সাত দশকের বেশি সময় ধরে Pablo Diego José Francisco de Paula Juan Nepomuceno Crispín Crispiano María Remedios de la Santísima Trinidad Ruiz Picasso যেভাবে নারীদের জীবনে ঢুকেছেন, আমার মতে এটা এক ধরনের ধারাবাহিক দখল। উনার নামটা বড়, ক্যানভাসটা আরও বড়, আর মানুষের জীবনে তাঁর ছায়া আরও বড়। নাতনি মারিনা পিকাসোর ভাষায়, দাদু ছিলেন এক রক্তচোষা প্রাণী। রং তুলতে রক্ত লাগত। শুধু রং নয়, শিল্পীর সইয়ের নিচে লেগে থাকত সেই রক্ত, যারা তাঁকে ভালোবেসেছিল তাদেরই। তিনি প্রেমিকাদের পশুর মতো ব্যবহার করতেন, বশ করতেন, মোহিত করতেন, গিলে খেতেন, তারপর ক্যানভাসে চ্যাপ্টা করে দিতেন। বাকিটা ইতিহাসের পাদটীকা।
দীর্ঘদিন শিল্প-ইতিহাস এই পাদটীকাকেই মূল লেখা বানাতে চায়নি। আধুনিকতাবাদের অট্টালিকা উঠেছে যেসব ছবির ওপর, সেখানে ১৯০৭-এর Les Demoiselles d’Avignon থেকে ১৯৩৭-এর Guernica পর্যন্ত পথটা এতটাই মহান যে ঘরের ভাঙাচোরা শব্দ শোনা যায় না। দুই স্ত্রী, চার সহবাসী, অজস্র শারীরিক সম্পর্ক। তো কী হয়েছে। এই সব করলে প্রতিভা নাকি লাইসেন্স পায়। এই পুরুষালি ছাড়পত্রেই পিকাসো এতদিন দিব্যি হেঁটে গেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসবিদেরা, বেশিরভাগই নারী অবশ্য, এই ছাড়পত্র মানতে রাজি নন। তাঁরা মারিনার পাশেই দাঁড়ান।
বইটিতে উঠে এসেছে পিকাসোর নারীরা নিজেরা কী বলেছিলেন। কিছু স্মৃতিকথা আছে, কিছু সাক্ষাৎকার আছে, কিন্তু সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই অবহেলার জায়গাতেই ঢোকেন Sue Roe। ভার্জিনিয়া উল্ফ নিয়ে কাজ করা এই ব্রিটিশ লেখক বুঝেছিলেন, বিংশ শতকের সবচেয়ে নথিভুক্ত শিল্পী পিকাসো হলেও তাঁর সঙ্গে থাকা ফার্নান্দ, ওলগা, মারি-থেরেস, ডোরা, ফ্রাঁসোয়াজ, জাকলিনদের বরাবরই মঞ্চের বাইরে রাখা হয়েছে। তাঁরা শুধু ‘মিউজ’, শুধু ‘সঙ্গিনী’। মানুষ হিসেবে তাঁদের জীবন যেন অপ্রাসঙ্গিক।
রো এই ছয়জনকেই ফের আলোয় আনেন। আর আলোটা সুখকর নয়। পিকাসো কখনও অসাধারণ সঙ্গী, বাসন মাজছেন, বাচ্চা কোলে নিচ্ছেন, নিখুঁত উপহার দিচ্ছেন। আবার একই সঙ্গে বাগানের শেডে লুকিয়ে থাকা প্রেমিকা, আর সর্বত্র সেই রক্তের দাগ। Hidden Portraits বইটি জিজ্ঞেস করে, কোন ধরনের নারী এমন মানুষের সঙ্গে থাকতে রাজি হন।
রোর ছবিতে এই ছয়জন আধুনিক নারী নির্বোধ নন। তাঁরা শিল্প বোঝেন, পিকাসোর কাজকে শ্রদ্ধা করেন, স্টুডিও ভাগ করেন, ছুটি কাটান। তবু তাঁরা সবাই উপেক্ষা করেন পিকাসোর মায়ের সেই সতর্কবাণী, যা তাঁর প্রথম স্ত্রী ওলগাকে বলেছিলেন, আমার ছেলের সঙ্গে কোনও নারী সুখী হতে পারবে না। প্রতি দশ বছরে একবার করে পিকাসো একটা জীবন ছিঁড়ে ফেলেন, আরেকটা শুরু করেন। এই জটিল প্রেমকালপঞ্জি উদ্ধার করাই রোর বড় কাজ।
সমস্যাটা নিষ্ঠুরতা নয়। আসলে পিকাসো ছিলেন বিয়ে পাগল মানুষ। কাউকে পুরোপুরি ছাড়তে চাইতেন না। বয়সের ফারাকও বাড়ত। শেষ স্ত্রী তাঁর থেকে ছেচল্লিশ বছরের ছোট। এই ধরনের সমষ্টিগত জীবনী নতুন নয়। কিন্তু রো প্লুটার্ক আর লিটন স্ট্র্যাচির ধারাকে আধুনিকভাবে নেন। তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার। জীবনীকার বিচারক নন। তথ্য জুড়ে গোপন ছবিটা উদ্ধার করাই কাজ। তবু সমস্যা থেকেই যায়। রোর গদ্য অপ্রয়োজনীয় উচ্ছ্বাসে হাঁপায়। কাঠামোও টলমল। ছয়জনের মধ্যে তিনজন সত্যিই টানেন। ডোরা মার, ফ্রাঁসোয়াজ জিলো, আর বহুদিন অবহেলিত জাকলিন রোক। বাকিদের গল্পে গতি কমে।
তবুও একেকজনের জীবনে প্রবেশ করার সুযোগ মেলে। যেমন—ফার্নান্দ রোজ, যিনি ছিলেন পিকাসোর প্রথম দিকের ‘গোলাপী পর্বের’ প্রাণ। এরপর ওলগা খোখলোভা, যার সাথে দিয়াগিলেভের ব্যালে রুসে কাজ করার সময় দেখা হয়। মারি-থেরেস ওয়াল্টারকে তিনি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের সামনে আবিষ্কার করেন। আর ডোরা মারের সঙ্গে পরিচয় হয় লে দ্যু ম্যাগো ক্যাফেতে, যখন তিনি কালো গ্লাভস পরে ছুরি খেলা করছিলেন—পিকাসো তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ হন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ সালের সেই সময়টি ছিল চরম বিশৃঙ্খলার। একদিকে মারি-থেরেসের সন্তান জন্ম নিচ্ছে, অন্যদিকে ওলগার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক তখনও ছিন্ন হয়নি। এর মধ্যেই ফ্যাসিবাদবিরোধী ডোরা ‘গের্নিকা’ তৈরির প্রতিটি ধাপ ক্যামেরায় ধরে রাখছেন।
একজনই বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। ফ্রাঁসোয়াজ জিলো। ক্যাফেতে আলাপ, কালোবাজারের চেরি, আর সেই তাচ্ছিল্য, তোমার মতো মেয়েরা ছবি আঁকতে পারে না। তিনি চলে যান। পরে লেখেন Life With Picasso। বিয়ে করেন জোনাস সল্ককে। বলেন, সিংহ সিংহীর সঙ্গেই থাকে। তাঁর ছবিও কোটি ডলারে বিকোয়। তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী, যিনি পিকাসোকে না বলতে পেরেছিলেন।
জিলো না থাকলে বইটা কেবল নিষ্ঠুরতার একটা লিস্ট হতো। পিকাসো নারীদের কখনও দেবী, কখনও দোরম্যাট ভাবতেন। রোর বইটা ফের ভাবতে বাধ্য করে যে প্রশ্নটা পিকাসোর শিল্পের নয়। প্রশ্নটা, আমরা আর কতদিন প্রতিভার নামে এই ক্ষতগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাব।




