অনুভূতি নিয়ে আমাদের মস্ত বড় একটা গণ্ডগোল আছে। আমরা মনে করি, আবেগ মানেই বুঝি জানালায় বৃষ্টির শব্দ শোনা, বিষণ্ণ সুরে ট্রেনের বাঁশি আর কারও স্মৃতিতে ডুবে যাওয়া। অথচ বিবর্তনের ইতিহাসে আমাদের অনুভূতির দায়িত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি আদিম এবং গুরুতর। কয়েক লক্ষ বছর ধরে সে আমাদের কানে কানে বলে এসেছে— ওদিকের ঝোপে বাঘ আছে, যেও না; লোকটার চাহনি সুবিধার ঠেকছে না; ওই পচা খাবারটা মুখে তুলো না; কিংবা বাচ্চাটা কাঁদছে, ওকে আদর করো। মূলত জীবন বাঁচানোর সংকেতগুলো চিনে নেওয়াই ছিল তার আসল কাজ।
অর্থাৎ আবেগ আমাদের প্রাচীন নিরাপত্তারক্ষী। সমস্যা হচ্ছে, নিরাপত্তারক্ষী মাঝে মাঝে একটু বেশি কর্তব্যপরায়ণ হয়ে পড়ে। রাত তিনটেয় ফ্রিজের কম্প্রেসর চালু হলে সে ধরে নেয় আল-কায়েদা রান্নাঘর দখল করেছে।
ভয়, রাগ, লজ্জা, অপমান, ঈর্ষা, উৎকণ্ঠা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সবকিছুই আমাদের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দেয়। কিন্তু তথ্যদাতা আর বিচারক একই লোক হলে মাঝেমধ্যে কেলেঙ্কারি বাধে।
মনে করুন, নিঝুম অন্ধকারে বারান্দায় কাপড় শুকোতে দিয়েছেন। সেই আঁধারে একটি ধবধবে সাদা চাদর হাওয়ায় অল্প দুলছে। দ্বিপ্রহরের আলোয় একে সাধারণ শয্যাবরণ বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু রাত আড়াইটের নিস্তব্ধতায় ওই একই দৃশ্য দেখে মস্তিষ্ক হয়তো সজোরে সতর্কবার্তা পাঠাবে— প্রেতাত্মা! বিশেষত শৈশবে যদি আপনার ঠাকুমা যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে শাঁকচুন্নি সংক্রান্ত গালগল্প আপনার স্নায়ুর কোষে কোষে গেঁথে দিয়ে থাকেন, তবে ওই নিরীহ কাপড়টিকে ঘিরে আপনার আদিম ভয়ের আর নিস্তার নেই।
কারণ প্রচণ্ড আবেগের সময় আমাদের মাথার কাজের জায়গাটা ভরে যায়।
আমাদের মস্তিষ্ক আদতে এক ব্যস্ত সার্কাস খেলোয়াড়ের মতো। সে হয়তো দক্ষ হাতে কয়েকটা বল সামলাতে পারে, কিন্তু সাত নম্বরটি হাতে নিলেই তালগোল পাকানোর ভয় থাকে। প্রচণ্ড আতঙ্কের মুহূর্তে যখন অসংখ্য চিন্তা—বিপদটা ঠিক কী, পালানোর পথ কোথায়, প্রাণের মায়া আর দরজার খিল—একযোগে মাথায় এসে ভিড় জমায়, তখন যুক্তি সেখানে বড়ই কোণঠাসা। সেই অস্থির সময়ে নির্ভেজাল গাণিতিক বিশ্লেষণ আশা করাটা বাতুলতা মাত্র।
এই কারণেই আতঙ্কে ছোট বিপদ বড় দেখায়। রাগের সময় সামান্য অপমান রাষ্ট্রদ্রোহ বলে মনে হয়। প্রেমে পড়লে যার টাইম ম্যানেজমেন্ট ভয়াবহ, হাস্যরস মাঝারি এবং ধার করা বই ফেরত দেওয়ার ইতিহাস সন্দেহজনক, তাকেও মনে হয় মানবসভ্যতার বহু সহস্রাব্দের বিবর্তন শুধু এই ব্যক্তিটিকে নির্মাণ করার প্রস্তুতি ছিল।
তারপর ছ’মাস পরে ডারউইনের ওপর রাগ হয়।
মস্তিষ্কের ভাষায় ব্যাপারটা আরও মজার। আমাদের কাছে আসা তথ্যের একটা অংশ বিশ্লেষণ, তুলনা, বিচার ইত্যাদির অপেক্ষা না করেই খুব দ্রুত আবেগসংশ্লিষ্ট সিস্টেমে পৌঁছে যায়। কারণ বিবর্তন মানুষের সামনে পরীক্ষার খাতা ধরেনি যে, ‘আপনি প্রথমে সাপটির প্রজাতি নির্ণয় করুন, তারপর দংশনের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিন।’ ঝোপে সরসর শব্দ হল। প্রথম কাজ: লাফ। দ্বিতীয় কাজ: দেখা। তৃতীয় কাজ: আরে ধুর, বিড়াল।
জীবন বাঁচাতে এই ব্যবস্থা চমৎকার। কিন্তু আধুনিক জীবনে ঝোপের সাপের জায়গায় এসেছে বসের ই-মেল, স্ত্রীর গলার স্বর, বন্ধুর ‘ঠিক আছে’ লেখা দু-শব্দের মেসেজ, ব্যাংকের নোটিফিকেশন এবং রাতে সন্তানের ঘর থেকে অস্বাভাবিক নীরবতা।
আমাদের শরীরটা আসলে প্রস্তরযুগের এক সেকেলে সফটওয়্যারের ওপরেই ভর করে চলছে। ধরুন, কোনও মিটিংয়ে কেউ একজন আপনাকে সামান্য একটা পরামর্শ দিল, “এই জায়গাটা একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ো।” সেটুকুই যথেষ্ট। অমনি আপনার অ্যামিগডালা (মস্তিষ্কের গভীরে থাকা বাদাম-আকৃতির সেই অতি-সতর্ক স্নায়ুকেন্দ্র) হয়তো আপনার কানে চিৎকার করে বলবে— চাকরিটা গেল, সংসারটা পথে বসল, ছেলেমেয়েরাও আর আমল দেবে না এবং জীবনের উপান্তে পৌঁছে কোনও এক জীর্ণ বাসস্টপে বসে নিজেকে ধিক্কার দেবেন আপনি। অথচ লোকটা হয়তো স্রেফ একটা কমার ভুল শুধরে দিতে চেয়েছিল।
আবেগের মানচিত্রে এক অদ্ভুত চোরাবালি আছে—অতীতের তিক্ত স্মৃতি। ধরা যাক, স্কুলের দিনগুলোতে এক সহপাঠীর কাছে আপনি নিয়মিত নিগৃহীত হতেন। সেই সময়কার আপনি ছিলেন এক ভীতু, কৃশকায় বালক। অথচ তিন দশক পর আজ আপনি দীর্ঘদেহী, জিম-ফেরত বলিষ্ঠ শরীরের মালিক, আপনার সফল কেরিয়ার আর নিজস্ব অফিস রয়েছে; কেবল বার্ধক্যের আগাম সংকেত হিসেবে হাঁটুর ব্যথার ফিজিওথেরাপি চলে। আচমকা এক গেট-টুগেদারে সেই পুরনো প্রতিপক্ষকে দেখলেন—সে এখন চশমা-পরা এক স্থবির মানুষ, ডায়াবেটিস সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু আপনার স্নায়ুকোষের গভীরে ঘাপটি মেরে থাকা সেই আট বছরের অসহায় সত্তাটি হয়তো এখনও সজোরে চিৎকার করে উঠবে: বিপদ, সাবধান!
বর্তমান বদলেছে। আবেগের পুরনো মানচিত্র বদলায়নি। এই জায়গাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আবেগ মিথ্যা বলছে এমন নয়। সে অতীতের সত্য দিয়ে বর্তমানকে বুঝতে চাইছে। সমস্যা হচ্ছে, পুরনো কলকাতার মানচিত্র হাতে নিয়ে আজকের নিউ টাউনে রাস্তা খুঁজলে শেষে জলাভূমিতে পড়তে পারেন।
মানুষের পুরনো অভ্যাস হল দুটো চরম রাস্তার একটি বেছে নেওয়া। এক দল বলে, আবেগ শুনব। হৃদয়ের কথা শুনব। মন যা বলে তাই করব। এই নীতিতে পৃথিবীতে প্রেম হয়েছে, কবিতা হয়েছে, আবার ভোর চারটেয় প্রাক্তন প্রেমিকাকে চৌত্রিশটি মেসেজও গেছে।
অন্য দল বলে, আবেগ দুর্বলতা। ঠান্ডা মাথায় চলব। তারাও বাড়ি ফিরে স্ত্রী বললেন ‘কিছু হয়নি’ শুনে সত্যিই ধরে নেন কিছু হয়নি এবং দশ মিনিটের মধ্যে বুঝতে পারেন অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যায় দাম্পত্যের জন্য একটি আলাদা অধ্যায় থাকা উচিত ছিল।
এই দুইয়ের মাঝখানের বিদ্যেটার নাম emotional intelligence, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা। এর প্রথম পাঠ অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু আশ্চর্য কঠিন: নিজের অনুভূতির নাম জানা। আমি খারাপ লাগছে বললাম, তাতে খুব বেশি কিছু জানা গেল না। কী খারাপ? রাগ? অপমান? ঈর্ষা? ভয়? অপরাধবোধ? একাকিত্ব? বর্জিত হওয়ার কষ্ট? একেকটির চিকিৎসা একেক।
পেটে ব্যথা হয়েছে বলে ডাক্তার যদি বলেন, ‘হুঁ, শরীর খারাপ’, তারপর বাড়ি পাঠিয়ে দেন, আপনি নিশ্চয় সন্তুষ্ট হবেন না। অথচ নিজের মনের ক্ষেত্রে আমরা সারাদিন এই চিকিৎসাই করি।
‘মুডটা খারাপ।’ কেন? ‘জানি না।’ জানার চেষ্টা করাটাই emotional self-awareness। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজের আবেগ চিহ্নিত করতে খুব অসুবিধা বোধ করে, তাদের মধ্যে আবেগের বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হতে পারে। কারণ যে জিনিসের নামই জানা নেই, তাকে সামলাবেন কী করে?
মনে করুন, রাস্তার উল্টো দিকে আপনার এক অতি পরিচিত বন্ধুকে দেখলেন। তিনি স্রেফ পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন, একটি বাক্যও ব্যয় করলেন না। অমনি আমাদের মস্তিষ্কের ‘উপন্যাস শাখা’ সচল হয়ে উঠবে। হয়তো ভাববেন— লোকটা আমায় অবজ্ঞা করল। কেন? নিশ্চয়ই গত আড্ডার সেই তর্কে তিনি ক্ষুণ্ণ হয়েছেন। কিংবা হয়তো তাঁর নতুন কোনও বৃত্ত তৈরি হয়েছে, তাই পুরনো বন্ধুর আর প্রয়োজন নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আপনি মনে মনে বন্ধুত্বের এক করুণ ময়নাতদন্ত সেরে ফেলবেন। অথচ গল্পের আরও অনেকগুলো খসড়া টেবিলে রাখা যেত। হতে পারে তিনি সত্যিই আপনাকে খেয়াল করেননি। হয়তো মনের গহীনে অন্য কোনও দুশ্চিন্তা কাজ করছিল। কিংবা তাঁর পারিবারিক কোনও সংকট অথবা স্রেফ চশমার পাওয়ার বদলে যাওয়াও এর নেপথ্যে থাকতে পারে। এমনকি আপনার চেহারার বদলও তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারে। অবশ্য এ কথাও সত্য হতে পারে যে, তিনি সচেতনভাবেই আপনাকে এড়িয়ে গিয়েছেন।
Emotional intelligence কোনও একটি মিষ্টি ব্যাখ্যা জোর করে গিলিয়ে দেয় না। সে বলে, রায় দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলো টেবিলে রাখো। মানুষের দুর্ভোগের বড় অংশ ঘটনা থেকে হয়, আর একটা বিরাট অংশ ঘটে ঘটনাটির বিষয়ে আমরা যে উপন্যাস লিখে ফেলি তা থেকে।
ধরুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পেপার লিখতে হবে। বিষয়টা আপনার কাছে এমন বিরক্তিকর যে সূচিপত্র দেখেই মনে হচ্ছে মানবজন্ম বৃথা। এদিকে শহরে চলচ্চিত্র উৎসব চলছে। মন বলছে, ফেলিনি। সিলেবাস বলছে, ফুটনোট।
এখানেই emotional intelligence আপনার হাতে পুলিশি লাঠি তুলে দেবে না। বরং বলে, বিষয়টার মধ্যে নিজের আগ্রহের কোনও অংশ আছে কি না দেখো। কাজটাকে ছোট ভাগে ভাঙো। আনন্দটাকে পুরোপুরি বাতিল না করে একটু পিছিয়ে দাও। আজ তিন ঘণ্টা পেপার। কাল সিনেমা।
এই ক্ষমতার নাম delayed gratification, তাৎক্ষণিক আনন্দকে কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখা।
নিজের মনের খবর রাখা চমৎকার কাজ, তবে ঘর থেকে বেরুলেই বিচিত্র সব মানুষের মেলা। ফলে তাল মেলাতে গেলে আরেকটি বিশেষ বিদ্যে আয়ত্ত করা জরুরি— empathy বা সহমর্মিতা। এই সহমর্মিতা মানে কেবল কারোর দুঃখে গদগদ হওয়া নয়। বরং অন্য এক জন ঠিক কী যন্ত্রণায় ছটফট করছেন কিংবা তাঁর চশমার লেন্স দিয়ে দুনিয়াটা কেমন দেখাচ্ছে, সেই মানচিত্রটা খানিকটা আন্দাজ করে নেওয়ার নামই দক্ষতা। আমরা অবিরত মানুষের চোখের ভাষা, গলার কারুকাজ আর পেশির টান থেকে তথ্যের নুড়ি কুড়োই। ধরুন, উল্টোদিকের মানুষটির মুখ ফ্যাকাশে, চোখের মণি বড় বড় আর তিনি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই দৃশ্য দেখে যদি আপনি মনে করেন লোকটা আদতে ইনকাম ট্যাক্স ফাইল করা নিয়ে চিন্তিত, তবে বুঝতে হবে আপনার সংকেত চিনে নেওয়ার রাডারে বেশ বড়সড় জং ধরেছে।
শরীর কথা বলে। অনেক সময় মুখের ভাষার আগেই। এ ক্ষমতাই সামাজিক জীবনে অমূল্য। ধরুন আপনি ম্যানেজার। একজন কর্মী একই ভুল বারবার করছে। আপনার হাতে দুটি রাস্তা।
এক: ‘আপনার দ্বারা কিছু হবে না।’
দুই: ‘এই রিপোর্টে গত তিনবার একই জায়গায় ভুল হয়েছে। এই অংশটা জমা দেওয়ার আগে আমরা যদি এই চেকলিস্টটা ব্যবহার করি, সমস্যাটা কমবে।’
দুটোতেই সমালোচনা আছে।
কিন্তু প্রথমটি ব্যক্তিকে আক্রমণ করছে, দ্বিতীয়টি আচরণকে।
প্রথমটির পরে লোকটি নিজের সম্মান বাঁচাতে ব্যস্ত হবে। দ্বিতীয়টির পরে হয়তো সমস্যাটা ঠিক করতে পারবে।
মানুষকে অপমান করে সংশোধন করানো যায় কখনও কখনও, কিন্তু তখন সংশোধনের সঙ্গে প্রতিশোধের ইচ্ছাটাও ফ্রি আসে।
কথার খাতিরে আমরা ‘যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক’ আর ‘আবেগপ্রবণ মস্তিষ্ক’—এই দুভাগে দুনিয়াটাকে ভাগ করে ফেলি। অথচ আমাদের করোটির ভেতরে থাকা সেই জাদুকরী যন্ত্রটি মোটেও এমন পরিপাটি করে সাজানো নয় যে, এক কামরায় শুধুই গাণিতিক হিসেব চলে আর অন্যটিতে কেবল কান্নাকাটির আসর বসে। বাস্তবে অসংখ্য নিউরাল নেটওয়ার্ক সারাক্ষণ একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এক জটিল সার্কাস চালিয়ে যায়। আবেগ যেমন চুপিচুপি আমাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে, তেমনই ঠান্ডা মাথার চিন্তাও বুনো আবেগের লাগাম টেনে ধরতে সাহায্য করে।
হঠাৎ এক বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। সেই মুহূর্তে শরীর প্রথমে শিউরে ওঠে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় আর পেশিগুলো টানটান হয়ে আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তার খানিক পরেই মস্তিষ্কের বিচার বিভাগ সচল হয়ে খবর পাঠায়: ভয়ের কিছু নেই, পাশের ঘরে একটা থালা পড়ে গিয়েছে মাত্র। অমনি সেই আদিম সংকেত বদলে যায়—পুরো শরীরে যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা জারি হয়।
মস্তিষ্কের উপরিভাগের উন্নত চিন্তাকেন্দ্র দিয়ে নিজের আদিম সংবেদনশীলতাকে বশ করার এই যে ক্ষমতা, একেই আমরা সুস্থ আত্মনিয়ন্ত্রণের এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি বলতে পারি।
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে গুরুতর ক্ষতি হলে মানুষ কখনও আবেগ বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে অথবা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে অসুবিধা অনুভব করতে পারে। পুরনো লোবোটমি-র ইতিহাস আমাদের এক ভয়াবহ শিক্ষা দিয়েছে: মানুষকে ‘শান্ত’ করা আর তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে সুস্থ রাখা এক ব্যাপার নয়।
আবেগ সরিয়ে দিলে নিখুঁত যুক্তিমান যন্ত্র বেরিয়ে আসে, এমন ধারণাও ভুল। বরং অনেক সিদ্ধান্তের জন্য আবেগ দরকার। কোন জিনিস মূল্যবান, কোন সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কোন ক্ষতি অসহনীয়, এসবের মান নির্ধারণে আবেগ গভীরভাবে জড়িত।
অর্থাৎ মাথা আর মন বহুদিনের বিবাহিত দম্পতি। ঝগড়া করে, কিন্তু আলাদা ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিলে সংসার ভালো চলে না।
দীর্ঘদিন আমরা সাফল্যের ক্ষেত্রে IQ-কে এমন সম্মান দিয়েছি যেন মানুষের ভবিষ্যৎ একটা অঙ্কের নম্বরেই লেখা আছে। কিন্তু বাস্তব জীবন পরীক্ষার হল নয়।
অফিসে আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কিন্তু কেউ আপনার সমালোচনা করলেই তিন দিন কথা বন্ধ রাখেন, সহকর্মীর মুখ দেখে বুঝতে পারেন না সে অপমানিত হয়েছে, মিটিংয়ে সামান্য বিরোধেই চিৎকার করেন, নিজের হতাশায় কাজ ফেলে দেন, তাহলে আপনার IQ একা চাকরিজীবনকে কত দূর ঠেলবে?
Empathy, impulse control, self-regulation, persistence, social skill, এগুলোও শিক্ষা ও কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
একই IQ-র দুই ছাত্রের মধ্যে যে নিজের হতাশা সামলাতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, বন্ধুত্ব বজায় রাখতে পারে, তার হাতে জীবনযাপনের বাড়তি যন্ত্র আছে।
ম্যানেজারের ক্ষেত্রেও তাই।
শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। লোককে সেই সিদ্ধান্তে রাজি করাতে হয়।
সক্রেটিসের সঙ্গে যদি HR department থাকত, তিনিও হয়তো এই সমস্যাটা বুঝতেন।
মানসিক চাপকে আমরা সচরাচর শুধুই মনের কোনো গূঢ় সমস্যা বলে ভুল করি। অথচ আমাদের শরীর কিন্তু মোটেই সে কথায় সায় দেয় না। যদি এই ধকল দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা রক্তের চাপ থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ, ঘুমের ব্যাঘাত, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা হজমপ্রক্রিয়া—সবকিছুর ওপরই বিষম প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচণ্ড রাগের বশে আপনি যাকে কড়া কথা শোনালেন, সে হয়তো কালের নিয়মে তা ভুলে যাবে। কিন্তু আপনার ধমনীগুলো অতটা মহানুভব নয় যে সবকিছু নিঃশব্দে সয়ে নেবে।
তাই ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ, উৎকণ্ঠা সামলানো কিংবা চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কৌশলগুলো কেবল মনের শান্তি নয়, বরং শারীরিক সুস্থতার জন্যও সমান জরুরি। বিশেষত হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে উগ্র মেজাজ ও আবেগের লাগাম টেনে ধরার গুরুত্ব নিয়ে বহু বৈজ্ঞানিক কাটাছেঁড়া হয়েছে।
কাজেই ‘আমার স্বভাবটাই এমন’ বলে বাহাদুরি করার মধ্যে আসলে মস্ত বড় একটা বিপদ লুকিয়ে আছে। আপনার মেজাজ হয়তো আপনার নিজস্ব পরিচয়ের অঙ্গ হতে পারে, কিন্তু আপনার শরীরের রক্তচাপ সেই চারিত্রিক স্বাধীনতার ধার ধারে না।
যে শিশুটি নিজের অন্তরের ক্ষোভ শনাক্ত করতে শেখে না, অবাধ্য আবেগের লাগাম টানতে পারে না কিংবা অন্যের চোখের কোণে জমে থাকা আতঙ্কের রেখাটি পড়তে ব্যর্থ হয়, সামাজিকতার বন্ধুর পথে তার হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক সহিংস কিশোর অপরাধীর স্নায়বিক স্তরেই impulse control এবং অন্যের মুখের ভাব চেনার ক্ষমতার এক ধরনের খরা কাজ করে। এমনকি মাদকের মায়াজালে জড়িয়ে পড়ার নেপথ্যেও এই আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই তত্ত্বে অন্ধভাবে সায় দেওয়ার আগে একটু থামতে হবে।
অপরাধের দায় যদি আমরা স্রেফ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার অভাবে চাপা দিয়ে রাখি, তবে দারিদ্র্যের দহন, পারিবারিক ভাঙন, শৈশবের ট্রমা, শিক্ষার দৈন্য কিংবা সামাজিক অবিচারের মতো গুরুতর বিষয়গুলো আমাদের বিচারসভা থেকে সসম্মানে ছুটি পেয়ে যাবে। মানুষের মনস্তত্ত্ব তো আর একটা মাত্র পেঁচ দিয়ে আটকানো কোনও সাধারণ সিন্দুক নয় যে, তার একটা চাবি ঘোরালেই সব রহস্য উন্মোচিত হবে।
তবু শিশুর বেড়ে ওঠার আবহে আবেগীয় দক্ষতার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কারণ জীবনের একদম শুরুতে শিশু তার অনুভূতির শব্দকোষটি সংগ্রহ করে বড়দের হাত ধরেই। ধরা যাক, একটি শিশু রাগে ফেটে পড়েছে। সেই মুহূর্তে বাবা যদি ধমক দিয়ে বলেন, ‘একেবারে চুপ!’ তবে সেটি হবে এক ধরনের পাঠ। আবার তিনি যদি বলেন, ‘তুমি বোধ হয় খুব রেগে আছ, আমায় খুলে বলো কী হয়েছে,’ তবে তার প্রভাব হবে সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রাগ করার অন্যায্য সুযোগ দেওয়া হল না ঠিকই, কিন্তু রাগ নামক সেই বুনো অনুভূতিটাকে ভাষা দিয়ে চিনিয়ে দেওয়া হল।
যেসব পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠরা নিজেদের আবেগ বুঝতে পারেন, তীব্র কলহের পরেও সম্পর্কের ফাটল জোড়া লাগাতে জানেন কিংবা সন্তানের মনের কথা ধৈর্য ধরে শুনতে পারেন, সেখানে একটি শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দক্ষতা শেখার পথটি অনেক বেশি মসৃণ হয়।
মনে রাখতে হবে, আজকের এই ছোট্ট শিশুটিই আগামীর শিক্ষক, বিচারক, চিকিৎসক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হবে। চার বছরের একটি চঞ্চল শিশুর আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা হয়তো বড়জোর হাত থেকে একটা খেলনা কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু চার দশক পর সেই একই নিয়ন্ত্রণহীন অস্থিরতার হাতে যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিংবা মারণাস্ত্রের কোড চলে আসে, তবে সেই কেলেঙ্কারির দায়ভার বহন করা পৃথিবীর পক্ষে বড়ই কঠিন হবে।
তাহলে প্রশ্ন; emotional intelligence কি শেখা যায়? অনেকটাই যায়।
এই আত্মসচেতনতার যাত্রার শুরুটা হতে পারে নিজের সঙ্গেই একটি মৃদু কথোপকথন দিয়ে। মনে করুন, আপনার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাঁর দাম্পত্য সংকটের কথা বাকি সবার কাছে বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন, অথচ রহস্যজনকভাবে আপনাকে একটি শব্দও জানালেন না। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠছে আপনার।
প্রথম জিজ্ঞাসা: ঠিক কী অনুভূত হচ্ছে এই মুহূর্তে? এক অদ্ভুত বর্জিত হওয়ার যন্ত্রণা।
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা: কেন এমন লাগছে? মস্তিষ্ক ধরে নিয়েছে, বন্ধুত্বের সেই পুরনো শিকড় বোধ হয় আলগা হয়ে গিয়েছে।
তৃতীয় জিজ্ঞাসা: অন্য কোনও পাণ্ডুলিপি কি সম্ভব? হয়তো তিনি ভেবেছেন আপনার ব্যস্ততার ঘেরাটোপে ব্যাঘাত ঘটাবেন না। হয়তো আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে এই পরাজয়ের গল্প বলাটা তাঁর জন্য বড়ই অস্বস্তিকর। কিংবা হয়তো সেই বিশেষ মুহূর্তের ভিড়ে অন্যরা দৈবক্রমে হাজির ছিল।
আবার এ কথাটিও সত্য হতে পারে যে, সম্পর্কে সত্যিই ধুলো জমেছে। এখানে লক্ষ্যটি কিন্তু আত্মপ্রবঞ্চনা নয়। সবই সুন্দর আর কুসুম-কোমল বলে জোর করে হাসার নাম আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা নয়। বরং একমাত্রিক ব্যাখ্যার সেই স্বৈরতন্ত্র চুরমার করাই এর আসল উদ্দেশ্য।
সহমর্মিতার পেশি মজবুত করতে অন্যের শারীরিক সংকেতগুলোর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। মনোবৈজ্ঞানিক কাটাছেঁড়ায় দেখা গেছে, পেশির টান বা মুখের ভঙ্গি কেবল মনের খবর বয়ে আনে না, তা পারস্পরিক স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার ওপরেও ছড়ি ঘোরায়। কারও শক্ত হয়ে যাওয়া শরীর, অনুচ্চ কণ্ঠস্বর কিংবা দ্রুত শ্বাসের উঠানামা—সবই আদতে তথ্যের নুড়ি।
তবে সাবধান, একে যেন গোয়েন্দাগিরিতে পর্যবসিত করবেন না।
কেউ হাত আড়াআড়ি করে বসেছে মানেই তিনি আপনাকে ঘৃণা করছেন—পপুলার সাইকোলজির এই সস্তা জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করলে হিতে বিপরীত হওয়ার ভয় থাকে। হতে পারে লোকটার স্রেফ একটু শীত করছে।
নিজেকে নতুন করে তাতিয়ে তোলার পথে আমরা ব্যর্থতার যে অনুবাদ করি, তার ভূমিকা কিন্তু নেহাত কম নয়। মনে করুন, পরীক্ষার ফলটা আশানুরূপ হল না। এক জন হয়তো হতাশ হয়ে নিজের কপালে ছাপ্পা মেরে দিলেন— ‘আমি আসলে নির্বোধ’। এখানে ব্যর্থতা যেন এক অমোঘ নিয়তি, যা অপরিবর্তনীয় এবং একান্তই ব্যক্তিগত। অন্য এক জন হয়তো ভাবলেন, ‘এই বিশেষ অধ্যায়টিতে আমার দখল কম ছিল, প্রস্তুতির কৌশলে বদল আনা জরুরি’। এখানে সংকটটি চিহ্নিত করা সম্ভব এবং তা সংশোধনের আওতাধীন।
স্বাভাবিকভাবেই, দ্বিতীয় এই পাণ্ডুলিপিটি মানুষকে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ জোগায়। তার মানে এই নয় যে, জগতের সমস্ত না-পাওয়ার দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে কুঁজো হতে হবে। কিছু হারের নেপথ্যে সত্যিই একপেশে নিয়ম কাজ করে। কিছু দুয়ার হয়তো জন্মগতভাবেই রুদ্ধ। কিছু পরীক্ষক সত্যিই অবিবেচক হতে পারেন এবং কিছু কর্মসংস্থানের আসর হয়তো আগেভাগেই সাজানো থাকে।
তবে যেখানে নিজের লড়াইয়ের ব্যাকরণ বদলানোর সামান্যতম সুযোগও অবশিষ্ট আছে, সেখানে ‘আমার দ্বারা হবে না’—এই অকাল বিসর্জন স্রেফ একটি বাক্য নয়, বরং এক ধরনের মানসিক মৃত্যুদণ্ড।
মানুষের সম্পর্কের মানচিত্রে এই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার খেলাটি আরও বেশ চমকপ্রদ। সমাজতত্ত্বের দলিলে একটা কথা প্রায়ই ঘোরে—শৈশব থেকেই মেয়েরা নাকি অনুভূতির ব্যাকরণ পাঠে বেশি অভ্যস্ত, আর ছেলেদের শেখানো হয় কাঠখোট্টা কাঠিন্য দিয়ে দুর্বলতা আড়াল করার পাঠ। তবে একে স্রেফ বিবর্তনের অমোঘ বিধান ভেবে ভুল করবেন না। জগতের সমস্ত মানুষ এক ছাঁচে গড়া নয়, আর লিঙ্গপরিচয়ই সব সময় সংবেদনের শেষ কথা হতে পারে না।
তবু আমাদের চেনাজানা পরিসরে একটা দৃশ্য বড্ড চেনা। এক জন হয়তো বিদীর্ণ মনে বললেন, ‘আজকের দিনটা অফিসে বড়ই দুর্বিষহ কাটল।’ অন্য জন মুহূর্তের বিলম্ব না করে নিদান দিলেন, ‘তবে তো চাকরিটা ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।’ ব্যস, সেখানেই ইতি।
প্রথম জন হয়তো চেয়েছিলেন স্রেফ এক জোড়া মনোযোগী কান, যেখানে তাঁর ক্লান্তির কথাগুলো একটু আশ্রয় পাবে। আর দ্বিতীয় জন ভাবছেন—এ তো অংকের মতো পরিষ্কার সমস্যা, সমাধানের সূত্র ধরিয়ে দিয়েছি, এবার কি তবে পেশাদারি ফি-র দাবি জানাব? আসলে উপদেশের আগে মানুষ অনেক সময় চায় একটু স্বীকৃতি বা validation।
‘খুব কষ্ট হয়েছে তোমার, তাই না?’ এই যৎসামান্য সহমর্মিতা অনেক সময় এক ঝুড়ি গাণিতিক সমাধানের চেয়েও ঢের বেশি শক্তিশালী হতে পারে। কারণ পৃথিবীর সব লড়াই উত্তর খোঁজার জন্য নয়; মাঝে মাঝে মানুষ কেবল এটুকু নিশ্চয়তা চায় যে, তাঁর যন্ত্রণার ঘরটা অন্তত অন্য কারও চোখে ছায়া হয়ে ধরা পড়ছে।
দাম্পত্য কলহ কিংবা যে কোনও তীব্র বিবাদের মুহূর্তে এমন এক সন্ধিক্ষণ আসে, যখন শরীরের প্রতিটি তন্তু আদিম উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে এবং সেখানে যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণের আর তিলমাত্র জায়গা অবশিষ্ট থাকে না।
হৃৎস্পন্দনের গতি তখন উর্ধ্বমুখী। কণ্ঠস্বরে চিল চিৎকার। পেশিতে অবাধ্য কাঁপন। মস্তিষ্কের ধুলো জমা সেলফ থেকে পাঁচ বছরের পুরনো সব অভিযোগের পাণ্ডুলিপি বেরিয়ে এসেছে। সেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ‘এসো ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করি’ বলে ঘোষণা দেওয়াটা দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা ঘরের ভেতর বসে অগ্নি-নিরাপত্তার স্লাইড শো দেখার মতোই হাস্যকর এক নিরর্থক প্রয়াস। সেখানে বিরতি নেওয়াটাই এক মাত্র পথ।
অনেক বিশেষজ্ঞই সেই বিশেষ মুহূর্তে পালস রেট কিংবা শারীরিক উত্তেজনার পারদের দিকে নজর দিতে বলেন; কারণ মূল সূত্রটি অতি সাধারণ—শরীর যখন পূর্ণমাত্রায় রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন সংসদীয় বিতর্কের সেই মার্জিত শিষ্টাচার স্থগিত রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মস্তিষ্কের উত্তাপ একটু থিতিয়ে এলে তবেই ফিরে আসুন। অবশ্য ‘একটু শান্ত হয়ে আসছি’ বলে তিন সপ্তাহের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াকে আর যাই হোক, বিজ্ঞের মতো cooling-off period বলে চালিয়ে দেওয়া চলে না।
কাউকে সংশোধনের পথে চালিত করারও এক নিপুণ শিল্প আছে। সমালোচনা যখন করবেন, তখন অস্পষ্টতার কুয়াশা সরিয়ে নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর আলো ফেলুন। ‘তুমি বড়ই খামখেয়ালি’—এই জাতীয় বাক্য স্রেফ একটা তকমা মাত্র; এমন ঢালাও মন্তব্যে আক্রান্ত মানুষটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠবে।
কিন্তু যদি বলেন, ‘এই প্রতিবেদনের দুটি সংখ্যা যাচাই করা হয়নি,’ তবে তাঁর সামনে ভুল শোধরানোর একটা পরিষ্কার মানচিত্র খুলে যায়। আসল ত্রুটিটি ঠিক কোথায়, সেটি ধৈর্য ধরে চিহ্নিত করুন। ভবিষ্যতে সেই জট কীভাবে খোলা সম্ভব, সেই উপায়ের দিকেও ইঙ্গিত রাখুন। যদি কাজের মধ্যে সামান্যতম আলোর রেখাও দেখতে পান, তবে সেই প্রশংসাটুকু করতে কার্পণ্য করবেন না।
তবে মনে রাখবেন, কৃত্রিম স্তুতির চেয়ে নীরব থাকা ঢের ভালো; মানুষের অনুভূতির রাডার কিন্তু এই জাল সংকেতগুলো খুব দ্রুত ধরে ফেলে। সমালোচনার গূঢ় উদ্দেশ্য যদি কেবল অপরকে খাটো করা হয়, তবে তাকে আর যাই হোক সংশোধন না বলে আধিপত্য বিস্তারের উল্লাস বলাই যুক্তিযুক্ত।
তর্কটা আসলে বহু পুরনো সেই শিকড় নিয়ে। মানুষের করোটির ভেতরে যুক্তি আর আবেগের যে অবিরাম দড়ি টানাটানি, তার ইতিহাস বড্ড প্রাচীন।
প্লেটো থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শন, স্টোইকদের সংযম থেকে স্পিনোজার তত্ত্ব, কিংবা ফ্রয়েড থেকে আজকের আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান—সবাই আসলে একই গোলমেলে চোরাবালির দিকে আঙুল দেখিয়েছেন। প্রশ্নটা অমোঘ: অন্তরের এই যে হঠাৎ জেগে ওঠা তরঙ্গ, তার ওপর কতটা ভরসা রাখা চলে? চিন্তার এই যে বুদবুদ, তার কতটুকুই বা খাঁটি সত্য? ভেতরে যে তীব্র সংকেত আছড়ে পড়ল, সে কি সত্যিই কোনও আসন্ন বিপদের ডঙ্কা, নাকি স্রেফ জং ধরা পুরনো স্মৃতির এক ভুল সংকেত মাত্র?
সহজ কোনও ব্যাকরণ মেনে এর এক রৈখিক সমাধান আজও অধরা। অথচ রাগের একটা প্রয়োজন আছে। এই তেজ না থাকলে অন্যায়ের মুখে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো হয়তো কবেই শুকিয়ে যেত। ভয়েরও দরকার আছে ষোলোআনা। এই সতর্কবার্তা না থাকলে মানুষ হয়তো খাড়া পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার নেশায় নিজের প্রজাতিটিকেই বিবর্তনের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলত। দুঃখবোধও অবান্তর নয়। সে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দেয় কোনও হারানো বস্তুর প্রকৃত মূল্য ঠিক কতখানি।
লজ্জা অনেক সময় সমাজবদ্ধ জীবনের সেই লক্ষ্মণরেখাটি মনে করিয়ে দেয়। এমনকি ঈর্ষার দহনও চুপিচুপি বলে দেয়, আপনার অন্তরের অবদমিত আকাঙ্ক্ষাটি আসলে ঠিক কোন দিকে মুখ করে আছে। কিন্তু এই আদিম অনুভূতির প্রত্যেকের হাতেই যদি শাসনদণ্ড তুলে দেওয়া হয়, তবে কেলেঙ্কারি ঘটতে মুহূর্তকাল সময় লাগবে না।
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার কাজ তাই আবেগকে নির্বাসনে পাঠানো নয়। বরং তাকে বিবেকের কাঠগড়ায় সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করানো, তার জবানবন্দি নেওয়া, পুরনো আমলনামা খতিয়ে দেখা—আর তার পরেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা। ক্রোধ হয়তো কানে কানে ফিসফিস করে বলবে, ‘ওই লোকটা কিন্তু তোমাকে ছোট করার চেষ্টা করেছে।’ ভালো কথা। নোটবইয়ে লিখে রাখলাম। ভয় হয়তো সতর্ক করবে, ‘সামনে মস্ত বিপদ ঘাপটি মেরে আছে।’ বেশ তো। একটু পরখ করে দেখি। ঈর্ষা হয়তো টিপ্পনী কাটবে, ‘ওর ঐশ্বর্য তোমারও তো পাওয়ার কথা ছিল।’ হুম, সত্যিই কি আমার ওটা প্রয়োজন? বিষণ্ণতা স্মরণ করাবে, ‘বস্তুটি তোমার জীবনে সত্যিই অপরিহার্য ছিল।’ সেই সত্যটুকুও হৃদয়ে জমিয়ে রাখলাম।
এর পরেই আসুক আসল সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত। অনুভূতি আর আচরণের মাঝখানের এই যে কয়েক পলকের ব্যবধান, একেই হয়তো সভ্যতার এক মস্ত বড় মাইলফলক বলা যেতে পারে। জঙ্গলের বাঘের সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্য এটাই নয় যে আমাদের রাগ হয় না। আমাদেরও সমান তেজ আছে।
পার্থক্য শুধু এটুকু—রাগের আগুন জ্বলে ওঠার পরে আমরা অন্তত একবার থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে পারি: নখদাঁত বের করাটা কি এই মুহূর্তে সত্যিই খুব প্রয়োজন?


