জন ক্যারি : এক পড়ুয়ার শ্রদ্ধাঞ্জলি
জন ক্যারি ছিলেন একজন প্রভাবশালী বই সমালোচক। দীর্ঘদিন তিনি দ্য সানডে টাইমস-এর বই সমালোচক হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি তিনি দুই দফা (১৯৮২ ও ২০০৪) বুকার পুরস্কারের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জন ক্যারির রিভিউ শুরু হতো যেন দরজা ভেঙে ঢোকা। ভদ্রতার ঘণ্টা টিপে নয়, একেবারে লাথি মেরে। প্রথম লাইনেই পাঠক বুঝে যেত, এখানে প্রশংসা আসবে না গুছিয়ে প্যাকেট করা কাগজে, আর নিন্দা আসবে না কুশন দেওয়া বাক্সে। ক্যারির কাছে সমালোচনা মানে ছিল বিচার। তিনি বিশ্বাস করতেন, বই নিয়ে কথা বলার অর্থ হচ্ছে লেখক, পাঠক এবং সমাজ—এই তিনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সৎ অবস্থান নেওয়া। আর সেই অবস্থান যদি কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে, তাতে তাঁর বিশেষ আপত্তি ছিল না।
John Carey নিজেকে কখনও নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে ভাবেননি। তিনি বরং সেই খেলোয়াড়, যে মাঠে নেমেই বলে দেয়, কোন খেলাটা ফাঁকি, কোনটা ভণ্ডামি। এলিটদের প্রতি তাঁর বিরাগ ছিল প্রায় স্বভাবজাত। পোজার, মতাদর্শিক জাদুকর, নান্দনিকতার দোহাই দিয়ে সমাজকে তুচ্ছ করা সৌন্দর্যবিলাসী—সবাই তাঁর নিশানায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের ইংরেজ সাংস্কৃতিক জীবনে যে ড্যান্ডি-সংস্কৃতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল—সিটওয়েল পরিবার, হ্যারল্ড অ্যাক্টন, সিরিল কনোলি, এমনকি এভেলিন ওয়াফ—ক্যারির চোখে তারা ছিল আত্মমুগ্ধতার একেকটা নমুনা। কিন্তু তিনি কেবল সমসাময়িকদের সঙ্গেই ঝগড়া করেননি। থমাস কার্লাইল থেকে ভি এস নাইপল—যেখানে অহংকার, জাত্যাভিমান বা মানববিদ্বেষ দেখেছেন, সেখানেই হাত বাড়িয়েছেন।
এই লড়াইটা ব্যক্তিগতও ছিল। অক্সফোর্ডের ক্লাস-স্নবিজম তাঁর গায়ে লেগে ছিল আজীবন। “ডাউন উইথ ডনস” প্রবন্ধে স্যার মরিস বোউরার বিরুদ্ধে যে আক্রমণ, তা আসলে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এক মানসিকতার বিরুদ্ধে। পাবলিক স্কুল থেকে অক্সব্রিজে ঢোকার শর্টকাট, বন্ধ স্কলারশিপ, একাডেমিক আত্মতৃপ্তি—এই সব কিছুকে তিনি দেখতেন সামাজিক অন্যায়ের যন্ত্র হিসেবে। তার ফলও পেয়েছেন। অক্সফোর্ডে থেকেও তিনি কখনও পুরোপুরি ‘আপন লোক’ হয়ে ওঠেননি।
ব্যক্তিগতভাবে ক্যারি ছিলেন মিশুক, কথা বলতে ভালোবাসতেন, কিন্তু নতুনদের জন্য তিনি ছিলেন কঠিন। ক্লাইভ জেমসের প্রথম বইকে যেভাবে তিনি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন—“অমর নামগুলো তার থেকে খুশকির মতো ঝরে”—এটা কেবল আক্রমণ নয়, একধরনের সাবধানবাণী। পাণ্ডিত্য দেখানো তাঁর কাছে ছিল অপরাধ। সেই আঘাত জেমস আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন, এমন কথাই শোনা যায়।
খ্যাতির প্রতিও ক্যারির ভক্তি ছিল না। নোবেলজয়ী হোক বা কিংবদন্তি, কারও ক্ষেত্রেই ছাড় নেই। ইয়েটসের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাঁর সংশয়, বানান না শেখা, গুপ্তবিদ্যায় ডুবে থাকা, মড গনের সঙ্গে সম্পর্কে সরলতা—এসব তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছিলেন, সাহিত্যিক প্রতিভা মানেই মানবিক পরিপূর্ণতা নয়। ক্যারি ইচ্ছাকৃতভাবেই মূর্তি ভাঙতেন, কারণ মূর্তি থাকলে প্রশ্ন বন্ধ হয়ে যায়।
বই লেখার সময়ও তাঁর পদ্ধতি ছিল বাঁকা পথে হাঁটা। ডিকেন্স নিয়ে লিখতে গিয়ে সমাজচিন্তার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন অদ্ভুত সব আসক্তি—কাঠের পা, হাঁটতে থাকা কফিন, মোমের পুতুল, বোতলবন্দি শিশু। এই দৃষ্টিভঙ্গিই “দ্য ভায়োলেন্ট এফিজি”-কে অক্সফোর্ডের সকাল ন’টার লেকচারেও ভিড় টানতে বাধ্য করেছিল। থ্যাকারে পড়েও তিনি উপন্যাসে হতাশ, কিন্তু সাংবাদিকতায় মুগ্ধ। তাই “থ্যাকারে: প্রডিগাল জিনিয়াস”-এ ঢুকে পড়ল বিস্মৃত লেখা, উনিশ শতক থেকে তুলে আনা ব্যঙ্গ আর খাবারের গল্প। টাইমস ঠিকই বলেছিল, এটা প্রচলিত ইংরেজ সাহিত্যসমালোচনা নয়। জন ডনের ক্ষেত্রেও তিনি কবিতা আর ধর্মীয় লেখাকে আলাদা করেননি। দশ খণ্ডের উপদেশ পড়া মানে একধরনের জেদ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কল্পনার ধরন বদলায় না, মাধ্যম বদলায়।
এই জেদটার শিকড় ছিল শৈশবে। বার্নসে জন্ম, শ্রমজীবী পরিবার, ক্রিস্টাল প্যালেস আর ব্লিটজের আগুন দেখা—এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে ইতিহাসের বাস্তবতা শিখিয়েছিল। নটিংহামশায়ারে কমিকস, স্তোত্র, বিগলস আর কৈশোরের কামনা—সব মিলিয়ে এক মিশ্র সংস্কৃতি। চোখে চশমা পরার পর পড়াশোনায় হঠাৎ গতি—এটা যেন প্রতীকী। দেখার ক্ষমতা বাড়লে বোঝার ক্ষমতাও বাড়ে।
অক্সফোর্ডে ঢোকার পেছনে ছিল শিক্ষক জে এইচ হাইডের ধাক্কা, আর নিজের অনিদ্রা আর অ্যামফেটামিন। ন্যাশনাল সার্ভিস শেষে তিনি অক্সফোর্ডে ফিরলেন, মিল্টন, ডন, জনসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থে ডুবে গেলেন। টলকিয়েন তাঁকে ধরতে পারেননি, কিন্তু ডনের প্রতি আকর্ষণ আজীবনের।
অক্সফোর্ডেই তাঁর জীবন। ব্যালিওলে বন্ধুত্ব, ক্রাইস্ট চার্চে অপমান। “ওটা কেউ না”—স্যার রয় হারডের এই মন্তব্য ক্যারি ভুলতে পারেননি। এই স্মৃতি থেকেই তাঁর ক্লাস-বিরোধী অবস্থান আরও শক্ত হলো। কটসওল্ডে ভাঙা কটেজ, ফলগাছ, মৌমাছি, দুই ছেলে—একজন নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক, অন্যজন সলিসিটর—এই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত আশ্রয়।
রিভিউ লেখা শুরু নিউ স্টেটসম্যানে, পরে সানডে টাইমস। দশকের পর দশক। অথচ তিনি জানতেন, তাঁর সম্পাদিত ফেবার অ্যান্থলজি তাঁর নিজের বইয়ের চেয়ে বেশি বিকোবে। “ফেবার বুক অফ রিপোর্টাজ”-এ আতিলা দ্য হানের ডিনারের ভদ্রতা নিয়ে নোট—এই ধরনের খোঁচা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটাল “দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড দ্য ম্যাসেস”। আধুনিকতাবাদী লেখকদের গণপাঠকের প্রতি অবজ্ঞা আর ভাষার ইচ্ছাকৃত দুর্বোধ্যতাকে তিনি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখালেন। হিটলারের ভাষার সঙ্গে মিল টেনে আনায় সাহিত্যদুনিয়া ফেটে পড়ল। তাঁকে শুদ্ধিবাদী বলা হলো। তবু তিনি পিছু হটেননি। “হোয়াট গুড আর দ্য আর্টস?”-এ গিয়ে আবার বললেন, নান্দনিক উচ্ছ্বাস আসলে ব্যক্তিগত রুচি, কিন্তু সাহিত্য ভাষার মাধ্যমে বোঝাপড়া তৈরি করে, কারণ শব্দ সবার।
বুকার প্রাইজের চেয়ার, রেডিও, টেলিভিশন—সব জায়গায় তাঁর কণ্ঠ ছিল সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ, ভদ্রভাবে ধারালো। জুলি বার্চিল ঠিকই বলেছিলেন, আদর্শ জগতে বুদ্ধিজীবীরা হলে জন ক্যারির মতো হতেন।
শেষ পর্যন্ত জন ক্যারি ছিলেন একধরনের বিরক্তিকর বিবেক। যিনি বারবার মনে করিয়ে দিতেন, সাহিত্য শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটা ক্ষমতার প্রশ্নও। আর সেই প্রশ্ন করতে গেলে বন্ধুত্ব নষ্ট হতে পারে, সম্মান কমতে পারে—এই ঝুঁকি তিনি নিতে রাজি ছিলেন। ৯১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে সমালোচনার সেই অস্বস্তিকর কণ্ঠটা থামল, যে কণ্ঠ আমাদের মনে করাত, বই ভালোবাসা মানে বইকে প্রশ্ন করাও।
জন ক্যারি
জন্ম: ১৯৩৪, লন্ডন, ইংল্যান্ড
মৃত্যু: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ (বয়স ৯১)
শিক্ষাগত পদ: এমেরিটাস মের্টন অধ্যাপক, ইংরেজি সাহিত্য, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
প্রধান রচনা: The Intellectuals and the Masses (১৯৯২); What Good Are the Arts? (২০০৫)
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা: বই সমালোচক, দ্য সানডে টাইমস; চেয়ার, বুকার পুরস্কার (১৯৮২, ২০০৪)




