I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
অ্যান কারসন একটা চমৎকার কথা বলেছেন, “If your way of life is writing, then everything that happens becomes a sentence.”
অর্থাৎ, লেখালেখিই যদি আপনার জীবনযাপনের পদ্ধতি হয়, তা হলে আপনার জীবনে যা কিছু ঘটছে, তার প্রত্যেকটাই একসময় বাক্যে পরিণত হবে। এমন একটা কথাই আমি কিছু দিন আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম। কিভাবে আমি রেস্তোরায় বসে মানুষ দেখি।
কথাটা বেশ মজার। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে লেখক নামক জীবটির চরিত্র সম্পর্কে একটা অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে পড়ে। এই জীবটির পক্ষে নিছক বেঁচে থাকা বেশ কঠিন। সে বাঁচতে বাঁচতে নিজের জীবনটাকে লক্ষ করে। আনন্দ পেলে আনন্দের স্বাদ গ্রহণ করে, পাশাপাশি ভাবে, এই আনন্দটা ঠিক কোন শব্দে ধরা যাবে। দুঃখ পেলে কাঁদে, আবার কান্নার মাঝখানেই তার মাথায় একটা বাক্য উঁকি দেয়। বাক্যটা বেশ ভালো হয়েছে বুঝতে পেরে তার সামান্য আনন্দও হয়। অর্থাৎ, শোকের মধ্যেও একফোঁটা সাহিত্যিক আত্মতৃপ্তি। এ বড় সুবিধের চরিত্র নয়।
একজন লেখক প্রেমে পড়েছেন। যে মানুষটির প্রেমে পড়েছেন, তিনি যে খুব সুবিধের মানুষ, এমন প্রমাণ নেই। বরং প্রমাণাদি উলটো দিকেই ইঙ্গিত করছে। বন্ধুবান্ধব সাবধান করছেন, আত্মীয়স্বজন মাথা নাড়ছেন, এমনকি লেখক নিজেও বুঝতে পারছেন, এ সম্পর্কের পরিণতি খুব সুখকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবু তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। কেন? প্রেমের অন্ধত্ব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তাঁর মনের এক কোণে আরেকটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করছে, এই লোকটাকে ছাড়া উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায়টা ঠিক জমবে না।
এবার মুশকিল হল, তিনি কি সত্যিই প্রেমে পড়েছেন, নাকি সম্ভাব্য একটা উপন্যাসের চরিত্র সংগ্রহ করছেন? উত্তরটা তিনি নিজেও জানেন না। কারণ তাঁর কাছে প্রেম এবং প্রেমের অভিজ্ঞতাকে ভাষায় রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে একটাকে অন্যটার থেকে আলাদা করা মুশকিল।
আরেকটা ঘটনা ভাবুন। লেখক গেছেন একজনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। চারদিকে শোকস্তব্ধ মানুষ, কেউ কাঁদছেন, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মৃত মানুষটির সঙ্গে তাঁরও বহুদিনের সম্পর্ক। মন খারাপ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল কফিনের পাশে রাখা সাদা লিলি ফুলগুলোর দিকে। ফুলগুলো প্লাস্টিকের।
ব্যস, সর্বনাশ।
এই অতি সামান্য তথ্যটা তাঁর মাথায় গেঁথে গেল। মৃত্যু সত্যি, কান্না সত্যি, মানুষের শোক সত্যি, অথচ শোকপ্রকাশের ফুলগুলো নকল। কী অদ্ভুত একটা বৈপরীত্য! কী চমৎকার একটা দৃশ্য! কোনও গল্পের শেষ অনুচ্ছেদে ব্যবহার করা যায়।
পরক্ষণেই তাঁর নিজের উপর ঘেন্না হল। একটা মানুষ মারা গেছেন, আর তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাহিত্যিক উপাদান সংগ্রহ করছেন! তাঁর কি একটুও লজ্জা নেই?
আছে। যথেষ্ট আছে।
কিন্তু সেই লজ্জাটাও তিনি মনে মনে লিখে ফেললেন।
ফলে বিপদ আরও বাড়ল। এবার শুধু প্লাস্টিকের ফুল নিয়ে একটা বাক্য তৈরি হল না, নিজের নির্লজ্জতা সম্পর্কে আরও তিনটে বাক্য তৈরি হয়ে গেল। লেখক নিজের বিবেকের ধিক্কার থেকেও সাহিত্য নিষ্কাশন করে ফেললেন। যেন একটা অদ্ভুত যন্ত্র, যার মধ্যে যা-ই ঢোকানো হোক, অন্য দিক দিয়ে বেরোবে ভাষা।
এইখানে লেখকের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা অদ্ভুত পার্থক্য তৈরি হয়। আমরা অনেকেই কোনও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাই, তারপর ধীরে ধীরে সেটা স্মৃতি হয়ে যায়। লেখকও সেই একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান। কিন্তু তাঁর ভিতরে আরও একজন লোক বসে থাকেন। তিনি দেখছেন, শুনছেন, শব্দ বাছছেন, দৃশ্যের বিন্যাস করছেন, কোন কথাটা আগে বলা উচিত আর কোন কথাটা পরে, তার হিসেব কষছেন।
ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের কথা ভাবুন। একটা মাদলেন কেক চায়ে ডুবিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে স্মৃতির যে বিপুল জগৎ খুলে গেল, তা শেষ পর্যন্ত In Search of Lost Time-এর সাহিত্যিক মহাবিশ্বের অন্যতম প্রবেশদ্বার হয়ে উঠল। আমাদের অনেকেরই চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আছে। বিস্কুট ভেঙে চায়ের মধ্যে পড়ে গেলে আমরা চামচ খুঁজি। প্রুস্ত খুঁজে পেলেন হারিয়ে যাওয়া সময়।
অবশ্য ব্যাপারটা এত সহজ হলে প্রত্যেক চায়ের দোকান থেকে অন্তত দুজন করে প্রুস্ত বেরোতেন। অভিজ্ঞতা সকলেরই হয়, কিন্তু অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অর্থকে ভাষায় ধরার জন্য এক ধরনের অস্বাভাবিক মনোযোগ দরকার। দরকার স্মৃতির কাছে বারবার ফিরে যাওয়া, তাকে প্রশ্ন করা, তার সঙ্গে তর্ক করা। একটা আপাততুচ্ছ মুহূর্তের মধ্যে গোটা জীবনের ছায়া পড়েছে কি না, সেটা পরীক্ষা করে দেখা।
ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ডায়েরিতে লিখে গেছেন নিজের জীবন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, অসুস্থতা, সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লেখার ব্যর্থতা আর সাফল্যের কথা। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং সেগুলো নিয়ে ভাবনার মধ্যে ক্রমাগত যাতায়াত চলেছে। কখনও জীবনের একটা ঘটনা লেখাকে প্রভাবিত করেছে, কখনও লেখার প্রয়োজন তাঁকে নিজের জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
একজন লেখকের কি অন্য মানুষের দুঃখকে নিজের লেখার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার আছে? তাঁর প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতা, বন্ধুর অসুখ, মায়ের মৃত্যু, সন্তানের কান্না, প্রতিবেশীর অপমান, এই সমস্ত ঘটনা কি তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যিক সম্পত্তি?
প্রশ্নটার সহজ উত্তর দেওয়া মুশকিল। কারণ কোনও মানুষই কেবল নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবন কাটান না। আমরা অন্যের সুখদুঃখের মধ্যেও নিজেদের জীবন খুঁজে পাই। সাহিত্যও বহুদিন ধরে সেই কাজ করে চলেছে। কিন্তু লেখকের হাতে কলম আছে বলেই অন্য মানুষের জীবনের উপর তাঁর অবাধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি অভিজ্ঞতাকে বাক্যে পরিণত করার ক্ষমতার সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতার প্রতি দায়িত্বও জড়িয়ে থাকে।
তবু লেখক লিখবেন। অনেক সময় এমন কথাও লিখবেন, যা লেখার পর তাঁর নিজেরই অস্বস্তি হবে। বহুদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি হয়তো আবিষ্কার করবেন, বিচ্ছেদের মুহূর্তে প্রেমিকার বলা একটা নিষ্ঠুর বাক্য অসাধারণ সংলাপ হয়ে উঠতে পারে। তখন তাঁর মনে দুটো অনুভূতি পাশাপাশি কাজ করবে। একটা মানুষকে হারানোর বেদনা, আর একটা ভালো সংলাপ পাওয়ার আনন্দ।
ভাবুন একবার, কী সাংঘাতিক ব্যবস্থা! যে মানুষটা তাঁর জীবন তছনছ করে দিয়ে চলে গেলেন, তাঁর কাছেও লেখক খানিকটা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটা ভালো সংলাপ তো দিয়ে গেলেন!
এমনকি লেখক নিজের ব্যর্থতাকেও সম্পূর্ণ ব্যর্থতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না। একটা সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, চাকরি চলে গেছে, বহুদিনের বন্ধুত্ব ভেঙেছে, তিনি কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সর্বনাশ করেছেন। এসব ঘটনার কোনওটাই সুখকর নয়। কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে কোথাও একটা ছোট্ট সম্ভাবনা বেঁচে থাকে, এই অভিজ্ঞতাটা হয়তো একদিন লেখায় কাজে লাগবে।
এর মধ্যে যেমন সৃষ্টিশীলতার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে, তেমনই আছে একটা নির্মমতা।
কারণ লেখক অনেক সময় বর্তমান মুহূর্তটাকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারেন না। যে মুহূর্তে তাঁর থাকার কথা, সেই মুহূর্তটাকে তিনি খানিকটা দূর থেকে দেখছেন। নিজের জীবনে তিনি একই সঙ্গে অভিনেতা এবং দর্শক। মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সংলাপ বলছেন, আবার দর্শকাসনে বসে খেয়াল করছেন, আলোটা ঠিকমতো পড়ছে কি না।
এখানেই অ্যান কারসনের কথাটার গভীরতা।
লেখালেখি যখন জীবনযাপনের কেন্দ্রে বসে যায়, তখন লেখার জন্য আলাদা করে উপাদান খুঁজতে হয় না। প্রতিদিনের জীবনই ক্রমাগত ভাষার মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে। সকালে ঘুম ভাঙা, কারও ফোনের অপেক্ষা করা, পুরোনো চিঠি খুঁজে পাওয়া, কোনও মানুষের মুখে নিজের সম্পর্কে অপ্রিয় কথা শোনা, রাত্তিরে একা খেতে বসে হঠাৎ কারও কথা মনে পড়ে যাওয়া, সবই সম্ভাব্য বাক্য।
এমনকি দীর্ঘদিন কিছু লিখতে না পারার অভিজ্ঞতাটাও একসময় লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। লেখক তখন নিজের লেখক-হতে-না-পারার কাহিনিও লিখছেন। অর্থাৎ, এই পেশায় ব্যর্থতারও সাহিত্যিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে। তবে সেই ব্যবস্থার সুবিধা পেতে হলেও শেষ পর্যন্ত লিখতে হবে। এখানেই নিষ্ঠুর শর্ত।
অবশ্য এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপারটা হল, জীবনকে বাক্যে পরিণত করতে গিয়ে লেখক অনেক সময় জীবনটাকেই নতুন করে বুঝতে পারেন।
একটা ঘটনা যখন ঘটছে, তখন তার অর্থ আমাদের কাছে সম্পূর্ণ স্পষ্ট থাকে না। আমরা রাগ করি, কাঁদি, আনন্দ পাই, ভুল বুঝি, ভুলে যাই। বহু বছর পরে সেই ঘটনাটা নিয়ে লিখতে বসে হঠাৎ বোঝা যায়, সেদিন মানুষটা কেন ওই কথাটা বলেছিলেন। কিংবা বোঝা যায়, সেদিন যে অপমানের জন্য আমরা তাঁকে ক্ষমা করতে পারিনি, তার পিছনে তাঁর নিজেরও কোনও অসহায়তা ছিল।
আবার উলটোটাও ঘটে। যাকে এতদিন ক্ষমা করে রেখেছিলাম, লিখতে বসে আবিষ্কার করি, তাঁর আচরণে কতখানি নিষ্ঠুরতা ছিল।
ভাষা তখন স্মৃতিকে পরীক্ষা করে। স্মৃতিও পালটা ভাষাকে সংশোধন করে। বহুবার কাটাকুটি হয়। প্রথমে যে বাক্যটি অত্যন্ত নিশ্চিত মনে হয়েছিল, পরে দেখা গেল তার মধ্যে খানিকটা আত্মপ্রবঞ্চনা আছে। লেখক আবার লেখেন। আবার কাটেন। নিজের জীবনের ঘটনাগুলোর সামনে তিনি সাক্ষী হয়ে দাঁড়ান, কখনও অভিযুক্তও।
এইভাবে একটা জীবনের মধ্যে অসংখ্য জীবন তৈরি হতে থাকে।
তবে একটা সাবধানবাণীও আছে। সব অভিজ্ঞতাকে লেখার উপাদান হিসেবে দেখতে দেখতে মানুষ যদি কেবল পরবর্তী বাক্যটির কথাই ভাবতে থাকেন, তা হলে একসময় তাঁর নিজের জীবনের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হতে পারে। প্রেমিকার হাত ধরেছেন, অথচ মনে মনে ভাবছেন হাত ধরার দৃশ্যটা কীভাবে লিখবেন। সন্তানের সঙ্গে খেলছেন, অথচ খেয়াল করছেন শিশুটির হাসির বর্ণনায় কোন বিশেষণ ব্যবহার করা উচিত। তখন জীবনও যেন সারাক্ষণ একটা অদৃশ্য সম্পাদকের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।
লেখককে তাই কখনও কখনও নিজের কলমের হাত থেকেও জীবনটাকে বাঁচাতে হয়। সমস্ত অভিজ্ঞতার তাৎক্ষণিক সাহিত্যিক ব্যবহার জরুরি নয়। কিছু মুহূর্তকে কেবল অনুভব করতে দেওয়াও দরকার। তাদের অর্থ হয়তো অনেক পরে বোঝা যাবে। কোনও কোনও মুহূর্তের অর্থ চিরকাল অধরাই থাকবে।
কারসনের কথাটায় ফিরে যাই।
“If your way of life is writing, then everything that happens becomes a sentence.”
লেখক সম্ভবত সেই মানুষ, যিনি জীবনের কোনও ঘটনাকেই সহজে শেষ হতে দিতে পারেন না। ঘটনা ঘটে যায়, মানুষ চলে যায়, সম্পর্ক ভেঙে যায়, বাড়ি বদলে যায়, শহর বদলে যায়। কিন্তু তাঁর মাথার মধ্যে কথাগুলো থেকে যায়। সেই কথাগুলো একদিন বাক্য হয়। বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ থেকে গল্প, কখনও গোটা উপন্যাস।
আর এখানেই লেখকের এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা।
অন্য মানুষের জীবনে একটা ঘটনার পর দাঁড়ি পড়লে ঘটনাটা শেষ হয়ে যায়। লেখক দাঁড়িটা দেওয়ার পরেও ভাবেন, দাঁড়ির বদলে কমা দিলে কেমন হত?
তারপর আবার লিখতে বসেন।
কারণ তাঁর কাছে জীবন শেষ পর্যন্ত এমন এক পাণ্ডুলিপি, যার সংশোধন কখনও সম্পূর্ণ হয় না।



