ইউক্লিডের Elements
ইউক্লিডের Elements হাতে নিলে আমার মনে হয়, একজন বুড়ো মাস্টারমশাই ক্লাসে ঢুকে বলছেন, “বাবারা, আগে বিন্দু কাকে বলে সেটা বুঝো, তারপর দুনিয়া উদ্ধার করতে যেও।” আমরা তো আজকাল উল্টো পথে চলি। আগে মতামত দিই, পরে প্রমাণ খুঁজি। আগে রায় ঘোষণা করি, পরে সাক্ষী হাজির করি। ফেসবুকে তো আরও সহজ ব্যবস্থা। কারও কথা পছন্দ না হলে লিখে দিলাম, “ভাই, আপনার সোর্স কী?” আর নিজের কথার সোর্স হিসেবে দিলাম নিজের বুকের ভেতরের বজ্রধ্বনি।
ইউক্লিড এইসব বজ্রধ্বনিতে কান দিতেন বলে মনে হয় না। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় বসে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালের দিকে এমন এক বই লিখলেন, যার নাম Elements। বাংলায় বললে, মৌলিক উপাদানসমূহ। নামটা শুনে মনে হতে পারে, গৃহস্থালির বাজারের তালিকা। চাল, ডাল, লবণ, তেল, বিন্দু, রেখা, কোণ। কিন্তু এই সরল জিনিসগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই তিনি জ্যামিতির এমন এক বাড়ি বানালেন, যার বারান্দায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষ দাঁড়িয়ে ভাবছে, যুক্তি জিনিসটা আসলে কীভাবে হাঁটে।
বইটা ১৩ খণ্ডে বিভক্ত। শুরুতেই তিনি বলেন, বিন্দু কী, রেখা কী, সরলরেখা কী, কোণ কী, বৃত্ত কী। তারপর দেন স্বীকার্য, পোস্টুলেট, সাধারণ ধারণা। যেমন, দুটি বিন্দুর মধ্যে একটি সরলরেখা আঁকা যায়। সমান জিনিসের সঙ্গে সমান জিনিস যোগ করলে ফলও সমান হয়। শুনতে একেবারে পাড়ার চায়ের দোকানের হিসাব। কিন্তু এখানেই আসল খেলা। ইউক্লিড বলেন, আমি বড় বড় কথা বলব, কিন্তু প্রতিটি কথা ছোট ছোট দরজার মধ্য দিয়ে যাবে। দরজা খুলতে চাবি লাগবে। সেই চাবির নাম প্রমাণ।
আমি যখন ছোটবেলায় জ্যামিতি পড়তাম, তখন কম্পাস, স্কেল, প্রট্রাক্টর নিয়ে এমন ভাব করতাম যেন অস্ত্রোপচার করতে যাচ্ছি। ত্রিভুজ আঁকতে গিয়ে এক বাহু একটু বেঁকে গেলে মনে হত, জীবন শেষ। স্যার বলতেন, “প্রমাণ কর।” এই “প্রমাণ কর” কথাটা তখন কানে লাগত পুলিশের জেরা করার মতো। কী প্রমাণ করব? চোখে তো দেখছি দুই কোণ সমান। স্যার বলতেন, চোখে দেখলে হবে না, যুক্তি দিয়ে দেখাও। তখন বুঝিনি, জ্যামিতির খাতায় যে বকুনি খাচ্ছি, জীবনেও তার দরকার পড়বে। পরে দেখলাম, সংসার, রাজনীতি, প্রেম, আদালত, সাহিত্য, সব জায়গায় একই প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়: তুমি যা বলছ, তার পা কোথায়?
Elements তাই শুধু ত্রিভুজ-বৃত্তের বই হিসেবে পড়লে তাকে কম সম্মান দেওয়া হয়। এতে আছে সমতল জ্যামিতি, ত্রিভুজ, কোণ, সমান্তরাল রেখা, বৃত্ত। আছে অনুপাত ও সদৃশতা। আছে সংখ্যাতত্ত্বের শুরু, জোড়-বিজোড়, মৌলিক সংখ্যা, গ.সা.গু.-র মতো ধারণা। আছে অমূলদ রাশি, যাদের আমরা সহজ ভগ্নাংশে বেঁধে ফেলতে পারি না। আছে ঘন জ্যামিতি, পিরামিড, শঙ্কু, গোলক-জাতীয় ধারণা, প্লেটোনিক ঘনবস্তু। একেবারে গ্রামের মেলায় যেমন নাগরদোলা, ঝালমুড়ি, বাঁশি, সার্কাস সব থাকে, ইউক্লিডের বইতেও গণিতের সেই প্রাচীন মেলা।
কিন্তু মেলার ভেতরে শৃঙ্খলা আছে। এই শৃঙ্খলাই আমাকে মুগ্ধ করে। ইউক্লিড কোনো জিনিস মুখের জোরে চাপিয়ে দেন না। তিনি বলেন, এইটুকু মেনে নাও, তারপর দেখো কোথায় পৌঁছাই। একটা বিন্দু থেকে আরেকটা বিন্দু, একটা রেখা থেকে একটা ত্রিভুজ, একটা ত্রিভুজ থেকে একটা পৃথিবী। আজকের ভাষায় বললে, তিনি চিন্তার অপারেটিং সিস্টেম বানিয়েছিলেন। অ্যাপ বদলেছে, স্ক্রিন বদলেছে, কিন্তু গভীর ভিতরে সেই পুরোনো লজিক এখনও কাজ করে।
এইখানেই আব্রাহাম লিঙ্কনের একটা গল্প বলি। লিঙ্কনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি ছিল না। তিনি নিজের ঘাটতি জানতেন। এই জানাটাও বড় জিনিস। আমাদের অনেকের ঘাটতি থাকে, কিন্তু আমরা তাকে আত্মবিশ্বাস বলে চালিয়ে দিই। লিঙ্কন আইন পড়তে গিয়ে “demonstrate” শব্দটার কঠোর মানে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। প্রমাণ করা মানে ঠিক কী? কোনো কথা সুন্দর করে বলা? গম্ভীর মুখে বলা? আদালতে দাঁড়িয়ে কোটের বোতাম লাগিয়ে বলা? তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাই তিনি ইউক্লিড পড়লেন।
ভাবুন দৃশ্যটা। ভবিষ্যতের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, রাতের আলো কম, চারপাশে সীমিত সুযোগ, হাতে ইউক্লিড। তিনি রাষ্ট্র চালানোর বই পড়ছেন না, ভোটের কৌশল পড়ছেন না, বক্তৃতার অলংকার পড়ছেন না। তিনি শিখছেন, একটি কথা কীভাবে প্রমাণিত হয়। আমি এই দৃশ্য কল্পনা করলে একটু লজ্জাও পাই। আমরা অনেক সময় ভাবি, বড় চিন্তার জন্য বড় লাইব্রেরি দরকার, বড় ডিগ্রি দরকার, বড় প্রতিষ্ঠান দরকার। লিঙ্কন যেন দূর থেকে বলেন, “আগে মাথার ভেতরে একটা সোজা রেখা আঁকো।”
লিঙ্কন নাকি কংগ্রেসে যাওয়ার পরে ইউক্লিডের প্রথম ছয়টি বই প্রায় আয়ত্ত করেছিলেন। কথাটা শুনে আমার ভেতরের ছাত্র কেঁপে ওঠে। কারণ আমরা প্রথম ছয় অধ্যায় পড়তেই পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় বলে খুশি হতাম। আর ভদ্রলোক প্রেসিডেন্ট হওয়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ইউক্লিড পড়ছেন। তাঁর দরকার ছিল যুক্তির হাড়-মাংস বোঝা। আইনজীবী হিসেবে তিনি জানতেন, আদালতে আবেগ দরকার, ভাষা দরকার, মানুষের মন বোঝা দরকার। কিন্তু যুক্তির ধার না থাকলে তর্ক লাটাইছাড়া ঘুড়ি।
লিঙ্কনের রাজনৈতিক জীবনেও ইউক্লিড ঢুকে পড়েছিল। ১৮৫৮ সালের ডগলাস-বিতর্কে তিনি যে ধরনের কথা বলেছিলেন, তার মর্ম ছিল খুব পরিষ্কার। কোনো জ্যামিতিক উপপাদ্যকে ভুল বলতে হলে ইউক্লিডকে গালি দিলেই হবে না। প্রমাণের ভেতরে কোথায় ত্রুটি আছে, সেটা দেখাতে হবে। আহা, এই কথাটা যদি আমাদের পাড়ার রাজনৈতিক আলোচনায় টাঙিয়ে রাখা যেত! সকালবেলা চায়ের দোকানে একজন বললেন, “ও লোকটা মিথ্যাবাদী।” আরেকজন বললেন, “প্রমাণ?” প্রথমজন বললেন, “আমার মনে হয়।” ব্যাস, ইউক্লিড তখন চুপচাপ উঠে চলে যেতেন।
আমার বয়স যত হচ্ছে, তত বুঝছি, যুক্তি মানে ঠান্ডা মানুষ হওয়া নয়। প্রমাণ মানে হৃদয়হীনতা নয়। বরং প্রমাণ মানুষের প্রতি সম্মান। আমি যখন কাউকে বলি, “তোমার কথার ভিত্তি দেখাও”, আমি তাকে অপমান করছি না। আমি বলছি, তোমার কথাকে গুরুত্ব দিতে চাই, তাই তার ভিত দেখতে চাই। লিঙ্কনও এই জায়গাটা বুঝেছিলেন। দাসপ্রথা, গণতন্ত্র, সংবিধান, মানবসমতা, এইসব বিষয় শুধু আবেগ দিয়ে সামলানো যায় না। আবেগ আগুন জ্বালায়, যুক্তি আগুনের পথ ঠিক করে।
ইউক্লিড আমাকে আরেকটা জিনিস শেখায়: শুরু ছোট হতে পারে, ফল বিশাল হতে পারে। একটি বিন্দু, যার দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই। সেখান থেকে রেখা। রেখা থেকে আকৃতি। আকৃতি থেকে পরিমাপ। পরিমাপ থেকে স্থাপত্য। স্থাপত্য থেকে সভ্যতা। মানুষের চিন্তাও এমন। একটা প্রশ্ন, একটু সংশয়, একটা শব্দের অর্থ না বুঝে ঘুম না আসা। লিঙ্কনের কাছে সেই শব্দ ছিল “demonstrate”। আমার কাছে কখনও “প্রমাণ”, কখনও “ন্যায়”, কখনও “ভালোবাসা”, কখনও “স্বাধীনতা”। আমরা যে শব্দগুলো মুখে বলি, তাদের অনেকেরই ভেতরে ইউক্লিড দরকার।
বইয়ের জ্যামিতি সোজা, জীবনের জ্যামিতি বাঁকা। তবু সোজা রেখার ধারণা না থাকলে বাঁকাটাও বুঝব কীভাবে?
আজ আমরা এমন সময়ে দাড়িয়ে, যেখানে মতামতের গতি প্রমাণের গতির চেয়ে অনেক বেশি। একটা খবর বেরোল, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বাবা আনন্দে মেয়েকে চুমু খাচ্ছেন, ছবিটা দেখলাম, চরিত্র বিচার হয়ে গেল। একটা বক্তৃতা শুনলাম, নেতা মহাপুরুষ। একটা ভুল দেখলাম, মানুষ বাতিল। এই দ্রুত বিচারসভায় ইউক্লিডের দরকার আগের চেয়ে বেশি। তিনি আমাদের ধীর করেন। বলেন, সংজ্ঞা ঠিক করো। কী নিয়ে কথা বলছ? কোন স্বীকার্য মেনে নিচ্ছ? কোন ধাপে এসে তোমার যুক্তি লাফ দিল? কোথায় আবেগ প্রমাণ সেজে বসেছে?
আমি তাই Elements পড়তে চাই শুধু গণিতের জন্য নয়, মাথার ভেতরের আদালত পরিষ্কার করার জন্য। আমার ভেতরেও বিচারক আছে, উকিল আছে, সাক্ষী আছে, আবার এক-আধজন নাটুকে লোকও আছে, যারা সুযোগ পেলেই বলে, “মশাই, নাটক জমাই।” ইউক্লিড এসে তাদের একটু চুপ করান। বলেন, আগে বিন্দু। তারপর রেখা। তারপর প্রমাণ। তারপর রায়।
লিঙ্কনের জীবন আমাকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ নিজের অভাব বুঝে যখন বইয়ের কাছে যায়, তখন বই শিক্ষক হয়ে ওঠে। লিঙ্কন ইউক্লিড পড়ে জ্যামিতিবিদ হননি, কিন্তু তাঁর চিন্তা ধারালো হয়েছে। তাঁর ভাষা মাপা হয়েছে। তাঁর তর্কে কাঠামো এসেছে। তিনি শিখেছেন, সত্যের নামে চিৎকার করা সহজ, সত্যকে প্রমাণ করা কঠিন। এই কঠিন কাজের মধ্যেই সভ্যতার ভরসা।
আমার নিজের জীবনেও যতবার কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত নিশ্চিত হয়ে উঠেছি, ততবার পরে লজ্জা পেয়েছি। নিশ্চিত মানুষ বিপজ্জনক হতে পারে, যদি তার পেছনে প্রমাণ না থাকে। ইউক্লিডের সৌন্দর্য এইখানে। তিনি নিশ্চিত, কিন্তু উদ্ধত নন। তিনি ধীরে হাঁটেন। প্রতিটি ধাপের হিসাব রাখেন। যেন বলছেন, “আমার সঙ্গে এসো, কিন্তু চোখ খোলা রাখো।”
ইউক্লিডের Elements আমার কাছে একটি পুরোনো গণিতগ্রন্থের চেয়ে বেশি কিছু। এটি চিন্তার জিম। এখানে বুদ্ধি হাঁটে, দৌড়ায় না। এখানে কথা সাজে, ফুলে ওঠে না। এখানে প্রমাণের আগে অহংকারের চেয়ার নেই। আর লিঙ্কনকে ভাবলে মনে হয়, একজন মানুষ গরিব শিক্ষা থেকে উঠে এসেও নিজের মাথাকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার আগে সে নিজেকে যুক্তির ছাত্র বানাতে পারে।
আমাদেরও মাঝে মাঝে সেই ছাত্র হওয়া দরকার। কারণ দুনিয়া যতই বদলাক, ভুল যুক্তি এখনও ভুল গেট খুলে দেয়। আর সোজা প্রমাণ, সে যতই পুরোনো হোক, মানুষের মাথায় এখনও বাতি জ্বালায়। ইউক্লিড সেই বাতির পুরোনো কারিগর। লিঙ্কন তার আলোয় নিজের পথ মেপেছিলেন। আমি দূর থেকে তাকিয়ে ভাবি, আহা, জীবনে অন্তত কয়েকটা কথা যদি এমনভাবে বলতে পারতাম, যার পর আর গলার জোর লাগত না, শুধু প্রমাণটাই যথেষ্ট হত।
রিটন খান


