একুশে ফেব্রুয়ারী
সংকলনের উন্নত মান, ছাপা ও বাঁধাইয়ের যত্ন দেখে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা সেরা সংকলনের জন্য পুরস্কার প্রবর্তন করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারী সম্পাদনা হাসান আফিজুর রহমানের সংকলনটি যে ১৯৫২ সালের তাৎক্ষণিক আবেগে প্রকাশিত হয়নি, বরং ১৯৫৩ সালের মার্চে প্রথম আলোর মুখ দেখেছিল। ভাষা, শহিদ, রক্তস্মৃতি এ সবই তখনো উষ্ণ; অথচ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল শীতল এবং সতর্ক। প্রকাশের পরপরই সরকার বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একটি সংকলনকে ভয় করার মধ্যে যে শাসন-মনস্তত্ত্ব কাজ করে, তা নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; সেখানে শব্দের শক্তিকে স্বীকার করার এক পরোক্ষ স্বীকারোক্তি থাকে। খুব সম্ভব ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু এই স্বল্প অবকাশ স্থায়ী হয়নি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে আবারও সাংস্কৃতিক পরিসরে অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে আসে।
তবু ইতিহাসের একটি নিজস্ব ছন্দ আছে। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একুশকে ঘিরে সংকলন প্রকাশের নতুন ঢেউ ওঠে। ফেব্রুয়ারি তখন কেবল স্মরণ নয়, প্রতিবাদের ভাষা। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে একুশে সংকলন প্রকাশ করতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে হল থেকে পাড়া-মহল্লায়, সারা দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিতে। একুশে সংকলন হয়ে ওঠে সমবেত মননের আয়না। সেখানে লেখা, রেখা, মুদ্রণ; সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ কাজ করতে শুরু করে। সংকলনের উন্নত মান, ছাপা ও বাঁধাইয়ের যত্ন দেখে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা সেরা সংকলনের জন্য পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই প্রবর্তন ছিল মানোন্নয়নের আহ্বান। তার ফলে সংকলনগুলিকে ঘিরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক নান্দনিকতা তৈরি হয়; অনেক নতুন লেখক ও শিল্পী বিদগ্ধ মহলে পরিচিতি পান। একুশে তখন স্মৃতির সঙ্গে সৃজনের সংযোগস্থল।
সময় অবশ্য তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। ছাপা কাগজের ব্যয় বাড়তে থাকে। ছোট উদ্যোগগুলির পক্ষে সংকলন প্রকাশ ক্রমে কঠিন হয়ে ওঠে। একসময় এই সব একুশে সংকলনের ধারাবাহিক প্রকাশ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসের এক রূপ থেমে গেলে অন্য রূপ জন্ম নেয়। সংকলনের প্রকাশনা ক্ষীণ হলেও একুশে বইমেলা নতুন মাত্রা যোগ করে পুস্তক প্রকাশে। বইমেলা হয়ে ওঠে স্মৃতি ও বাজার, সংস্কৃতি ও বিপণন; এই দ্বৈত স্রোতের মিলনক্ষেত্র। ভাষা-আন্দোলনের উত্তরাধিকার সেখানে এক বৃহত্তর প্রকাশনা-সংস্কৃতির ভিত গড়ে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে বই নিয়ে আমাদের সামগ্রিক ভাবনার দিকে তাকানো প্রয়োজন। বই যে কেবল পাঠ্যবস্তু নয়, বরং মননের দীর্ঘ সাধনার সঙ্গী, সে কথা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। “বুকস আর দ্য বেস্ট টিচারস”; শিক্ষকের এই উপদেশ কেবল শৈশবস্মৃতি নয়, বরং এক প্রজন্মের বৌদ্ধিক অনুশাসন। গ্রন্থপাঠের অনুশীলন পাঠকের রুচি নির্মাণ করে, সমাজের মাইক্রো স্তরে অগ্রসরতা ও অনগ্রসরতার চিহ্ন শনাক্ত করতে সাহায্য করে। বইপড়া কমেছে; এই অভিযোগ যতই উঠুক, বই মানুষকে ছেড়ে যায়নি। বরং পরিবর্তিত মাধ্যমের সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছে। ছাপার অক্ষর থেকে ই-বুক, অডিয়ো বুক; সবই মূলত সেই অক্ষরসমুদ্রের নতুন তরঙ্গ।
কিন্তু পাঠের সঙ্গে প্রদর্শনের ফারাক ক্রমেই প্রকট। বইমেলায় ভিড় বাড়ে, সামাজিক মাধ্যমে বই-প্রকাশের ঘোষণা ছড়ায়, পরিসংখ্যান হাজির হয় বিক্রির অঙ্কে। সংখ্যা যেন চূড়ান্ত বিচারক। অথচ শব্দের কাজ গ্রন্থের বিচার পরিসংখ্যানের অতিরিক্ত এক সূক্ষ্ম অনুশীলন। সামাজিক মাধ্যমে তা প্রায়শই ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অন্ধ প্রশংসায় রূপ নেয়। সেখানে পাঠের গভীরতা অনুপস্থিত, মননের সংযম অনুপস্থিত। ফলে গ্রন্থের তুল্যমূল্য বিচার গৌণ হয়ে পড়ে।
একুশের সংকলনগুলির ইতিহাস আমাদের স্মরণ করায়, সাহিত্য কেবল রাষ্ট্রের বিরোধিতা বা সমর্থনের ক্ষেত্র নয়, বরং আত্মমর্যাদার অনুশীলন। ভাষা যখন নতুন শব্দবন্ধ সৃষ্টি করে; হুমকি-সংস্কৃতি, দ্রোহকাল, রাতদখল তখন বোঝা যায় ভাষা জীবিত। সেই জীবন্ত ভাষার উত্তরাধিকারই একুশে সংকলনের প্রাণ। শাসনব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থা যেমন পরস্পরের পরিপূরক হওয়া উচিত, তেমনি রাষ্ট্র ও সাহিত্যও প্রতিযোগী নয়। শাসন যদি সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু করে তোলে, তবে মননের প্রসারণ সংকুচিত হয়। ইতিহাসে ‘ইঞ্জিনিয়ার্স অফ দ্য হিউম্যান সোল’-এর মতো নির্দেশ তার প্রমাণ।
একুশের সংকলন, বইমেলা, গ্রন্থপাঠ এই সবই এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চক্রের অংশ। পাড়া-মহল্লার বইয়ের দোকান হারিয়ে গেছে, কিন্তু মিলনক্ষেত্র হিসেবে বইমেলা রয়ে গেছে। প্রশ্ন হল, বছরের বাকি সময় বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা নিবিড়। কেবল উৎসব নয়, নৈমিত্তিক পাঠের অভ্যাসই গ্রন্থ-সংস্কৃতির ভিত্তি। মহামারির সময় সমাগম স্তব্ধ হলেও পাঠ থামেনি। মানুষ অপঠিত বইয়ের পাতা উল্টেছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনের প্রকাশ-নিষেধাজ্ঞা-উন্মোচনের ইতিহাস আমাদের শেখায়, বইয়ের ভিতরে গ্রথিত থাকে স্বপ্ন, আশা, উন্মাদনা। বই চাই, বইয়ের সঙ্গে সংলাপ চাই। কারণ, ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে, শব্দই শেষ পর্যন্ত আমাদের একমাত্র নির্ভর।


