একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি; যে বইগুলোকে আমরা “রেফারেন্স বই” বলে আলমারির এক কোণে ঠেলে রাখি, সেগুলোর চেহারা সাধারণত এমন যেন তারা নিজেরাই পড়তে অনিচ্ছুক; মোটা, গম্ভীর, আর একটু দূরত্ব বজায় রাখা স্বভাবের। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখি, সেই রেফারেন্স বই-ই চুপচাপ এসে পাশে বসে বলছে, একটু গল্প করি?
এই যে অ্যারিস্টটলের Poetics, নাম শুনলেই ক্লাসরুমের গন্ধ; কাঠের বেঞ্চ, বোর্ডে চক, আর পরীক্ষার আগের রাতের আতঙ্ক। অথচ বইটা আসলে গল্প নিয়ে। গল্প কীভাবে কাজ করে, কেন একটা গল্প আমাদের টানে, আরেকটা গল্প মাঝপথেই ফেলে রাখি; এইসব নিয়ে এক ধরনের বিশ্লেষণ। সেই হিসেবে, এটাকে রেফারেন্স বই বলাটা একটু অন্যায়ই বোধহয়।
আমি নিজে বইটা কয়েকবার পড়েছি; প্রথমবার ২০১৮-১৯-এর দিকে, তারপর আবার কয়েক বছর পর, তখন মনে হলো আগেরবার যা বুঝেছিলাম তার অর্ধেকই ভুল; আর এই সাম্প্রতিক অনুবাদটা হাতে পেয়ে আবার পড়লাম, এবার মনে হলো, আচ্ছা, এবার হয়তো কিছুটা ঠিকঠাক বোঝা গেল। এই যে একই বই বারবার পড়েও নতুন মনে হওয়া; এটাও একটা আলাদা অভিজ্ঞতা।
এখানেই অনুবাদের গুরুত্ব চলে আসে। দুই হাজার বছরের পুরনো একটা লেখা; শব্দগুলো বদলে গেছে, বাক্যগুলো আমাদের আজকের ভাষার মতো নয়, আর ভাবটা মাঝেমধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে মনে হয় লেখক ইচ্ছে করেই একটু ধাঁধা রেখে গেছেন। সেখানে ফিলিপ ফ্রিম্যানের এই নতুন অনুবাদটা বেশ সহজ। তিনি এমনভাবে লিখেছেন যে পড়তে গিয়ে মনে হয় কেউ পাশে বসে ব্যাখ্যা করছে; শিক্ষকের মতো না, বরং একধরনের ধৈর্যশীল পাঠকের মতো, যে নিজেও বুঝে নিতে নিতে এগোচ্ছে।
অবশ্যই অনুবাদক কে, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিম্যান শুধু অনুবাদ করেননি, তিনি ক্লাসিক্স নিয়ে বহুদিন কাজ করেছেন, সিজার থেকে শুরু করে সিসেরো; সবাইকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। ফলে এই অনুবাদে একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। পাঠকের মনে হয়, আচ্ছা, এই মানুষটার হাতে থাকলে অন্তত শব্দগুলো অযথা বদলে যাবে না।
তারপর আসে সেই চিরচেনা প্রশ্ন; অ্যারিস্টটল আসলে কে? আমরা সবাই নামটা শুনেছি, কিন্তু প্রায়ই জানি না তিনি কী করেছেন। তিনি একরকম সবকিছু নিয়েই লিখেছেন—যুক্তি, নীতি, রাজনীতি, সৌন্দর্য, বিজ্ঞান। আজকের দিনে যাকে “পলিম্যাথ” বলা হয়, সেই ধরনের মানুষ। ফলে Poetics তার কাজের একটা ছোট অংশ, কিন্তু সেটাই গল্প বলার জগতে এত বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর Poetics আসলে কী? খুব সহজ করে বললে, এটি নাটক ও ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখা; কীভাবে একটি গল্প তৈরি হয়, কীভাবে তা কাজ করে। মজার ব্যাপার হলো, এর অর্ধেকটাই হারিয়ে গেছে; বিশেষ করে কমেডি নিয়ে যে অংশটা ছিল। ফলে আমরা যেন একটা অসম্পূর্ণ বই পড়ছি, যেখানে লেখক মাঝপথে বলে গেছেন, “আরও কিছু ছিল”; কিন্তু সেটা আর আমাদের হাতে নেই।
তবু যা আছে, তা-ই যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই এটাকে “গল্প বলার নিয়মের বই” বলে। যদিও “নিয়ম” শব্দটা একটু বিপজ্জনক; কারণ গল্প কখনোই পুরোপুরি নিয়ম মানে না। তবু এই বই একটা লেন্স, যার মাধ্যমে গল্পকে দেখা যায়।
অ্যারিস্টটলের প্রথম কথা; সব গল্পই একধরনের অনুকরণ, বা imitation। কিন্তু সেটা কথার অনুকরণ নয়, কাজের। চরিত্র কী বলছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে কী করছে। এই কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু লেখার সময় বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আমরা প্রায়ই কথায় গল্প চালাতে চাই, কাজের মধ্যে নয়।
তারপর তিনি বলেন, প্রতিটি গল্পের একটি উপযুক্ত দৈর্ঘ্য আছে। যতটুকু সময়ে একটি চরিত্র তার যাত্রা সম্পূর্ণ করে, ততটুকুই যথেষ্ট। এর বেশি হলে গল্প আলগা হয়ে যায়, কম হলে অসম্পূর্ণ লাগে। এখানে এসে আধুনিক টেলিভিশন সিরিজগুলোর কথা মনে পড়ে; একটা গল্প কখন শেষ হবে, সেটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, আরেকটা সিজন করা যাবে কি না। ফলে গল্পটা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা; গল্পের শুরু, মধ্যভাগ, আর শেষ থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবে অনেক গল্পই এই সরল কাঠামো হারিয়ে ফেলে।
এরপর আসে spectacle; অর্থাৎ চমক। অ্যারিস্টটল এটাকে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। আজকের দিনে এসে এই কথাটা একটু বিব্রত করে। কারণ এখন গল্পের চেয়ে চমকই বেশি বিক্রি হয়। বড় বাজেট, বড় ভিজ্যুয়াল, বড় আওয়াজ; কিন্তু গল্পটা মাঝে মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, চমক দিয়ে pity আর fear তৈরি করা গেলে সেটা লেখার দক্ষতা নয়, বরং প্রযোজনার খরচের ফল।
তার মতে, একটি ট্র্যাজেডির উদ্দেশ্য হলো এই pity আর fear তৈরি করা; যাতে দর্শক নিজের ভেতরের আবেগকে একধরনের পরিশুদ্ধির মধ্যে ফেলতে পারে। এই catharsis শব্দটা শুনতে একটু খটমট লাগে, কিন্তু আসলে আমরা সবাই এটা অনুভব করি; একটা ভালো গল্প দেখে বা পড়ে মনে হয়, কিছু একটা হালকা হলো।
আরেকটা বিতর্কিত বিষয়; plot চরিত্রের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেকেই এর উল্টোটা বলবেন। কিন্তু অ্যারিস্টটলের যুক্তি; চরিত্র যদি কিছু না করে, তবে সে যতই আকর্ষণীয় হোক, গল্প এগোবে না। একজন চরিত্র কিছু চায়, আর কিছু তার পথে বাধা দেয়; এই সংঘাতই গল্পের চালিকা শক্তি।
এই সংঘাত যত বেশি কাছের মানুষের মধ্যে হয় যেমন; বন্ধু, পরিবার; ততই তা তীব্র হয়। কারণ আবেগ সেখানে বেশি। আর সবচেয়ে ভালো ট্র্যাজেডি হয়, যখন ভালো মানুষ একটি ভুল করে। এই “ভুল”টাই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সবশেষে, একটা কথা তিনি বলে গেছেন; অনেক লেখক গল্পের গিঁট খুব ভালো বাঁধতে পারেন, কিন্তু খুলতে পারেন না। এই কথাটা পড়ার পর থেকে আমি যেকোনো গল্প পড়ে একটু ভাবি; এখানে গিঁটটা কোথায়, আর খুলল কীভাবে?
মজার ব্যাপার হলো, এত নিয়ম, এত বিশ্লেষণ; তবু বইটা পড়ে মনে হয় না কেউ আমাদের বাঁধতে চাইছে। বরং মনে হয়, কেউ একজন অনেকদিন ধরে গল্প দেখেছেন, শুনেছেন, ভেবেছেন, তারপর শান্তভাবে বলছেন; দেখো, ব্যাপারটা হয়তো এমনও হতে পারে।



