রবীন্দ্রনাথ: চলমান এক নদী
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখতে বসলেই আমার সংকোচ করে। এমন নয় যে তাঁর সম্পর্কে বলার ভাষা নেই, বরং উল্টোটা; কথা এত বেশি যে কোন দিক থেকে শুরু করব সেটাই স্থির করতে পারি না। তাঁর সৃষ্টির বিস্তার, যেন একক মানুষ নন, একটি যুগ লিখছে। কখনো মনে হয় তিনি একা নন, তাঁর কলমের পেছনে বাংলার ঋতুচক্র, নদীর স্রোত, ভাঙা জমিদারবাড়ির বারান্দা, শহুরে ভদ্রসমাজের দ্বিধা; সবাই মিলে কাজ করছে।
শুধু কবিতার কথাই ধরা যাক। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হৃদয়ের যে নাচন, তা যেমন তিনি ধরেছেন, তেমনি অস্তিত্বের গাঢ় অন্ধকারও এড়িয়ে যাননি। ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে’; এই উচ্চারণে আমি বরাবরই বর্ষার প্রথম দিনের ভেজা মাটি, হাওয়ায় কাঁপতে থাকা কদমফুলের গন্ধ পাই। মনে হয় জীবন হালকা, দেহের ভেতরে বাতাস ঢুকে জায়গা করে নিচ্ছে।
আবার অন্য প্রান্তে; ‘নাই স্নেহ মোহ বন্ধন / ওরে আশা নাই…’ এই স্বর একেবারেই আলাদা। এখানে আলো নেই, কেবল ঘনিয়ে আসা ছায়া। মানুষ যখন ভেতর থেকে শূন্য হয়ে যায়, তখন ভাষা এমনই নিরাবরণ হয় বোধহয়। রবীন্দ্রনাথের শক্তি ছিল এই দুই প্রান্তকে সমান স্বাভাবিকতায় ধারণ করা। আনন্দ তাঁর কাছে বিলাস নয়, দুঃখও নাটক নয়। দুটোই অভিজ্ঞতা।
জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে তাঁর কণ্ঠে যে সুর ধরা পড়ে, সেটি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। তখন তিনি লিখতে পারছেন না, মুখে মুখে বলে যাচ্ছেন; ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনাজালে…’
যে মানুষ একসময় প্রকৃতির সর্বত্র মঙ্গল ও ঐশ্বর্যের উপস্থিতি দেখেছিলেন, তাঁর মুখে ‘ছলনাময়ী’ শব্দটি শুনলে প্রথমে বিস্ময় লাগে। তারপর ধীরে ধীরে বোঝা যায়, এটি আক্রোশ নয়, বোধের পরিণতি। জগৎকে সরল মনে করা যেমন ভ্রম, তেমনি তাকে নিছক প্রতারণা ভাবাও অর্ধসত্য। ছলনা আছে, কিন্তু মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় নয়। অন্তরে যদি সত্য থাকে, তবে প্রতারণার জাল ছিন্ন হওয়াও সম্ভব। তাই তাঁর শেষ দিকের উচ্চারণে শুনি; ‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে / সে পায় তোমার হাতে / শান্তির অক্ষয় অধিকার।’
এখানে ক্লান্তি আছে, কিন্তু পরাজয় নেই। বরং এক ধরনের নীরব প্রজ্ঞা।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা প্রায়ই গুরুগম্ভীর আলোচনায় আবদ্ধ রাখি। কিন্তু তাঁর লঘু রসবোধও কম আশ্চর্য নয়। ‘দামোদর শেঠ’, ‘গোরা বোষ্টম বাবা’, কিংবা ‘বীরের ছাঁছে আসা বর’; এইসব ছড়ায় এক অন্য রবীন্দ্রনাথকে পাই। হালকা, কৌতুকপ্রবণ, খানিকটা দুষ্টুমি মেশানো।
‘বর এসেছে বীরের ছাঁছে বিয়ের লগ্ন আটটা…’
এই কয়েকটি লাইনে যে দৃশ্যরচনা; পিতল আঁটা লাঠি, গালপট্টা, রায়বেঁশে নাচের ঝোঁক; সব মিলিয়ে যেন এক চলমান গ্রামবাংলা। হাস্যরস এখানে শব্দের খেলায় নয়, পরিস্থিতির অস্বস্তিতে। শ্বশুরের কান্না আর বরের ঠাট্টা পাশাপাশি দাঁড়ায়। জীবনও কি এমন নয়; একজনের শোক, আরেকজনের মজা?
তারপর আছে তাঁর কাহিনী-কবিতা। ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘পুরস্কার’, ‘ছুটি’, ‘ফাঁকি’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘জুতা আবিষ্কার’; এইসব রচনায় দেখি গল্প আর কবিতা আলাদা থাকে না। ভাষা যেমন কাব্যিক, তেমনি বর্ণনা নির্ভুল। মানুষের ছোট ঘটনা বৃহত্তর সামাজিক সত্যকে ছুঁয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ বড় বিষয়কে ছোট করে বলেননি, বরং ছোট বিষয়েই বড় অর্থ খুঁজে পেয়েছেন।
সাহিত্যের একেকটি শাখায় তাঁর উপস্থিতি এত প্রবল যে আলাদা করে তালিকা করলেও বিস্ময় কমে না; কবিতা, গান, ছড়া, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, পত্রসাহিত্য, আত্মজীবনী। তার সঙ্গে চিত্রকর্ম, বক্তৃতা, শিক্ষাচিন্তা। বৈচিত্র্য এখানে শুধু সংখ্যায় নয়, ভঙ্গিতে। প্রতিটি মাধ্যমে তিনি আলাদা সুর খুঁজেছেন।
তবু একটা বিষয় আমরা প্রায়ই আড়ালে রাখি। তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড বর্জন, মিস র্যাথবোনকে লেখা খোলা চিঠি, ‘সভ্যতার সংকট’ বক্তৃতা; এসব কেবল ঐতিহাসিক দলিল নয়। এগুলো একজন শিল্পীর নৈতিক অবস্থান। তিনি কেবল গান লেখেননি, সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এইসব ভেবে মাঝে মাঝে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা মানে এক চলমান নদীকে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা। শেষ হয় না। তাই অনেক প্রসঙ্গ ছেড়ে দিয়ে আমি প্রায়ই ফিরে যাই তাঁর একটি প্রতীকী রচনায়; ‘কর্তার ভূত’।
শুরুটা সহজ, প্রায় লোককথার মতো। মরণাপন্ন কর্তা, প্রজাদের উদ্বেগ, দেবতার আশ্বাস; মানুষ মরবে, ভূত মরবে না।
কিন্তু শেষ অনুচ্ছেদে এসে রচনাটি হঠাৎ রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, যদিও কোথাও সরাসরি রাজনীতি নেই। কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই; ভূত হয়ে আছে। দেশকে নাড়েও না, ছাড়েও না। মানুষ ভয়ে কথা বলে না। গভীর রাতে ফিসফিস করে। কর্তা বলেন: আমার ধরা নেই, ছাড়াও নেই। তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া। আর শেষ কথা: ভয়ই ভূত।
এই কয়েকটি লাইনে ক্ষমতার প্রকৃতি, আনুগত্যের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক ভীতির নির্মাণ; সব এসে যায়। ভাষা সরল, ইঙ্গিত গভীর। রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে উচ্চকিত ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর রচনাগুলোই ধীরে ধীরে সেই কাজ করে। আমরা পড়তে পড়তে বুঝি; একজন মানুষ কতভাবে মানুষকে দেখতে পারেন। আর কতভাবে নিজেকেও।
কর্তার ভূত লেখাটি সম্পূর্ণ তুলে দিলাম নিচেঃ
কর্তার ভূত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, 'তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।'
শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, 'আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।'
তা ব'লে মরণ তো এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, 'ভাবনা কী। লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক্-না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের তো মৃত্যু নেই।'
২
দেশের লোক ভারি নিশ্চিন্ত হল।
কেননা ভবিষ্যৎকে মানলেই তার জন্যে যত ভাবনা, ভূতকে মানলে কোনো ভাবনাই নেই; সকল ভাবনা ভূতের মাথায় চাপে। অথচ তার মাথা নেই, সুতরাং কারো জন্যে মাথাব্যথাও নেই।
তবু স্বভাবদোষে যারা নিজের ভাবনা নিজে ভাবতে যায় তারা খায় ভূতের কানমলা। সেই কানমলা না যায় ছাড়ানো, তার থেকে না যায় পালানো, তার বিরুদ্ধে না চলে নালিশ, তার সম্বন্ধে না আছে বিচার।
দেশসুদ্ধ লোক ভূতগ্রস্ত হয়ে চোখ বুজে চলে। দেশের তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, 'এই চোখ বুজে চলাই হচ্ছে জগতের সবচেয়ে আদিম চলা। একেই বলে অদৃষ্টের চালে চলা। সৃষ্টির প্রথম চক্ষুহীন কীটাণুরা এই চলা চলত; ঘাসের মধ্যে, গাছের মধ্যে, আজও এই চলার আভাস প্রচলিত।'
শুনে ভূতগ্রস্ত দেশ আপন আদিম আভিজাত্য অনুভব করে। তাতে অত্যন্ত আনন্দ পায়।
ভূতের নায়েব ভুতুড়ে জেলখানার দারোগা। সেই জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না। এইজন্যে ভেবে পাওয়া যায় না, সেটাকে ফুটো করে কী উপায়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এই জেলখানায় যে ঘানি নিরন্তর ঘোরাতে হয় তার থেকে এক ছটাক তেল বেরোয় না যা হাটে বিকোতে পারে, বেরোবার মধ্যে বেরিয়ে যায় মানুষের তেজ। সেই তেজ বেরিয়ে গেলে মানুষ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাতে করে ভূতের রাজত্বে আর কিচ্ছুই না থাক্--অন্ন হোক, বস্ত্র হোক, স্বাস্থ্য হোক-- শান্তি থাকে।
কত-যে শান্তি তার একটা দৃষ্টান্ত এই যে, অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে। এখানে সে চিন্তাই নেই। কেননা ওঝাকেই আগেভাগে ভূতে পেয়ে বসেছে।
৩
এই ভাবেই দিন চলত, ভূতশাসনতন্ত্র নিয়ে কারো মনে দ্বিধা জাগত না; চিরকালই গর্ব করতে পারত যে, এদের ভবিষ্যৎটা পোষা ভেড়ার মতো ভূতের খোঁটায় বাঁধা, সে ভবিষ্যৎ ভ্যা'ও করে না, ম্যা'ও করে না, চুপ করে পড়ে থাকে মাটিতে, যেন একেবারে চিরকালের মতো মাটি।
কেবল অতি সামান্য একটা কারণে একটু মুশকিল বাধল। সেটা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোকে ভূতে পায় নি। তাই অন্য সব দেশে যত ঘানি ঘোরে তার থেকে তেল বেরোয় তাদের ভবিষ্যতের রথচক্রটাকে সচল করে রাখবার জন্যে,বুকের রক্ত পিষে ভূতের খর্পরে ঢেলে দেবার জন্যে নয়। কাজেই মানুষ সেখানে একেবারে জুড়িয়ে যায় নি। তারা ভয়ংকর সজাগ আছে।
৪
এ দিকে দিব্যি ঠাণ্ডায় ভূতের রাজ্য জুড়ে 'খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো'।
সেটা খোকার পক্ষে আরামের, খোকার অভিভাবকের পক্ষেও; আর পাড়ার কথা তো বলাই আছে।
কিন্তু, 'বর্গি এল দেশে'।
নইলে ছন্দ মেলে না, ইতিহাসের পদটা খোঁড়া হয়েই থাকে।
দেশে যত শিরোমণি চূড়ামণি আছে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা গেল, 'এমন হল কেন।'
তারা এক বাক্যে শিখা নেড়ে বললে, 'এটা ভূতের দোষ নয়, ভুতুড়ে দেশের দোষ নয়, একমাত্র বর্গিরই দোষ। বর্গি আসে কেন।'
শুনে সকলেই বললে, 'তা তো বটেই।' অত্যন্ত সান্ত্বনা বোধ করলে।
দোষ যারই থাক্, খিড়কির আনাচে-কানাচে ঘোরে ভূতের পেয়াদা, আর সদরের রাস্তায়-ঘাটে ঘোরে অভূতের পেয়াদা; ঘরে গেরস্তর টেঁকা দায়, ঘর থেকে বেরোবারও পথ নেই। এক দিক থেকে এ হাঁকে, 'খাজনা দাও।' আর-এক দিক থেকে ও হাঁকে, 'খাজনা দাও।'
এখন কথাটা দাঁড়িয়েছে, 'খাজনা দেব কিসে'।
এতকাল উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারো হুঁস ছিল না। জগতে যারা হুঁশিয়ার এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিতও করে না। শিরোমণি-চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, 'বেহুঁশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি, অতএব হুঁশিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।'
শুনে সকলের অত্যন্ত আনন্দ হয়।
৫
কিন্তু, তৎসত্ত্বেও এ প্রশ্নকে ঠেকানো যায় না, 'খাজনা দেব কিসে'।
শ্মশান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা ক'রে তার উত্তর আসে, 'আব্রু দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।'
প্রশ্নমাত্রেরই দোষ এই যে, যখন আসে একা আসে না। তাই আরও একটা প্রশ্ন উঠে পড়েছে, 'ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চলবে।'
শুনে ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি আর মাসতুতো-পিসতুতোর দল কানে হাত দিয়ে বলে, 'কী সর্বনাশ। এমন প্রশ্ন তো বাপের জন্মে শুনি নি। তা হলে সনাতন ঘুমের কী হবে-- সেই আদিমতম, সকল জাগরণের চেয়ে প্রাচীনতম ঘুমের?'
প্রশ্নকারী বলে, 'সে তো বুঝলুম, কিন্তু আধুনিকতম বুলবুলির ঝাঁক আর উপস্থিততম বর্গির দল, এদের কী করা যায়।'
মাসিপিসি বলে, 'বুলবুলির ঝাঁককে কৃষ্ণনাম শোনাব, আর বর্গির দলকেও।'
অর্বাচীনেরা উদ্ধত হয়ে বলে ওঠে, 'যেমন করে পারি ভূত ছাড়াব।'
ভূতের নায়েব চোখ পাকিয়ে বলে, 'চুপ। এখনো ঘানি অচল হয় নি।'
শুনে দেশের খোকা নিস্তব্ধ হয়, তার পরে পাশ ফিরে শোয়।
৬
মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, বুড়ো কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।
দেশের মধ্যে দুটো-একটা মানুষ, যারা দিনের বেলা নায়েবের ভয়ে কথা কয় না, তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে, 'কর্তা, এখনো কি ছাড়বার সময় হয় নি।'
কর্তা বলেন, 'ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই, ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।'
তারা বলে, 'ভয় করে যে, কর্তা।'
কর্তা বলেন, 'সেইখানেই তো ভূত।'


