মারিও ভার্গাস য়োসা শেষ বইয়ে গিয়ে ধরলেন এক গিটার
য়োসা এখানে এক বিপজ্জনক লেখক-ভ্রম দেখান; সবকিছু প্রাসঙ্গিক, সবকিছু আমার গল্পের অংশ। এই বোধ একদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বিভ্রম।
মারিও ভার্গাস য়োসা শেষ বয়সে এসে কী করলেন? রাজনীতি, ক্ষমতা, ষড়যন্ত্র, লাতিন আমেরিকার কাদা–রক্ত–ঘাম সব পেরিয়ে তিনি শেষ বইয়ে গিয়ে ধরলেন এক গিটার। যেন বহু যুদ্ধ লড়ে ফেরা জেনারেল হঠাৎ বুঝলেন, আসল মানচিত্রটা ছিল সুরের ভাঁজে।
২০১০ সালের নোবেলজয়ী মারিও ভার্গাস য়োসা তাঁর শেষ উপন্যাস I Give You My Silence-এ পেরুকে আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান দিয়ে ধরতে চান না। ধরতে চান গানের ভেতর দিয়ে। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Adrian Nathan West, এবং অনুবাদটি যথেষ্ট সংযমী, যথেষ্ট স্বচ্ছ, যেন অতিরিক্ত অলংকারে নয়, সুরের শিরদাঁড়া বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে পেরুর লোকসঙ্গীত, বিশেষ করে vals— ইউরোপীয় ওয়াল্জ থেকে জন্ম নিয়ে পেরুর গলিঘুপচিতে নিজের স্বর খুঁজে পাওয়া এক সংগীতধারা। বিশ শতকের গোড়ায় লিমার রোগজীর্ণ, সরু, উপনিবেশিক অলিগলিতে জন্ম নেওয়া এই সুর ধীরে ধীরে শ্রেণি–বর্ণ–অঞ্চলের বিভাজন ছাড়িয়ে জাতীয় আবেগে পরিণত হয়। আর্জেন্টিনার ট্যাঙ্গোর মতোই, কিন্তু স্বভাবে আলাদা। আরও ব্যক্তিগত, আরও কাতর, প্রায় আত্মবিনাশী প্রেমে ভেজা। এমন গান যেখানে প্রেমিক বলে, ঘৃণা করো আমাকে, কারণ ঘৃণায় অন্তত প্রমাণ থাকবে, একদিন তুমি ভালোবেসেছিলে।
উপন্যাসের নায়ক তোঞো আজপিলকুয়েতা; এক দরিদ্র সংগীতসমালোচক। লিমার বারের পর বার ঘুরে বেড়ায়, প্রায় লোম্যাক্স-সুলভ এক সংগ্রাহক, তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া। সে কঠোর, সন্ন্যাসীস্বভাবের, খ্যাতির মোহ নেই। বড় পত্রিকা তাঁর লেখা ছাপে না। ছোট পত্রিকায় প্রায় বিনা পয়সায় লেখে (অনেকটা এই কলাম লেখকের মতো)। স্ত্রী সেলাই করে সংসার চালান, দুই মেয়ে বড় হচ্ছে অনিশ্চয়তায়। তার একমাত্র পাঠক সেই সব শিল্পী, যারা নিজেরাও প্রায় না খেয়ে গান করে।
এক সন্ধ্যায় সে শোনে এক অখ্যাত তরুণ গিটারবাদক; লালো মলফিনোকে। এক ভাঙাচোরা প্রাসাদের বাগানে, এক স্পটলাইটের নীচে, কাঁচা বয়সের এক অদ্ভুত ছেলেটি বাজাতে শুরু করে। আর তোঞোর মনে হয়, সে যা শুনছে, তা আগে কখনও শোনেনি। সুর যেন মুহূর্তে জন্ম নিচ্ছে। পরিচিত স্বরলিপি নতুন জন্ম পাচ্ছে। সে কাঁদে। তার মনে হয়, এই তো সেই পেরু, যাকে সে সারা জীবন খুঁজেছে।
য়োসা গিটারকে এখানে প্রায় অতিলৌকিক করে না তুলে বরং মিথের ভিতরে কাদা মাখিয়ে দেন। লালো জন্মেছিল বস্তিতে। মা তাকে ফেলে গিয়েছিল ময়লার স্তূপে। এক পুরোহিত তাকে মানুষ করেন। শিশুকালে সে সেই আবর্জনার স্তূপ থেকেই খুঁজে পায় এক ভাঙা গিটার, সেটাকেই সারিয়ে তোলে। আবর্জনা থেকে সুর। প্রত্যাখ্যাত শরীর থেকে অনির্বচনীয় সংগীত।
কিন্তু লালো কোনো সন্ত নয়। সে অহংকারী, দুর্বল, আত্মঘৃণায় ভরা। দল বেঁধে বাজাতে অস্বীকার করে। একা মঞ্চ চায়। ট্যুর বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিভা এবং চরিত্রের এই টানাপোড়েন য়োসার পরিচিত বিষয়।
তোঞো স্থির করে লালোর জীবনী লিখবে। কারণ তার বিশ্বাস, এই শিল্পীর ভিতর দিয়ে পেরুর আত্মা ধরা যায়। সে লালোর জন্মভূমিতে যায়, খোঁজ করে, ছিন্নভিন্ন তথ্য জোগাড় করে। আর তার লেখালিখি ক্রমশ জাতীয় ইতিহাসের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাক-স্প্যানিশ যুগ থেকে সমকাল; সবই ঢুকে পড়তে চায় তার বইয়ে।
এখানে একটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— huachafería। য়োসা এটিকে ব্যাখ্যা করেন অতিরিক্ত আবেগ, বাচনিক আড়ম্বর, কিট্শের সীমায় পৌঁছনো অনুভূতির এক স্বদেশি রূপ হিসেবে। যুক্তির আগে অনুভূতি। ধারণার আগে কাঁপুনি। কখনও উজ্জ্বল, কিন্তু সচরাচর বুদ্ধিদীপ্ত নয়। এই আবেগপ্রবণতা পেরুর সংগীতকে যেমন জন্ম দিয়েছে, তেমনি জাতিগত বিভাজনের মধ্যেও এক সেতু তৈরি করেছে।
তোঞোর বই প্রকাশিত হলে প্রথমে কেউ কেনে না। শেষে এক দরিদ্র বইবিক্রেতা সস্তা কাগজে ছাপে। অবাক কাণ্ড। বিক্রি হয়ে যায়। দ্বিতীয় সংস্করণ আরও দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়ে তোঞোর উন্মাদনা। সে বইটিকে আরও বড় করতে চায়, আরও সর্বগ্রাসী। সব ইতিহাস, সব ঘটনা যেন তার বয়ানে ঢুকে পড়তে চায়।
য়োসা এখানে এক বিপজ্জনক লেখক-ভ্রম দেখান; সবকিছু প্রাসঙ্গিক, সবকিছু আমার গল্পের অংশ। এই বোধ একদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বিভ্রম। তোঞোর ভেতরে ফোবিয়া, ইঁদুর-ভীতি, অবসেশন। সব মিলিয়ে অন্ধকারের স্বাদ তৈরি হয়।
এই শেষ উপন্যাসে য়োসার ভাষা তুলনামূলক সরল। বয়সের ভার, অসুস্থতার পূর্বজ্ঞান। সবই এতে আছে। তবু মাঝেমধ্যে ঝলসে ওঠে সেই পুরোনো তীব্রতা। রাজনীতি তাঁর জীবনে বারবার বদলেছে। কাস্ত্রো-পন্থা থেকে মুক্তবাজারপন্থা পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট পদেও লড়েছিলেন। তবু এক জিনিসে তিনি স্থির; শিকড়বদ্ধ সংস্কৃতির শক্তিতে তাঁর বিশ্বাস।
তিনি জানতেন পেরুর মধ্যে আছে আত্মবিনাশী, আত্ম-নিগ্রহী প্রবণতা। তবু তাঁর স্বপ্ন ছিল এক মিশ্র জাতি, যেখানে শ্বেত ও আদিবাসী বিভাজন মুছে গিয়ে এক নতুন পরিচয় জন্ম নেবে। এই স্বপ্নে যেমন উদারতা আছে, তেমনি বিতর্কের উপাদানও আছে।
I Give You My Silence একটি সংগীতময় উপন্যাসের পাশাপাশি এটি এক দেশের আবেগ-ইতিহাসের সমালোচনা। এক সমালোচকের উন্মাদনা। এক শিল্পীর ভঙ্গুরতা। এবং এক বৃদ্ধ লেখকের শেষ স্বীকারোক্তি; রাজনীতি দিয়ে যা ধরা যায়নি, তা হয়তো সুর দিয়ে ধরা যায়।
য়োসার বিদায়-বই তাই বিদায় নয়, বরং এক নিম্নস্বরে বলা কথা। রাষ্ট্রের আগে ছিল গান। এবং রাষ্ট্রের পরে, সম্ভবত, গানই থাকবে।
I GIVE YOU MY SILENCE | By Mario Vargas Llosa | Translated by Adrian Nathan West | Farrar, Straus & Giroux | 246 pp. | $28






