকে মানুষ হিশেবে দেখে ফেললে প্রশ্নটা রাষ্ট্র এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে হয়ে যায়। কোনো রাজা, কোনো চার্চ, কোনো ফরমান, কোনো সীমান্তরক্ষী কি সত্যিই মানুষের অতীত মুছে দিতে পারে?
ঘর কেড়ে নেওয়া যায়। ঘরের স্মৃতি? সেটা কোন আইনে বাজেয়াপ্ত করা যায়?
- রিটন খান
Pdf: ডন কুইকসোট [eboi.org].pdf
I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.



