মার্সেল প্রুস্তের In Search of Lost Time মহাকাব্যটির নাম প্রথমবার শুনেই মনের ভেতর কেমন যেন একটা অহেতুক ভীতি জেঁকে বসেছিল। বইটির ফরাসি নামটা তো আরও রহস্যময়, À la recherche du temps perdu।
ফরাসি ভাষার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই। তাই নামের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এটি পড়তে বসলে বোধহয় আস্ত ফরাসি বিপ্লবটাই মাথায় করে নামতে হবে। তার ওপর আবার সেই প্রকাণ্ড সাত খণ্ড আর তেরো লক্ষ শব্দের বিশাল পাহাড়। ওসবের আকার-আকৃতি দেখে সন্দেহ জাগে, লেখক শুধু কি গল্প শোনানোর জন্য কলম ধরেছিলেন, নাকি পাঠকের বাকি আয়ুটাই মহাকাব্যের নামে লিখে নিতে চেয়েছেন?
আমাদের দেশে বই কেনার সময় একটা বদভ্যাস আছে। বই হাতে নিয়ে প্রথমে ওজন আন্দাজ করি। তারপর দাম দেখি। তারপর পাতা উল্টে মনে মনে হিসাব করি, জীবনে আর কত বছর বাঁচব। প্রুস্তের বই হাতে নিলে তৃতীয় হিসাবটাই বেশি জরুরি।
কিন্তু বইটা পড়তে পড়তে বোঝা যায়, এত বড় কাণ্ডের ভিতরে গল্পটা আশ্চর্য রকমের পরিচিত। একজন মানুষ তার জীবন মনে করছে। ব্যস। অবশ্য মানুষের জীবন মনে করার ব্যাপারটা মোটেই ‘ব্যস’ নয়। আপনি নিজের গত মঙ্গলবারের দুপুরটাই ঠিকঠাক মনে করতে পারবেন না। কী খেয়েছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, জানালা দিয়ে আলো কোন দিকে পড়েছিল, মোবাইল হাতে নিয়ে কী ভেবেছিলেন, তার অর্ধেকই ইতিমধ্যে উধাও। অথচ হঠাৎ ত্রিশ বছর আগের একটা গন্ধ এসে আপনাকে ধরে ফেলবে।
ধরুন, কোনোদিন রান্নাঘরে পেঁয়াজ ভাজার সঙ্গে শুকনো মরিচের গন্ধ উঠল। আচমকা আপনার মনে পড়ে গেল শীতের সকালে নানির বাড়ি। উঠোনে রোদ। পাশে বাঁশের মোড়া। দূরে কেউ গোসল করছে। রান্নাঘর থেকে গরম ভাতের গন্ধ। একজন মানুষ, যিনি বহু বছর আগে মারা গেছেন, তাকেও যেন পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলেন। তার মুখের কথাটি পর্যন্ত মনে পড়ে গেল। যে মানুষটাকে আপনি গত দশ বছর সচেতনভাবে মনে করার চেষ্টা করেও ঠিকমতো মনে করতে পারেননি।
স্মৃতি বড় বদমাশ জিনিস। ডাকলে আসে না। নিজের ইচ্ছায় এসে ঘাড়ে চেপে বসে। প্রুস্তের গোটা মহাকাব্যিক উপন্যাসের ভিতরে এই বদমাশ স্মৃতিটাই একরকম প্রধান চরিত্র।
প্রুস্তের বই নিয়ে কথা উঠলেই একটা ছোট কেকের কথা বলতে হয়। নাম ম্যাডেলিন। আমাদের দেশের সাহিত্য হলে হয়তো এই জায়গায় কেকের বদলে থাকত নারকেলের নাড়ু, চিতই পিঠা বা শীতের সকালে গরম পাটিসাপটা।
একদিন উপন্যাসের কথক চায়ের মধ্যে ম্যাডেলিন ডুবিয়ে মুখে দেন। খুব সাধারণ ঘটনা। চা খাচ্ছে মানুষ, কেক ডুবিয়েছে। এর মধ্যে সাহিত্য কোথায়?
আমিও চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খাই। পার্থক্য হলো, আমার বিস্কুট বেশিক্ষণ ডোবালে কাপের তলায় গিয়ে পড়ে। তখন চামচ দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। প্রুস্তের ম্যাডেলিনের ভাগ্য ভালো, সেটি ডোবার বদলে বিশ্বসাহিত্য তৈরি করেছে।
ম্যাডেলিনের স্বাদ মুখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কথকের ভিতরে হঠাৎ একটা স্মৃতির দুয়ার খুলে গেল। শৈশবের কমব্রে শহর ফিরে এল। বাড়ি ফিরে এল। রাস্তা ফিরে এল। রবিবার ফিরে এল। মানুষ ফিরে এল। আলো ফিরে এল। এমনকি সেই সময়কার নিজের ভেতরের মানুষটাও ফিরে এল।
এই জায়গাটাই প্রুস্তের বিখ্যাত ধারণা, অনিচ্ছাকৃত স্মৃতি। আমরা সাধারণত মনে করি স্মৃতি মানে মাথার ভিতরে একটা আর্কাইভ আছে। দরকার হলে ফাইল নম্বর দিয়ে খুলে দেখব।
ব্যাপারটা অত ভদ্র নয়। আপনি বসে বললেন, ‘১৯৮৭ সালের সেই বিকেলের কথাটা মনে করি।’ মাথা বলবে, ‘আজ না। ব্যস্ত আছি।’ তারপর কোনোদিন পুরোনো বই খুললেন। পাতার মধ্যে বহুদিনের কাগজের একটা গন্ধ পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ১৯৮৭ এসে আপনার সামনে চেয়ার টেনে বসে গেল।
আমাদের জীবনে এ রকম কত ম্যাডেলিন ছড়িয়ে আছে। পুরোনো সাবানের গন্ধ। স্কুলের নতুন বই। শীতের কম্বল। বৃষ্টির পরে মাটি। কোনো পুরোনো আতর। একটা বাসের হর্ন। কোনো বিশেষ রান্না। একটা গান। এমনকি কারও উচ্চারণ।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষের স্মৃতির আলমারিতে তালা থাকে, কিন্তু চাবিটা তার নিজের হাতে থাকে না। প্রুস্ত সেই চাবির খোঁজ করেছেন।
হারানো সময় বলতে কী? বইটির নাম In Search of Lost Time। হারানো সময়ের সন্ধানে। ‘হারানো’ কথাটার মধ্যে একটু ফাঁকি আছে। কারণ সময় হারায় কোথায়? কাল সকাল আটটা একবার চলে গেলে আর ফিরবে না। আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হলেও গত মঙ্গলবারে ফিরে গিয়ে নাশতার টেবিলে বসতে পারবেন না।
মানুষ মরে যায়। বাড়ি ভেঙে যায়। শহর বদলে যায়। রাস্তার নাম পালটে যায়। বন্ধু দূরে চলে যায়। প্রেমিক বা প্রেমিকা একসময় এমন অপরিচিত হয়ে যায় যে সামনে বসে থাকলেও মনে হয় এই মানুষটাকে কোনোদিন চিনতাম? ছোটবেলায় যে ঘরটাকে বিশাল মনে হত, ত্রিশ বছর পরে গিয়ে দেখবেন ঘরটা ছোট। আসলে ঘর ছোট হয়নি। আপনি বড় হয়ে গেছেন।
আমাদের অতীতের সঙ্গে এই ঝামেলাটা চিরকাল। আমরা তাকে যেমন ছিল তেমন পাই না। নিজের বর্তমান চোখ দিয়ে দেখি। প্রুস্ত এই জায়গাটাকে নিয়ে অসাধারণ খেলা করেছেন। তাঁর কাছে অতীত কোনো মরা জিনিস নয়। ওটা মানুষের মধ্যে স্তরে স্তরে জমে থাকে। হয়তো আমরা তার নাগাল পাই না। হঠাৎ কোনো গন্ধ, স্বাদ, শব্দ বা আলো সেই স্তর ভেদ করে তাকে ওপরে তুলে আনে। তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য বর্তমান আর অতীত পাশাপাশি দাঁড়ায়। আপনি একই সঙ্গে পঞ্চাশ বছরের মানুষ এবং দশ বছরের শিশু। এই অভিজ্ঞতাটা আমরা প্রায় সবাই পেয়েছি, শুধু প্রুস্তের মতো তেরো লক্ষ শব্দ লিখিনি। এটাই তাঁর সঙ্গে আমাদের তফাত।
আমরা বলি, ‘আরে, এই গন্ধটা ছোটবেলার মতো!’ প্রুস্ত বলেন, ‘বসুন। সাত খণ্ডে আলোচনা করি।’
গল্প কোথায়? যাঁরা গল্প বলতে বোঝেন খুন হবে, খুনি পালাবে, গোয়েন্দা আসবে, ট্রেনে মানুষ উঠবে, জাহাজ ডুববে, প্রেমিকা পালাবে, যুদ্ধ লাগবে, তাঁরা প্রুস্ত পড়ে বিপদে পড়তে পারেন। এখানে অনেক সময় বাহ্যিক ঘটনা খুব সামান্য। কিন্তু একটি ছোট ঘটনা মানুষের মনে কী করল, প্রুস্ত তার পেছনে কয়েক পৃষ্ঠা, কখনও কয়েক ডজন পৃষ্ঠা হাঁটবেন।
প্রুস্তকে গল্পের গতি দিয়ে বিচার করলে বিরক্তি আসতে পারে। মনের গভীরতা দিয়ে পড়লে অন্য অভিজ্ঞতা। এ বই পড়ার সময় মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে নিজের জীবনের কথা মনে পড়বে। আমার মনে হয় সেটাই প্রুস্ত পড়ার অন্যতম লক্ষণ। আপনি প্রুস্ত পড়তে পড়তে প্রুস্তকে ছেড়ে নিজের শৈশবে চলে গেলেন। লেখকের তো তখনই জয়
একজন মানুষ ঘরে ঢুকল। সাধারণ লেখক হয়তো লিখবেন, ‘সে ঘরে ঢুকল।’ প্রুস্ত ভাববেন, লোকটি কেন ঢুকল, ঢোকার সময় দরজার আলো তার মুখে কীভাবে পড়ল, তাকে দেখে কথকের মনে দশ বছর আগের কোন মানুষটির কথা উঠল, সেই মানুষটির সঙ্গে ভালোবাসা, ঈর্ষা, অপমান, প্রত্যাশার কী সম্পর্ক ছিল, তারপর সেই স্মৃতি সময় সম্পর্কে কী বোঝায়। এদিকে যে লোকটা ঘরে ঢুকেছিল সে হয়তো এখনও দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
এই কারণে প্রুস্ত পড়তে ধৈর্য লাগে। কিন্তু ধৈর্য ধরলে আপনি অন্যরকম একটা জিনিস দেখতে শুরু করবেন। ঘটনাকে নয়, ঘটনার ভিতরে মানুষের মনকে।
একজন ছেলের বড় হয়ে ওঠা। উপন্যাসের কথককে আমরা শৈশব থেকে বড় হতে দেখি। তার পরিবার আছে। শৈশবের কমব্রে আছে। মায়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ আছে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে মায়ের চুমুর জন্য অপেক্ষা আছে। এই ছোট্ট ঘটনাটাও প্রুস্তের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর কাছে মা রাতের বেলা এসে চুমু দিয়ে যাবে কি যাবে না, এটাই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট। বড়রা ভাবে, ‘এই সামান্য ব্যাপারে এত কান্নাকাটি কেন?’
শিশুর কোনো ‘সামান্য’ ব্যাপার নেই। তার পৃথিবী ছোট, ফলে সেই পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা বিশাল।
বড় হতে হতে কথক প্রেমে পড়ে। বন্ধুত্ব হয়। মানুষকে আদর্শ মনে করে। আবার সেই আদর্শ-মানুষের কাছে গিয়ে হতাশ হয়। অভিজাত সমাজের দিকে তাকিয়ে মোহিত হয়। পরে কাছে গিয়ে দেখে চকচকে মোড়কের নিচে মানুষ মোটামুটি আমাদের মতোই। কেউ ঈর্ষাকাতর। কেউ অহংকারী। কেউ হাস্যকর। কেউ নিষ্ঠুর। কেউ খুব একা। অর্থাৎ বাইরে নামের আগে যত উপাধিই থাকুক, রাতে ঘুম না এলে কাউন্ট, ডিউক, ব্যারন আর পাড়ার বিমলবাবুর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।
প্রুস্ত তাঁর মহাকাব্যের এক বিশাল অংশ জুড়ে সেই তৎকালীন ফরাসি অভিজাত সমাজকে আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন।
কে কার বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেল। কে পেল না। কে কোন পরিবারের সঙ্গে মিশছে। কার পদবি কত পুরোনো। কে কাকে গুরুত্ব দিল। কে কার দিকে তাকাল না। কে কোন সালোঁতে যায়। এগুলো শুনে প্রথমে মনে হতে পারে, এ আবার কেমন গল্প? কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, আজও এসব বদলায়নি। আগে সালোঁ ছিল। এখন সোশ্যাল মিডিয়া আছে। আগে অভিজাত ড্রয়িংরুমে ঢোকার অনুমতি দরকার ছিল। এখন ব্লু টিক দরকার। আগে কে কাকে ডিনারে ডাকল সেটা নিয়ে আলোচনা হত। এখন কে কাকে ফলো করল, আনফলো করল, কার ছবিতে লাইক দিল, সেটা নিয়ে সভ্যতার চাকা ঘোরে। মানুষের প্রযুক্তি বদলেছে। অহংকারের সফটওয়্যারটা খুব বেশি আপডেট হয়নি।
কথকও প্রথমদিকে এই অভিজাত মানুষদের দূর থেকে দেখে প্রায় পৌরাণিক প্রাণী মনে করেন। পরে কাছে গিয়ে আবিষ্কার করেন, এঁরাও গসিপ করেন, ঈর্ষা করেন, ভুল করেন, ভান করেন। এই আবিষ্কার বড় হয়ে ওঠারই অংশ।
ছোটবেলায় দূরের মানুষকে আমরা বিশাল মনে করি। বড় হয়ে কাছে গেলে তাদের উচ্চতা কমে আসে। কিছু মানুষ অবশ্য কাছে গিয়েও বড় থাকেন। সেটাই বিরল।
প্রুস্তের প্রেমের গল্পগুলো খুব আরামদায়ক নয়। ভালোবাসার সঙ্গে সন্দেহ আছে। অধিকারবোধ আছে। ঈর্ষা আছে। কেউ কোথায় গেল? কার সঙ্গে কথা বলল? কী বলল? কেন বলল? আমাকে কেন বলেনি?
প্রেম করতে করতে মানুষ অনেক সময় প্রেমিক থেকে গোয়েন্দা হয়ে যায়। আমাদের পরিচিত ব্যাপার। প্রেমিকার ফোন পাঁচ মিনিট ব্যস্ত থাকলে একজন স্বাভাবিক মানুষ ভাবতে পারে, নিশ্চয় কারও সঙ্গে কথা বলছে। প্রেমিক ভাববে, ‘কার সঙ্গে?’ তারপর শুরু হবে আন্তর্জাতিক তদন্ত। প্রুস্ত এই ঈর্ষার মনস্তত্ত্ব ভয়ানক সূক্ষ্মভাবে দেখেছেন।
কারণ আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন সেই মানুষকে পুরো জানতে চাই। সমস্যা হচ্ছে, একজন মানুষকে পুরো জানা যায় না। সে আপনার পাশে শুয়ে আছে, তবুও তার মাথার ভিতরে আলাদা একটা দেশ। সেই দেশের সীমান্ত আছে। পাসপোর্ট আছে। অনেক অঞ্চলে আপনার ভিসা নেই। এই অজানা জায়গাটাই প্রেমে ভয় তৈরি করে।
আমরা প্রিয় মানুষকে হারানোর আগে অনেক সময় তার সম্ভাব্য হারিয়ে যাওয়াকে নিয়ে কষ্ট পেতে শুরু করি। যে ঘটনা ঘটেইনি, তার জন্য আগাম দুঃখ। মানুষের মস্তিষ্কের এই বিশেষ প্রতিভা আছে। প্রুস্তের প্রেমের জগতে তাই সুখের সঙ্গে যন্ত্রণা পাশাপাশি থাকে। প্রুস্ত বারবার দেখান, আমরা অন্য মানুষকে যেমন দেখি, সে আসলে তেমন কি না, নিশ্চিত বলা কঠিন। আমরা মানুষের একটা সংস্করণ বানাই। প্রেমিকা সম্পর্কে একটা সংস্করণ। বন্ধু সম্পর্কে একটা সংস্করণ। নিজের সম্পর্কেও একটা সংস্করণ। তারপর সেই বানানো মানুষটার সঙ্গেই অনেক সময় সম্পর্ক চালাই।
বহু বছর পরে দেখা যায়, আমরা যাকে ভালোবেসেছিলাম তার বড় অংশই আমাদের কল্পনা। এখানেই প্রুস্ত একটু নিষ্ঠুর। তিনি পাঠককে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দেন না বলেই তিনি এতটা নিষ্ঠুর ও নির্মম। মানুষ রহস্যময়। প্রেম করলেও রহস্যময়। বিয়ে করলেও রহস্যময়। চল্লিশ বছর পাশাপাশি থাকলেও পুরোটা জানা হয় না।
মাঝে মাঝে এমন হয়, কোনো মানুষ ওপাড়ে চলে যাওয়ার পর তার ধুলোপড়া পুরোনো চিঠিপত্রগুলো হাতে আসে। সেগুলো পড়তে গিয়ে হঠাৎ বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে—মনে হয়, লোকটার বুকের ভেতর এমন এক প্রকাণ্ড জগৎ ছিল, যার কথা আমরা কোনোদিন টেরই পাইনি।
আরেকটা জটিল ব্যাপার আছে। যখন স্মৃতির সিন্দুকে রাখা কোনো পুরোনো মুহূর্তের ধুলো ঝাড়তে বসি, তখন ঠিক যা ঘটেছিল আমরা কি হুবহু সেই ছবিটাই দেখতে পাই? নাকি আমাদের বর্তমানের চশমা দিয়ে সেই ফেলে আসা দিনটাকে অন্য কোনো রঙে রাঙিয়ে নিয়ে এক নতুন গল্প সাজাই?
প্রুস্তের জগতে স্মৃতি কোনো CCTV ফুটেজ নয়। স্মৃতি জীবন্ত। সময় তাকে বদলায়। আমরা বদলাই। ফলে আমাদের অতীতও বদলে যায়। বিশ বছর বয়সে যে প্রেমকে জীবনের একমাত্র সত্য মনে হয়েছিল, পঞ্চাশ বছর বয়সে তাকিয়ে হয়তো হাসি পাবে। আবার পঞ্চাশে দাঁড়িয়ে মনে হবে, সেই বিশ বছরের ছেলেটার অনুভূতিটা তুচ্ছও ছিল না। সে তখন সত্যিই ওইভাবে বেঁচেছিল।
এই কারণে প্রুস্তের বই পড়তে পড়তে নিজের জীবন নিয়েও সন্দেহ হয়। আমার শৈশবের যে গল্প আমি বহুবার বলেছি, প্রথম ঘটনাটা কি সত্যিই তেমন ছিল? নাকি গল্প বলতে বলতে গল্পটাকেই স্মৃতি বানিয়ে ফেলেছি? মানুষের আত্মজীবনীতে এই বিপদ চিরকাল। আমরা জীবন মনে করি। তারপর জীবন সম্পাদনা করি। তারপর সম্পাদিত জীবনটাই সত্যি বলে বিশ্বাস করি।
সময় আমাদের কী করে? প্রুস্তের কাছে সময় শুধু ঘড়ির ব্যাপার নয়। সময় মানুষকে বদলায়। শরীর বদলায়। সম্পর্ক বদলায়।
সমাজে মানুষের পজিশন বা দাপট চিরকাল এক থাকে না। যেই মুখটাকে একসময় অপার্থিব সৌন্দর্যের আধার বলে মনে হতো, বহু বছর পর তাকে দেখে চেনাটাই যেন এক মস্ত দায় হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোনো এক ডিনারের মধ্যমণি যে মানুষটি সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন, কালের নিয়মে একসময় তাঁর খোঁজ নেওয়ার মতো কাউকেও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি প্রবল প্রতাপশালী কোনো রাজকীয় পরিবারকেও সময় এক ঝটকায় ধুলোয় নামিয়ে আনতে পারে।
প্রুস্তের এই নির্মম পর্যবেক্ষণগুলো পড়তে বসলে মনের মধ্যে কেমন একটা খচখচে অস্বস্তি দানা বাঁধে। কারণ আমরা অবুঝের মতো নিজেদের এই ক্ষণস্থায়ী বর্তমানটাকেই অমর আর অপরিবর্তনীয় বলে বিশ্বাস করতে চাই। আমার বাড়ি। আমার কাজ। আমার বন্ধু। আমার প্রেম। আমার খ্যাতি। আমার শরীর। আমার পরিচয়। সময় পিছনে বসে মুচকি হাসে। সে জানে, ‘দেখা যাবে।’
উপন্যাসের সবচেয়ে গভীর জায়গাটা সম্ভবত শেষে। শিল্পের কাছে শেষ আশ্রয়। কথক ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তাঁর এত বছরের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা, ব্যর্থতা, ঈর্ষা, অপমান, আনন্দ, শৈশব, সমাজ দেখা, মানুষের পরিবর্তন দেখা, এগুলো এলোমেলো ঘটনা হয়ে পড়ে নেই। এগুলোই তাঁর লেখার উপাদান। তিনি লেখক হতে চান।
এখানে প্রুস্ত শিল্প সম্পর্কে এক আশ্চর্য ধারণা দেন। জীবনে আমরা যে সময় হারিয়ে ফেলি, শিল্প তাকে একইভাবে ফেরায় না। মরা মানুষ জীবিত হয় না। পুরোনো বাড়ি ফেরত আসে না। যৌবন ফিরে আসে না। কিন্তু শিল্প সেই অভিজ্ঞতার অর্থ উদ্ধার করতে পারে।
আমরা যে দিনটাকে তখন তুচ্ছ ভেবেছিলাম, বহু বছর পরে লেখার মধ্যে সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে দুঃখকে তখন দুর্ভাগ্য মনে হয়েছিল, শিল্পী পরে বুঝতে পারে ওই দুঃখই তাকে দেখার চোখ দিয়েছে। এই কারণে লেখকের জীবনে কোনো অভিজ্ঞতাই পুরোপুরি অপচয় হয় না। অবশ্য লেখক তখন সেটা জানে না। প্রেম ভাঙার দিন সে বসে ভাববে না, ‘চমৎকার, সাত নম্বর অধ্যায়ের উপাদান পাওয়া গেল।’ তখন সে কাঁদবে। পরে লিখবে।
মানুষের কষ্ট আর শিল্পের মধ্যে এই সময়ের ব্যবধানটাই গুরুত্বপূর্ণ। যে বইটি আমরা পড়ছি, সেই বইই লেখা হবে। প্রুস্ত এখানে একটা সুন্দর বৃত্ত তৈরি করেন। দীর্ঘ উপন্যাসের শেষে কথক বুঝতে পারেন, তাঁকে তাঁর জীবন নিয়ে একটা বই লিখতে হবে। পাঠক তখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, যে বই তিনি লিখবেন বলে ভাবছেন, আমরা যেন সেই বইটাই এতক্ষণ ধরে পড়ছি। অর্থাৎ সাত খণ্ড ধরে একজন মানুষ লেখক হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সে জীবন কাটিয়েছে। ভুল করেছে। প্রেম করেছে। ঈর্ষা করেছে। মানুষের পেছনে ছুটেছে। অভিজাত সমাজে ঢুকেছে। হতাশ হয়েছে। মানুষ হারিয়েছে। বুড়ো হয়েছে। তারপর বুঝেছে, এই সবকিছুর মধ্যে একটা বই লুকিয়ে ছিল। বইটি লেখার আগে তাকে জীবনটা বাঁচতে হয়েছিল। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক শিক্ষা আর কী হতে পারে!
কারণ তখন নিজের প্রতিটি বিপর্যয় দেখেও মনে হবে, দেখি, শেষে এর থেকে কী লেখা যায়।
বইটি পড়তে এত কঠিন কেন? প্রুস্ত পড়তে অসুবিধা হওয়ার কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমত তাঁর বাক্য। বাক্য শুরু হয়েছে সোমবার সকালে, শেষ হতে হতে বৃহস্পতিবার বিকেল। মাঝখানে আপনি দুবার চা খেয়ে আসতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তিনি দ্রুত এগোতে চান না। আমাদের বর্তমান জীবনের সঙ্গে এটা সাংঘর্ষিক। আমরা দশ সেকেন্ডের ভিডিওতে বিরক্ত হয়ে স্ক্রল করি। প্রুস্ত বলছেন, একটা অনুভূতি নিয়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা বসুন। আজকের পাঠক বলবে, ‘ভাই, সারাংশ আছে?’, ‘ভাই লেখা ছোট করেন’। তৃতীয়ত, চরিত্র অনেক। নাম, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, প্রেম, পরিচিতি, সময়ের পরিবর্তন সব মিলিয়ে প্রথমদিকে মাথা ঘুরতে পারে। চতুর্থত, গল্প সরলরেখায় চলে না। স্মৃতি যেভাবে চলে, গল্পও অনেকটা সেভাবে। একটা কথা থেকে আরেকটা। একজন মানুষ থেকে পুরোনো একটা ঘটনা। সেখান থেকে কোনো গন্ধ। তারপর একটা সম্পর্ক। তারপর আবার বর্তমান।
আমাদের নিজের চিন্তাও তো এইভাবে চলে। আপনি রাতে শুয়ে বিদ্যুৎ বিলের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ক্লাস সেভেনের এক বন্ধুর কথা ভাবতে শুরু করলেন কেন, তার কোনো যুক্তিসঙ্গত মানচিত্র কেউ আঁকতে পারবে না। প্রুস্তের বই সেই মনের মানচিত্র অনুসরণ করে।
তাহলে কীভাবে পড়বেন? এই বইকে প্রতিযোগিতা বানালে বিপদ। ‘এই মাসেই সাত খণ্ড শেষ করব।’ কেন? প্রুস্ত কি পালিয়ে যাচ্ছেন? ধীরে পড়ুন। পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ুন। দশ পৃষ্ঠা পড়ুন। একটা জায়গা ভালো লাগলে থামুন। নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। বিশেষ করে কমব্রের অংশ, ম্যাডেলিনের দৃশ্য, প্রেম আর ঈর্ষার অংশগুলো, সমাজের পর্যবেক্ষণ, শেষের শিল্প ও সময় নিয়ে উপলব্ধি।
প্রুস্তকে গল্পের গতি দিয়ে বিচার করলে বিরক্তি আসতে পারে। মনের গভীরতা দিয়ে পড়লে অন্য অভিজ্ঞতা। এ বই পড়ার সময় মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে নিজের জীবনের কথা মনে পড়বে। আমার মনে হয় সেটাই প্রুস্ত পড়ার অন্যতম লক্ষণ। আপনি প্রুস্ত পড়তে পড়তে প্রুস্তকে ছেড়ে নিজের শৈশবে চলে গেলেন। লেখকের তো তখনই জয়।
বড় হয়ে ওঠার সবচেয়ে কষ্টের শিক্ষা। উপন্যাসে কথক অনেক কিছু শেখে। মানুষকে দূর থেকে যত সুন্দর লাগে, কাছে গিয়ে তত জটিল লাগে। প্রেম মানুষকে মহৎও করতে পারে, হাস্যকরও করতে পারে। অভিজাত সমাজের দরজা খুলে গেলে দেখা যায় ভিতরে বসে থাকা মানুষগুলোও ভয়, হিংসা, অহংকার, নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে বেঁচে আছে।
শৈশব ফিরে আসে না। যৌবন ফিরে আসে না। কোনো সম্পর্ককে শক্ত করে ধরে রাখলেই সেটা টিকে থাকবে, এমন কোনো চুক্তি নেই। বড় হয়ে ওঠার সবচেয়ে নিদারুণ শিক্ষা বোধহয় এটাই—আমরা সময়ের আঙিনায় বাস করি ঠিকই, কিন্তু সময় তার খেয়ালখুশিমতো চলে, আমাদের অনুমতির তোয়াক্কা করার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন সে মনে করে না। আপনি প্রস্তুত কি না, সময়ের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
তারপরও সব হারায় না। প্রুস্তের বইকে খুব বিষণ্ন মনে হতে পারে। কারণ সবাই বদলায়। সবকিছু চলে যায়। কিন্তু উপন্যাসের শেষে একটা আশ্চর্য আশ্বাস আছে। যা ঘটেছে, তার সবটুকু নষ্ট হয়নি। একটি অনুভূতি, একটি বিকেল, একটি মুখ, একটি শৈশব, একটি প্রেম, একটি ব্যর্থতা শিল্পের মধ্যে নতুন জীবন পেতে পারে।
লেখক সময়কে থামাতে পারেন না। তিনি সময়ের ভেতর থেকে অর্থ উদ্ধার করতে পারেন। এই পার্থক্যটাই বড়। হয়তো এ কারণেই মানুষ লেখালেখি করে। হয়তো এ কারণেই আমরা পুরোনো ছবি দেখি। পুরোনো চিঠি রেখে দিই। মৃত মানুষের হাতের লেখা ফেলে দিতে পারি না। কোনো পুরোনো বইয়ের মধ্যে শুকনো ফুল পেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। জানি ফুলটা আর ফুল নেই। তবু ফেলতে ইচ্ছে করে না। কারণ মানুষ শুধু বর্তমানকে আঁকড়ে বেঁচে থাকে না। তার একটা বড় অংশ এমন সব সময়ে বাস করে, যেগুলো ক্যালেন্ডারে আর নেই। প্রুস্ত সেই হারিয়ে যাওয়া ক্যালেন্ডারের লেখক।
In Search of Lost Time নিয়ে যদি একেবারে সহজ করে বলতে হয়, আমি বলব, যৌবন পেরিয়ে আসা সেই ছেলেটি একদিন বুঝতে পারে, কালস্রোত তার সামনে দিয়ে বয়ে গেলেও সবটুকু ধুয়ে নিয়ে যায়নি; বরং জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো তার ভিতরেই কোথাও আষ্টেপৃষ্ঠে জমা হয়ে আছে। তার শৈশব আছে। তার প্রেম আছে। তার ভুল আছে। তার ঈর্ষা আছে। তার অপমান আছে। তার দেখা মানুষগুলো আছে। সবই তার মধ্যে অন্য এক অবস্থায় জমে আছে। এক কাপ চা, একটা কেক, একটা গন্ধ, একটা শব্দ হঠাৎ সেই গোপন ভাণ্ডারের দরজা খুলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে, সময়কে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু তাকে বুঝে নেওয়া যায়। লেখার মধ্যে তাকে আবার ছুঁয়ে দেখা যায়। সেখানেই প্রুস্তের বিশাল সাত খণ্ডের কাণ্ডকারখানা গিয়ে দাঁড়ায়। তেরো লক্ষের বেশি শব্দ খরচ করে ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন একটা কথাই বললেন, যেটা আমরা প্রায় সবাই কোনো এক বৃষ্টির বিকেলে, পুরোনো গান শুনে, নিজের অজান্তেই অনুভব করেছি।
পুরোনো স্মৃতি চলে যায়। কিন্তু মানুষের ভেতর থেকে পুরোপুরি বিদায় নিতে তাদেরও বোধহয় একটু মায়া লাগে।




