ইমান, আনুগত্য আর বুদ্ধিমত্তা
আমরা যদি নিজের চোখ বেঁধে পথ চলি, তবে পথকে দোষারোপ করে কী লাভ?
ধর্মের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধির সম্পর্কটা আমার কাছে বরাবরই একটু মজার ঠেকেছে। মজার বলছি বলে কেউ যেন মনে না করেন ব্যাপারটা হাসির। আমাদের দেশে অনেক গভীর সমস্যারই চেহারা এমন যে, একটু দূর থেকে দেখলে হাসি পায়, কাছে গেলে ভয় লাগে। যেমন পুরোনো ঢাকার এক গাড়োয়ানকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, “মিঞা, এই রাস্তা কই যায়?” গাড়োয়ান বলেছিল, “রাস্তা কইও যায় না কত্তা, রাস্তা এইহানেই থাকে, আপনে যান।” ধর্মের ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে আমার ওই গাড়োয়ানের কথা মনে পড়ে। মানুষ বলে, “আমার ধর্ম আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?” আমি ভাবি, ধর্ম কোথাও যাবে না ভাই, যেতে হবে আপনাকেই। প্রশ্ন হল, নিজের পায়ে যাবেন, না কারও কাঁধে চড়ে।
ইসলামে আল্লাহ আর মানুষের সম্পর্ক বোঝাতে দুটি শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ, আল্লাহ্ এবং বান্দা। আল্লাহ্ হলেন প্রভু, পালনকর্তা, সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। বান্দা হলেন মানুষ, যিনি তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। মুসলমানের ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের ভেতর এই আনুগত্যের ধারণা গভীরভাবে বসানো। নামাজে দাঁড়ানো থেকে রোজা রাখা, হালাল-হারাম, দৈনন্দিন আচরণ থেকে নৈতিক বিধি, সর্বত্রই একটি কথা ফিরে ফিরে আসে: আল্লাহর হুকুম মানতে হবে।
এখানেই আমার প্রশ্ন শুরু। আনুগত্য যখন বিশ্বাসের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের স্বাধীন বিচারবুদ্ধির জায়গাটা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে দেওয়া যায় না। দিলে বড় আরাম হত। আমাদের দেশে সব কঠিন সমস্যার এক লাইনের উত্তর খুব জনপ্রিয়। “সব ধর্মই শান্তির।” ব্যস। “সব সমস্যা শিক্ষার অভাবে।” ব্যস। “দেশে আইনের শাসন দরকার।” এটাও ব্যস। তারপর সবাই চা খেয়ে বাড়ি যায়।
মানুষের চিন্তার ইতিহাস কিন্তু এত ভদ্র নয়। একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ একই সঙ্গে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিকিৎসক, কবি, স্থপতি কিংবা গণিতজ্ঞ হতে পারেন। ইতিহাসে এমন বহু মুসলমান ছিলেন। আল-খোয়ারিজমি ছিলেন, ইবন আল-হাইসম ছিলেন, ইবন সিনা ছিলেন, আল-বিরুনি ছিলেন, ইবন রুশদ ছিলেন। কাজেই “মুসলমান কখনও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না” এই রকম দাবি ঐতিহাসিকভাবে টেকে না। মুসলমান সমাজ বহু যুগে গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, স্থাপত্য এবং অন্যান্য বিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।
আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
কোন ধরনের ধর্মচর্চা স্বাধীন চিন্তার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
এই প্রশ্ন করলে আমাদের সামনে ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হয়। যে ধর্মীয় পরিবেশে বলা হয়, কিছু প্রশ্ন করা যাবে, কিছু প্রশ্ন করা যাবে না, সেখানে বুদ্ধি আর শাস্ত্রের মধ্যে অদৃশ্য একটা বেড়া তৈরি হয়। মানুষকে বলা হয়, পৃথিবী সম্পর্কে যত খুশি জানো, কিন্তু নির্দিষ্ট কয়েকটি মূল ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না। বিজ্ঞান পড়তে পারো, প্রযুক্তি বানাতে পারো, রকেট পাঠাতে পারো, সফটওয়্যার লিখতে পারো, কিন্তু বিশ্বাসের ভিত্তির সামনে এসে মাথা নিচু করবে।
ব্যাপারটা অনেকটা সেই পুরোনো জমিদারবাড়ির মতো। বাড়ির সব ঘরে যেতে পারো, কেবল দোতলার দক্ষিণের ঘরটা খুলবে না।
ছোটবেলায় হলে আমি নিশ্চয়ই সবার আগে ওই দরজাই খুলতাম। আমাকে নিষেধ করলেই আমার কৌতূহল বেড়ে যেত। বাবা বলতেন, “এই সুইচটা কেউ জ্বালাবে না।” পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি জ্বালিয়ে দিতাম। নিষেধাজ্ঞা আর মানুষের কৌতূহলের সম্পর্ক বরাবরই শত্রুতার।
চিন্তারও একই দশা। আপনি যদি বলেন, “এই বিষয়ে প্রশ্ন কোরো না,” ঠিক সেই জায়গাতেই দর্শনের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা।
এখন সমস্যা হল, কঠোর ধর্মীয় শাস্ত্রনিষ্ঠা সেই প্রশ্নকে অনেক সময় নৈতিক অপরাধে পরিণত করে। সন্দেহ তখন জ্ঞানের নয়, হয়ে যায় বিশ্বাসের দুর্বলতা। প্রশ্ন হয়ে যায় বিদ্রোহ। ব্যাখ্যার পরিবর্তন হয়ে যায় বিচ্যুতি। বিজ্ঞান পাঠ হয়ে যায় বিপজ্জনক। ফলে মানুষ দুই ধরনের জীবন যাপন করতে শেখে।
একদিকে স্মার্টফোন, স্যাটেলাইট, অ্যান্টিবায়োটিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক ব্যাংকিং, জেনেটিক পরীক্ষা, বিমানের টিকিট, ডিজিটাল ঘড়ি। অন্যদিকে সপ্তম শতকের সামাজিক আচরণ নিয়ে আক্ষরিক আনুগত্য।
সকালবেলা একজন মানুষ আইফোন দিয়ে আবহাওয়া দেখে, গুগল ম্যাপে অফিসে যায়, অফিসে ক্লাউড কম্পিউটিং করে, দুপুরে ডায়বেটিসের ওষুধ খায়, রাতে এআই দিয়ে রিপোর্ট লেখে, তারপর কোনো ধর্মীয় প্রশ্ন উঠলে বলে, “আমাকে যুক্তি দেখাতে আসবেন না।” আমি তখন মনে মনে বলি, ভাই, যুক্তিটা কি অফিসেই রেখে এসেছেন?
এর মধ্যে মানুষের একটা আশ্চর্য ক্ষমতা কাজ করে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় compartmentalization বলা যায়। বাংলায় বললে, মগজের ঘর ভাগ করে রাখা। এক ঘরে বিজ্ঞান, আরেক ঘরে বিশ্বাস। দুই ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ।
একজন সার্জন অপারেশন থিয়েটারে কারণ-ফল, প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ, অ্যানাটমি, পরিসংখ্যান সব মেনে চলতে পারেন। কিন্তু ধর্মীয় প্রসঙ্গে এসে এমন কোনো ব্যাখ্যাও মেনে নিতে পারেন যার জন্য একই ধরনের প্রমাণ তিনি হাসপাতালের ভেতরে কখনো গ্রহণ করতেন না।
এই দ্বৈত মানদণ্ড কেবল মুসলমানদের মধ্যে দেখা যায়, এমন কথা বলা ভুল হবে। প্রায় সব সংগঠিত ধর্মেই এর নজির আছে। খ্রিস্টান মৌলবাদীর সৃষ্টিতত্ত্ব, হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীর পৌরাণিক বিজ্ঞান, ইহুদি অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের কঠোর বিধান, সব জায়গাতেই মানুষের মন একই খেলা খেলতে পারে। মানুষ আগে বিশ্বাস করে, পরে সেই বিশ্বাসের জন্য যুক্তি সংগ্রহ করে।
তবে মুসলিম সমাজের নির্দিষ্ট সমস্যাটি আলাদা করে আলোচনা করা দরকার, কারণ ইসলামি আইন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, দৈনন্দিন আচরণ এবং আখিরাতের ধারণা বহু সমাজে এখনও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এখানে “হুকুম” শব্দটার গুরুত্ব অনেক।
নামাজ কীভাবে পড়বেন, রোজা কখন শুরু করবেন, কোন হাতে খাবেন, কী খাওয়া যাবে, কী যাবে না, কীভাবে শরীর পরিষ্কার করবেন, যৌন আচরণ কেমন হবে, উত্তরাধিকার কীভাবে ভাগ হবে, বিয়ে কীভাবে হবে, বিবাহবিচ্ছেদ কীভাবে হবে, মৃতদেহ কীভাবে দাফন হবে, বহু বিষয়ে বিধান আছে।
এই বিধানের একটা অংশ স্বাস্থ্যবিধি, একটা অংশ সামাজিক নিয়ম, একটা অংশ আচার, একটা অংশ প্রতীক।
সমস্যা শুরু হয় যখন প্রতীক আর বাস্তবতার পার্থক্য মুছে যায়। ধরা যাক, অজু।
ধর্মীয় পবিত্রতা ও স্বাস্থ্যগত পরিচ্ছন্নতা; এই দুইয়ের মূল ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অজুর মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় পবিত্রতা অর্জন করা। আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞানের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেললেই নানা গোলমাল ও বিপত্তি দেখা দেয়। অজু করার মাধ্যমেই কেউ পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয়ে যান না, আবার অজু না করলেই একজন মানুষ অপরিচ্ছন্ন হয়ে যান; বিজ্ঞান এমন দাবিও করে না।
বিষয়টি বুঝতে দুটি সাধারণ উদাহরণ বিবেচনা করা যাক:
একজন ক্ষেতমজুর দিনভর কাদা, ধুলাবালি, ঘাম ও সারের মধ্যে কাজ করার পর শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ ধোয়ার মাধ্যমে ধর্মীয়ভাবে অজু সম্পন্ন করতে পারেন।
অন্যদিকে, একজন ব্যক্তি গোসল সেরে একদম পরিষ্কার পোশাক পরে ঘরের ভেতর বসে থাকলেও নামাজের পূর্বে তাঁর আবার অজুর প্রয়োজন হয়।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, বায়ুত্যাগ করলে অজু ভঙ্গ হওয়ার নিয়ম রয়েছে। পানি দিয়ে ধৌত করলে তো আর বাতাসের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায় না। ফলে অজু কোনো বৈজ্ঞানিক উপায়ে দুর্গন্ধ পরিচ্ছন্ন করার প্রক্রিয়া নয়। মূলত এটি প্রতীকী বিশুদ্ধতা ও একটি ধর্মীয় আত্মিক অবস্থার পুনঃস্থাপন।
ধর্মীয় আচার ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের এই মৌলিক পার্থক্যটুকু অনুধাবন করতে পারলে অযাচিত বিতর্ক ও ঝামেলা অনেকটাই কমে আসে।
তবে আক্ষরিক ধর্মানুশীলনের মূল জটিলতা হলো, অনেকে রূপক বা প্রতীককে বাস্তবের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা মনে করেন। এর ফলে যখনই কোনো জিজ্ঞাসা বা অনুসন্ধিৎসা জাগে, উত্তরগুলো বাঁধাধরা ছকে আটকে যায়:
প্রশ্ন: “কেন?” — উত্তর: “হুকুম।”
প্রশ্ন: “কিন্তু মূল কারণটা কী?” — উত্তর: “আল্লাহই ভালো জানেন।”
প্রশ্ন: “কালের আবর্তনে নিয়মের প্রয়োগ কি বদলাতে পারে না?” — উত্তর: “যা নির্দিষ্ট করা আছে, সেটাই চূড়ান্ত।”
চিন্তাশীলতার জন্য এই ধরনের মনোভাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা যেকোনো জ্ঞানচর্চার মৌলিক ভিত্তিই হলো “কেন” প্রশ্নটি। বিজ্ঞানী ও শিশু; উভয়ের কাছেই সবচেয়ে পছন্দের শব্দ হলো এই “কেন”।
একটি শিশু কত সহজ ও মৌলিক প্রশ্ন তোলে:
আকাশ কেন নীল দেখায়?
পানি কেন নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে?
মানুষের কেন মৃত্যু হয়?
সূর্য কেন পূর্বাকাশে ওঠে?
বয়স্করা কিছুদিন কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করলেও একসময় অধৈর্য হয়ে বলে ওঠেন, “এত প্রশ্ন করার দরকার কী?”
আমার মনে হয়, মানবসভ্যতার অগ্রগতির অর্ধেকটাই সাধিত হয়েছে সেসব শিশুর বদৌলতে, যারা ধমক খেয়েও প্রশ্ন করা থামায়নি ।
ধর্মীয় মৌলবাদ মূলত প্রশ্ন করার এই সুযোগটাকেই বন্ধ করে দিতে চায় । তবে এখানে “মৌলবাদী” আর “মুসলমান” ধারণাদুটোকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না । একজন মুসলমান গভীর বিশ্বাসী হয়েও শাস্ত্রকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অনুধাবন করতে পারেন ; অন্যদিকে কেউ ধর্মকে একটি আক্ষরিক ও অপরিবর্তনীয় বিধান হিসেবেও দেখতে পারেন । মূল জটিলতা সৃষ্টি হয় এই দ্বিতীয় অবস্থানটির কারণে ।
প্রকৃত জ্ঞানের আসল পরিচয় হলো নিজেকে সংশোধন করার সক্ষমতায় । আজকে যা সত্য বলে মনে হচ্ছে, নতুন তথ্য বা প্রমাণের ভিত্তিতে কাল তা পরিবর্তিত হতে পারে । যেমন, নিউটনের তত্ত্বের পর এলেন আইনস্টাইন, আবার তার পর বিস্তার লাভ করল কোয়ান্টাম তত্ত্ব । চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস দেখলেও দেখা যায়, একসময় রক্তক্ষরণ ঘটানোকে নিরাময়ের উপায় মনে করা হতো; পরবর্তীতে বোঝা গেল, এতে সুস্থ হওয়ার বদলে মানুষ আরও দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে । বিজ্ঞান এভাবেই নিজের ভুল স্বীকার করে সামনের দিকে এগিয়ে যায় ।
কিন্তু ধর্মীয় শাস্ত্র যদি শুরুতেই তার মৌলিক বক্তব্যকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করে, তবে সেখানে স্বসংশোধনের কোনো সুযোগ বা কাঠামো থাকে না । ঠিক এই বিন্দুতেই মানব বুদ্ধিমত্তার সাথে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার সংঘাত সৃষ্টি হয় ।
মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চিন্তার এই দ্বন্দ্ব মোটেও নতুন নয়। একসময় বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা, বুখারা ও সমরকন্দের মতো কেন্দ্রগুলোতে মুক্ত জ্ঞানচর্চার এক অভূতপূর্ব পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। সেই যুগে গ্রিক দর্শনের অনুবাদের পাশাপাশি ভারতীয় গণিত ও পারস্যের সমৃদ্ধ জ্ঞান সংগৃহীত হয়েছিল, এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। এই বিকাশ কতখানি গভীর ছিল, তার প্রমাণ মেলে মনীষীদের দিকে তাকালে; আল-খোয়ারিজমির নাম থেকেই এসেছে “algorithm” শব্দটি, ইবন আল-হাইসম আলোকবিজ্ঞানে আনেন পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি, ইবন সিনার চিকিৎসাবিষয়ক মৌলিক কাজ শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত হয়েছে, আর ইবন রুশদের অ্যারিস্টটলীয় ব্যাখ্যা ইউরোপীয় চিন্তাধারাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
অতএব, ইতিহাস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মুসলমানরা বুদ্ধি খাটাতে অক্ষম’ এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরঞ্চ ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যে সমাজে প্রশ্ন তোলার স্বাধীন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, সেখানে মুসলমানরাও নতুন জ্ঞানের জন্ম দিয়েছে; পক্ষান্তরে, যেখানে প্রশ্নের মুখে ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও পাহারা বসানো হয়েছে, সেখানেই জ্ঞানচর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে সংকুচিত হয়েছে।
বিষয়টি বোঝাতে আমাদের পাড়ার এক ভদ্রলোকের কথা মনে করা যেতে পারে, যাঁর কাছে সব বিষয়েই যেন তৈরি উত্তর থাকত। রাজনীতি, ধর্ম কিংবা ডাক্তারি; যে বিষয়ই উত্থাপিত হোক না কেন, তিনি সদর্প উত্তর দিতেন। একদিন কৌতূহলী হয়ে কেউ যখন তাঁকে প্রশ্ন করল, “কাকা, আপনার এত জ্ঞানের উৎস কী?” তখন তিনি নির্দ্বিধায় জবাব দিলেন, “সব তো বইতেই লেখা রয়েছে।” লোকটি পুনরায় জানতে চাইল, “নির্দিষ্ট কোন বইয়ের কথা বলছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “বই আবার আলাদা কী? বই মানেই তো বই!”
এই ধরনের অন্ধ আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যে ব্যক্তি বা সমাজ ধরে নেয় যে তার কাছেই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত উত্তর রয়েছে, সে আর নতুন কোনো অনুসন্ধানে ব্রতী হয় না। যে সভ্যতা বিশ্বাস করে তার সুবর্ণ সময় কেবল অতীতেই রয়ে গেছে, তার দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ ছেড়ে পেছনের দিকেই আটকে থাকে।
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট মূলত দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায়। বর্তমান সমাজগুলোতে ভবিষ্যৎ গড়ার দূরদর্শিতার চেয়ে অতীতকে ফিরিয়ে আনার ব্যাকুলতাই বেশি দেখা যায়; যেখানে প্রতিনিয়ত “সোনালি যুগ”, “সালাফ”, “প্রথম যুগ” কিংবা “খাঁটি ইসলাম”-এর দোহাই দেওয়া হয়।
অথচ ইতিহাসকে পেছন দিকে ঘুরিয়ে কোনো সভ্যতা সামনের দিকে এগোতে পারে না।
সপ্তম শতকের নৈতিক আদর্শ থেকে শিক্ষণীয় বিষয় গ্রহণ করা যেতেই পারে। তবে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থান, মানবাধিকার, শিক্ষা, প্রযুক্তি কিংবা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে যদি জোড়াতালি দিয়ে সেই সপ্তম শতকের সামাজিক খাঁচে বন্দি করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে হাতির গায়ে শিশুর পোশাক পরানোর মতো এক হাস্যকর প্রচেষ্টা।
ফলাফল; পোশাকটি যেমন ছিঁড়বে, হাতিটিও তেমনি চরম অস্বস্তিতে পড়বে।
এই জটিল মানসিকতার গোড়ায় জড়িয়ে আছে আমাদের গলদপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা। বিশেষ করে মাস্রাসা শিক্ষা।
যেখানে মুখস্থবিদ্যাকেই জ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হয়, শিক্ষকের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ বা প্রশ্ন করাকে অশিষ্টতা ধরা হয় এবং ধর্মীয় আধিপত্যকে প্রশ্নাতীত মনে করা হয়, সেখানে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার মেধা বিকাশ লাভ করতে পারে না।
দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ধর্ম ছাড়াও এই চিন্তার জড়তা সর্বত্র বিদ্যমান। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক যখন বলে দেন “এটাই শেষ কথা”, আর শিক্ষার্থীর “কেন?” প্রশ্নের উত্তরে শুনতে হয় “বেশি পণ্ডিত হয়েছ?”, তখন সেখানে অনুসন্ধিৎসা মারা পড়ে।
এই শিক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছাত্র হয়তো প্রস্তুত করা সম্ভব, কিন্তু কোনো প্রকৃত গবেষক তৈরি করা অসম্ভব।
কারণ, গবেষক স্বভাবগতভাবেই কিছুটা প্রথাভাঙা ও প্রশ্নমুখর।
তার মনস্তত্ত্ব হবে এমন; নিউটন, অ্যারিস্টটল, প্রখ্যাত ইমাম, সম্মানিত অধ্যাপক, কিংবা আমি নিজে গতকাল কী বলেছিলাম তা মুখ্য নয়; মূল বিষয় হলো; এর পেছনে যুক্তি ও প্রমাণ কোথায়?
প্রমাণ খোঁজার এই অদম্য প্রশ্নই বস্তুত মানব সভ্যতার অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি।
প্রযুক্তি ব্যবহার করা আর নতুন প্রযুক্তি সৃষ্টি করা; এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কেবল সর্বাধুনিক স্মার্টফোন কেনা, সুবিশাল বিমানবন্দর তৈরি করা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা স্থাপন কিংবা বাইরের প্রকৌশলী দিয়ে নগর গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি সমাজ হয়তো প্রযুক্তিনির্ভর বা উন্নত হতে পারে। কিন্তু নতুন ধারণা, মৌলিক বিজ্ঞান, উদ্ভাবনী তত্ত্ব, শিল্প কিংবা গভীর গবেষণার বিকাশের জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ।
সেই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যা যা অত্যন্ত জরুরি:
ব্যর্থতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার অধিকার।
প্রশ্ন তোলার ও মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা।
যেকোনো কর্তৃপক্ষ কিংবা ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার সাহস।
রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ।
এই চর্চাগুলো আমাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া উচিত:
শিক্ষার্থী নির্দ্বিধায় শিক্ষককে বলতে পারবে, “স্যার, আপনার যুক্তিটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।”
সন্তান পিতাকে বিনয়ের সঙ্গে বলতে পারবে, “আপনার সিদ্ধান্তেও ভুল থাকতে পারে।”
শ্রোতা আলেম বা ধর্মীয় শিক্ষককে প্রশ্ন করতে পারবে, “এই ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক ভিত্তি কতটুকু?”
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদেরও নিঃসংকোচে স্বীকার করার স্বাধীনতা থাকতে হবে, “বিষয়টি আমার জানা নেই।”
“আমি জানি না”—এই বিনম্র স্বীকারোক্তিটি মানব সভ্যতার বিকাশে এক অনন্য সম্পদ। অথচ ধর্মীয় বা প্রথাগত কর্তৃত্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে এই কথাটি বলা অত্যন্ত কঠিন। কারণ সাধারণ অনুসারীরা সব সময় সুনির্দিষ্ট ও সহজ উত্তর প্রত্যাশা করে। কোনো নেতা বা ব্যক্তিত্ব যদি বলেন, “বিষয়টি জটিল”, তবে সমর্থকেরা হতাশ হয়ে পড়ে।
বাস্তবতায়, জটিল ও বহুমুখী পৃথিবীতে মানুষ খুব সহজ ব্যাখ্যা পছন্দ করে। যেমন—
সব সমস্যার মূলে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব।
সকল সংকটের কারণ ধর্মহীনতা।
সব ঝামেলার জন্য দায়ী আমেরিকা, ইহুদি কিংবা মুসলমান সম্প্রদায়।
এমন একপেশে ও সরলীকৃত বক্তব্যের সুবিধা একটাই; এতে গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয় না। তবে বড় অসুবিধা হলো, এসব চটকদার উত্তর বা ধারণার প্রায় প্রতিটিই ভুল ও ভিত্তিহীন।
মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক অনগ্রসরতার নেপথ্যে কেবল ধর্মকে দায়ী করা ভুল। এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, স্বৈরাচার, যুদ্ধ, সম্পদের অসমান বণ্টন, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থার গলদ, গবেষণায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং ক্রমাগত মেধাপাচার। অধিকন্তু, অঞ্চলভেদে তেলের অর্থনীতি, সামরিক শাসন, রাজতন্ত্র কিংবা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ধর্ম কখনো সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে, কখনো প্রতিরোধের মাধ্যম হয়েছে, আবার কখনো স্রেফ ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সুতরাং, দুইশো কোটিরও বেশি মানুষকে ঢালাওভাবে “অনুভূতিহীন প্রাণী” হিসেবে আখ্যা দেওয়া কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ নয়; তা কেবল গালাগাল মাত্র। এ ধরনের গালাগাল শুনে হয়তো কেউ বিনোদন পেতে পারে, কিন্তু কোনো সমস্যা অনুধাবনে তা বিন্দুমাত্র সহায়তা করে না।
ব্যক্তিগতভাবে ধর্মবিশ্বাসীর অস্তিত্ব নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত বা আপত্তি নেই। একজন মানুষ নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করুন, রোজা রাখুন, কোরআন তেলাওয়াত করুন কিংবা হজ পালন করুন; এতে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে আপত্তির কিছু দেখি না।
তবে আমার সুনির্দিষ্ট আপত্তি রয়েছে সেইসব জায়গায়, যেখানে:
অন্ধ বিশ্বাস সকল প্রশ্ন ও অনুসন্ধিৎসার পথ রুদ্ধ করে দেয়।
ধর্মশাস্ত্রের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে মানুষের মৌলিক অস্তিত্বের চেয়েও বড় করে দেখা হয়।
যেকোনো প্রকার সংশয় বা সন্দেহ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
অতীতের কোনো নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থাকে জোরপূর্বক ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রূপরেখা বানানোর চেষ্টা চলে।
বিতর্ক কিংবা আলোচনার সৃষ্টি হয় তখনই, যখন দাবি করা হয়; কোনো ধারণা কেবল ধর্মগ্রন্থে বিদ্যমান বলেই তা প্রশ্নের অতীত।
মানুষকে যদি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়েই সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তবে সেই বুদ্ধির চর্চা করা কীভাবে অবাধ্যতা হতে পারে? এই মৌলিক প্রশ্নটি ধর্মতাত্ত্বিকদের ভাবনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
আমি আর একটি সহজ প্রশ্ন তুলছি।
যদি একজন সন্তান তার বাবার সব নির্দেশ অন্ধভাবে মেনে চলে এবং নিজস্ব কোনো ভাবনা প্রকাশ না করে, তবে কি তাকে একজন আদর্শ প্রাপ্তবয়স্ক বলা যায়?
তেমনি, অফিসে কোনো কর্মী যদি বসের প্রতিটা কথা নির্দ্বিধায় মেনে নেয় এবং পরিকল্পনার ত্রুটি ধরতে দিতে না চায়, তবে কি তাকে সেরা প্রকৌশলীর স্বীকৃতি দেওয়া চলে?
কিংবা একজন চিকিৎসক যদি নতুন কোনো গবেষণা না পর্যবেক্ষণ করে শুধু পুরোনো বইয়ের চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করে যান, তবে আমরা কি তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারব?
তবে মুক্তচিন্তা ও মানুষের ভাবনার জায়গায় এই নীতি আলাদা হবে কেন?
প্রকৃতপক্ষে, প্রথাভাঙা মানুষের হাত ধরেই মানবসভ্যতা সামনের দিকে এগিয়েছে।
পরিবর্তন এনেছে তারাই, যারা ভিন্নভাবে চিন্তা করার সাহস দেখিয়েছে:
যে ছেলেটি স্বচক্ষে পরখ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যে মেয়েটি প্রচলিত অন্যায্য নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
যে বিজ্ঞানী পুরোনো তত্ত্বকে অসম্পূর্ণ মনে করে নতুন ব্যাখ্যার সন্ধানে নেমেছেন।
যে দার্শনিক ঈশ্বর ও পরম ধারণাকেও প্রশ্ন ও পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
এবং যে লেখক গল্পকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সবাই যদি বাধ্য আর সুসংহত হয়ে থাকত, তবে হয়তো পৃথিবীটা অত্যন্ত শান্ত হতো। কিন্তু সেই শান্তিতে আজও আমাদের আঁধার গুহাতেই বাস করতে হতো। কোনো এক দুঃসাহসী মানুষ আগুন নিয়ে পরীক্ষা চালানোর ঝুঁকি নিয়েছিল বলেই সভ্যতার পথ চলা শুরু হয়েছিল!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন এডিটিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নিউরোসায়েন্স ও মহাকাশ প্রযুক্তির এই যুগে আমরা প্রবেশ করেছি। আগামী আধাশতকে মানবজাতি এমন সব অভিনব জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে, যেগুলোর উত্তর মধ্যযুগীয় ফিকহ শাস্ত্রে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এই নতুন বাস্তবতা মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, সুস্থ সংশয়বাদ, যুগোপযোগী ব্যাখ্যা ও সাহসী সিদ্ধান্ত।
এই পথচলায় হয়তো ধর্ম ও বিশ্বাসের অস্তিত্ব বজায় থাকবে; তাতে কোনো বাধা নেই। তবে কোনো অবস্থাতেই প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে রুদ্ধ করা যাবে না।
মনে রাখা জরুরি, অগ্রগতি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী কিংবা সভ্যতার একচেটিয়া অধিকার নয়। অগ্রগতি কেবল সেখানেই সম্ভব, যেখানে মানুষ ভুল থেকে শেখার সুযোগ পায়, সংশয় প্রকাশ ও প্রশ্ন তোলার সাহস রাখে, প্রমাণের সামনে শ্রদ্ধাশীল হয় এবং নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পুরোনো ধ্যানধারণাকে কুণ্ঠাহীনভাবে পরীক্ষা করে।
বিষয়টি স্মরণে এনে দেয় ঢাকার সেই গাড়োয়ানের চিরন্তন সত্যটি; পথ নিজে কোথাও ধাবিত হয় না, মানুষই পথ অতিক্রম করে। এখন আমরা যদি নিজের চোখ বেঁধে পথ চলি, তবে পথকে দোষারোপ করে কী লাভ?


