তিন বন্ধু, এক বিকেল এবং নব্বইয়ের দশক




আমরা তিন স্কুলের বন্ধু হঠাৎ সেদিন নস্টালজিক হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বলছি বটে, তবে নস্টালজিয়া মোটেই হঠাৎ হয় না। সে আগে থেকে ঘাপটি মেরে থাকে। পুরোনো আলমারির ন্যাপথলিনের গন্ধের মধ্যে থাকে, ক্যাসেটের ফিতার মধ্যে থাকে, স্কুলের গ্রুপ ফটোর পেছনে কারও বাঁকা হাতের লেখায় থাকে। তারপর একদিন আপনি নিশ্চিন্তে কফি খাচ্ছেন, পাশে দুই বন্ধু বসে আছে, হঠাৎ কোথা থেকে একটা পুরোনো গান বাজল, ব্যস, নস্টালজিয়া আপনার ঘাড় ধরে বলল, “চলেন মিয়া, আপনেরে একটু ছোটবেলায় লইয়া যাই।”
সেদিনও তাই হলো।
আমরা তিনজন বসেছিলাম ক্রাউনের রেস্তোরাঁয়। বয়স আমাদের প্রত্যেকের মুখেই নিজের স্বাক্ষর রেখে দিয়েছে। একজনের চুলে রুপালি ভাব, আরেকজনের পেটে পারিবারিক সমৃদ্ধির চিহ্ন, আর আমার চোখের নিচে এমন দুটো স্থায়ী ছায়া পড়েছে যে দেখলে মনে হয় রাতে আমি ঘুমাই না, জাতিসংঘের গোপন নথি অনুবাদ করি।
ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, কী দেব?”
আমাদের একজন বলল, “তিনটা কফি।”
অন্যজন বলল, “চিনি আলাদা দিয়েন।”
কফি আসার আগেই কথায় কথায় স্কুলের প্রসঙ্গ উঠল।
স্কুলটির নাম সেন্ট জোসেফ। মনে হলো, রেস্তোরাঁর কাচের দেয়াল সরে গিয়ে সামনে আমাদের পুরোনো মাঠটা দেখা যাচ্ছে। মাঠের একদিকে বাস্কেটবল কোর্ট, আরেকদিকে জল জমে থাকা জায়গা। বর্ষাকালে সেখানে ব্যাঙের রাজত্ব চলত। আমরা ফুটবল খেলতে গিয়ে বলের চেয়ে বেশি ব্যাঙকে কিক করেছি। ব্যাঙগুলোও সম্ভবত আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিল, কারণ ঘণ্টা পড়লে তারাও নর্দমার দিকে ছুটত।
আমাদের ক্লাসরুমে তিন ধরনের ছাত্র ছিল।
একদল সত্যি সত্যি পড়াশোনা করত। এরা খাতা পরিষ্কার রাখত, কলমে একই রঙের কালি ব্যবহার করত এবং পরীক্ষার আগে বলত, “কিছুই পড়িনি।” পরে নম্বর পেত পঁচানব্বই। এই জাতের মানুষদের ওপর আমি ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস রাখিনি।
দ্বিতীয় দল পড়াশোনা করত না, কিন্তু পরীক্ষার আগে ভয় পেত। তারা বই খুলে বসত, দশ মিনিট পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাত, তারপর পনেরো মিনিট পেন্সিল কাটত। শেষে মনে হতো পেন্সিলের নিব যতটা তীক্ষ্ণ হয়েছে, মস্তিষ্ক ততটা হয়নি।
তৃতীয় দলে ছিলাম আমরা। আমাদের পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কূটনৈতিক। পুরোপুরি শত্রুতা করতাম না, আবার ঘনিষ্ঠ মিত্রও ছিলাম না। পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলে প্রথমে সূচিপত্র দেখতাম। সূচিপত্র দেখে মনে হতো, পৃথিবীতে জানার মতো এত কিছু কেন? মানুষ অল্প জানিয়া সুখে থাকিবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সহজ সত্যটি বুঝল না।
আমাদের একজন বলল, “মনে আছে হেডস্যারকে?”
মনে না থাকার উপায় আছে?
হেডস্যার ছিলেন লম্বা, গম্ভীর এবং এমনভাবে হাঁটতেন, যেন স্কুলের প্রতিটি ইট তাঁর ব্যক্তিগত শৃঙ্খলায় বাঁধা। তাঁর হাতে থাকত সরু একটি বেত। বেতটির আলাদা নাম থাকা উচিত ছিল। কারণ স্কুলে বহু ছাত্রের ব্যক্তিত্ব গঠনে ওই বেতের অবদান ছিল। আমরা হেডস্যারের চেয়ে বেতটিকেই বেশি সম্মান করতাম। মানুষকে দূর থেকে দেখে সবসময় বোঝা যায় না, কিন্তু বেতের উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার।
হেডস্যার কাউকে ডাকলে সে প্রথমে নিজের অপরাধ মনে করার চেষ্টা করত। টিফিনে মারামারি করেছি? পেছনের বেঞ্চে সিনেমার নায়িকার নাম লিখেছি? নাকি গতকাল টিফিনের পরে স্কুল পালিয়েছি?
একদিন আমি হেডস্যারের ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে আছে। স্যার চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে কেন ডেকেছি জানো?”
আমি ভয় পেয়ে বললাম, “স্যার, যে কারণে ডেকেছেন, আর করব না।”
স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোমার বৃত্তির ফর্মে সই করতে ডেকেছি।”
আমি বেরিয়ে এসে বললাম, “দ্যাখছিস, উপস্থিত বুদ্ধি থাকলে বৃত্তিও পাওয়া যায়।”
তারপর টিফিনের কথা উঠল।
নব্বইয়ের দশকের টিফিন ছিল মানবসভ্যতার এক বিশেষ অধ্যায়। কারও কাছে দুই টাকার সিঙাড়া, কারও কাছে মায়ের বানানো পরোটা, কারও টিফিনবক্সে ডিমভাজি। যার টিফিনে মিষ্টি থাকত, সে সেদিন শ্রেণিকক্ষের অঘোষিত জমিদার। তার চারপাশে প্রজাদের ভিড় জমত।
“একটু দে।”
“এক কামড়।”
“আরে, তুই তো আমার ভাই।”
মিষ্টির এক টুকরোর সামনে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, মানবতা সব একসঙ্গে জেগে উঠত।
আমরা হাসলাম।
রেস্তোরাঁয় তখন হালকা করে একটা পুরোনো বাংলা গান বাজছিল। গানটা শুনে ক্যাসেটের কথা মনে পড়ল।
নব্বইয়ের দশকে গান শোনা ছিল সাধনার ব্যাপার। এখন আঙুল ছোঁয়ালেই লাখ লাখ গান। তখন একটা ক্যাসেট কিনতে টাকা জমাতে হতো। ক্যাসেটের এ-পিঠ, ও-পিঠ ছিল। প্রিয় গান কখন আসবে তা আন্দাজ করে রিওয়াইন্ড করতে হতো। বেশি রিওয়াইন্ড করলে আগের গান, কম করলে পরের গান। মাঝখানে থামলে গায়কের কণ্ঠ শুরু হওয়ার আগে আধখানা তবলা শোনা যেত।
ক্যাসেটের ফিতা জড়িয়ে গেলে কলম ঢুকিয়ে ঘোরানো হতো। বিশেষ করে Reynolds কিংবা Econo DX কলম এই কাজে খুব নাম করেছিল। কলম কোম্পানি জানত না, তাদের পণ্য দিয়ে দেশের অর্ধেক মানুষ লিখছে, আর বাকি অর্ধেক ক্যাসেট মেরামত করছে।
আমাদের একজনের বাসায় ডাবল ডেক ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। সে তখন আমাদের চোখে শিল্পপতি। এক ক্যাসেট থেকে আরেক ক্যাসেটে গান কপি করা যেত। আমরা তালিকা বানিয়ে দিতাম।
প্রথমে কুমার শানু।
তারপর আইয়ুব বাচ্চু।
তারপর জেমস।
মাঝে একটা সাইফের দুঃখের গান। “কখনো জানতে চেয়েও না…কি আমার সুখ কি আমার বেদনা”।
শেষে এমন একটা গান, যা শুনে পাশের বাসার মেয়েটি বুঝবে ক্যাসেটটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি।
প্রেম তখন খুব শ্রমসাধ্য কাজ ছিল। একটি গান কাউকে শোনানোর জন্য ক্যাসেট কিনতে হতো, গান রেকর্ড করতে হতো, কভারের ভেতর হাতের লেখায় তালিকা লিখতে হতো, তারপর বিশ্বস্ত বন্ধুর মাধ্যমে পৌঁছাতে হতো। প্রেমের সঙ্গে তখন ডাক বিভাগ, রেকর্ডিং প্রযুক্তি এবং বন্ধুর সততার গভীর সম্পর্ক ছিল।
আমাদের তিনজনের মধ্যে একজন যে একটু ফর্সা, স্কুলে প্রেমে পড়েছিল। মেয়েটি পাশের স্কুলে পড়ত। দেখা হতো স্কুল ছুটির পর। দেখা বলতে দূর থেকে দেখা। ছেলেটি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, মেয়েটি অন্য পাশ দিয়ে রিকশায় চলে যেত। মোট সময় সাত সেকেন্ড। এই সাত সেকেন্ডের জন্য সে দুপুর থেকে চুল আঁচড়াত।
একদিন সে মেয়েটিকে চিঠি লিখল। চার পৃষ্ঠা। শুরু করেছিল, “প্রিয়তমা।”
আমরা বললাম, “প্রিয়তমা কেন? কথা তো কোনোদিন হয় নাই।”
সে বলল, “আগে থেকে সম্মান দিলে সম্পর্ক দ্রুত এগোয়।”
চিঠির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, তিনজনই ছিলেন। নিজের কথা ছিল কম। শেষ লাইনে লিখেছিল, “তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।”
চিঠি পৌঁছানোর দায়িত্ব পড়ল আমাদের আরেক বন্ধুর ওপর। সে চিঠি পকেটে নিয়ে তিনদিন ঘুরল। সাহস পেল না। চতুর্থ দিন তার মা প্যান্ট ধুতে গিয়ে চিঠি পেয়ে গেলেন।
তারপর কী হয়েছিল, তা আমাদের বন্ধু আজও সম্পূর্ণ বলে না। শুধু জানি, প্রেমিকের বদলে বাহকই প্রথম পারিবারিক জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকের প্রেমে হৃদয় ভাঙার আগে প্রায়ই বন্ধুর পিঠ ভাঙত।
তারপর এল ক্রিকেট।
নব্বইয়ের দশকে ক্রিকেট ম্যাচ মানে পাড়া ফাঁকা। টেলিভিশনের সামনে সবাই বসে আছে। অ্যান্টেনা ঘোরানো হচ্ছে।
“এখন পরিষ্কার?”
“না, মানুষ দুইটা দেখা যায়।”
“এইবার?”
“মানুষ একটাই, কিন্তু মাঠ নাই।”
ছাদে একজন অ্যান্টেনা ঘোরাচ্ছে, নিচে আরেকজন চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে। এই যোগাযোগব্যবস্থা নাসার চেয়ে কম জটিল ছিল না।
বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো পাড়া একসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগকে এমন ভাষায় স্মরণ করত, যা বাংলা ব্যাকরণে নেই। কারও কাছে ব্যাটারিচালিত ছোট টিভি থাকলে তার বাড়িতে ভিড় জমত। বাড়ির মালিক তখন রাষ্ট্রপ্রধানের মতো আচরণ করতেন।
“সামনে বসবেন না।”
“জুতা বাইরে খুলেন।”
“বাচ্চারা চুপ।”
আমরা ক্রিকেট খেলতাম স্কুলের মাঠে, গলিতে, ছাদে, কখনো ঘরের ভেতর। ব্যাট না থাকলে কাঠের টুকরা, বল না থাকলে মোজা পাকিয়ে বল। স্টাম্প ছিল চেয়ার, দেয়াল অথবা তিনটা ইট।
আমাদের এক বন্ধু সবসময় ব্যাটিং করতে চাইত। আউট হলে বলত, “নো বল।”
“কীভাবে নো বল?”
“তোর হাত বাঁকা ছিল।”
“হাত বাঁকা হলে নো বল হয়?”
“আমাদের নিয়মে হয়।”
নিজের ব্যাট থাকলে নিয়মও নিজের হয়। গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ আমরা ক্রিকেটেই পেয়েছিলাম।
স্কুল ছুটির পর আমরা কখনো সরাসরি বাড়ি ফিরতাম না। রাস্তা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়াতাম, ভিডিও ক্যাসেটের দোকানের পোস্টার দেখতাম, পাড়ার মোড়ে আড্ডা দিতাম। পকেটে টাকা না থাকলেও সময় ছিল প্রচুর। এখন পকেটে কার্ড আছে, গাড়ি আছে, ফোন আছে, সময়টি কার কাছে জমা রেখেছি কেউ জানি না।
তখন বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার আগে ফোন করতে হতো না। দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দিলেই হতো।
“খালা, ও আছে?”
খালা বলতেন, “পড়তে বসছে।”
ভেতর থেকে বন্ধু ফিসফিস করে বলত, “ক বলবি জরুরি কাজ।”
আমরা বলতাম, “খালা, গ্রুপ স্টাডি।”
গ্রুপ স্টাডি ছিল বাংলা অঞ্চলের সবচেয়ে সফল সামাজিক প্রতারণা। বই সামনে খোলা থাকত, আলোচনা হতো ক্রিকেট, সিনেমা, ভূত, প্রেম এবং কার বাবা বেশি রাগী তা নিয়ে।
একদিন আমরা সত্যিই পড়তে বসেছিলাম। ঘণ্টাখানেক পরে বুঝলাম, এই কাজ আমাদের বন্ধুত্বের জন্য ক্ষতিকর। তারপর থেকে শিক্ষা আর সম্পর্ককে আলাদা রাখতাম।
আমাদের কথায় ধীরে ধীরে ভিডিও ক্যাসেট, ভিসিআর, শুক্রবারের সিনেমা, বইমেলা, স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান, কাগজের ডায়েরি, অটোগ্রাফ খাতা সব ফিরে এল।
অটোগ্রাফ খাতায় প্রশ্ন থাকত:
তোমার প্রিয় রং কী?
প্রিয় নায়ক কে?
জীবনের লক্ষ্য কী?
আমরা কেউ লিখতাম ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পাইলট।
তারপর জীবন এসে তিনজনকে তিন দিকে নিয়ে গেল।
কেউ চাকরিতে ঢুকল, কেউ ব্যবসায়, কেউ দেশ ছাড়ল। কারও বিয়ে হলো, কারও সন্তান হলো, কারও বাবা চলে গেলেন, কারও মা অসুস্থ হলেন। ফোন নম্বর বদলাল, ঠিকানা বদলাল, শরীর বদলাল। কেবল স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি ছেলের বয়স আর বাড়ল না। তারা সেখানেই রয়ে গেল। একজনের হাতে টিফিনবক্স, একজনের পকেটে প্রেমপত্র, আরেকজন বলছে, “আজ শেষ পিরিয়ডটা পালাই চল।”
সেদিন রেস্তোরাঁয় বসে আমরা অনেকক্ষণ সেই ছেলেগুলোর কথা বললাম।
কথার মাঝখানে একজন ফোন বের করে বলল, “একটা ছবি তুলি।”
আমরা তিনজন পাশাপাশি বসলাম। ছবির আগে সবাই স্বভাবতই পেট ভেতরে টেনে, মুখে তরুণ ভাব এনে, চশমা ঠিক করে নিলাম।
ছবি তোলার পর স্ক্রিনে তাকিয়ে একজন বলল, “আমাদের এত বুড়া লাগে ক্যান?”
আমি বললাম, “ক্যামেরার দোষ।”
অন্যজন বলল, “আলো খারাপ।”
মানুষ বয়সের দোষ কখনো বয়সকে দেয় না। ক্যামেরা, আলো, ঘুম, অফিস, আবহাওয়া, দেশের রাজনীতি, সব দায়ী। শুধু ক্যালেন্ডার নির্দোষভাবে দেয়ালে ঝুলে থাকে।
বাইরে বেরিয়ে দেখি রাত হয়ে গেছে। শহরের আলো জ্বলছে, গাড়ি ছুটছে, সবাই ব্যস্ত। আমরা ক্রাউন হোটেলের গেটে দাঁড়িয়ে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু কেউই প্রথমে যেতে চাইছি না। যেন আবার স্কুল ছুটি হয়েছে। যেন যার যার বাড়ি ফিরলেই মা জিজ্ঞেস করবেন, “এত দেরি হলো কেন?”
আমরা হাত মেলালাম। তারপর একজনকে জড়িয়ে ধরলাম। অন্যজন বলল, “আবার বসতে হবে।”
আমরা সবাই জানি, বড়দের এই “আবার বসতে হবে” কথাটি অনেক সময় পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত কার্যকর হয় না। তবু কথাটি বলা দরকার। মানুষের হাতে সবসময় সময় থাকে না, আশ্বাসটি থাকে।
গাড়িতে উঠে আয়নায় ওদের দিকে তাকালাম। দুজন দাঁড়িয়ে আছে, হাত নাড়ছে। হঠাৎ মনে হলো, আমরা তিনজনই একই সঙ্গে দুই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। একবার এই শহরের আলোয়, মধ্যবয়সের ক্লান্ত শরীর নিয়ে। আরেকবার নব্বইয়ের কোনো এক বিকেলে, স্কুলব্যাগ কাঁধে, সামনে অনন্ত সময়।
সেই সময় আমাদের কাছে টাকা ছিল কম, পরিকল্পনা ছিল ছোট, পৃথিবী ছিল অনেক বড়।
এখন পৃথিবী হাতের ফোনে ঢুকে গেছে। কেবল সেই বিকেলগুলো আর কোথাও পাওয়া যায় না।
তবে তিন পুরোনো বন্ধু একসঙ্গে বসলে সময় কিছুক্ষণের জন্য ভুল করে ফেলে। সে আমাদের বর্তমান বয়সের হিসাব গুলিয়ে দেয়। হাঁটুর ব্যথা, রক্তচাপ, অফিসের মিটিং সব সরিয়ে দিয়ে বলে, “যাও, আরেকবার স্কুল ছুটি হলো।”
আমরাও বিশ্বাস করি।
মানুষ বুড়ো হয়, বন্ধুত্বের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্কুলছাত্ররা হয় না।


