ফাঁসির মঞ্চ থেকে দস্তয়েভস্কি
দস্তয়েভস্কির ভাগ্যকে এত সহজে অভিনন্দন জানাবেন না। ওই ভাগ্য লোকটা খুব বদমাশ ছিল। সে সাধারণত একটা বিপদ সরিয়ে তার জায়গায় দুটো বসিয়ে দিত।
একটা লোকের কথা বলি।
লোকটির বয়স আটাশ। নাম ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি। ডিসেম্বর মাস। সেন্ট পিটার্সবার্গে শীত এমন যে আমাদের ঢাকার মাঘ মাসকে সেখানে নিয়ে গেলে মাঘ নিজেই কম্বল চেয়ে বসবে।
লোকটাকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে জেল থেকে বের করে একটা খোলা জায়গায় আনা হয়েছে। জায়গাটার নাম সেমিওনভস্কি স্কোয়ার। সামনে সৈন্য। হাতে বন্দুক। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পড়ে শোনানো হয়েছে। কয়েদিদের গায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পোশাক পরানো হয়েছে। প্রথম তিনজনকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধেও ফেলা হয়েছে।
দস্তয়েভস্কি দ্বিতীয় দলের লোক।
অর্থাৎ সামনের তিনজন মরবে। তারপর তাঁর পালা।
এখন মানুষের মাথায় এমন মুহূর্তে কী চলে, আমি জানি না। বাজারের ব্যাগ হারালেও আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আর এই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, মিনিট কয়েক পরে তাঁকে গুলি করে মারা হবে। তিনি পরে তাঁর ভাইকে লিখেছিলেন, শেষ মুহূর্তে জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড কী অমূল্য বলে মনে হয়েছিল। আর বহু বছর পরে The Idiot-এ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের মনের ভিতরের সেই ভয়াবহ সময়টাকে তিনি আবার ফিরিয়ে আনবেন।
প্রথম দল তৈরি।
বন্দুক তৈরি।
তারপর…
একজন দূত এল।
জারের ক্ষমা।
মৃত্যুদণ্ড বদলে গেছে।
ফাঁসি, মানে গুলি, হবে না।
সাইবেরিয়া যেতে হবে।
এখানে শুনে আমাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যাক বাবা, বেঁচে গেল!
দস্তয়েভস্কির ভাগ্যকে এত সহজে অভিনন্দন জানাবেন না। ওই ভাগ্য লোকটা খুব বদমাশ ছিল। সে সাধারণত একটা বিপদ সরিয়ে তার জায়গায় দুটো বসিয়ে দিত।
পরে জানা যায়, ক্ষমা হঠাৎ আসেনি। পুরো ব্যাপারটাই সাজানো ছিল। জার নিকোলাস প্রথম আগেই মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু কয়েদিদের তা জানানো হয়নি। তাঁদের মৃত্যুর একেবারে কিনারায় দাঁড় করিয়ে তারপর জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক বন্দিদের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য এর চেয়ে কার্যকর নাট্যপরিচালনা আর কী হতে পারে! রাশিয়ার সরকার সেদিন একটা নাটক করেছিল, শুধু দর্শকদের কেউ জানত না তারা নাটকের অভিনেতা।
দস্তয়েভস্কির জীবন বুঝতে হলে এই দৃশ্যটা মনে রাখতে হবে।
কারণ ওই আটাশ বছরের লোকটি আর কখনও পুরোপুরি সেমিওনভস্কি স্কোয়ার থেকে বের হতে পারেননি।
শরীর বের হয়েছিল।
মাথার ভিতরে জায়গাটা থেকে গিয়েছিল।
মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো, অপরাধ, শাস্তি, ক্ষমা, ঈশ্বর, মানুষের নিষ্ঠুরতা, মানুষ কত নিচে নামতে পারে, আবার সেই একই মানুষ কী আশ্চর্যভাবে অন্য মানুষকে ভালোবাসতে পারে, এই প্রশ্নগুলো পরে তাঁর বইয়ে বারবার ফিরে এসেছে। রাসকলনিকভ কুড়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, ইভান কারামাজভ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মামলা করছে, প্রিন্স মিশকিন মানুষের প্রতি প্রায় অসহ্য রকমের করুণা নিয়ে ঘুরছে। পেছনে কোথাও ওই বরফের মাঠটা পড়ে আছে।
কিন্তু আমরা একটু পেছনে যাই।
স্মৃতি তো সোজা রাস্তা ধরে চলে না। আমিও একবার বাবার গল্প বলতে গিয়ে শেষ করেছিলাম পাড়ার নাপিতের কাছে। দস্তয়েভস্কির জীবনও সেরকম। একটা মৃত্যু ধরলে আরেকটা মৃত্যু এসে হাত ধরে।
১৮২১ সালে মস্কোয় তাঁর জন্ম। বাবা মিখাইল দস্তয়েভস্কি ছিলেন চিকিৎসক। তিনি মস্কোর গরীবদের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ছোট ফিওদর যে পরিবেশে বড় হচ্ছেন, সেখানে অসুখ, দারিদ্র্য, ব্যথা, মৃত্যু জানালার বাইরে এগুলো নিয়মিত দৃশ্য।
আমরা অনেকেই মানুষের দুঃখ বই পড়ে আবিষ্কার করি। দস্তয়েভস্কির বই পড়ার আগেই রোগী দেখা হয়ে গিয়েছিল।
বাবা কঠোর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। মা মারিয়া ছিলেন কোমল, ধর্মপ্রাণ, সন্তানদের পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষায় আগ্রহী। ছোটবেলা থেকেই দস্তয়েভস্কি বাইবেলের গল্প, পুশকিন, পরে গোগোল, শিলার, হুগো, বালজাক, হফমান পড়তে শুরু করেন। অর্থাৎ একদিকে হাসপাতালের উঠোনে মানুষের কষ্ট, অন্যদিকে বইয়ের ভিতরে মানুষের কল্পনা।
এই দুটোকে একসঙ্গে একটা ছেলের মাথায় ঢুকিয়ে দিলে পরে সে Crime and Punishment লিখবে, এর নিশ্চয়তা নেই।
তবে সম্ভাবনা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না।
তাঁর শৈশব নিয়ে একটা ভয়াবহ গল্প বহু চালু আছে। একটি ছোট মেয়ের ওপর যৌন নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা নাকি কিশোর দস্তয়েভস্কিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। দস্তয়েভস্কির জীবনী ঘাঁটলে এ ধরনের ঘটনার বিভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যায়, কিন্তু এটাকে তাঁর নয় বছর বয়সের নিশ্চিত ব্যক্তিগত বন্ধুর ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দুর্বল। তাই জীবনটাকে আরও নাটকীয় করার লোভে এটাকে নিশ্চিত ঘটনা বানিয়ে বলা ঠিক হবে না।
দস্তয়েভস্কির জীবনে যাচাই করা দুঃখের এমনিতেই অভাব নেই। আলাদা করে ধার করার দরকার পড়ে না।
১৮৩৭ সালে তাঁর মা যক্ষ্মায় মারা গেলেন। ফিওদরের বয়স তখন পনেরো। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে সেন্ট পিটার্সবার্গের Military Engineering School-এ পাঠানো হল। ছেলের মন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নেই। বাবা চান একটা স্থির পেশা হোক। ছেলে চায় সাহিত্য।
এই সমস্যাটা আজও আছে।
বাবা বলছেন, “কম্পিউটার সায়েন্স পড়।”
ছেলে বলছে, “আমি কবিতা লিখব।”
শুধু তখন সফটওয়্যার কোম্পানি ছিল না বলে ছেলেকে মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার বানানো হচ্ছিল।
১৮৩৯ সালে বাবার মৃত্যু।
এখানে আবার একটা বিখ্যাত কাহিনি আছে। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়েছে, তাঁর বাবার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জমিদারির কৃষকেরা তাঁকে হত্যা করেছিল। ফ্রয়েড পর্যন্ত এই কথিত পিতৃহত্যাকে ধরে দস্তয়েভস্কির মানসিক জীবন এবং মৃগীরোগের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন।
সমস্যা হল, ইতিহাস এত ভদ্র নয় যে ফ্রয়েডের তত্ত্বের সুবিধার জন্য ঠিকমতো খুন ঘটিয়ে রাখবে।
আধুনিক গবেষণায় বাবার মৃত্যুর ঘটনাটি বিতর্কিত। সরকারি রেকর্ডে স্ট্রোকের কথা ছিল, হত্যার গল্পটি পরে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনেই দস্তয়েভস্কির প্রথম epileptic seizure হয়েছিল, এই জনপ্রিয় গল্পটিও নিশ্চিত নয়। তাঁর মৃগীরোগ বাস্তব, পরবর্তী জীবনে গুরুতর খিঁচুনি হয়েছে, কিন্তু রোগের শুরু ও বাবার মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এখানে যে জিনিসটা আমার খুব ভালো লাগে সেটা হলো; একজন লেখকের জীবনও শেষ পর্যন্ত তাঁর উপন্যাসের মতো। সাক্ষী আছে, গুজব আছে, স্মৃতি আছে, ডাক্তারি নথি আছে, আত্মীয়ের কথা আছে, আর মাঝখানে সত্য বসে আছে মুখ গোমড়া করে।
ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল শেষ করে দস্তয়েভস্কি সামান্য সময় সরকারি চাকরি করলেন। তারপর ১৮৪৪ সালে চাকরি ছেড়ে দিলেন।
কারণ সাহিত্য।
এখনকার ভাষায় বললে, stable career ছেড়ে full-time writer।
পরিবারের কেউ নিশ্চয়ই থাকলে বলতেন, “মাথাটা একেবারে গেছে।”
মাথা গিয়েছিল কি না জানি না, তবে সিদ্ধান্তটা বিশ্বসাহিত্যের বেশ কাজে লেগেছে।
প্রথম উপন্যাস Poor Folk বা Poor People। ১৮৪৬ সালে প্রকাশিত। দরিদ্র মানুষের জীবন, অপমান, সামাজিক অসমতা, ছোট মানুষের আত্মসম্মান। পাণ্ডুলিপি পড়েই সাহিত্যিক নেক্রাসভ উত্তেজিত হয়ে সমালোচক ভিসারিয়ন বেলিনস্কির কাছে নিয়ে যান। বই বেরোতেই তরুণ লেখক আলোচনায় উঠে এলেন।
দস্তয়েভস্কি ভাবলেন, এই তো!
জীবন এবার আমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার শুরু করেছে।
জীবন বলল, “এক মিনিট।”
পরের উপন্যাস The Double তেমন সাড়া পেল না। সমালোচকেরা আগের মতো মাথায় তুলে রাখলেন না। তাঁর সামাজিক ব্যবহারও খুব সহজ ছিল না। আত্মমর্যাদা প্রবল, আবেগ বেশি, সন্দেহপ্রবণতা আছে, খ্যাতি পাওয়ার পর একটু নিজের গুরুত্বও বেশি অনুভব করছেন। সাহিত্যিক মহলে যে লোকটাকে একদিন প্রায় প্রতিভা বলে স্বাগত জানানো হয়েছিল, অল্পদিনের মধ্যেই সেই লোককে নিয়ে হাসাহাসিও শুরু হল।
আমাদের সাহিত্যজগতে এরকম হলে আমরা বলি, “গ্রুপিং।”
রাশিয়াতেও গ্রুপিং ছিল। শুধু সেখানে শীত বেশি।
এই সময় দস্তয়েভস্কি মিখাইল পেত্রাশেভস্কির একটি আলোচনাচক্রে যেতে শুরু করলেন। সেখানে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক চিন্তা, রাশিয়ার serfdom, সেন্সরশিপ, সামাজিক সংস্কার, নিষিদ্ধ বই ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতেন।
মানে বইয়ের আড্ডা।
তবে জারের রাশিয়ায় ভুল বই নিয়ে আড্ডা দিলে চা-বিস্কুটের পরে পুলিশও যোগ দিত।
১৮৪৯ সালের এপ্রিলে দস্তয়েভস্কি গ্রেপ্তার হলেন। Peter and Paul Fortress-এ আট মাস বন্দি। অভিযোগ রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড।
তারপর সেই বরফের মাঠ।
সেই সৈন্য।
সেই শেষ মুহূর্তের ক্ষমা।
এরপর তাঁর পায়ে ভারী লোহার শিকল পরানো হল। খোলা স্লেজে করে শুরু হল সাইবেরিয়ার পথে যাত্রা। গন্তব্য ওমস্কের কারাগার।
চার বছর hard labour।
এই চার বছরকে “কারাগারে ছিলেন” বললে ব্যাপারটার প্রতি অন্যায় হয়।
লোক ঠাসা ব্যারাক। গোপনীয়তা নেই। পোকামাকড়। দুর্গন্ধ। শীতে ভয়ানক ঠান্ডা। গরমে অসহ্য আবদ্ধতা। শিকল পরা জীবন। সাধারণ অপরাধী, খুনি, চোর, সহিংস মানুষদের সঙ্গে একই ঘরে থাকা। বই পড়ার স্বাধীনতাও প্রায় নেই। তাঁর কাছে যে বইটি থাকার অনুমতি ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল New Testament। পরে এই অভিজ্ঞতা Notes from the House of the Dead-এর ভিতরে ঢুকে যায়।
দস্তয়েভস্কির আগে “মানুষ” বলতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত লেখক যে মানুষকে বুঝেছিলেন, ওমস্কে গিয়ে সেই সংজ্ঞা ভেঙে গেল।
তিনি দেখলেন, একজন ভয়ংকর অপরাধীর মধ্যেও কোমলতা থাকতে পারে।
আবার সভ্য, শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা থাকতে পারে।
মানুষকে একটা বিশেষণ দিয়ে শেষ করা যায় না।
ভালো।
খারাপ।
পাপী।
সাধু।
বুদ্ধিমান।
মূর্খ।
দস্তয়েভস্কির পরবর্তী উপন্যাসে মানুষ তাই বারবার নিজের বিপরীত কাজ করে। ভালোবাসে, তারপর আঘাত করে। ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে চায়, আবার ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অপরাধ করে, তারপর নিজের শাস্তির জন্য ছটফট করে।
কারাগারে তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তায়ও বড় পরিবর্তন ঘটে। তরুণ বয়সের ইউটোপিয়ান সমাজতান্ত্রিক আকর্ষণ থেকে তিনি ক্রমশ রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত নৈতিক দায়িত্ব এবং suffering-এর ধর্মীয় তাৎপর্যের দিকে সরে যান। পরবর্তী দস্তয়েভস্কিকে বুঝতে এই পরিবর্তন খুব জরুরি।
চার বছর শেষে ১৮৫৪ সালে কারাগার থেকে বের হলেন।
এইবার বাড়ি?
না।
রাশিয়া বলল, “আমাদের এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাচ্ছেন?”
তাঁকে সাইবেরিয়ার সেমিপালাতিনস্ক অঞ্চলে সাধারণ সৈনিক হিসেবে বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরিতে পাঠানো হল। পরবর্তী কয়েক বছরে ধীরে ধীরে তাঁর নাগরিক অধিকার ফিরল, অফিসার পদও পেলেন, লেখার অনুমতিও এল। ১৮৫৯ সালে শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল।
এই সাইবেরিয়ান সময়েই জীবনে এলেন মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ইসায়েভা।
মারিয়া তখন বিবাহিতা। পরে তাঁর স্বামী মারা গেলে দস্তয়েভস্কি তাঁকে বিয়ে করেন ১৮৫৭ সালে।
এখন কেউ যদি মনে করেন চার বছরের কারাগার, নির্বাসন, epilepsy, দারিদ্র্য, মৃত্যুদণ্ডের অভিনয় সব পার হওয়ার পরে ভদ্রলোক এবার সুখে সংসার করবেন, তাঁদের রুশ সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা কম।
বিয়েটা সুখের হয়নি।
দুইজনেরই অসুস্থতা, অর্থকষ্ট, আবেগ, সন্দেহ, অস্থিরতা। সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগল। মারিয়া শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৮৬৪ সালে মারা যান। একই বছর দস্তয়েভস্কির খুব প্রিয় বড় ভাই মিখাইলও মারা গেলেন।
এক বছরে স্ত্রী গেলেন।
ভাই গেলেন।
ভাইয়ের ব্যবসায়িক দেনার বড় অংশও তাঁর ঘাড়ে এল।
এই পর্যায়ে সাধারণ মানুষ হিসাবের খাতা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে।
দস্তয়েভস্কি উপন্যাস লিখতে বসলেন।
তার মধ্যে আবার প্রেমও করলেন।
এখানে আসছেন আপোলিনারিয়া, সংক্ষেপে পোলিনা সুসলোভা।
বয়সে অনেক ছোট, বুদ্ধিমতী, স্বাধীনচেতা, প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণী। দস্তয়েভস্কি তখন চল্লিশের কাছাকাছি। সম্পর্কটা ছিল প্রচণ্ড, অস্থির, ঈর্ষাপূর্ণ এবং যন্ত্রণাদায়ক। দুজনের সম্পর্কের টানাপোড়েন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সাহিত্যে ছাপ ফেলেছিল। The Gambler-এর পোলিনা চরিত্রের সঙ্গে সুসলোভার সম্পর্ক জীবনীকারেরা বহুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছেন।
দস্তয়েভস্কির প্রেমের ব্যাপারে একটা সমস্যা ছিল।
ভদ্রলোক শান্ত মানুষ দেখে প্রেমে পড়তেন না।
জীবনে শান্তি কম ছিল, প্রেমেও সেই একই ব্যবস্থা রাখতে পছন্দ করতেন বোধহয়।
এর মধ্যে আরও একটা নেশা তাঁর জীবন প্রায় ধ্বংস করে দিল।
জুয়া।
বিশেষ করে roulette।
ইউরোপে গিয়ে roulette table-এ বসে টাকা হারাতেন। তারপর আরও টাকা জিতবেন বলে আবার খেলতেন। তারপর হারানো টাকা উদ্ধার করতে আবার খেলতেন। শেষে বন্ধুকে চিঠি, প্রকাশককে চিঠি, পরিচিতকে চিঠি।
“কিছু টাকা পাঠাও।”
মানুষ roulette table-এর সামনে বসলে গণিতের সঙ্গে তার সম্পর্ক অদ্ভুত হয়ে যায়।
সে জানে probability তার বিরুদ্ধে।
তারপরও ভাবে, “এইবার লাল পড়বেই।”
দস্তয়েভস্কি মানবমনের irrationality নিয়ে এত ভালো লিখেছেন, কারণ সম্ভবত নিজের ভিতরেও একটা গবেষণাগার সারাক্ষণ খোলা ছিল।
১৮৬৬ সালে অবস্থা চরমে উঠল।
এক প্রকাশক স্টেলোভস্কির সঙ্গে এমন একটা চুক্তি করেছেন যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন উপন্যাস দিতে না পারলে ভয়াবহ আর্থিক ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত ক্ষতি হবে। একই সময় তিনি Crime and Punishment লিখছেন।
ডেডলাইন সামনে।
টাকা নেই।
শরীর খারাপ।
epileptic seizure আছে।
ঋণদাতা আছে।
জুয়া আছে।
স্বাভাবিক লেখক বলবে, “আমি একটু বিরতি নিই।”
দস্তয়েভস্কি বললেন, stenographer লাগবে।
সেখানে এলেন আন্না গ্রিগোরিয়েভনা স্নিতকিনা।
বয়স কুড়ি।
দস্তয়েভস্কি চুয়াল্লিশ।
এখানে আবার একটু থামতে হয়।
ভদ্রলোকের বয়সের ব্যবধান নিয়ে আধুনিক পাঠকের ভুরু ওপরে উঠতেই পারে। উঠুক। ইতিহাসের লোকজনকে তাদের সময়ের মধ্যে বুঝতে হবে, আবার আমাদের সময়ের প্রশ্নও করা যাবে। দুটো একসঙ্গে করা অসম্ভব নয়।
আন্নার কাজ ছিল তাঁর মুখে বলা লেখা shorthand-এ নেওয়া। অল্প কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ পরিশ্রমে The Gambler শেষ হল। ডেডলাইন রক্ষা পেল।
কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার সময় দস্তয়েভস্কি বুঝলেন stenographer-কে বিদায় দিতে তাঁর মন চাইছে না।
সোজা প্রস্তাব দিতে সাহস পাচ্ছেন না।
লেখক মানুষ।
বাস্তবে যে কথা বলা যায় না, গল্প বানিয়ে বলা যায়।
তিনি আন্নাকে একটা কাল্পনিক গল্প বললেন। ধরুন, একজন বয়স্ক লেখক আছে। জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছে। সে একজন তরুণীকে ভালোবাসে। মেয়েটি কি এমন লোককে বিয়ে করতে পারে?
আন্না মোটামুটি বুঝে গেছেন লেখকটি কে।
বললেন, পারে।
দস্তয়েভস্কি হয়তো মনে মনে বললেন, আহা, সাহিত্য কখনও কখনও বেশ কাজের জিনিস।
১৮৬৭ সালে তাঁরা বিয়ে করলেন।
আন্না তাঁর জীবনে এমন এক ভূমিকা নিলেন, যা শুধু “স্ত্রী” শব্দে ধরলে কম বলা হয়।
তিনি stenographer।
হিসাবরক্ষক।
প্রকাশনার কাজের সংগঠক।
ঋণদাতাদের সামলান।
স্বামীর manuscript দেখেন।
জুয়ার ক্ষতি সামলান।
epileptic seizure-এর সময়ে পাশে থাকেন।
পরিবার পরিচালনা করেন।
পরবর্তী সময়ে দস্তয়েভস্কির বই সরাসরি প্রকাশ ও বিক্রির ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, দস্তয়েভস্কির মাথার ভিতরের ঝড় দেখে পালাননি।
তবে এই সংসারও কোনও মিষ্টি রুশ postcard ছিল না। তাঁদের প্রথম সন্তান সোফিয়া অল্প বয়সে মারা যায়। পরে আরও তিনটি সন্তান হয়। তাদের একজন, আলেক্সেই, ছোটবেলায় মারা যায়। দস্তয়েভস্কি আবার সন্তানের মৃত্যু দেখলেন।
এই মানুষটার জীবন পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাগ্য বুঝি খাতা নিয়ে বসে আছে।
“মৃত্যু দেখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“কারাগার?”
“হ্যাঁ।”
“দারিদ্র্য?”
“হ্যাঁ।”
“জুয়া?”
“হ্যাঁ।”
“প্রেমে বিপদ?”
“হ্যাঁ।”
“সন্তানের মৃত্যু?”
“সেটাও।”
“আচ্ছা, এবার একটা উপন্যাস লেখো।”
আর দস্তয়েভস্কি লিখছেন।
Notes from Underground।
Crime and Punishment।
The Idiot।
Demons।
The Gambler।
তারপর শেষ জীবনে The Brothers Karamazov।
দস্তয়েভস্কিকে শুধু “ডিপ্রেসিং লেখক” বললে তাঁর সঙ্গে অন্যায় হয়।
হ্যাঁ, তাঁর বইয়ে খুন আছে।
আত্মহত্যা আছে।
অপমান আছে।
দারিদ্র্য আছে।
পাগলামি আছে।
মদ আছে।
ঈর্ষা আছে।
বাচ্চাদের কষ্ট আছে।
মানুষ ঈশ্বরকে আদালতে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করছে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এত অন্ধকারের ভিতরেও দস্তয়েভস্কি মানুষকে পুরোপুরি বাতিল করতে পারেন না।
এই জায়গাটাই আমার কাছে তাঁর বড় রহস্য।
মানুষকে তিনি ভালো করে চিনতেন বলে মানুষের ওপর তাঁর রাগ ছিল।
আবার মানুষকে ভালো করে চিনতেন বলেই মানুষের জন্য তাঁর মায়াও ছিল।
রাসকলনিকভ খুনি।
তবু তার গল্প শেষ হয় সম্ভাব্য পুনর্জন্মের দিকে।
মিশকিন প্রায় অকার্যকর রকমের ভালো মানুষ।
ইভান ঈশ্বরের বিচার মেনে নিতে পারে না।
আলিওশা বিশ্বাস ধরে রাখতে চায়।
দিমিত্রি কামনা, রাগ, অপরাধবোধে ছিন্নভিন্ন।
একই পরিবারের চারদিকে মানুষ ঈশ্বর, স্বাধীনতা, পাপ আর ভালোবাসা নিয়ে কুস্তি করছে।
The Brothers Karamazov যেন তাঁর সারা জীবনের সমস্ত প্রশ্নের শেষ বড় বৈঠক।
বাবা ও ছেলে।
বিশ্বাস ও অবিশ্বাস।
স্বাধীনতা ও দায়িত্ব।
কামনা ও আত্মসংযম।
অপরাধ ও অপরাধবোধ।
শিশুর যন্ত্রণা।
মানুষের স্বাধীনতা যদি মানুষকে ভয়াবহ কাজ করার অধিকারও দেয়, তবে সেই স্বাধীনতার মূল্য কত?
ঈশ্বর থাকলে নিরপরাধ শিশুর কষ্ট কেন?
ঈশ্বর না থাকলে নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়?
মানুষ কি নিজের বিচারক হতে পারে?
ভালোবাসা কি কোনও বাস্তব শক্তি, নাকি কেবল আবেগ?
দস্তয়েভস্কি উত্তর দিতে বসে প্রশ্নগুলোকে আরও বিপজ্জনক করে দিলেন।
এটাই তাঁর কায়দা।
আপনি তাঁর কাছে উত্তর চাইতে যাবেন।
ফিরে আসবেন আরও পাঁচটা প্রশ্ন নিয়ে।
১৮৮০ সালে The Brothers Karamazov প্রকাশ সম্পন্ন হল। একই বছর পুশকিনকে নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা তাঁকে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। একসময় যে তরুণ লেখক সাহিত্যিক মহলে উপহাসের মুখে পড়েছিলেন, যে লোকটির গায়ে কয়েদির শিকল ছিল, সে এখন জাতীয় লেখক।
তারপর ১৮৮১।
বয়স ঊনষাট।
শরীর বহুদিন ধরেই ভালো নয়। epilepsy আছে, ফুসফুসের সমস্যাও রয়েছে।
জানুয়ারির শেষদিকে তাঁর pulmonary hemorrhage শুরু হয়। পুরনো রুশ ক্যালেন্ডার আর আধুনিক Gregorian ক্যালেন্ডারের পার্থক্যের কারণে মৃত্যুর তারিখ দুইভাবে লেখা হয়। বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৮১ তিনি মারা যান।
সেমিওনভস্কি স্কোয়ারে যে মৃত্যু বন্দুক নিয়ে এসেছিল, সে মৃত্যু সেদিন তাঁকে নিতে পারেনি।
ওমস্কের কারাগার পারেনি।
epileptic seizure পারেনি।
দারিদ্র্য পারেনি।
roulette পারেনি।
ঋণদাতা পারেনি।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যু এল ঘরের মধ্যে।
আন্না পাশে।
পরিবার পাশে।
তারপর চলে গেলেন।
কিন্তু গল্পটা এখানেও শেষ হল না।
তাঁর funeral procession-এ প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে সমকালীন বিবরণে পাওয়া যায়। ছাত্র, লেখক, সাধারণ মানুষ, ধর্মযাজক, বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির লোক। পিটার্সবার্গের রাস্তায় মানুষের দীর্ঘ মিছিল। যে মানুষটাকে একসময় রাষ্ট্র অপরাধী হিসেবে গুলি করে মারার অভিনয় করেছিল, সেই রাষ্ট্রের রাজধানীর রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ তাঁর জন্য হাঁটছে।
এই দৃশ্যটা আমার খুব পছন্দ।
কারণ সেমিওনভস্কি স্কোয়ারে রাষ্ট্র তাঁকে বলেছিল,
তোমার জীবন শেষ।
বত্রিশ বছর পরে মানুষের মিছিল বলল,
তা ঠিক হয়নি।
দস্তয়েভস্কির জীবন থেকে খুব সহজ কোনও motivational lesson বের করতে আমার ভয় হয়। লোকটার কষ্টকে “Never give up” লেখা coffee mug বানিয়ে ফেললে তাঁকে ছোট করা হবে।
তিনি নিজেও সবসময় মহৎ ছিলেন না।
তিনি জুয়াড়ি ছিলেন।
ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন।
রাজনৈতিক মতামতের অনেক দিক আজকের পাঠকের কাছে অস্বস্তিকর।
প্রবল রুশ জাতীয়তাবাদ তাঁর শেষ জীবনের চিন্তায় ঢুকে পড়েছিল।
তাঁর ব্যক্তিত্বে বিরোধ ছিল।
তাঁর চিন্তাতেও ছিল।
বরং এই বিরোধগুলোই দস্তয়েভস্কিকে দস্তয়েভস্কি করেছে।
তিনি মানুষের ওপর থেকে ভদ্রতার জামাটা খুলে দেখেছিলেন ভিতরে কী আছে।
দেখলেন সেখানে একই সঙ্গে কামনা, ভয়, অহংকার, লজ্জা, নিষ্ঠুরতা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, আত্মবিনাশ আর পরিত্রাণের আকাঙ্ক্ষা গাদাগাদি করে থাকে।
মানুষ একরকম না।
নিজের কাছেও না।
আজ সকালে যে মানুষটি দান করে, বিকেলে সে কাউকে অপমান করতে পারে।
যে লোক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, রাত তিনটায় সেই লোকই ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করতে পারে, “তুমি আছ তো?”
যে লোক অপরাধ করেছে, সেই লোকই নিজের শাস্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।
যে লোক অন্যকে ভালোবাসে, সেই ভালোবাসার মধ্যেই তাকে ধ্বংস করার উপাদান থাকতে পারে।
দস্তয়েভস্কি এই বিশৃঙ্খলা থেকে চোখ সরাননি।
এই জন্য তাঁর উপন্যাস পড়লে মাঝে মাঝে মনে হয় লোকটা আমাদের ঘরের গোপন ড্রয়ার খুলে বসে আছে।
আমি Crime and Punishment পড়ছি।
রাসকলনিকভ একটা কথা ভাবছে।
হঠাৎ আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
আরে ব্যাটা, এই কথাটা তো আমি কখনও কাউকে বলিনি!
তুমি জানলে কী করে?
এই জায়গায় দস্তয়েভস্কি ভয়ংকর।
তিনি আমাদের অপরাধ জানেন বলে নয়।
অপরাধ করার আগে মানুষের মাথায় যে ছোট ছোট যুক্তি জন্মায়, সেগুলো চিনতেন বলে।
মানুষ প্রথমে খুন করে না।
আগে যুক্তি তৈরি করে।
আমি বিশেষ মানুষ।
আমার ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা।
আমি যা করছি বৃহত্তর ভালোর জন্য।
ওই মানুষটার জীবনের মূল্য কম।
আমার কোনও উপায় ছিল না।
এরপর নৈতিক বিপর্যয় ধীরে ধীরে নিজের ভাষা বানায়।
দস্তয়েভস্কির সাহিত্য সেই ভাষা শুনতে পায়।
আবার তিনিই দেখেছেন অন্য এক জিনিস।
মানুষ অনেক সময় যুক্তি দিয়ে ধ্বংস হয়, সম্পর্ক দিয়ে বাঁচে।
Sonya রাসকলনিকভের পাশে বসে।
আলিওশা মানুষের কাছে যায়।
মিশকিন বিচার করার আগে মানুষকে বোঝার চেষ্টা করে।
আন্না বাস্তব জীবনে দস্তয়েভস্কির পাশে বসে shorthand নেয়।
এই দৃশ্যগুলো আলাদা নয়।
একটা গভীর বিশ্বাস তাদের যুক্ত করে।
মানুষকে কেবল মতবাদ দিয়ে উদ্ধার করা যায় না। তাকে একজন আরেকজনের কাছে যেতে হয়।
হয়তো এই বিশ্বাসই সাইবেরিয়া থেকে তাঁর সঙ্গে ফিরেছিল।
কারাগারে তিনি দেখেছিলেন মানুষ কত ভয়াবহ।
সেখানেই আবার দেখেছিলেন সবচেয়ে নিচে নামা মানুষও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
আর সেই আটাশ বছরের যুবকটির কথা?
যে বরফের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে?
বন্দুক তাক করা?
মনে মনে জীবনের শেষ কয়েক মিনিট গুনছে?
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, সেদিন যদি সত্যিই গুলি চলত, তাহলে কী কী বই লেখা হত না।
Notes from Underground থাকত না।
রাসকলনিকভ থাকত না।
প্রিন্স মিশকিন থাকত না।
ইভান কারামাজভের “Grand Inquisitor” থাকত না।
আলিওশা থাকত না।
মানুষের অপরাধবোধ নিয়ে আধুনিক সাহিত্য অন্যরকম হত।
ফ্রয়েড দস্তয়েভস্কিকে নিয়ে লিখতে পারতেন না।
কাফকা, কামু থেকে শুরু করে পরবর্তী অসংখ্য লেখকের সাহিত্যিক মানচিত্রও কিছুটা বদলে যেত। তাঁর প্রভাব বিশ শতকের সাহিত্য ও চিন্তার বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর পড়েছে।
একজন সৈন্য হয়তো ট্রিগারে আঙুল রেখেছিল।
একটা আদেশ এলে সে গুলি চালাত।
আদেশটা এল না।
আর বিশ্বসাহিত্য ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পেল।
এই জন্য দস্তয়েভস্কির জীবন নিয়ে ভাবলে আমার কাছে বারবার তিনটে সংখ্যা ফিরে আসে।
তিন।
দুই।
এক।
তারপর গুলি হয়নি।
মানুষটি বেঁচে গেলেন।
কিন্তু তিনি আগের মানুষ হয়ে বাঁচলেন না।
হয়তো সেদিন সেমিওনভস্কি স্কোয়ারে ফিওদর দস্তয়েভস্কি একবার সত্যিই মারা গিয়েছিলেন।
যে মানুষটি সাইবেরিয়ার দিকে শিকল পরে রওনা দিলেন, সে মৃত্যুর খবর জানা একজন মানুষ।
আর মৃত্যু সম্বন্ধে একবার নিশ্চিত খবর পেয়ে গেলে পৃথিবীর আলো, সময়, ভালোবাসা, অপরাধ, ক্ষমা, এমনকি এক কাপ চায়েরও অর্থ বদলে যায়।
দস্তয়েভস্কি বাকি জীবন সেই বদলে যাওয়া পৃথিবীটার খবর আমাদের দিয়ে গেছেন।
লোকটা সুখী ছিলেন কি না জানি না।
স্বাভাবিক ছিলেন কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন।
তবে “স্বাভাবিক” মানুষ লিখলে আমরা হয়তো সন্ধ্যার মধ্যে ভুলে যেতাম।
এই লোকটাকে দেড়শো বছর পরেও ভুলতে পারিনি।
জীবন তাঁকে একবার firing squad-এর সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, “শেষ।”
দস্তয়েভস্কি বোধহয় মনে মনে উত্তর দিয়েছিলেন,
“দেখা যাক।”
তারপর বাড়ি ফিরে চার হাজার পৃষ্ঠার মতো জবাব লিখে গেলেন।



