রেডিও আবিষ্কারের সেই ইতিহাসের পাতায় একটা ভারী চমৎকার ভুল জড়িয়ে আছে। ভুল বলছি, কারণ ইতিহাসের শুষ্ক খাতা খুললে দেখবেন তথ্যগুলো অন্যরকম। হাইনরিখ হার্টজ সাহেব আগেই তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব হাতে-কলমে প্রমাণ করেছিলেন, আর মার্কনি সেই তরঙ্গকে বশ করে বহুদূরে তারবিহীন সংকেত পাঠানোর কায়দা বের করলেন। কিন্তু মানুষের মন তো আর পাঠ্যবইয়ের ফুটনোটে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নয়। মার্কনিকে ঘিরে এক অদ্ভুত গল্প লোকমুখে ঘুরে বেড়ায়, যা এতটাই মায়াময় যে সেটিকে নেহাত কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে মন বড় একটা সায় দেয় না।
গল্পটা হল, মার্কনির নাকি মনে হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত শব্দ কোথাও না কোথাও থেকে যায়। মানুষ মরে যায়, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর? সে কি পুরোপুরি মরে?
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন ভাবনা বড়জোর দুপুরের আড্ডায় চায়ের কাপে তুফান তুলে বিকেলের আলো ফুরোতেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু মার্কনি ছিলেন বিজ্ঞানের মানুষ। বিজ্ঞানীদের মুশকিল হচ্ছে, আমাদের মাথার ভেতরে যে পাগলামিগুলো কেবল কল্পনা হয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাঁরা সেই অদ্ভুত কল্পনাগুলোকেও যন্ত্রপাতি দিয়ে মপে দেখার সুযোগ পান।
তিনি নাকি বিশ্বাস করতেন, নেপোলিয়ন সেই কবে যে কথাগুলো বলেছিলেন, তার রেশ আজও পৃথিবীর বাতাসে অদৃশ্য হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সিজারের শেষ হাহাকার, সক্রেটিসের অন্তিম বাণী, কিংবা কয়েক হাজার বছর আগের কোনো এক নামহীন মায়ের শান্ত ঘুমপাড়ানি সুর—সবই যেন কোথাও জমা হয়ে আছে। রণক্ষেত্রের সেই আর্তনাদ থেকে শুরু করে প্রেমিকের অতি গোপন ফিসফাস, শিশুর প্রথম কান্নার শব্দ—কোনো কিছুই নাকি ফুরিয়ে যায় না, কেবল অতিশয় ক্ষীণ হতে হতে ছাইচাপা আগুনের মতো টিকে থাকে।
মার্কনির ভাবনায় ছিল, একদিন যদি এক অসাধ্য সাধন করা যায়, যদি অদ্ভুত শক্তিশালী কোনো রিসিভার তৈরি করে সঠিক কম্পাঙ্কে মন দেওয়া যায়, তবে হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সেই কণ্ঠস্বরগুলোকেও আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।
ভাবুন তো কী সাংঘাতিক ব্যাপার।
রেডিও খুললেন।
খড়খড় শব্দ হচ্ছে।
একটু পরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, “হ্যালো?”
আমি হলে সঙ্গে সঙ্গে রেডিও বন্ধ করে দিতাম।
কারণ মানুষের কৌতূহল যত বড়ই হোক, রাত আড়াইটায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ করার সাহস আমার নেই। তিনি যদি প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, “আমার লেখাগুলো কতখানি পড়েছ?” তখন কী উত্তর দেব?
মার্কনি অবশ্য এত সহজে ভয় পাওয়ার লোক ছিলেন না। তিনি যন্ত্র বানালেন, অ্যান্টেনা তুললেন, দূরে সংকেত পাঠালেন, ধরলেন।
এবং অবশেষে শুনলেন মানুষের কণ্ঠ। সমস্যা হচ্ছে, লোকটি মৃত নয়। লোকটি দিব্যি বেঁচে আছে। ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালে।
আটলান্টিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তারহীন সংকেত পৌঁছে যাচ্ছে, মানুষের গলার স্বর কোনো মাধ্যম ছাড়াই পাড়ি দিচ্ছে হাজার মাইল—এমন এক অভাবনীয় সাফল্যের মুহূর্তে মার্কনির মন নিশ্চয়ই আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার এক অসামান্য কারিগর তখন তিনি। অথচ লোকগাথার গল্পেরা বলে অন্য কথা; সেই বিপুল প্রাপ্তির ভিড়েও নাকি তাঁর মনের এক কোণে সামান্য বিষণ্ণতার ছায়া লেগে ছিল।
মুশকিল হল, তিনি তো খুঁজেছিলেন পরপারের হারানো সুর, অথচ তাঁর জালে ধরা পড়ল এই পৃথিবীরই কোনো এক রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষ।
বিজ্ঞান পেল রেডিও।
মার্কনি পেলেন কর্নওয়ালের এক ভদ্রলোক।
জীবন এইরকমই। আপনি মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজতে বেরোবেন, শেষ পর্যন্ত পাশের বাড়ির ওয়াই-ফাই ধরবে।
তবে মার্কনির সেই কল্পনা আমাকে অন্য একটা ব্যাপারে ভাবায়।
মৃত মানুষের কণ্ঠ সত্যিই কি হারিয়ে যায়?
রেডিওতে যদি না-ও থাকে, বইয়ে তো থাকে।
আমার কাছে বইয়ের সবচেয়ে রহস্যময় দিক এটাই।
ভাবুন তো একবার, একজন মানুষ সেই কবে দুই শতাব্দী আগে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর হাড়মাংসের অস্তিত্বটুকুও অবশিষ্ট নেই। যে নিভৃত কোণে বসে তিনি একদা কলম ধরতেন, সেই ঘরখানিও হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তাঁর প্রিয় কাঠের টেবিল ভস্মীভূত, পরিহিত বসন বিলীন, এমনকি তাঁর উত্তরসূরিরাও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। যে মেঠো পথ বা শহরের অলিগলিতে তিনি বিচরণ করতেন, সময়ের আবর্তে সেগুলোর নামধামও হয়তো আজ অপিরিচিত। অথচ গভীর নিশীথে যখন নিস্তব্ধ বিছানায় শুয়ে আপনি স্রেফ তাঁর লেখা বইখানি খুললেন—
অমনি মৃত সেই মানুষটি আবার আপনার সঙ্গে কথা কইতে শুরু করলেন।
এর চেয়ে বড় ভূতের গল্প আমি জানি না।
ভূতের গল্পে অন্তত ভূতকে ডাকার জন্য প্ল্যানচেট লাগে, মোমবাতি লাগে, তিনজন বেকার বন্ধু লাগে, তাদের মধ্যে একজনের বিশেষ ক্ষমতা থাকতে হয়। বইয়ের ক্ষেত্রে কিছুই লাগে না।
একটু সময়।
ব্যস।
দুইশো বছর আগে মৃত একজন মানুষ আপনার ঘরে ঢুকে পড়লেন।
আমার বরাবরই মনে হয়েছে গল্প আসলে দুই মানুষের মধ্যে একটা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার ব্যবস্থা। লেখক একদিকে, পাঠক আরেকদিকে। দুজনের মধ্যে কখনো হাজার মাইল দূরত্ব, কখনো কয়েকশো বছরের ব্যবধান।
লেখক লিখে রেখে গেলেন, “আজ আমার খুব একা লাগছে।”
দেড়শো বছর পরে আরেকজন মানুষ সেই লাইন পড়ে ভাবে, “আরে, আমারও তো।”
বই পড়ার পেছনে মানুষের হাজারটা মতলব থাকে—কেউ তথ্যের ঝুলি ভরতে চায়, কেউ স্রেফ অলস দ্বিপ্রহর কাটানোর খোরাক খোঁজে, কেউ আবার পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার চিন্তায় অস্থির। কখনো বা উদ্দেশ্য হয় প্রেয়সীকে মুগ্ধ করা, কখনো আবার চোখের পাতা ভারী করে আনা ঘুমের আয়োজন, কিংবা কোনো অদ্ভুত শিহরণে সেই ঘুমকে চিরতরে বিদেয় দেওয়া। কিন্তু জীবনের কোনো এক নিভৃত মুহূর্তে একটা বই হঠাৎ এমনভাবে হাত বাড়িয়ে দেয় যে আপনার চমক ভেঙে যায়। আপনি তখন বুঝতে পারেন, আপনি স্রেফ পাতা উল্টে যাচ্ছেন না, বরং এক পরম নিশ্চিন্তিতে কোনো এক মানুষের মুখোমুখি বসে আছেন।
সেই মানুষটি হয়তো রক্ত-মাংসের শরীরে আপনার সামনে সশরীরে উপস্থিত নেই।
অথচ তিনি আছেন।
এক রাতে আমার নিজের এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
জায়গাটা ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার লাগুনা বিচের একটা ছোট কটেজ। “কটেজ” বললে আবার মনে করবেন সমুদ্রের ধারে সাদা পর্দা উড়ছে, জানালা খুললেই প্যাসিফিক মহাসাগর, সামনে কাঠের ডেক, আমি বসে আছি কফির কাপ হাতে, জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবছি।
আমার ভাগ্যে এত সৌন্দর্য বরাদ্দ ছিল না।
ঘরটা প্রায় সারাদিন ছায়ার মধ্যে থাকত। জানালা দিয়ে যে দৃশ্য পাওয়া যেত তার মধ্যে প্রকৃতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল সুপারমার্কেটের পার্কিং লট।
সকালে গাড়ি আসে।
বিকেলে গাড়ি যায়।
কখনো কেউ ট্রলি ঠিক জায়গায় ফেরত রাখে না।
মানবসভ্যতার একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলতে পারেন।
আমার একটা ছোট kitchenette ছিল। পূর্ণাঙ্গ চুলা নেই, toaster oven আছে। এমন এক ব্যবস্থা যাতে আপনি রান্না করার চেষ্টা করলে খাবারের আগে নিজের আত্মসম্মান পুড়ে যায়।
সেই রাতে আমি কাজ থেকে ফিরেছি অনেক দেরিতে।
আমি ঘরে ফিরলাম।
শরীর ক্লান্ত।
মাথায় সারাদিনের শব্দ।
এরকম রাতে মানুষের অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে।
ঘুমাতে ইচ্ছে করে।
গরম জল দিয়ে গোসল করতে ইচ্ছে করে।
চুপ করে বসতে ইচ্ছে করে।
আমার ইচ্ছে করল মহান সাহিত্য পড়ি।
এখন স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এর মধ্যে সামান্য আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষাও ছিল।
মানুষ তো নিজের কাছেও একটা মানসম্মান রাখতে চায়।
তাই ভাবলাম, এই অবস্থায় যদি Walt Whitman পড়ি, তাহলে চরিত্রের কিছু উন্নতি হতে পারে।
পাপের পরে মানুষ যেমন গঙ্গাস্নান করে, আমি Leaves of Grass খুললাম।
Whitman-এর সঙ্গে আমার পরিচয় নতুন কিছু নয়। জানতাম তিনি বড় কবি। জানতাম আমেরিকান কবিতার ইতিহাসে তাঁর জায়গা বিরাট। তাঁর দীর্ঘ পঙ্ক্তি, শরীর, গণতন্ত্র, যৌনতা, প্রকৃতি, মানুষ, শ্রমিক, প্রেম, মৃত্যু, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পৃথিবী।
কিন্তু বড় লেখককে “বড় লেখক” বলে জানা আর এক রাতে তাঁর হাতে ধরা পড়ে যাওয়া এক ব্যাপার নয়।
আমি পড়তে পড়তে একটা জায়গায় এসে থামলাম।
Whitman যেন সরাসরি পাঠককে বলছেন, বন্ধু, তুমি যে জিনিসটা হাতে ধরে আছ, এটা শুধু একটা বই ভেবে ভুল কোরো না।
তুমি একজন মানুষকে ছুঁয়ে আছ।
তুমি আমাকে ছুঁয়েছ।
তারপর তিনি যেন জিজ্ঞেস করছেন, এখন কি রাত?
আমরা কি এখানে একা?
আমি পড়া থামালাম।
কারণ সত্যিই রাত।
আর সত্যিই আমি একা।
এখানে “একা” কথাটাও আবার ঠিক নয়।
কয়েক সেকেন্ড আগে একা ছিলাম।
এখন ঘরে Walt Whitman আছেন।
লোকটি মারা গেছেন ১৮৯২ সালে।
এই তথ্য আমি জানি।
তবু সেই মুহূর্তে তথ্যটির কোনো ব্যবহার নেই।
তিনি লিখছেন, যে আমাকে ধরে আছে, আমিও তাকে ধরে আছি।
মৃত্যু আমাকে পৃষ্ঠা থেকে তোমার দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
তোমার আঙুল আমাকে ছুঁচ্ছে।
তোমার নিশ্বাস আমার চারদিকে শিশিরের মতো পড়ছে।
তিনি পাঠককে একটা চুম্বন দিয়ে বিদায় নিচ্ছেন।
বলছেন, আমাকে ভুলে যেও না।
আমি আবার ফিরে আসতে পারি।
এবং শেষে যেন শরীর ছেড়ে, কাগজ ছেড়ে, সময় ছেড়ে এক মৃত মানুষ পাঠকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি চলে গেলাম, কিন্তু আমি আছি।
আমি বইটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম।
সত্যিই কি আমি Whitman-এর চুম্বন অনুভব করেছিলাম?
শুনলে একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়।
আমি নিজেও কাউকে কফিশপে বসে এই কথা বলতে শুনলে হয়তো চেয়ার একটু দূরে সরিয়ে বসতাম।
কিন্তু সাহিত্য নিয়ে সব সত্যি কথা যুক্তির আদালতে দাঁড় করালে একটু পাগলামির মতো শোনায়।
আপনি বলছেন, “একটা উপন্যাস পড়ে আমি কেঁদেছি।”
লোকটা জিজ্ঞেস করল, “ঘটনাটা সত্যি?”
বললেন, “না।”
“লোকগুলো সত্যি?”
“না।”
“যে মারা গেছে সে সত্যিই মারা গেছে?”
“না।”
“তাহলে কাঁদলেন কেন?”
এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই।
সাহিত্য এই উত্তরহীন জায়গাতেই কাজ করে।
সেই রাতে আমার মধ্যে যা ঘটেছিল, তাকে চুম্বন বলুন, বিভ্রম বলুন, গভীর পাঠ বলুন, ক্লান্তির ফল বলুন, আমি জানতাম কিছু একটা বদলে গেছে।
এর আগে পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করতাম মহান সাহিত্য সময় অতিক্রম করতে পারে।
সেই রাতে বিশ্বাসের জায়গায় অভিজ্ঞতা এল।
আমি বুঝলাম, Whitman যখন লিখেছিলেন, তখন তিনি ভবিষ্যতের পাঠককে কল্পনা করেছিলেন।
তাঁর সময়ের কোনো পাঠককে শুধু নয়।
আমাকেও।
আমার পরের কাউকেও।
তিনি জানতেন না আমার নাম।
জানতেন না Laguna Beach কোথায় আমার ঘর হবে।
জানতেন না আমার রান্নাঘরে stove থাকবে না, toaster oven থাকবে।
জানতেন না আমার টাইপরাইটারের টেবিলটা নড়বড়ে।
জানতেন না জানালা দিয়ে সমুদ্রের বদলে supermarket parking lot দেখা যাবে।
তবু তিনি আমাকে জানতেন।
কারণ মানুষ হিসেবে আমার যে মৌলিক অবস্থাটা, একা থাকা, ছোঁয়া পেতে চাওয়া, কারও কাছে পৌঁছাতে চাওয়া, মৃত্যুকে ভয় পাওয়া, ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে চাওয়া, এসব তাঁর পরিচিত।
এখানেই মৃত লেখক আর জীবিত পাঠকের দেখা হয়।
সময় দুদিকে চলে।
Whitman ১৮৯২ সালে মারা গেলেন।
আমি তাঁর অনেক পরে বসে তাঁকে পড়ছি।
কিন্তু পড়ার মুহূর্তে তিনি আমার ভবিষ্যৎ কল্পনা করছেন আর আমি তাঁর অতীত কল্পনা করছি।
তিনি ভাবছেন, একদিন কেউ আমাকে পড়বে।
আমি ভাবছি, একদিন এই মানুষটি বসে এই লাইনগুলো লিখেছিল।
দুই দিকের কল্পনা মাঝখানে এসে ধাক্কা খেল।
সেই জায়গাটার নাম পাঠ।
সেই রাতের আগে আমি বইকে ভালোবাসতাম, কিন্তু আমার ভালোবাসার মধ্যে খানিকটা ভক্তির ভাব ছিল।
বই মানে গুরুগম্ভীর ব্যাপার।
বইয়ের তাক ঠিকঠাক থাকবে।
পাতা ভাঁজ করা যাবে না।
কলমের দাগ দেওয়া নিয়ে বিবেকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
বিখ্যাত লেখকের বই পড়ার আগে একটু মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।
যেন বই পড়তে বসিনি, কোনো বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছি।
এই ধরনের ভালোবাসায় দূরত্ব থাকে।
আপনি মন্দিরে দেবতাকে ভালোবাসেন, কিন্তু দেবতাকে গিয়ে বলেন না, “দাদা, আজকে দিনটা খুব বাজে গেল।”
সেই রাতে Whitman সেই দূরত্বটাই ভেঙে দিলেন।
তিনি বইয়ের ভেতর থেকে নেমে এসে বললেন, “আমি তো এখানেই।”
সাহিত্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেদিন থেকে একটু বদলে গেল।
বই আর শুধু জ্ঞানের পাত্র থাকল না।
বই হয়ে উঠল মানুষের সংরক্ষিত উপস্থিতি।
একজন মানুষ তাঁর চেতনার একটা অংশ কাগজে রেখে যেতে পারেন।
এই ব্যাপারটা যত ভাববেন, তত অদ্ভুত লাগবে।
মানুষের শরীরের মেয়াদ আছে।
কণ্ঠস্বর থেমে যায়।
চোখ বন্ধ হয়।
হাত আর নড়ে না।
কিন্তু একদিন সেই হাত লিখেছিল:
আমি ভয় পেয়েছিলাম।
আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি ঈর্ষা করেছি।
আমি ভুল করেছি।
আমি তোমাকে মনে রেখেছি।
আমি মরতে চাই না।
আমি মরব।
তুমি যখন এটা পড়বে, আমি থাকব না।
এই বাক্যগুলো পড়ে দুইশো বছর পর আরেকজন মানুষের বুক কেঁপে ওঠে।
মার্কনি যদি সত্যিই মৃতদের কণ্ঠ ধরতে চেয়ে থাকেন, তিনি হয়তো যন্ত্রের দিক দিয়ে ভুল জায়গায় খুঁজেছিলেন।
অ্যান্টেনা আকাশের দিকে তুলেছিলেন।
তাকের দিকে তুললে সহজ হত।
লাইব্রেরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় séance room।
এখানে মৃতেরা চুপ করে সারি দিয়ে বসে আছে।
Plato আছেন।
Shakespeare আছেন।
Virginia Woolf আছেন।
Dostoevsky আছেন।
Tagore আছেন।
Kafka আছেন।
Whitman আছেন।
আপনি যাকে চান নামিয়ে নিন।
কেউ আপত্তি করবে না।
রাত তিনটায় Tolstoy-কে ডাকলেও তিনি বলবেন না, “এত রাতে ফোন করেছেন কেন?”
অবশ্য Tolstoy-এর সঙ্গে বেশি রাত পর্যন্ত কথা না বলাই ভালো। লোকটা সংসার, ঈশ্বর, নৈতিকতা, মৃত্যু সব একসঙ্গে তুলবেন। ঘুম আর হবে না।
Kafka তুলনায় সুবিধার। তাঁর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বললেই বুঝবেন অফিস নিয়ে আপনার অভিযোগ এখনও সহনীয় পর্যায়ে আছে।
বইয়ের আরেকটি আশ্চর্য গুণ হল, মৃত লেখক বয়স বাড়ান না, পাঠক বাড়ে।
আপনি বিশ বছর বয়সে Leaves of Grass পড়লেন একরকম।
চল্লিশে আবার পড়লেন।
বই একই।
পাঠক বদলে গেছে।
ষাটে গিয়ে খুললে আরেকজন Whitman বেরিয়ে আসতে পারেন।
আসলে বইয়ের ভেতরের লোকটা পুরোপুরি বইয়ে নেই।
অর্ধেক বইয়ে।
অর্ধেক আপনার মধ্যে।
এই কারণে একই বই দুই মানুষ দুইভাবে পড়ে।
একজন প্রেমের কবিতা পড়ে প্রেমিকাকে মনে করে।
আরেকজন মৃত স্ত্রীকে।
একজন বাবার গল্প পড়ে নিজের বাবাকে ক্ষমা করে।
আরেকজন সিদ্ধান্ত নেয়, সে বাবার মতো হবে না।
লেখক বাক্য দেন।
পাঠক জীবন ঢেলে দেয়।
তারপর সাহিত্য তৈরি হয়।
সেই Laguna Beach-এর রাতটা আমার কাছে সেই শিক্ষার রাত।
দিনের বেলায় আমি খুব সাধারণ কাজ করেছি।
সুপারমার্কেটের পার্কিং লটের দিকে তাকিয়েছি।
রাতে একজন মৃত কবি এসে আমাকে স্পর্শ করলেন।
মজার ব্যাপার হল, Whitman আমার ঘরের জীর্ণতা নিয়ে একটুও মাথা ঘামালেন না।
মহান সাহিত্য বোধহয় এই কারণেই মহান।
সে আপনার ড্রয়িংরুমের সোফার দাম দেখে নাক শিটকায় না।
আপনার ব্যাংক ব্যালান্স দেখে না।
আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক না বারটেন্ডার, তাতেও তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
সে কেবল জানতে চায়, আপনি মানুষ কি না।
আপনার ভেতরে ভয় আছে?
আকাঙ্ক্ষা আছে?
একাকিত্ব আছে?
মৃত্যুর চিন্তা আছে?
কারও স্পর্শের প্রয়োজন আছে?
তাহলে বসুন।
কথা হবে।
আমরা অনেক সময় অমরত্বকে খুব বড় করে দেখি।
পিরামিড বানাতে হবে।
মূর্তি বসাতে হবে।
নিজের নামের রাস্তা করতে হবে।
বংশধর থাকতে হবে।
বিশাল প্রতিষ্ঠান বানাতে হবে।
অথচ একজন লেখক হয়তো ছোট একটা ঘরে বসে কয়েকটা বাক্য লিখলেন।
তারপর মরে গেলেন।
একশো বছর পরে অন্য একটা ছোট ঘরে একজন অচেনা মানুষ সেই বাক্য পড়ে বলল, “আমি তোমাকে শুনতে পাচ্ছি।”
মার্কনির যন্ত্রে মৃত মানুষের কণ্ঠ ধরা পড়েছিল কি না জানি না।
আমার জীবনে এক রাতে পড়েছিল।
সেটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছিল না।
কাগজের ওপর কালি ছিল।
আরও ঠিক করে বললে, কালি পর্যন্ত নয়।
কালির মধ্যে জমে থাকা এক মানুষের মন।
সেই রাতে বই বন্ধ করার পরও অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম।
বাইরে পার্কিং লট।
ঘরে পুরোনো টাইপরাইটার।
toaster oven।
দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর।
কোথাও কোনো অলৌকিক আলো জ্বলেনি।
আকাশ ফেটে Whitman নামেননি।
কোনো বেহালাও বাজেনি।
শুধু আমার হাতে একটা বই ছিল।
আর হঠাৎ মনে হয়েছিল, একজন মৃত মানুষ আমার পাশে বসে আছেন।
তারপর থেকে বই ভালোবাসার অর্থ আমার কাছে একটু অন্যরকম।
আগে বইকে শ্রদ্ধা করতাম।
সেই রাতের পর বইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হল।
শ্রদ্ধার মানুষকে দূর থেকে প্রণাম করা যায়।
ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজের লজ্জার কথাও বলা যায়।
নিজের ব্যর্থতার কথাও।
এমনকি এই কথাটাও বলা যায় যে, “আজ আমার দিনটা ভালো যায়নি।”
আর কোনো কোনো রাতে, দেড়শো বছর আগে মারা যাওয়া একজন কবি পৃষ্ঠা থেকে উঠে এসে উত্তর দেন,
“বসো। আমি আছি।”
এই জন্যই আমি বই পড়ি।
-রিটন খান
riton.us/notes


