I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
ছোটবেলায় একটা জিনিস ছিল, নাম ভি.এইচ.এস. ক্যাসেট। এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়তো জিনিসটা চেনেই না। তাদের ধারণা, পৃথিবীর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নেটফ্লিক্সেরও জন্ম হয়েছে। তার আগে মানুষ কী করে সিনেমা দেখত, সেটা তাদের কাছে একটা ঐতিহাসিক রহস্য। যেন ডাইনোসরের পিঠে চড়ে সিনেমা হলে যেতাম।
যাই হোক, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে আমার একটা প্রিয় ভিডিও ক্যাসেট ছিল। ক্যাসেটের শুরুতে অন্য একটা সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখানো হত। সিনেমাটা আমার কাছে ছিল না, কোনওদিন দেখিওনি। কিন্তু বিজ্ঞাপনটা যতবার ক্যাসেট চালিয়েছি, ততবার দেখেছি।
বিজ্ঞাপনটা আমার ভীষণ ভয় লাগত, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে বারবার দেখতাম কেন?
তার কারণ বোধহয় তখনকার দিনে বিজ্ঞাপন স্কিপ করার সংস্কৃতি আমাদের জানা ছিল না। ক্যাসেটের শুরুতে যা থাকত, সেটাকে সিনেমা দেখার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মেনে নিতাম। যেমন আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে কোনও গুরুজন বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলে যতক্ষণ না তিনি নিজে থামতেন, ততক্ষণ শোনার ব্যবস্থা ছিল। মাঝখানে স্কিপ করার চেষ্টা করলে বক্তৃতার সঙ্গে আরও দু-চার ঘা যোগ হত।
বিজ্ঞাপনটা ছিল দুই যমজ বোনকে নিয়ে। একজন অন্যজনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। এমন ঘৃণা যে স্বপ্নে দেখে বেলচা দিয়ে নিজের বোনকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে।
একটা দৃশ্য আজও মনে আছে।
দুই বোন গির্জায় বসে আছে। পাদ্রি প্রচণ্ড গম্ভীর গলায় ঘৃণার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিচ্ছেন। বলছেন, যারা অন্যকে ঘৃণা করে, ঈশ্বর তাদের অভিশাপ দেবেন, অনন্ত অন্ধকারে নিক্ষেপ করবেন। ঠিক তখনই গির্জার রঙিন কাচের জানালাগুলোর ওপর কালো পর্দা নেমে এল। চারদিক অন্ধকার।
দৃশ্যটা দেখে ছোটবেলায় আমার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠেছিল। আজ এত বছর পরেও দৃশ্যটা মনে আছে। কিন্তু এখন মনে হয়, ভয়ের কারণটা ছিল আরও গভীরে।
আলো নিভিয়ে দেওয়া সম্ভব। নিজের হাতেই সম্ভব। বাইরে সূর্য দিব্যি জ্বলছে, অথচ আপনি ঘরের জানালায় পর্দা টেনে বসে আছেন। ধীরে ধীরে অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। তারপর একসময় বিশ্বাস করতে আরম্ভ করলেন, পৃথিবীতে কোনও আলোই নেই।
মানুষের মনের মধ্যেও এরকম পর্দা আছে। কেউ কেউ নিজের অজান্তেই সেই পর্দা নামিয়ে ফেলে। যখন বুঝতে পারে, ততক্ষণে ঘরের আসবাবপত্র পর্যন্ত অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
সেই সিনেমার নাম Jacob Have I Loved। ক্যাথরিন প্যাটারসনের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি। প্যাটারসনকে অনেকে চেনেন তাঁর Bridge to Terabithia বইটির জন্য। শিশু-কিশোরদের জন্য বই লিখতেন বটে, কিন্তু তাঁর বই পড়ে বড়দেরও চোখের জল সামলানো মুশকিল।
সিনেমাটা আর দেখা হয়নি। বহু বছর পরে উপন্যাসটা পড়েছিলাম।
বইটির নাম এসেছে বাইবেলের রোমানদের প্রতি পত্রের নবম অধ্যায় থেকে। সেখানে ঈশ্বরের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমি জ্যাকবকে ভালোবেসেছি, কিন্তু এসাউকে ঘৃণা করেছি।’
ব্যাপারটা ভাবুন তো, এখানে ঘৃণাকারী কোনও সাধারণ মানুষ নন। স্বয়ং ঈশ্বর।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সারা লুইস। তার যমজ বোন ক্যারোলাইন। দুজনের জন্মের ব্যবধান কয়েক মিনিট। কিন্তু ওই কয়েক মিনিটের ব্যবধানই যেন সারা লুইসের জীবনের একমাত্র বিজয়।
সারা নিজেই বলেছে, জন্মের পর ওই কয়েক মিনিটই ছিল তার জীবনের একমাত্র সময়, যখন বাড়ির সমস্ত মানুষের মনোযোগ শুধু তার দিকে ছিল। ক্যারোলাইন জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মনোযোগ চলে গেল।
তারপর থেকে ক্যারোলাইনের রাজত্ব। জন্মের সময় ক্যারোলাইন ছিল দুর্বল, অসুস্থ, তাকে নিয়ে মা-বাবার চিন্তার শেষ নেই। আর সারা? সে দিব্যি সুস্থ। তার জন্য বিশেষ চিন্তার দরকার নেই।
আমাদের সংসারেও ব্যাপারটা দেখা যায়। যে ছেলেটা ভালো আছে, তাকে সবাই বলে, ‘তুই তো ভালোই আছিস।’ আর যে একটু অসুস্থ, তার জন্য বাড়িসুদ্ধ লোক মাথায় করে ঘোরে।
সুস্থ থাকাও যে একটা শাস্তি, সেটা ছোটরা খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে। গল্পের ক্যারোলাইন বড় হতে হতে সুন্দরী হল। তার গানের গলা অসাধারণ। সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সারা লুইসের সেরকম কোনও প্রতিভা নেই। সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতাতেও বোনের পাশে দাঁড়িয়ে বিশেষ সুবিধে করতে পারে না। তাদের বাড়ি একটা ছোট দ্বীপে। মাছ ধরে মানুষের সংসার চলে। দ্বীপটাও আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র যেন প্রতি বছর একটু একটু করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
ক্যারোলাইনের প্রতিভা তাকে সেই দ্বীপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিল। সে সংগীতের শিক্ষা নিতে পারবে, বাইরের জগতে যেতে পারবে। সারা লুইসও দ্বীপ ছাড়তে চায়। কিন্তু তার মনে একটা ধারণা জন্মেছে, ক্যারোলাইন পৃথিবীতে যতটুকু জায়গা দখল করছে, সেই জায়গাটা আসলে তার নিজের পাওয়ার কথা ছিল।
মা-বাবা সারাকে ভালো স্কুলে পড়ানোর চেষ্টার প্রস্তাব দিলেন। সে প্রত্যাখ্যান করল। বাবার মাছ ধরার নৌকায় কাজ করতে আরম্ভ করল।
ক্যারোলাইন শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেকেও বিয়ে করল, যাকে সারা নিজের ভবিষ্যৎ স্বামী বলে ভেবে রেখেছিল। এবার সারার মনে হল, তার জীবনের সর্বনাশ সম্পূর্ণ হয়েছে।
একদিন মাকে চিৎকার করে বলল, সবকিছুই ক্যারোলাইনের জন্য। ক্যারোলাইন অসুস্থ, ক্যারোলাইন সুন্দরী, ক্যারোলাইন প্রতিভাবান। তার মহান প্রতিভা পৃথিবীকে উপহার দেওয়ার জন্য বাড়ির সবাইকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে! সারার অভিযোগের মধ্যে সত্যি ছিল। ক্যারোলাইন বাড়তি যত্ন পেয়েছিল। পরিবারের মনোযোগও অনেক বেশি পেয়েছিল। কিন্তু সারার মনে যে হিসাবটা চলছিল, সেখানে একটা গোলমাল ছিল।
ক্যারোলাইন কিছু পেয়েছে মানেই সারা কিছু হারিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিয়ে ফেলেছিল। আর সেই সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড় করিয়েছিল নিজের গোটা জীবন। সারার আসল বিপদটা এখানেই। সে এতদিন ধরে বোনের জীবন দেখেছে যে নিজের জীবন নিয়ে কী করতে চায়, সেই প্রশ্নটাই আর করেনি। অন্যের ভাগ্যের হিসাব করতে করতে নিজের ভাগ্যের খাতাটা খোলাই হয়নি।
আমাদের দেশে একটা কথা আছে, পরশ্রীকাতরতা। কথাটা ভারিক্কি। কিন্তু রোগটা এতই পরিচিত যে বাঙালির বাড়িতে বাড়িতে এর চিকিৎসাকেন্দ্র খোলা যায়। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, রোগী নিজে কখনও স্বীকার করবে না যে তার অসুখ হয়েছে। সে বলবে, ‘আমি কারও ভালো দেখতে পারি না, এমন কথা কে বলল? আমি তো শুধু সত্যি কথাটা বলছি।’ ব্যস, এই ‘সত্যি কথাটা’ দিয়েই সর্বনাশের শুরু।
দুটো মাছ একসঙ্গে থাকলে দুটো মাছই থাকে। দুটো পাথর পাশাপাশি রাখলেও তাদের সংখ্যা দুই। দুটো কেঁচোকে একসঙ্গে ছেড়ে দিলে অবশ্য কিছুদিন পরে সংখ্যা বাড়তে পারে, সেটা জীববিজ্ঞানের ব্যাপার। কিন্তু দুজন মানুষকে পাশাপাশি রাখলে সেখানে প্রায়ই তৃতীয় একজনের জন্ম হয়। সে আবার অদৃশ্য। আপনি আছেন, আমি আছি, আর আছে কে কার চেয়ে এগিয়ে। আমি এই তৃতীয়জনের নাম দিয়েছি তুলনা।
বাঙালির বিয়েবাড়িতে একবার গেলেই বুঝবেন। এক ভদ্রমহিলা আরেকজনকে বলছেন, ‘বউমার গয়নাগুলো বেশ হয়েছে। তবে আমাদের মেয়ের বিয়েতে এর চেয়ে একটু ভারী গয়না দিয়েছিলাম।’ কথাটা বলার আগে পর্যন্ত বউমার গয়নাগুলো সুন্দরই ছিল। তুলনাটা ঢুকে পড়তেই সৌন্দর্যের সঙ্গে ওজনের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।
হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের The Snow Queen গল্পে কাই নামে একটা ছেলে আছে। একদিন তার চোখে অভিশপ্ত আয়নার একটা টুকরো ঢুকে যায়। তারপর থেকে কাই পৃথিবীটাকে অন্যরকম দেখতে আরম্ভ করে। সুন্দর জিনিসের সৌন্দর্য তার চোখে ছোট হয়ে যায়। কুৎসিত জিনিস আরও কুৎসিত হয়ে ওঠে। মানুষের ভালো গুণগুলো আর দেখতে পায় না। শুধু ত্রুটি চোখে পড়ে।
পরশ্রীকাতরতাও মানুষের চোখে অদৃশ্য কাচের টুকরো ঢুকিয়ে দেয়। ধরুন, আপনার একজন বন্ধু বই লিখেছে। বইটা ভালো হয়েছে। সমালোচকেরা প্রশংসা করছেন। পাঠকেরাও পছন্দ করছেন। আপনি বইটা পড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, খারাপ লেখেনি। তবে লেখাটা খুব অরিজিনাল বলব না।’ কেমন যেন এ আই গন্ধ।
কেন অরিজিনাল নয়?
‘মানে, এই ধরনের লেখা তো অনেকেই লিখেছে।’
আচ্ছা, কারা লিখেছে?
‘সেটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না।’
এই যে মনে পড়ছে না, এটাই সমস্যার জায়গা।
অন্যের সাফল্যের মধ্যে কোনও একটা খুঁত বার করতেই হবে। খুঁত না-পাওয়া গেলে বানাতে হবে। তাতেও না-কুলোলে বলতে হবে, ‘ওর ভাগ্যটা ভালো।’ ভাগ্য ভালো কথাটা অত্যন্ত উপকারী। এতে অন্যের পরিশ্রম স্বীকার করার ঝামেলা থাকে না। আবার নিজের ব্যর্থতার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়।
অ্যান্ডারসেনের অভিশপ্ত আয়নাটার মতোই পরশ্রীকাতর মানুষের বিচারবুদ্ধিকে বিকৃত করে। যে জিনিস তার কাছে আগে ভালো ছিল, অন্যের হাতে পড়ার পর সেই জিনিসই অসহ্য হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে ইংরেজি ভাষার দুটো শব্দ নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার।
Jealousy আর Envy।
আমরা সাধারণ কথাবার্তায় দুটোই ঈর্ষা অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। জেলাসি হচ্ছে নিজের কাছে যা আছে, সেটা হারানোর ভয়। একজন মানুষ তার প্রেমিকাকে ভালোবাসে। প্রেমিকা অন্য একজনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে দেখে তার ভয় হচ্ছে, সম্পর্কটা বুঝি নষ্ট হয়ে যাবে। এটা জেলাসি।
এনভি হচ্ছে অন্যের কাছে যা আছে, সেটা দেখে নিজের মধ্যে অসন্তোষ জন্মানো। কখনও এমনও হয়, জিনিসটা নিজের পাওয়ার চেয়ে অন্যের হাতছাড়া হওয়াটাই বেশি কাম্য হয়ে ওঠে। ধরুন, আপনার বন্ধুর একটা সুন্দর বাড়ি হয়েছে। আপনার নিজের বাড়িও আছে। কিন্তু বন্ধুর বাড়িটা দেখে আপনি আর শান্তি পাচ্ছেন না। আপনি হয়তো মনে মনে ভাবছেন, বাড়িটায় যদি কোনও সমস্যা দেখা দিত! বন্ধুর বাড়ি আপনার হয়ে যাবে, এমন কোনও সম্ভাবনা নেই। তাতে কী? তার সুখটা একটু কমলেই আপনার মনটা হালকা হবে।
শেক্সপিয়ারের Othello নাটকে ওথেলোর সর্বনাশের পেছনে জেলাসির ভূমিকা আছে। আর ইয়াগোর চরিত্রে আমরা এনভির আরও জটিল চেহারা দেখতে পাই। ইয়াগো অন্যের সুখ, সম্মান আর ভালোবাসা সহ্য করতে পারে না। নিজের ভিতরের অসন্তোষকে অন্যের জীবনে ছড়িয়ে দেয়। জেলাসির মধ্যে অন্তত হারানোর একটা বাস্তব আশঙ্কা থাকতে পারে। পরশ্রীকাতরতা অনেক সময় বাস্তবের ধারই ধারে না। আপনি যে জিনিসটা কোনওদিন চাননি, অন্য কেউ সেটা পেয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আপনার মনে হতে পারে, ওই জিনিসটাই আপনার জীবনের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।
এক ভদ্রলোককে চিনতাম, জীবনে কখনও বিদেশ যাওয়ার বিশেষ ইচ্ছে ছিল না। দিব্যি সংসার করছেন, চাকরি করছেন, পুজোর ছুটিতে দিঘা-পুরী যাচ্ছেন। একদিন শুনলেন তাঁর ছোটবেলার বন্ধু আমেরিকায় যাচ্ছে। ব্যস, ভদ্রলোকের শান্তি গেল। এবার তাঁর কাছে আমেরিকা যাওয়া জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করবেন আমেরিকা গিয়ে?’
বললেন, ‘সে দেখা যাবে।’
মানে কোথায় যাবেন, কেন যাবেন, কী করবেন, কিছুই ঠিক নেই। কিন্তু বন্ধুটি গেলে তাঁকেও যেতে হবে।
পরশ্রীকাতরতার এক অদ্ভুত গুণ। নিজের ইচ্ছেটাকেও অন্যের ইচ্ছের অধীন করে ফেলে। আপনি তখন আর নিজের জীবনের পরিচালক নন। পরিচালক অন্য একজন। আপনি কেবল তার ছবিতে এক্সট্রার কাজ করছেন।
উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের The Two Trees কবিতায় একটা আয়নার কথা আছে। সেই আয়না ক্লান্তি, অশান্তি আর বিকৃত চিন্তার প্রতীক। তার ভাঙা ডালের ফাঁক দিয়ে অস্থির চিন্তার দাঁড়কাক উড়ে বেড়ায়।
পরশ্রীকাতরতার আয়নাটাও অনেকটা সেরকম। তবে সাধারণ আত্মমুগ্ধ মানুষের আয়নার সঙ্গে এর একটা পার্থক্য আছে। আত্মমুগ্ধ মানুষ আয়নায় নিজের চেহারা দেখে খুশি হয়। পরশ্রীকাতর মানুষ আয়নায় নিজের চেহারা দেখে অন্যের চেহারার কথা ভাবে। তার চোখে নিজের পরিচয় তৈরি হয় নিজের যা নেই, তার ভিত্তিতে। আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু অমুকের মতো আলোচনা হয়নি। আমার ছেলে ভালো পড়াশোনা করে, কিন্তু পাশের বাড়ির ছেলেটা আরও ভালো। এভাবে নিজের সমস্ত প্রাপ্তিকে অপ্রাপ্তির তালিকায় স্থানান্তরিত করে ফেলা যায়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই তালিকার কোনও শেষ নেই। ধরুন, আপনি যাঁর সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হচ্ছেন, তাঁর সমান সাফল্য পেয়ে গেলেন। তখন কী হবে? কিছুদিন আনন্দ করবেন। তারপর চোখ পড়বে আরও একজনের দিকে। এই নতুন মানুষটি হয়তো আপনার আগের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে।
আবার শুরু হবে তুলনা। মানুষের অন্যান্য অনেক লোভ অন্তত সাময়িকভাবে মেটানো সম্ভব। ক্ষুধা পেলে খেয়ে তৃপ্ত হওয়া যায়। তৃষ্ণা পেলে জল খেয়ে শান্তি পাওয়া যায়। একটা বই পড়ার ইচ্ছে হলে বইটা পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু পরশ্রীকাতরতা এমন এক ক্ষুধা, যার খাদ্যই হচ্ছে অন্যের প্রাপ্তি। খাওয়া শেষ হলেই নতুন ক্ষুধা তৈরি হয়। আর সবচেয়ে বড় বিপদ, যে জিনিসটা নিজের হয়ে গেছে, সেই জিনিসটার আকর্ষণ কমে যায়। যতক্ষণ অন্যের হাতে ছিল, ততক্ষণ সেটার মূল্য ছিল। নিজের হাতে আসামাত্রই বোঝা গেল, জিনিসটা আসলে তেমন কিছু নয়।
এই রোগের একটা মজার উপসর্গ আছে। এমন একজনের কথা শুনলেন যাঁকে আপনি মনে মনে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। তাঁর কোনও একটা বিপদ হয়েছে। খুব বড় বিপদ নয়। ধরুন, বইয়ের প্রকাশনা পিছিয়ে গেছে, চাকরিতে পদোন্নতি আটকে গেছে, কিংবা কোনও পুরস্কারের তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি। খবরটা শুনে আপনার মনের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য একটু আনন্দ হল।
তারপরই নিজেকে ধমক দিলেন।
‘ছি ছি, এ কী ভাবছি!’
আপনি হয়তো সত্যিই চান না লোকটার বড় কোনও ক্ষতি হোক। কিন্তু ওই এক মুহূর্তের আনন্দটাকে অস্বীকার করবেন কী করে? মানুষের মন বড় বিচিত্র। বাইরে আমরা অনেকেই মহানুভবতার পোশাক পরে ঘুরি। ভেতরে মাঝে মাঝে এমন সব চিন্তা মাথা তোলে যে নিজের কাছেই লজ্জা লাগে। অবশ্য মনে কোনও অনুভূতি হঠাৎ জন্মানো আর সেই অনুভূতিকে যত্ন করে বড় করে তোলা এক ব্যাপার নয়। প্রথমটা অনেক সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দ্বিতীয়টার জন্য দায় আমাদেরই।
আপনি কারও সাফল্যে এক মুহূর্তের জন্য কষ্ট পেতে পারেন। সেটা নিয়ে নিজেকে সারাদিন দোষারোপ করার দরকার নেই। কিন্তু সেই কষ্টকে যুক্তি দিয়ে, গল্প বানিয়ে, নিন্দা করে, প্রতিদিন জলসেচ করে বড় করতে থাকলে একদিন দেখবেন, আপনার নিজের মনেই একটা বিষবৃক্ষ জন্মেছে। তার ছায়ায় বসে আরাম পাওয়া যায় না।
এবার ভাইবোনের কথায় আসি। পরশ্রীকাতরতার ইতিহাস লিখতে গেলে ভাইবোনদের একটা আলাদা অধ্যায় রাখতে হবে। কারণ ভাইবোনের মধ্যে তুলনা করার সুযোগ প্রচুর। একই বাবা, একই মা, একই বাড়ি, অনেকটা একই পরিবেশ। অথচ একজনের জীবন অন্যজনের চেয়ে অনেক ভালো হতে পারে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, ও পারল, আমি পারলাম না কেন? আমাদের পরিবারে ছোটবেলা থেকেই তুলনার একটা প্রতিষ্ঠান চালু থাকে।
‘দেখ, তোর দাদা কত ভালো রেজাল্ট করেছে।’
‘দেখ, তোর বোন কত সুন্দর গান গায়।’
‘তোর মামাতো ভাইটা কত ভদ্র, আর তুই সারাদিন বাঁদরামি করিস।’
এখন বাঁদরামি করারও তো একটা প্রতিভা লাগে। কিন্তু সেই প্রতিভার কোনও স্বীকৃতি নেই।
বাড়ির বড়দের ধারণা, তুলনা করলে ছেলেমেয়েরা উৎসাহ পাবে। কখনও পায়ও। কিন্তু অনেক সময় তুলনাটা শিশুর মনে এমনভাবে বসে যায় যে সে বড় হয়ে নিজের মূল্য বোঝার জন্য সারাজীবন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বাইবেলের প্রথম দিকের গল্পগুলো দেখুন।
কেইন আর আবেল। জোসেফ আর তার ভাইয়েরা। বড় ছেলে আর ঘরে ফিরে আসা উড়নচণ্ডী ছোট ছেলের গল্প। এই সব গল্পে ভাইবোনের সম্পর্কের মধ্যে স্বীকৃতি, ভালোবাসা, সম্পত্তি আর ঈর্ষা ঘুরেফিরে এসেছে। কেইন নিজের ভাই আবেলকে হত্যা করে। কারণ ঈশ্বর আবেলের উৎসর্গ গ্রহণ করেছেন, তারটা করেননি। জোসেফের ভাইয়েরা তাকে ঘৃণা করে। বাবার বিশেষ স্নেহ আর জোসেফের স্বপ্ন তাদের অসহ্য লাগে। শেষ পর্যন্ত ভাইকে বিক্রি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
আরেক গল্পে ছোট ছেলে নিজের সম্পত্তি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যায়, সব উড়িয়ে ফিরে এসে বাবার ভালোবাসা পায়। বড় ছেলে এতদিন বাড়িতে থেকে দায়িত্ব পালন করেছে। সে দেখে, যে ভাই সব নষ্ট করে এসেছে, তার জন্যই উৎসব হচ্ছে। বড় ছেলের রাগ কি একেবারে অযৌক্তিক? সেটাও বলা মুশকিল।
কারণ মানুষের মনে ন্যায্যতার একটা ধারণা থাকে। কে কতটা পরিশ্রম করল, কে কতটা দায়িত্ব পালন করল, তার ভিত্তিতে কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়।কিন্তু সেই প্রত্যাশা যখন অন্যের সুখের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সমস্যা।
ইংরেজি লোকগাথা The Two Sisters-এ বড় বোন ছোট বোনকে হত্যা করে। কারণ ছোট বোন সেই পুরুষের ভালোবাসা পেয়েছে, যাকে বড় বোন নিজে চেয়েছিল। ভেবে দেখুন, ভালোবাসা না-পাওয়ার কষ্ট থেকে মানুষ হত্যার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এখানেই পরশ্রীকাতরতার ভয়ংকর চেহারা। কখনও কখনও এমন জিনিসও ঈর্ষার বিষয় হয়ে ওঠে, যা সাধারণ বিচারবুদ্ধিতে কোনও মানুষের কাম্য হওয়ার কথা নয়।
স্টিভেন স্টেইনারের ঘটনা মনে করুন।১৯৭২ সালে সাত বছর বয়সী স্টিভেনকে অপহরণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছর সে অপহরণকারীর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পরে পালিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। তার জীবন নিয়ে ১৯৮৯ সালে I Know My First Name Is Steven নামে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র তৈরি হয়।
স্টিভেনের বড় ভাই ক্যারি স্টেইনার পরবর্তী জীবনে ইয়োসেমিটি অঞ্চলে একাধিক নারীকে হত্যা করে। ধরা পড়ার পর নিজের অপরাধ নিয়েও চলচ্চিত্র হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
দুই ভাইয়ের জীবন নিয়ে আলোচনায় একটা অস্বস্তিকর বিষয় উঠে এসেছে। স্টিভেনের অপহরণ, নির্যাতন এবং ফিরে আসার ঘটনায় যে বিপুল জনমনোযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, ক্যারি সেই মনোযোগকে ঈর্ষা করত।
একবার ভেবে দেখুন। একটা শিশু সাত বছর ধরে কী ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্যে কাটিয়েছে। একজন মানুষ সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে নিজের ভাইয়ের পাওয়া খ্যাতি আর মনোযোগ খুঁজে পাচ্ছে!
অবশ্য ক্যারির অপরাধপ্রবণতার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এই ঈর্ষার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের সহিংস আচরণের পেছনে বহু জটিল কারণ থাকে। কিন্তু ঘটনাটা দেখায়, স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষুধা কখনও কখনও মানুষের বিচারবুদ্ধিকে কতখানি বিকৃত করতে পারে।
আমাদের সাধারণ জীবনে এরকম চরম ঘটনা ঘটে না। কিন্তু একই মানসিকতার ছোট ছোট চেহারা প্রায়ই দেখা যায়। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আত্মীয়স্বজন দেখতে যাচ্ছে, খবর নিচ্ছে। আরেকজন মনে মনে ভাবছেন, ‘ওর জন্য এত লোক ছুটে যাচ্ছে, আমার অসুখ হলে কে যাবে?’ অসুস্থ মানুষের প্রতি সহানুভূতির মধ্যেও নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব ঢুকে গেল। এই হিসাবের খাতা নিয়ে বেঁচে থাকা বড় ক্লান্তিকর ব্যাপার।
এবার জ্যাকব আর এসাউয়ের গল্পটা দেখা যাক। বাইবেলের এই দুই ভাইও যমজ। এসাউ বড়, জ্যাকব ছোট। প্রাচীন সমাজে বড় ছেলের জন্মগত অধিকার ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাধিকার, পরিবারের নেতৃত্ব, বাবার আশীর্বাদ, এসবের সঙ্গে বড় ছেলের একটা বিশেষ মর্যাদা জড়িত ছিল। জ্যাকব সেই অধিকার চায়। সে সুযোগ বুঝে ক্ষুধার্ত এসাউয়ের কাছ থেকে এক বাটি খাবারের বিনিময়ে জন্মগত অধিকার আদায় করে নেয়। পরে বাবার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য ছলনারও আশ্রয় নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জ্যাকবের এই আচরণের পরেও বাইবেলের কাহিনিতে সে ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ পায়।
এখানেই সারা লুইসের প্রশ্ন। জ্যাকবকে ঈশ্বর ভালোবাসেন, এসাউকে ঘৃণা করেন কেন? সারা যখন এই কথাটা পড়ে, তখন নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। তার মনে হয়, ঈশ্বরও যেন ক্যারোলাইনকে বেছে নিয়েছেন। আর তাকে জন্ম থেকেই অবহেলার জন্য রেখে দিয়েছেন।
বাইবেলের রোমানদের প্রতি পত্রে আরও বলা হয়েছে, ঈশ্বর যাকে ইচ্ছা করুণা করেন, আর যাকে ইচ্ছা কঠিন হৃদয়ের মানুষ হতে দেন। সারা এই কথার মধ্যে নিজের জন্য কোনও আশার আলো খুঁজে পায় না। সে ভাবে, ঈশ্বর যদি নিজেই আমাকে ঘৃণা করেন, তাহলে চেষ্টা করে লাভ কী? আমার হৃদয় যদি কঠিন হয়ে থাকে, সেটাও তো তাঁরই ইচ্ছা!
ধর্মতত্ত্ববিদেরা যুগের পর যুগ এই কথাগুলোর নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ঈশ্বরের নির্বাচন, অনুগ্রহ, পূর্বনির্ধারণ, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে বিস্তর তর্ক হয়েছে। কিন্তু একজন অবহেলিত কিশোরীর কাছে এসব ব্যাখ্যার বিশেষ মূল্য থাকে না। সে খুব সহজ একটা প্রশ্নের উত্তর চায়। আমার বোনকে সবাই ভালোবাসে, আমাকে কেন বাসে না?
এই প্রশ্নের মধ্যে মানুষের একটা গভীর আকাঙ্ক্ষা আছে। আমরা সবাই চাই, আমাদের জীবনের একটা আলাদা মূল্য থাকুক। কিন্তু জ্যাকব আর এসাউয়ের গল্পে আরও একটা দিক আছে।
এসাউ তার জন্মগত অধিকারকে খুব সহজে পাওয়া একটা জিনিস বলে ধরে নিয়েছিল। সেই অধিকারের মূল্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিল না। জ্যাকব ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ক্ষুধার্ত, কৌশলী। সে যা চেয়েছে, সেটা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে, কখনও অন্যায় পথেও গেছে। পরবর্তী কাহিনিতে জ্যাকব এক রহস্যময় সত্তার সঙ্গে সারা রাত কুস্তি করে আশীর্বাদ দাবি করে। তার চরিত্রের এই জেদ, এই চাওয়া, এই সংগ্রাম লক্ষ করার মতো।
এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পরশ্রীকাতরতা মানুষকে প্রায়ই একই জায়গায় আটকে রাখে। অন্যের যা আছে, সেটা নিয়ে এত চিন্তা করে যে নিজের জন্য কোনও উদ্যোগ নিতে পারে না। এসাউ নিজের প্রাপ্তিকে অবহেলা করেছে। জ্যাকব নিজের চাওয়ার জন্য লড়েছে, যদিও তার কাজের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
আর সারা লুইস? সে নিজের চাওয়াটাই ঠিক করতে পারেনি। বোনের জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত যে নিজের জীবনের দিকে তাকানোর অবকাশ পায়নি। আমাদের অনেকের অবস্থাও এরকম। অমুকের পদোন্নতি হয়েছে, তমুকের বই বেরিয়েছে, আরেকজন বিদেশে চলে গেছে। এসব খবর আমাদের মুখস্থ। কিন্তু নিজের জীবনে আগামী পাঁচ বছরে কী করতে চাই, সেই প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারি না। অন্যের জীবনের ইতিহাসবিদ হয়ে গেছি, নিজের জীবনের পরিকল্পনাকারী হতে পারিনি।
এবার একটু বর্তমান যুগে ফিরে আসি। আগেকার দিনে পরশ্রীকাতরতার প্রধান বাহন ছিল পাড়ার আড্ডা, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, বিয়েবাড়ি আর বাজারের চায়ের দোকান। এখন প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। মানুষের ঈর্ষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিরাট বিরাট কোম্পানি তৈরি হয়েছে। তাদের কর্মচারী আছে, অ্যালগরিদম আছে, বিজ্ঞাপন বিভাগ আছে, গবেষণা আছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই ব্যবসার কাঁচামাল আমরা নিজেরাই সরবরাহ করছি।
বিজ্ঞাপন ব্যবসার একটা বড় অংশ মানুষের অপূর্ণতার অনুভূতিকে কাজে লাগায়। আপনার মনে প্রথমে একটা অভাব তৈরি করতে হবে। তারপর সেই অভাব পূরণের জন্য একটা পণ্য বিক্রি করতে হবে। ধরুন, একজন সুদর্শন পুরুষের বিজ্ঞাপন দেখলেন। চমৎকার পোশাক, সুন্দর গাড়ি, পাশে সুন্দরী নারী। বিজ্ঞাপনের শেষে দেখা গেল, ভদ্রলোক একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের সুগন্ধি ব্যবহার করেন।
এবার আপনার মনে প্রশ্ন তৈরি হল, আমার মধ্যে কী নেই? আপনার কাছে গাড়ি আছে, পোশাক আছে, সংসার আছে। কিন্তু ওই বিজ্ঞাপনের লোকটার মতো আকর্ষণীয় লাগছে না নিজেকে। সমস্যার সমাধান বিজ্ঞাপনদাতা আগেই তৈরি করে রেখেছেন। এক বোতল সুগন্ধি কিনুন।
তারপর?
তারপর হয়তো আপনার জীবনে বিশেষ কোনও পরিবর্তন হবে না। কিন্তু কোম্পানির বিক্রি বাড়বে। একসময় শ্যানেলের ১৯ নম্বর সুগন্ধির বিজ্ঞাপনে বুদ্ধিমত্তা, আত্মবিশ্বাস আর নারীত্বের বিশেষ আকর্ষণের কথা বলা হত। কথাগুলো শুনে মনে হয়, একটা সুগন্ধির বোতলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস পর্যন্ত প্যাকেট করে বিক্রি হচ্ছে।
একজন মানুষের আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকলে তার জন্য অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু সুগন্ধির দোকানে গিয়ে আত্মবিশ্বাস কেনার ব্যবস্থা এখনও আমার জানা নেই।
তবু বিজ্ঞাপন কাজ করে। কারণ মানুষ প্রায়ই জিনিসের সঙ্গে একটা জীবনযাত্রা কিনতে চায়। একটা ঘড়ি কেনার সময় শুধু সময় দেখার যন্ত্র কেনে না। সে কল্পনা করে, ঘড়িটা পরলে অন্যেরা তাকে কেমন দেখবে। একটা গাড়ি কেনার সময় শুধু যাতায়াতের সুবিধা কেনে না। গাড়িটার সঙ্গে নিজের সামাজিক মর্যাদার একটা সম্পর্ক তৈরি করে। একটা পোশাক কেনার সময় শুধু শরীর ঢাকার কথা ভাবে না। ভাবে, পোশাকটা পরে অন্যদের সামনে দাঁড়ালে নিজের পরিচয় কেমন হবে। এসব চাওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। মানুষ সৌন্দর্য ভালোবাসে, স্বাচ্ছন্দ্য ভালোবাসে, সামাজিক স্বীকৃতিও চায়। বিপদ তখনই, যখন নিজের জীবনকে অন্যের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন বাজার আপনাকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কারণ আপনি কী চান, সেটা আপনার নিজের কাছেই পরিষ্কার নেই। বিজ্ঞাপনদাতা আপনার হয়ে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে দিচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এই ব্যবসাটাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
আগে বিজ্ঞাপনে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের দেখানো হত। তাঁদের জীবন যে আমাদের জীবনের মতো নয়, সেটা সবাই বুঝতাম। এখন বিজ্ঞাপনের নায়ক আপনার পাশের বাড়ির মানুষ। একজন মহিলা সকালে ঘুম থেকে উঠছেন। পরিপাটি বিছানা, সুন্দর রান্নাঘর, জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। তিনি একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের কফি বানাচ্ছেন। তারপর ইয়োগা করছেন। সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন। দুপুরে স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন। সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছেন। সবকিছু নিখুঁত।
আপনি ভিডিওটা দেখলেন। তারপর নিজের বাড়ির দিকে তাকালেন। বিছানা অগোছালো। রান্নাঘরে বাসন জমে আছে। বাচ্চা স্কুলে যাওয়ার আগে মোজা খুঁজে পাচ্ছে না। স্বামী অফিসের কাজে ব্যস্ত। আপনার নিজের মাথার চুল আঁচড়ানোর সময় নেই। এবার মনে হল, আমার জীবনটা এমন কেন?
যে মহিলার ভিডিও দেখলেন, তিনি হয়তো সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ক্যামেরা বসিয়েছেন। বিছানা গুছিয়েছেন তিনবার। কফির কাপের অবস্থান বদলেছেন পাঁচবার। বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর দৃশ্যটা আবার শুট করেছেন। শেষে ভিডিও এডিট করে এমন একটা সকাল বানিয়েছেন, যা বাস্তবে কোনওদিন ঘটেনি।
আপনি সেই সম্পাদিত সকালটার সঙ্গে নিজের বাস্তব সকালকে তুলনা করছেন। ব্যবসাটা এখানেই । ভিডিওর নিচে লিংক আছে। এই কফি কিনুন। এই কাপ কিনুন। এই বিছানার চাদর কিনুন। এই পোশাক কিনুন। এই প্রসাধনী ব্যবহার করুন। আরও ভালো জীবনযাপনের জন্য এই দশটা জিনিস দরকার।
অথচ যাঁর জীবন দেখে আপনি ঈর্ষান্বিত হচ্ছেন, তিনিও হয়তো আরও বড় কোনও ইনফ্লুয়েন্সারের জীবন দেখে একই অসুখে ভুগছেন। চমৎকার ব্যবস্থা! একজন আরেকজনকে ঈর্ষা করছে, আর মাঝখান থেকে কোম্পানি টাকা রোজগার করছে।
অর্থনীতির ভাষায় একে লাভজনক ব্যবসা বলা যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর মধ্যে সামাজিক তুলনার প্রবণতা কাজ করছে। আমার ভাষায় বললে, মানুষকে নিজের জীবন নিয়ে অখুশি করে পয়সা কামানোর এক অভিনব বন্দোবস্ত।
এখানে আরেকটা মজার ব্যাপার আছে। অনেকেই যে ইনফ্লুয়েন্সারকে সবচেয়ে অপছন্দ করেন, তাঁর ভিডিওই সবচেয়ে বেশি দেখেন। ভিডিও দেখবেন, তারপর মন্তব্য করবেন, ‘মেয়েটাকে একেবারে সহ্য করতে পারি না।’
পরের দিন আবার তাঁর ভিডিও দেখবেন। তারপর লিখবেন, ‘কী ভয়ংকর লোকদেখানো জীবন!’ তৃতীয় দিন দেখবেন, তিনি কোন ব্র্যান্ডের ব্যাগ ব্যবহার করেন। চতুর্থ দিন সেই ব্যাগের দাম খুঁজবেন। পঞ্চম দিন ছাড় পেলে কিনেও ফেলবেন। তাহলে এতদিন যে ঘৃণা করছিলেন, তার ফল কী হল?
যাঁকে অপছন্দ করেন, তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ালেন। তাঁর পণ্য বিক্রিতে সাহায্য করলেন। নিজের সময়ও খরচ করলেন। এই ব্যবসায় আপনার অবদান অসামান্য। আর আপনার লাভ? মনের মধ্যে একটু বেশি অশান্তি।
আমরা এখন এমন একটা সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে মানুষের জীবনের নানা দিক সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়। কতজন অনুসরণ করে, কতজন পছন্দ করে, কতজন মন্তব্য করে, কতজন ভিডিও দেখেছে, কতজন আপনার লেখা শেয়ার করেছে।
আগেকার দিনে একজন লেখক বই লিখে খুশি হতেন। পাঠকেরা পড়ছেন, আলোচনা করছেন, এতেই একটা তৃপ্তি ছিল। এখন লেখক বই প্রকাশ করার পর প্রথমেই দেখেন কতজন লাইক দিয়েছে। দশজন লাইক দিলে মন খারাপ। একশোজন দিলে কিছুটা স্বস্তি। এক হাজার দিলে আনন্দ। কিন্তু পাশের লেখকের পোস্টে দশ হাজার লাইক দেখার পর নিজের এক হাজার লাইকও তুচ্ছ হয়ে গেল। কী অদ্ভুত!
এক হাজার মানুষ আপনার লেখা পছন্দ করেছে। সেই এক হাজার মানুষের ভালোবাসা মুহূর্তের মধ্যে মূল্যহীন হয়ে গেল, কারণ অন্য একজন আরও বেশি পেয়েছে। অবশ্য সংখ্যার ব্যবহার নিজে কোনও অপরাধ নয়। বই কত বিক্রি হল, কত মানুষ পড়ল, কতজন অনুষ্ঠান দেখতে এল, এসব তথ্যের মূল্য আছে।
সমস্যা হচ্ছে, সংখ্যাগুলো যখন মানুষের আত্মসম্মানের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। তখন মানুষ নিজের কাজের মান বিচার করার বদলে অন্যের সংখ্যার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের লেখা ভালো হল কি না, সেটা গৌণ হয়ে যায়। অমুকের চেয়ে বেশি মানুষ পড়েছে কি না, সেটাই প্রধান প্রশ্ন।
এভাবে শিল্প, সাহিত্য, বন্ধুত্ব, প্রেম, এমনকি ব্যক্তিগত সুখও প্রতিযোগিতার বাজারে ঢুকে পড়ে। আর এই প্রতিযোগিতার কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই।
পরশ্রীকাতরতার একটা রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিকও আছে। সমাজে সম্পদ, ক্ষমতা এবং সুযোগের বণ্টন সবসময় সমান হয় না। অনেক মানুষের বঞ্চনা বাস্তব। একজন শ্রমিক বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি পান না। অন্যদিকে কেউ উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হন। এই বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও জরুরি।
কিন্তু এখানে একটা পার্থক্য বুঝতে হবে। কারও প্রাপ্য অধিকার আদায়ের দাবি আর অন্যের প্রাপ্তি নষ্ট করার ইচ্ছা এক জিনিস নয়। ধরুন, একটি অফিসে দুজন কর্মী একই কাজ করেন। একজন বেশি মাইনে পান। অন্যজন জানতে পারলেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে কম মাইনে দেওয়া হচ্ছে। তিনি সমান মাইনের দাবি তুললেন। এটা ন্যায্যতার প্রশ্ন। কিন্তু যদি তিনি বলেন, ‘আমার মাইনে না-বাড়ালেও চলবে, ওরটা কমিয়ে দিন’, তাহলে সেই দাবির মধ্যে ঈর্ষা ঢুকে পড়েছে। এখানেই পরশ্রীকাতরতা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষা ধার করে নিজের কাজ চালায়।
বাইবেলে জুডাসের একটা ঘটনা আছে। যিশুর পায়ে দামি সুগন্ধি তেল ব্যবহারের প্রতিবাদ করে সে প্রশ্ন তোলে, তেলটা বিক্রি করে গরিবদের টাকা দেওয়া হল না কেন? যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। গরিব মানুষের জন্য সম্পদ ব্যয় করার দাবির মধ্যে অন্যায় কিছু নেই।
কিন্তু বাইবেলের বর্ণনায় জুডাসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তার আপত্তির পেছনে দরিদ্রদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ছিল না বলে সেখানে জানানো হয়েছে। মানুষের নৈতিক অবস্থান বিচার করার সময় তাই শুধু বক্তব্য শুনলেই চলে না। বক্তব্যের পেছনের উদ্দেশ্য এবং আচরণের ধারাবাহিকতাও দেখতে হয়।
একজন মানুষ সত্যিই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, নাকি অন্যের ভালো কাজকে ছোট করার জন্য ন্যায়বিচারের ভাষা ব্যবহার করছেন, সেটা বোঝা দরকার। আমাদের সমাজে এরকম ঘটনা প্রচুর।
কেউ একটা স্কুল তৈরি করলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠল, ‘নিজের নাম প্রচারের জন্য করেছেন।’ কেউ গরিবদের সাহায্য করলেন। প্রশ্ন উঠল, ‘ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়ার জন্য করেছেন।’ কেউ কোনও পুরস্কার পেলেন। মন্তব্য এল, ‘ওসব পুরস্কারের পেছনে অনেক রাজনীতি আছে।’
অবশ্য কোনও কাজের সমালোচনা করা যাবে না, এমন কথা নেই। আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে দান করা হয়, পুরস্কারের পেছনে রাজনীতি থাকে, ক্ষমতাবানেরা নিজেদের সুবিধামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। এসবই বাস্তব সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিটি ভালো কাজের পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার একটা অভ্যাসও মানুষের তৈরি হতে পারে। এই অভ্যাস বিচারবুদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলে। তারপর একসময় কেউ ভালো কাজ করলে আনন্দ হয় না। বরং অস্বস্তি হয়। কারণ অন্যের ভালো কাজটাও নিজের নিষ্ক্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এমন অবস্থায় মানুষের সামনে দুটো পথ থাকে। নিজেও ভালো কিছু করার চেষ্টা করা। অথবা অন্যের কাজটাকে ছোট করে নিজের অস্বস্তি কমানো। দ্বিতীয় পথটা সহজ। বিশেষ পরিশ্রম লাগে না। চারটে মন্তব্য করলেই কাজ শেষ।
আবার সারা লুইসের কাছে ফিরে যাই। Jacob Have I Loved উপন্যাসে একটা সময়ে, যখন সারাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, সে নিজের জীবন নিয়ে কী করতে চায়।
খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন। তুমি কী চাও? সারা উত্তর দিতে পারে না। এতদিন সে শুধু ভেবেছে, ক্যারোলাইন কী পেয়েছে। ক্যারোলাইনের সৌন্দর্য আছে, গানের প্রতিভা আছে, পরিবারের ভালোবাসা আছে, দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। সারা এই সমস্ত প্রাপ্তির হিসাব রেখেছে। কিন্তু নিজের জীবনের ইচ্ছেগুলো নিয়ে কখনও বসে ভাবেনি। দ্বীপ ছাড়তে চায়, অথচ সেই ইচ্ছেটাও স্পষ্ট করে প্রকাশ করেনি। মা-বাবা যখন সুযোগ করে দিতে চেয়েছেন, তখন নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপর নিজের সিদ্ধান্তের ফলকে বোনের বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত করেছে। এই উপলব্ধিটা সারার কাছে এক বিরাট ধাক্কা। সে বুঝতে পারে, নিজের জীবনের অনেক দরজা সে নিজেই বন্ধ করে রেখেছে।
এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার। সারার শৈশবে অবহেলার অভিজ্ঞতা সত্যি। তার কষ্টও সত্যি। সেই কষ্টের জন্য পরিবারের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু কষ্টের অভিজ্ঞতা আর সেই কষ্টকে সারাজীবনের একমাত্র পরিচয় বানিয়ে ফেলা আলাদা ব্যাপার। মানুষ নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় মুছে ফেলতে পারে না। কিন্তু সেই অন্যায়কে নিজের সমস্ত ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রক করে রাখবে কি না, সে বিষয়ে অনেক সময় তার কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।
সারা সেই সুযোগটা চিনতে শেখে। একদিনেই তার মন বদলে যায় না। বোনের সঙ্গে সম্পর্কও একেবারে মধুর না হলেও। একটা পরিবর্তন ঘটে। সে প্রথমবার নিজের জীবনের দিকে তাকাতে আরম্ভ করে। এই পরিবর্তনটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরশ্রীকাতরতার চিকিৎসার প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের ইচ্ছেকে অন্যের জীবন থেকে আলাদা করা।
আপনি কী চান? কেন চান? কতদিন ধরে চান? অন্য কেউ ওই জিনিসটা না-পেলেও কি আপনি সেটা চাইতেন? প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তর দেওয়া কঠিন।
ধরুন, আপনার বন্ধু একটা বড় বাড়ি কিনেছে। আপনারও বড় বাড়ি কেনার ইচ্ছে হয়েছে। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, এই বাড়িটা কি আমার সত্যিই দরকার? আমার সংসারের জন্য? আমার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য? আমার ভবিষ্যতের জন্য? নাকি বন্ধুর বাড়ির সামনে নিজের বাড়িটাকে ছোট মনে হচ্ছে বলেই এই ইচ্ছে?
একইভাবে, অন্য একজন লেখক পুরস্কার পেয়েছেন বলে আপনার পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে। প্রশ্ন করুন, আমি কি ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করতে চাই, নাকি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের চেয়ারে বসতে চাই? দুটো ইচ্ছের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এক নয়। ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করার জন্য পরিশ্রম করতে হয়। পড়তে হয়, লিখতে হয়, কাটাকুটি করতে হয়, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হয়।
পুরস্কারের চেয়ারে বসার স্বপ্ন দেখতে বিশেষ পরিশ্রম লাগে না। সেখানে বসে বক্তৃতা দেওয়ার কল্পনাও করা যায়। সমস্যা হচ্ছে, কল্পনায় বক্তৃতা দিতে দিতে আসল পাণ্ডুলিপিটাই লেখা হয় না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী?
অনেকে বলেন, সমস্ত চাওয়া-পাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। অন্যের সঙ্গে তুলনা বন্ধ করতে হবে। নিজের অহংকার বিসর্জন দিতে হবে।
ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে Litany of Humility নামে একটা প্রার্থনা আছে। সেখানে মানুষ নিজের জন্য বিনয় প্রার্থনা করে। প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপমানিত হওয়ার ভয়, অন্যের কাছে বিশেষ মর্যাদা পাওয়ার ইচ্ছা থেকে মুক্তি চায়। এ পর্যন্ত মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু প্রার্থনার পরের অংশটা আরও কঠিন।
সেখানে অন্যেরা নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসা পাক, বেশি সম্মান পাক, বেশি পবিত্র হোক, নিজের আগে অন্যদের নির্বাচন করা হোক, এমন কামনা করার কথা আছে। এবার মুশকিল। আমি বিনয়ী হতে চাই, বেশ কথা। কিন্তু সেই সঙ্গে চাই, আমার কাজের প্রশংসাও হোক।
আমি অহংকার থেকে মুক্তি চাই, কিন্তু আমার বইটা যদি পাঠকেরা অন্য দশজনের বইয়ের চেয়ে একটু বেশি পছন্দ করেন, তাতে আমার বিশেষ আপত্তি নেই। আমি মনে মনে খুব সাধারণ মানুষ হতে রাজি আছি, তবে সমাজে আমার সম্মানটা যেন একটু অসাধারণ থাকে।
এই হচ্ছে আমাদের মনের অবস্থা। বিনয় চাই, সঙ্গে কিছুটা খ্যাতিও চাই। আত্মত্যাগ চাই, তবে আত্মত্যাগের খবরটা লোকজন জানলে মন্দ হয় না।
একজন ভদ্রলোক একবার বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে কোনও স্বীকৃতি চাই না।’ তারপর পাঁচ মিনিট ধরে ব্যাখ্যা করলেন, মানুষ তাঁকে যথেষ্ট স্বীকৃতি দেয় না কেন। আমি শুনে ভাবলাম, স্বীকৃতি না-চাওয়ার জন্যও যদি একটা পুরস্কার থাকত, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই সেটার অন্যতম দাবিদার হতেন।
এখানে আত্মপ্রবঞ্চনার একটা বিপদ হলো, আমরা যদি জোর করে নিজেদের সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করি, তাহলে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক সময় অন্য চেহারায় ফিরে আসে। ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আর কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন না। তারপর দেখলেন, আপনার একজন সহকর্মী পদোন্নতি পেয়েছেন। আপনি তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। মুখে হাসি।
বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে বললেন, ‘দেখলে, আমি কিন্তু ওকে অভিনন্দন জানিয়েছি। আমার মতো উদার মানুষ আজকাল পাওয়া মুশকিল।’
স্ত্রী বললেন, ‘বেশ তো।’
আপনি বললেন, ‘তবে একটা কথা, ওর পদোন্নতিটা একেবারেই প্রাপ্য ছিল না।’
এই হচ্ছে বিপদ।
মুখের হাসির সঙ্গে মনের সংস্কার না-ঘটলে সমস্ত অভিনন্দন জমে জমে ক্ষোভের পাহাড় তৈরি হতে পারে। অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার একটা অভ্যাস তৈরি করতে হয়। এটা সহজাতভাবে সবার মধ্যে সমান থাকে না। তবে চর্চা করা যায়। প্রথমে অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। একজন ভালো লেখক বই প্রকাশ করেছেন। তার মানে আপনার লেখার সম্ভাবনা কমে যায়নি। একজন শিল্পী পুরস্কার পেয়েছেন। তার মানে আপনার শিল্পের মূল্য শূন্য হয়ে যায়নি। একজন বন্ধু সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। তার মানে আপনার জীবনের সমস্ত সম্পর্ক ব্যর্থ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। অন্যের ভালো ঘটনার জন্য নিজের জীবনে জায়গা তৈরি করতে হয়।
সঙ্গে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও ঠিকভাবে বুঝতে হয়। মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা ভালো। আমরা সবাই কিছু করতে চাই, কিছু অর্জন করতে চাই, নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে চাই। সমস্যা তখনই, যখন উচ্চাকাঙ্ক্ষার লক্ষ্য হয় অন্য কাউকে হারানো। কারণ অন্যকে হারানোর আনন্দ খুব অল্প সময় থাকে। নিজের দক্ষতা বাড়ানোর আনন্দ অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ধরুন, দুজন লেখক। একজন প্রতিদিন ভাবছেন, অমুকের বই কত বিক্রি হল, তমুক কোন পত্রিকায় লিখল, আরেকজন কোন পুরস্কারের তালিকায় উঠল। অন্যজন প্রতিদিন পড়ছেন, লিখছেন, নিজের লেখা সংশোধন করছেন। অন্য লেখকদের ভালো বই পড়ে শিখছেন। দুজনেরই হয়তো সাফল্যের ইচ্ছে আছে। কিন্তু প্রথমজনের মনোযোগ অন্যের জীবনে। দ্বিতীয়জনের মনোযোগ নিজের কাজে। পাঁচ বছর পরে কে ভালো লিখবেন, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তবে কে নিজের সময়টা বেশি কাজে লাগালেন, সে বিষয়ে একটা ধারণা করা যায়।
এই প্রসঙ্গে ফরাসি কবি বোদলেয়ারের একটা বিখ্যাত সম্বোধন মনে পড়ে। Hypocrite lecteur, mon semblable, mon frère! অর্থাৎ, হে ভণ্ড পাঠক, আমারই মতো মানুষ, আমার ভাই!
কথাটা বড় মজার। কারণ পরশ্রীকাতরতা নিয়ে এতক্ষণ যা বললাম, তার মধ্যে নিজেকেও বাদ দেওয়ার উপায় নেই। আমরা সবাই কমবেশি এই রোগের অভিজ্ঞতা জানি। কেউ হয়তো প্রকাশ্যে স্বীকার করি, কেউ করি না। কারও সাফল্য দেখে মনে মনে অস্বস্তি হওয়া, নিজের প্রাপ্তিকে ছোট মনে হওয়া, অন্যের ব্যর্থতায় এক মুহূর্তের জন্য আনন্দ পাওয়া, এসব অনুভূতির সঙ্গে মানুষের পরিচয় খুব পুরোনো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্মের বহু আগে থেকেই পরশ্রীকাতরতা ছিল। তখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন ছিল না। কিন্তু পাশের বাড়ির দিকে তাকানোর জন্য দুটো চোখ ছিল। সেই দুটো চোখ দিয়েই যথেষ্ট সর্বনাশ করা যেত।
এখন প্রযুক্তি শুধু চোখের সামনে দৃশ্যের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে পাড়ায় দশজনের সঙ্গে তুলনা করতাম। এখন সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখছেন একজন পাহাড়ে বেড়াচ্ছেন, একজন নতুন গাড়ি কিনেছেন, একজন বই প্রকাশ করেছেন, আরেকজন বিয়ে করেছেন, কেউ বিদেশে চাকরি পেয়েছেন, কেউ সুন্দর বাড়ি বানিয়েছেন।
সবাই যেন জীবনের কোনও না কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। শুধু আপনি বিছানায় বসে চা খাচ্ছেন। চা-টাও ঠান্ডা হয়ে গেছে। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার। আপনি যাদের জীবন দেখছেন, তাদের জীবনের সমস্ত অংশ দেখছেন না। একজনের ভ্রমণের ছবি দেখছেন, তার ঋণের হিসাব দেখছেন না। আরেকজনের সুখী সংসারের ছবি দেখছেন, তাদের ব্যক্তিগত ঝগড়ার খবর জানেন না। একজনের পুরস্কারের ছবি দেখছেন, পুরস্কার পাওয়ার আগের দশ বছরের ব্যর্থতা দেখছেন না। আমরা অন্যের জীবনের নির্বাচিত মুহূর্তগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের প্রতিটি সাধারণ মুহূর্তের তুলনা করি। তারপর সিদ্ধান্ত নিই, নিজের জীবনটা বড়ই অসফল। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিটাই গোলমেলে।
অবশ্য সবাই যে অনলাইনে সাজানো জীবন দেখাচ্ছে, তা-ও নয়। অনেক মানুষের জীবন সত্যিই ভালো চলছে। তাঁরা পরিশ্রম করেছেন, সুযোগ পেয়েছেন, সাফল্য অর্জন করেছেন। সেই সাফল্যকে স্বীকার করতে শেখাও দরকার। কারণ অন্যের ভালো থাকা আপনার বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র নয়। পৃথিবীতে সুখের পরিমাণ এমন কোনও নির্দিষ্ট মাপে বাঁধা নেই যে একজন বেশি পেলে অন্যজনের ভাগ থেকে কেটে নিতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের সাফল্য আমাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। একজন ভালো লেখক জনপ্রিয় হলে সাহিত্যপাঠকের সংখ্যা বাড়তে পারে। একজন ভালো শিক্ষক সফল হলে আরও অনেক ছাত্র উপকৃত হতে পারে। একজন বিজ্ঞানী নতুন আবিষ্কার করলে অন্য গবেষকেরা সেই জ্ঞান ব্যবহার করে আরও এগোতে পারেন। একজন বন্ধু ভালো কিছু শিখলে তাঁর কাছ থেকে আপনিও শিখতে পারেন।
অথচ পরশ্রীকাতর মানুষ এই সম্ভাবনাগুলো দেখতে পায় না। তার চোখে অন্যের সাফল্য একটা ব্যক্তিগত অপমান। এভাবে বেঁচে থাকলে পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট হয়ে যায়। আর নিজের মনটা আরও ছোট।
অনেক বড় লেখা লিখে ফেলেছি, শেষ করার আগে একটা কথা বলি। পরশ্রীকাতরতার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা কী জানেন? এটা ভীষণ একঘেয়ে। একজন মানুষ সারাজীবন ধরে একই কথা বলে যেতে পারে।
‘ও কেন পেল?’
‘আমি কেন পেলাম না?’
‘ওর মধ্যে এমন কী আছে?’
‘আমার চেয়ে ও ভালো কীসে?’
‘সবই ভাগ্য।’
‘সবই যোগাযোগ।’
‘আমাকে কেউ সুযোগ দিল না।’
এই কথাগুলো নিয়ে দশ বছর কাটিয়ে দেওয়া যায়। কুড়ি বছরও কাটিয়ে দেওয়া যায়। আরও বড় বিপদ, এই কথাগুলো বলার জন্য কোনও নতুন অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। যে মানুষটি আজ প্রতিবেশীর গাড়ি দেখে কষ্ট পাচ্ছেন, কাল তিনি সহকর্মীর বাড়ি দেখে কষ্ট পাবেন। পরশু বন্ধুর পদোন্নতি দেখে মন খারাপ করবেন। বিষয় বদলাবে। অভিযোগ একই থাকবে।
ধরুন, মৃত্যুর পরে সত্যিই যদি ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হয়, আর ঈশ্বর আপনাকে একটা বড় পর্দার সামনে বসিয়ে বলেন, ‘এই যে, তোমার জীবনের সমস্ত পরশ্রীকাতরতার মুহূর্তগুলো একসঙ্গে দেখো।’
কী হবে?
প্রথমে হয়তো লজ্জা লাগবে।
তারপর বিরক্তি।
একই মানুষ বারবার বলছে, ‘ও কেন পেল? আমি কেন পেলাম না?’
ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
একই অভিযোগ, একই মুখভঙ্গি, একই হতাশা।
আমার ধারণা, কিছুক্ষণ পরে আপনি নিজেই ঈশ্বরকে বলবেন, ‘প্রভু, একটু বন্ধ করেন। এতক্ষণ নিজের এইসব বকবকানি শুনে আর পারতেসি না।’
ঈশ্বর হয়তো বলবেন, ‘তাহলে এত বছর ধরে এসব ভেবেছ কেন?’
উত্তর দেওয়া কঠিন হবে।
আমরা পরশ্রীকাতরতাকে অনেক সময় অত্যন্ত গুরুগম্ভীর ব্যাপার করে ফেলি। মনে করি, নিজের প্রতি বিরাট অন্যায় হয়েছে। পৃথিবী আমাদের যথাযথ মূল্য দেয়নি। অন্যেরা অন্যায়ভাবে বেশি পেয়ে গেছে। কিন্তু একবার যদি নিজের এই অবিরাম অভিযোগের দিকে একটু দূর থেকে তাকানো যায়, তাহলে অনেক সময় হাসি পায়। ভাবুন তো, পৃথিবীতে কত কিছু করার আছে। কত বই পড়ার আছে, কত গান শোনার আছে, কত জায়গায় যাওয়ার আছে, কত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আছে, কত কিছু শেখার আছে। আর আমরা বসে আছি অমুকের কী আছে, তমুকের কী নেই, তার হিসাব নিয়ে। এই হিসাবের জন্য কতটা সময় খরচ করেছি, সেটা ভাবলেও অবাক লাগে।
জীবন এমনিতেই ছোট। তার ওপর অন্যের জীবন নিয়ে হিসাব করতে করতে নিজের জীবনের অর্ধেকটা নষ্ট করে ফেললে শেষ পর্যন্ত হাতে কী থাকবে? কিছু পুরোনো অভিযোগ। কিছু অসমাপ্ত ইচ্ছে। আর অনেকগুলো মানুষ, যাদের আমরা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলাম, অথচ তারা হয়তো জানতই না যে আমাদের সঙ্গে তাদের কোনও প্রতিযোগিতা চলছে। এটাই সবচেয়ে হাস্যকর।
আপনি একজন মানুষকে প্রতিদিন মনে মনে হারানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর সাফল্যে কষ্ট পাচ্ছেন, ব্যর্থতায় আনন্দ পাচ্ছেন। তিনি এদিকে দিব্যি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আপনার সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ চলছে, অথচ যুদ্ধের খবরটা তাঁর কাছেই পৌঁছায়নি! এর চেয়ে একতরফা যুদ্ধ আর কী হতে পারে?
পরশ্রীকাতরতার বিরুদ্ধে অনেক নৈতিক উপদেশ দেওয়া যায়। ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যায়। দর্শনের বই খুলে বসা যায়। মনোবিজ্ঞানের গবেষণা আলোচনা করা যায়। সবই কাজে লাগতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, মাঝেমধ্যে নিজের এই বোকামিটাকে দেখে একটু হাসতে পারলেও বেশ উপকার হয়। কারণ নিজের অহংকারকে যত বেশি গুরুত্ব দেবেন, সে তত বেশি ফুলে উঠবে। আর নিজের বোকামিটা বুঝে হাসতে পারলে অহংকারের হাওয়া কিছুটা বেরিয়ে যায়।
পরশ্রীকাতরতা হয়তো আবার ফিরে আসবে। পুরোনো অভ্যাস সহজে যায় না। কিন্তু ফিরে এলেই তাকে একটু চিনে নেওয়া যায়। ‘আরে, তুমি আবার এসেছ? সেই পুরোনো হিসাবের খাতা নিয়ে?’ তারপর খাতাটা বন্ধ করে নিজের কাজে ফিরে যাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটা তো নিজেকেই কাটাতে হবে। অন্যের সুখের হিসাব রাখতে রাখতে নিজের সুখটুকু হারিয়ে ফেললে ক্ষতিপূরণ দেবে কে?
আর সেই যে ছোটবেলার গির্জার জানালায় কালো পর্দা নেমে এসেছিল, তার কথাটা মনে রাখবেন। পর্দা নামানোর ক্ষমতা আমাদের আছে। আবার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক সময় আমাদের হাতেই থাকে। বাইরে আলো থাকলে জানালাটা একটু খুলে দেওয়া মন্দ কী? অন্যের বাড়িতে আলো জ্বলছে বলে নিজের ঘরের বাতিটা নিভিয়ে বসে থাকার মধ্যে কোনও বুদ্ধিমত্তা নেই। তাতে বিদ্যুতের বিল কিছুটা কমতে পারে। জীবনের অন্ধকারটা কিন্তু কমবে না।
বন লেকত্যুর!



