গেম থিওরি
গেম থিওরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানবতার ভবিষ্যৎ
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৌশল নির্ধারণ এবং পারস্পরিক আচরণের যে তাত্ত্বিক কাঠামোটি সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে, তার নাম গেম থিওরি। এই তত্ত্ব কেবল অর্থনীতি বা সামরিক কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে আমাদের রাজনীতি, প্রযুক্তি ডিজাইন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি দৈনন্দিন মানবিক সম্পর্কের ভেতরেও প্রবেশ করেছে। আমি আলোচনা করবো কীভাবে যুক্তিবাদী সিদ্ধান্তের নামে তৈরি এই মডেলগুলো মানুষকে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেয়, বিশ্বাসকে রূপান্তরিত করে সন্দেহে, আর প্রযুক্তিকে পরিণত করে জিরো সাম খেলায়। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থার বন্দী হয়ে পড়ছি, যেখানে সবাই নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে সকলকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং এই প্রক্রিয়াটিই আধুনিক যুক্তিবোধের সবচেয়ে বিপজ্জনক উত্তরাধিকার।
গেম থিওরির সূচনা ঘটে মূলত ১৯৪০-এর দশকে, খ্যাতনামা গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী John von Neumann এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি নির্মাণ করেন। তাঁর প্রাথমিক আগ্রহ ছিল দাবা বা পোকারের মতো প্রতিযোগিতামূলক খেলায় জয়ের যুক্তি খুঁজে বের করা, অর্থাৎ কীভাবে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য চাল, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা আবেগপ্রবণ আচরণকে গাণিতিক সূত্রে রূপ দিয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করা যায়। এই তত্ত্বের কেন্দ্রে ছিল একটি কঠোর অনুমান: প্রতিটি খেলোয়াড় পুরোপুরি স্বার্থপর, সর্বদা লাভের হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়, এবং সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে নিউম্যানের গেম থিওরিতে সহযোগিতা কোনো স্বাভাবিক বা কাম্য বিকল্প নয়; বরং একে দুর্বলতা বা কৌশলগত ভুল হিসেবে ধরা হয়। এখানে খেলাটি মূলত জিরো সাম, যেখানে একজনের লাভ মানেই অপরজনের ক্ষতি, এবং আবেগ বা পারস্পরিক আস্থার জন্য কোনো জায়গা রাখা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে অর্থনীতি, সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে, এবং মানব আচরণকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতার এক সংকীর্ণ ছকে ব্যাখ্যা করার পথ তৈরি করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গেম থিওরি শুধু দাবা বা পোকারের টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। খুব দ্রুতই এটি কোল্ড ওয়ারের সময় পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার, পারস্পরিক ধ্বংসের কৌশল এবং সামরিক নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রীয় যুক্তিতে পরিণত হয়। এক পক্ষ অস্ত্র বাড়ালে অন্য পক্ষও বাধ্য হয় একই পথে হাঁটতে, কারণ না বাড়ালেই পরাজয়ের আশঙ্কা। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় স্থায়ী অবিশ্বাস, সন্দেহনির্ভর কৌশল যেখানে শান্তি রক্ষা করা হয় ভয়ের ভারসাম্যের মাধ্যমে। পরে এই যুক্তিবোধ অর্থনীতিতে ঢুকে পড়ে, যেখানে প্রতিযোগিতা সহযোগিতাকে গ্রাস করে; রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখাই মুখ্য হয়ে ওঠে; এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনেও ছড়িয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে দেখা হয় জিতব না হারব এই দ্বৈত হিসাবের ভেতর দিয়ে।
গেম থিওরির এই বিশ্বদর্শনের মূল বাক্যটি খুব সরল কিন্তু ভয়ংকর: আমি যদি এটি না করি, তবে অন্য কেউ করবে, আর তখন আমি হেরে যাব। এই ভীতি থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো মানুষের মনোযোগ দখলের প্রতিযোগিতায় নামে, একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য ডিজাইন করে আরও আসক্তিকর প্ল্যাটফর্ম, আরও সূক্ষ্ম অ্যালগরিদম। একই ভীতি রাষ্ট্রগুলোকে ঠেলে দেয় আরও বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির দিকে, কারণ কেউই প্রথমে থামতে চায় না। ফলাফল, সবাই আত্মরক্ষার নামে শেষ পর্যন্ত সবার জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, আর সহযোগিতার সম্ভাবনাকে বোকামি বলে বাতিল করে দেয়।
অধ্যাপক Sonia Amadae যুক্তি দেন, গেম থিওরি ধীরে ধীরে আমাদের জগতকে এক ধরনের উপনিবেশে রূপান্তর করেছে। এই উপনিবেশ কোনো ভূখণ্ডভিত্তিক নয়; এটি চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের ভেতরে গড়ে ওঠা এক মানসিক শাসনব্যবস্থা। প্রযুক্তি ডিজাইন বা যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং ডেটিং পর্যন্ত এই যুক্তিবোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সম্পর্ককে আর পারস্পরিক বোঝাপড়া বা বিশ্বাসের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয় না; বরং দেখা হয় একটি সমস্যার মতো, যার সমাধান বের করতে হবে নির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োগ করে।
এই প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ, তথাকথিত ‘পিক-আপ আর্টিস্ট্রি’ বা আধুনিক ডেটিং কৌশলে। এখানে সম্পর্ক গড়ে তোলাকে শেখানো হয় একটি গাণিতিক খেলার মতো, যেখানে অপর পক্ষ একজন মানুষ নয়, বরং একটি ভ্যারিয়েবল। লক্ষ্য থাকে তাকে প্রভাবিত করা, বিভ্রান্ত করা, কখনো আবেগকে অস্ত্র বানিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বের করে আনা। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যর্থতা মানে ভুল কৌশল প্রয়োগ; আর সাফল্য মানে মানবিক সংযোগ নয়, বরং খেলায় জয়। আমাডেইর যুক্তি অনুযায়ী, এখানেই গেম থিওরির সবচেয়ে গভীর ক্ষতি নিহিত, কারণ এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী বা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখতে শেখায়, এবং সম্পর্ককে পরিণত করে জিরো-সাম এক নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতায়।
রাজনীতি ও সফটওয়্যার ডিজাইনের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। রাজনীতিবিদরা ক্রমেই সত্য বলা বা নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে চান না; তার বদলে তারা এমন বাক্য, এমন ভঙ্গি বেছে নেন যা অ্যালগরিদম, জনমত জরিপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে হয়। বক্তব্য এখানে আর মানবিক অবস্থান নয়, বরং একটি পরীক্ষিত আউটপুট, যা ভোট, লাইক বা শেয়ারের মাধ্যমে মাপা যায়। ফলে রাজনীতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক ধরনের পারফরম্যান্সে, যেখানে আসল প্রশ্ন কী সত্য বা কী ন্যায্য, তা নয়; প্রশ্ন হলো কোনটি বেশি কাজ করছে।
সফটওয়্যার ডিজাইনের জগতে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। ডিজাইনাররা মানুষের মঙ্গল, মনোযোগের সীমা বা মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন না; বরং তারা পরীক্ষা করেন কীভাবে মস্তিষ্কের দুর্বলতা, অভ্যাস এবং আসক্তিপ্রবণতা কাজে লাগিয়ে স্ক্রিন টাইম বাড়ানো যায়। এ জন্য এ/বি টেস্টিং ব্যবহৃত হয় এমনভাবে, যেন ব্যবহারকারী কোনো মানুষ নয়, বরং একটি ডেটা পয়েন্ট। কোন রঙে নোটিফিকেশন বেশি ক্লিক করায়, কোন স্ক্রলে মানুষ বেশি সময় আটকে থাকে, কোন শব্দে ভয় বা উত্তেজনা বাড়ে, এসবই হয়ে ওঠে ডিজাইনের মূল চালিকা শক্তি। এই প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি সহায়তার বদলে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয়।
এর সম্মিলিত ফলাফল, যেখানে প্রায় প্রতিটি যোগাযোগ কৌশলনির্ভর ও কৃত্রিম হয়ে উঠছে। কথা বলা মানে ভাব প্রকাশ করা নয়, বরং প্রতিক্রিয়া আদায়ের চেষ্টা। সম্পর্ক, রাজনীতি, প্রযুক্তি সবখানেই মানুষ নিজেকে অপ্টিমাইজ করে। আর এই অপ্টিমাইজেশনের চাপে সত্য, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং বিশ্বাস ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
গেম থিওরির সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রভাবশালী উদাহরণ হিসেবে বারবার উঠে আসে ‘প্রিজনার্স ডিলেমা’ বা বন্দীর উভয়সঙ্কট। এখানে একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক কিন্তু গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। দুইজন বন্দীকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তারা একে অপরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছে না। প্রত্যেকের সামনে একই ধরনের প্রস্তাব রাখা হয়: যদি তুমি অপরজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও, অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা করো, তাহলে তুমি তুলনামূলকভাবে হালকা শাস্তি পাবে কিংবা মুক্তিও পেতে পারো। কিন্তু যদি দুজনেই একে অপরকে দোষারোপ করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত দুজনেরই কপালে জোটে কঠোর শাস্তি।
এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তি আর আস্থার সংঘর্ষ। গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি বন্দীর জন্য ‘নিরাপদ’ সিদ্ধান্ত হলো বিশ্বাসঘাতকতা করা। কারণ সে জানে না অপর পক্ষ কী করবে, আর যদি অপরজন তাকে ফাঁসিয়ে দেয়, তবে চুপ করে থাকা মানে নিজের জন্য সবচেয়ে খারাপ ফল মেনে নেওয়া। তাই স্বার্থপরের মতো আচরণ করাই এখানে ‘র্যাশনাল’ বা যুক্তিসঙ্গত বলে গণ্য হয়। অথচ এই যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফল ভয়াবহ: দুজনেই বেশি শাস্তি পায়। বিপরীতে, যদি তারা দুজনেই চুপ থাকত, অর্থাৎ পারস্পরিক সহযোগিতা করত, তাহলে উভয়েরই শাস্তি হতো তুলনামূলকভাবে কম।
এই উদাহরণটি গেম থিওরির একটি মৌলিক সত্য উন্মোচন করে। এখানে যা ব্যক্তিগতভাবে যুক্তিসঙ্গত, তা সম্মিলিতভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার তাগিদ সহযোগিতাকে অসম্ভব করে তোলে, যদিও সহযোগিতাই সবার জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে পারত। ঠিক এই যুক্তিই পরবর্তীতে রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি নকশা এবং মানবিক সম্পর্কের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যেখানে মানুষ জানে সহযোগিতা ভালো, তবু ভয়ের কারণে বিশ্বাসঘাতকতাকেই নিরাপদ পথ বলে বেছে নেয়।
অধ্যাপক Sonia Amadae মনে করেন, গেম থিওরির ভিত্তি গড়ে উঠেছে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে কয়েকটি গভীরভাবে সীমাবদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর অনুমানের ওপর। এই অনুমানগুলোকে প্রায়ই স্বাভাবিক বা অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নেওয়া হয়, অথচ এগুলোই আমাদের চিন্তা ও আচরণকে একটি সংকীর্ণ পথে আটকে রাখে।
প্রথমত, রয়েছে মূল্যবোধের অভাব। গেম থিওরি ধরে নেয় যে পৃথিবীতে যা কিছু মূল্যবান, তা স্বভাবতই সীমিত। সম্পদ, ক্ষমতা, মনোযোগ কিংবা সুযোগ সবকিছুই যেন কম, আর তাই সেগুলো দখলের জন্য প্রতিযোগিতা অনিবার্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সহযোগিতা কোনো স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা নয়; বরং তা একটি অস্থায়ী কৌশল, যা কেবল তখনই কাজে লাগে যখন প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা দরকার।
দ্বিতীয়ত, এই তত্ত্ব মানুষকে কল্পনা করে জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও কৌশলী প্রতিযোগী হিসেবে। এখানে মানুষ আর সামাজিক, সহানুভূতিশীল বা নৈতিক সত্তা নয়; সে এক ধরনের হিসাবি এজেন্ট, যে প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজের লাভ সর্বাধিক করতে চায়। আবেগ, মূল্যবোধ, বিশ্বাস বা দায়িত্ববোধকে হয় উপেক্ষা করা হয়, নয়তো এগুলোকে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে মানব আচরণের বহুমাত্রিক বাস্তবতা একটি মাত্র বৈশিষ্ট্যে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক অনুমানটি হলো বিকল্পহীনতার ধারণা। গেম থিওরি এমন একটি যুক্তি তৈরি করে, যেখানে মনে হয় এই খেলার বাইরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। আপনি যদি এই নিয়ম মেনে না খেলেন, যদি প্রতিযোগিতায় অংশ না নেন, তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবেই হেরে যাবেন। এই ভাবনাই মানুষকে বাধ্য করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে, যা সে নিজেও নৈতিক বা মানবিক বলে মনে করে না, কিন্তু তবু মনে করে তার আর কোনো উপায় নেই। আমাডেইর মতে, এখানেই গেম থিওরি শুধু একটি বিশ্লেষণী মডেল না থেকে এক ধরনের আত্মপূরণকারী ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হয়, যা মানুষকে এমন আচরণে ঠেলে দেয়, যাকে সে পরে মানুষের প্রকৃতি বলে ভুল করে চিহ্নিত করে।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, মানুষ সব সময় গেম থিওরির এই কঠোর যুক্তি মেনে চলে না। উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উঠে আসে Finland-এর মতো উচ্চ-বিশ্বাসভিত্তিক সমাজের কথা। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর যখন প্রিজনার্স ডিলেমার মতো পরীক্ষা চালানো হয়, দেখা যায় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে যাওয়ার পথ বেছে নেয় না; বরং সহযোগিতাকেই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার যে গাণিতিক হিসাব, সেটি কেবল অস্বস্তিকর নয়, অনেক সময় অবোধ্যও মনে হয়। অর্থাৎ সামাজিক প্রেক্ষাপট, পারস্পরিক আস্থা এবং নৈতিক শিক্ষা মানুষের সিদ্ধান্তকে এমনভাবে গঠন করে, যা গেম থিওরির অনুমানের সঙ্গে মেলে না।
এখানেই গেম থিওরির সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আদৌ সীমিত নয় এবং সেগুলোকে শূন্য-সমের খেলায় ফেলা যায় না। ভালোবাসা, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব কিংবা পারস্পরিক শ্রদ্ধা এমন সম্পদ নয় যে একজনেরটা বাড়লে আরেকজনেরটা কমে যাবে। বরং অনেক ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটে। একজন মানুষের আত্মসম্মান বেড়ে গেলে তা অন্যদের জন্যও একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে, আস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। এই অর্থে এগুলো জিরো-সাম নয়, বরং পজিটিভ-সাম বাস্তবতা।
এই অভিজ্ঞতাগুলো জানায় যে মানুষ কেবল স্বার্থপর হিসাবি সত্তা নয়। সে সামাজিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ভেতর দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। গেম থিওরি যেখানে ধরে নেয় অবিশ্বাসই নিরাপদ পথ, বাস্তব জীবন অনেক সময় শেখায় ঠিক উল্টো কথা। বিশ্বাসই সেখানে যুক্তিসঙ্গত হয়ে ওঠে, কারণ বিশ্বাস ভেঙে নয়, বরং বিশ্বাস গড়েই মানুষ টিকে থাকে।
বর্তমান সময়ে গেম থিওরির সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রয়োগে। এআই আসলে গেম থিওরির যুক্তিকে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। এটি মানুষের ভাষা, আবেগ ও মনস্তত্ত্ব ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং যেকোনো প্রতিযোগিতাকে, তা সামরিক হোক বা বাণিজ্যিক, আরও দ্রুত ও আরও তীব্র করে তোলে। যেখানে মানুষ এখনো দ্বিধা, নৈতিকতা বা ক্লান্তির সীমায় আটকে যায়, সেখানে অ্যালগরিদম নিরবচ্ছিন্নভাবে হিসাব কষে যায়, প্রতিপক্ষকে হারানোর সর্বোত্তম পথ খুঁজে বের করে, এবং প্রভাব তৈরিকে একটি অপ্টিমাইজেশন সমস্যায় নামিয়ে আনে।
এআই-এর যুগে আমরা এমন এক দৌড়ে নেমেছি, যেখানে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা ভাবার আগেই শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করার তাড়া দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে কাজ করছে সেই পুরোনো ভয়: আমরা যদি না করি, ওরা করবে, আর তখন ওরাই নিয়ন্ত্রণ নেবে। এই আশঙ্কা থেকেই রাষ্ট্র, কর্পোরেশন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, এমনকি যখন তারা জানে যে এই তাড়াহুড়ো সবার জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গেম থিওরির এই মানসিকতায় থামা মানে দুর্বল হওয়া, আর সাবধানতা মানে পরাজয়ের সম্ভাবনা।
এই কাঠামোর ভেতরে যাদের পুরস্কৃত করা হয়, তারা প্রায়ই সহানুভূতিহীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। নেতৃত্ব হোক বা অ্যালগরিদম, যে সবচেয়ে নির্দয়ভাবে লক্ষ্য পূরণ করতে পারে, তাকেই কার্যকর বলা হয়। মানবিক বিবেচনা এখানে বাধা হিসেবে দেখা দেয়, আর চরম স্বার্থপর বা তথাকথিত সাইকোপ্যাথিক আচরণকে কৌশলগত দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে এআই শুধু প্রযুক্তিগত শক্তি নয়, এটি এমন এক মানসিকতা বহন করে, যা প্রতিযোগিতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয় এবং সহযোগিতা, সংযম ও সহমর্মিতাকে ক্রমশ প্রান্তে ঠেলে দেয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই ‘যুক্তির কারাগার’ থেকে বের হওয়ার পথ কোথায়। অধ্যাপক Sonia Amadae মনে করেন, এই বেরিয়ে আসা কোনো একক কৌশলের ফল নয়; বরং এটি চিন্তার কাঠামো বদলানোর প্রক্রিয়া। তারা কয়েকটি দিকনির্দেশনার কথা বলেন, যেগুলো গেম থিওরির সংকীর্ণ যুক্তিকে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
প্রথমত, বিশ্বাস ও সংহতির প্রশ্ন। এখানে মূল দাবি হলো, সহযোগিতা কোনো নৈতিক বিলাসিতা নয় এবং এটি দুর্বলতার লক্ষণও নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। যদি মানসিকতা হয়, অন্য পক্ষ সহযোগিতা করলে আমিও করব, তাহলে প্রিজনার্স ডিলেমার সেই অনিবার্য বিশ্বাসঘাতকতার চক্র ভাঙা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস কোনো অন্ধ ঝাঁপ নয়; এটি শর্তসাপেক্ষ কিন্তু মানবিক এক সিদ্ধান্ত, যা ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সত্যিকারের যোগাযোগ। এখানে সমস্যা কেবল কী বলা হচ্ছে তা নয়, কীভাবে বলা হচ্ছে সেটাও। গেম থিওরিনির্ভর জগতে যোগাযোগ মানে প্রায়ই কৌশলগত সিগন্যালিং, যেখানে কথা বলা হয় প্রতিক্রিয়া আদায়ের জন্য। এর বিকল্প হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে Nonviolent Communication বা অহিংস যোগাযোগের ধারণা। এতে মানুষ কৌশল লুকিয়ে না রেখে নিজের অনুভূতি, চাহিদা এবং উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। লক্ষ্য থাকে জয়ী হওয়া নয়, বোঝাপড়ায় পৌঁছানো।
তৃতীয়ত, মূল্যবোধের পুনর্বিন্যাস। এখানে Abraham Maslow-এর চাহিদার সোপানের কথা টানা হয়। মাসলোর যুক্তি অনুযায়ী, মানুষের উচ্চতর চাহিদা, যেমন ভালোবাসা, আত্মসম্মান, জ্ঞান বা অর্থপূর্ণতার অনুভূতি, এগুলো সীমিত সম্পদের মতো নয়। এগুলো দখল করতে হয় না, বরং ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে বাড়ানো যায়। এই উপলব্ধি গেম থিওরির স্কার্সিটি বা অভাবকেন্দ্রিক যুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
চতুর্থত, দলের যুক্তি বা টিম রিজনিং। আধুনিক বিবর্তনবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়, যা অনেকাংশে Charles Darwin-এর তত্ত্বের সম্প্রসারণ, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। স্বার্থপর ব্যক্তি হয়তো স্বল্পমেয়াদে পরোপকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে দিতে পারে, কিন্তু পরোপকারী বা সহযোগী মানুষের দল দীর্ঘমেয়াদে সবসময় স্বার্থপর মানুষের দলকে পরাজিত করে। অর্থাৎ প্রশ্নটি ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়; প্রশ্নটি দল বনাম দল। সহযোগিতা এখানে নৈতিক আদর্শ নয়, বরং বিবর্তনগতভাবে কার্যকর কৌশল।
এই চারটি পথ মিলিয়ে একটি ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। সেখানে মানুষ আর একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখে। যুক্তি সেখানে বাতিল হয় না, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং ভাগ করে নেওয়ার বোধ। আর ঠিক এই সংযোজনের মাধ্যমেই ‘যুক্তির কারাগার’-এর দরজায় প্রথম ফাটল ধরে।
গেম থিওরি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে জয় নিশ্চিত করতে হয়, কিন্তু এটি আমাদের শেখায়নি কীভাবে সমষ্টিগতভাবে টিকে থাকতে হয়। এই সীমাবদ্ধতার একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক স্মারক হলো ১৯৮৩ সালের টেলিভিশন চলচ্চিত্র The Day After। সেই ছবি পরমাণু যুদ্ধের পরিণতি এমন নির্মমভাবে তুলে ধরেছিল যে রাষ্ট্রনেতাদের সামনে এক কঠিন সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে: পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অসহযোগিতা শেষ পর্যন্ত সবাইকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে গেম থিওরির শূন্য-সম যুক্তি বাস্তব জীবনের সামনে টিকতে পারেনি; ভয় আর প্রতিযোগিতার হিসাব একসময় অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।
আজকের সময়ে, এআই এবং অন্যান্য শক্তিশালী প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই উপলব্ধি জরুরি। দ্রুত এগোনোর তাড়া, নিরাপত্তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এবং আমরা না করলে ওরা করবে এই ভয় গেম থিওরির সেই পুরোনো ফাঁদকেই নতুন প্রযুক্তির ভেতর পুনরাবৃত্তি করছে। এখানে ঝুঁকিটি আর কল্পনাপ্রসূত নয়। অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এই অন্ধ অনুসরণ সরাসরি আমাদের সামষ্টিক অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে স্পষ্টতই দুটি পথ খোলা। একদিকে রয়েছে গাণিতিক যুক্তির দাসত্ব, যেখানে দক্ষতা মানে নির্দয়তা, আর অগ্রগতি মানে নিয়ন্ত্রণ। সেই পথে ভবিষ্যৎ হবে যান্ত্রিক, সহানুভূতিহীন এবং ভঙ্গুর। অন্যদিকে রয়েছে মানবিক গুণাবলীর পুনরাবিষ্কার। বিশ্বাস, সততা এবং সহযোগিতাকে কৌশল নয়, ভিত্তি হিসেবে নেওয়া। এই পথ সহজ নয়, কিন্তু নিরাপদ। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জেতে তারা, যারা কেবল হিসাব করে না, একসঙ্গে দাঁড়াতে জানে।
একটি উপমা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক:
গেম থিওরি বা এই ধরনের কৌশলী যুক্তিকে ক্যান্সারের কোষের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ক্যান্সার কোষ নিজের বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শরীরের বাকি কোষগুলোর সঙ্গে কোনো সমন্বয় রাখে না। সে কেবল নিজের লাভ দেখে, আশপাশের কোষ থেকে যতটা সম্ভব পুষ্টি টেনে নেয় এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে। স্বল্প সময়ের হিসেবে দেখলে মনে হতে পারে, এই কোষটি জিতে যাচ্ছে। সে দ্রুত বেড়ে উঠছে, শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদের ছাপিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই জয় আসলে আত্মঘাতী। কারণ তার এই স্বার্থপর সাফল্য ধীরে ধীরে পুরো শরীরকে অসুস্থ করে তোলে। একসময় শরীরটি ভেঙে পড়ে, আর সেই সঙ্গে ক্যান্সার কোষটিও মারা যায়।
গেম থিওরির অন্ধ অনুসরণ অনেকটা এই পথেই হাঁটে। যখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কেবল নিজের জয় নিশ্চিত করার নেশায় সহযোগিতা, সংযম এবং পারস্পরিক দায়িত্বের ধারণা ছুড়ে ফেলে দেয়, তখন তারা স্বল্পমেয়াদে লাভবান হতে পারে। কেউ বেশি ক্ষমতা জোগাড় করে, কেউ বেশি সম্পদ দখল করে, কেউ প্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়। কিন্তু এই প্রতিযোগিতামূলক সাফল্য যদি সমষ্টিগত ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে, তবে শেষ পর্যন্ত সেই সাফল্যও টেকে না।
আমরা সবাই মিলে এই পৃথিবী নামক একটিমাত্র শরীরের ভেতর বাস করছি। এখানে রাষ্ট্রের জয়, কর্পোরেশনের জয় বা ব্যক্তিগত জয় আলাদা করে টেকসই নয়, যদি পুরো ব্যবস্থাটাই ক্ষয়ে যায়। সহযোগিতার পথ ত্যাগ করে যদি আমরা কেবল জয়ের হিসাব কষতে থাকি, তবে ক্যান্সার কোষের মতোই আমরা হয়তো কিছুদিন বাড়ব, শক্ত হব, এগোব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পথ আমাদের সবাইকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে একই পরিণতির সামনে, যেখানে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে কোষটিও আর বেঁচে থাকে না।



