I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
জেমস জয়েসের একটা চিঠি পড়ে আমার মনে হয়েছে, পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকদের নিয়ে আমরা যতই মাতামাতি করি, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ঘাঁটলে এমন সব কাণ্ডকারখানা বেরোয় যে হাসব না শ্রদ্ধা করব, সেটা ঠিক করা মুশকিল।
এই যেমন জয়েস। যে ভদ্রলোক ইংরেজি ভাষার প্রচলিত ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, আখ্যানরীতি সবকিছু নিয়ে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন যে তাঁর ইউলিসিস পড়তে বসে অনেক বিদ্বান লোকও মাঝেমধ্যে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন, সেই মানুষটাই একদিন তাঁর পিসিমাকে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন, একটা সাধারণ মানুষ বাড়ির রেলিং টপকে লাফ দিলে তার হাত-পা অক্ষত থাকবে তো?
ভাবুন একবার ব্যাপারটা!
একদিকে হোমারের ওডিসি, গ্রিক পুরাণ, পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাস, মানুষের চেতনার জটিলতা, ভাষার অসংখ্য স্তর। আর অন্যদিকে একটা বাড়ির রেলিং। সেই রেলিংয়ের উচ্চতা কত, একজন মানুষের পা মাটি থেকে কতখানি ওপরে থাকবে, লাফ দিলে হাঁটু ভাঙবে কি না, এসব নিয়ে লেখকের প্রাণান্তকর দুশ্চিন্তা।
যেন বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে। পাঁচশো লোকের খাওয়াদাওয়া, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা, বাজনাদার সব ঠিকঠাক। হঠাৎ বরপক্ষের একজন এসে বললেন, ‘আচ্ছা, বরটা দরজা দিয়ে ঢুকতে পারবে তো?’
এদিকে জয়েসের বর হচ্ছেন লিওপোল্ড ব্লুম। তাঁকে ঘরে ঢোকাতেই হবে। কারণ তাঁর ঘরে ফেরার ওপর নির্ভর করছে আধুনিক সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্যিক যাত্রার সমাপ্তি।
ঘটনাটা ১৯২১ সালের ২ নভেম্বরের।
জয়েস তখন প্যারিসে। জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড ছেড়েছেন বহু বছর আগে। অথচ তাঁর লেখার মধ্যে ডাবলিন শহর এমনভাবে বেঁচে আছে যেন তিনি প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সেখানকার রাস্তায় হাঁটতে বেরোন। কোন রাস্তার পাশে কোন দোকান, কোন বাড়ির সামনে কয়টা সিঁড়ি, কোথায় রেলিং, কোথায় নর্দমা, কোথায় মানুষ দাঁড়িয়ে গল্প করে, এসব তাঁর কাছে সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্যারিসে বসে তিনি লিখছেন ডাবলিনের মানুষের জীবন। আর সেই জীবনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাঁর দরকার ডাবলিনের বাস্তব ভূগোল।
কাজেই আত্মীয়া জোসেফিন মারেকে চিঠি লিখলেন।
জোসেফিন সম্পর্কে একটু বলা দরকার। তিনি ছিলেন জয়েসের মায়ের ভাই উইলিয়াম মারের স্ত্রী। জয়েসের পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য মানুষ। লেখক যখন আয়ারল্যান্ড থেকে দূরে, তখন ডাবলিনের খুঁটিনাটি খবর সংগ্রহের জন্য এই জোসেফিনই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান ভরসা।
জয়েসের চিঠির বক্তব্যটা বাংলায় করলে মোটামুটি এইরকম দাঁড়ায়:
পিসিমা, একটা কথা জানতে চাই। ৭ নম্বর একল্স স্ট্রিটের বাড়ির সামনের নিচু অংশের রেলিং টপকে একজন সাধারণ গড়নের মানুষ কি নিরাপদে নিচে নামতে পারবে? ধরুন, রেলিং ধরে শরীরটা যতটা সম্ভব নামিয়ে এনে পা মাটি থেকে দুই কিংবা তিন ফুট ওপরে থাকতে ছেড়ে দিল। তাতে কি আঘাত না পেয়ে মাটিতে নামা সম্ভব? আমি নিজে একজনকে এমন করতে দেখেছি, তবে লোকটার চেহারা ছিল বেশ অ্যাথলেটিক।
আরও জানালেন, একটি অনুচ্ছেদের ভাষা ঠিক করার জন্য তাঁর এই তথ্য বিস্তারিত জানা দরকার।
এই শেষ কথাটাই লক্ষ করার মতো।
একটা প্যারাগ্রাফ লিখবেন। তার জন্য আটলান্টিকের ওপারের আত্মীয়াকে চিঠি লিখে রেলিংয়ের মাপজোক জানতে হচ্ছে।
আমাদের অনেক লেখক হলে কী করতেন জানি না। হয়তো লিখতেন, ‘ব্লুম অনায়াসে রেলিং টপকে বাড়িতে প্রবেশ করল।’ ব্যস, কাজ শেষ। পাঠক তখন নিজের কল্পনাশক্তি দিয়ে বাকি ব্যাপারটা সামলে নিতেন। ব্লুমের হাঁটু ভাঙলে ভাঙুক, লেখকের কী!
জয়েসের কাছে ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না।
তিনি জানতেন, তাঁর চরিত্রের শরীর আছে। তার ওজন আছে। পেশি আছে, হাড় আছে, বয়স আছে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও আছে। সাহিত্যিক কল্পনাশক্তির খাতিরে মাধ্যাকর্ষণ সাময়িক ছুটি নেবে, এমন নিশ্চয়তা নিউটন দিয়ে যাননি।
আর ব্লুম তো কোনও সার্কাসের ট্রাপিজ-শিল্পী নন। তিনি একজন সাধারণ মধ্যবয়স্ক মানুষ। সারাদিন ডাবলিন শহরে ঘুরে বেড়ানোর পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরছেন। তাঁর শরীরে ক্লান্তি আছে, মাথায় দুশ্চিন্তা আছে। এই অবস্থায় বাড়ির রেলিং টপকাতে গেলে তাঁর কী হতে পারে, সেটার হিসাব লেখককে রাখতেই হবে।
এবার আসল উপন্যাসের ঘটনায় আসি।
ইউলিসিস-এর মূল কাহিনি ১৯০৪ সালের ১৬ জুনের ডাবলিন শহরকে ঘিরে। দিনটি পরবর্তী সময়ে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে ‘ব্লুমসডে’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
এই একদিনে জয়েস আমাদের নিয়ে যান মানুষের জীবনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্যে। প্রেম, কামনা, মৃত্যু, ধর্ম, রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, বিজ্ঞাপন, খাদ্য, শরীর, স্মৃতি, বিশ্বাসঘাতকতা, একাকিত্ব। একটা মানুষের সাধারণ দিনের মধ্যে কত রকমের অভিজ্ঞতা জমা হতে পারে, জয়েস সেসব তুলে ধরেছেন।
সপ্তদশ পর্বের নাম ‘ইথাকা’।
গ্রিক পুরাণে ইথাকা হচ্ছে ওডিসিউসের স্বদেশ, দীর্ঘ যাত্রা শেষে যেখানে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘটে। জয়েস সেই মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনকে স্থানান্তরিত করেছেন ডাবলিনের এক সাধারণ বাড়িতে।
লিওপোল্ড ব্লুমের বাড়ি ৭ নম্বর একল্স স্ট্রিট।
রাত পেরিয়ে ১৭ জুনের প্রথম প্রহর। ব্লুম সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তরুণ স্টিফেন ডেডালাসকে। সারাদিনের নানা অভিজ্ঞতা শেষে দুজন বাড়ির সামনে উপস্থিত।
এবার পকেটে হাত দিয়ে ব্লুমের মনে পড়ল, বাড়ির চাবিটা সঙ্গে নেই।
চাবি পড়ে আছে আগে পরা অন্য ট্রাউজার্সের পকেটে।
জয়েস এখানে ব্লুমের বিরক্তির কারণটাও হিসাব করে জানিয়েছেন। লোকটা দুবার নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছিল চাবি নিতে হবে। তারপরেও ভুলে গেছে।
মানুষের জীবনে এই ধরনের ঘটনা কতবার ঘটে বলুন তো! বাজারে যাওয়ার আগে স্ত্রী তিনবার বলে দিলেন, ‘আলু আনবে, আলু।’ আপনি বাজার থেকে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, এমনকি দোকানদারের সঙ্গে আধঘণ্টা রাজনৈতিক আলোচনা সেরে বাড়ি ফিরলেন। আলুটা আর কেনা হল না।
তখন যে বিরক্তি তৈরি হয়, তার অর্ধেক নিজের ওপর, বাকি অর্ধেক পৃথিবীর সমস্ত আলু উৎপাদনকারীর ওপর।
ব্লুমের অবস্থাও খানিকটা সেইরকম।
এদিকে সঙ্গে অতিথি। গভীর রাত। নিজের বাড়িতে ঢোকার উপায় নেই।
এখন কী করা যায়?
উপন্যাসে জয়েস প্রশ্ন তুললেন, দরজায় কড়া নাড়া হবে, নাকি অন্য কোনও উপায়ে ঢোকা হবে?
ব্লুম সিদ্ধান্ত নিলেন রেলিং টপকানোর।
বাড়ির সামনের নিচু দেয়ালে পা রাখলেন। রেলিংয়ের ওপর দিয়ে শরীর নিয়ে গেলেন। টুপিটা মাথায় চেপে ধরলেন। তারপর লোহার কাঠামোর দুটি অংশ আঁকড়ে ধীরে ধীরে নিজেকে নিচে নামাতে লাগলেন। তাঁর উচ্চতা পাঁচ ফুট সাড়ে নয় ইঞ্চি। শরীর নামানোর পর পা থেকে নিচের মাটি পর্যন্ত দূরত্ব রইল দুই ফুট দশ ইঞ্চি।
এরপর তিনি হাত ছেড়ে দিলেন এবং মাটিতে নামার ধাক্কা সামলাতে শরীর নিচু করলেন।
এই বিবরণ পড়লে বোঝা যায় জয়েস তাঁর পিসিমাকে কেন অত প্রশ্ন করেছিলেন।
চিঠিতে জানতে চেয়েছিলেন, দুই বা তিন ফুট ওপর থেকে নামা সম্ভব কি না। উপন্যাসে সেই দূরত্ব এসে দাঁড়াল দুই ফুট দশ ইঞ্চিতে।
এরপরেও থামলেন না। ব্লুমের শরীরের ওজন, মাটিতে পড়ার প্রভাব, ভারসাম্য ফিরে পাওয়া, নিচের দরজা খোলা, রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে বাড়িতে ঢোকা, সবকিছুর হিসাব দিলেন।
ব্লুম শেষ পর্যন্ত শারীরিক আঘাত ছাড়াই উঠে দাঁড়ালেন, যদিও মাটিতে নামার ধাক্কা অনুভব করলেন। তারপর রান্নাঘর হয়ে ভেতরে ঢুকে মোমবাতি জ্বালিয়ে সদর দরজা খুললেন স্টিফেনের জন্য।
এইখানে একটু থামা দরকার।
আমাদের মনে প্রশ্ন হতে পারে, একটা মানুষ রেলিং টপকে বাড়িতে ঢুকছে, এই সামান্য ঘটনাকে এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার কী দরকার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জয়েসের উপন্যাস নির্মাণের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়।
‘ইথাকা’ পর্বটা জয়েস লিখেছেন প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতে। অনেকটা ধর্মশিক্ষার ক্যাটেকিজম কিংবা বিজ্ঞানের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মতো। প্রশ্ন করা হচ্ছে, তারপর উত্তর দেওয়া হচ্ছে। উত্তরগুলোয় আবেগের প্রকাশ কম, তথ্যের পরিমাণ প্রচুর। মাঝেমধ্যে সেই তথ্য এতটাই বিস্তারিত যে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে ওঠে।
একটা মানুষ বাড়িতে ঢুকল। সাধারণ গল্পকারের কাছে ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে পারে। জয়েস জানতে চাইবেন লোকটার ওজন কত, নামার সময় মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কী, ভারসাম্য কীভাবে ফিরল।
এরপর রান্নাঘরে গিয়ে কেতলিতে জল ভরার সময় জল কোথা থেকে এসেছে, ডাবলিনের জলসরবরাহ ব্যবস্থা কেমন, জলের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য কী, সেসব নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা।
অর্থাৎ দুই কাপ কোকো বানাতে গিয়ে প্রায় গোটা জলবিদ্যা হাজির!
এই প্রসঙ্গে ১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধু ফ্রাঙ্ক বাজেনকে লেখা জয়েসের আরেকটি চিঠির কথা মনে পড়ে। সেখানে তিনি ‘ইথাকা’কে গাণিতিক ক্যাটেকিজমের আকারে লিখছেন বলে জানান। ব্লুমের রেলিং টপকানো, কল থেকে জল নেওয়া, বাগানের বিভিন্ন শারীরিক কাজ, সবকিছুকে তিনি ভৌত, মানসিক ও মহাজাগতিক সমতুল্যতায় বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ব্লুম ও স্টিফেনকে এমন এক বিস্তৃত পরিসরে স্থাপন করা, যেখানে মানুষ ও নক্ষত্রের গতির মধ্যেও সম্পর্ক তৈরি হয়।
কী আশ্চর্য ব্যাপার!
একদিকে মানুষ বাড়ির রেলিং টপকাচ্ছে। অন্যদিকে তার অস্তিত্বের সঙ্গে মহাবিশ্বের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
জয়েসের রসবোধটাও এখানে লক্ষ করার মতো। তাঁর বর্ণনার গাম্ভীর্য যত বাড়ে, ঘটনাটার সাধারণত্ব তত বেশি ফুটে ওঠে। যেন একজন পরীক্ষক অত্যন্ত গুরুগম্ভীরভাবে ব্যাখ্যা করছেন, একজন ভদ্রলোক কীভাবে নিজের বাড়িতে ঢুকলেন।
হাসিটা তৈরি হচ্ছে এই অতিরিক্ত গুরুত্ব থেকেই।
কিন্তু এই হাসির পেছনে আরও একটা ব্যাপার আছে।
হোমারের ওডিসিউস দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপদসংকুল যাত্রা পেরিয়ে ইথাকায় ফেরেন। তাঁকে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়, নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সংসারে নিজের জায়গা ফিরে পেতে হয়।
জয়েসের ব্লুমও এক ধরনের যাত্রা শেষে ফিরছেন। তবে তাঁর যুদ্ধগুলো দৈনন্দিন জীবনের। শহরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক অবজ্ঞা, বিবাহিত জীবনের জটিলতা, কামনা, ক্লান্তি, পিতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব।
এই মানুষটা দিনের শেষে নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ায়। অথচ দরজা খুলতে পারে না।
একটা সাধারণ চাবির অনুপস্থিতি এখানে অদ্ভুত অর্থ তৈরি করে।
সারাদিন শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানুষটার শেষ আশ্রয় নিজের বাড়ি। অথচ সেই আশ্রয়ে প্রবেশ করতেও তাকে একটু কসরত করতে হচ্ছে।
বাড়ি আমাদের জীবনে কেবল একটা ঠিকানা নয়। বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তা, পরিচয়, স্মৃতি, অভ্যাস, সঙ্গ, কখনও আবার অস্বস্তি ও বিচ্ছিন্নতা।
ব্লুমের ঘরে ফেরা তাই সহজ কোনও আবেগপূর্ণ সমাপ্তি পায় না। ঘরের ভেতরে মলি আছেন। তাঁদের দাম্পত্যের মধ্যে দূরত্ব ও জটিলতা আছে। ছেলের মৃত্যুর স্মৃতি আছে। স্টিফেনের প্রতি ব্লুমের যে পিতৃসুলভ আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের ছায়া রয়েছে।
তারপরেও তিনি বাড়িতে ফিরলেন।
অতিথির জন্য দরজা খুললেন। আগুন জ্বালালেন। কোকো বানালেন। দুজন কিছুক্ষণ একসঙ্গে বসলেন।
এই সামান্য আতিথেয়তার মধ্যেও মানুষে মানুষে সম্পর্কের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এখানেই জয়েসের অসাধারণ নির্মাণশক্তির পরিচয় পাই। মানুষের জীবনের বড় বড় প্রশ্নগুলোকে তিনি দৈনন্দিন কাজের মধ্যে জায়গা দিয়েছেন। খাওয়া, হাঁটা, প্রস্রাব করা, ঘুমানো, চাবি ভুলে যাওয়া, বাড়ি ফেরা, সবকিছুই তাঁর মহাকাব্যের অংশ।
আর এইসব কাজের বাস্তবতা নিশ্চিত করার জন্য তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন অবিশ্বাস্য নিষ্ঠায়।
জোসেফিনকে লেখা চিঠির গল্প এখানেই শেষ করলে তাঁর প্রতি অন্যায় করা হবে।
কারণ জয়েস শুধু রেলিংয়ের খবরই চাইতেন না। অন্য চিঠিতে জানতে চেয়েছেন স্যান্ডিমাউন্টের গির্জার পাশে গাছ আছে কি না, থাকলে কী ধরনের গাছ, সমুদ্রসৈকতে নামার সিঁড়ি আছে কি না। ডাবলিনের প্রসূতি হাসপাতাল সম্পর্কে বিস্তারিত খবরও চেয়েছেন। আবার ১৮৯৩ সালের ফেব্রুয়ারির শীত কতটা তীব্র ছিল, খাল জমে বরফ হয়েছিল কি না, সেখানে কেউ স্কেটিং করেছিল কি না, সেসবও তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়।
জোসেফিনের নিজের অসুস্থতা ও পারিবারিক সমস্যার মধ্যেও জয়েসের এইসব অনুরোধ চলেছে। গবেষক স্কারলেট ব্যারন তাঁর In Pursuit of Fact: Joyce and Flaubert’s Documentary Letter-Writing প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, তথ্য সংগ্রহে জয়েসের এই প্রবল আগ্রহের সঙ্গে আত্মীয়দের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা এবং কখনও বেশ দাবিদারসুলভ আচরণও জড়িয়ে ছিল।
এখানে লেখকের মানবিক চরিত্রটাও দেখতে পাই।
নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে জয়েস ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। কিন্তু তাঁর এই যত্নের জন্য অন্য মানুষকে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়েছে। দূরদেশে বসে তিনি ডাবলিনকে পুনর্নির্মাণ করেছেন স্মৃতি, চিঠি, খবরের কাগজ এবং আত্মীয়স্বজনের পাঠানো তথ্য দিয়ে।
আমাদের সাহিত্য-আলোচনায় লেখককে প্রায়ই একক প্রতিভা হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মাথার ভেতরে যেন গোটা উপন্যাসটা জন্ম নিল, তারপর কলম দিয়ে বেরিয়ে এল।
বাস্তবে সৃষ্টির এই প্রক্রিয়ার পেছনে আরও অনেক মানুষের অবদান থাকে। কেউ তথ্য সংগ্রহ করেন, কেউ পাণ্ডুলিপি পড়েন, কেউ ভুল ধরিয়ে দেন, কেউ ভুলে যাওয়া কোনও জায়গার কথা মনে করিয়ে দেন।
জোসেফিন সেই মানুষদের একজন।
তবে একটা বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। ১৯২১ সালের ২ নভেম্বরের চিঠিতে জয়েস যে রেলিং টপকানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন, তার প্রমাণ আছে। জয়েস নিজে একজন অ্যাথলেটিক গড়নের মানুষকে ওই কাজ করতে দেখেছেন বলেও লিখেছেন। কিন্তু জোসেফিন নিজে গিয়ে রেলিং টপকেছিলেন, কাউকে দিয়ে লাফ দেওয়ার পরীক্ষা করিয়েছিলেন, কিংবা ঠিক কোন পদ্ধতিতে উত্তর সংগ্রহ করেছিলেন, তার প্রমাণ এই চিঠিতে পাওয়া যায় না।
গবেষণায় যতটুকু জানা যায়, আমাদের সেখানেই থামতে হবে।
তবুও ব্যাপারটা কল্পনা করলে হাসি পায়।
ধরুন, ডাবলিনের এক বাড়িতে বসে জোসেফিন চিঠিটা পড়ছেন। প্যারিস থেকে ভাগনে লিখেছে, একটা সাধারণ লোক রেলিং থেকে লাফ দিলে আঘাত পাবে কি না জানতে হবে।
একজন সাধারণ পিসিমা হলে হয়তো উত্তর দিতেন, ‘তোর উপন্যাসের লোককে বাড়ির দরজা দিয়ে ঢোকাতে পারিস না? এই বয়সে আমাকে রেলিংয়ের খবর নিতে বলছিস কেন?’
অবশ্য কথাগুলো সম্পূর্ণ আমার কল্পনা। জোসেফিন এমন কোনও উত্তর দিয়েছিলেন বলে জানা যায় না।
কিন্তু কল্পনাটুকু করতে গিয়েই বুঝতে পারি, সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে কত রকমের বাস্তব ঝামেলা লুকিয়ে থাকে।
জয়েসের এই চিঠিটা আমাকে আরও একটা কারণে আকর্ষণ করে।
আমরা পরীক্ষামূলক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাধারণত ভাষার জটিলতা, চেতনার প্রবাহ, সময়ের বিন্যাস, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, পুরাণের ব্যবহার এসব নিয়ে কথা বলি।
এসব আলোচনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু একটা উপন্যাসের চরিত্র যে পৃথিবীতে বাস করছে, সেই পৃথিবীর বাস্তবতা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জয়েস ভাষাকে যতদূর সম্ভব প্রসারিত করেছেন। বাক্যকে কখনও দীর্ঘ করেছেন, কখনও ভেঙেছেন, কখনও মানুষের মনের বিচিত্র প্রবাহের সঙ্গে মিশিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ডাবলিনের রাস্তায় হাঁটতে গেলে পাঠক বাস্তব শহরের স্পর্শ পান।
শহরের এই নির্দিষ্টতা তাঁর কল্পনার স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছে।
রেলিংয়ের উচ্চতা, শরীরের ওজন, মাটির দূরত্ব, মানুষের ভারসাম্য, সবকিছু মিলে একটা বাস্তব ঘটনা নির্মিত হয়েছে। তারপর সেই ঘটনাই উপন্যাসের বৃহত্তর ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এইখানে বাস্তবতা এবং কল্পনার মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।
জয়েসের উপন্যাসের পরীক্ষামূলক রচনাশৈলী পাঠককে বারবার চ্যালেঞ্জ করে। অথচ সেই কঠিন রচনার ভেতরে একজন সাধারণ মানুষ নিজের চাবি ভুলে গিয়ে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছেন।
আমাদের জীবনের সঙ্গে এই মানুষটার মিল আছে। আমরা সবাই কোনও না কোনও সময় নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পকেট হাতড়েছি। কখনও চাবি পাইনি, কখনও মানিব্যাগ, কখনও চশমা। আর মাঝেমধ্যে যে জিনিসটা খুঁজছি, দেখা গেছে সেটা নিজের হাতেই ধরে আছি।
জয়েস এইসব সামান্য মানবিক ভুলের মধ্যেও সাহিত্য খুঁজে পেয়েছেন।
আর একটা কথা।
ইউলিসিস পড়ার সময় অনেকের মনে হয়, এই উপন্যাস বুঝতে গেলে প্রথমে হোমারের ওডিসি জানতে হবে, গ্রিক পুরাণ জানতে হবে, পাশ্চাত্য দর্শন জানতে হবে, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব সবকিছু জানতে হবে।
জানলে অবশ্যই সুবিধা হয়। কিন্তু ব্লুমের বাড়ি ফেরার এই দৃশ্যটা মনে করিয়ে দেয়, জয়েসকে পড়ার আরেকটা পথ আছে।
সেটা হল মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা।
একজন ক্লান্ত মানুষ। গভীর রাত। বাড়ির সামনে এসে পকেটে হাত দিলেন। চাবি নেই। সঙ্গে একজন তরুণ অতিথি। এখন কী করা যায়?
এই সামান্য সমস্যার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করলেই আমরা জয়েসের মহাকাব্যিক নির্মাণের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বুঝতে শুরু করি।
ব্লুমের রেলিং টপকে নামার দৃশ্যটি তাই উপন্যাসের রচনাপদ্ধতি বোঝার জন্যও মূল্যবান। এখানে চরিত্রের শরীর, শহরের স্থাপত্য, বর্ণনার ভাষা এবং পুরাণের ইঙ্গিত একসঙ্গে কাজ করছে।
আর যে মানুষটা প্যারিসে বসে এইসব হিসাব করছেন, তাঁর মাথায় তখন নিশ্চয়ই আরও হাজারটা চিন্তা। উপন্যাস শেষ করতে হবে। প্রকাশনার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের আর্থিক ও পারিবারিক দুশ্চিন্তা আছে। তার মধ্যেও একটা রেলিংয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া চাই।
আমার কাছে এই নিষ্ঠার মধ্যে লেখকের সৃষ্টিশীল চরিত্রের একটা শিক্ষা আছে।
একটা বড় উপন্যাস লিখতে গেলে বড় ভাবনার পাশাপাশি ছোট জিনিসগুলোর দিকেও নজর রাখতে হয়। অনেক সময় সেই ছোট জিনিসটাই পুরো দৃশ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
জয়েসের কাছে সাত নম্বর একল্স স্ট্রিটের রেলিং ছিল সেইরকম একটা ছোট জিনিস।
আজ এত বছর পরে আমরা তাঁর উপন্যাস পড়ে ভাষা, ইতিহাস, পুরাণ, মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একসময় সেই উপন্যাসের একটা অনুচ্ছেদ লিখতে গিয়ে লেখক চিন্তিত ছিলেন, ব্লুম মাটিতে নামার পর সুস্থভাবে উঠে দাঁড়াতে পারবেন তো?
ভাবলে হাসিও পায়, শ্রদ্ধাও হয়।
শেষ পর্যন্ত ব্লুম বাড়িতে ঢুকলেন। স্টিফেনের জন্য দরজা খুললেন। দুজনে কোকো খেলেন। মহাকাব্য এগিয়ে চলল তার শেষ পর্বের দিকে, যেখানে মলি ব্লুমের চেতনার নিজস্ব প্রবাহ আমাদের সামনে খুলে যাবে।
আর জয়েসের সেই চিঠিটা থেকে গেল।
আমার ধারণা, লেখালেখির ব্যাপারে এই চিঠি থেকে একটা কথা শেখার আছে। কল্পনা যত দূরেই যাক, তার ভেতরে মানুষের শরীর, শহরের রাস্তা, দরজার কবজা আর মাটির দূরত্ব সম্পর্কে লেখকের সচেতনতা থাকা দরকার।
হোমারের ওডিসিউসকে ইথাকায় ফেরাতে দেবদেবীদের সাহায্য লেগেছিল। জয়েসের ব্লুমকে বাড়িতে ফেরাতে শেষ পর্যন্ত দরকার হল একটু শারীরিক কসরত আর পিসিমার কাছে কিছু বাস্তব তথ্যের অনুসন্ধান।
আর ভাগ্যিস ব্লুমের হাত-পা ভাঙেনি।
নইলে আধুনিক সাহিত্যের মহাকাব্য শেষ করার আগে জয়েসকে হয়তো জোসেফিনের কাছে আরও একটা চিঠি লিখতে হতো।
‘পিসিমা, ডাবলিনে রাত দুটোর সময় কোনও সাধারণ মানুষ গোড়ালি মচকে ফেললে কাছাকাছি ডাক্তার কোথায় পাওয়া যায়, একটু খবর নিয়ে জানাবে?’



