I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
পৃথিবীতে এমন কিছু বই আছে, যেগুলোর নাম যত লোক জানেন, বইগুলো পড়েছেন তার দশ ভাগের এক ভাগ লোকও কি না সন্দেহ। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার The End of History and the Last Man সেই গোত্রের। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত বইটি সম্পর্কে মোটামুটি একটা সর্বজনস্বীকৃত ধারণা চালু আছে। ফুকুয়ামা নাকি বলেছিলেন, ইতিহাস শেষ। তার পর থেকে পৃথিবীর যেখানে যখনই যুদ্ধ লেগেছে, বিপ্লব হয়েছে, স্বৈরশাসক ক্ষমতায় এসেছেন, কিংবা কোনও দেশের প্রেসিডেন্ট আচমকা অন্য দেশের উপর বোমা ফেলেছেন, অমনি একদল লোক ফুকুয়ামাকে ধরে এনে বলেছে, কী হে পণ্ডিত, ইতিহাস তো শেষ হয়ে গিয়েছিল, এ আবার কী হচ্ছে? তোমার ইতিহাস কি ছুটি কাটিয়ে ফিরল?
বেচারা ফুকুয়ামা।
লোকটা ইতিহাসের সমাপ্তি নিয়ে একটা জটিল দার্শনিক তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন। পৃথিবী সেই তত্ত্বের শিরোনামটুকু পড়ে তাঁকে গত তিন দশক ধরে পরীক্ষার খাতায় লাল কালি দিয়ে শূন্য বসিয়ে চলেছে।
অবশ্য ফুকুয়ামার বই পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার জন্য পাঠকদেরও পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। বিশেষত পাঠকের বয়স যদি সতেরো-আঠারো হয়।
মেরিল্যান্ডের শহরতলিতে একটি কিশোর বাস করে। তার বন্ধুবান্ধব আছে, কম্পিউটার আছে, ইন্টারনেট আছে, রাজনৈতিক তর্ক করার প্রচুর সময় আছে। কৈশোরের শরীরে তখন হরমোনের এমন দাপাদাপি যে, পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনাই মনে হয় নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ওই বয়সে কেউ The Catcher in the Rye পড়ে হোল্ডেন কলফিল্ডের মতো সমস্ত পৃথিবীকে ভণ্ড মনে করে। কেউ গ্যেটের The Sorrows of Young Werther পড়ে প্রেমের ব্যর্থতাকে মহাজাগতিক বিপর্যয় হিসেবে গ্রহণ করে। আর আমাদের এই কিশোর পড়ে ফেলল ফুকুয়ামা।
ফল হল মারাত্মক।
সে বুঝে গেল, মানুষের সামনে বড় কোনও আদর্শগত সংগ্রামের সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট নেই। ইতিহাস তার প্রধান নাটকটি শেষ করে ফেলেছে। কমিউনিজম বনাম ক্যাপিটালিজম, ফ্যাসিবাদ বনাম গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বনাম উদারনীতি, এসব নিয়ে যে কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের এত রক্তারক্তি, তার শেষ অঙ্ক অভিনীত হয়ে গেছে। এবার পর্দা নামবে। দর্শক বাড়ি যাবে।
কিন্তু কিশোর যাবে কোথায়?
তার তো সবে রাজনৈতিক উত্তেজনার বয়স হয়েছে। সে চায় পৃথিবী বদলাতে। বিপ্লব করতে। বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে তর্ক করতে। শত্রুপক্ষকে যুক্তির আঘাতে ধরাশায়ী করতে। প্রয়োজনে সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কয়েক রাত না ঘুমোতে। অথচ ফুকুয়ামা এসে জানিয়ে দিয়েছেন, ওসব হয়ে গেছে বাবা। তোমার জন্মাতে একটু দেরি হয়েছে।
সমস্যা আরও বেড়ে গেল, কারণ সময়টা ২০২০ সাল।
আমেরিকার রাজনৈতিক উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, মহামারি, বর্ণবৈষম্য, প্রতিবাদ, পালটা প্রতিবাদ। শহরতলির কিশোরদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বড় অংশই অবশ্য কম্পিউটারের সামনে বসে। নিজেরা রাস্তায় নেমে ইতিহাস তৈরি করার চেয়ে অন্যদের ইতিহাস তৈরি করা নিয়ে তর্ক করাই তাদের প্রধান কর্মসূচি। কিন্তু সেই পরোক্ষ অংশগ্রহণেও একটা উত্তেজনা আছে। পৃথিবীতে একটা বিরাট কিছু ঘটছে এবং তার সঙ্গে আমারও একটা সম্পর্ক আছে, এই বিশ্বাস কৈশোরকে বেশ নেশাগ্রস্ত করে।
ফুকুয়ামা সেই নেশায় জল ঢেলে দিলেন।
কিশোরটির কয়েক মাস কাটল এক বিচিত্র অস্তিত্বসংকটে। পৃথিবীতে যদি আর কোনও মহৎ রাজনৈতিক সংগ্রাম অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে বেঁচে থেকে কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে একদিন সে আবিষ্কার করবে, পৃথিবীতে কাঠের টেবিল বানানো যায়, ফুল সাজানো যায়, ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা যায়। কিন্তু সে অনেক পরের কথা।
প্রথমে ফুকুয়ামাকে একটু বোঝা দরকার।
১. ইতিহাস শেষ হওয়া বলতে কী বোঝায়?
ফুকুয়ামার তত্ত্বের জন্ম স্নায়ু যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভাঙল। পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট শাসনগুলো একের পর এক ভেঙে পড়ল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান হল। যে রাজনৈতিক আদর্শ বিংশ শতাব্দীর একটা বিরাট অংশ জুড়ে পশ্চিমি উদার গণতন্ত্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, সেই আদর্শের রাষ্ট্রিক কাঠামো চোখের সামনে ধসে গেল।
পশ্চিমি বিশ্বে তখন বিজয়োল্লাস। অনেকেই ভাবছেন, গণতন্ত্র জিতেছে, পুঁজিবাদ জিতেছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা জিতেছে। এবার সমস্ত পৃথিবী একটু একটু করে পশ্চিমি উদার গণতন্ত্রের দিকে এগোবে।
ফুকুয়ামাও সেই পরিস্থিতিতে ইতিহাসের সমাপ্তির কথা বললেন। কিন্তু তাঁর ইতিহাসের ধারণাটা একটু আলাদা।
এর শিকড় আছে হেগেলের দর্শনে।
হেগেলের কাছে ইতিহাস ছিল মানবচেতনার বিকাশের এক বিরাট প্রক্রিয়া। মানুষ ধীরে ধীরে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বুঝতে শেখে। সমাজের প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, আইন, রাজনৈতিক সম্পর্ক, এসবের মধ্য দিয়ে সেই স্বাধীনতার ধারণা বিকশিত হয়।
পরবর্তী কালে আলেকজান্দ্র কোজেভ নামে এক রুশ-বংশোদ্ভূত ফরাসি দার্শনিক হেগেলের দর্শনের এক প্রভাবশালী ব্যাখ্যা হাজির করলেন। ১৯৩০-এর দশকে প্যারিসে তাঁর হেগেল-বিষয়ক বক্তৃতাগুলো ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল। রেমঁ কেনো, জর্জ বাতাই, মরিস মেরলো-পন্তি, জাক লাকাঁর মতো ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময়ে সেই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কোজেভের ব্যাখ্যায় ইতিহাস হল মানুষের স্বীকৃতি অর্জনের সংগ্রামের ইতিহাস।
ফুকুয়ামা সেই ধারণাটিকেই আধুনিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করলেন।
তাঁর বক্তব্য, উদার গণতন্ত্র ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতি মানবসমাজের মৌলিক রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর একটা কার্যকর সমাধান হাজির করেছে। মানুষ নাগরিক অধিকার পেতে পারে, রাষ্ট্রের কাজে অংশ নিতে পারে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করতে পারে, আইনগত সমতার দাবি করতে পারে। বস্তুগত সমৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
ফলে রাজনৈতিক আদর্শের বিবর্তনে উদার গণতন্ত্রকে একটি চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ভাবা যায়।
এখানে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার।
ফুকুয়ামা বলেননি, পৃথিবীতে আর যুদ্ধ হবে না। বলেননি, স্বৈরশাসক জন্মাবেন না। এমনকী সমস্ত দেশ অবিলম্বে গণতান্ত্রিক হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তাও দেননি।
তাঁর দাবি ছিল, উদার গণতন্ত্রের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য এবং সর্বজনীন কোনও বিকল্প রাজনৈতিক আদর্শ মানবসভ্যতার সামনে আর দেখা যাচ্ছে না।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
ধরুন, কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ নানা ধরনের যানবাহন তৈরি করল। ঘোড়ার গাড়ি, পালকি, রথ, সাইকেল, মোটরগাড়ি। শেষে এমন একটা যান আবিষ্কৃত হল, যা মানুষের যাতায়াতের মৌলিক চাহিদাগুলো সবচেয়ে কার্যকরভাবে মেটাতে পারে।
তার পরেও গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটবে। রাস্তা ভাঙবে। চালক মাতাল হবে। ট্র্যাফিক পুলিশ ঘুষ খাবে। কোথাও গাড়ি পুড়বে।
এসব ঘটনার কোনওটিই সরাসরি প্রমাণ করে না যে যানবাহনটির মৌলিক নকশা অকার্যকর।
ফুকুয়ামা উদার গণতন্ত্র সম্পর্কে অনেকটা এমনই একটা দাবি করেছিলেন।
দাবিটি যে বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তা অবশ্য নয়। ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাগুলো তাঁর তত্ত্বের বিভিন্ন দুর্বলতা সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের সাফল্য, সবই প্রশ্ন তুলেছে, উদার গণতন্ত্রের বিজয় সম্পর্কে এতখানি আত্মবিশ্বাস আদৌ যুক্তিসংগত ছিল কি না।
কিন্তু ফুকুয়ামার বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত এই বিজয়ের ঘোষণা নয়।
আসল গোলমাল শুরু হয়েছে বিজয়ের পরে।
২. মানুষের পেট ভরল, এবার তার অহংকারের কী হবে?
মানুষের কী চাই?
খাবার চাই। মাথার উপর ছাদ চাই। শীতকালে গরম জামা চাই। অসুখ হলে চিকিৎসা চাই। সন্তানের জন্য নিরাপত্তা চাই।
এগুলো মোটামুটি সবাই জানি।
কিন্তু মানুষ এমন এক প্রাণী, যার পেট ভরে গেলেও সমস্যা শেষ হয় না।
সে চায়, অন্যরা তাকে গুরুত্ব দিক।
ধরুন, আপনার একটি বাড়ি আছে। চমৎকার বাড়ি। শোবার ঘরে এসি, রান্নাঘরে মাইক্রোওয়েভ, বাথরুমে গরম জল। আপনার কোনও অভাব নেই।
একদিন পাশের বাড়ির ভদ্রলোক একটা গাড়ি কিনলেন।
আপনার গাড়িটাও দিব্যি চলছে। কিন্তু নতুন গাড়িটা দেখে আপনার বুকের মধ্যে কী একটা খচখচ করতে লাগল।
ভদ্রলোক কি আপনাকে ছাড়িয়ে গেলেন?
এবার আপনিও গাড়ি বদলালেন।
তার পর আরেক দিন অফিসে দেখলেন, সহকর্মী পদোন্নতি পেয়েছেন। আপনার মাইনে যথেষ্ট। সংসার চলে। বেড়াতেও যেতে পারেন। তবু মন খারাপ।
কেন?
কারণ পৃথিবীতে এমন কিছু জিনিস আছে, যার মূল্য অন্য মানুষের চোখে আপনার অবস্থানের উপর নির্ভর করে।
হেগেলের দর্শন থেকে কোজেভ, এবং কোজেভ থেকে ফুকুয়ামা এসে মানুষের এই স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রে বসালেন।
ফুকুয়ামা গ্রিক শব্দ thymos ব্যবহার করেন। প্লেটোর আত্মাবিষয়ক আলোচনায় এই ধারণার শিকড় রয়েছে। মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ, ক্রোধ, গর্ব, সম্মান পাওয়ার ইচ্ছা, অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, এসবের সঙ্গে থাইমোসের সম্পর্ক।
এই আকাঙ্ক্ষার আবার দুটো আলাদা রূপ রয়েছে।
একটি হল isothymia। অন্যদের সমান মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
আরেকটি হল megalothymia। অন্যদের চেয়ে বেশি মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
প্রথমটি বলছে, আমাকে তোমাদের সমান মানুষ হিসেবে স্বীকার করো।
দ্বিতীয়টি বলছে, আমাকে দেখে তোমরা দাঁড়িয়ে পড়ো।
গণতন্ত্র প্রথম আকাঙ্ক্ষাটিকে পূরণ করার চেষ্টা করে।
রাজা এবং প্রজার মধ্যে জন্মগত মর্যাদার ফারাক ঘোচে। প্রত্যেক নাগরিক আইনের চোখে সমান। প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান। প্রত্যেকের অধিকার স্বীকৃত।
চমৎকার ব্যবস্থা।
কিন্তু দ্বিতীয় আকাঙ্ক্ষাটি কোথায় যাবে?
মানুষের একটা অংশ সমান হতে চায়। আরেকটা অংশ চায় অসাধারণ হতে। কেউ চায় তার নাম ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকুক। কেউ চায় হাজার বছর পরেও মানুষ তাকে স্মরণ করুক। কেউ চায় যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব দেখাতে। কেউ চায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে।
উদার গণতন্ত্র প্রথম আকাঙ্ক্ষাটিকে নৈতিক ভিত্তি দেয়। দ্বিতীয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
এখানেই ফুকুয়ামার দুশ্চিন্তা।
ধরা যাক, পৃথিবীতে এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হল, যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটেছে। স্বাধীনতা আছে। নিরাপত্তা আছে। প্রত্যেকের সমান মর্যাদা আছে।
সেই সমাজে মানুষ কী করবে?
খাবে, ঘুমোবে, বেড়াবে, প্রেম করবে, বাজার করবে, টেলিভিশন দেখবে।
বেশ।
কিন্তু যে মানুষ অন্যদের চেয়ে বড় হতে চায়, তার কী হবে?
যার বুকের মধ্যে আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ন কিংবা আকিলিসের মতো মহত্ত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা গুমরে মরছে, তাকে যদি বলা হয়, তোমার জন্য সুন্দর বাড়ি, স্বাস্থ্যবিমা আর বছরে দুবার ছুটি বরাদ্দ হয়েছে, এবার শান্ত হয়ে বসো, সে কি বসবে?
সম্ভবত সকলেই বসবে না।
ফুকুয়ামা এই আশঙ্কাটাই করেছিলেন।
মানুষ হয়তো এমনকি বিনা প্রয়োজনেও সংঘাত তৈরি করবে। কেবল নিজের সাহস, শক্তি, শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য।
কারণ তার কাছে নিরাপত্তার চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে স্বীকৃতি।
৩. নিৎশের শেষ মানুষ এবং সভ্যতার আরামকেদারা
এখানে এসে হাজির হন ফ্রিডরিখ নিৎশে।
নিৎশের Thus Spoke Zarathustra বইয়ে একটি চরিত্রগত ধারণা আছে, the last man, শেষ মানুষ।
শেষ মানুষটি অত্যন্ত সাবধানী। নিরাপত্তাপ্রিয়। ঝুঁকি নিতে চায় না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না। নিজের ছোটখাটো সুখের মধ্যেই সন্তুষ্ট।
সে এমন একটি পৃথিবী চায়, যেখানে বিপদ কম, কষ্ট কম, অস্বস্তি কম।
নিৎশের জরাথুস্ত্র এই মানুষটির কথা বলতে গিয়ে এক ধরনের অবজ্ঞা প্রকাশ করেন। কারণ শেষ মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ অস্তিত্বে এত সন্তুষ্ট যে, নিজেকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষাই হারিয়ে ফেলেছে।
ভাবুন, একজন মানুষ সারাজীবন চেষ্টা করেছেন একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠবেন।
পাহাড় দুর্গম। পথে খাদ আছে, বরফ আছে, মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে।
একদিন সরকার ঘোষণা করল, পাহাড়ে ওঠা বিপজ্জনক। পাহাড়ের ছবি দেখার জন্য নীচে চমৎকার একটা পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সেখানে গরম কফি পাওয়া যায়। আরামদায়ক চেয়ার আছে। বড় পর্দায় পাহাড়ের ছবি দেখানো হয়। চাইলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানোর মতো ছবিও তুলে দেওয়া হবে।
সকলেই খুশি।
কিন্তু যে মানুষটি সত্যি সত্যি পাহাড়ে উঠতে চেয়েছিলেন, তাঁর কী হবে?
ফুকুয়ামা এই প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক সভ্যতার ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করলেন।
এবং এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
যদি উদার গণতন্ত্র মানবসভ্যতার সর্বোত্তম রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়, তাহলে তার সাফল্যই কি মানুষের একটা মৌলিক আকাঙ্ক্ষাকে অপূর্ণ রেখে দেবে?
মানুষ কি নিজের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, আরামদায়ক সমাজের উপরেই বিরক্ত হয়ে উঠবে?
আজকের কিছু রাজনৈতিক আন্দোলন দেখে এই প্রশ্নটি আবার নতুন করে মনে পড়ে।
এমন তরুণও দেখা যায়, যে অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করছে, অথচ বলছে, দেশে একটা যুদ্ধ লাগা দরকার। পুরোনো বীরত্ব ফিরে আসা দরকার। গণতন্ত্র বড্ড নরম হয়ে গেছে। শক্তিশালী নেতা চাই। শত্রু চাই। সংঘর্ষ চাই।
এমন কথার পিছনে কতটা অর্থনৈতিক ক্ষোভ, কতটা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কতটা পরিচয়ের সংকট, আর কতটা থাইমোসের উত্তেজনা কাজ করছে, তা আলাদা করে বিচার করা দরকার।
ফুকুয়ামার তত্ত্ব দিয়ে সমস্ত সমকালীন রাজনীতি ব্যাখ্যা করা যাবে না।
তবে মানুষের একটা অস্বস্তিকে তিনি ঠিকই চিনেছিলেন।
কিছু মানুষ শান্তির মধ্যে থেকেও অশান্তির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।
কারণ অশান্তি তাদের নিজের গুরুত্ব অনুভব করার সুযোগ দেয়।
৪. ইতিহাসের শেষ মানুষের আত্মজীবনীতে কাঠের গুঁড়ো
এই পর্যন্ত শুনে মনে হতে পারে, ফুকুয়ামা নিজে নিশ্চয়ই ইতিহাসের অবসান নিয়ে গভীর বিষণ্ণতায় ভুগেছেন।
লোকটি স্নায়ু যুদ্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকা। পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা। বিপ্লব। মতাদর্শ। গুপ্তচর। সামরিক জোট। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরাট বিরাট তর্ক।
তার পর একদিন তিনি ঘোষণা করলেন, ইতিহাসের প্রধান আদর্শগত সংগ্রাম শেষ।
এই ঘোষণা দেওয়ার পর নিশ্চয়ই তাঁর বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল?
অন্তত তাঁর স্মৃতিকথা পড়ে এমন কোনও যন্ত্রণার সন্ধান পাওয়ার আশা করা যায়।
কিন্তু In the Realm of the Last Man পড়লে অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হবে পাঠকের।
একজন রাজনৈতিক দার্শনিকের স্মৃতিকথা পড়তে বসেছেন। আশা করছেন, হেগেল, কোজেভ, মার্কস, নিৎশে, স্নায়ু যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আত্মসমীক্ষা পাবেন।
এসব আছে।
কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে কাঠের কাজ, ক্যামেরা, গানবাজনা, খেলাধুলা, কম্পিউটার তৈরির অভিজ্ঞতা।
তৃতীয় অধ্যায়ে কাঠের কাজ।
দশম অধ্যায়ে ফটোগ্রাফি।
দ্বাদশ অধ্যায়ে আবার কাঠের কাজ।
পঁচিশতম অধ্যায়ে কম্পিউটার।
যে মানুষ ইতিহাসের সমাপ্তির তত্ত্ব দিয়েছেন, তিনি নিজের জীবনকাহিনি বলতে গিয়ে কখন কোন যন্ত্র ব্যবহার করে কী বানিয়েছেন, তার খুঁটিনাটি বিবরণ দিচ্ছেন।
পাঠক একটু হতভম্ব হতেই পারেন।
এই যে সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল, পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র পালটে গেল, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত আলোচনা হল, তার মধ্যে আপনার কাঠের তাক বানানোর অভিজ্ঞতা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কী করে?
সমালোচক স্যামুয়েল ময়নও এই বিষয়টিতে খোঁচা দিয়েছেন। ফুকুয়ামার ব্যক্তিগত আবেগ, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক, জীবনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে বইটিতে তুলনামূলকভাবে কম জানা যায়। তার বদলে ক্যামেরা আর পাওয়ার টুলসের বিবরণ।
ময়নের রসিকতা, ইতিহাস শেষ হওয়ার পরের পার্টিটা যে বিরক্তিকর হবে, ফুকুয়ামা তো আগেই বলেছিলেন।
কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলে?
হয়তো ওই ক্যামেরা, ওই কাঠের কাজ, ওই শখগুলোই স্মৃতিকথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হয়তো ফুকুয়ামা নিজের তত্ত্বের একটা বাস্তব উত্তর সারা জীবন ধরে চর্চা করে এসেছেন।
উত্তরটা খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে জাপানে।
৫. জাপানের চায়ের পেয়ালায় হেগেলের ইতিহাস
১৯৫৮ সালে আলেকজান্দ্র কোজেভ জাপান সফর করেছিলেন।
সেই অভিজ্ঞতা তাঁর ইতিহাসের সমাপ্তিবিষয়ক চিন্তায় একটি অদ্ভুত মাত্রা যোগ করে।
জাপানের ইতিহাসে তোকুগাওয়া শোগুনতন্ত্রের শাসনকাল, ১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ সাল, দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত। অবশ্য এই শান্তি সর্বত্র, সর্বসময়ে এবং সকল মানুষের জন্য সমান ছিল না। তবু তার আগের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের যুগের তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি স্থিতিশীল সময়।
সেই জাপানে কিছু সাংস্কৃতিক চর্চা বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছিল।
চা পরিবেশনের অনুষ্ঠান।
ফুল সাজানো।
নোহ থিয়েটার।
ক্যালিগ্রাফি।
এই সমস্ত কাজের একটা বিশেষত্ব আছে।
ধরুন, আপনি চা খাবেন।
আমাদের সাধারণ ধারণা, চা খাওয়ার জন্য জল গরম করতে হবে, চা পাতা দিতে হবে, দুধ-চিনি লাগলে দিতে হবে, তারপর পেয়ালায় ঢেলে খেতে হবে।
কাজ শেষ।
কিন্তু জাপানি চা-অনুষ্ঠানের ঐতিহ্যে এই কাজের চারপাশে তৈরি হয়েছে বিপুল নিয়মকানুন। কোন পাত্র ব্যবহার করবেন, কীভাবে ধরবেন, কীভাবে বসবেন, কোন ভঙ্গিতে পরিবেশন করবেন, কীভাবে অতিথিকে সম্মান জানাবেন।
এক কাপ চা খেতে গিয়ে একটা সম্পূর্ণ নন্দনতাত্ত্বিক জগৎ তৈরি হয়ে গেছে।
এবার কেউ বলতে পারেন, এত ঝামেলার দরকার কী? চা তো পেটেই যাবে।
তা যাবে।
কিন্তু মানুষ চায়ের সঙ্গে আরও কিছু তৈরি করেছে। মনোযোগ, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্যবোধ, দক্ষতা, ঐতিহ্য, মর্যাদা।
একই কথা ফুল সাজানোর ক্ষেত্রেও।
ফুল তো এমনিতেই সুন্দর।
বাগানে ফুটেছে। গাছে আছে। বাতাসে দুলছে।
মানুষ এসে বলল, না, ফুলগুলোকে বিশেষ নিয়মে সাজাতে হবে। এই ডালটা এতখানি বাঁকবে। ওই ফুলটা ওখানে থাকবে। এই পাতাটা সামনের দিকে মুখ করে থাকবে। অমুক ঋতুতে তমুক ফুল ব্যবহার করা চলবে।
তারপর সেই কাজের জন্য শিক্ষক তৈরি হলেন। শিক্ষার্থী তৈরি হলেন। বিভিন্ন সম্প্রদায় বা স্কুল তৈরি হল। নিয়ম তৈরি হল। কে ভালো ফুল সাজান, কে আরও ভালো সাজান, তার বিচার শুরু হল।
একটা ফুলদানির মধ্যে গোটা সভ্যতার মর্যাদাক্রম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
কোজেভ এই ব্যাপারটিতে মানুষের ইতিহাস-পরবর্তী অস্তিত্বের একটা সম্ভাবনা দেখতে পেলেন।
মানুষ যদি আর রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে না পারে, তাহলেও সে নতুন নতুন নিয়ম তৈরি করে নিজের দক্ষতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রয়োজনের বাইরে গিয়েও মানুষ এমন চর্চায় অংশ নিতে পারে, যেখানে দক্ষতার পার্থক্য আছে, সাফল্যের মানদণ্ড আছে, ঐতিহ্য আছে, স্বীকৃতি আছে।
কোজেভ মজা করে এমন সম্ভাবনাও তুলেছিলেন, পশ্চিমের দেশগুলো একদিন জাপানি হয়ে উঠতে পারে।
এখানে জাপানি হওয়া বলতে জাপানি ভাষায় কথা বলা কিংবা সুশি খাওয়া বোঝানো হচ্ছে না।
মানুষের জীবনকে সূক্ষ্ম আনুষ্ঠানিকতা, নান্দনিক নিয়ম এবং মর্যাদার প্রতিযোগিতা দিয়ে সংগঠিত করা বোঝানো হচ্ছে।
ভাবুন, ইতিহাসের বিরাট বিরাট যুদ্ধ শেষ। মানুষ আর সাম্রাজ্য দখল করতে যাচ্ছে না। তার বদলে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন, কে সবচেয়ে সুন্দরভাবে একটা ফুলদানিতে তিনটি ডাল সাজাতে পারেন।
জুলিয়াস সিজার গল জয় করেছিলেন।
নেপোলিয়ন ইউরোপ কাঁপিয়েছিলেন।
আর ইতিহাসের শেষ মানুষটি একটা পাতার কোণ ঠিক করতে করতে ঘামছেন।
দৃশ্যটি হাস্যকর মনে হতে পারে।
কিন্তু একটু ভাবলে এর মধ্যে সভ্যতার একটা গভীর সম্ভাবনাও রয়েছে।
৬. মানুষের শখের মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বীকৃতির রাজনীতি
ফুকুয়ামার স্মৃতিকথায় ফিরে যাওয়া যাক।
তিনি জানাচ্ছেন, তাঁর ঠাকুমা শিজু ইয়োকোতা পিয়ানো ও কোতো বাজাতেন, জলরঙে ছবি আঁকতেন। ঠাকুরদা ক্যালিগ্রাফি ও ঘোড়সওয়ারি চর্চা করতেন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষক অ্যালান ব্লুম সংগীতের রেকর্ড সংগ্রহ করতেন।
ফুকুয়ামা নিজেও ছোটবেলা থেকে নানা কাজে উৎসাহী।
একটি মজার স্মৃতি আছে।
দশ বছর বয়সে একদিন তিনি বাবার লুকিয়ে রাখা Playboy পত্রিকাগুলো আবিষ্কার করেন।
যে বয়সে একটি কিশোরের ওই পত্রিকার প্রতি আকর্ষণ হওয়ার কথা, তাঁরও হয়েছিল।
কিন্তু পত্রিকার পাতায় সুন্দরী মহিলাদের ছবি দেখতে দেখতে তিনি হঠাৎ আটকে গেলেন অন্য একটা জিনিসে।
দামি ক্যামেরার বিজ্ঞাপন।
একদিকে নগ্নতার আকর্ষণ, অন্যদিকে ক্যামেরার যন্ত্রপাতি।
কিশোর ফুকুয়ামা ক্যামেরার দিকে আকৃষ্ট হলেন।
ঘটনাটার একটা দার্শনিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়।
মানুষের শরীরী কামনা আর মানুষের কোনও বিশেষ দক্ষতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, দুটোই তার জীবনের অংশ। কিন্তু দ্বিতীয়টির ভিতর দিয়ে সে এক ধরনের জগৎ তৈরি করতে পারে। সেখানে শিক্ষা আছে, নিয়ম আছে, কারিগরি উৎকর্ষ আছে, অন্যদের স্বীকৃতি আছে।
ফুকুয়ামার ক্যামেরাপ্রীতি সেই দিকে এগোল।
নিকন এফ২এ।
লাইকা এম৩।
কোডাক একটাক্রোম ই১০০ ফিল্ম।
এসবের ইতিহাস, প্রযুক্তি, ব্যবহার, পরিবর্তন নিয়ে তিনি এমন আগ্রহে আলোচনা করেন যে, পাঠকের মনে হতে পারে ফুকুয়ামা ভুল করে রাজনৈতিক দর্শনের অধ্যাপক হয়েছিলেন। তাঁর আসলে ক্যামেরার দোকান দেওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই একটা জায়গায় তাঁর বিষণ্ণতা প্রকাশ পায়।
তিনি আশঙ্কা করেন, স্থিরচিত্রের ফটোগ্রাফিতে প্রযুক্তিগত ও সৃজনশীল উদ্ভাবনের সম্ভাবনা এক ধরনের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। প্রায় সমস্ত ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাই কেউ না কেউ করে ফেলেছেন।
এ কথাটি নিঃসন্দেহে বিতর্কযোগ্য। শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
তবু লক্ষ করার বিষয় হল, ফটোগ্রাফির সম্ভাব্য স্থবিরতা তাঁকে সত্যিই বিষণ্ণ করে।
ইতিহাসের সমাপ্তি নিয়ে যিনি বিখ্যাত, তিনি ক্যামেরার ইতিহাস শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় যেন বেশি আক্ষেপ করছেন।
এখানে একটু থামা দরকার।
কারণ ফুকুয়ামার এই শখগুলোকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হারিয়ে যাবে।
সম্ভবত তাঁর জীবন আমাদের বলছে, মানুষ মহত্ত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য নিজের চারপাশে ছোট ছোট জগৎ তৈরি করতে পারে।
সেই জগতে সাফল্য আছে।
ব্যর্থতা আছে।
নিয়ম আছে।
দক্ষতা আছে।
ঐতিহ্য আছে।
অন্য মানুষের মূল্যায়ন আছে।
একজন কাঠমিস্ত্রি একটা চেয়ার বানিয়ে এমন সন্তুষ্টি পেতে পারেন, যা একজন রাজনীতিক নির্বাচনে জিতেও পান না।
একজন ফটোগ্রাফার একটি ছবির আলোর বিন্যাস ঠিক করতে গিয়ে এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন, যার সমাধানে তাঁকে দিনের পর দিন খাটতে হবে।
একজন সংগীতশিল্পী একটি রাগের বিশেষ অলংকার আয়ত্ত করতে কয়েক বছর কাটিয়ে দিতে পারেন।
এই কাজগুলোর কোনওটির জন্য প্রতিবেশী দেশ আক্রমণ করার প্রয়োজন হয় না।
অথচ এগুলো মানুষের মনকে গভীরভাবে ব্যস্ত রাখতে পারে।
৭. লিও স্ট্রাউস, গোপন পাঠ এবং বুদ্ধিজীবীদের ফুল সাজানো
ফুকুয়ামার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনও খানিকটা এমনই একটা জগৎ।
সত্তরের দশকে তিনি প্যারিসে গিয়েছিলেন ফরাসি উত্তর-কাঠামোবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে।
সে সময় ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে জাক দেরিদা, মিশেল ফুকো, রোলাঁ বার্তের মতো চিন্তাবিদদের প্রভাব প্রবল। ভাষা, অর্থ, ক্ষমতা, জ্ঞান, পরিচয়, পাঠের পদ্ধতি নিয়ে নতুন নতুন তর্ক চলছে।
ফুকুয়ামা সেই জগতে প্রবেশ করলেন।
কিন্তু খুব বেশিদিন সেখানে স্বস্তি পেলেন না।
নিজের বাবার একটা মন্তব্য তাঁর মনে পড়ল। অতিরিক্ত বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে বাবা একসময় বলেছিলেন intellectual masturbation।
অর্থাৎ, চিন্তার এমন এক আত্মতৃপ্তিকর ব্যায়াম, যার সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর যোগাযোগ ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ফুকুয়ামা ধীরে ধীরে বুঝলেন, তাঁর আগ্রহ অন্য দিকে।
প্যারিসে থাকার সময় ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের অভিঘাত ইউরোপেও পড়েছে। তেলের সংকট, জ্বালানির দাম, শীতের কষ্ট। একদিকে ফরাসি তত্ত্বের জটিল ভাষা, অন্যদিকে ভূরাজনীতির বাস্তব সংঘাত।
ফুকুয়ামা সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজনৈতিক সংগ্রামের বাস্তব জগৎ নিয়ে পড়াশোনা করবেন।
তিনি হার্ভার্ডে গেলেন হার্ভি ম্যানসফিল্ডের অধীনে পড়তে।
ম্যানসফিল্ড এবং ফুকুয়ামার আরেক শিক্ষক অ্যালান ব্লুম, দুজনেই লিও স্ট্রাউসের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত।
এবার স্ট্রাউসবাদী পাঠপদ্ধতি সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা দরকার।
লিও স্ট্রাউস রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাস পড়ার একটি বিশেষ পদ্ধতির উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, অতীতের অনেক দার্শনিক তাঁদের সমস্ত বক্তব্য সরাসরি প্রকাশ করতে পারেননি। রাজনৈতিক নিপীড়ন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামাজিক নিষেধাজ্ঞা, নানা কারণে তাঁদের লেখায় এমন বক্তব্য থাকতে পারে, যা আড়ালে রাখা হয়েছে।
ফলে পাঠককে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে।
লেখক কোথায় নিজের বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন?
কোন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন?
কোন বিষয় নিয়ে অস্বাভাবিক নীরবতা পালন করছেন?
কোন প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসছে?
লেখার প্রকাশ্য অর্থের পাশাপাশি অপ্রকাশ্য সম্ভাবনাগুলোও বিচার করতে হবে।
পদ্ধতিটি যথাযথভাবে ব্যবহার করলে মূল্যবান ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। আবার অতিরিক্ত উৎসাহে প্রয়োগ করলে লেখকের প্রতিটি কমা, দাঁড়ি, অনুচ্ছেদ, এমনকি পৃষ্ঠা সংখ্যার মধ্যেও গোপন ষড়যন্ত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
ধরুন, প্লেটো কোনও সংলাপে সক্রেটিসকে দিয়ে তিনবার একটি বিশেষ প্রশ্ন করিয়েছেন।
স্ট্রাউসীয় পাঠক ভাবতে পারেন, তিনবারই কেন?
দুইবার নয় কেন?
চারবার নয় কেন?
এই সংখ্যার মধ্যে কোনও গোপন দার্শনিক ইঙ্গিত আছে?
তারপর তিনি আরও সাতটি বই পড়বেন। বারোটি নোট লিখবেন। তিনটি সেমিনারে বক্তৃতা দেবেন।
শেষে হয়তো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন যে, মানুষের সর্বোচ্চ জীবন হল গভীর দার্শনিক চিন্তা ও পাঠের জীবন।
অর্থাৎ, অনেক বই পড়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, মানুষের সবচেয়ে ভালো কাজ হল আরও বই পড়া।
এটুকু শুনে যাঁরা বই পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের অবশ্য বিশেষ আপত্তি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু বিষয়টির মধ্যে একটা কৌতুক আছে।
স্ট্রাউসবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎও কোজেভের জাপানি চা-অনুষ্ঠানের মতোই অনেকটা সংগঠিত।
সেখানে শিক্ষক আছেন।
শিষ্য আছেন।
বিভিন্ন ব্যাখ্যার সম্প্রদায় আছে।
কোন পাঠ সঠিক, কোনটি ভুল, তার বিচার আছে।
ঐতিহ্য আছে।
মর্যাদা আছে।
বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার দীর্ঘ সাধনা আছে।
একজন মানুষ সারাজীবন প্লেটোর কয়েকটি সংলাপ পড়ে কাটিয়ে দিতে পারেন এবং সেই পাঠের সূক্ষ্মতার মধ্যে নিজের কৃতিত্ব খুঁজে পেতে পারেন।
একজন জাপানি শিল্পী যেমন একটা ডাল কোন দিকে বাঁকবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন সাধনা করেন, তেমনি একজন রাজনৈতিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের একটি অনুচ্ছেদে কী বোঝানো হয়েছে, সেই প্রশ্নে তিরিশ বছর কাটিয়ে দিতে পারেন।
দুজনের কাজেই নিয়ম আছে, দক্ষতা আছে, স্বীকৃতি আছে।
এখানে অবশ্য পার্থক্যটাও জরুরি।
দার্শনিক পাঠের মাধ্যমে নৈতিক ও রাজনৈতিক সত্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জিত হতে পারে। সেই জ্ঞান মানুষের জীবন ও প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিতও করতে পারে। ফলে একে নিছক নিয়মের খেলা বলে উড়িয়ে দেওয়া অন্যায় হবে।
তবু বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়ের সামাজিক জীবন আর নান্দনিক চর্চার সামাজিক জীবনের মধ্যে আশ্চর্য কিছু মিল রয়েছে।
উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের জন্য একটি জটিল পৃথিবী তৈরি করে, যেখানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সুযোগ আছে।
এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পাওয়া যায়।
৮. ইরাক যুদ্ধ এবং ইতিহাসের পুরোনো ভূত
ফুকুয়ামার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনও তাঁর স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একসময় তিনি আমেরিকার নব্যরক্ষণশীল বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণকে ঘিরে তাঁর অবস্থান বদলায়।
ইরাক যুদ্ধের সমর্থকদের একটি অংশ বিশ্বাস করেছিলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেওয়া সম্ভব।
ফুকুয়ামা এই প্রকল্পের সমালোচক হয়ে ওঠেন। বিশেষত রাষ্ট্রগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির জটিলতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়ে তাঁর আপত্তি ছিল।
এর ফলে পুরোনো রাজনৈতিক বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। কিছু বন্ধু তাঁর সঙ্গে কথাবার্তাও বন্ধ করে দেন।
এখানেও একটা বিষয় লক্ষণীয়।
ফুকুয়ামা নিজের তত্ত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য কোনও বিশেষ যুদ্ধকে স্বাগত জানাননি।
তিনি বরং বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কাজ অত্যন্ত জটিল। সামরিক বিজয় আর স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ একই জিনিস নয়।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের The Clash of Civilizations তত্ত্বের সঙ্গেও তাঁর মতপার্থক্য ছিল।
হান্টিংটন ভবিষ্যতের সংঘাতকে বিভিন্ন সভ্যতার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের আলোকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ফুকুয়ামা ইসলামবাদকে উদার গণতন্ত্রের সমতুল্য সর্বজনীন বিকল্প আদর্শ হিসেবে দেখতে রাজি ছিলেন না।
এ নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট সুযোগ আছে।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং উদার গণতন্ত্রের সংকট আজও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। তাঁর ইতিহাসের সমাপ্তির তত্ত্ব এসব সমস্যার পুরো ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
তবে স্মৃতিকথা থেকে যে মানুষটির ছবি ফুটে ওঠে, তিনি অন্তত ব্যক্তিগত জীবনে নিরন্তর রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য কাতর হয়ে বসে নেই।
তিনি পড়ছেন।
লিখছেন।
কাঠের কাজ করছেন।
ক্যামেরা নিয়ে ভাবছেন।
কম্পিউটার বানাচ্ছেন।
বিশ্বসভ্যতার চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যিনি তর্ক করেছেন, তাঁর নিজের জীবন এতখানি সাধারণ শখের মধ্যে তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে।
হয়তো এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত আছে।
মানুষের বেঁচে থাকার সার্থকতা সবসময় ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠার উপর নির্ভর করে না।
৯. ৬ জানুয়ারি ২০২১: ইতিহাস আবার দরজায় ধাক্কা দিল
এবার ফিরে যাওয়া যাক মেরিল্যান্ডের সেই কিশোরের কাছে।
২০২০ সালে ফুকুয়ামা পড়ে সে ভেবেছিল, ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে। বড় রাজনৈতিক সংগ্রামের সম্ভাবনা নিঃশেষ।
তারপর এল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি।
আমেরিকার ক্যাপিটল ভবনে হামলা হল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি জনতা কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালীন ভবনে ঢুকে পড়ল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হল। গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মৌলিক নিয়মের উপর আঘাত এল।
আমাদের কিশোর তখন বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে সময় কাটাচ্ছে।
কেউ ভিডিও গেম খেলছে।
কেউ লাইভস্ট্রিম দেখছে।
কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে।
হঠাৎ সবাই ক্যাপিটল ভবনের দৃশ্য দেখতে শুরু করল।
জনতার ভিড়। পতাকা। ব্যারিকেড। ভাঙচুর। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ।
এক বন্ধু বলল, আমাদের ল্যান্ডন কি আজ ওয়াশিংটনের সমাবেশে যায়নি?
খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সে সত্যিই সেখানে আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যান্ডন ক্যাপিটলের সিঁড়ির কাছ থেকে ভিডিও কলে জানাল, কাঁদানে গ্যাসে তার অবস্থা খারাপ।
কিশোরটির মনে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
এই তো ইতিহাস!
বইয়ে পড়া বিপ্লবের দৃশ্যের সঙ্গে যেন মিল পাওয়া যাচ্ছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি বিপ্লব, ঊনবিংশ শতাব্দীর গণঅভ্যুত্থান, বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক সংঘাত, এসবের ইতিহাস পড়ে সে যে দৃশ্যগুলো কল্পনা করেছিল, তার কিছু উপাদান চোখের সামনে।
জনতা রাষ্ট্রের ভবনে প্রবেশ করছে।
পতাকা উড়ছে।
প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
উদার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আচমকা অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।
কিশোরটি প্রকাশ্যে ঘটনার নিন্দা করল। যেসব বন্ধু যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হচ্ছে না, তাদের বকাঝকা করল।
কিন্তু মনের ভিতরে একটা গোপন উত্তেজনাও অনুভব করল।
ইতিহাস তাহলে সত্যিই ফিরে এসেছে?
এই অনুভূতিটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখানেই ফুকুয়ামার থাইমোস-সংক্রান্ত আশঙ্কার একটা ব্যক্তিগত নমুনা দেখা যায়।
একজন মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার বিরোধিতা করতে পারেন, অথচ সেই সহিংসতার নাটকীয়তায় উত্তেজিতও হতে পারেন।
তিনি জানেন ঘটনাটি বিপজ্জনক। তবু মনে হচ্ছে, অবশেষে একটা বিরাট কিছু ঘটছে।
এখানেই বিপদ।
রাজনৈতিক সংঘর্ষের উত্তেজনা মানুষের বিচারবোধকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথমে সে গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে সংঘর্ষকে উত্তেজনাপূর্ণ মনে করে। পরে হয়তো সংঘর্ষের আকাঙ্ক্ষাই এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, গণতন্ত্রের শত্রুপক্ষের সাফল্যও তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে শুরু করে।
কারণ সে শান্ত রাজনৈতিক জীবনকে নিস্তেজ মনে করে।
সে চায় নাটক।
সে চায় বিপ্লব।
সে চায় ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়াতে।
এই আকাঙ্ক্ষা থেকে মানুষ কখনও কখনও বিপজ্জনক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়।
আমাদের কিশোর অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই উত্তেজনা কাটিয়ে উঠল।
কলেজে গেল।
টেনিসন পড়ল।
ওয়াল্টার পেটার পড়ল।
সাহিত্য, শিল্প এবং নন্দনতত্ত্বের জগতে প্রবেশ করল।
ধীরে ধীরে বুঝল, নিজের জীবনে যে বিরক্তি এবং শূন্যতা অনুভব করছিল, তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে দায়ী করা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল।
দিনের অধিকাংশ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে কাটানোর সঙ্গেও সেই শূন্যতার গভীর সম্পর্ক ছিল।
ইতিহাসের সমাপ্তির বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য হয়তো একটা ভালো বই, একটা বাদ্যযন্ত্র কিংবা কাঠের কাজ শেখাই যথেষ্ট হতে পারত।
এই উপলব্ধি থেকে একটা বেশ দুষ্টু পরামর্শ বেরিয়ে আসে।
যে যুবক বলছে, গণতন্ত্র মানুষকে নরম করে ফেলেছে, পৃথিবীতে আবার অভিজাত বীরত্বের যুগ ফিরিয়ে আনতে হবে, তাকে বলা যেতে পারে, বাবা, রাজনীতি একটু কম করো। গ্রিক শিখে প্লেটো পড়ো। চেলো বাজানো শেখো। অথবা ফুল সাজাও।
অভিজাত জীবনের একটা প্রাচীন বৈশিষ্ট্য হল, জীবিকার জন্য জরুরি নয় এমন কাজে গভীর দক্ষতা অর্জন করা।
যুদ্ধ লাগিয়ে সেই মর্যাদা অর্জন করার চেয়ে ফুলের বিন্যাস নিয়ে দশ বছর সাধনা করা অনেক নিরাপদ।
আর ফুলটা যদি শেষ পর্যন্ত বেঁকেও যায়, প্রাণহানির আশঙ্কা কম।
১০. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইতিহাসের দ্বিতীয় সমাপ্তি
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হচ্ছে না।
কারণ ফুকুয়ামার ইতিহাসের সমাপ্তি নিয়ে যে পুরোনো প্রশ্ন একসময় কিশোরটিকে বিষণ্ণ করেছিল, কয়েক বছর পরে সেটাই অন্য চেহারায় ফিরে এল।
এবার বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
যদি কোনও একসময় যন্ত্র মানুষের অধিকাংশ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ আরও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, তাহলে মানুষের ভূমিকা কী হবে?
যদি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি উৎপাদনের খরচ বিপুলভাবে কমিয়ে দেয়?
যদি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা, সফটওয়্যার নির্মাণ, গবেষণা, প্রশাসনের বড় অংশে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন অনেক কমে যায়?
যদি মানুষের অধিকাংশ বস্তুগত চাহিদা প্রযুক্তির সাহায্যে পূরণ করা সম্ভব হয়?
এআই সম্পর্কে আশাবাদীদের একটি অংশ এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলেন, যেখানে মানুষের অভাব অনেক কমে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই প্রাচুর্যের সমাজে মানুষ নিজের গুরুত্ব খুঁজে পাবে কোথায়?
একজন চিকিৎসক বহু বছর পড়াশোনা করে রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা অর্জন করেছেন। একদিন দেখা গেল, যন্ত্র তাঁর চেয়ে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে সেই কাজ করছে।
একজন লেখক তিরিশ বছর ধরে ভাষা আয়ত্ত করেছেন। যন্ত্র মুহূর্তে তার চেয়ে মসৃণ বাক্য তৈরি করছে।
একজন বিজ্ঞানী জীবনের অধিকাংশ সময় গবেষণায় কাটিয়েছেন। এআই কয়েক দিনে এমন সম্ভাবনা পরীক্ষা করছে, যা করতে মানুষের কয়েক বছর লাগত।
এই পরিস্থিতিতে মানুষের বস্তুগত জীবন আরও স্বচ্ছন্দ হতে পারে।
কিন্তু স্বীকৃতির প্রশ্নটি জটিল হয়ে উঠবে।
কারণ মানুষ শুধু কাজের ফল চায় না। সেই কাজটি নিজে করার মধ্যে যে দক্ষতা, সাধনা, আনন্দ ও আত্মসম্মান আছে, সেটাও চায়।
যে মানুষ নিজে একটি গণিতের সমস্যা সমাধান করেন, তাঁর আনন্দ আর কম্পিউটারের দেওয়া উত্তর দেখে নেওয়ার আনন্দ আলাদা।
যে শিল্পী নিজে পিয়ানো বাজান, তাঁর অভিজ্ঞতা আর একটি যন্ত্রকে দিয়ে নিখুঁত সুর বাজিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা আলাদা।
মানুষের কাজের মধ্যে একটা আত্মগঠনের প্রক্রিয়া আছে।
সে কাজ করতে করতে নিজের দক্ষতা বাড়ায়। নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়ে। নিজের ক্ষমতা আবিষ্কার করে।
কাজের সেই অভিজ্ঞতা থেকে তার আত্মপরিচয়ের একটি অংশ তৈরি হয়।
এআই-নির্ভর সমাজে এই আত্মপরিচয়ের ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে এখানে প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সাবধান থাকা দরকার। মানুষের সমস্ত কাজ এআই দখল করবে, কিংবা অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ অভাবমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন কোনও সিদ্ধান্ত আজ নিশ্চিত করে বলা যায় না। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সম্পদের মালিকানা, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বৈষম্য ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
তবু ফুকুয়ামার প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
মানুষ যখন নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সংগ্রাম করে না, তখন তার জীবনের উদ্দেশ্য কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কোজেভের জাপানি চা-অনুষ্ঠান আবার আমাদের সামনে হাজির।
হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ আরও বেশি করে এমন কাজে মন দেবে, যার মধ্যে ব্যক্তিগত সাধনা, নিয়ম, নান্দনিকতা এবং স্বীকৃতির সুযোগ আছে।
হয়তো কেউ এমন এক বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখবে, যা যন্ত্র নিখুঁতভাবে বাজাতে পারে।
কেউ নিজে কাঠের চেয়ার বানাবে, যদিও বাজারে অনেক ভালো চেয়ার কম দামে পাওয়া যায়।
কেউ হাতে বই বাঁধাই করবে।
কেউ নিজের বাগানে গোলাপের নতুন বিন্যাস তৈরি করবে।
কেউ প্রাচীন গ্রিক শিখে হোমার পড়বে।
এমন সব কাজে সময় ব্যয় করবে, যার অর্থনৈতিক প্রয়োজন খুব সামান্য, কিন্তু ব্যক্তিগত অর্থ অনেক।
এখানেও একটা কৌতুক আছে।
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে চেষ্টা করেছে কঠিন কাজকে সহজ করতে।
যন্ত্র আবিষ্কার করেছে।
প্রযুক্তি তৈরি করেছে।
শ্রম বাঁচিয়েছে।
আর ভবিষ্যতে হয়তো সেই মানুষই নতুন নতুন কঠিন নিয়ম তৈরি করবে, যাতে আবার পরিশ্রম করার সুযোগ পাওয়া যায়।
১১. ফুল সাজানোর রাজনীতি
এবার সেই তরুণের শেষ কাণ্ডটি শোনা যাক।
ফুকুয়ামা পড়ে ইতিহাসের সমাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা করেছিলেন। ক্যাপিটল হামলা দেখে রাজনৈতিক সংঘর্ষের উত্তেজনা অনুভব করেছিলেন। পরে সাহিত্য ও শিল্পের জগতে স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি জাপানি ফুল সাজানোর শিল্প, ইকেবানা, শিখতে শুরু করলেন।
শিক্ষিকার নাম এলিজাবেথ।
অবসরপ্রাপ্ত মহিলা। একসময় বিদেশসেবায় কাজ করার সূত্রে ফুল সাজানোর এই জাপানি ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।
এখন তিনি নিয়মিত ছাত্রদের শেখান।
তরুণটি শিখছে শোকা শোফুতাই নামে একটি ঐতিহ্যবাহী বিন্যাসরীতি।
ব্যাপারটি সহজ।
কয়েকটি ফুল আর ডাল নিয়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি করতে হবে।
কিন্তু নিয়মের বহর শুনলে মাথা ঘুরে যেতে পারে।
এই রীতিতে শিন, সোয়ে এবং তাই নামে তিনটি প্রধান উপাদান থাকে।
শিন প্রধান রেখা। সাধারণত সবচেয়ে উঁচু।
সোয়ে তার সহযোগী রেখা।
তাই অপেক্ষাকৃত ছোট, সামনের দিকে অবস্থান করে।
এদের উচ্চতা, বক্রতা, দিক, পারস্পরিক সম্পর্ক, সবকিছু নিয়মের অধীন।
শুধু ফুলগুলোকে সুন্দর দেখালেই চলবে না। কোন ডাল সূর্যের দিকে বাঁকবে, কোথায় ভারসাম্য তৈরি হবে, কোন পাতার মুখ কোন দিকে থাকবে, ঋতু অনুযায়ী কোন উদ্ভিদ ব্যবহার করা যাবে, এসবেরও হিসাব আছে।
একটা ফুলদানি সাজাতে গিয়ে প্রকৃতি, জ্যামিতি, ঐতিহ্য আর শৃঙ্খলার এক বিচিত্র সংসার তৈরি হয়েছে।
আবার ইকেবানার বিভিন্ন স্কুল আছে।
সোগেৎসু।
ওহারা।
ইকেনোবো।
প্রত্যেকের নিজস্ব নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়ম, শিক্ষাপদ্ধতি।
সোগেৎসু অপেক্ষাকৃত আধুনিক ও পরীক্ষামূলক বিন্যাসের জন্য পরিচিত। ওহারা স্কুলে প্রাকৃতিক দৃশ্যের অনুভূতি এবং বিস্তৃত পাত্রে বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে।
আর ইকেনোবো?
জাপানি ফুল সাজানোর প্রাচীনতম ধারাগুলোর একটি।
কিয়োটোর রোক্কাকুদো মন্দিরের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক। বহু শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য বিকশিত হয়েছে।
ইকেনোবো প্রধানের পদটি বংশানুক্রমিক। সেন্এই ইকেনোবো এই ধারার পঁয়তাল্লিশতম প্রধান হিসেবে পরিচিত।
ভাবুন একবার।
একটা ফুল সাজানোর শিল্পের প্রধান পদে পঁয়তাল্লিশ প্রজন্মের ঐতিহ্য।
ইউরোপের অনেক আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে থেকে এই শিল্পের ধারাবাহিকতা চলে এসেছে।
কোন ফুল কোথায় রাখা হবে, সেই বিষয়ে মানুষের এমন দীর্ঘ ঐতিহাসিক নিষ্ঠা!
এলিজাবেথ তাঁর ছাত্রকে ইকেনোবো স্কুলে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন।
কারণ সেখানে শুধু ফুল সাজানো শেখানো হয় না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে।
ধাপে ধাপে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে নতুন নতুন রীতিতে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া যায়।
শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যায়।
এলিজাবেথের বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে চোদ্দটি মর্যাদাস্তর রয়েছে। তিনি নিজে নবম স্তরে পৌঁছেছেন।
এতক্ষণে কোজেভ নিশ্চয়ই পরম তৃপ্তিতে হাসতেন।
ইতিহাস-পরবর্তী মানুষের জন্য তিনি যে ধরনের মর্যাদাব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন, সেটাই যেন এখানে সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত।
কোনও রাজা নেই।
সেনাপতি নেই।
সাম্রাজ্য জয়ের পরিকল্পনা নেই।
অথচ মর্যাদা আছে।
প্রতিযোগিতা আছে।
উন্নতির সিঁড়ি আছে।
বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ আছে।
এবং সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে পুরস্কারও আছে।
এলিজাবেথ জানালেন, প্রতিবার একটি নতুন স্তরে উন্নীত হলে সদর দপ্তর থেকে একটি সনদ পাঠানো হয়।
সোনালি ক্যালিগ্রাফিতে হাতে লেখা সনদ।
একটি ফুল সাজানোর শিল্পে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে।
এই পর্যন্ত বলে এলিজাবেথ একটু থামলেন।
সম্ভবত ভাবলেন, ফুল সাজানোর মধ্যে যে নান্দনিক আনন্দ আছে, যে আত্মনিবেদন আছে, প্রকৃতির সঙ্গে যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, সেসব কথাও বলা উচিত।
তারপর তিনি খুব সাধারণ একটা বাক্য বললেন।
“It’s nice to be recognized.”
স্বীকৃতি পেতে ভালো লাগে।
১২. শেষ মানুষটির শেষ ইচ্ছা
এই ছোট্ট বাক্যটির কাছে ফিরে এসে ফুকুয়ামার গোটা রাজনৈতিক দর্শন যেন নতুন অর্থ পায়।
ভাবুন, মানুষের ইতিহাসে কত রকমের স্বীকৃতির ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
একসময় রাজা যুদ্ধ জিতে উপাধি পেতেন।
সেনাপতি বীরত্বের জন্য পদক পেতেন।
কবি রাজসভায় সম্মান পেতেন।
পণ্ডিত রাজদরবারে আসন পেতেন।
আধুনিক সমাজে মানুষ ডিগ্রি পায়, পদোন্নতি পায়, সাহিত্য পুরস্কার পায়, গবেষণার স্বীকৃতি পায়।
একজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়ে আনন্দিত হন।
একজন লেখক নিজের বইয়ের প্রশংসা শুনে আনন্দিত হন।
একজন শিক্ষক ছাত্রদের সাফল্যে গর্ব অনুভব করেন।
আর একজন বৃদ্ধা জাপানি ফুল সাজানোর শিল্পে উন্নতি করে সোনালি অক্ষরে লেখা সনদ পান।
মানুষের এই স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাচ্ছিল্য করা সহজ।
বলতে পারেন, সবই অহংকার।
সবই অন্যের চোখে বড় হওয়ার চেষ্টা।
কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষার ভিতরেই মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের একটা গভীর সত্য আছে।
মানুষ নিজের কাজের মূল্য নিজে অনুভব করে। আবার চায়, অন্য কেউ সেই মূল্য বুঝুক।
একজন লেখক নিজের ঘরে বসে বই লিখতে পারেন। কেউ না পড়লেও লেখার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে মূল্যবান হতে পারে।
কিন্তু কোনও পাঠক যদি একদিন এসে বলেন, আপনার লেখা পড়ে আমার জীবনের একটা বিষয় নতুনভাবে বুঝেছি, তাহলে লেখকের আনন্দের মধ্যে অন্য একটা মাত্রা যুক্ত হয়।
একজন সংগীতশিল্পী একা ঘরে বসে সুর তুলতে পারেন। কিন্তু শ্রোতার মনোযোগ, ভালোবাসা এবং স্বীকৃতি তাঁর কাজের সামাজিক অর্থ তৈরি করে।
এই স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা থেকেই শিল্পের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার, ঐতিহ্য, বিভিন্ন ধরনের দক্ষতার মানদণ্ড গড়ে ওঠে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষ নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য মানুষের মর্যাদা ধ্বংস করতে শুরু করে।
যখন শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য যুদ্ধ দরকার হয়।
যখন নিজের জাতির গৌরব প্রতিষ্ঠা করতে অন্য জাতিকে অপমান করা জরুরি হয়ে ওঠে।
যখন রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য সহিংসতা উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে।
কোজেভের জাপানি নান্দনিকতার সম্ভাবনাটি এইখানেই তাৎপর্যপূর্ণ।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে এমন সব কাজে পরিচালিত করা সম্ভব, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তার জন্য রক্তপাতের প্রয়োজন হবে না।
তবে এই ব্যবস্থাকেও একেবারে নিরীহ ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
ফুল সাজানোর স্কুলেও মর্যাদার লড়াই তৈরি হতে পারে। শিক্ষক-শিষ্যের ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। ঐতিহ্যের নামে গোঁড়ামি তৈরি হতে পারে। কার দক্ষতা বেশি, কার সনদের মূল্য বেশি, এসব নিয়ে অহংকার, ঈর্ষা, অপমান, দলাদলি সবই সম্ভব।
মানুষ যেখানে যাবে, তার থাইমোসও সেখানে যাবে।
ফুলদানির ভিতরেও সে ক্ষমতার কাঠামো বানাতে পারে।
তবু একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থেকে যায়।
ফুলদানি সাজাতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে সর্বোচ্চ বিপর্যয় হিসেবে হয়তো প্রদর্শনীর বিচারক আপনার বিন্যাসটি বাতিল করবেন।
রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াইয়ে একই ধরনের অপমানবোধ থেকে যুদ্ধ শুরু হলে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যেতে পারেন।
মানুষের অহংকার পুরোপুরি দূর করা সম্ভব কি না, জানা নেই।
কিন্তু সেই অহংকারের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরীহ ক্ষেত্র তৈরি করা নিশ্চয়ই সভ্যতার একটা অর্জন।
এখানে অবশ্য আরও একটা বড় প্রশ্ন আছে।
সব মানুষ কি ফুল সাজানোর সুযোগ পাবে?
দিনে বারো ঘণ্টা কাজ করে যে শ্রমিক সংসার চালান, যাঁর মাথার উপর ঋণের বোঝা, যাঁর সন্তান অসুস্থ, তাঁর কাছে নান্দনিক অবসরের এই অভিজাত আদর্শ কতটা বাস্তবসম্মত?
ইতিহাসের সমাপ্তির দর্শনে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ বস্তুগত নিরাপত্তা, সামাজিক সমতা এবং অবসরের সুযোগ মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।
কোজেভের জাপানি চা-অনুষ্ঠান একটি সম্ভাবনা দেখায়। সেই সম্ভাবনাকে সকলের জীবনে বাস্তব করে তুলতে অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আছে।
শুধু একজন ধনী মানুষ ফুল সাজিয়ে আনন্দ পাচ্ছেন, এই দৃশ্য দিয়ে মানবসভ্যতার সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না।
তবে ওই দৃশ্যটি আমাদের একটা জরুরি প্রশ্ন করতে শেখায়।
মানুষ তার জীবনের সময় কীভাবে ব্যবহার করতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাষ্ট্র বা বাজারের কাছে পাওয়া যাবে না।
মানুষের নিজের কাছেও খুঁজতে হবে।
ইতিহাসের পরে কী থাকে?
ফুকুয়ামার বইয়ের শিরোনামে দুটি শব্দবন্ধ আছে।
The End of History.
The Last Man.
প্রথমটি রাজনৈতিক।
দ্বিতীয়টি গভীরভাবে মানবিক।
প্রথমটি জানতে চায়, মানুষের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন কোন দিকে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়টি জানতে চায়, সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বসবাসকারী মানুষটি কীভাবে বাঁচবে।
এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিই হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী।
কারণ ইতিহাস শেষ হোক বা না হোক, মানুষের প্রতিদিনের জীবন চালিয়ে যেতে হয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়।
চা খেতে হয়।
কাজে যেতে হয়।
বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে হয়।
বই পড়তে হয়।
কখনও কোনও একটা জিনিস বানাতে ইচ্ছে করে।
কখনও একটা সুর আয়ত্ত করতে ইচ্ছে করে।
কখনও একটা বাক্য ঠিকঠাক লিখতে না পেরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে হয়।
এই কাজগুলোর মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিহিত রয়েছে।
একজন লেখক হয়তো জানেন, তাঁর লেখা পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র বদলাবে না। তবু তিনি একটি বাক্যের সঠিক শব্দটি খুঁজতে সারারাত জেগে থাকেন।
একজন সংগীতশিল্পী জানেন, তাঁর রেওয়াজে কোনও সাম্রাজ্যের পতন হবে না। তবু প্রতিদিন একই সুরের কাছে ফিরে যান।
একজন মালী জানেন, তাঁর বাগানের একটি ফুল পৃথিবীর অর্থনীতিতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে না। তবু ফুলটি ঠিকভাবে ফুটেছে কি না, তা দেখতে সকালবেলা ছুটে যান।
এসবের মধ্যে মানুষের একটা আশ্চর্য স্বাধীনতা আছে।
নিজের জীবনে কী গুরুত্বপূর্ণ, তা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা।
ফুকুয়ামার ইতিহাসের শেষ মানুষটি যদি শুধু আরাম খুঁজে বেড়ায়, তাহলে নিৎশের আশঙ্কা যথার্থ হতে পারে।
কিন্তু সে যদি নিজের জন্য নতুন দক্ষতা, নতুন সৌন্দর্য, নতুন সাধনা, নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তাহলে ইতিহাস-পরবর্তী জীবনও গভীর অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য ইতিহাস আদৌ শেষ হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন এখনও খোলা।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। প্রযুক্তির পরিবর্তন সমাজকে নতুনভাবে গড়ছে। যুদ্ধ চলছে। রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাতও থামেনি।
মানুষকে ইতিহাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
কিন্তু ইতিহাসের মাঝখানে দাঁড়িয়েও নিজের জীবনে এমন কিছু চর্চা করা যায়, যার মূল্য রাজনৈতিক বিজয়-পরাজয়ের উপর নির্ভর করে না।
সেই সম্ভাবনাটিই ফুকুয়ামার স্মৃতিকথায় কাঠের কাজ, ক্যামেরা আর ফুল সাজানোর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে।
এবং সবশেষে আবার সেই এলিজাবেথের কথাটিতে ফিরে যেতে হয়।
একজন বৃদ্ধা ফুল সাজানো শিখিয়েছেন বহু বছর। অসংখ্য নিয়ম আয়ত্ত করেছেন। শিক্ষক হয়েছেন। নিজের প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাক্রমে উন্নতি করেছেন।
এখনও তাঁর ভালো লাগে যখন সদর দপ্তর থেকে সোনালি অক্ষরে লেখা একটা সনদ পাঠানো হয়।
কেন ভালো লাগে?
কারণ কেউ তাঁর চেষ্টা লক্ষ করেছে।
কেউ তাঁর দক্ষতাকে মূল্য দিয়েছে।
কেউ বলেছেন, হ্যাঁ, আপনি এগিয়েছেন।
ভাবলে একটু হাসি পায়।
হেগেল, কোজেভ, নিৎশে, ফুকুয়ামা, কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক দর্শন, মানবসভ্যতার বিকাশ, যুদ্ধ, বিপ্লব, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ইতিহাসের সমাপ্তি নিয়ে এত দীর্ঘ তর্কের শেষে আমরা এসে দাঁড়ালাম একটি ফুলদানির সামনে।
সেখানে তিনটি ডাল।
কয়েকটি পাতা।
একজন বৃদ্ধা।
আর তাঁর ইচ্ছা, কেউ যেন কাজটা দেখে বলেন, বেশ হয়েছে।
সম্ভবত মানুষের সভ্যতার অনেক বড় বড় কাণ্ডকারখানার পিছনে এই ইচ্ছাটিই কাজ করে।
আলেকজান্ডার চেয়েছিলেন পৃথিবী তাঁকে মনে রাখুক।
নেপোলিয়ন চেয়েছিলেন তাঁর গৌরব স্বীকৃত হোক।
একজন কবি চান তাঁর কবিতা কেউ পড়ুক।
একজন শিল্পী চান তাঁর কাজ কেউ বুঝুক।
আর এলিজাবেথ চান, কিয়োটো থেকে তাঁর নামে একটি সনদ পাঠানো হোক।
ফারাকটা অবশ্যই আছে। এবং বেশ গুরুত্বপূর্ণ ফারাক।
প্রথম দুজনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য বহু মানুষকে মরতে হয়েছে।
এলিজাবেথের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় কয়েকটি ফুলের ডালকে একটু বাঁকতে হয়েছে।
মানবসভ্যতা যদি শেষ পর্যন্ত এইটুকু শিখে থাকে যে, স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মানুষের বদলে ফুলের ডাল বাঁকানো যায়, তাহলে ইতিহাসের এত বছরের পড়াশোনা একেবারে বিফলে যায়নি।
এবার ফুলদানিটা একটু বাঁ দিকে সরান।
ঠিক হয়েছে।
সনদ পাঠানো যেতে পারে।




