জাস্ট বিইং
আমার জীবনের এক প্রান্তিক অধ্যায়
রোমিলা থাপারের জাস্ট বিইং পড়া শুরু করেছিলাম কিছুদিন আগে। বইটি পড়ে এতই ভালো লাগছে যে সেই ভালোলাগা শেয়ার না করে পারছি না। বিশাল বই। শুধু প্রস্তাবনা পড়ে যা মনে হলোঃ
প্রস্তাবনার শিরোনাম দিয়েছেন “আমার জীবনের এক প্রান্তিক অধ্যায়” (One Bookend of My Life).
রোমিলা থাপারের জাস্ট বিইং বইটির প্রস্তাবনা পড়তে পড়তে প্রথমে মনে হয়, একজন ইতিহাসবিদ তাঁর আত্মজীবনী শুরু করছেন খুব সাবধানে, যেন টেবিলের ওপর পুরোনো কাগজ ছড়িয়ে বসেছেন, পাশে কফির কাপ, জানলার বাইরে ছোটো বাগান, পাখির ডাক, কুকুরের বিরক্তি, দূরে কোভিড ভাইরাসের সময়ের অবরুদ্ধ পৃথিবী, আর ভেতরে বহু বছরের জমে থাকা স্মৃতি, কিন্তু একটু পরে বোঝা যায়, এই প্রস্তাবনা কোনো সোজা আত্মকথনের দুয়ার খুলছে না; বরং একজন মানুষ কীভাবে নিজের জীবনের দিকে তাকায়, কীভাবে স্মৃতি তাকে একা করে দই, কীভাবে ইতিহাস ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকে পড়ে, কীভাবে বাগানের নুড়ি, শাপলা, জুঁইলতা, বুলবুলের বাসা, কফির তেতো স্বাদ, কুকুরের ডাক, গিরগিটির লেজ, সব মিলিয়ে একটি জীবনের চিন্তার নকশা বানায়, তারই ধীর, শ্বাস-প্রশ্বাসময় প্রস্তুতি এখানে তৈরি হচ্ছে।
প্রস্তাবনার শুরুতেই থাপার বৌদ্ধ গ্রন্থের সেই পরিচিত ধ্বনি তুলে আনেন, “এমনই আমি শুনেছি।” কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের পথ আলাদা করে নেন, কারণ এখানে কোনো গুরুপ্রদত্ত সত্য নেই, কোনো শাস্ত্রের কর্তৃত্ব নেই, কোনো প্রকাশিত বাণী নেই। আছে স্মরণ। আছে ফিরে দেখা। আছে জীবনের ভাঙা অংশগুলোর ওপর হাত রেখে দেখা, কোথায় দাগ, কোথায় নরম মাটি, কোথায় শুকনো শিকড়, কোথায় এমন কিছু ঘটনা জমে আছে যা মুছে যায়নি। এই শুরুটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রোমিলা থাপারের মতো একজন ইতিহাসবিদ যখন নিজের জীবন নিয়ে লিখতে বসেন, তখন তাঁর বিপদও বেশি। ইতিহাসবিদরা সাধারণত অন্যের সময়, অন্যের সমাজ, অন্যের নথি, অন্যের চিহ্ন নিয়ে কাজ করেন। এখানে তাঁকে নিজের ওপরই সেই নজর ফেরাতে হচ্ছে। আর নিজের ওপর নজর ফেরানো সব সময়ই অস্বস্তিকর, কারণ সেখানে কোনো আর্কাইভের নিরাপদ দূরত্ব থাকে না, নিজের বলা কথা, না-বলা কথা, ভুল, অভিমান, কৃতজ্ঞতা, লজ্জা, সব একসঙ্গে এসে বসে।
এই বইটির বড়ো সৌন্দর্য তার কথোপকথনের ধারণায়। থাপার বলেন, মানুষের জীবনের বড়ো অংশই কেটে যায় নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। বাইরে মুখ বন্ধ, অথচ ভেতরে নিরন্তর কথাবার্তা চলছে; প্রশ্ন উঠছে, জবাব তৈরি হচ্ছে, আবার অনেক সময় জবাব আসছে না, শুধু একটি অস্বস্তি এসে বসে থাকে। এই জায়গাটিই বইটির আত্মা। স্মৃতিকথা এখানে ঘটনাপঞ্জি নয়, নিজের ভেতরের সেই কল্পিত অন্যজনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ। কখনো সে অন্যজন স্নেহময়, কখনো বিরক্ত, কখনো কঠোর, কখনো হতাশ, কখনো যেন হিসেব চাইতে বসেছে। আর এই কথোপকথনের চারপাশে ভাসে নানা রকম বাক্য, যা কখনো বলা হয়নি। জীবনের যে অংশ বলা যায়, তার থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে যা বলা হয়নি, যা গলার কাছে এসে আটকে ছিল, যা মুখে ওঠেনি, যা নিজের ভিতরেই পড়ে থেকেছে।
বইটির কেন্দ্রে আছে বাগান। এই বাগান একটি মানসিক ভূদৃশ্য, একটি স্মৃতি-যন্ত্র, একটি একাকিত্বের ঘর, একটি বয়সের আশ্রয়, একটি চিন্তার পরীক্ষাগার। থাপার তাঁর বাড়ির ছোটো বাগানের দোলনায় বসে আছেন; ভাবনাগুলোকে তিনি আসতে দিচ্ছেন, যেতে দিচ্ছেন, নিজের মতো ঘুরতে দিচ্ছেন। বাগানটি খুব বড়ো নয়। বাড়ির কিনারা আর রাস্তার সীমানা-দেয়ালের মাঝখানে গুঁজে রাখা সামান্য জায়গা। কিন্তু সেই অল্প জায়গার ভিতরেই তিনি বানিয়ে ফেলেছেন এক ক্ষুদ্র জগৎ। সেখানে পাখি আছে, প্রজাপতি আছে, কাঠবিড়ালি আছে, লম্বা লেজের গিরগিটি আছে, রোদ পোহানো কুকুর আছে। এইসব প্রাণীদের সঙ্গে বসবাস করেন। মানুষের স্মৃতিকথায় সাধারণত মানুষজন বেশি থাকে, কিন্তু থাপারের বইয়ে প্রাণী, গাছ, পাথর, কাঁকর, জল, ছায়া, সবকিছু মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
এই বাগানের ভিতর তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অদ্ভুত মিশ্র রুচি দেখা যায়। তিনি লন চান না। কারণ লন তাঁর কাছে ঝক্কি, চেনা, সামাজিকভাবে অনুমোদিত, সবার মতো। তিনি চান নানা সবুজের বিস্ফোরণ, এক সবুজ থেকে অন্য সবুজে সরে যাওয়া, পাতার মধ্যে মরচে রঙ, সামান্য হলুদ, ছায়ার স্তর, এমন এক ঘেরা জায়গা যা তাঁকে বাইরের দুনিয়া থেকে কিছুটা আলাদা করে। কিন্তু এই আলাদা হওয়া দূরত্ব নিয়ে দেখা। একজন ইতিহাসবিদেরও তো এটাই দরকার, একটু দূরত্ব, যাতে দেখা যায়, আবার এত দূরত্ব নয় যে স্পর্শ হারিয়ে যায়।
লুনুগঙ্গার স্মৃতি এই বাগানকে আরেক স্তর দেয়। জিওফ্রি বাওয়ার সেই ট্রপিক্যাল এস্টেটে তিনি যে অংশগুলো মনে রেখেছেন, সেগুলো অতিরিক্ত পরিপাটি নয়, কাঁচি-চালানো নয়, বরং প্রায় আধা-চাষকরা জঙ্গল, যেখানে গাছপালা একে অন্যের ওপর উঠে আছে, জড়িয়ে আছে, শরীরী ভিড় তৈরি করেছে। উত্তরের ঠান্ডা দেশের গাছের মতো তারা দূরত্ব মেপে দাঁড়ায় না। এই তুলনাটির ভিতরে শুধু বাগানবিষয়ক নান্দনিকতা নেই, আছে সভ্যতার মেজাজের পার্থক্য। ট্রপিক্যাল সবুজের ঘনতা, জলীয়তা, অনিয়ন্ত্রিত শরীরী উপস্থিতি তাঁর স্মৃতিতে থেকে যায়। তাঁর নিজের ছোটো বাগান সেই স্মৃতির ক্ষুদ্র প্রতিফলন। আবার সেই সঙ্গে এসে পড়ে জাপানের জেন বাগান, কিয়োটো, রায়ানজি, পাথর ও কাঁকরের বিন্যাস, নীরবতা, শূন্যতা, খালি জায়গার অর্থ। ফলে তাঁর বাগান একদিকে লুনুগঙ্গার ঘন, শরীরী, জলীয় সবুজ, অন্যদিকে জেন বাগানের পাথর, কাঁকর, ফাঁক, সংযম। এই দুই বিপরীত প্রবণতা তাঁর জীবনভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে যায়: ভিড়ের মধ্যেও একাকিত্ব, অগোছালোর মধ্যেও গোপন বিন্যাস, শূন্যতার মধ্যেও সংকেত।
বাগানের নামকরণগুলোও অসাধারণ। দুটি পাথরের মাঝের সরু ফাঁক, “দ্য গেটওয়ে টু এনিহোয়ার”; বাঁশঝাড়ের নিচে লাল বেলেপাথরের অমসৃণ খণ্ড, “মাই এপিটাফ”; নুড়ির ধারা, যা তাঁর কাছে জলপ্রপাতের চিহ্ন; বড়ো জলের জার, তাতে লাজুক শাপলা। এইসব নামকরণে এক ধরনের রসবোধ আছে, আবার মৃত্যু-সচেতনতা আছে। “মাই এপিটাফ” লিখে তিনি নিজের জীবনের শেষের দিকে তাকান, কিন্তু বাড়াবাড়ি বিষণ্নতায় ডুবে যান না। যেন বাগানের কোণে সমাধিলিপি না-থাকা একটি পাথর রেখে তিনি নিজেরই ভবিষ্যৎ অনুপস্থিতির সঙ্গে আলাপ করছেন।
এই প্রস্তাবনায় কফি, টোস্ট, কুমকোয়াট মার্মালেডেরও আলাদা ভূমিকা আছে। সকালের নাশতা, কড়া কালো কফি, হোল-হুইট টোস্ট, ঘরে বানানো টক মার্মালেড, বন্ধুরা যার নাম দিয়েছে “জাম্প-স্টার্ট মার্মালেড”, এইসব ছোটো জিনিস প্রস্তাবনাকে শরীর দেয়। স্মৃতিকথা শুধু বড়ো ঘটনা দিয়ে তৈরি হয় না। বরং জীবনের বেশির ভাগই টেবিলে রাখা কাপ, সকালের আলো, একটি ফলের টক স্বাদ, কুকুরের বিরক্ত চোখ, পাশের বাড়ির কুকুরছানার অতিরিক্ত ডাক, পাখিদের খাবার ছড়িয়ে দেওয়া, কাঠবিড়ালির লোভ, এসব দিয়ে তৈরি। থাপারের শক্তি এখানেই, তিনি বড়ো ইতিহাসের মানুষ হয়েও ছোটো বস্তুগুলিকে অগ্রাহ্য করেন না।
বাগানের প্রাণীদের বর্ণনা পড়লে মনে হয়, লেখক তাঁর জীবনকে আর শুধু মানুষের সমাজে সীমাবদ্ধ রাখছেন না। বসন্তে বুলবুল আসে, জুঁইলতায় বাসা বানায়, ডিমে তা দেয়, ছানাদের মুখে পোকা দেয়, উড়তে শেখায়। সানবার্ড আসে, পুরুষ পাখির গায়ে বেগুনি ঝিলিক, ঝুলন্ত তুলোর মতো বাসা, পাশে ছোট্ট দরজা। প্রজাপতি আসে হলুদের নানা ছায়ায়, কেউ পাকা আমের মতো, কেউ কালো রাতের টুকরোর মতো। কাঠবিড়ালি আসে ক্যাসিয়া গাছ বেয়ে, বার্ড বাথের চারপাশে ছড়ানো খাবার খায়, বড়োরা ছোটোদের ঠেলে সরিয়ে দেয়। পাখিদের তালিকায় বুলবুল, সানবার্ড, ময়না, ঘুঘু, থ্রাশ, ম্যাগপাই, সেভেন সিস্টার্স, সবুজ-পালকের এক মাছরাঙা-সেজে-থাকা পাখি। এই সব বর্ণনা শুধু প্রকৃতিপ্রেমের নরম শখ নয়। এখানে দেখা যায় জীবনের চলমানতা, জন্ম, খাদ্য, প্রতিযোগিতা, ভয়, বাসা, উড়াল, শিকারি, শিকার, সহাবস্থান, বিরোধ। প্রকৃতি কোমলও, আবার নির্মমও। পাখি এলে বিড়ালও আসে। কুকুর অম্বাকে দিয়ে বিড়াল তাড়াতে হয়। জীবনের ভিতরে যে সহিংস স্তরবিন্যাস আছে, সেটাকেও তিনি এড়িয়ে যান না।
কোভিড-১৯-এর লকডাউন এই প্রস্তাবনায় সরাসরি বড়ো রাজনৈতিক বা সামাজিক আলোচনার মতো আসে না, বরং গরমের আক্রমণ, ঘরে ঢুকে পড়া, একা কাজ করা, নিজের অতীতের ভিতর হাঁটার সময় হিসেবে আসে। ভাইরাসের সময়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা হঠাৎ কাছে এসে দাঁড়ায়। আগামী সপ্তাহে, আগামী মাসে, আগামী বছর, শেষ আসতে পারে। এই উপলব্ধি লেখককে নিজের অতীতের দিকে আরেকবার তাকাতে বাধ্য করে। কিন্তু তিনি আত্মপ্রশংসা করতে বসেননি। নিজের জীবনকে বড়ো করে দেখানোরও চেষ্টা নেই। তাঁর ভাষায়, এটি প্রায় এক ধরনের উপহার, তাদের জন্য যারা অন্য একজন মানুষের জীবন সম্পর্কে কৌতূহলী হতে পারে। এই বিনয়ী বাক্যের ভিতরে দীর্ঘ জীবনের ভার আছে।
বইটির অন্যতম গভীর প্রশ্ন হলো: স্মৃতিকথায় কোন জীবন লেখা হয়? মানুষ কি একটিমাত্র জীবন বাঁচে? থাপার বলেন, মানুষ যেন পাশাপাশি দুটি জীবন বাঁচে, একটি দৃশ্যমান, শোনা যায়, নথিবদ্ধ করা যায়; আরেকটি অদৃশ্য, নীরব, ভেতরের জীবন। তিনি স্বীকার করেন, যদি কবি হতেন, হয়তো ভেতরের জীবনটিকেই বেছে নিতেন। কিন্তু তিনি গদ্য লিখেছেন, অ্যাকাডেমিক গদ্য, মাপা, সংযত, অলংকারহীন। তাই তিনি দৃশ্যমান জীবনের কথা লিখবেন, তবে অন্য স্বরগুলোকে পুরোপুরি ঠেকাবেন না। এই অংশটি বইটির পদ্ধতি বুঝিয়ে দেয়। তিনি শৃঙ্খলা চান, কিন্তু জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার ভান করেন না। তিনি কালক্রম মানবেন, কারণ ইতিহাসবিদের অভ্যাসে সময়ের ক্রম এসে যায়; কিন্তু জীবন নিজে কোনো সোজা রেখা নয়। তা ঘোরে, থামে, হঠাৎ ছুটে যায়, কখনো ভুল পথে স্থির পথের মতো মনে হয়, কখনো পড়ে যায়, কখনো উঠে আসে।
“জাস্ট বিইং” নামটির ব্যাখ্যা বইটির আবেগী কেন্দ্রে বসে আছে। রজনী প্যাটেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে কথোপকথনে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের বন্ধুত্ব তার কাছে কী অর্থ বহন করেছে। উত্তরটি সংক্ষিপ্ত: “শুধু থাকার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।” এই “শুধু থাকা” খুব সহজ শোনালেও আসলে মানুষের সম্পর্কের কঠিনতম কাজগুলোর একটি। কাউকে বদলাতে যাওয়া নয়, বিচার করা নয়, নিজের মত চাপানো নয়, পাশে থেকে যাওয়া। এই নাম বইটির স্মৃতিকথামূলক প্রকৃতিকে আলাদা মাত্রা দেয়। জীবনের বড়ো ঘটনা, বিখ্যাত মানুষ, ইতিহাস, রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান, চিন্তা, সব থাকবে হয়তো, কিন্তু তাদের নিচে আছে থাকা, উপস্থিত থাকা, সম্পর্কের নীরব দায়, মানুষের পাশে মানুষের স্বল্প অথচ স্থায়ী অবস্থান।
বৌদ্ধ ভাবনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দ্বিধাহীনভাবে দ্বন্দ্বময়। ধম্মপদে নিজের ভিতরেই দ্বীপের মতো বাস করার কথা আছে, নিজের ভিতরে আশ্রয় নেওয়ার কথা আছে, গণ্ডারের শিংয়ের মতো একা চলার কথা আছে। কিন্তু বৌদ্ধ শরণ তো আবার বুদ্ধ, ধম্ম, সংঘে। সেখানে গুরু আছে, শিক্ষা আছে, সম্প্রদায় আছে। তাহলে মানুষ কি একা থাকবে, নাকি সমষ্টিতে? থাপার এর সহজ সমাধান দেন না। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার ভিতরেই এই বিরোধ থাকে, আর মানুষকে এগুলো সামলে রাখতে হয়। কখনো নিজের দ্বীপে ফিরে যেতে হয়, কখনো মানুষের ভিড়ে নিজের নিঃসঙ্গতা বহন করতে হয়, কখনো আশ্রয় নিতে হয়, কখনো আশ্রয় ছাড়তে হয়। এই বোধই বইটিকে আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং জীবনের ব্যবহারিক জটিলতায় স্থাপন করে।
প্রস্তাবনার শেষ অংশে ইতিহাস বড়ো হয়ে ওঠে। থাপারের ভিতরের ইতিহাসবিদ তাঁকে নিজের জীবন থেকে অন্য মানুষের দিকে নিয়ে যায়। তিনি নিজেকে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারক হিসেবে দেখেন না; দেখেন একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতার ভিতর। তিনি জন্মেছেন ও বড়ো হয়েছেন যখন উপনিবেশবাদ ভেঙে পড়ছে, স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র উঠে আসছে। ভারতীয়দের এক অন্তর্বর্তী সময়ের মানুষ হিসেবে তিনি দেখেন, প্রজা থেকে নাগরিক হওয়ার পথ, উপনিবেশিক ক্ষমতা থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম, অতীত থেকে কী বহন করা হলো, ভবিষ্যৎ থেকে কী আশা করা হলো। এই প্রশ্নগুলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে নয়। তাঁর চিন্তা, কাজ, লেখা, নারীর স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন, মানুষের সঙ্গে থাকা, নতুন ভাবনার পিছু নেওয়া, সব ঘটেছে এই পরিবর্তনশীল সমাজের মধ্যে।
এই কারণে জাস্ট বিইং এক ধরনের আত্ম-পরীক্ষা, যেখানে ব্যক্তি, বাগান, প্রাণী, বন্ধুত্ব, মৃত্যু, ইতিহাস, নারীস্বাধীনতা, জাতিরাষ্ট্র, একাকিত্ব, স্মৃতি, সব একে অন্যের পাশে বসে। কোনোটি অন্যটিকে মুছে দেয় না। একজন মানুষ নিজের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝতে চান, তিনি কী দেখেছেন, কাদের সঙ্গে থেকেছেন, কাদের দ্বারা গড়ে উঠেছেন, কাদের ছুঁয়েছেন, অথবা আদৌ ছুঁয়েছেন কি না। এই প্রশ্নের পুরো উত্তর তাঁর কাছে নেই। আর সেই অসম্পূর্ণতাই প্রস্তাবনাটিকে সত্যি করে তোলে।
টি. এস. এলিয়টের সময়-বিষয়ক পংক্তি দিয়ে শেষ করার অর্থও তাই গভীর। বর্তমানের মধ্যে অতীত, অতীতের মধ্যে ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের মধ্যে বর্তমান, সময় যেন কোনো সরল রাস্তা নয়, বরং স্তর, প্রতিধ্বনি, ফেরত আসা, হারানো, পুনরুদ্ধারহীনতা। থাপার পাঠককে বলেন, আপাতত সময়ের ভিতর দিয়ে তাঁর কথা শুনতে। এই আমন্ত্রণে কোনো আত্মম্ভরিতা নেই। আছে একটি দীর্ঘ জীবন থেকে উঠে আসা স্থির স্বর। যে স্বর জানে, সব বলা যাবে না, অনেক কিছু বললে নষ্ট হয়ে যাবে, কিছু অভিজ্ঞতা ভিতরের গুহায় অন্ধকারে থাকুক; তবু যতটুকু বলা যায়, তা বলা দরকার।
বইটি যদি তার প্রতিশ্রুতি রাখে, তবে জাস্ট বিইং হবে এমন এক স্মৃতিকথা যেখানে বড়ো ইতিহাসকে দেখা যাবে ছোটো জীবনের জানালা দিয়ে, আর ছোটো জীবনকে দেখা যাবে ইতিহাসের দীর্ঘ আলো-ছায়ার ভিতর দিয়ে। এখানে রোমিলা থাপার নিজেকে স্মৃতির কেন্দ্রে বসিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই কেন্দ্র স্থির নয়; তার চারপাশে ঘুরছে বাগানের পাখি, শাপলার হলুদ কুঁড়ি, বুলবুলের বাসা, রজনী প্যাটেলের বাক্য, বৌদ্ধ নিঃসঙ্গতা, সংঘের আশ্রয়, উপনিবেশ ভাঙার শব্দ, স্বাধীন নাগরিক হওয়ার অস্বস্তি, একজন মুক্ত নারীর নিজের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ শ্রম। বইটির হয়ত শেষ হবে, কিন্তু দোলনায় বসে থাকা সেই মানুষটির চিন্তা শেষ হবে না। পাঠকও যেন বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে, পাতার ফাঁকে আলো নড়ে ওঠে, আর মনে হয়, জীবনকে বোঝার জন্য কখনো কখনো শুধু থাকা, শুধু দেখা, শুধু মনে রাখা, এই সামান্য কাজগুলিই সবচেয়ে কঠিন।



