মানুষকে ভাগ করা যেতে পারে তাদের দুঃখ দিয়ে
মানুষ প্রথম যেদিন কোনো জিনিসের নাম দিয়েছিল, সেদিনই সে পৃথিবীকে একটু নিজের করে নিয়েছিল। নামহীন পৃথিবী বড় ভয়ংকর। যে বনে প্রতিটি শব্দ অচেনা, প্রতিটি ছায়া রহস্য, প্রতিটি মুখ অনির্দিষ্ট, সেখানে বেঁচে থাকা কঠিন। তাই মানুষ নাম দিয়েছে। গাছকে গাছ বলেছে, নদীকে নদী, শত্রুকে শত্রু, আপনজনকে আপনজন।
সম্ভবত আমাদের চেতনার জন্মই হয়েছে এই অসীম বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আলাদা করার জন্য। এই মহাবিশ্ব আমাদের সামনে সবকিছু একসঙ্গে ছুড়ে দেয়। আলো, শব্দ, গন্ধ, স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, মানুষ, সম্পর্ক, মৃত্যু। আমরা সেই অসীম প্রবাহ থেকে ছোট ছোট টুকরো তুলে নিই, তাদের নাম দিই, বাক্স বানাই, নিয়ম তৈরি করি, তারপর নিজেদের বোঝাই, “এবার বুঝতে পারলাম।”
অবশ্য পুরোপুরি বুঝি না।
কিন্তু মানুষ সম্ভবত একমাত্র প্রাণী যে না বুঝেও বোঝার চেষ্টা করে যায়।
এই চেষ্টার ইতিহাসই অনেকাংশে সভ্যতার ইতিহাস।
আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারাগুলোকে এলোমেলো আলো হিসেবে মেনে নিতে পারিনি। আমরা তাদের রেখা দিয়ে যুক্ত করেছি, নক্ষত্রমণ্ডল বানিয়েছি, গল্প বানিয়েছি। আমরা শব্দকে সাজিয়ে সঙ্গীত বানিয়েছি। প্রকৃতির রহস্য দেখে গণিত তৈরি করেছি। গ্রহের চলাফেরা দেখে নিয়ম আবিষ্কার করেছি। মানুষের একসঙ্গে থাকার জটিলতা থেকে আইন, রাষ্ট্র, গণতন্ত্রের মতো ধারণা তৈরি করেছি।
মানুষের এই শ্রেণিবিন্যাস করার ক্ষমতা আমাদের অনেক দিয়েছে।
আবার অনেক কেড়েও নিয়েছে।
কারণ যে মন জিনিসকে বুঝতে চায়, সেই মন অনেক সময় মানুষকেও জিনিসের মতো সাজিয়ে ফেলতে চায়।
এই মানুষ ধনী। ওই মানুষ গরিব।
এই মানুষ শিক্ষিত। ওই মানুষ অশিক্ষিত।
এই মানুষ আমাদের। ওই মানুষ অন্যদের।
ছোট ছোট বাক্স। সুন্দর সুন্দর লেবেল।
সমস্যা হলো, মানুষ কোনোদিনই কোনো বাক্সের ভেতর পুরোপুরি ধরে না।
একজন মানুষের ভেতর তার পেশার চেয়ে বেশি কিছু থাকে। তার দেশের চেয়ে বেশি কিছু থাকে। তার ধর্ম, ভাষা, রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থানের চেয়েও বেশি কিছু থাকে। কিন্তু আমরা প্রায়ই পুরো মানুষটাকে না দেখে তার গায়ে লাগানো ছোট্ট কাগজটা পড়ে ফেলি।
তারপর ভাবি, মানুষটাকে পড়ে ফেলেছি।
এই ভুলটা আমরা প্রতিদিন করি।
কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে, কখনো সমাজে, কখনো ইতিহাসের ভয়াবহ মুহূর্তে।
মানুষের তৈরি প্রায় সব “বাদ”-এর নিচে এই প্রবণতা কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে। একই ক্ষমতা দিয়ে আমরা বিজ্ঞান বানাই, আবার একই ক্ষমতা দিয়ে ঘৃণার যুক্তিও সাজাই। আমরা শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে লাইব্রেরির বই খুঁজে পাই, আবার মানুষকেও এমনভাবে সাজিয়ে ফেলি যেন তারা বইয়ের তাকের বস্তু।
আজকের পৃথিবীতে এই অভ্যাস আরও অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ, অপছন্দ, কেনাকাটা, ছবি দেখা, কোথায় থামলাম, কোথায় স্ক্রল করলাম, সবকিছু মেপে আমাদের একটা সংখ্যায় পরিণত করতে চায়।
সে বলে, তুমি এই।
তোমার পছন্দ এই।
তোমার রাগ এই।
তোমার ভয় এই।
তোমার দাম এই।
অথচ মানুষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলো অনেক সময় মাপার বাইরে থেকে যায়।
একজন মানুষ কেন কোনো পুরোনো গান শুনে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, কেন ত্রিশ বছর আগের একটা বিকেলের কথা মনে পড়ে, কেন কোনো মৃত মানুষের পুরোনো হাতের লেখা দেখে বুকের ভেতর একটু ভারী লাগে, এগুলোর হিসাব কোনো সহজ সূত্রে মেলে না।
১৮৩৬ সালের শরতে নাথানিয়েল হথর্ন তাঁর নোটবুকে মানুষের জন্য আরেক ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের কথা ভেবেছিলেন।
বড় অদ্ভুত এবং সুন্দর চিন্তা।
তিনি বলেছিলেন, মানুষকে যদি ভাগ করতেই হয়, তাহলে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু দিয়ে কেন?
মানুষকে ভাগ করা যেতে পারে তাদের দুঃখ দিয়ে।
যারা প্রিয়জন হারিয়েছে, তারা একই শ্রেণির মানুষ। একজন হয়তো বিশাল বাড়ির নরম ঘরে বসে কাঁদছে, আরেকজন হয়তো ছোট্ট ঘরের অন্ধকার কোণে। কিন্তু হারানোর মুহূর্তে তাদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য আত্মীয়তা তৈরি হয়।
মানুষকে ভাগ করা যেতে পারে তাদের অসুখ দিয়ে।
যে মানুষ দামি বিছানায় শুয়ে অসুস্থ, আর যে হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে পড়ে আছে, শরীরের দুর্বলতার কাছে তারা একই পরিবারের সদস্য।
মানুষকে ভাগ করা যেতে পারে তাদের ভুল দিয়ে।
কারও ভুল পৃথিবী জেনে গেছে, তাই সে শাস্তি পাচ্ছে। কারও ভুল সুন্দর পোশাকের নিচে লুকানো, তাই সে সম্মান নিয়ে হাঁটছে। কিন্তু নিজের ভেতরে মানুষ প্রায় সবাই কোনো না কোনো অনুশোচনার ভার বহন করে।
শেষ পর্যন্ত হথর্ন মনে করিয়ে দেন, দুঃখ, ভুল, অসুখ থেকে কেউ যদি কোনোভাবে বেঁচেও যায়, মৃত্যু একদিন সবাইকে একই দরজা দিয়ে নিয়ে যাবে।
কঠিন কথা। কিন্তু সান্ত্বনাদায়কও।
কারণ জীবনের গভীরে গিয়ে দেখলে আমরা যতটা আলাদা ভাবি, সম্ভবত ততটা আলাদা নই।
আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিরাপদ হতে চাই। আমরা সবাই এমন কিছু খুঁজি যা হারিয়ে যাবে জেনেও ভালোবাসার যোগ্য।
হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় জ্ঞান মাঝে মাঝে নিজের বানানো শ্রেণির দেয়াল একটু সরিয়ে দেখে নেওয়া, ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সেও আমাদের মতোই একদিন ভয় পেয়েছে, ভালোবেসেছে, ভুল করেছে, কাউকে হারিয়েছে।
এবং সেও, আমাদের মতোই, এই বিশাল অজানা পৃথিবীর মধ্যে একটু জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।
রিটন খান



