জেরাল্ড মুরনেন, দ্য আর্ট অফ ফিকশন
দ্য প্যারিস রিভিউ
জেরাল্ড মুরনেনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ: লুইস ক্লি
ভাষান্তর: রিটন খান
জেরাল্ড মুরনেন বাস করেন গোরোকে, একটি ছোট শহর যেখানে মাত্র তিনশ জন বাসিন্দা। এটি অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্ট উইমেরা সমতলভূমিতে অবস্থিত, মেলবোর্ন থেকে গাড়িতে পাঁচ ঘণ্টার পথ। এটি ক্লাসিক আউটব্যাক নয়, উইমেরা অঞ্চলের গ্রামীণ প্রকৃতি নির্জন । এখানকার বনভূমি গম চাষের জন্য উপযোগী, আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন ভুট্টা গাছগুলো যেন সমতল ভূমির বিশালতা আর শূন্যতাকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এই স্থান মুরনেনের কল্পগল্পের সাথে বেশ সাযুজ্যপূর্ণ। তার গল্পের বর্ণনাকারীরা প্রায়শই “ছবির মতো এক প্রান্তর, যেখানে সমতল তৃণভূমি আর ছড়িয়ে থাকা ছবির মতো গাছ” নিয়ে মগ্ন থাকে। এই পরিবেশ তার লেখার নৈসর্গিক, বিমূর্ত প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি, যা তার সাহিত্যকর্মে গভীর আবেদন যোগ করে।
এক সময় মনে হয়েছিল জেরাল্ড মুরনেনের সাহিত্যিক জীবন দেরিতে শুরু হয়ে আগেভাগেই শেষ হয়ে গেছে। তার প্রথম উপন্যাস Tamarisk Row প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে, যখন তার বয়স ছিল পঁইত্রিশ। দীর্ঘ, জটিল, এবং কখনো কখনো অতিমাত্রায় অলঙ্কৃত বাক্যের মাধ্যমে গ্রামীণ স্কুলছাত্রের কল্পিত জগৎ তুলে ধরে এই উপন্যাস কিছুটা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তবু, সেই সময়ে মুরনেন নিজেকে প্রায় ব্যর্থ মনে করতেন—সমালোচকদের দ্বারা ভুল বোঝা ও প্রধান প্রকাশকদের নজরে উপেক্ষিত। তার আজকের সবচেয়ে প্রশংসিত উপন্যাস The Plains (১৯৮২) প্রথমে একটি ছোট সায়েন্স-ফিকশন প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়। এতে এক তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতার অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্দেশীয় সৌন্দর্যে “দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থ” খোঁজার সংগ্রাম এবং শেষে নিজের চোখেই ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেওয়ার চমকপ্রদ দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।
Inland (১৯৮৮) এর পরে, মুরনেন দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য কোনো উপন্যাস প্রকাশ করেননি, যদিও কিছু ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এই “বিরতি” নিয়ে সমালোচকরা বহু কথা বলেছেন—যেমন তার ছোটগল্প সংকলন Emerald Blue (১৯৯৫)-এর শেষ বাক্যটি অনেকের কাছে তার লেখালেখির ইতি ঘোষণার মতো মনে হয়েছিল: “লেখালেখি এখানে শেষ।” তবে, তার বর্তমান খ্যাতি মূলত তার ফিরে আসার কারণে, যা শুরু হয় Barley Patch (২০০৯) দিয়ে। এরপর দ্রুত পরপর প্রকাশিত হয় কয়েকটি বই: A History of Books (২০১২), A Million Windows (২০১৪), এবং Border Districts (২০১৭)।
Barley Patch এবং তার পরবর্তী রচনাগুলো চমৎকার বৈপরীত্যে ভরা—একটি অনধিকৃত বইয়ের জন্য শোকগাথা, যা একই সঙ্গে জটিল প্যাটার্ন ও চিত্রে মুগ্ধ করে এবং এমন এক ব্যক্তির কণ্ঠে রচিত, যিনি দাবি করেন যে কথাসাহিত্যই বাস্তবতার সর্বোত্তম রূপ। গত পনের বছরে, জে. এম. কুটজি এবং বেন লার্নারের মতো লেখকরা মুরনেনের লেখালেখির প্রশংসা করেছেন, এবং তিনি নোবেল পুরস্কারের একজন নিয়মিত সম্ভাব্য একজন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। তার প্রায় বিলুপ্তপ্রায় প্রাথমিক লেখাগুলো অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রকাশকরা নতুন করে প্রকাশ করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অপ্রাপ্য ছিল।
জেরাল্ড মুরনেন ১৯৩৯ সালে মেলবোর্নের শ্রমজীবী উপশহর কোবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব প্রভাবিত হয়েছিল তার বাবা রেজিনাল্ডের ভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যে, যিনি ছিলেন একজন স্বভাবগত জুয়াড়ি এবং ঘোড়দৌড়ে বাজি ধরতেন। ১৯৬৪ সালে মুরনেন তার প্রয়াত স্ত্রী ক্যাথরিনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। ক্যাথরিন ছিলেন একজন মনোবিজ্ঞানী। তাদের তিন পুত্র—জাইলস, গ্যাভিন, এবং মার্টিন—ছিল এবং তারা মেলবোর্নের ম্যাকলিওড এলাকায় জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন।
তাদের বড় ছেলে জাইলস গোরোকে শহরে মুরনেনের আগেই বসবাস শুরু করেন। মুরনেন বর্তমানে জাইলসের বাড়ির পেছনে একটি শেডে বসবাস করেন। এটি একটি আয়তাকার ঘর, যা মাউন্ট গ্যাম্বিয়ার লাইমস্টোনের বিশাল স্ল্যাব দিয়ে তৈরি। কংকর বিছানো একটি গলিপথ থেকে সেখানে পৌঁছানো যায়, যা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঢেউটিনের পাতায় ঢেকে থাকে।
মুরনেনের ঘরের ভেতরে প্রায় সব স্থান দখল করে রেখেছে ইস্পাতের ফাইলিং ক্যাবিনেট, যেখানে তিনি তার বিশাল আর্কাইভ সংরক্ষণ করেন। ক্যাবিনেট এতটাই বেশি যে সেখানে একটি বিছানা রাখার জায়গাও নেই। তিনি একটি ক্যাম্পিং স্ট্রেচারে ঘুমান, যা তিনি প্রতিদিন সকালে গুটিয়ে ফেলেন। তার আর্কাইভ তিনটি বিভাগে বিভক্ত:
১. Chronological Archive—ব্যক্তিগত স্মৃতি, যার মধ্যে একটি ক্যাবিনেট রয়েছে যা তিনি রহস্যময়ভাবে titkos dolgok (হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় “গোপন বিষয়”) বলে উল্লেখ করেন।
২. Literary Archive—যেখানে তার পাণ্ডুলিপি, অপ্রকাশিত কাজ, এবং বই সম্পর্কিত কাগজপত্র সংরক্ষিত।
৩. Antipodean Archive—১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগে মানচিত্র, চার্ট এবং রেকর্ড রয়েছে, যেখানে তিনি তার লেখা অনুযায়ী, “নতুন ইডেন এবং নতুন আরকাডি নামের দুটি কাল্পনিক দেশের ঘোড়দৌড়ের সংগঠন, প্রশাসন, এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম” লিপিবদ্ধ করেছেন।
তার ড্রয়ারগুলোতে রয়েছে পঞ্চাশ ঘণ্টার বেশি ডিক্টেট করা টেপ, ভবিষ্যতের কোনো গবেষকের জন্য, যারা তার আর্কাইভের ব্যক্তিগত কোড বুঝতে সাহায্য চাইতে পারে। সঙ্গে রয়েছে একটি অতিরিক্ত টেপ প্লেয়ার, যেটি যান্ত্রিকভাবে অচল হয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা ভেবে রাখা। এমনকি তার মোবাইল ফোনে পাঠানো টেক্সট বার্তাগুলোও তিনি পরম নিষ্ঠায় ট্রান্সক্রাইব করে সংরক্ষণ করেন।
তার এই অস্বাভাবিকভাবে সতর্ক রেকর্ড সংরক্ষণের অভ্যাস অন্যদের উপর প্রভাব ফেলে, যা তিনি উপভোগ করেন। গ্রন্থাগারিকরা তার আর্কাইভের সম্ভাব্য নিলামমূল্য নিয়ে প্রশংসা করেন, কিন্তু তিনিমনে করেন, কিছু মানুষ তাদের নিজস্ব চিহ্ন মুছে ফেলতে চান। এখন তিনি এই আর্কাইভ তালাবদ্ধ রাখেন। মুরনেন একবার আমাকে বলেছিলেন, “আমার বইয়ের লেখক হিসেবে নয়, বরং আর্কাইভের রচয়িতা হিসেবে আমি পঞ্চাশ বছর পর আরও বেশি পরিচিত হব।”
জুলাই মাসে মুরনেনের সঙ্গে কাটানো তিন দিনের জন্য তিনি বিস্তারিত কর্মসূচি তৈরি করেছিলেন। এটি শুরু হয় স্থানীয় গলফ ক্লাবে থেকে, যেখানে তিনি সাংবাদিকদের এবং “তীর্থযাত্রীদের” (তার ভাষায়, যারা গোরোকে এসে তার সঙ্গে দেখা করেন) নিয়ে যান। পরের দিন, তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন লিটল ডেজার্টের দক্ষিণের ঝোপঝাড়ে, যাকে তিনি বললেন “সত্যিকারের বর্ডার ডিস্ট্রিক্ট।” ড্রাইভের সময়, কথোপকথনে ফাঁকে ফাঁকে, তিনি আমাদের মাঝে রাখা ভয়েস রেকর্ডারের দিকে ইঙ্গিত করেন তখন আমি ও আমার সহকারী ছয়-সাত মিনিট হলো গাড়ি চালাচ্ছি।
আমাদের বেশিরভাগ সময় কাটে তার ঘরে, যেখানে তিনি একজন ধৈর্যশীল আর্কাইভিস্টের ভূমিকা পালন করেন, যেন তার সংগ্রহের একচেটিয়া ভ্রমণসঙ্গী আমিই। তিনি তার জীবনী, মতামত বা লেখালেখির প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। তার বই সম্পর্কে প্রশ্ন করলে, তিনি সংশ্লিষ্ট ড্রয়ার খুঁজে বের করতেন, যেখানে একসময় নিজের লেখা একটি হাতে লেখা নোট রাখা আছে, এবং এটি জোরে পড়ে শোনাতেন। প্রথম দিনের শেষে, আমরা একটি স্টিলের ফাইলিং ক্যাবিনেটের বেশি এগোতে পারিনি।
তাৎক্ষণিক কফি বানাতে বা কিছু গসিপ শেয়ার করতে মুরনেন মাঝে মাঝে বিরতি নিতেন। দ্বিতীয় দিনের দুপুরে, তিনি জোর করে আমাকে গোরোকে মেন’স শেডে নিয়ে গেলেন, যেখানে স্থানীয় অবসরপ্রাপ্তরা বিভিন্ন হস্তশিল্পে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। মেন’স শেড সেদিন বন্ধ ছিল, কিন্তু মুরনেনের কাছে চাবি ছিল। আমি বোর্ডরুমে একা বসে স্যান্ডউইচ খেয়েছিলাম, যেন ক্যাফেতে একা অপেক্ষায় থাকা একটি শিশু।
লুইস ক্লি
আপনি কখন গোরোকে চলে এলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
প্রথমবার এখানে এসেছিলাম ১৯৯৭ সালে। আমার ছেলে তখন এখানে একাই থাকত—সে একপ্রকার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে, প্রায় তার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনটাই এমন কেটেছে। আমার স্ত্রী আর আমি নিয়মিত তাকে দেখতে আসতাম, এরপর ২০০৮ সালে আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৯ সালের শুরুর দিকে তার মৃত্যু হলে, আমি মেলবোর্ন থেকে এখানে চলে আসি।
এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ একেবারে নিরব। মাঝে মাঝে একটি ট্রাকের শব্দ শোনা যায়, আর ভোরে, যখন চারপাশে বিশেষ কিছু ঘটছে না, মেলবোর্ন থেকে অ্যাডিলেড বা অ্যাডিলেড থেকে মেলবোর্ন যাওয়া উড়োজাহাজের আওয়াজ শোনা যায়। আমি আমার বেশিরভাগ সময় এই ঘরে কাটাই, যা সম্পূর্ণ নীরব, যদিও আমি নিজে মাঝে মাঝে ফিডল বাজাই বা নিজের জন্য গান গাই। তবুও আমি দিনে সক্রিয় থাকি—গোরোকে বা ইডেনহোপের গলফ কোর্সে বা মেন’স শেডে সময় কাটাই। আমি কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন বা নিঃসঙ্গ মানুষ নই।
লুইস ক্লি
গলফ খেলার কোন দিকটি আপনার বেশি পছন্দ?
জেরাল্ড মুরনেন
গলফ খেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো গলফ কোর্সের নিজস্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এটি আসলে আমার আজীবনের একটি অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত—পরিচিত স্থানে হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা অভিজ্ঞতা। কখন আমি এই প্রবণতায় আকৃষ্ট হয়েছি, তা আমি জানি না। ছোটবেলায়, অন্যের বাড়িতে গেলে এমন ঘর খুঁজতাম, যেখানে জানালা নেই। আশা করতাম এমন কোনো গোপন কক্ষ খুঁজে পাব, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অপরিচিত শহর বা গ্রামের পেছনের রাস্তায় আমি সহজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারি, যদিও সবসময় জানি আমি কোথায় আছি, এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসতে পারব। তবে পরিচিত পরিবেশে হারিয়ে যাওয়ার বিভ্রান্তিকর অথচ আনন্দদায়ক অনুভূতিটা আমার দারুণ লাগে।
গলফ কোর্সে সাধারণত, যদি তা ঘন জঙ্গলে ঘেরা না হয়, এক হোল থেকে পাশের হোল বা তারও পেছনের হোল দেখা যায়। আমি নিশ্চিত, আমি দুনিয়ার একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এমনটা করেছেন—আমি চেষ্টা করি এক পজিশন থেকে আঠারোটি হোলের কতটা দেখতে পারি। প্রায় অর্ধেক কোর্স গোলকধাঁধার মতো দৃশ্যমান। যদিও আমি গলফ কোর্সটি তৈরি করিনি বা এর নকশা করিনি, গোরোকে গলফ ক্লাবের সদস্য, সেক্রেটারি এবং বার ম্যানেজার হিসেবে বলতে পারি, আমি কিছুটা হলেও এর মালিক। এবং এতে আমি আনন্দ পাই যে আমি সেখানে গিয়ে কয়েকবার ঘুরে নিজেকে এমনভাবে পরিবেষ্টিত করতে পারি যে বুঝতে পারি না, আমি আসলে কোথায় আছি।
লুইস ক্লি
এজন্যেই কি লেখালেখির সময়, বিশেষত দীর্ঘ বাক্য নির্মাণের ক্ষেত্রে, আপনি হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা তৈরি করার চেষ্টা করেন?
জেরাল্ড মুরনেন
Tamarisk Row-এর শেষ অংশ এটি বোঝানোর জন্য একটি নিখুঁত উদাহরণ। এখানে পাঁচটি বিশাল বাক্যকে একত্রে গঠন করা হয়েছে। প্রথম বাক্যের একটি অংশ শুরু হয়, থেমে যায়, তারপর দ্বিতীয় বাক্যের প্রথম অংশ শুরু হয়, এরপর তৃতীয় বাক্যের প্রথম অংশ, এভাবেই চলে। একবার প্রতিটি বাক্যের প্রথম অংশ লেখা হয়ে গেলে, আমরা ফিরে যাই প্রতিটির দ্বিতীয় অংশ লিখতে … এটি শুনতে কৃত্রিম কৌশল মনে হতে পারে, তবে এর উদ্দেশ্য ছিল একধরনের বিভ্রান্তি ফুটিয়ে তোলা—যে বিভ্রান্তি একজন ছেলে অনুভব করতে পারে যখন সে বাড়ির বাইরের উঠোনে ঘোড়দৌড়ের সম্প্রচার শুনছে।
আমার প্রথম ঘোড়দৌড় সম্পর্কে জ্ঞান আসে যখন আমি চার বা পাঁচ বছর বয়সে উঠোনে খেলা করছিলাম। জানালার ভেতর দিয়ে আসা শব্দের টুকরো টুকরো অংশ শুনতাম, যা ঘোড়দৌড়ের সম্প্রচারের খণ্ডাংশ হিসেবে কানে আসত। এই খণ্ডাংশগুলো শুনে আমি একদিকে যেমন বুঝতে পারতাম যে এটি একটি উপলব্ধ, যুক্তিসঙ্গত ঘটনা, তেমন একই সঙ্গে আমি হারিয়েও যেতাম। ওই বিভ্রান্তি আর একই সঙ্গে বোধগম্যতার মিশ্রণ থেকেই আনন্দ আসত।
লুইস ক্লি
Tamarisk Row-এর জন্য বর্ণনাভঙ্গি কীভাবে খুঁজে পেলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
অনেক বছর আমি জানতাম না এটি কীভাবে উপস্থাপন করব। Tamarisk Row এক লক্ষেরও বেশি শব্দের, কিন্তু এই ড্রয়ারে—এখানে প্রায় ছয় মিলিয়ন শব্দ জমা রয়েছে। আমি যে বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজনকে ব্যবহার করেছিলাম, এবং এটি বলতে কিছুটা অস্বস্তি লাগে, তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত, নিঃসঙ্গ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি। তিনি তার আন্টির সঙ্গে থাকতেন এবং মেলবোর্নের একটি উপশহর থেকে উত্তর দিকে তাকিয়ে একটি হারিয়ে যাওয়া শহরের দিকে নজর দিতেন, যেখানে তিনি বড় হয়েছিলেন এবং যা Tamarisk Row-এর বাসেটে রূপ নিয়েছিল। তবে এটি কার্যকর হয়নি।
অন্য একজন বর্ণনাকারী নিয়েও চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি একটি তুলনামূলকভাবে প্রচলিত বর্ণনার ধারা বেছে নিয়েছি। একজন বুদ্ধিমান—হ্যাঁ, অত্যন্ত বুদ্ধিমান—পূর্ণ সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক বর্ণনাকারী দুই চরিত্র, ছেলে ক্লেমেন্ট এবং তার বাবা অগাস্টিনের অনুমানযোগ্য চিন্তা ও অনুভূতি তুলে ধরেন। তবে এই প্রচলিত ধারার মধ্যেও কিছু অদ্ভুততা রয়েছে, যা অন্য কয়েকটি বইতেই কেবল পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হলো দীর্ঘ বাক্যের ব্যবহার। ক্লেমেন্টের জীবনের অনেক সময় এমন ছিল, যখন তার চারপাশে যা কিছু তিনি দেখেন বা স্পর্শ করতে পারেন, তা তার কাছে আরেকটি সম্ভাব্য জগতে যা তিনি কল্পনা করেন তার চেয়ে বেশি অবাস্তব। বিশেষ করে, যখন তিনি গির্জায়, রেসকোর্সে বা তার উঠোনে থাকেন, সেই ক্ষুদ্র জগৎ যেখানে তিনি নিজের ছোট ছোট খামার এবং রেসকোর্স তৈরি করার চেষ্টা করেন।
লুইস ক্লি
অগাস্টিন, পিতৃচরিত্র, নিয়ে লিখতে কেমন লাগছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার বাবা তখন মৃত। আমি ভাবি, যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, কী লিখতাম … হয়তো কিছুটা বেশি মমতা বা কোমলতা দেখাতাম। তবে এটা বলা কঠিন। আমি মনে করতাম, অগাস্টিনের দোষগুণগুলো সমানভাবে দেখেছি। এটি কোনো প্রতিশোধমূলক রচনা ছিল না। আমি অগাস্টিনকে বোঝার চেষ্টা করেছি, যেমন ক্লেমেন্টকে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।
আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায় পুরোপুরি পৌঁছানো সম্ভব নয়।
লুইস ক্লি
আপনার বাবা মারা যাওয়ার সময় আপনার বয়স কত ছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার বয়স ছিল একুশ। তিনি পঞ্চাশের কোঠায় মারা যান। তার অকালমৃত্যু আমাকে অনেকটা মুক্তি দিয়েছিল, যাতে আমি তার সম্পর্কে, একটি কল্পিত রূপ নিয়ে, নির্ভয়ে লিখতে পারি। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, আমার বাবা আর সাথে নেই। অন্য কেউ এতে কষ্ট পেলে সেটা তাদের সমস্যা।
লুইস ক্লি
লেখার সময় আপনি কি সেই মানুষগুলোর কথা ভাবেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার চাচা লুইস জেমস মুরনেন Tamarisk Row লেখার এবং প্রকাশের কারণে প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়েছিলেন। আমি তার থেকে দূরে সরে এসেছিলাম, কিন্তু তিনি আমার বাবার চেয়েও আমার আন্তরিক বন্ধু ছিলেন, কারণ আমার বাবা কখনো আমার সঙ্গে সময় কাটানোর মতো অবসর পেতেন না। আমার চাচা কখনো গালি দিতেন না, কোনো অশালীন শব্দ ব্যবহার করতেন না, আর Tamarisk Row-এ বাচ্চাদের মধ্যে থাকা যেকোনো প্রকারের যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত তাকে খুবই কষ্ট দিয়েছিল। আমার নিজের ভাইয়ের মাধ্যমে এটা জানতে পারি । তিনি হয়তো জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তুমি কি জেরাল্ডের বই পড়েছ?” আর আমার চাচা হয়তো কিছু বলেছিলেন, “হ্যাঁ, পড়েছি।” তারপর তিনি বইটা নিয়ে কাঠ কাটার জায়গায় যান, যেখানে খোলা আগুনের জন্য কাঠ চেরা হয়। সেখানে তিনি বইটা চেরা ব্লকে রেখে—আমি জানি না, বইটি খোলা ছিল না বন্ধ—একটা কুড়ালের আঘাতে মেরুদণ্ড বরাবর সোজা কেটে ফেলেন।
আমাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। আমরা সত্তরের দশকের শেষের কথা বলছি। আমরা ভিক্টোরিয়ার একটি প্রাদেশিক শহরের একটি পরিবার সম্পর্কে বলছি, যারা সারা জীবন গির্জায় যেতেন। আমি আপনাকে Barley Patch-এর বর্ণনাকারীরকে দেখবেন, সেখানে একটি দৃশ্য আছে যেখানে বর্ণনাকারী তার চাচাকে মৃত্যুশয্যায় দেখতে যান এবং তাদের পুনর্মিলন হয়। তবে আমি একটি জিনিস জোর দিয়ে বলতে চাই। আমার জীবনে বহু মানুষকে দেখেছি, যারা পারিবারিক বিচ্ছেদ, মৃত্যু, বা ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আমার চাচা লিভার ক্যানসারে মারা যান, যদিও তিনি প্রায় কখনোই মদ্যপান করতেন না এবং ধূমপানও করতেন না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার প্রথম দুটি বই যা তার এবং তার বোনদের জন্য ছিল এক প্রকার ধাক্কা, সেটাই তার শারীরিক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছিল।
লুইস ক্লি
আপনি কি এ নিয়ে কোনো অপরাধবোধ অনুভব করেছেন?
জেরাল্ড মুরনেন
শুনতে নির্মম মনে হতে পারে, কিন্তু জানলেও আমি এই বইগুলো না লিখে থাকতে পারতাম না। আমার মনে হয়, এই বইগুলো এমন একটি সত্য প্রকাশ করে, যা আমার চাচার মতো মানুষের ভ্রান্ত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—আর সেই ধারণাগুলো সত্যিই ভ্রান্ত। আমি পৃথিবীতে এসেছি তাদের শৈশবের সত্য আড়াল করার জন্য নয়।
লুইস ক্লি
Tamarisk Row লিখে কি আপনার বাবার সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পেরেছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
হ্যাঁ এবং না। যখন আমি অগাস্টিন কিলেটনের কথা ভাবি, তখন রেজিনাল্ড থমাস মুরনেনের ছবি ভেসে ওঠে। তবে অগাস্টিনের চিন্তা, অনুভূতি, এবং উদ্দেশ্য ভাবতে গেলে মনে হয় তিনি ভিন্ন একজন । লেখার শুরুতেই এই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আরেকভাবে বললে, অগাস্টিন হতে পারতেন সেই মানুষ, যা রেজিনাল্ড মুরনেন অন্য পরিস্থিতিতে হতে পারতেন। আমার অধিকাংশ বর্ণনাকারী এবং প্রধান চরিত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—তারা আমারই সম্ভাব্য রূপ, যা কখনো বাস্তব ছিলনা ।
লুইস ক্লি
আপনি কি শৈশবের পড়ার অভিজ্ঞতায় নিজেকে খুঁজে পেতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আপনি অবাক হবেন শুনে, আমি খুব কমই পড়েছি। বেশিরভাগই ছিল মায়ের ধার করা মহিলাদের ম্যাগাজিন। আমরা এতটাই দরিদ্র ছিলাম যে বই কিনতে পারতাম না, কিন্তু রাস্তার মহিলারা The Australian Women’s Weekly আর New Idea বিলি করতেন। এসব ম্যাগাজিনে সবসময় ছোট ছোট রোমান্টিক গল্প থাকত। তবে আমি কখনো সেগুলোর শেষ পর্যন্ত পড়তাম না, কারণ মনে হতো তা আমার জন্য অনুপযুক্ত। আমি সবসময় বকা খাওয়ার ভয়ে থাকতাম। আমার মা যদি জানতেন, তার ছয়-সাত বছরের ছেলে এসব ম্যাগাজিনের গল্প বোঝার চেষ্টা করছে, তিনি অবাক হতেন।
লুইস ক্লি
এটা কি গোপন ছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। তবে বাড়িতে ছয়-সাতটি উপন্যাসও ছিল, যা সম্ভবত আমার বাবাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল ফ্রাঙ্ক ডালবি ডেভিসনের Man-Shy। এর পটভূমি ছিল আউটব্যাক, যা পরে জানি কুইন্সল্যান্ডের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এতে একটি বন্য গরুর পাল ছিল, যারা অবাধে ঘুরে বেড়াত। শেষ পর্যন্ত তাদের বন্দি করা হয়, কিন্তু একটি লাল গরু তার বাছুরসহ পালিয়ে যায় এবং পানির উৎসগুলো বেড়া দিয়ে ঘেরাও করায় তৃষ্ণায় মৃত্যুর সম্মুখীন হয়।
আমি মনে করি, Invisible Yet Enduring Lilacs (২০০৫)-এ আমি—অথবা বর্ণনাকারী—Man-Shy-এর শেষ বাক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলি, গরুটি কি সত্যিই মারা গিয়েছিল, নাকি কোনো অন্য কল্পজগতে পালিয়ে গিয়েছিল?
আমি পড়তাম যেন কিছু খুঁজছি, এমনকি সেই বয়সেই জনশূন্য, দূরবর্তী স্থানগুলোর প্রতি এক ধরনের সহজাত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা মানচিত্র দেখতে পারি। আমার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশদ মানচিত্র আছে। ডেস্কে বসে প্রাতঃরাশ করার সময় আমি কেবল একটি রাস্তার মানচিত্র দেখতে বিশ মিনিট ব্যয় করতে পারি। আমি গুগল আর্থে অনেক সময় কাটাই, যেন বিমানের মধ্যে থেকে পৃথিবীর দিকে তাকাচ্ছি, যদিও আমি কখনো বাস্তবে বিমানে চড়িনি।
লুইস ক্লি
গুগল আর্থে আপনি কোথায় যেতেন—সাইবেরিয়া?
জেরাল্ড মুরনেন
না, সেসব জায়গার প্রতি আমার আগ্রহ নেই, আফ্রিকার প্রতিও না। আমি প্রায়ই নিউজিল্যান্ডের গোরে যাই, যা ইনভারকারগিলের উত্তরে অবস্থিত, দেশের সবচেয়ে দক্ষিণের শহর। আমি একটি রাস্তা বেছে নিয়ে সেটি দেখতে থাকি। এটি প্রায় একধরনের বিশ্রামের মতো, যখন বছরের পর বছর আমি লেখক হিসেবে সময়, স্থান এবং অবস্থান নিয়ে এত চেষ্টা করেছি। গোরের একটি শহরতলির রাস্তায় একটি ছোট বাড়ি দেখে, যেখানে আট হাজার মানুষের বসতি, আমি একধরনের অদ্ভুত মমতা ও বিষণ্নতা অনুভব করি, যারা পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে এত দূরে বাস করে। এটি হয়তো মূর্খতার মতো শোনায়, কিন্তু আমি এটিকে মেনে নিই। কারণ আমি আশি বছরের বেশি সময় ধরে এই পৃথিবীর এই অংশে বাস করেছি, যা আমার কাছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। অনেকেই আমাকে বলত, “অবসর নিলে নিশ্চয়ই ভ্রমণে যাবেন?” আমি বলতাম, “দেখা যাক।”
লুইস ক্লি
শৈশবের কোনো বাড়ি কি আপনার মনে বিশেষভাবে গেঁথে আছে?
জেরাল্ড মুরনেন
জীবনের প্রথম একুশ বছরে আমি একুশটি ভিন্ন ঠিকানায় থেকেছি। আমার প্রথম স্মৃতি বুন্দুরার, মেলবোর্নের কাছে। আমরা সেখানে একটি খামারে থাকতাম, যেখানে আমার বাবা ম্যানেজারের সহকারী ছিলেন। সেই খামারটি মানসিক রোগীদের একটি হাসপাতালের সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৪৪ সালের শুরুতে আমরা বেন্ডিগো যাই। আমার এখনো সেই দিনটি মনে আছে, যেদিন আমরা বেন্ডিগো পৌঁছাই। রেলস্টেশনের বাইরে বসে আমরা ট্রাকগুলো দেখছিলাম, যেগুলোর গায়ে Buckle and Jeffrey লেখা ছিল। নতুন জায়গাটা একেবারেই অন্যরকম মনে হয়েছিল, এমনকি আলোটাও মেলবোর্নের চেয়ে ভিন্ন।
একবার আমরা ওয়াঙ্গারাটার কাছে লন্ড্রিগানে দু’সপ্তাহ ছিলাম। বাবা এমন জায়গায় থাকতে চেয়েছিলেন, যেখানে ভাড়া দিতে হবে না। তার নতুন চাকরিদাতা একটি বাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু মা বাড়ি দেখে বলেছিলেন, “আমরা এখানে থাকব না। যত দ্রুত সম্ভব মেলবোর্ন ফিরব।” আমরা দু’সপ্তাহ পর ফিরে যাই, কিন্তু তখন বাড়ি না থাকায় আত্মীয়দের কাছে থাকতে হতো। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি “As It Were a Letter” নামে একটি গল্প লিখেছি।
লুইস ক্লি
Inland-এ একটি দৃশ্য আছে, যেখানে আপনি আসবাবপত্রের ভ্যানে ভ্রমণ করছেন …
জেরাল্ড মুরনেন
হ্যাঁ, সেটা মেলবোর্ন ছেড়ে লন্ড্রিগানে যাওয়ার সময়। ওই অধ্যায়ের প্রথম বাক্যগুলো ছিল—“তার জীবনে চারবার আমার বাবা সবুজ-গ্রামে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন।”
লুইস ক্লি
আপনার বাবা কেন পালানোর চেষ্টা করছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
তার ঋণ থেকে। আর কিছু নয়। তার শেষ পালানোর চেষ্টা ছিল আমার বাড়ি ছাড়ার পর, যখন তিনি মেলবোর্নে থাকতেন। তিনি জিলং চলে যান, তার জন্মস্থানের দিকে অর্ধেক পথ যাওয়ার পর, কয়েক মাস পর তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রমে মারা যান—দিনে দুইটি কাজ করে ঋণ শোধ করার চেষ্টা করছিলেন।
আমি জানি এই প্রশ্নগুলো পাঠকের জন্য প্রয়োজন, কিন্তু যখন আপনি আমার প্রকৃত স্মৃতির কথা জানতে চান, তখন সেগুলো আমার বই লেখার সময় তৈরি হওয়া কাল্পনিক সংস্করণের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। তখন বাস্তব আর কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
লুইস ক্লি
আপনি কখন লেখালেখি শুরু করেছিলেন তা কি মনে আছে?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার যরদূর মনে পরে আমি শুরু থেকেই লেখক। তবে আমাদের পরিবারে লেখালেখির সমস্যা ছিল, কারণ আমার মা ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী। আমি তাঁর সাথে কিছু শেয়ার করতাম না, কিন্তু যখন আমার বয়স এগারো, তখন তিনি আমার লেখা খসড় একটি উপন্যাস খুঁজে পান। এটি ছিল সিডনি হবসন কোর্টিয়ার নামে একজন অস্ট্রেলিয়ান লেখকের The Glass Spear বইয়ের পুনর্লিখন।
বইটি একটি দূরবর্তী খামারবাড়ি নিয়ে লেখা, সম্ভবত পশ্চিম নিউ সাউথ ওয়েলসে। সেখানে পুলিশ একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে। আমার উপন্যাসের—অথবা প্রথম কুড়ি পৃষ্ঠার—মূল চরিত্র ছিল একজন তরুণ অবিবাহিত পুরুষ, যার সঙ্গে একটি তরুণী দ্বিতীয় বা দূর সম্পর্কের আত্মীয় হিসেবে জড়িত। এটা ছিল এক ধরনের রোমান্টিক ইঙ্গিত। এছাড়া প্রকৃতির বর্ণনা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেটুকু মনে আছে।
আমি উপন্যাসটি পাসকো ভেলের বাড়ির মেঝের লিনোলিয়ামের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু মা সেটা খুঁজে পান এবং ঠাট্টা করেন, যদিও তিনি বুঝতে পারেননি এতে আমার উপর কী প্রভাব পড়েছিল। আমি প্রধান চরিত্রের জন্য নিজের নাম ব্যবহার করেছিলাম—জেরাল্ড নয়, ধরুন গ্যারি মুরনেন। মা আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “এই গ্যারি মুরনেন কে?” আজও আমি আমার কল্পিত চরিত্রদের নিয়ে এমন প্রশ্ন করি, কিন্তু মা কেবল আমাকে বিব্রত করতে চেয়েছিলেন। হয়তো এটা নিশ্চিত বলা যায় না, তবে এগারো বছরের একটি ছেলের প্রথম গল্প লেখার ক্ষেত্রে এটি খুব দয়ালু আচরণ ছিল না।
তবু আমি শান্ত থাকি। যা লিখেছিলাম তা ছিঁড়ে ফেলি এবং সম্ভবত প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার আকাঙ্ক্ষার কথা তাকে আর কখনো জানাব না। আপনি চাইলে আমি আমার এবং মায়ের সম্পর্ক নিয়ে তিন সপ্তাহ ধরে টানা কথা বলতে পারি।
লুইস ক্লি
আপনার কি এমন কোনো শিক্ষক ছিলেন, যিনি আপনাকে বুঝতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
না। আমার বেশিরভাগ শিক্ষকই ভয়ংকরভাবে অজ্ঞ ছিলেন, আমি জেনে শুনেই বলছি। ইংরেজি বিষয়ে আমি ক্লাসের শীর্ষে ছিলাম, আর শিক্ষকরা আমার রচনার প্রশংসা করতেন। কিন্তু আমি সেগুলোয় বিন্দুমাত্র খাটতাম না—শুধু তারা যা পড়তে চাইবেন বলে মনে হতো, তাই লিখে দিতাম। Wuthering Heights-এর মতো একটি বই সম্পর্কে আমি যা বিশ্বাস করতাম, তার সঙ্গে আমার রচনার কোনো সম্পর্কই ছিল না।
ডি লা স্যাল কলেজে কেবল দুজন শিক্ষকই দক্ষ ছিলেন। বইয়ের শব্দ ছাড়া আর কোথাও থেকে আমি কোনো অনুপ্রেরণা পাইনি। এমনকি সিডনি হবসন কোর্টিয়ারকেও আমি ভাবতাম মেলবোর্নের কোনো গাছপথঘেরা অভিজাত রাস্তায় বসবাসরত একজন দূরবর্তী সত্তা।
আমার বেড়ে ওঠার জায়গাকে আমি বলি “ব্যাকস্ট্রিট বেন্ডিগো।” আমার সৃষ্টিশীল বছরগুলো ছিল চল্লিশের দশকে। গ্রামীণ শহরের পেছনের গলিতে কেউ ঘরে বই রাখত না। তারা সিনেমায় যেত। এটাই ছিল তাদের বিনোদন। অথবা তারা রেডিওর তারকাদের নিয়ে কথা বলত। আমি কখনো কোনো লেখকের সঙ্গে দেখা করার কথা কল্পনাও করতে পারতাম না। কোনো লেখক আমাকে তার কোলে বসিয়ে ভবিষ্যতের আশ্চর্য সম্ভাবনার কথা বলেননি।
লুইস ক্লি
ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
মাধ্যমিকে পড়ার সময়, ভাবতাম আমি একদিন গ্রামীণ স্কুলের শিক্ষক হব, যিনি অবসর সময়ে কবিতা লিখবেন। আমরা এতটাই দরিদ্র ছিলাম যে, আমি ভিক্টোরিয়ার শিক্ষা দপ্তরের শিক্ষক হিসেবে নিজেকে বেঁধে না রাখলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতাম না।
ভাবতাম, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, তারপর ওয়াঙ্গারাটা হাই স্কুলের মতো কোনো জায়গায় মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক হব। ছোট্ট একটি সুন্দর ফ্ল্যাটে থাকব। শুধু কবিতা লেখার সুযোগ পেলেই আমি সন্তুষ্ট হতাম। দিনের বেলা আনন্দময়, মনোযোগী শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে, রাতে বাড়ি ফিরে কবিতা লিখতাম। সেগুলো কোনো ছদ্মনামে প্রকাশিত হতো। জীবনের কাছে এটাই চেয়েছিলাম।
একশ পঞ্চাশ বছর আগে হলে, আমি ইংল্যান্ডের কোনো গ্রামীণ পাদ্রী হতে চাইতাম, যিনি তার রেক্টরিতে বসে কবিতা লিখতেন। এমন অনেকেই ছিলেন।
লুইস ক্লি
আপনি কি কখনো সেমিনারিতে গিয়েছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
১৯৫৬ সালে আমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না, কখনো খুব একটা ভাবিওনি। তখন আমার একটি প্রেমিকা ছিল, মাঝে মাঝে তার সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ দেখতে যেতাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আমাকে ভীত করেছিল। এখন ভাবলে অবাক লাগে, এমন অনুভূতি কেন হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া, বিশেষ করে শিক্ষক হিসেবে বাঁধা পড়ে, যেন একধরনের বন্দিত্ব।
ক্যাথলিকরা vocation শব্দটি ব্যবহার করে, যার অর্থ হলো ঈশ্বর আপনাকে জীবনের একটি নির্দিষ্ট পথে রেখেছেন। তাই আমি ভাবলাম, হয়তো ঈশ্বর আমাকে পুরোহিত হতে বলেছেন, এবং এতে আমার মুক্তি নিহিত। আমি আমার মা-বাবাকে এই সিদ্ধান্তে রাজি করাই। মাধ্যমিক চলাকালীনই তাদের বলি, “আমি মনে করি, আমাকে পুরোহিত হওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।” এরপর নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি সেমিনারিতে যাই। আমি তখন আঠারো, সেখানে কিশোর থেকে বিশের কোঠার যুবকরা ছিল।
আমি তখন ভাবতাম, থমাস মার্টনের মতো পুরোহিত-কবি হব। তিনি একজন সিস্টারসিয়ান ছিলেন, যদিও তার জীবনের কিছু দিক প্রতারণাপূর্ণ ছিল, যেমন, তিনি এক নার্সের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিলেন। তবে আমি তাকে দারুণ মনে করতাম। আমার ধারণা ছিল, দিনের বেলা পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করব, মানুষকে ঈশ্বরের পথে আনব, আর রাতে বাড়ি ফিরে কবিতা লিখব।
কয়েক সপ্তাহ আমি এটি খুবই গুরুত্ব সহ নিয়েছিলাম। A Season on Earth (২০১৯)-এর তৃতীয় ভাগে অ্যাড্রিয়ান যখন শার্লেরোই ফাদার্স নামে এক কাল্পনিক বেলজিয়ান অর্ডারে যোগ দেয়, তখন সে এটি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। সেমিনারিতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমি ভেবেছিলাম, আমি উচ্চতর কোনো উদ্দেশ্যের জন্য তৈরি। এবং দশ সপ্তাহ পর আমি বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হই।
আমাকে উপদেশ দিয়ে পুরোহিত বলেছিলেন, “তুমি পৃথিবীতে ফিরে যাবে, বিয়ে করবে, আর ত্রিশ বছর বয়সে ভাববে, কেন আমি থাকলাম না? এই পার্থিব সুখ ঈশ্বরের পুরোহিত হিসেবে পাওয়া সুখের মতো নয়।” পরে তিনিই পুরোহিত জীবন ছেড়ে বিয়ে করেন। এতে আমি খানিকটা তৃপ্তি পেয়েছিলাম। তবে কখনো ভাবিনি, তিনি সঠিক ছিলেন আর আমি ভুল।
লুইস ক্লি
আপনি সেমিনারি ছাড়ার সময় কি চার্চের বিশ্বাসে সন্দিহান ছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
যখন আমি ফিরে আসি, তখনও আমি গির্জায় যেতাম, কিন্তু ১৮-১৯ বয়স থেকেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে শুরু করি। এটি কোনো বজ্রপাতের মতো হঠাৎ ঘটেনি। আমাদের পরিবার ছিল কট্টরপন্থী, আর মা-বাবা ভাবতেন আমি কোন দলে যোগদিয়েছি। কিন্তু আমি দুধের দোকানে গিয়ে মাল্টেড মিল্ক খেতে খেতে খেলার পত্রিকা পড়তাম, সময় শেষ হলে বাড়ি ফিরতাম।
ধর্মের যা শিক্ষা পেয়েছি—ঈশ্বর, ফেরেশতা, চিরস্থায়ী মুক্তি নিয়ে সব কথা—কখনোই আমার সেই অংশকে ছুঁতে পারেনি, যা কল্পগল্প বা কবিতা ছুঁয়েছে। সেই আঠারো-উনিশ বছরের বিশ্বাস থেকে মুক্তি পেতে প্রথমে আমাকে এক ধরনের নাস্তিক, ফ্রয়েডিয়ান, ভোগবাদী মানুষ হতে হয়েছিল। তবে আমি ক্যাথলিকিজম থেকে দূরে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকেও যেতে চাইনি। উনিশ বছর বয়সে আমি পুরো A Shropshire Lad মুখস্থ করেছিলাম। হাউসম্যানের কবিতায় আমি একটি বিকল্প খুঁজে পেয়েছিলাম, এবং এটি আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
ইংল্যান্ডের সবুজ প্রকৃতি আমাকে এমন কিছু বোঝাত, যা ক্যাথলিকিজমের সাদাকালো নিশ্চয়তা বা প্যাগান সংস্কৃতির উজ্জ্বল লাল কামনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল। এটি ছিল কবিতার আবেগ, যাকে আমি তখন বলতাম।
আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে, কাব্য, কল্পকাহিনি, ঘোড়দৌড় এবং সঙ্গীতের জগৎই ছিল আমার জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। ধর্ম ছিল মানুষের তৈরি নিম্নতর একটি ধারণা। জীবনের যে সন্তুষ্টি আমি খুঁজতাম, তা ছিল কবিতা, গল্প, সঙ্গীত এবং ঘোড়দৌড়ে—ধর্মে নয়। কবিতা বা গল্প পড়ার সময়, ঘোড়দৌড় দেখার বা ভাবনার সময়, বা সঙ্গীত শোনার কিংবা বাজানোর সময় যে অনুভূতিগুলো আমার কাছে আসত, সেগুলোই আমার জীবনের পথ নির্দেশ করেছিল।
লুইস ক্লি
আপনার কি বিশ্বাসের সংকট দেখা দিয়েছিল যখন আপনি ধর্ম ছেড়েছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আঠারো-উনিশ বছর বয়সেও আমি নিয়মিত গির্জায় যেতাম, কিন্তু ফিরবার পর থেকেই ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করি। ঘটনাটা ঠিক বজ্রপাতের মতো হঠাৎ ঘটেনি। কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠা আমার— মা-বাবা ভাবতেন আমি গির্জায় যাচ্ছি, অথচ আমি সেই সময়টা ব্যয় করতাম কাছের দুধের দোকানে বসে; সেখানে মাল্টেড মিল্কের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে খেলার সংবাদপত্র পড়ে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে নিতাম। ঘরে ফেরার সময় ধর্মীয় আচারবিচার রক্ষার অভিনয়টুকু বেশ নিখুঁতই ছিল। এখন ভেবে অবাক হই যে, শৈশব থেকে যে ধর্মে আমার বেড়ে ওঠা, যেখানে ঈশ্বর আর দেবদূতদের নিয়ে এত মাতামাতি, স্বর্গ-পরকাল নিয়ে এত উদ্বেগ, সেই ধর্ম আমার অন্তরের সেই অংশে পৌঁছাতে পারেনি যেখানে স্থান করে নিয়েছিল সাহিত্য ও কবিতা। কৈশোরের এই বিশ্বাস থেকে মুক্তির জন্য শুরুতে এক ধরনের নাস্তিক্যবাদী, ফ্রয়েডীয় ভোগবাদী হওয়া দরকার ছিল; কিন্তু সেটাও আমি হতে চাইনি, ক্যাথলিক ধর্মের উল্টো প্রান্তে গিয়ে পৌত্তলিকতায় ডুবতে চাইনি। উনিশ বছর বয়সে আমি সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছিলাম হাউসম্যানের এ শ্রপশায়ার ল্যাড; হাউসমানের কবিতার মধ্যে আমি নতুন একটি আশ্রয় খুঁজে পাই। ইংল্যান্ডের প্রান্তরের সবুজ আমাকে উস্কে দিত না উজ্জ্বল, রক্তিম কোনো পৌত্তলিক কামনার দিকে, আবার ক্যাথলিক ধর্মের সাদাকালো নিশ্চিততার দিকেও না—আমার কাছে তা ছিল এক ধরনের সৌন্দর্যচর্চার, ‘কাব্যিক আবেগের’ নিবিড় ক্ষেত্র। পরে যখন আমি ধীরে ধীরে পরিণত হলাম, তখন বুঝলাম, কবিতা, সাহিত্য, ঘোড়দৌড় আর সঙ্গীত—এদের ক্ষেত্রটাই আসলে সর্বোচ্চ, আর ধর্ম একটা মানুষেরই সৃষ্ট, অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের ধারণা; নিজের অস্তিত্ব ও জীবন থেকে যা চেয়েছিলাম তা এই শিল্পের জগতেই পাওয়া যাবে, ধর্মে নয়। সাহিত্যে নিমগ্ন থেকে, কবিতা পড়তে পড়তে বা ঘোড়দৌড়ের দৃশ্যাবলি নিয়ে ভাবতে কিংবা সঙ্গীত শুনতে শুনতে অথবা বাজাতে যে সমস্ত অনুভূতি বা বোধ আমার কাছে এসেছে, সেগুলোই যেন আমাকে নির্দেশ করত যে আমার জীবনের প্রকৃত পথ কোনদিকে।
লুইস ক্লি
সেমিনারি থেকে ফিরে এসে আপনি কী ধরনের কাজ করতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার তখন জরুরি ভিত্তিতে একটা সাময়িক চাকরির জন্য সুপারিশপত্রের দরকার পড়েছিল, তাই বাধ্য হয়ে আগের স্কুলের হেডমাস্টারের দ্বারস্থ হতে হয়। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, একটা কম সময়ের চাকরির জন্য সুপারিশপত্র অবশ্যই দেবেন। এরপর আমার পঁচিশের কাছাকাছি বয়সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলাম, স্পষ্ট বুঝতে পারলাম—যে অস্পষ্ট ভয় আমার মনের মধ্যে ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমার লেখার ক্ষমতা আর কথাসাহিত্যের প্রতি আগ্রহকে হয়তো নষ্ট করে দেবে, সেই ভয় আসলে একেবারেই অমূলক ছিল না। সত্যিই, যতটা আশঙ্কা করেছিলাম তার থেকেও আরও খারাপ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, লেকচার, টিউটোরিয়াল—সবকিছুই।
লুইস ক্লি
আপনি আপনার Last Letter to a Reader (২০২১) বইটিতে এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন।
জেরাল্ড মুরনেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছিলেন ফ্রাঙ্ক রেমন্ড লিভিসের অন্ধভক্ত। ক্লাসে কোনো ছাত্র যদি লিভিসের মতবাদের ব্যাপারে অজ্ঞতা প্রকাশ করত—আর আমি আদতেই কখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি তাঁর মতবাদ কী—তাহলে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আদলে, সেই ছাত্রকে নতুন করে ‘শিক্ষিত’ করার ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আমার কাছে সত্যিই এক অলৌকিক ব্যাপার যে আমি ইংরেজিতে পাস করতে পেরেছিলাম। বহু বছর পর এক চাকরির জন্য আরেকটি সুপারিশপত্রের দরকার পড়েছিল আমার, তখন এক পুরোনো পরীক্ষকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি আমার পুরোনো রেকর্ড ঘেঁটে দেখলেন এবং আমাকে অবাক হয়ে বললেন, ‘বিশ্বাস করো আর না-ই করো, জেরাল্ড, ইংরেজি প্রথম পত্রে তুমি ফেল করেছিলে।’ আমি বললাম, ‘আমি মোটেই অবাক হইনি।’ তিনি আবার বললেন, ‘কিন্তু দ্বিতীয় পত্রে তুমি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া ছাত্রদের একজন। এটা কীভাবে সম্ভব?’ আমি তার ব্যাখ্যা দিতে পারিনি। আমার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি পরীক্ষা ছিল যেন চোখ বাঁধা অবস্থায় এক গোলকধাঁধার ভেতর দাঁড়িয়ে ডার্টবোর্ডে ডার্ট ছুড়ে দেওয়ার মতো একটি ব্যাপার—আমি মোটেই বাড়িয়ে বলছি না। আমি আমার কিছু পুরোনো পরীক্ষার খাতা আর্কাইভে রেখে দিয়েছি, মাঝেমাঝে সেগুলো বের করি আর অদ্ভুত এক ভয় আমাকে পেয়ে বসে। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করি, কীভাবে এই পরীক্ষা আমি উতরে গিয়েছিলাম?
লুইস ক্লি
আপনার কি প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো ভালো লাগত?
জেরাল্ড মুরনেন
ও, দারুণ লাগত। প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি। সেটা ছিল ১৯৬০ থেকে ’৬৫ সাল পর্যন্ত, প্রায় ছয় বছর। যদিও আমার ব্যক্তিগত জীবনে তীব্র টানাপোড়েনের কারণে কিছু কিছু বছর খুবই কঠিন ছিল। ১৯৬৩ সালে তো আমি প্রায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আর পুরোপুরি এড়ানোও যায়নি সেই বিপর্যয়। সেই সময় আমি আবার আমার পুরনো ক্যাথলিক বিশ্বাসের দিকেই ফিরে যাচ্ছিলাম প্রায়।
লুইস ক্লি
কী আপনাকে আবার প্রায় ধর্মান্তরের দিকে ঠেলে দিয়েছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
বেপরোয়া হতাশা। এখন, এই যে রঙিন চার্টটি দেখছেন— প্রায় পঁচিশটি রঙিন রেখায় আমার পুরো জীবনের একটা নকশা আঁকা। ধূসর রঙটা অস্পষ্টতা বোঝায়। আমার কাছে সবকিছুকেই ডায়াগ্রাম বা স্থানিক আকৃতিতে তুলে ধরতে হয়। এই চার্ট আসলে স্মৃতি ধরে রাখার একটি মাধ্যম। ‘৮৮ রিভার স্ট্রিট সাউথ’, এটা আমার ঠিকানা। এই যে এখানে দেখছেন, তখনই আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। টিচার্স কলেজে ওর সঙ্গে আগেই কিছুটা পরিচয় ছিল বটে, কিন্তু তখন আমাদের কারোই তেমন আগ্রহ ছিল না। আবার ’৬৪ সালের শুরুর দিকে ওর সঙ্গে দেখা হয়। এখানে ‘সি.এল. ১’ লিখে রেখেছি—তার মানে ’৬৪ সালের মাঝামাঝি আমরা প্রথমবার একসঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাই। দেখছেন এখানে? (ছবি দেখিয়ে)
লুইস ক্লি
হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।
জেরাল্ড মুরনেন
ঠিক। আর এই যে সমস্ত রেখাগুলো দেখছেন, এগুলো হলো আমাদের সম্পর্কের নানা ঘটনা। আর সম্পর্কটা শুরুতে কিছুটা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় আমাদের বিচ্ছেদও হয়েছিল—সেটা ওর সিদ্ধান্তেই। তারপর এখানে দেখুন, লেখা আছে, ‘সি.এম.এল.-এর সঙ্গে বাগদান।’ এরপর থেকে সবকিছুতেই ‘সি.এম.এল.’ লেখা আছে। ‘ব্রান্সউইকে সি.এম.এল.-এর সঙ্গে,’ তারপর ‘সি.এম.এল.-এর সঙ্গে বিয়ে’—এরপর থেকে আমি চার্ট তৈরি করা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
লুইস ক্লি
কেন চার্ট তৈরি করা ছেড়ে দিয়েছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
ধরা যাক, মানুষ হিসেবে জীবনের অর্থ কী, আমি কেন এখানে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। তারপর হঠাৎ এমন একজন মানুষকে পেয়ে গেলাম যার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায়, যে মানুষটি সত্যি সত্যিই আমাকে মন দিয়ে শুনতে পারত। তখন মনে হয়েছিল, আমার যাবতীয় সমস্যা বুঝি এবার শেষ হলো। তার আগে পর্যন্ত আমার আশ্রয় ছিল শ্রেণিকক্ষ। প্রাইমারি স্কুলের সেই ক্লাসরুমে ঢুকলেই শিশুরা আমার দিকে শ্রদ্ধাভরে তাকাত, সম্মান করত আমাকে। আমি তাদের আনন্দ দিতে পারতাম, কিছু শেখাতে পারতাম।
লুইস ক্লি
আপনি ওদের কী শেখাতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
প্রায় সব বিষয়। বিশেষ করে প্রচুর কবিতা মুখস্থ করাতাম—‘দ্য টেল অফ কাস্টার্ড দ্য ড্রাগন’, এ. এ. মিলনের কবিতা—এই ধরনের অনেক কবিতা। ছোটরা কবিতা মুখস্থ করতে খুব আনন্দ পেত। ওদের লেখালেখির আগ্রহ জাগানোর জন্য একটা মজার পদ্ধতি নিয়েছিলাম—‘অস্ট্রেলিয়ান উইমেন’স উইকলি’ ম্যাগাজিনের ছবি কাটতে বলতাম। বলতাম, ‘একটা ছবি খুঁজে নাও যা তোমাদের কাছে গল্পের মতো মনে হয়, ছবির নিচের লেখাটা একদম পড়বে না। কেবল ছবিটা স্কুলে নিয়ে এসো আর তোমাদের নোটবুকে সেঁটে দাও।’ ওগুলোকে বলতাম ‘পিকচার স্টোরি’। আরেকটা কাজ খুব পছন্দ করতাম—বাচ্চাদের ছোট ছোট দৃশ্য বা নাটিকা অভিনয় করাতাম। আগে থেকে ওদের একটু বোঝাতাম—‘ধরো তুমি সকালে ঘুম থেকে উঠেছো, আজ বড়দিনের সকাল। আশা করেছিলে একটা সাইকেল পাবে, অথচ পেলেই না—দেখো শুধু একটা জাল পেলে! তোমার বড় ভাই পাশেই বসে কথা বলছে...’ এইভাবে ওদের দিয়ে কথা বলাতাম, অভিনয় করাতাম, স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ তৈরি করতে বলতাম। কিছু বাচ্চা তো সত্যিই অসাধারণ ছিল, যেন জন্মগত অভিনেতা। এসব নিয়ে এত সময় ব্যয় করতাম যে পাঠ্যক্রমের অন্য বিষয়গুলো কিছুটা বাদ পড়ে যেত, আর এটা অবশ্য একটু নিয়মবহির্ভূতও ছিল।
লুইস ক্লি
আপনার নিজের লেখালেখিতে কি তখন সাফল্য আসছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
আমি কবিতা লিখতাম, কিন্তু সেগুলো তেমন চলতি ধারার ছিল না। আমার পরিচিত কবিতাগুলো ছিল স্কুলের সংকলন থেকে, যেগুলো প্রায়শই ছোটখাটো কবিতা ছিল। একটা কবিতা ছিল ডব্লিউ. জে. টার্নারের, অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া, পরে বিদেশে চলে যাওয়া কবি। সেই কবিতার কিছু লাইন আমাকে যেন সম্পূর্ণ গ্রাস করেছিল—“আমি হাঁটছিলাম এক সোনালী স্বপ্নের মধ্য দিয়ে / স্কুল থেকে এদিক-ওদিক— / উজ্জ্বল পোপোকাটাপেটল / ধুলোবালি ভরা রাস্তাগুলোকে শাসন করছিল।” টার্নার বড় হয়েছিলেন ধুলোমাখা রাস্তায়, আর স্বপ্ন দেখতেন দূরের, অজানা কোনো স্থানের। আর ছিল টেনিসনের ‘দ্য লোটোস-ইটার্স’, আর ক্রিস্টোফার ব্রেনানের কবিতা। ব্রেনান একসময় যাজকত্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, পরে আবার ফিরে আসেন। তার একটা লাইন ছিল—“upon the final ridges of the world”—এই লাইনটি আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল, আমার লেখায়ও আমি তেমন কিছু বলতে চেয়েছিলাম যা পাঠকের মনে সেইরকম গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৬১ সালে আমার এক অবাক করা বছর কেটেছিল। আমি কিছুই লিখিনি, শুধু প্রথমবার প্রুস্ত পড়েছিলাম। সেই প্রারম্ভিক ভূদৃশ্যগুলো... সেই অনুভূতি যে, একজন মানুষ ছিলেন যিনি এমন সব কথা লিখে গেছেন, যা আমি কখনোই ভাষায় প্রকাশ করতে পারিনি।
কিন্তু আমার লেখা কোথাও প্রকাশিত হচ্ছিল না। এরপর আমি একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি—‘উইথ পেরিশড পিপল’—আমার জন্মের আগের সময়কে কেন্দ্র করে, আমার বাবা-মায়ের দেখা হওয়ার আগের সময়ের কথা। এর শিরোনামটা নিয়েছিলাম হাউসমানের কবিতা থেকে—“The land is still by farm and steeple, / And still for me the land may stay: / There I was friends with perished people, / And there lie they.” আমি ইচ্ছে করেই বরফ সহযোগে হুইস্কি খেতাম, নিজেকে শিথিল করার জন্য, যাতে অন্তত কিছু লিখতে পারি।
লুইস ক্লি
তাহলে কি সেটা কাজ করেছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
শুরুতে কিছুটা কাজ করেছিল, কিন্তু তারপরের দিন লেখা পড়তে গিয়ে দেখতাম কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগের এক ঘণ্টার লেখাগুলো প্রায় দুর্বোধ্য হয়ে যেত। শেষমেশ সেই বইটা ফেলে দিই। তখন আমি প্রচুর বীয়ার আর অন্যান্য মদ্যপ পানীয় খেতাম। যেন আমার আর বাইরের জগতের মাঝে একটা পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ের অভিজ্ঞতার একটা বড় অংশই জায়গা করে নিয়েছে Landscape with Landscape (১৯৮৫)-এর ‘ল্যান্ডস্কেপ উইথ আর্টিস্ট’ অংশে। সেখানে বর্ণনাকারীকে দেখা যায় বিখ্যাত শিল্পীর প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে পাইন গাছের নিচে বসে থাকতে—উঁচু পাহাড়ের ওপর, হালকা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, শেরি আর পোর্টের বোতল হাতে।
লুইস ক্লি
কীভাবে আপনি লিখতে থাকলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
তামারিস্ক রো লেখার সময়টা ছিল কয়েক বছরের ছেদবিচ্ছিন্ন চেষ্টা—ছেদবিচ্ছিন্ন বলছি, কারণ তখন আমি খণ্ডকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স করছিলাম, যার ফলে কথাসাহিত্য লেখার জন্য প্রায় কোনো সময়ই থাকত না। গ্রীষ্মের ছুটির সময় বা যেকোনো ফাঁকা সময় পেলে আবার লিখতে বসতাম। উইথ পেরিশড পিপল লেখা হয়েছিল ১৯৬২ সালে, যা তামারিস্ক রো প্রকাশিত হওয়ার প্রায় বারো বছর আগের কথা। আমি জানি, সেই সময়গুলোতে আমার স্ত্রী কী ভাবতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি বসে বসে তামারিস্ক রো লিখতাম। সে খুব বেশি বলত না, তবে মাঝে মাঝে বলত, ‘এত পরিশ্রম করছ একটা এমন জিনিসের জন্য যা হয়তো কখনো প্রকাশিতই হবে না।’ আমাকে আলাদা করে তা বলতে হতো না, কারণ সেই কথাটাই আমি প্রতিদিন নিজেকে মনে করিয়ে দিতাম। তবু, যখন তামারিস্ক রো লেখা শেষ করলাম, তখন অদ্ভুত একটা আত্মবিশ্বাস জন্মালো আমার। আমি পাণ্ডুলিপিটা রেখে দিলাম প্রায় এক বছর ধরে, কাউকে দেখালাম না। কেননা, আমার মনে হচ্ছিল, এত বছর পর অবশেষে আমি এমন কিছু লিখেছি যা নিঃসন্দেহে প্রকাশিত হবে। আর তখন আমার একান্ত চাওয়া ছিল—প্রকাশিত হওয়া।
লুইস ক্লি
আপনি প্রকাশক পেলেন কীভাবে?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার ভাই একদিন আমাকে বলল, ‘দেখো, তুমি এই বইটা নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছো...’ তারপর সে আমাকে লেখক ব্যারি ওকলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ব্যারি আমার বিশাল এক উপকার করল। ব্যারির দ্বিতীয় উপন্যাসটি তখন প্রকাশ করবে হাইনেম্যান অস্ট্রেলিয়া, যারা তখনই নতুন শুরু করেছে। প্রকাশকরা আমার কাছে তখন লেখকদের চেয়েও দূরের ব্যাপার ছিল। আমি ভাবতাম তারা বুঝি সেই সাহিত্যিক মূল্যবোধে নিবিষ্ট, যেটা আমি আয়ত্ত করার চেষ্টা করছিলাম—সাহিত্যিক কথাসাহিত্যের গুরুত্ব, এসব। কখনোই ভাবিনি যে তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়িক লাভ করা, বই থেকে টাকা বানানো।
আমি ব্যারিকে বললাম, আমি একটা দীর্ঘ উপন্যাস লিখেছি, নাম তামারিস্ক রো। ব্যারি সেটা ‘দেখল’—আমার প্রিয় শব্দবন্ধ এটা—‘পড়ল’ নয়, ‘দেখল’। সে আমাকে বলল, এর কিছু অংশ তার একদমই ভালো লাগেনি, আর কিছু অংশ তার খুব ভালো লেগেছে। তারপর সে হিলারি ম্যাকফির কাছে বলল, যিনি তখন হাইনেম্যানের সম্পাদক। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে ভাগ্যবানের মতো ঘটনা ছিল। কারণ, যখন হিলারি আমাকে তার সেন্ট কিলডার অফিসে ডাকলেন, তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যদি এটাকে অর্ধেক কেটে ফেলতে পারো, তাহলে আমরা প্রকাশ করব।’ আজ যেটা সবাই তামারিস্ক রো হিসেবে চেনে, সেটি মূল পাণ্ডুলিপির মাত্র ষাট-সত্তর শতাংশ।
তবে তামারিস্ক রো প্রকাশিত হওয়া মানেই পরের বইটি প্রকাশিত হবে, এমনটা নয়। আ সিজন অন আর্থ ছিল আমার দ্বিতীয় বই হওয়ার কথা, কিন্তু প্রকাশকরা সেটাও অর্ধেক করে ফেলল। প্রথম অর্ধেকটা প্রকাশ করল আ লাইফটাইম অন ক্লাউডস (১৯৭৬) নামে। তারপর আমি লিখলাম দ্য অনলি অ্যাডাম, যা দুটি প্রকাশকই প্রত্যাখ্যান করল।
দ্য অনলি অ্যাডাম-এর প্রথম আশি পৃষ্ঠাই এখনকার দ্য প্লেইন্স-এর প্রথম আশি পৃষ্ঠা। তারপর গল্পটা রূপ নেয় এক সাধারণ ছেলের জীবনে, লায়নেল আর্মফিল্ড নামে। সে দক্ষিণ-পশ্চিম ভিক্টোরিয়ার এক ছোট্ট স্কুলে পড়ে। প্রায় আশি পৃষ্ঠা ধরে তার গল্প চলে, তারপর আবার ফিরে আসা হয় দ্য প্লেইন্স-এ। এইভাবে একটা করে প্লেইন্সের অংশ, তারপর একটা করে লায়নেলের অংশ—এই ধাঁচে পুরো গল্পটা এগিয়েছিল।
যখন সেই বইটি প্রত্যাখ্যাত হলো, তখন আমি কয়েক বছর ধরে এক ধরনের হতাশায় ভুগছিলাম। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। সেই সময়টাতে আমি আমার সবচেয়ে বড় ভুল করেছিলাম—কল্পনা করা শুরু করলাম যে আমি যেন সাধারণ প্রকাশকদের জন্য লিখছি। নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা ছিল সবচেয়ে বড় পাপ। মাথায় ঘুরত সেই প্রশ্ন—‘মানুষ এখন কী পড়ছে?’ আসল প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল—‘আমি কী নিয়ে লিখব?’
দ্য প্লেইন্স প্রকাশিত হওয়াটা ছিল একদম ভাগ্যের ব্যাপার। আমার বয়সী তিনজন যুবক একটা প্রকাশনা সংস্থা শুরু করতে চাইল—তারা সায়েন্স ফিকশন নয়, বরং ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’ প্রকাশ করতে চেয়েছিল। কেউ জানে না, ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’ মানে আসলে কী। আমি অবাক হলাম যখন জানতে পারলাম, তারা দ্য প্লেইন্স-কে স্পেকুলেটিভ ফিকশন বলেই প্রকাশ করবে। তাদের একজন, ব্রুস গিলেস্পি বলল, ‘যদি দ্য অনলি অ্যাডাম কোথাও প্রকাশ করতে না পারো, তাহলে প্লেইন্সের অংশগুলো আলাদা করে বের করো। আমরা সেটাকে বই হিসেবে ছাপব।’
আমি প্রথমে বইটির জন্য অন্য একটা শিরোনাম ভেবেছিলাম—ল্যান্ডস্কেপ উইথ ডার্কনেস অ্যান্ড মিরাজ। এখনো যখন আমি নির্জন কোনো রাস্তায় গাড়ি চালাই—আর এখানে সব রাস্তাই প্রায় নির্জন—তখন নিজেকেই প্রশ্ন করি, দ্য প্লেইন্স কি আরও ভালো বই হতে পারত?
লুইস ক্লি
আপনি কি দ্য প্লেইন্স নিয়ে সন্তুষ্ট নন?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার নিজের বিচারে আমি আরও ভালো বই লিখেছি। দ্য প্লেইন্স নিয়ে যে বিপুল প্রশংসা হয়েছে, সেটা আমি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারি না। যদিও এটিই সেই বই, যার প্রতি আমার ঋণ সবচেয়ে বেশি। আমার অস্বস্তির কারণ সম্ভবত এটাই যে, বইটি যেন ম্যাকডাফের মতোই অস্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে এসেছে—মায়ের গর্ভ থেকে অসময়ে টেনে বের করে আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে সবচেয়ে অদ্ভুত আর চিন্তা উদ্রেককারী মন্তব্যটি করেছিলেন জন টিটেনসর। দ্য প্লেইন্স প্রকাশের পর তিনি বলেছিলেন, ‘জেরাল্ড মুরনেন আসলে অস্ট্রেলিয়ার মানসিকতার সন্ধানে আছে।’ এখন, ধরা যাক, অস্ট্রেলিয়ার সত্যিই একটা মানসিকতা আছে—এই বক্তব্যটি তো একটা দারুণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভাষিক লাফ।
লুইস ক্লি
“অস্ট্রেলিয়ার মানসিকতা”—এই কথাটার মানে আপনার কাছে কী?
জেরাল্ড মুরনেন
এটা আমাকে তৃণভূমির কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন বাতাস তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন যেন তারা ভাবতে শুরু করে। কোনো হালকা হাওয়া এসে তাদের জাগিয়ে তোলে, আর তারা ভাবে—‘আরে, আমরা তো তৃণভূমি, মরুভূমি নই, আমরা অন্য কিছু। আমাদের নিজেদের নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত।’ আমার মনে এমন চিন্তাগুলোই ঘুরপাক খায়। এই ভাবনারাই আমাকে টিকিয়ে রাখে।
লুইস ক্লি
আপনি নিজেকে খুব অস্ট্রেলিয়ান মনে করেন কি?
জেরাল্ড মুরনেন
বিশ্বাস করুন বা না করুন, আমি আসলে ফেডারেশনবিরোধী। আমি সবসময়ই ভেবেছি, যদি ভিক্টোরিয়া নামে একটা আধা-স্বাধীন ডোমিনিয়নে বাস করতাম, তাহলে হয়তো আরও সুখী হতাম। ‘অস্ট্রেলিয়া’ শব্দটির প্রতি আমার তেমন কোনো টান নেই, বা খুব সামান্যই। দেখুন, দ্য প্লেইন্স-এর লোকেরাও কিন্তু নিজেদের অস্ট্রেলিয়ান ভাবে না। তারা তৃণভূমির মানুষ—তারা জানে না তারা আসলে কী, কিন্তু এটুকু জানে যে তারা অস্ট্রেলিয়ান নয়। এ ব্যাপারটা আমার সঙ্গেও বেশ মিলে যায়। আমি কখনোই ঠিকঠাকভাবে উত্তর দিতে পারব বলে মনে হয় না যে, তৃণভূমির মানুষ কারা, তারা কোথায়।
লুইস ক্লি
মেলবোর্নে বসে কীভাবে আপনি দ্য প্লেইন্স লিখলেন, যেখানে আপনি যে প্রাকৃতিক দৃশ্য বর্ণনা করেছেন, তা তো সেখানকার নয়?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার কাছে যা ছিল, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। যখন আমি ইনল্যান্ড লিখছিলাম, তখনো কখনো কল্পনাও করিনি যে মেলবোর্ন ছেড়ে কোথাও যাব। তাই উত্তর-পূর্ব উপশহরের ছোট ছোট খাল আর দিগন্ত বিস্তৃত দৃশ্যপটই তখন আমার কাছে ছিল সবচেয়ে কাছাকাছি, যা আমাকে সেই পূর্ণতৃপ্তি দিতে পারত। এখন যে সীমানা অঞ্চলের প্রান্তর থেকে আমি সেই তৃপ্তি পাই, তখন তা শুধু কল্পনাতেই ছিল। মেলবোর্নকে আমি একটুও মিস করি না।
লুইস ক্লি
মেলবোর্নে টিকে থাকা কি একটু সহজ ছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
তামারিস্ক রো প্রকাশের পর আমি ভিক্টোরিয়ার শিক্ষা দপ্তরের প্রকাশনা শাখায় খুব ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে দিলাম। তারপর আমি গৃহস্বামী হলাম, আর আমার স্ত্রী তার মনোবিজ্ঞানীর ক্যারিয়ারে ফিরে গেল। আমরা দুই বছরের মধ্যে তিনটি ছোট বাচ্চার জন্ম দিয়েছিলাম, আর ঘরের মধ্যে আটকে থেকে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আমি সুযোগটাকে লুফে নিয়েছিলাম—চাকরিটা ভালো ছিল বটে, কিন্তু সেটা উপভোগ করতাম না। কিন্তু এরপর শুরু হলো কঠিন কিছু বছর। আমাদের পারিবারিকভাবে বেশ সংগ্রাম করতে হচ্ছিল। আমি দু-একটি গ্রান্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু সেসব দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। কেউ আমাকে রিভিউ লেখার জন্য বললে, আর পয়সা দিতে চাইলে, তবেই লিখতাম। তখন এমন একটা সময় এল যখন যেকোনো কাজ পাওয়া আমার জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল। আমি লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই চাকরিটা আমার জন্য দারুণ মানানসই ছিল—বিভিন্ন সময়ে কাজ, সন্ধ্যায় গেটের বাঁশ নামানো-তোলা, এসবই করতে হতো। তখনই আমার এক পুরোনো সহকর্মীর কথা মনে পড়ল। সে আগে আমার অধীনে কাজ করত, আর এখন সে প্রাহরান কলেজের রেজিস্ট্রার হয়ে গেছে। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘লাইল, তুমি কি আমার জন্য একটা সুপারিশপত্র লিখতে পারবে?’ সে ভেবেছিল আমি হয়তো কোনো অ্যাকাডেমিক চাকরির জন্য আবেদন করছি। সে বলল, ‘এখানে একটা চাকরি খালি আছে, তুমি হয়তো আবেদন করতে চাইবে—ক্রিয়েটিভ রাইটিং লেকচারার।’ একটা থেকে আরেকটা ঘটনার সূত্র ধরে আমি সেই চাকরিটাই পেয়ে গেলাম। প্রথমে তারা আমাকে এক বছরের চুক্তিতে রাখল, আর শর্তগুলো ছিল বেশ কঠিন। তবু, টাকার জন্য আমাকে সেই কাজটা করতেই হতো।
লুইস ক্লি
গৃহস্বামী থাকার দিনগুলো কি আপনি কখনো মিস করেন?
জেরাল্ড মুরনেন
গৃহস্বামী থাকার সময় আমি তেমন কিছুই লিখতে পারিনি। দিনে প্রায় চার ঘণ্টা—সকাল দশটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত—এই সময়টুকুতেই লেখালেখি করতাম।
লুইস ক্লি
বাকি সময়টা কী করতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
লেখালেখি এড়িয়ে চলতাম, যেমন বেশিরভাগ লেখকরাই করে। ক্রসওয়ার্ড পাজল মেলাতাম, স্ক্র্যাবল খেলতাম। বাড়ির কাজ করতাম—সেটা করতে করতে সকাল দশটা বেজে যেত। আপনি ভাবতে পারেন, ষোলোটি বই লেখার পর আমি বুঝি প্রতিটি লেখার মুহূর্তকে ভীষণ উপভোগ করেছি। না। লেখাটা যখন গতি পায়, তখন ঠিক আছে, কিন্তু সেই গতি পেতে প্রায় আধঘণ্টা আলসেমি করতেই হয়। এভাবেই কাজটা করতে হয়। কারণ, আপনি তখন এমন কিছু আহ্বান করছেন যা সবসময় চোখের সামনে থাকে না। মানুষের মন এমনভাবেই তৈরি যে, লেখার প্রকৃত, গভীর, অর্থপূর্ণ বিষয়বস্তু সহজে ধরা দেয় না। তা কীভাবে দেবে? এক অর্থে, সেটা যেন নিজেকেই রক্ষা করতে চায়। ‘আমাকে আমার জায়গাতেই থাকতে দাও।’
আমি কখনোই বলব না যে আমি আমার পরিবারের চাহিদার চেয়ে লেখালেখিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার এক ছেলের গুরুতর অসুখ ধরা পড়ল। তখন কী লিখছিলাম? সম্ভবত দ্য অনলি অ্যাডাম। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে তার জীবনসংকট চলছিল। পাঁচ মাস পর সে পুরোপুরি সেরে উঠল। সেই সময়টাতে লেখার কথা মনেও আসেনি। আমার স্ত্রী যখন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিল, তখন এমন সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি যা বেশিরভাগ মানুষ কখনোই দেখেনি। ভাগ্য ভালো, তাদের দেখতে হয়নি। আমি তখন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছিলাম ওর দিকে, যতটা পেরেছি। লেখালেখি তখন আমার জন্য একদম দশ নম্বর অগ্রাধিকার ছিল।
লুইস ক্লি
স্ত্রীর মৃত্যুর পর লেখালেখি করতে কেমন লেগেছিল?
জেরাল্ড মুরনেন
বর্ডার ডিস্ট্রিক্টস প্রায় লেখা হচ্ছিল না। আমি তখন গোরোকে এসে উঠেছি, আ হিস্টরি অফ বুকস শেষ করার পর, মনস্থির করেছিলাম আর কিছুই লিখব না। নতুন জীবন শুরু করার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। স্ত্রীর মৃত্যুতে দুঃখিত ছিলাম, কিন্তু আমরা দু’জনেই জানতাম এটা আসবে। একান্তে, দূরের এই দেশগ্রামে একা থাকা—এটা ছিল বিশাল একটা পরিবর্তন। তারপর একদিন সকালে আমি একটা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলাম। আমি স্বপ্নে রঙিন কাচ দেখেছিলাম। কারণ, কাছের একটা ছোট্ট গির্জায় কিছু রঙিন কাচের জানালা দেখেছিলাম। সেগুলো সাধারণ জানালা, কিন্তু সেগুলো শত বছর আগের দুই যাজকের স্মৃতিতে উৎসর্গ করা। তখন মনে হলো, রঙিন কাচ নিয়ে একটা বই লিখতে পারি, আর সেই বইতে এমন একজনকে রাখতে পারি যার জীবন হঠাৎ বদলে গেছে। বর্ডার ডিস্ট্রিক্টস হলো সেই বই, যা লেখার আগে আমি একটিও নোট রাখিনি। কিন্তু শেষমেশ কোথাও যেন পৌঁছে গিয়েছিলাম।
লুইস ক্লি
আপনার বইগুলোর জন্য আপনি কী ধরনের নোট রাখতেন?
জেরাল্ড মুরনেন
কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল না। প্রায়ই আমি ম্যানিলা ফোল্ডার নিয়ে তা ফাইলিং ক্যাবিনেটে রাখতাম, ফোল্ডারগুলোর জন্য আলাদা আলাদা শিরোনাম দিতাম। তারপর যখনই কোনো ভাবনা মাথায় আসত, সেগুলো সেখানে রাখতাম। একেকটা ফোল্ডারে চার-পাঁচটি নোট জমা পড়ত, কিছু ছিল রহস্যময়, আবার কিছু ছিল একেবারে স্পষ্ট। আমি সেসব নোট থেকেই লিখতে শুরু করতাম। ইনল্যান্ড-এর সময় থেকেই আমি এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করি। দেখুন এখানে—‘মাটির বিজ্ঞানী’, ‘বেন্ডিগো স্ট্রিটের মেয়ে’, ‘চ্যাপ্টা নাকের মেয়েটির কাছে যাওয়া’... আমি এখন আর ঠিক মনে করতে পারছি না চ্যাপ্টা নাকের মেয়েটা কে ছিল। কিন্তু এটা ছিল আমার ব্যবহৃত দশটি পদ্ধতির একটি মাত্র। আমি একসময় ভাবতাম, ‘এই তো, এবার সঠিক পদ্ধতি পেয়ে গেছি।’ কিন্তু সেই পদ্ধতিটাই পরের বইয়ের ক্ষেত্রে কাজ করত না।
আমরা এই ড্রয়ারগুলো সব খুলে দেখব না, কারণ তাতে আপনার পুরো দিনটাই এখানে কেটে যাবে। তবে এই শেষ ড্রয়ারটা দেখে রাখুন—এখানে রয়েছে অপ্রকাশিত আর পরিত্যক্ত খসড়াগুলো। এটা হলো... কোথায় গেল? ‘ও, ডেম গোল্ডেন স্লিপার্স’। ইনল্যান্ড শেষ হওয়ার পর এই বইটিই লেখার কথা ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এখানে যতগুলো ফোল্ডার আছে, তা আমার প্রকাশিত কিছু বইয়ের ফোল্ডারের চেয়েও বেশি। এতে বোঝা যায়, ও, ডেম গোল্ডেন স্লিপার্স-এ কতটা শ্রম দিয়েছিলাম, অথচ শেষ করতে পারিনি। আজও সেই দিনটা মনে আছে যেদিন আমি ঠিক করেছিলাম, আর কাজটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। ভীষণ অপরাধবোধ হচ্ছিল। কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা চিত্রকল্পগুলোকে তখন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল, কিন্তু কাজটা আমি শেষ করতে পারিনি। এখনও সেটার কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি। ঠিক কোথায় ভুল ছিল, তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।
ঠিক আছে, পরের প্রশ্ন করুন।
লুইস ক্লি
ও, ডেম গোল্ডেন স্লিপার্স শেষ করতে না পারার জন্যই কি আপনি লেখালেখি থেকে বিরতি নিয়েছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আমি যা মনে করি, তা হয়তো আপনার ধারণার সঙ্গে মিলবে না। আপনি মনে করছেন, আমি লিখতে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। আমি লেখাই চালিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমত, আমি অ্যান্টিপোডিয়ান আর্কাইভ নিয়ে কাজ করতে শুরু করি—সেই সময়েই এই প্রকল্পটা চালু করি। তবে যখন বুঝলাম ও, ডেম গোল্ডেন স্লিপার্স শেষ করতে পারব না, তখন সেই সময়ে লেখা ছোট ছোট টুকরোগুলোকে জুড়ে ভেলভেট ওয়াটারস (১৯৯০) তৈরি করি। সেগুলো ছিল বিভিন্ন সময়ে লেখা ছোট ছোট রচনা। এডিটররা ফোন করে জিজ্ঞেস করত, ‘তোমার কাছে কি এমন কিছু আছে যা আমাদের পাঠাতে পারো?’ আমি সরাসরি এভাবে বলতাম না, কিন্তু মনে মনে ভাবতাম, ‘যদি আমার কাছে কিছু থাকত যা প্রকাশের যোগ্য মনে করতাম, তবে তা তো আগেই প্রকাশ করতাম!’ খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। তবু, আমি সেই অর্ধসমাপ্ত নোটগুলো ঘেঁটে খুঁজে বের করতাম, আর পরের সপ্তাহান্তে বসে একটা ছোট গল্প লিখে ফেলতাম। আমি কখনো নিজেকে ছোটগল্প লেখক ভাবিনি। কিন্তু সেই গল্পগুলোর মধ্যে কিছু, যেমন স্টোন কোয়ারি—যেটায় লেখকদের একটা কমিউনিটি দেখানো হয়েছে যেখানে কাউকে কথা বলা বা একে অন্যের দিকে তাকানো নিষেধ—তাদের মধ্যে এমন গভীরতা আছে, যা গোটা একটা বইয়ের সমতুল্য।
তারপর লেখালেখি একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। আমার স্ত্রী তখন আক্ষেপ করে বলত, ‘তোমার তো আর কিছুই নেই দেখছি। তুমি কি ভেলভেট ওয়াটারস-এর মতো আরেকটা সংগ্রহ তৈরি করতে পারো না?’ তখন আমি রাতের পর রাত বসে কাজ করতাম। তেমন আনন্দ পাচ্ছিলাম না, কিন্তু মনে হচ্ছিল, অন্তত একটা বই তো শেষ করতে পারব। সেই সময়কালের মাঝামাঝি এক সময়ে আমি আমার এজেন্টকে এমেরাল্ড ব্লু জমা দিলাম। কিন্তু যে প্রকাশক সেটা প্রকাশ করল, সে বইটির প্রচারের জন্য কিছুই করল না। মাত্র কয়েকশো কপি বিক্রি হলো।
লুইস ক্লি
দ্য ইন্টেরিয়র অফ গ্যালডিন-এ যখন আপনি লিখলেন, “The text ends at this point”—তখন কী অনুভব করেছিলেন?
জেরাল্ড মুরনেন
ওই লাইনটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি কতটা অস্থির আর সহজেই প্রভাবিত হওয়া মানুষ। একজন লেখক হিসেবে কতবারই তো সংকল্প করেছি, তারপর নিজেরই দেওয়া কথা ভেঙেছি। যখন এমেরাল্ড ব্লু শেষ করলাম, তখন সত্যিই আর কোনো কথাসাহিত্য লেখার কোনো ইচ্ছে ছিল না। তাই ওই লাইনটা লেখার সময় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করেছিলাম। কিন্তু একইসঙ্গে পাঠকদের জন্য এক ধরনের দুঃখও হচ্ছিল। আমার আদর্শ পাঠকের প্রতি যে আনুগত্য ও নিষ্ঠা, সেটাই আমাকে অপরাধবোধে ভোগাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি—‘দুঃখিত, এটুকুই শেষ। তোমাদের কাছে শুধু এই সাতটা বইই রইল।’ তারপর যখন প্রকাশক আইভার ইনডাইকের সঙ্গে দেখা হলো, তখন সে আমাকে আবার লেখার ব্যাপারে রাজি করাল। এর ফলে ইনভিজিবল ইয়েট এন্ডিউরিং লাইল্যাকস-এর প্রবন্ধগুলো জন্ম নেয়।
কিন্তু এটাই আবার আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বার্লি প্যাচ লেখার দিকে, যেখানে আমি অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি ব্যাখ্যা করেছি কেন ও, ডেম গোল্ডেন স্লিপার্স শেষ করা সম্ভব হয়নি এবং সেটা পৃথিবীকে জানানোর মানে কী ছিল। এটা ছিল এক ধরনের বিশাল মুক্তি। কারণ, নিজের লেখা নষ্ট হয়ে যাওয়া মানে যেন কোথাও কোনো ড্রয়ারে টাকা হারিয়ে ফেলা।
লুইস ক্লি
আপনি কি বার্লি প্যাচ-কে কথাসাহিত্য মনে করেন?
জেরাল্ড মুরনেন
আমার মনে হয় ইনভিজিবল ইয়েট এন্ডিউরিং লাইল্যাকস-এর ভূমিকায়ই লিখেছিলাম যে আমি আসলে কথাসাহিত্য লিখছি কিনা, সেটা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। পুরো লেখাগুলোকেই প্রবন্ধ বলা যেতে পারে। আমি যা লিখি, তা মূলত আমার মনের বিষয়বস্তুর একটি প্রতিবেদন। আর যদি কোনো একটি অনুচ্ছেদে কথাসাহিত্য আর অ-কথাসাহিত্য মিশে যায়, তাহলে সেটাই হোক।
লুইস ক্লি
কিন্তু এ মিলিয়ন উইন্ডোজ-এ “সত্যিকারের কথাসাহিত্য” ধারণাটি নিয়ে আপনি যেভাবে ভাবনাচিন্তা করেছেন, তাতে তো কথাসাহিত্য বিভাগটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়।
জেরাল্ড মুরনেন
এ রকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া আমার ভালোই লাগে। আপনি এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন, এটাই আমার ভালো লেগেছে। আমি অবশ্য আপনার প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে পারি এভাবে—এগুলো এমন বিষয়, যেগুলো নিয়ে আমরা সাধারণত ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করি, যখন লেখা শেষ হয়ে গেছে, সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, বছরও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যখন লেখা হচ্ছিল, তখন এসব কথা আমার মাথায় আসেনি বা কখনোই আমাকে বিরক্ত করেনি।
লুইস ক্লি
বার্লি প্যাচ-এ আপনি এমনটা ইঙ্গিত করেছেন যে, কথাসাহিত্যের মধ্যে এমন এক ধরনের বাস্তবতা আছে, যা কোন কোন ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতার চেয়েও বেশি প্রকৃত, যা থেকে সেই গল্পটি জন্ম নিয়েছে।
জেরাল্ড মুরনেন
ঠিক আছে, আমি মানসিকভাবে পাশ কাটানোর মতো কিছু একটা করব। আপনার ঠিক পাশেই দুটি ড্রয়ার রয়েছে, যেগুলো আমরা এখনো খুলে দেখিনি। সম্ভবত আগামীকাল আমাদের সেগুলো দেখতে হবে—অ্যান্টিপোডিয়ান আর্কাইভ, যেটা আমি নব্বইয়ের দশকে কথাসাহিত্য লেখা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।
বার্লি প্যাচ-এর অর্থের একটি অংশ, যা অনেক পাঠক হয়তো বুঝতে পারেননি, সেটি হলো কীভাবে আমি কথাসাহিত্যের সীমানা পেরিয়ে অন্য একটি জগতে প্রবেশ করেছিলাম—আমার ঘোড়দৌড়ের আর্কাইভের জগতে। সাধারণ, সদাশয় কেউ সেটা দেখে বলবে, ‘ওটা তো কাল্পনিক একটা জগৎ।’ কিন্তু সেই কাল্পনিক জগৎ আমাকে পুরোপুরি অধিকার করে আছে। আজ রাতেও এক-দুই ঘণ্টা আমি ওই জগতে কাজ করব। আমার কাছে ওটার এমন এক বাস্তবতা আছে, যা আমি ব্যাখ্যা করতে পারি না।
আমি যে মানচিত্র তৈরি করেছি, তাতে শত শত শহর আছে, প্রত্যেকটির নামকরণ করা হয়েছে। পাহাড় আর নদীগুলোরও নাম আছে। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে পরিকল্পনা করেছি, যেন প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব কাপ, প্রধান স্প্রিন্ট রেস, এসব ঠিকঠাক হয়। আমার লক্ষ্য ছিল এটাকে যতটা সম্ভব বাস্তবিক করে তোলা—বাস্তবিক অর্থে বলতে এখানে আসল রেসের মতো করে তোলা।
সেখানে মানুষের ছবিও আছে, ম্যাগাজিন বা সংবাদপত্র থেকে কেটে রাখা ছবি—আমি জানি না এরা কারা। কিন্তু অ্যান্টিপোডিয়ান আর্কাইভে, এরা সবাই প্রশিক্ষক, জকি, পুরুষ-নারী, তরুণ-প্রবীণ, সুন্দরী-অসুন্দরী। কখনো কখনো আমি ওদের কথা ভাবতে থাকি, ওদের অর্জনের জন্য গর্ববোধ করি বা সহানুভূতি অনুভব করি।
মাঝেমাঝে, বিশেষত গাড়ি চালানোর সময়, আমি ভাবি—‘লুসি ব্রাবেন্ডার এখন কী করছে? সে একজন প্রশিক্ষক। এখন বিকেল, তাই তার দুই সহকারী হয়তো ঘোড়াগুলোকে মাঠে নিয়ে হাঁটাচ্ছে, ঘাস খাওয়াচ্ছে। আর লুসি ফোনে কথা বলছে, মেরিক্সে কোনো এক নিম্নমানের রেসে ঘোড়া এন্ট্রি করানোর জন্য।’
অথবা বেভারলি জারডিন—তার লম্বা ঘোড়ার মুখ—তার একটা ছবি আছে সেখানে। তার রঙ হলো বেগুনি আর ক্রিম। এখন সে হয়তো মাঠে ঘোড়াগুলোকে দৌড় করাচ্ছে।
ওদেরকে চিন্তা করা কঠিন যে, ওদেরও হয়তো দুশ্চিন্তা বা কষ্ট আছে। কিন্তু আমার বয়স যত বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি, কেউই সেসব থেকে মুক্ত নয়। ওদেরও দুশ্চিন্তা আর সংগ্রাম আছে। হয়তো এখনই, যখন আমি কথা বলছি, ওদের কেউ কেউ ভয়াবহ ডিভোর্স মামলার মধ্যে আছে। কেউ হয়তো তার ছেলের দিকে হাত তোলার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।
তখন আমি থেমে যাই। ভাবি—‘আচ্ছা, এসব আমি কীভাবে যৌক্তিক করতে পারি? এগুলো তো আমি কেবল স্টিকারের নামগুলোকে কল্পনা করে তৈরি করেছি।’
এক্ষেত্রে আমার কাছে একটাই শব্দ মানানসই মনে হয়—ম্যাজিক। এখন, আমি নিজেই নিশ্চিত নই, ম্যাজিক আসলে কী। ভিন্ন মানুষের কাছে এটা ভিন্ন অর্থ বহন করে। কারো কাছে এটা হাতসাফাই, কারো কাছে এটা ভয়াবহ রহস্যময় কিছু। কিন্তু আমার কাছে এটা হলো এমন কিছু যা আগে ছিল না, আর এখন আছে।
লুইস ক্লি
এই জগতটা কি আপনি কখনো কারো সঙ্গে শেয়ার করেছেন?
জেরাল্ড মুরনেন
যদি কেউ এসে বলে, ‘জেরাল্ড, আমাকে শেখাও কিভাবে অ্যান্টিপোডসের এই জগতটা তোমার মৃত্যুর পরও টিকিয়ে রাখা যায়,’ আমি খুবই খুশি হয়ে তাকে শেখাব। কিন্তু এজন্য দুই-তিন সপ্তাহের নির্দেশনা দিতে হবে। তবে আমি নিজে কখনো কাউকে তা জিজ্ঞেস করব না। আমি মরে গেলে এই জগতের বিস্তারও থেমে যাবে। এই গোটা মানসিক ক্ষেত্রটা আমি নিজেই তৈরি করেছি, যেটাতে আর কেউ কখনো প্রবেশ করবে না। আমি এটা গর্ব বা অনুশোচনা নিয়ে বলছি না—এটা কেবল এক বাস্তবতা। নিউ ইডেনের মধ্যভাগে একটি শহর আছে, নাম প্যান্টন ভ্যাল। আমি নিশ্চিত, আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ প্যান্টন ভ্যালের রাস্তাগুলোর চেহারা নিয়ে ভাবেনি। অনেক বছর ধরে আমি এই আর্কাইভ নিয়ে কিছুই লিখিনি, কারো সঙ্গে কথাও বলিনি। সন্ধ্যাবেলা বসে বসে এই কাল্পনিক দেশগুলো নিয়ে কাজ করতাম। আমার স্ত্রী ভেবেছিল আমি বোধহয় আমার ক্রোনোলজিকাল আর্কাইভে নতুন কিছু যোগ করছি। একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ওকে বলব। তখন প্রায় ২০০০ সাল। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার আট-নয় বছর আগের কথা। আমি সবটা বললাম। আর তার একমাত্র প্রতিক্রিয়া ছিল—‘তুমি এই সময়টা কোথায় পেলে?’



