আমেরিকার মাঠে গোলের অভাব
আন্তর্জাতিক খেলাধুলার মঞ্চে আমেরিকার ইতিহাস দেখলে একটা বৈপরীত্য চোখে পড়ে। অলিম্পিকের দৌড়ের ট্র্যাক থেকে শুরু করে সুইমিং পুল, বাস্কেটবল কোর্ট থেকে জিমন্যাস্টিকসের ম্যাট, প্রায় সব জায়গায় আঙ্কেল স্যামের পতাকা কোনো না কোনো সময় উঁচুতে উঠেছে। পদক তালিকায় আমেরিকার নাম থাকে উপরের দিকে, তাদের অ্যাথলেটদের নিয়ে তৈরি হয় বিজ্ঞাপন, সিনেমা, কিংবদন্তি। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার মাঠে এসে সেই একই দেশ বারবার আটকে যায়।
ফুটবল, যাকে আমেরিকানরা বলে সকার।
বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিতে শীর্ষে থাকা দেশ, যেখানে খেলাধুলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পেশাদার পর্যায় পর্যন্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা আছে, সেই দেশ এখনো পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এমনকি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শক্তিগুলোর তালিকায়ও আমেরিকার নাম সাধারণত আসে না। এত মানুষ, এত টাকা, এত প্রযুক্তি, এত স্পোর্টস সায়েন্স থাকার পরেও সমস্যা কোথায়?
উত্তরটা শুধু মাঠের নব্বই মিনিটের মধ্যে নেই। এর পেছনে আছে সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, শৈশব, পাড়ার মাঠ, টেলিভিশনের পর্দা, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত, কলেজের স্কলারশিপ, আর একটা দেশের বহু বছরের খেলাধুলার অভ্যাস।
বহু বছর ধরে আমেরিকায় সকার (ফুটবল) ছিল ঘরের সবচেয়ে ছোট সন্তানের মতো। ফুটবল বলতে আমেরিকানদের চোখে ভেসে উঠত হেলমেট পরা এনএফএলের খেলোয়াড়, বাস্কেটবল মানে এনবিএর তারকারা, গ্রীষ্মের বিকেল মানে বেসবল স্টেডিয়ামের আলো। ছোটবেলার সবচেয়ে শক্তিশালী, দ্রুততম, প্রতিভাবান ছেলেদের বড় একটা অংশ চলে যেত এই তিন খেলায়।
একটা বাচ্চা যদি টেক্সাসের কোনো শহরে জন্মায়, তার শরীর বড়, গতি ভালো, হাত শক্ত, তাহলে ছোটবেলা থেকেই তার সামনে খুলে যায় আমেরিকান ফুটবলের রাস্তা। নিউ ইয়র্ক বা শিকাগোর কোনো পাড়ায় অসাধারণ অ্যাথলেটিক একটা ছেলে হয়তো বাস্কেটবল কোর্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। বেসবলের নিজস্ব এক শত বছরের সংস্কৃতি আছে। বাবারা ছেলেদের নিয়ে যায় খেলা দেখতে, পুরোনো গ্লাভস হাতে তুলে দেয়, পারিবারিক স্মৃতির অংশ হয়ে যায় খেলা।
সকার দীর্ঘদিন সেই জায়গাটা পায়নি।
একটা ব্রাজিলিয়ান শিশুর জন্য বল পায়ে নেওয়া যতটা স্বাভাবিক, একটা আর্জেন্টাইন ছেলের জন্য মেসির গল্প শুনে বড় হওয়া যতটা সাধারণ, একটা ইংরেজ শিশুর জন্য স্থানীয় ক্লাবের জার্সি পরে মাঠে যাওয়া যতটা পরিচয়ের অংশ, আমেরিকায় সকার বহু বছর ছিল অনেকটা স্কুলের পরের একটা কার্যক্রম। খেলা শেষ, গাড়ি এসে নিয়ে গেল, বাসায় ফেরা।
কিন্তু ছবিটা বদলাচ্ছে। গত কয়েক দশকে আমেরিকায় সকারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল দেখে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিশ্বকাপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের ঘরে ঢুকে গেছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর হিসাব অনুযায়ী জনপ্রিয়তার দিক থেকে সকার সম্প্রতি বেসবলকেও ছাড়িয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা বাড়া আর বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা তৈরি হওয়া একই জিনিস নয়।
এখানেই আসে দ্বিতীয় সমস্যা। ফুটবল প্রতিভা তৈরির কারখানা। বিশ্বের বড় ফুটবল দেশগুলোতে খেলোয়াড় তৈরির একটা গভীর শিকড় আছে। ইউরোপের ক্লাব একাডেমি, দক্ষিণ আমেরিকার পাড়ার ফুটবল সংস্কৃতি, ছোট বয়স থেকেই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, কোচিং, স্কাউটিং, সবকিছু একটা ধারাবাহিক ব্যবস্থার মধ্যে চলে।
বার্সেলোনার লা মাসিয়া শুধু একটা ট্রেনিং সেন্টার না, একটা ফুটবল দর্শন তৈরির জায়গা। আয়াক্সের একাডেমি শুধু খেলোয়াড় বানায় না, নির্দিষ্টভাবে চিন্তা করার পদ্ধতি শেখায়। আর্জেন্টিনায় একটা শিশু হয়তো ধুলার মাঠে খেলতে খেলতেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা কোনো ড্রিলে শেখানো কঠিন।
আমেরিকার ব্যবস্থা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। কোথাও স্থানীয় লিগ, কোথাও স্কুল, কোথাও ব্যক্তিগত ক্লাব, কোথাও কলেজ ব্যবস্থা। ইউএস সকারের স্পোর্টিং ডিরেক্টর ম্যাট ক্রকার একবার বলেছিলেন, খেলোয়াড় তৈরির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ হয় এই স্থানীয় পর্যায়ে। অর্থাৎ যে জায়গায় ভবিষ্যতের তারকা তৈরি হওয়ার কথা, সেই জায়গাটাই অনেক সময় অসম, বিচ্ছিন্ন এবং সুযোগের ওপর নির্ভরশীল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটা বিষয়: অর্থ। অনেক দেশে ফুটবল গরিব মানুষের খেলা। একটা বল হলেই শুরু করা যায়। ব্রাজিলের বস্তি, আফ্রিকার রাস্তা, ইউরোপের শ্রমিক এলাকা থেকে খেলোয়াড় উঠে এসেছে কারণ খেলার দরজা খোলা ছিল।
আমেরিকায় দীর্ঘদিন যুব সকারের বড় অংশ ছিল “পে-টু-প্লে” সংস্কৃতির মধ্যে। ভালো ক্লাবে খেলতে হলে টাকা লাগে, ভ্রমণের খরচ লাগে, টুর্নামেন্ট লাগে। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় শিশু হয়তো শুরুতেই বাদ পড়ে যায়। প্রতিভা খুঁজে বের করার বদলে অনেক সময় ব্যবস্থা তাদেরই বেশি সুযোগ দেয়, যাদের পরিবার সেই সুযোগ কিনতে পারে।
তারপর আসে অভিজ্ঞতার প্রশ্ন। বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি হয় বিশ্বমানের চাপের মধ্যে। প্রতি সপ্তাহে যদি একজন খেলোয়াড় বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, গোলকিপারের বিপক্ষে খেলে, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বদলে যায়। খেলার গতি, শরীরের ভাষা পড়া, চাপ সামলানো, বড় ম্যাচের ভয় কাটানো, এসব শুধু অনুশীলনে আসে না।
মেজর লিগ সকার অনেক উন্নতি করেছে। ভালো স্টেডিয়াম হয়েছে, দর্শক বেড়েছে, আন্তর্জাতিক তারকারা এসেছে, একাডেমি শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু ইউরোপের বড় লিগগুলোর সঙ্গে এখনো ব্যবধান আছে। ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্সের ক্লাব ফুটবলে যে প্রতিযোগিতা, যে ঐতিহাসিক চাপ, যে গভীরতা, সেটা কয়েক দশকে তৈরি হয়েছে।
ফুটবল শুধু এগারো জন মানুষের খেলা নয়, অনেক দেশে এটা সামাজিক ভাষা। ইংল্যান্ডে কোনো ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সময় পরিবারের ইতিহাস। আর্জেন্টিনায় ফুটবল রাজনৈতিক আবেগের মতো। ব্রাজিলে সুন্দর ফুটবল জাতীয় পরিচয়ের অংশ। একটা শিশু শুধু খেলা শেখে না, সে গল্প শেখে, স্মৃতি শেখে, আগের প্রজন্মের কান্না আর আনন্দ শেখে।
আমেরিকা এখনো সেই দীর্ঘ স্মৃতি তৈরি করছে। মজার ব্যাপার হলো, একই দেশের নারী দল ঠিক উল্টো গল্প লিখেছে। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হওয়া নারী বিশ্বকাপের নয়টি আসরের মধ্যে চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বহু বছর ধরে তারা ছিল নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি। এর পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, ইতিহাসের একটা বিশেষ বাঁক কাজ করেছে।
১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসে টাইটেল নাইন আইন। এই আইনের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের খেলাধুলায় বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে। কলেজগুলো নারী অ্যাথলেটদের সুযোগ দিতে বাধ্য হয়। সকার স্কলারশিপ তৈরি হয়। মেয়েরা ছোটবেলা থেকে সংগঠিতভাবে খেলার সুযোগ পায়।
সেই সময় পৃথিবীর অনেক দেশে মেয়েদের ফুটবল এখনো অবহেলিত ছিল, কোথাও কোথাও নিষিদ্ধও ছিল। ফলে আমেরিকান নারীরা একটা বিশাল সময়ের সুবিধা পায়। ভালো অবকাঠামো থেকে ভালো খেলোয়াড়, ভালো খেলোয়াড় থেকে জয়, জয় থেকে জনপ্রিয়তা, জনপ্রিয়তা থেকে আবার নতুন প্রজন্ম, একটা চক্র তৈরি হয়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা ছিল না। তাদের প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে এমন সব দেশের বিরুদ্ধে, যেখানে ফুটবল একশ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের জীবনের অংশ।
তবে ভবিষ্যতের গল্প এখনো লেখা শেষ হয়নি। আজকের আমেরিকান শিশুর সামনে আগের চেয়ে ভিন্ন পৃথিবী। সে সকালে এনবিএ দেখে, দুপুরে মেসির পুরোনো ক্লিপ দেখে, রাতে ইউরোপিয়ান ম্যাচ দেখে। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক, ওয়েস্টন ম্যাককেনি, জিও রেইনার মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপে গিয়ে খেলছে। এমএলএসও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছে।
কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার জন্য শুধু এগারো জন ভালো খেলোয়াড় লাগে না। লাগে এমন একটা সংস্কৃতি, যেখানে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন বল নিয়ে বড় হয়। যেখানে খেলা একটা আলাদা কার্যক্রম না হয়ে জীবনের অংশ হয়ে যায়। যেখানে প্রতিভা হারিয়ে যায় না, খুঁজে বের করা হয়।
আমেরিকার হাতে টাকা আছে, মানুষ আছে, বিজ্ঞান আছে। এখন প্রশ্ন, তাদের ফুটবলের জন্য যথেষ্ট সময়, স্মৃতি আর মাটি তৈরি হয়েছে কি না। কারণ ফুটবলে শুধু দ্রুত দৌড়ানো মানুষ নয়। প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা ছোটবেলা থেকে বুঝে যায় কখন দৌড়াতে হয়, কখন থামতে হয়, আর কখন এক সেকেন্ডের জন্য পুরো পৃথিবীকে ভুলিয়ে দিয়ে বলটা জালে পাঠাতে হয়।
রিটন খান



