পাঠকের অন্তর্লোকে হুমায়ূন আহমেদ
সহজতার অন্তরালে: হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও উত্তরাধিকার। হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণদিবসে তাকে স্মরণ করি।
প্রমথ চৌধুরী একবার লিখেছিলেন, সাহিত্যের তত্ত্বজ্ঞান অবলম্বন করে সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না; প্রথমে আসে বস্তু, অর্থাৎ সৃষ্টির জীবন্ত শরীর, তার পরে আসে তত্ত্ব, ব্যাখ্যা ও বিচার। সাহিত্যস্রষ্টা তাঁর কাজ সমাপ্ত করে অতীতের অন্ধকারে মিলিয়ে যান, অথচ তত্ত্বজ্ঞ, সমালোচক ও ব্যাখ্যাকারীরা তাঁর রচনাকে ঘিরে অনন্তকাল কথা বলে চলেন। এই উক্তির মধ্যে সাহিত্য-ইতিহাসের এক গভীর সত্য নিহিত আছে। কারণ সাহিত্য প্রথমত জীবনের অভিজ্ঞতা, ভাষার অন্তর্লীন সুর, চরিত্রের চলাচল, মানুষের আনন্দ ও বেদনার রূপান্তরিত প্রকাশ; তত্ত্ব তার পরে এসে সেই সৃষ্টির প্রকৃতি, সীমা, শক্তি ও তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করে। বস্তু না থাকলে তত্ত্বের সমস্ত আয়োজন শূন্যে ঝুলে থাকে। অথচ বস্তু যথার্থ প্রাণময় হলে, তত্ত্বের অনুপস্থিতিতেও তার অস্তিত্ব পাঠকের চেতনায় বহমান থাকে।
হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণদিবসে তাঁকে স্মরণ করতে গেলে প্রমথ চৌধুরীর এই উক্তি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আমাদের সাহিত্যে যত বিতর্ক, তার একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে সাহিত্যতত্ত্বের মাপকাঠি ও পাঠকের অভিজ্ঞতার মধ্যকার ব্যবধান থেকে। একদিকে বিপুল পাঠকসমাজ তাঁকে তাদের জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ কথাকার হিসেবে গ্রহণ করেছে; অন্যদিকে তথাকথিত গম্ভীর সাহিত্যসমাজের একটি অংশ তাঁর জনপ্রিয়তাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। এই দ্বন্দ্ব বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়। সাহিত্য ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যে লেখক পাঠকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করেন, তাঁকে অনেক সময় সমালোচনার উচ্চাসন থেকে কিছুটা নিচু করে দেখা হয়। কারণ জনপ্রিয়তা যেন শিল্পগুণের বিপরীত, সহজতা যেন গভীরতার শত্রু, পাঠযোগ্যতা যেন সাহিত্যিক দুর্বলতার লক্ষণ। অথচ সাহিত্যের ইতিহাস এই সরল সমীকরণকে সমর্থন করে না।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা পরবর্তী সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা তাঁদের সাহিত্যিক গুরুত্বকে লঘু করেনি। চার্লস ডিকেন্স তাঁর সময়ের বিপুল জনপ্রিয় লেখক ছিলেন; দস্তয়েভস্কি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছেন পত্রিকার পাঠক ও প্রকাশকের আর্থিক চাপের মধ্যে; আলেক্সান্দ্র দ্যুমা পাঠকের রোমাঞ্চতৃষ্ণাকে গভীরভাবে বুঝতেন; তলস্তয়ের উপন্যাসও শিক্ষিত অভিজাত পরিসর ছাড়িয়ে বৃহৎ পাঠকসমাজে পৌঁছেছিল। জনপ্রিয়তা কখনও শিল্পের নিশ্চয়তা নয়, কিন্তু জনপ্রিয়তা নিজে কোনও অপরাধও নয়। বরং কোনও লেখক যদি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বয়স, শ্রেণি ও পেশার পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করতে পারেন, তবে সেই সম্পর্কের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করা সমালোচকের দায়িত্ব।
হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক, এই বাক্যটি এতবার উচ্চারিত হয়েছে যে তার ভেতরের বিস্ময়টি আমরা প্রায় ভুলে গেছি। একটি দরিদ্র, বইপাঠে অনভ্যস্ত, শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমাগত সংকুচিত এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামোয় দুর্বল সমাজে একজন কথাসাহিত্যিক কয়েক দশক ধরে লক্ষ লক্ষ পাঠক সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নতুন বই প্রকাশিত হলে বইমেলায় দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে, কিশোরেরা পকেটের টাকা জমিয়ে বই কিনেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি বই হাতবদল হয়ে বহুজনের কাছে পৌঁছেছে, গ্রাম ও মফস্বলের পাঠক শহরের প্রকাশনার সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করেছেন। এই ঘটনা নিছক বাজারের নয়। এর মধ্যে একটি সমাজের পাঠাভ্যাস, কল্পনাশক্তি, আবেগের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন নিহিত রয়েছে।
প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, টেলিভিশন, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দ্রুত বিনোদনের সংস্কৃতি মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করেছে। আধুনিক মানুষের সময় যত ব্যস্ত হয়েছে, তার পাঠের ধৈর্য তত কমেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ রচনার সামনে ক্রমে অস্থির হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনা করলে দেখা যাবে, তিনি পাঠককে বইয়ের দিকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই দুর্বল হতে শুরু করেছে। তাঁর ভাষার স্বচ্ছতা, সংলাপের গতিময়তা, ছোট অধ্যায়, রহস্যময়তা, দৈনন্দিনতার পরিচিত দৃশ্য এবং চরিত্রের সহজাত আকর্ষণ তরুণ পাঠককে বইয়ের জগতে প্রবেশের একটি দরজা দিয়েছিল।
অনেকে এই সহজ প্রবেশপথকে রুচির অবক্ষয় বলে মনে করেন। বস্তুত পাঠরুচি কোনও জন্মগত ও অপরিবর্তনীয় গুণ নয়; তা ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। যে কিশোর প্রথমে হিমু, মিসির আলি কিংবা শুভ্র পড়ছে, সে পরবর্তী জীবনে বিভূতিভূষণ, মানিক, দস্তয়েভস্কি, কাফকা, কামু কিংবা মার্কেজের কাছে পৌঁছাবে না, এমন কোনও অনিবার্য বিধান নেই। বরং পাঠের প্রতি প্রাথমিক আকর্ষণ না জন্মালে গভীরতর সাহিত্যের দিকে যাত্রার সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়। হুমায়ূন আহমেদ বহু পাঠকের হাতে প্রথম বইটি তুলে দিয়েছিলেন। সেই প্রথম বইয়ের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
আমাদের সাহিত্যসমাজে অপরের রুচি দিয়ে নিজের রুচি নির্ধারণ করার এক আশ্চর্য প্রবণতা আছে। কোনও সমালোচক একটি লেখককে গুরুতর বলে ঘোষণা করলে আমরা তাঁকে গুরুত্ব দিতে শুরু করি; অন্যদিকে কোনও জনপ্রিয় লেখককে হালকা বলা হলে তাঁর রচনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় ছাড়াই আমরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিই। নন্দনতত্ত্বের বিচার তখন ব্যক্তিগত পাঠানুভূতি, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও ভাষাগত সংবেদনশীলতার পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। কে কাকে পড়ছে, কোন বই ঘরের দৃশ্যমান তাকে রাখা হচ্ছে, কোন লেখকের নাম উচ্চারণ করলে নিজেকে পরিশীলিত মনে হয়, এসব প্রশ্ন সাহিত্যবিচারকে গোপনে প্রভাবিত করে।
ফলে হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ সাহিত্যিক, অপর অংশ শ্রেণিগত। বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একাংশ তাঁর বই পড়ে আনন্দ পেয়েছে, আবার সেই আনন্দ স্বীকার করতে সংকোচ বোধ করেছে। কারণ সহজে ভালো লাগা জিনিসকে অনেক সময় আমরা কম মূল্যবান মনে করি। কঠিন ভাষা, ঘন তত্ত্ব, দুর্বোধ্য প্রতীক কিংবা দীর্ঘ বর্ণনাকে গভীরতার আবশ্যিক লক্ষণ বলে ধরে নিই। অথচ সহজতা অর্জনও এক ধরনের কঠিন শিল্পসাধনা। ভাষাকে স্বচ্ছ করা, সংলাপকে স্বাভাবিক রাখা, চরিত্রকে অল্প কয়েকটি রেখায় পাঠকের মনে স্থাপন করা এবং দৈনন্দিন জীবনের ভেতর রহস্যের আবহ সৃষ্টি করা সহজ কাজ নয়।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় এই সহজতার পেছনে ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ। তিনি জানতেন মানুষ কীভাবে কথা বলে, পরিবারে নীরবতা কীভাবে কাজ করে, মধ্যবিত্ত ঘরে সামান্য অর্থকষ্ট কীভাবে সম্পর্কের ভাষা বদলে দেয়, ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশিত না হয়েও উপস্থিত থাকে, পিতা ও সন্তানের দূরত্ব কীভাবে এক কাপ চা, একটি অসুস্থতা কিংবা বিদায়ের মুহূর্তে হঠাৎ ভেঙে যায়। তাঁর চরিত্রেরা প্রায়ই বড় ঘটনা ঘটায় না; তারা বসে থাকে, অপেক্ষা করে, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে, হঠাৎ কোনও অদ্ভুত কাজ করে, আবার নীরবে নিজেদের বেদনার কাছে ফিরে যায়। এই ক্ষুদ্র আচরণগুলোর মধ্যে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের মনস্তত্ত্ব ধরেছিলেন।
তাঁর প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থের সবগুলো সমান শিল্পমূল্যের দাবি রাখে না। কোনও বৃহৎ লেখকের সমস্ত রচনা সমান উচ্চতায় অবস্থান করে না। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কবিতা, শরৎচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত গদ্য কিংবা তলস্তয়ের প্রতিটি রচনা একই শক্তির নয়। একজন সৃষ্টিশীল লেখক দীর্ঘ জীবন ধরে লিখলে তাঁর রচনায় পুনরাবৃত্তি, তাড়াহুড়া, অসমাপ্ত সম্ভাবনা, দুর্বল নির্মাণ এবং আত্মঅনুকরণের উপস্থিতি থাকবেই। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও তা সত্য। তাঁর অনেক বই দ্রুত লেখা, অনেক কাহিনি পরিচিত কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, অনেক চরিত্র পূর্ববর্তী চরিত্রের ছায়া। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা থেকে তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক অবদানকে অস্বীকার করা ন্যায়সংগত নয়।
সাহিত্যে চিরত্বের প্রশ্ন জটিল। একটি বই কালোত্তীর্ণ হয় ভাষার জন্য, চরিত্রের জন্য, মানবিক সত্যের জন্য, ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের জন্য কিংবা এমন এক আবেগগত রসায়নের কারণে, যা ভিন্ন সময়ের পাঠকও নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে। কোনও লেখকের সব বই চিরস্থায়ী হবে, এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, তাঁর রচনার কোন অংশ সময়কে অতিক্রম করার শক্তি ধারণ করে। এই বিচারে ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘দেয়াল’ কিংবা তাঁর নির্বাচিত কিছু ছোটগল্প, নাটক ও চরিত্র দীর্ঘকাল আলোচনার দাবি রাখে।
সাহিত্যের রূপ সময়ের সঙ্গে বদলায়। বঙ্কিমচন্দ্রের সমাজ, শরৎচন্দ্রের নৈতিক সংকট, রবীন্দ্রনাথের জমিদারি অভিজ্ঞতা, বিভূতিভূষণের গ্রামীণ প্রকৃতি কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা যে ইতিহাসে জন্ম নিয়েছিল, সেই ইতিহাস আজ অপরিবর্তিত নেই। পুঁজিবাদের বিস্তার, নগরায়ণ, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বৃদ্ধি, পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন, রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক প্রসার, প্রযুক্তির প্রবেশ এবং গণমাধ্যমের আধিপত্য মানুষের অভিজ্ঞতার প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। ফলে আধুনিক লেখক পূর্ববর্তী যুগের জীবনকে পুনরাবৃত্তি করতে পারেন না।
রবীন্দ্রনাথ বর্তমান যুগে জন্মালে তাঁর বিষয়, ভাষা, সংগীত, নাট্যরীতি ও সামাজিক ভাবনা অন্য রূপ গ্রহণ করত। তিনি হয়তো ডিজিটাল সভ্যতা, রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রকৃতির সংকট, বাজারের সর্বগ্রাসিতা, অভিবাসন, পরিচয়ের রাজনীতি ও যন্ত্রনির্ভর একাকীত্ব নিয়ে লিখতেন। তাই হুমায়ূন আহমেদকে বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছাঁচে বিচার করলে তাঁর যুগের বিশেষত্ব হারিয়ে যায়। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার মানে অনুকরণ নয়; বরং পূর্বসূরিদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে নিজের সময়ের অভিজ্ঞতার মধ্যে নতুন করে ব্যবহার করা।
হুমায়ূন আহমেদ রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে বহু শব্দ ও পঙ্ক্তি নিয়ে বইয়ের নাম রেখেছেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘কোথাও কেউ নেই’ কিংবা তাঁর আরও বহু নামকরণে বাংলা কাব্যভাষার স্মৃতি কাজ করে। কিন্তু তাঁর সাহিত্য রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুকৃতি নয়। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ব্যক্তি ও বিশ্বমানবের সম্পর্ক, প্রকৃতি ও আত্মার ঐক্য, স্বাধীনতা ও সভ্যতার সংকট; হুমায়ূনের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার, নিঃশব্দ আবেগ, ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা, হাস্যকর আচরণ, অসমাপ্ত প্রেম, অস্বাভাবিক মানুষ এবং দৈনন্দিনতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়। এই ভিন্নতা তাঁর স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক।
বাংলাদেশের নাগরিক ও গ্রামীণ জীবন উভয়ই তাঁর সাহিত্যিক জগতের অংশ। ঢাকা তাঁর রচনায় কেবল একটি শহর নয়, এক বিশেষ মধ্যবিত্ত মানসিকতার ভূগোল। ভাড়া বাড়ি, সরু বারান্দা, বৃষ্টিভেজা রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সরকারি অফিস, চিকিৎসকের চেম্বার, বেকার যুবক, টিউশনি, পারিবারিক ঋণ, মেসজীবন, মধ্যরাতের চা, অপ্রত্যাশিত অতিথি, আত্মীয়তার চাপ, প্রেমের সংকোচ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মিলিয়ে তাঁর ঢাকা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক মানচিত্র।
এই নগরজীবনের পাশাপাশি ভাটি বাংলার জল, কুয়াশা, বর্ষা, হাওর, নৌকা, লোকবিশ্বাস, অদ্ভুত মানুষ, পীর-ফকির, গ্রামীণ হাস্যরস ও অন্ধকার তাঁর কল্পনার গভীরে কাজ করেছে। মানুষের শৈশব তার শিল্পীসত্তার গুপ্ত ভূগোল। হুমায়ূন আহমেদের শৈশব, পিতার চাকরিসূত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস, নেত্রকোণা ও ভাটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্মৃতি তাঁর সাহিত্যকে এমন এক লোকজ আবহ দিয়েছে, যা নগরকেন্দ্রিক লেখার মধ্যেও অনুভূত হয়। তিনি শহরের লেখক হয়েও গ্রামের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।
তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য মানবজীবনের অপূর্ণতার স্বীকৃতি। তাঁর চরিত্রেরা সম্পূর্ণ নয়, সুসংগত নয়, আদর্শ নয়। তারা একই সঙ্গে হাস্যকর ও করুণ, যুক্তিবাদী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন, স্বার্থপর ও স্নেহশীল, সাহসী ও ভীত। এই অসংগতি মানবচরিত্রের স্বাভাবিক প্রকৃতি। আধুনিক মনস্তত্ত্ব আমাদের শেখায়, মানুষ নিজের কাছেও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়। ফ্রয়েডের অবচেতন, ইয়ুংয়ের ছায়া, কিয়ের্কেগার্দের উদ্বেগ কিংবা সার্ত্রের অস্তিত্বগত স্বাধীনতা মানুষের আত্মবিরোধের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তত্ত্বের ভাষায় এই দ্বন্দ্ব ব্যাখ্যা করেননি, কিন্তু চরিত্রের আচরণে তা দেখিয়েছেন।
তাঁর রচনায় হাস্যরসের গভীর সম্পর্ক আছে নৈঃসঙ্গ্য ও বেদনার সঙ্গে। অনেক পাঠক তাঁর সংলাপ, উদ্ভট পরিস্থিতি ও চরিত্রের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে তাঁকে লঘু লেখক মনে করেন। অথচ বিশ্বসাহিত্যে হাস্যরস কখনও লঘুতার সমার্থক ছিল না। সের্ভান্তেসের ‘ডন কিহোতে’, গোগোলের গল্প, চেখভের নাটক, মার্ক টোয়েনের ব্যঙ্গ, জেরোম কে. জেরোমের কৌতুক কিংবা বাংলা সাহিত্যে পরশুরাম ও সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনায় হাসির আড়ালে মানুষের দুর্বলতা, সামাজিক ভণ্ডামি ও অস্তিত্বের অসারতা প্রকাশিত হয়েছে।
হাস্যরস বহু সময় বেদনার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মরক্ষার পদ্ধতি। ফ্রয়েড রসিকতাকে মানসিক চাপমুক্তির এক বিশেষ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন। বার্গসন হাসির মধ্যে সামাজিক সংশোধনের শক্তি খুঁজেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের রচনায় হাসি প্রায়ই জীবনের গুরুভার সহ্য করার একটি কৌশল। চরিত্রেরা হাসে, অদ্ভুত কথা বলে, অপ্রত্যাশিত আচরণ করে; অথচ সেই হাসির কিছু পরেই পাঠক আবিষ্কার করে, চরিত্রটি গভীর একাকীত্ব, প্রত্যাখ্যান, অসুস্থতা, মৃত্যু কিংবা অপ্রকাশিত ভালোবাসা বহন করছে।
হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবনের নৈঃসঙ্গ্যবোধ সম্পর্কেও নানা স্মৃতি প্রচলিত আছে। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি অধ্যয়নকালে তাঁর কক্ষে একটি দেয়ালঘড়ি টিকটিক শব্দ করত। শব্দটি বিরক্তিকর মনে হওয়ায় তিনি ঘড়িটি মেরামত করিয়ে নীরব করেছিলেন। কিন্তু রাতে সেই নীরবতার মধ্যে তিনি তীব্র একাকীত্ব অনুভব করেন। পরদিন আবার ঘড়িটিকে আগের মতো শব্দ করার ব্যবস্থা করেন। ঘটনাটি প্রথমে কৌতুককর মনে হয়। অথচ এর ভেতরে প্রবাসী মানুষের নিঃসঙ্গতার গভীর রূপ রয়েছে। একটি যান্ত্রিক টিকটিক শব্দও তখন জীবনের উপস্থিতি, সময়ের চলাচল এবং অদৃশ্য সঙ্গীর মতো মনে হতে পারে।
মানুষ কখনও কখনও জড়বস্তুকেও প্রাণ দেয়, কারণ তার চেতনা সঙ্গের প্রয়োজন অনুভব করে। ঘড়ির টিকটিক, জানালায় বৃষ্টির শব্দ, পাশের কক্ষে মানুষের পদধ্বনি কিংবা দূরের ট্রেনের হুইসেল নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে অস্তিত্বের সাক্ষ্য হয়ে ওঠে। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের চরিত্রেরাও প্রায়ই জড়বস্তু, প্রকৃতি, অন্ধকার কিংবা অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে কথোপকথন করে। এই প্রবণতা শিশুসুলভ কল্পনা, লোকজ বিশ্বাস ও অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতার এক অদ্ভুত সমাবেশ।
তিনি একাকীত্বকে ভয় পেতেন এবং মানুষের সঙ্গ পছন্দ করতেন। পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, শিল্পী ও পরিচিতদের নিয়ে ভ্রমণ, আড্ডা ও উৎসবের আয়োজন তাঁর জীবনের পরিচিত অংশ। বাইরে থেকে এটি সামাজিক উচ্ছলতা বলে মনে হলেও, এর ভেতরে নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কাজ করতে পারে। বহু জনপ্রিয় মানুষের জীবনেই এই বৈপরীত্য দেখা যায়। জনসমক্ষে তাঁদের চারপাশে মানুষ থাকে, অথচ অন্তর্লোকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আরও তীব্র হয়। খ্যাতি মানুষের একাকীত্ব দূর করে না; অনেক সময় খ্যাতি মানুষ ও ব্যক্তিসত্তার মাঝখানে আরেকটি দেয়াল নির্মাণ করে।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিমু আধুনিক নগরসভ্যতার নিয়ম অস্বীকার করে। তার হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা, অর্থহীন ঘোরাফেরা, স্থায়ী পেশার অনুপস্থিতি এবং যুক্তির প্রতি উদাসীনতা তাকে এক ধরনের আধুনিক ভবঘুরে ঋষিতে পরিণত করে। সে সমাজের বাইরে নয়, বরং সমাজের নিয়মের মধ্যে প্রবেশ করে সেগুলোর অসারতা প্রকাশ করে। হিমুর স্বাধীনতা আকর্ষণীয়, কারণ মধ্যবিত্ত মানুষ দায়িত্ব, চাকরি, পরিবার, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের উদ্বেগে আবদ্ধ। হিমু সেই আবদ্ধ জীবনের গোপন মুক্তিচেতনা।
মিসির আলি হিমুর বিপরীত মেরু। তিনি যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, মনস্তত্ত্ব ও ব্যাখ্যার মানুষ। অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে তিনি কারণ অনুসন্ধান করেন। অথচ তাঁর যুক্তিবাদ সব রহস্যের সমাধান দিতে পারে না। ফলে মিসির আলির কাহিনিতে যুক্তি ও অজ্ঞাতের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ যেমন কুসংস্কার অস্বীকার করতে চায়, তেমনি তার অভিজ্ঞতায় এমন কিছু ঘটনা আসে, যা সহজ ব্যাখ্যার বাইরে থেকে যায়। মিসির আলি সেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্র।
হিমু ও মিসির আলিকে পাশাপাশি রাখলে হুমায়ূন আহমেদের মনোজগতের দুই প্রবণতা স্পষ্ট হয়। একদিকে যুক্তি, বিজ্ঞান, কারণ ও বিশ্লেষণ; অন্যদিকে রহস্য, স্বপ্ন, অন্তর্দৃষ্টি ও নিয়মভঙ্গের আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্তও এই দুই শক্তির মধ্যে বাস করে। সে বিজ্ঞান পড়েছে, কিন্তু স্বপ্নের অর্থ খোঁজে; চিকিৎসকের কাছে যায়, আবার অলৌকিক সম্ভাবনাও পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারে না; যুক্তিকে সম্মান করে, অথচ জীবনের সিদ্ধান্ত অনেক সময় আবেগ ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নেয়।
শুভ্র চরিত্রে আরেক ধরনের আদর্শবাদ কাজ করে। সে নির্মল, সংবেদনশীল, জগতের কৌশল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তার উপস্থিতিতে পাঠক এমন এক নৈতিক সরলতার মুখোমুখি হয়, যা বাস্তব জীবনে ক্রমে দুর্লভ। হুমায়ূনের বহু চরিত্র বাস্তবের নিখুঁত প্রতিলিপি নয়; তারা বাস্তব মানুষের অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার ঘনীভূত রূপ। এই কারণেই তাদের আচরণ কখনও অস্বাভাবিক মনে হলেও পাঠক তাদের আত্মীয় বলে গ্রহণ করে।
‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তাঁর সাহিত্যিক শক্তির প্রাথমিক সাক্ষ্য। এই রচনাগুলোতে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যে ভালোবাসা, লজ্জা, মানসিক অসুস্থতা, সামাজিক বিচার, ত্যাগ, অপরাধবোধ ও নীরব বেদনা একত্রে উপস্থিত। তাঁর পরবর্তী জনপ্রিয় রচনার হালকা সংলাপ ও কৌতুকের সঙ্গে পরিচিত পাঠক যখন এই উপন্যাসগুলো পড়েন, তখন বুঝতে পারেন তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার শুরুতেই গভীর করুণবোধ ও চরিত্রপর্যবেক্ষণের শক্তি উপস্থিত ছিল।
‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযুদ্ধকে পরিবার ও শহুরে জীবনের ক্ষুদ্র পরিসরে স্থাপন করে। যুদ্ধ সেখানে কেবল সম্মুখসমরের ঘটনা নয়; ঘরের ভেতর অপেক্ষা, ভয়, সন্দেহ, আশ্রয়, গোপনতা ও সম্পর্কের পরিবর্তন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত বীরত্ব, সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয় আত্মত্যাগের বৃহৎ বয়ানে রচিত হয়। হুমায়ূন আহমেদ সেই বৃহৎ ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের ঘরে নিয়ে এসেছেন। ফলে যুদ্ধ একটি দূরবর্তী জাতীয় ঘটনা থেকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে।
‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ব্যক্তিগত ইতিহাস, পারিবারিক শোক ও জাতীয় ট্র্যাজেডিকে বিস্তৃত আখ্যানের মধ্যে যুক্ত করে। তাঁর পিতা ফয়জুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং পরিবারের অভিজ্ঞতা এই রচনার আবেগগত পটভূমিতে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে তাঁর অবস্থান আবেগপূর্ণ হলেও সর্বদা স্লোগাননির্ভর নয়। তিনি মানুষের ভয়, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, স্বার্থপরতা ও সাহস একই সঙ্গে দেখেছেন। ইতিহাসকে নৈতিকভাবে সরলীকরণ না করে মানুষের জটিলতার মধ্যে স্থাপন করার এই প্রবণতা তাঁর শিল্পীসত্তার শক্তি।
তাঁর নাটক ও টেলিভিশন রচনাও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দাবি করে। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’ প্রভৃতি নাটক কেবল বিনোদন দেয়নি; তারা মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাষা, রসবোধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছিল। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি নিয়ে জনমানসে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা কাল্পনিক চরিত্রের সামাজিক বাস্তবতা অর্জনের বিরল উদাহরণ। কোনও চরিত্র যখন পর্দা অতিক্রম করে মানুষের নৈতিক প্রতিবাদ ও আবেগের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার সাংস্কৃতিক শক্তি অস্বীকার করা কঠিন।
হুমায়ূন আহমেদের ভাষা নিয়ে আলোচনাও জরুরি। তাঁর গদ্য সচেতনভাবে অলংকারমুক্ত, সংক্ষিপ্ত ও সংলাপনির্ভর। অনেক সময় একটি ছোট বাক্য, বিরতি কিংবা অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি আবেগ সৃষ্টি করেন। তাঁর ভাষার এই স্বচ্ছতা কিছু সমালোচকের কাছে সরলীকরণ বলে মনে হয়েছে। অথচ ভাষাকে কথ্যতার কাছাকাছি আনা বাংলা গদ্যের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষার পক্ষে যে লড়াই করেছিলেন, তার মূলেও ছিল জীবন্ত কথনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। হুমায়ূন আহমেদ সেই চলিত গদ্যকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত কথ্যভাষার আরও কাছে নিয়ে গেছেন।
তাঁর সাহিত্যিক সাফল্যের সঙ্গে বাজারের সম্পর্কও অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। তিনি বইয়ের বাজার সৃষ্টি করেছিলেন, প্রকাশনা শিল্পকে অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েছিলেন এবং লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সম্ভাবনা দৃশ্যমান করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে পূর্ণকালীন লেখক হওয়া ছিল তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাঠকের আস্থা ছিল। বিরল পাঠকের দেশে একজন লেখক শুধুমাত্র লেখালেখির আয় দিয়ে জীবনযাপন করতে পেরেছেন, এটি বাংলা ভাষার প্রকাশনা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
‘বাজারি লেখক’ শব্দটি প্রায়ই অবজ্ঞাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাজার নিজে নৈতিক সত্তা নয়। বাজারে নিম্নমানের বই থাকে, আবার বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও বিক্রি হয়। প্রশ্ন হলো, লেখক বাজারের দাবি অনুযায়ী নিজের শিল্পবোধ সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছেন কি না, অথবা বাজারকে ব্যবহার করে পাঠকের কাছে নিজের সাহিত্যিক জগৎ পৌঁছে দিয়েছেন কি না। হুমায়ূন আহমেদের রচনায় বাণিজ্যিক চাপের ছাপ আছে, কিন্তু তাঁর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোকে কেবল বাজারের ফল বলা যায় না।
বিমল মিত্র বলেছিলেন, সাহিত্য পাঠকের স্তরে নেমে আসে না; পাঠকই সাহিত্যের দিকে এগিয়ে যায়। এই বক্তব্যের মধ্যে শিল্পের স্বাধীনতার প্রশ্ন আছে। কিন্তু পাঠক ও সাহিত্যকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুই জগৎ হিসেবেও দেখা যায় না। সাহিত্য ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছায়। পাঠক ছাড়া সাহিত্যিক রচনা বস্তুগতভাবে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে জীবিত থাকে না। হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের স্তরে নেমেছিলেন কি না, এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি পাঠকের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিয়েছিলেন কি না। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা নির্দেশ করে, বহু মানুষ তাঁর রচনায় নিজেদের ভয়, হাসি, প্রেম, দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্বস্তি ও গোপন আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি শুনেছিল।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাসে ব্যক্তিচরিত্র ও সমাজের সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। ব্যক্তি যতই কেন্দ্রীয় হোক, তার জীবন অর্থনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিস্তৃত পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের চরিত্রেরাও ব্যক্তিগত সংকট বহন করলেও তাদের চারপাশে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পিতৃতন্ত্র ও পারিবারিক কাঠামো কাজ করে। তিনি সবসময় এই কাঠামোর বিশ্লেষণ করেননি, কিন্তু চরিত্রের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব দেখিয়েছেন।
তাঁর রচনায় আনন্দের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যের গম্ভীর সমালোচনায় বেদনা, সংকট, শোষণ, মৃত্যু ও বিচ্ছিন্নতা সহজে মর্যাদা পায়; আনন্দকে অনেক সময় সন্দেহ করা হয়। অথচ মানুষের জীবন শুধু বিপর্যয়ের দ্বারা গঠিত নয়। সামান্য খাবার, বৃষ্টি, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, শিশুর কথা, পরিবারের হাসি, অদ্ভুত অতিথি কিংবা চাঁদের আলোও জীবনের অর্থ নির্মাণ করে। হুমায়ূন আহমেদ এই ক্ষুদ্র আনন্দকে সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর রচনায় আনন্দ মরীচিকা নয়; তা অসম্পূর্ণ জীবনের মধ্যেও প্রবহমান।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর মা আয়েশা ফয়েজের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, লেখালেখির বীজ তাঁর পরিবারে আগে থেকেই ছিল। তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান সাহিত্যপ্রবণ মানুষ ছিলেন, নিজে উপন্যাস লিখেছিলেন, নাটক রচনা করেছিলেন এবং সন্তানের লেখার প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। হুমায়ূনের স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রথম রচনা পিতা কয়েক দফা সংশোধন করেছিলেন। বহু বছর পরে পিতাই নিজের নাটক ছেলের হাতে সংশোধনের জন্য দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটির মধ্যে প্রজন্মান্তরের এক আশ্চর্য সাহিত্যিক বিনিময় রয়েছে।
পিতা প্রথমে সন্তানের বাক্য সংশোধন করছেন; পরে সন্তান পিতার নাটকের কাঠামো বদলে দিচ্ছে। কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে উত্তরাধিকারে রূপান্তরিত হচ্ছে। পরিবারে সাহিত্য তখন নিছক শখ নয়, পারস্পরিক স্বীকৃতির ভাষা। পিতার লেখা ‘কত তারা আকাশে’ নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের বিপর্যয়ে হারিয়ে যায়। এই হারানো পাণ্ডুলিপি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতীকও বটে। যুদ্ধ শুধু মানুষ হত্যা করেনি; স্মৃতি, দলিল, শিল্পকর্ম, পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সম্ভাব্য সাহিত্যও ধ্বংস করেছে।
আয়েশা ফয়েজের স্মৃতিতে ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর জন্মকাহিনি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। হুমায়ূন ছুটিতে বাড়ি এসে একটি নীল খাতায় উপন্যাস লিখেছিলেন। পিতাকে সরাসরি পড়তে দিতে সংকোচ বোধ করে তিনি পাণ্ডুলিপিটি গোপনে অফিসের ফাইলের মধ্যে রেখে দেন। একজন পাংখাপুলারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, পিতা পড়েছেন কি না তা জানার জন্য। এই দৃশ্যের মধ্যে এক তরুণ লেখকের স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় উভয়ই আছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নবীন লেখক প্রথম পাঠকের রায়ের সামনে এই উদ্বেগ অনুভব করেন।
পিতা পাণ্ডুলিপি পড়ে সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলেননি। নীরবতা তরুণ লেখকের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছিল। পরে সন্ধ্যায় তিনি স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন, আল্লাহ তাঁর বড় ছেলেকে লেখক করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই স্বীকৃতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। তখন কেউ জানত না, সেই নীল খাতার তরুণ একদিন বাংলাদেশের সর্বাধিক পঠিত কথাসাহিত্যিকদের একজন হবেন; তাঁর উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হবে, নাটক জাতীয় স্মৃতির অংশ হবে, এবং তাঁর বইয়ের জন্য পাঠকের দীর্ঘ সারি তৈরি হবে।
প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ হলেও, আয়েশা ফয়েজের স্মৃতিতে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আগে লেখা। এই তথ্য শুধু গ্রন্থপঞ্জির সংশোধন নয়; এটি লেখক হয়ে ওঠার অন্তরঙ্গ ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কেমিস্ট্রির বইভর্তি বাক্স, নীল খাতায় লেখা উপন্যাস, পিতার নীরব পাঠ এবং মায়ের বিস্ময় মিলিয়ে সাহিত্যিক জন্মের এক পূর্ণ দৃশ্য তৈরি হয়। সাহিত্য ইতিহাস সাধারণত প্রকাশনার সাল, সংস্করণ ও সমালোচনার রেকর্ড সংরক্ষণ করে; অথচ একজন লেখকের আত্মবিশ্বাসের জন্ম ঘটে ঘরের ভেতর, কোনও প্রিয় মানুষের স্বীকৃতিতে।
হুমায়ূন আহমেদের জীবন ও সাহিত্য বিচার করতে গেলে তাঁর সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতে হবে। তিনি কখনও দ্রুত লিখেছেন, কখনও পরিচিত চরিত্র ও পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি করেছেন, কখনও নারীচরিত্রকে পুরুষকেন্দ্রিক কল্পনার মধ্যে আবদ্ধ রেখেছেন, কখনও অলৌকিকতা ও আবেগকে সহজ সমাধান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে প্রশ্ন আছে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সীমা আছে, জনপ্রিয়তার চাপ তাঁর রচনার মানে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একজন লেখককে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা মানে প্রশংসা কিংবা নিন্দার একমাত্রিক ভাষা বেছে নেওয়া নয়। তাঁর শক্তি ও সীমা উভয়কে একই আলোচনায় স্থান দিতে হয়।
তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব এই কারণে যে তিনি বাংলাদেশের মানুষের কথ্যভাষা, মধ্যবিত্ত মনের লজ্জা, পারিবারিক নৈঃশব্দ্য, হাস্যরস, অলৌকিক আকাঙ্ক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, নগরজীবনের অস্থিরতা এবং ভাটি বাংলার সাংস্কৃতিক আবহকে একটি বৃহৎ পাঠকসমাজের অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছেন। তিনি পাঠককে দেখিয়েছেন, সাহিত্য দূরবর্তী কোনও অলংকৃত প্রাসাদ নয়; তা নিজের ঘর, নিজের মা, নিজের ভাইবোন, নিজের প্রেম, নিজের ভয় এবং নিজের অদ্ভুত প্রতিবেশীর মধ্যেও জন্ম নিতে পারে।
প্রমথ চৌধুরীর উক্তিতে ফিরে গেলে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সৃষ্টির বস্তু রেখে গেছেন। এখন তত্ত্বজ্ঞ, গবেষক ও সমালোচকের কাজ সেই বিশাল রচনাভাণ্ডার থেকে মূল্যবান অংশ নির্বাচন করা, তাঁর ভাষার সামাজিক ইতিহাস অনুসন্ধান করা, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা, জনপ্রিয়তার সাংস্কৃতিক অর্থ বোঝা এবং তাঁর সাহিত্যকে বাংলাদেশের আধুনিকতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা। তাঁকে নিঃশর্ত মহিমান্বিত করা যেমন সমালোচনার কাজ নয়, তেমনি জনপ্রিয়তার কারণে তাঁকে সাহিত্য ইতিহাসের প্রান্তে ঠেলে দেওয়াও দায়িত্বশীল বিচার নয়।
সময়ের সঙ্গে তাঁর বহু বই হয়তো পাঠকের স্মৃতি থেকে সরে যাবে। কিছু চরিত্রের আকর্ষণও ক্ষীণ হতে পারে। ভাষার রীতি বদলাবে, মধ্যবিত্ত জীবনের কাঠামো পরিবর্তিত হবে, নতুন প্রজন্ম নতুন সংকট ও নতুন নায়ক খুঁজে নেবে। অথচ ‘নন্দিত নরকে’র পারিবারিক বেদনা, ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর নীরবতা, ‘আগুনের পরশমণি’র যুদ্ধকালীন ঘর, ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’-এর ইতিহাসবিদ্ধ স্মৃতি, হিমুর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং মিসির আলির যুক্তির সীমা দীর্ঘকাল পাঠককে ভাবাবে।
একজন লেখকের স্থায়িত্ব তাঁর সমস্ত বাক্যের অমরত্বে নির্ভর করে না। তিনি একটি ভাষার পাঠককে কতখানি বদলে দিয়েছেন, মানুষের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে উচ্চারণযোগ্য করেছেন, ভবিষ্যৎ লেখকদের জন্য কোন পথ খুলে দিয়েছেন এবং একটি জাতির স্মৃতিতে কত গভীর চিহ্ন রেখেছেন, তার ওপরও তাঁর ঐতিহাসিক স্থান নির্ধারিত হয়। এই বিচারে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য নাম।
তিনি লেখক হিসেবে পাঠকের কাছে পৌঁছেছিলেন এমন এক সরল পথে, যে পথের নির্মাণশ্রম সহজে চোখে পড়ে না। তিনি মানুষের গভীর বেদনাকে প্রায়ই হাসির আড়ালে রেখেছেন, নিঃসঙ্গতাকে ভিড়ের মধ্যে, রহস্যকে দৈনন্দিনতার মধ্যে, ইতিহাসকে পরিবারের মধ্যে এবং মৃত্যুকে জ্যোৎস্নার কোমল আলোয় স্থাপন করেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ তার সমস্ত অপূর্ণতা, উদ্ভটতা, ক্ষুদ্রতা ও ভালোবাসা নিয়েই সাহিত্যের বিষয়।
বাংলা ভাষা যতদিন তার মানুষের ঘরোয়া হাসি, নীরব কান্না, অসমাপ্ত প্রেম, বৃষ্টিভেজা বিকেল, যুদ্ধের স্মৃতি এবং একাকী ঘড়ির টিকটিক শব্দ বহন করবে, ততদিন হুমায়ূন আহমেদের নামও সেই ভাষার অন্তর্লোকে উচ্চারিত হবে। কারণ তিনি শুধু বিপুলসংখ্যক বই লেখেননি; তিনি এক বিরল পাঠকের দেশে পাঠক সৃষ্টি করেছিলেন। আর কোনও ভাষায় পাঠক সৃষ্টি করার চেয়ে বড় সাংস্কৃতিক কাজ খুব বেশি নেই।





