
ভালো লেখা কী? উত্তরটি অনেকে সহজেই দিয়ে দেন: যে লেখা পড়তে ভালো লাগে, সেটিই ভালো লেখা। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এই উত্তর যথেষ্ট নয়। অনেক লেখা পড়তে ভালো লাগে, কারণ সেখানে চমৎকার শব্দ, ঝকঝকে বাক্য, সুন্দর উপমা থাকে। পড়া শেষ হলে দেখা যায়, লেখাটি আসলে কিছুই বলেনি। আবার এমন লেখাও আছে, যার বিষয় কঠিন, ভাষা সংযত, আনন্দের উপকরণ কম; তবু পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক যেন আমাদের হাত ধরে একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে জানালাগুলো খুলে দিচ্ছেন।
তাহলে ভালো লেখার মূল লক্ষণ কী?
জটিল ধারণাকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলা। আর অকারণে সহজ কথাকে দুর্বোধ্য করে তোলা খারাপ লেখার একটি প্রধান লক্ষণ।
এখানে প্রথমেই একটি প্রশ্ন উঠবে: জটিল বিষয়কে সহজ করে বলা মানে কী? বিষয়কে ছোট করে ফেলা? কঠিন অংশ বাদ দেওয়া? পাঠকের সুবিধার জন্য সত্যকে সরলীকৃত করে তার হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া?
মোটেই তা নয়।
জটিলতা এবং দুর্বোধ্যতা এক জিনিস নয়। পৃথিবী জটিল। মানুষের মন জটিল। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, প্রেম, ধর্ম, ইতিহাস, এমনকি একটি সাধারণ পারিবারিক বিবাদও নানা কারণ, স্বার্থ, স্মৃতি ও ভুল বোঝাবুঝির সমভিব্যাহারে গঠিত। লেখকের কাজ সেই জটিলতাকে অস্বীকার করা নয়। বরং জটিলতার ভিতরকার সম্পর্কগুলো পাঠকের সামনে ক্রমে উন্মোচিত করা।
ধরা যাক, কেউ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে লিখছেন। তিনি যদি বলেন, “সময় আপেক্ষিক”, পাঠক হয়তো বাক্যটি মনে রাখবেন, কিন্তু বিষয়টি বুঝবেন না। সময় কার তুলনায় আপেক্ষিক? কেন আপেক্ষিক? দ্রুতগতি এবং মহাকর্ষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? ঘড়ির কাঁটা কি সত্যিই ধীর হয়ে যায়, না কি সময় মাপার পদ্ধতিই বদলায়? লেখক যদি এসব প্রশ্ন একে একে সামনে আনেন, উদাহরণ দেন, প্রয়োজনীয় শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করেন, তবে কঠিন তত্ত্বটি পাঠকের কাছে প্রবেশযোগ্য হয়ে ওঠে।
এখানে লেখককে জ্ঞান কমাতে হয় না। তাঁকে নিজের জ্ঞানকে সুশৃঙ্খল করতে হয়।
এই জায়গাটিই আসল। অনেক লেখক মনে করেন, তাঁরা কোনো বিষয় জানেন বলেই পাঠকও তা বুঝবেন। নিজের মাথায় ধারণাটি পরিষ্কার থাকলেই হলো। বাক্যের মধ্যে তার ছায়া পড়বে। কিন্তু পাঠকের মাথায় তো সেই প্রস্তুতি নেই। তিনি লেখকের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়েননি, একই বই পড়েননি, একই গবেষণার মধ্য দিয়ে যাননি। লেখক যদি মাঝপথ থেকে কথা শুরু করেন, পাঠক কোথায় দাঁড়াবেন?
প্রশ্নটা এই: পাঠককে কি লেখকের জ্ঞানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে, না লেখক পাঠকের বোধের দিকে এক পা এগিয়ে আসবেন?
ভালো লেখক দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন।
তিনি জানেন, পাঠককে ছোট করে দেখলে লেখা বড় হয় না। কঠিন শব্দের স্তূপ, অপ্রয়োজনীয় পরিভাষা, দীর্ঘ বাক্য এবং অস্পষ্ট যুক্তির সাহায্যে নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করা যায়, কিন্তু যোগাযোগ তৈরি করা যায় না। কোনো কোনো লেখায় দেখা যায়, একটি সাধারণ বক্তব্যকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন সেটি রাষ্ট্রীয় গোপন নথি। “মানুষ ভুল করতে পারে” কথাটি বলার জন্য লেখক লিখলেন, “মানবীয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া অনিবার্যভাবে সম্ভাব্য ত্রুটির অন্তর্নিহিত কাঠামো দ্বারা পরিবেষ্টিত।” পাঠক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বুঝলেন, এতক্ষণ ধরে লেখক তাঁকে জানাচ্ছিলেন যে মানুষ ভুল করে।
এখানে একটি অদ্ভুত প্রবণতা কাজ করে। সহজ ভাষাকে অনেকে নিম্নমানের ভাষা ভাবেন। যেন সাধারণ পাঠক বুঝতে পারলে লেখকের মর্যাদা কমে যাবে। অথচ একটি কঠিন কথা সহজে বলা কঠিন। সহজ বাক্যের পিছনে বহু চিন্তা, বাছাই এবং আত্মসংযম থাকে। দুর্বোধ্য বাক্য অনেক সময় লেখকের অক্ষমতাকে আড়াল করে। কথাটি পরিষ্কার করে বলতে না পারলে শব্দ বাড়ে, বাক্য দীর্ঘ হয়, বিশেষণ জমা হয়, পরিভাষা এসে বসে। সুবিধেটা এখানেই। পাঠক লেখকের অজ্ঞতা ধরতে পারেন না, কারণ তিনি লেখাটিই বুঝতে পারেননি।
তবে সব সহজ লেখা কি ভালো লেখা?
অবশ্যই নয়।
জটিল বিষয়কে সহজ করতে গিয়ে কেউ যদি তার প্রয়োজনীয় সূক্ষ্মতা, বিরোধ, সীমা এবং অনিশ্চয়তা বাদ দেন, তাহলে লেখা পাঠযোগ্য হলেও সত্যনিষ্ঠ থাকে না। ইতিহাসকে যদি বলা হয়, “একজন ভালো মানুষ এসে দেশকে বাঁচালেন”, তবে গল্পটি সহজ হলো, ইতিহাস বোঝা হলো না। অর্থনীতিকে যদি বলা হয়, “সব সমস্যার কারণ লোভী মানুষ”, তবে বক্তব্যটি আবেগপূর্ণ হলো, বিশ্লেষণ হলো না। বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্বকে যদি কেবল একটি চটকদার উপমায় নামিয়ে আনা হয়, তবে পাঠকের মনে একটি ছবি তৈরি হতে পারে, ধারণাটি তৈরি নাও হতে পারে।
সরলতা এবং সরলীকরণের মধ্যে এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
সরলতা জটিলতার ভিতর থেকে প্রয়োজনীয় রেখাগুলো স্পষ্ট করে। সরলীকরণ জটিলতার অংশ কেটে ফেলে। প্রথমটি পাঠককে বুঝতে সাহায্য করে, দ্বিতীয়টি পাঠককে ভুল বুঝতে শেখায়।
অকারণে জটিল করা লেখার আর একটি সমস্যা আছে। তা পাঠককে কথোপকথন থেকে বের করে দেয়। লেখক তখন পাঠকের সঙ্গে কথা বলেন না, পাঠকের উপর কথা বলেন। পাঠক কী জানেন, কী জানেন না, কোথায় থামতে পারেন, কোথায় প্রশ্ন তুলবেন, তাঁর কোনো হিসাব থাকে না। লেখকের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে নিজের বক্তব্যকে গুরুগম্ভীর দেখানো।
কিন্তু একটি লেখা তো একতরফা বক্তৃতা নয়। সেখানে লেখক লিখছেন, পাঠক পড়ছেন, এবং পাঠের ভিতর দিয়ে একটি অদৃশ্য সংলাপ গড়ে উঠছে। পাঠক যখন বলেন, “এখানে কী বোঝাতে চাইছেন?”, তখন লেখককে উত্তর দিতে হয়। পাঠক যখন বলেন, “এর প্রমাণ কী?”, তখন লেখককে থামতে হয়। পাঠক যখন বলেন, “এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন কী করে?”, তখন লেখার যুক্তি পরীক্ষা দিতে শুরু করে।
ভালো লেখা সেই পরীক্ষাকে ভয় পায় না।
বরং ভালো লেখক নিজের বক্তব্যের পথে পাঠকের জন্য চিহ্ন রেখে যান। তিনি প্রয়োজনমতো উদাহরণ দেন, কিন্তু উদাহরণকে যুক্তির বদলি করেন না। তিনি পরিভাষা ব্যবহার করেন, কিন্তু তার অর্থ ব্যাখ্যা করেন। তিনি দীর্ঘ বাক্য লেখেন, কিন্তু বাক্যের ভিতরকার সম্পর্কগুলো অস্পষ্ট রাখেন না। তিনি ছোট বাক্যও লেখেন। কারণ সব কথা একই ছন্দে বলা যায় না।
একটি জটিল ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক যদি প্রথমেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, পরে কোনো কারণ না দেন, তাহলে পাঠক তাঁর সঙ্গে চলার সুযোগ পান না। ভালো লেখা ঘটনাকে সামনে আনে, কারণ দেখায়, প্রশ্ন তোলে, আপত্তির সম্ভাবনা বিবেচনা করে, তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পাঠক তখন শুধু লেখকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথটিও দেখতে পান।
এখানে লেখকের দায়িত্ব আছে। অস্পষ্ট লেখা শুধু ভাষাগত দুর্বলতা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ক্ষমতার হাতিয়ার। আইন জটিল ভাষায় লেখা হলে সাধারণ মানুষ নিজের অধিকার বুঝতে পারেন না। চিকিৎসার ব্যাখ্যা দুর্বোধ্য হলে রোগী নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রশাসনিক ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোরালো হলে দায় এড়ানো সহজ হয়। অর্থনৈতিক প্রতিবেদন এমনভাবে লেখা হলে যে কেবল বিশেষজ্ঞ ছাড়া কেউ বুঝতে না পারেন, ক্ষতির বোঝা সাধারণ মানুষের উপরই পড়ে।
তাই ভালো লেখা কেবল সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়। তা জ্ঞানের গণতন্ত্রের সঙ্গেও যুক্ত।
আমরা যারা লিখি, তাদের মাঝেমধ্যে নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার: আমি কি সত্যিই বিষয়টি জটিল বলে কঠিন ভাষা ব্যবহার করছি, না বিষয়টি নিজেই আমার কাছে সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়? আমি কি পাঠককে চিন্তার পথে নিয়ে যাচ্ছি, না শব্দের জঙ্গলে ফেলে রেখে আসছি? আমার বাক্য কি ধারণাকে বহন করছে, না ধারণার অভাব ঢেকে রাখছে?
প্রশ্নগুলো জটিল। কিন্তু প্রয়োজনীয়।
ভালো লেখা পাঠকের সামনে জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। দুর্বল লেখা দরজার সামনে তালা ঝোলায় এবং চাবিটিকে দুর্লভ শব্দের ভেতর লুকিয়ে রাখে। আর সবচেয়ে খারাপ লেখা তখনই জন্ম নেয়, যখন লেখক একটি সহজ কথাকে এমনভাবে সাজান যে পাঠক শেষে নিজের বুদ্ধিকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন।
লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে পরাস্ত করা নয়। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো। জটিল পৃথিবীকে তার সমস্ত দ্বন্দ্ব, অনিশ্চয়তা ও গভীরতা সহকারে বোঝার মতো করে তোলা। বাকিটা শব্দের কারসাজি।


