বরফকুঠারের আঘাত: যে বিপ্লব নিজের সন্তানকে খেয়ে ফেলল
রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নীতির বদলে ভয়ে চালিত হয়, তখন বিপ্লবী আর বিশ্বাসঘাতকের মধ্যে দূরত্ব একদিনেই মুছে যায়।
রুশ বিপ্লবের পর থেকে, গর্বাচেভের স্বল্পস্থায়ী শিথিলতার সময়টুকু বাদ দিলে, ক্রেমলিনের রাজনীতিতে হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে ভাববার কোন কারণ নেই। হত্যাকাণ্ড ছিল নীতিগত এক অস্ত্র, রাষ্ট্রচালনার অবিচ্ছেদ্য উপাদান। বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে, যখন ক্ষমতা ছিল অনিশ্চিত এবং শত্রু ছিল সর্বত্র, তখনই ভ্লাদিমির লেনিন রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত করার নামে এমন এক যন্ত্র গড়ে তুললেন, যার কাজ ছিল শত্রুকে খুঁজে বের করা, বিচার করা এবং প্রয়োজনে নিশ্চিহ্ন করা; সব এক হাতে।
ভ্লাদিমির লেনিন নিজের জীবনে একাধিক হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল দ্রুত এবং নির্মম। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন চেকা; পরবর্তীতে যার নাম বদলে হয় জিপিইউ, এনকেভিডি, কেজিবি, আর আজকের এফএসবি। এই সংস্থাকে দেওয়া হলো এক অদ্ভুত ক্ষমতা: পুলিশ, তদন্তকারী, কৌঁসুলি, বিচারক এবং জল্লাদ; সব এক শরীরে। আইন ও বিচার এখানে বিপ্লবের প্রয়োজনের অধীন একক যন্ত্র।
রেড টেররের সময় সংগঠিত গণহত্যা ছিল এই যন্ত্রের প্রকাশ্য রূপ। আর গোপন রূপ ছিল বিষপ্রয়োগের গবেষণাগার, যেখানে গুলাগের বন্দিদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি হতো এমন রাসায়নিক, যা শত্রুকে নিঃশব্দে সরিয়ে দিতে পারে। এসব হত্যাকে বলা হতো ‘লিকুইড অ্যাফেয়ার্স’। কখনো বন্দুক, কখনো বোমা, কখনো ছুরি। বলশেভিকদের চোখে এগুলো ছিল অপরিহার্য; শ্রমিকস্বর্গ গড়তে হলে প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র চাই, আর একনায়কতন্ত্র রক্তহীন হয় না।
১৯১৮ সালের মার্চে, গৃহযুদ্ধের এক সংকটময় মুহূর্তে, লেনিন সামরিক দায়িত্ব তুলে দিলেন ট্রটস্কির হাতে। তিনি হলেন সামরিক বিষয়ক কমিশার। রেড আর্মিকে পুনর্গঠিত করতে গিয়ে তিনি নিলেন কঠোর পদক্ষেপ। পলাতক সৈন্যদের তাৎক্ষণিক গুলি, উদাহরণস্বরূপ মৃত্যুদণ্ড, জারের আমলের অফিসারদের পরিবার জিম্মি করে তাদের দলে টানা; সবই ছিল তাঁর কৌশল। ইউক্রেনের কুলাকদের বিরুদ্ধে ‘গরম লোহা মেরুদণ্ড বেয়ে নামিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।
ট্রটস্কি নিজেকে বিপ্লবী নির্মমতার ধারক ভাবতেন। জীবনের পবিত্রতা নিয়ে কুয়েকার বা প্যাপিস্টদের কথাবার্তা তিনি উড়িয়ে দিতেন। এই দমননীতিতে তিনি স্টালিনের সমকক্ষ, যদিও ব্যক্তিগতভাবে স্টালিনকে অবজ্ঞা করতেন। স্টালিন পাল্টা তাঁকে বিদ্রূপ করতেন। ট্রটস্কির সাঁজোয়া ট্রেনে ছিল ফিল্ম ইউনিট, রেডিও স্টেশন, মুদ্রণযন্ত্র, এমনকি ব্যান্ডদল। তিনি ছিলেন নাটকীয়, আত্মমুগ্ধ, অথচ অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তা এবং দক্ষ প্রচারক। শ্বেতশক্তিকে পরাজিত করতে তাঁর অবদান ছিল অস্বীকার্য। অনেকে ভাবতেন, তিনি হবেন সোভিয়েত নেপোলিয়ন।
কিন্তু ক্ষমতা দখলের খেলায় স্টালিন ছিলেন অন্য ধাতের। লেনিনের মৃত্যুর পর তিনি ধীরে ধীরে ট্রটস্কিকে বিচ্ছিন্ন করলেন। ১৯২৯ সালে ট্রটস্কি দেশছাড়া হলেন। ঘুরে বেড়ানো নির্বাসন শেষে ১৯৩৭ সালে তিনি মেক্সিকোতে আশ্রয় পেলেন, কমিউনিস্ট শিল্পী দিয়েগো রিভেরার সহায়তায়।
এদিকে মস্কোতে চলছিল শো ট্রায়াল। অভিযোগ, এক ভয়াবহ ট্রটস্কিবাদী ষড়যন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হয়তো স্টালিন নিজেই বিশ্বাস করতেন, হয়তো ট্রটস্কিও কল্পনা করতেন তিনি এখনও ইউরোপের আতঙ্ক। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে স্টালিনের কাছে হিটলারের চেয়ে ট্রটস্কির নির্মূলই ছিল জরুরি লক্ষ্য।




স্টালিন এই অভিযানের নাম দিলেন ইউটকা। এনকেভিডি ট্রটস্কির যোগাযোগব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করল। তাঁর পুত্র লেভের কাছেও এজেন্ট বসানো হলো; সন্দেহ আছে, তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল। কথাটি প্রচলিত ছিল; খুন যে কেউ করতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটাতে শিল্পীর দরকার।
অভিযান পরিচালনা করেন লিওনিদ আইটিংগন। তিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধে দক্ষতা ঝালিয়ে নিয়েছিলেন। কাতালান কর্মী কারিদাদ মেরকাদের মাধ্যমে তাঁর ছেলে রামোনকে কাজে লাগানো হয়। ছদ্মনাম ফ্র্যাঙ্ক জ্যাকসন, পরিচয়ে ব্যবসায়ী, মুখে প্লেবয়সুলভ হাসি। তিনি ট্রটস্কির দপ্তরে যাতায়াত করতেন, প্রহরীদের দুর্বলতা খুঁটিয়ে দেখতেন। ট্রটস্কি নিজেও প্রহরীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেন, আচরণে কঠোরতা ছিল। এদিকে রিভেরার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ, এমনকি রিভেরার স্ত্রী ফ্রিদা কাহেলোর সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী সম্পর্ক; সব মিলিয়ে পরিবেশ ছিল টানটান।
১৯৪০ সালের মে মাসে প্রথম হামলা ব্যর্থ হয়। গুলির ঝড়ে শয়নকক্ষ ঝাঁঝরা, কিন্তু ট্রটস্কি ও তাঁর স্ত্রী বিছানার নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান। অবশেষে ২৪ আগস্ট, রামোন একটি প্রবন্ধ পড়ার অজুহাতে তাঁর অধ্যয়নকক্ষে ঢোকেন। গ্যাবার্ডিন কোটের নিচে লুকোনো ছিল ছোট হাতলওয়ালা বরফকুঠার। ডেস্কে বসা ট্রটস্কির মাথায় তিনি আঘাত করেন। রক্তাক্ত চিৎকারে তিনি হামলাকারীকে চিহ্নিত করেন। পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়।
রামোন ধরা পড়েন, বিশ বছর কারাভোগ করেন, কিন্তু কখনো স্বীকার করেননি যে তিনি জিপিইউর হয়ে কাজ করেছেন। মুক্তির পর তাঁকে সোভিয়েত বীরের সম্মান দেওয়া হয়। স্টালিন দায় অস্বীকার করেন, যেমন পরবর্তী সময়ে ভিন্ন শাসকেরাও করেছে। কিন্তু এই অস্বীকারের মধ্যেই ছিল এক প্রচ্ছন্ন প্রদর্শন; ক্রেমলিনের হাত দীর্ঘ, তার শাস্তি নির্মম।
ট্রটস্কির মৃত্যুর ঘটনায় এক অদ্ভুত বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়। তিনি যে নির্মম মতাদর্শকে একসময় সমর্থন করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই যন্ত্রের সবচেয়ে আলোচিত শিকার হন। এই কাহিনি নিয়ে বিপুল সাহিত্য হয়েছে। দ্য ডেথ অব ট্রটস্কি বইটির বর্ণনা সাবলীল হলেও গবেষণায় তেমন নতুন সংযোজন নেই; বরং পূর্ববর্তী বিশদ গবেষণার পুনরুক্তি। ইতিহাস এখানে কেবল পুনর্কথিত, নতুন ব্যাখ্যা খুব কম। তবু গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়; রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নীতির বদলে ভয়ে চালিত হয়, তখন বিপ্লবী আর বিশ্বাসঘাতকের মধ্যে দূরত্ব একদিনেই মুছে যায়।
The Death of Trotsky: The True Story of the Plot to Kill Stalin’s Greatest Enemy by Josh Ireland - অবলম্বনে।



