ঈদের পাঞ্জাবি এবং আমাদের গৃহস্থ সংসদের বাজেট অধিবেশন
আমার গিন্নীর আয় আমার চাইতে বেশি, ডিগ্রিও বেশি, এবং সংসারের অর্থমন্ত্রকের চাবিটাও কার্যত তাঁর হাতেই, যদিও গণতান্ত্রিক সৌজন্যের খাতিরে মাঝেমধ্যে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “তোমার কী মত?”, আর আমি সেই প্রশ্নের উত্তরে এমন ভঙ্গি করি যেন রাষ্ট্রের এক গুরুতর নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নিচ্ছি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে জানি, আমার মতামতের পরিণতি সাধারণত চায়ে কতটা চিনি হবে সেই স্তরের বেশি কোথাও পৌঁছায় না। এই সব কথা আমি গভীর বেদনার সঙ্গে বলছি না, বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে একরকম শান্ত প্রজ্ঞা অর্জন করে বলছি, কারণ সংসারে সব ক্ষমতা যে একই ব্যক্তির হাতে থাকবে, এমন তো কোনও সংবিধানে লেখা নেই, এবং যাঁর উপার্জন বেশি, ডিগ্রি বেশি, রুচি তীক্ষ্ণতর, দোকানদারের সঙ্গে দরাদরির ক্ষমতা দৃঢ়তর, এবং ঈদের বাজারে কার জন্য কোন রঙের কাপড় মানাবে সে সম্পর্কে যার সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া প্রায় অব্যর্থ, তাঁকেই যে শেষ কথা বলতে হবে, এ আর এমন আশ্চর্য কী।
আমরা, অর্থাৎ আমি এবং আমার পুত্র, এই জাঁকজমকপূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রধানত দর্শক। “দর্শক” শব্দটিও একটু বড় হয়ে যায়। আমরা বরং ঈদের কেনাকাটার সেই সিনেমায় অতিরিক্ত শিল্পী। কখনও কখনও ব্যাগ ধরি, কখনও ট্রায়াল রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, কখনও জিজ্ঞেস করা হলে বলি, “ভালো”, “খুব ভালো”, “এইটাও ভালো”, “ওটাও ভালো”, এবং আমাদের এই গভীর নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়নের পরে যে পোশাকই কেনা হোক না কেন, বাড়ি ফিরে দেখা যায় সেটাই আগে থেকে ঠিক ছিল। আমার কাজ মূলত উপস্থিত থাকা। ছেলের কাজও তাই। তবে সে আমার চেয়ে একটু আধুনিক দর্শক। আমি এখনও বাজারে গেলে কাপড়ের গুণ, সেলাইয়ের ফিনিশিং, কলারের কাট এসব নিয়ে ভাবার ভান করি; সে সরাসরি বই হাতে বসে থাকে, যেন জানিয়ে দিচ্ছে, এই জাতীয় অনুষ্ঠান তার পূর্বপুরুষেরা করেছে, সেও বংশরক্ষার স্বার্থে এসেছে, কিন্তু অন্তরে সে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত।
ঈদের কেনাকাটার দিনগুলিতে আমার গিন্নীকে আমি নতুন করে চিনতে পারি। সারা বছরের পরিচিত মানুষটি তখন এক বিশেষ রূপ ধারণ করেন। দোকানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়, কণ্ঠস্বরে সংযত কর্তৃত্ব নামে, সেলসম্যানদের মধ্যে হালকা অস্থিরতা দেখা দেয়। কে কত পুরোনো স্টক নতুন বলে চালাতে চাইছে, কোন কাপড় আলোতে যেমন দেখাচ্ছে বাইরে গিয়ে তেমন থাকবে না, কোন পাঞ্জাবির বোতাম দেখে বোঝা যাচ্ছে দু’বার ধুলেই তার আত্মা ত্যাগ করবে, আর কোন দোকানদার “আপা, একদম এক্সক্লুসিভ” বললেও পাশের তিনজন গ্রাহকের হাতে সেই একই কাপড় ইতিমধ্যে ধরা আছে, এইসব সত্য তিনি এমন সহজে বুঝে ফেলেন যে মাঝে মাঝে আমার নিজের শিক্ষাজীবনের উপর সন্দেহ জাগে। আমি দীর্ঘকাল ধরে নানা বই পড়েছি, নানা বিষয় নিয়ে ভেবেছি, মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে কিছু ধারণা অর্জন করেছি বটে, কিন্তু গুলশান পিঙ্ক, অফ-হোয়াইট, ফিকে সি-গ্রীন এবং আসলে প্রায় একই রঙের আরও তিনটি শেডের সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারি না। সংসার আমাকে বারবার বিনয় শেখায়।
ঈদের বাজার করতে গিয়ে তিনি শুধু নিজের জন্য কেনেন না, ছেলের জন্য কেনেন, আমার জন্য কেনেন, ঘরের ছোটখাটো জিনিসও কেনেন, কখনও এমনকী এমন কিছু কিনে আনেন যার দরকার আছে কি না আমি তখনও জানি না, কিন্তু তিন দিন পরে দেখি সেটি ছাড়া সংসার চলতই না। এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা। আমি দীর্ঘদিন ধরে মনে করতাম সংসারে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মানে মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিল, কার্ড পেমেন্ট আর মুদি দোকানের খাতার হিসেব মেলানো। পরে বুঝেছি, প্রকৃত অর্থনীতি আরও সূক্ষ্ম। কোথায় কত খরচ করলে উৎসবের আনন্দ থাকে, কোথায় কমালে ক্ষতি নেই, কোথায় একটু বেশি দিলেও জিনিস টিকে যাবে, আর কোথায় কম দামে কিনে পরে দু’বার আফসোস করতে হবে, এই সবই উচ্চতর বিদ্যা। সে বিদ্যার উপর তাঁর প্রাকৃতিক অধিকার আছে।
এবারের ঈদে তিনি আমাকে একটা পাঞ্জাবি গিফট করেছেন। এই খবরটি শুনলে কারও মনে হতে পারে, এ আর এমন কী, স্বামীকে স্ত্রী পাঞ্জাবি দিয়েছে, উৎসবের আগে এ তো বহু ঘরেই হয়। কিন্তু আমার কাছে ঘটনাটি একটু বড়। কারণ পাঞ্জাবি শুধু কাপড় নয়, সংসারে আপনার অবস্থানেরও এক নিঃশব্দ সার্টিফিকেট। আপনি নিজে গিয়ে যা কিনতেন, তার চেয়ে ভালো কিছু কেউ আপনাকে কিনে দিল, এর মধ্যে একধরনের ভালোবাসা আছে, একটু কর্তৃত্ব আছে, অল্প উপহাসও আছে বোধহয়। যেন বলা হচ্ছে, “তুমি নিজে গেলে আবার সেই পুরোনো, ধোপদুরস্ত, নিরীহ, সভায়-সমিতিতে-পরা ধরনের পাঞ্জাবিটাই নিতে। আমি তোমার জন্য একটু মানুষসম পোশাক বেছে দিলাম।”
পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে আমি প্রথমে যথারীতি বললাম, “এর কী দরকার ছিল?” এই বাক্যটি বাঙালি পুরুষের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিরোধরীতি। প্রায় সব উপহার গ্রহণের সময় আমরা এটা বলি, যেন আমরা খুবই সংযমী, সংসারের অর্থব্যবস্থার প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল, এবং নিজের জন্য কিছু চাই না। কিন্তু এই বাক্যের অন্তরে যে পরিমাণ তৃপ্তি, তা মুখে প্রকাশ করা শোভন নয়। আমিও করিনি। কেবল কাপড়টা হাত বুলিয়ে দেখলাম, কলারের কাটটা দেখলাম, বোতামগুলি গুনলাম, তারপর আয়নায় ধরে একটু দেখার চেষ্টা করলাম আমার উপর কেমন লাগবে। সে সময় আমার মুখের ভাব সম্ভবত অতিরিক্ত সংযত ছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনে হচ্ছিল, লোকটি, অর্থাৎ আমি, এখনও সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাইনি।
আমার ছেলে সেই দৃশ্য দেখে যে মুখ করল, তা আলাদা করে লিখবার মতো। তার দৃষ্টিতে ছিল অল্প মজা, অল্প বিস্ময়, আর সামান্য সেই চিরন্তন ছেলেমানুষি বিচার, যাতে বাবাকে একটু অপ্রস্তুত দেখলে সন্তানরা বিশেষ আনন্দ পায়। সে হয়তো ভাবছিল, বাবা যিনি সারা বছর একই ধরনের দু’-চারটে জামা পরে দিব্যি কাটিয়ে দেন, তাঁকে উৎসব উপলক্ষে এভাবে নবায়ন করা হচ্ছে, ব্যাপারটা লক্ষণীয়। আমি তার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গি করলাম যেন পাঞ্জাবি-উপহার পাওয়া আমার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক, কিন্তু সে আমাকে বহুদিন ধরে চেনে, অতএব সে বিশেষ বিভ্রান্ত হল না।
বিয়ের পরে পুরুষমানুষের জীবনে একটা সময় আসে যখন সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে, সংসারে তার স্বাধীনতা পুরো লোপ পায়নি বটে, কিন্তু তার রুচির উপর আস্থা পরিবার ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কোন শার্টের সঙ্গে কোন প্যান্ট যাবে, কোন রঙে মানুষকে কম বয়সী না হোক অন্তত ক্লান্ত দেখাবে না, কোন কাপড়ে ছবি উঠবে, কোনটায় উঠবে এমনভাবে যে আত্মীয়স্বজনও চিনতে একটু সময় নেবে, এইসব গুরুতর বিষয়ে শেষ কথা সে আর বলে না। শুরুতে এই সত্যটুকু কষ্ট দেয়। পরে মানুষ শান্ত হয়। আরও পরে একপ্রকার কৃতজ্ঞও হয়। কারণ সত্যি কথা বলতে কী, নিজে নিজের পোশাক বেছে নেওয়ার উপর আমার যে আস্থা ছিল, তার যথেষ্ট কারণ ছিল না।
তার পরেও পুরুষের অহংকার বলে একটি বস্তু আছে। সে একেবারে মরে না। তাই নতুন পাঞ্জাবি পরে আমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, তখন মুখে যতই উদাসীন ভাব রাখি, ভিতরে ভিতরে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, পেট সামান্য টানলাম, কাঁধ নামালাম, তারপর খুব স্বাভাবিক সুরে জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন লাগছে?” এই প্রশ্নটিও চিরন্তন। যে মানুষই বলুক, এর মধ্যে প্রশংসা ভিক্ষা করার এক লাজুক প্রয়াস থাকে। গিন্নী তখন আমার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “ভালোই তো। আমি কি খারাপ কিছু আনতাম?” কথাটা শুনে বুঝলাম, পাঞ্জাবির প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রেতা, বাছাইকারী, অর্থদাতা এবং গৃহস্থ সংসদের মুখ্য রুচিনির্ধারক, চারটি পদে একই ব্যক্তি তাঁর অধিকার পুনর্ব্যক্ত করলেন।
আমি কিছু বললাম না। কারণ এইসব মুহূর্তে চুপ থাকাই উত্তম। চুপ করে থাকলে মানুষকে অনেক সময় জ্ঞানী বলে মনে হয়। আর তা ছাড়া, আমি সত্যিই খুশি ছিলাম। এ শুধু পাঞ্জাবি নয়, একসঙ্গে বহু বছরের সংসার, অভ্যাস, খুনসুটি, শ্রেষ্ঠত্বের মৃদু দম্ভ, আর স্নেহের আরামদায়ক কর্তৃত্ব, সব মিলিয়ে সেলাই করা একখানা পোশাক। এইরকম উপহার দোকানে মেলে না।
এখন ঈদের দিন আমি পাঞ্জাবিটা পরব, ছেলে আর আমি আবার দর্শকবৃন্দের সারি থেকে একটু বেরিয়ে পরিবারের দৃশ্যমান অংশ হব, ছবি তোলা হবে, কেউ না কেউ বলবে, “পাঞ্জাবিটা সুন্দর হয়েছে”, আর আমি এমনভাবে মাথা নাড়ব যেন এতে আমার ব্যক্তিগত অবদান বিশেষ কিছু ছিল। কিন্তু অন্তরে অন্তরে জানব, সংসারে আমার ডিগ্রি কম হোক, আয় কম হোক, কেনাকাটায় ভূমিকা প্রায় শূন্য হোক, তবু আমারও একটি বিশেষ মর্যাদা আছে। আমি সেই ব্যক্তি, যাকে প্রতি ঈদে নতুন করে সামলে নিতে হয়।
এও কম সৌভাগ্য নয়।
সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা।



