কাঁদলে ইতিহাস বদলায়: কেন অনুভূতিই সভ্যতার সবচেয়ে বিপজ্জনক শক্তি
সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র ক্ষোভ, টুইটারের রাগ, ক্যান্সেল করার হুড়োহুড়ি; এগুলোকে যতই আমরা নতুন রোগ বলি না কেন, এগুলো আসলে পুরনো ইতিহাসের নতুন সংস্করণ।
ইতিহাস মানে ফ্যাক্টস, ইতিহাস মানে ফিলিংস নয়; এগুলো আমাদের এমনভাবে শেখানো হয়েছে, যেন অনুভূতি একটা অপদার্থ জিনিস। কাঁদলে ইতিহাস হয় না, রাগ করলে সংবিধান বদলায় না, প্রেমে পড়লে আইনসভা বসে না। ইতিহাস নাকি তৈরি হয় ঠান্ডা মাথায়, ফাইল-ফুটনোট-পরিসংখ্যানে। অনুভূতি সেখানে বড়জোর ভুল, নয়তো বিপজ্জনক। এই ধারণাটা এতটাই চালু যে, আমরা নিজেরাও প্রায় বিশ্বাস করে ফেলি; মানুষ নয়, ডেটাই সভ্যতা বানিয়েছে।
কিন্তু একটু খোঁচা দিলেই পুরো তত্ত্বটা টলে যায়। কারণ মানুষ কখনও facts শুনে রাস্তায় নামে না। মানুষ নামে অপমানে, লজ্জায়, সহানুভূতিতে, ক্ষোভে। দাসপ্রথা উঠে গেল কেন? কেউ হঠাৎ বুঝল এটা অর্থনৈতিকভাবে অদক্ষ? নাকি একদিন হঠাৎ করে সাদা সমাজের ঘুম ভাঙল, যখন তারা বুঝল যাদের শেকলে বেঁধে রেখেছে, তারা আসলে মানুষ; দেহে রক্ত, মনে যন্ত্রণা নিয়ে? নাগরিক অধিকার আন্দোলন কি শুধুই আইনজ্ঞদের ড্রাফটিং দক্ষতার ফল? নাকি টিভির পর্দায় মার খাওয়া শরীর, কাঁদতে থাকা মুখ, অপমানের দৃশ্য এমন একটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল, যেটা আর উপেক্ষা করা যায়নি?
পশ্চিমী সংস্কৃতির এক হাজার বছরের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটা বড় পরিবর্তনের নিচে কাজ করেছে অনুভূতি—নীরবে, কিন্তু একগুঁয়ে। মধ্যযুগে গীতিকবিরা প্রেম “আবিষ্কার” করল। তার আগে মানুষ ভালোবাসেনি এমন নয়, কিন্তু ভালোবাসা তখন ব্যক্তিগত দুর্বলতা, সামাজিক শক্তি নয়। গীতিকবিরা গান-কবিতার মাধ্যমে প্রেমকে দিল নিয়ম, ভাষা, আচার। ভালোবাসা তখন দাবি করার মতো একটা জিনিস হয়ে উঠল। কাকে ভালোবাসা যায়, কাকে যায় না; এই প্রশ্নটা প্রথমবারের মতো সাংস্কৃতিক বিতর্কে ঢুকে পড়ল। প্রেম তখন রাজনীতির দরজায় নক করল।
এর পর এল উপন্যাস। আজ যেগুলোকে আমরা নাক সিটকিয়ে বলি; অতি আবেগী, কাঁদুনি, মেলোড্রামা; সেই কাঁদুনি উপন্যাসই এক সময় আইন বদলাতে বাধ্য করেছিল। পাঠক কাঁদত, কাঁদতে কাঁদতে রেগে উঠত, আর হঠাৎ বুঝতে পারত; এই অন্যায়টা দূরের কারও নয়, আমার পাশের বাড়ির। শিশুশ্রম, নারীর অধিকার; এই সব মানবিক বিষয় রাষ্ট্রের টেবিলে এল কারণ মানুষ অনুভব করতে শিখেছিল। যুক্তি তখন আবেগের পিছু নিল।
এই ধারাটা আজও থামেনি। সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র ক্ষোভ, টুইটারের রাগ, ক্যান্সেল করার হুড়োহুড়ি; এগুলোকে যতই আমরা নতুন রোগ বলি না কেন, এগুলো আসলে পুরনো ইতিহাসের নতুন সংস্করণ। প্রতিটা যুগের নিজের আবেগ প্রকাশের সামাজিক রীতি থাকে। কোন অনুভূতি গ্রহণযোগ্য, কোনটা বাড়াবাড়ি, কোনটা বিপজ্জনক; এই সীমারেখা বদলায়। কিন্তু অনুভূতির ভূমিকা বদলায় না। আগে উপন্যাস কাঁদাত, এখন স্ক্রিন কাঁদায়। আগে চিঠি, আজ থ্রেড।
আজ আমরা খুব সহজে বলি, “Love is love।” কথাটা শুনতে এতটাই স্বাভাবিক যে মনে হয় এটা চিরকালীন সত্য। কিন্তু ইতিহাস জানে, এই বাক্যটার পেছনে কত যুদ্ধ, কত অপমান, কত নিষেধাজ্ঞা। কোন ভালোবাসা পবিত্র, কোনটা বিকৃত; এই বিচার এসেছে ক্ষমতা থেকে, ধর্ম থেকে, রাষ্ট্র থেকে। আজ যেটা স্বতঃসিদ্ধ, সেটা আসলে বহু শতকের আবেগী সংঘর্ষের ফল।
তাই ইতিহাসকে যদি শুধু facts-এর হিসাবের খাতা বানাই, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাই বাদ পড়ে যায়; মানুষ। আইন বদলায় কারণ কেউ কাঁদে। বিপ্লব হয় কারণ কেউ আর লজ্জা সহ্য করতে পারে না। সমাজ এগোয় কারণ কেউ অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের বলে মেনে নিতে শেখে। অনুভূতি কোনো দুর্বলতা নয়। অনুভূতিই ইতিহাসের আসল ইঞ্জিন। আর এই ইঞ্জিনের কথা না বললে, ইতিহাসটা শেষ পর্যন্ত আধখানা গল্প হয়েই থেকে যায়।
আজ আমরা প্রেমকে যে ভাবে বুঝি, সেটা আদৌ চিরকালীন কোনো সত্য নয়। বরং ইতিহাসের হিসেবে দেখলে, এই আধুনিক প্রেমবোধ বেশ নতুন আবিষ্কার। প্রাচীন গ্রিক আর রোমান লেখকদের কাছে প্রেম ছিল একটা বিপজ্জনক ব্যাধি; খামখেয়ালি দেবতাদের পাঠানো দুর্যোগ, যা মানুষের ভালোর বদলে, নায়কদের সর্বনাশ করে। সেই জগতে বীরত্ব অর্থ যুদ্ধক্ষেত্রে গৌরব, সহযোদ্ধাদের প্রতি আনুগত্য। প্রেম? সেটা বড়জোর পার্শ্বটীকা। জীবনের মূল কাহিনিতে তার বিশেষ প্রবেশাধিকার ছিল না।
তারপর প্রায় ১১০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, দক্ষিণ ফ্রান্সে, একদল ভবঘুরে কবি হাজির হল। বললো, প্রেমে পড়া মানুষের জীবনের সবচেয়ে অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে। এরা নতুন ভাষা তৈরি করেছিল। প্রেমের জন্য একেবারে আলাদা সাহিত্যিক শব্দভাণ্ডার। তাদের গানে প্রেম মানে সর্বগ্রাসী শক্তি, যা জীবনকে উদ্দেশ্য দেয়, দিশা দেয়। লেখক C. S. Lewis একে বলেছেন “মানব অনুভূতির ইতিহাসে একেবারে সত্যিকারের পরিবর্তন।”
মধ্যযুগের ল্যান্সেলট আর গিনিভিয়ারের গল্পটা ধরলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। রানির চুলে জড়ানো একটা চিরুনি যখন ল্যান্সেলটের হাতে আসে, সে সেই চুলের প্রতিটা গুচ্ছ মুখের বিভিন্ন অংশে ছুঁইয়ে দেখে; প্রায় উপাসনার ভঙ্গিতে। তারপর সেগুলো সে জামার ভেতর, বুকের ঠিক উপর রেখে দেয়। প্রিয় মানুষের কোনো বস্তু নিয়ে এই রকম শারীরিক, প্রায় উন্মত্ত ভক্তি আগের যুগের মানুষের কাছে একেবারেই অবোধ্য লাগত। তখন প্রেম এমন কিছু নয়, যা শরীর আর আবেগকে এইভাবে গ্রাস করতে পারে।
এই আবেগী রূপান্তর শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কে থামেনি, ধর্মীয় জীবনেও ঢুকে পড়েছিল। আগের শতকের ক্রুশবিদ্ধ যিশুকে দেখানো হতো সোজা হয়ে দাঁড়ানো, চোখ খোলা, ঐশ্বরিক শক্তিতে দীপ্ত। কিন্তু ত্রয়োদশ শতক থেকে শিল্পীরা দেখাতে শুরু করল তাঁর যন্ত্রণা; বাঁকা হয়ে যাওয়া অঙ্গ, খোলা ক্ষত, যন্ত্রণায় বিকৃত মুখ। ইউরোপ জুড়ে মানুষ প্রকাশ্যে কাঁদত; শোভাযাত্রায়, জনসমাগমে। প্রবল আবেগ দেখানো তখন দুর্বলতা নয়, বরং গভীর আধ্যাত্মিকতার চিহ্ন হয়ে উঠল।
সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত বিষয়, এই আবেগপ্রবণতার মোড় রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বাস্তব ফল এনে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি তৃতীয় এই নতুন সংবেদনশীলতার এক দৃষ্টান্ত। সামরিক নেতারা তাঁকে দুর্বল আর অকর্মণ্য বলে বিদ্রূপ করতেন। অথচ তিনি নিজে কুষ্ঠরোগীদের সেবা করতেন, সারা দেশে হাসপাতাল তৈরি করিয়েছিলেন, আর প্রতিদিনের কল্যাণমূলক ব্যবস্থায় শত শত মানুষকে খাওয়াতেন। সমালোচকরা যেখানে বিপর্যয় আশা করছিল, সেখানে তাঁর সহমর্মিতাভিত্তিক শাসন এনে দিল স্থিতিশীলতা; যা আক্রমণাত্মক শাসকেরা পারেননি।
হেনরির শান্ত কূটনীতি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি নিশ্চিত করল, অর্থনীতি অভূতপূর্বভাবে বাড়ল, আর প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের প্রাথমিক রূপ গড়ে উঠতে শুরু করল। ভবঘুরে কবিদের হাত ধরে পশ্চিমী সংস্কৃতি বুঝতে শিখল; আবেগ লুকিয়ে রাখা নয়, বরং প্রকাশ করাই শক্তি হতে পারে। সহমর্মিতা দুর্বলতা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার উৎস। এই বোধটাই পরে ইউরোপীয় ইতিহাসের ভিত নাড়িয়ে দিল চুপচাপ।
আধুনিক প্রেম আর প্রকাশ্য আবেগ বেশ লম্বা সময় ধরে রাজত্ব করেছিল। কিন্তু ইতিহাসে কোনো আবেগই চিরস্থায়ী নয়। ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি অষ্টমের শাসনামলে রিফরমেশন একেবারে উল্টো স্রোত বইয়ে দিল। এই নতুন সংস্কৃতিতে চোখের জল সন্দেহজনক, সহমর্মিতা প্রায় অপরাধ। আবেগকে আর আধ্যাত্মিক গভীরতা নয়, দুর্বলতা হিসেবে দেখা শুরু হল। ধর্মের সংস্কারের নামে চালু হল এক নিষ্ঠুর, নিরাবেগ শাসনব্যবস্থা, যেখানে কাঁদা মানেই বিশ্বাসের ঘাটতি।
হেনরি অষ্টমের প্রশাসনিক সংস্কারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল মঠগুলোর ধ্বংস। শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে চালানো হল ফাঁসি, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, আর পবিত্র স্থাপত্যের পরিকল্পিত নিশ্চিহ্নকরণ। ১৫৩০-এর দশকে রাজকীয় কমিশনাররা ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রকাশ্যে হত্যা করা শুরু করে। গোটা মঠ নিলামে উঠল মাত্র নব্বই পাউন্ডে। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই জায়গায় দাঁড়াল এক ব্যক্তিগত প্রাসাদ। পবিত্রতা ইতিহাসে পরিণত হল, সম্পত্তি হয়ে উঠল বাজারদর।
এই সময়ের সংস্কারকরা আবেগকে শুধু নিষিদ্ধই করেননি, অপমানিতও করেছেন। আর্চবিশপ ম্যাথিউ পার্কার স্পষ্ট বলেছিলেন, মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করা লজ্জাজনক, “নারীসুলভ” এবং “পশুসুলভ”। ঠিক এই সময়েই ইংরেজি ভাষায় ঢুকে পড়ে “maudlin” বা “ছিঁচকাঁদুনে” শব্দটি। বিদ্রূপটা হল, শব্দটার উৎস বাইবেলের দৃশ্য, যেখানে মেরি ম্যাগদালেন খ্রিস্টের সমাধির সামনে কাঁদছেন। আবেগের যে ছবি একদিন ভক্তির প্রতীক ছিল, তা-ই হয়ে উঠল উপহাসের নাম।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচারেও। কবরের পাশে কাঁদা এখন প্রমাণ করে দিত যে মৃতের পুনরুত্থানে তোমার বিশ্বাস যথেষ্ট নয়। শোককে ধর্মীয় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা শুরু হল। এই কঠোরতা ঢুকে পড়ল অর্থনৈতিক নীতিতেও। শত শত মঠ-চালিত চিকিৎসালয় আর আশ্রয়কেন্দ্র প্রায় রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল। যারা এতদিন আশ্রয়, চিকিৎসা আর খাবারের জন্য এগুলোর ওপর নির্ভর করত, তারা হঠাৎ ছিটকে পড়ল।
দারিদ্র্যকে আর সামাজিক পরিস্থিতি নয়, নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হল। ফলে পরিবার থেকে পরিবার, গ্রাম থেকে গ্রামে অন্তহীন ঘুরে বেড়ানো; শুধু বেঁচে থাকার খোঁজে। সহানুভূতির জায়গায় এল নিয়ম, আর নিয়মের জায়গায় এল শাস্তি।
এই ধ্বংসাত্মক উন্মাদনার সবচেয়ে নগ্ন রূপ দেখা যায় William Dowsing–এর কর্মকান্ডে। তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল ‘স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার’ হিসেবে। পনেরো মাসে তিনি প্রায় আড়াইশো গির্জা তছনছ করেন। নিজের ডায়েরিতে তিনি নিখুঁত হিসাব রেখেছেন; কোথায় কতগুলো ছবি ভাঙা হল, কোথায় কাচের দেবদূত চূর্ণ করা হল। তিনি এমনকি সমাধিফলকও ধ্বংস করেছেন, যেখানে মৃতদের জন্য প্রার্থনার অনুরোধ খোদাই করা ছিল। শতাব্দীপ্রাচীন কবর খুঁড়ে প্রতিষ্ঠাতাদের চিহ্ন মুছে দেওয়া হয়েছে নির্বিকার ভাবে।
আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রোটেস্ট্যান্ট কঠোরতা একই সময়ে ইতালিতে জন্ম নেওয়া রেনেসাঁ শিল্পদর্শনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। মাইকেলেঞ্জেলো ফ্লেমিশ চিত্রকলাকে তাচ্ছিল্য করতেন, কারণ সেগুলো দর্শকের চোখে জল আনে। তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ শিল্প মানে সংযম, গাম্ভীর্য, ‘মার্জিত সরলতা’। একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে শিল্প। ফলাফল দাঁড়াল এক নতুন মানসিকতা—আরও শুষ্ক, আরও নিয়ন্ত্রিত, আর মানুষের এলোমেলো অনুভূতির সঙ্গে অনেক বেশি দূরত্ব রাখা। যেখানে এক সময় আবেগ ছিল শক্তির উৎস, সেখানে এখন আবেগই সন্দেহের বস্তু। ইতিহাস এখানে আবার দেখিয়ে দিল, অনুভূতির ওঠানামা পুরো সভ্যতার চরিত্রই বদলে দিতে পারে।
১৭৪০ সালে উপন্যাস Pamela প্রকাশ হওয়ার পর ইউরোপ জুড়ে পাঠকেরা কাঁদতে শুরু করেছিল। তারা কাঁদছিল এক গৃহপরিচারিকা মেয়ের জন্য; যে এক ক্ষমতাবান অভিজাতের শিকারি লালসার বিরুদ্ধে নিজের মর্যাদা বাঁচাতে লড়ছে। সমালোচকেরা এই নতুন আবেগপ্রবণতাকে ব্যঙ্গ করে বলেছিল, এটা নাকি “cult of feeling”; একটা বিপজ্জনক, নির্বোধ হুজুগ। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক গভীর কিছু ঘটছিল, যেটা তারা তখন ধরতে পারেনি। লেখক Samuel Richardson–এর চিঠির আকারে লেখা উপন্যাসের কৌশলটাই এখানে মূল। চরিত্ররা যেন ঘটনাগুলো ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই চিঠি লিখছে; কাঁচা, অপরিবর্তিত আবেগ নিয়ে। ফলে পাঠক পামেলার সেই কষ্টের মধ্যে ঢুকে পড়ছিল। এই মানসিক ঘনিষ্ঠতা আগে সাহিত্যে ছিল না। পাঠ আর অনুভবের মাঝের দেয়ালটা ভেঙে যাচ্ছিল।
কিন্তু এই দ্বিতীয় আবেগী বিপ্লব শুধু পড়ার অভ্যাস বদলায়নি। প্রায় সমাজটাই নতুন করে বানাতে শুরু করেছিল। একই সময়ে দার্শনিক David Hume আর Adam Smith আরেকটা সমান্তরাল উপলব্ধিতে পৌঁছচ্ছিলেন। তাঁদের মতে, মানুষের মানবিকতা যুক্তি থেকে নয়, অনুভূতি থেকে জন্মায়। আমরা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হই সহানুভূতির মাধ্যমে; নিজেকে অন্যের স্থানে কল্পনা করে।
স্মিথ বলেছিলেন, আমরা ভালো-মন্দ বিচার করি এই ভেবে যে এক নিরপেক্ষ দর্শক কী ভাবত। এই প্রক্রিয়াটা আসলে আবেগী। কল্পনা আর অনুভূতি এখানে কেন্দ্রে। মানবিকতা মানে অন্যের অবস্থায় নিজেকে বসিয়ে দেখা।
এই আবেগী বিপ্লব ধর্মেও ঢুকে পড়ল। ১৭৩৮ সালে Wesley brothers–এর হাত ধরে শুরু হওয়া মেথডিস্ট আন্দোলন ধর্মকে নিয়ে এল খোলা মাঠে। বিশাল সমাবেশ, উত্তেজিত ভাষণ, চোখের জল, আর “Amazing Grace”–এর মতো স্তোত্র, যেখানে যিশু দূরের বিচারক নন, ব্যক্তিগত বন্ধু। প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় মহল এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়েছিল; এত প্রকাশ্য আবেগ নাকি অশালীন। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ এই ধর্মে পেল মুক্তির স্বাদ, কারণ এখানে ঈশ্বর আর অভিজাতদের একচেটিয়া সম্পত্তি নন।
সমালোচকেরা তখনও, আজও, একটা জিনিস মিস করে যায়; এই কান্নাগুলো কোথাও গিয়ে থেমে থাকেনি। Thomas Coram লন্ডনের রাস্তায় শিশুদের মরতে দেখে দুই দশক ধরে সমর্থন জোগাড় করেছিলেন Foundling Hospital গড়ার জন্য। উদ্দেশ্য একটাই; শিশুদের জীবন একটু ভালো করা।
আর সমাজসংস্কারক John Howard কারাগার ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটালেন নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে। দণ্ডিত অপরাধীকেও তিনি মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, যাদের যত্ন পাওয়ার অধিকার আছে। একই ভাবে কোয়াকার আর ইভানজেলিকাল গোষ্ঠীগুলো আবেদনপত্র, উপদেশ আর পুস্তিকা ছড়িয়ে জনমত গড়ে তুলল। শেষ পর্যন্ত Parliament ১৮০৭ সালে দাসব্যবসা নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হল।
নতুন সহানুভূতির জন্ম আর বাস্তব পরিবর্তনের মাঝে প্রায়ই দশকের পর দশক লেগেছে। দেশের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষ, অনানুষ্ঠানিকভাবে জড়ো হয়ে, নিজেদের অনুভূতিকে সংগঠিত করলো। শুধু অনুভূতি থাকলে তা ফাঁপা। কিন্তু সহানুভূতি থেকে জন্ম নেওয়া কাজ; সেটাই প্রতিষ্ঠিত নিষ্ঠুরতাকে উল্টে দিতে পারে। ইতিহাসের আসলে সেই কথাই প্রমাণ করে।
এক সময় এসে কান্না থামতেই হল। ১৭৯০–এর দশকে ব্রিটেন তখন নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, দেশের ভিতরে ভিন্নমত চেপে ধরছে, আর বাইরে গড়ে তুলছে এক বিশাল সাম্রাজ্য। এই পরিস্থিতিতে আবেগী উপন্যাস পড়ে চোখ ভেজানো শুধু লজ্জার নয়, বিপজ্জনক বলেই মনে হতে শুরু করল। ঠিক এই সময়েই Napoleon Bonaparte–এর ছায়া ইউরোপ জুড়ে পড়ছে, আর আবেগ নিয়ে ধৈর্য হারাচ্ছে ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী সমাজ।
যখন French Revolution ধীরে ধীরে সন্ত্রাসের যুগে গিয়ে ঠেকল, তখন বলা হল, এই রক্তপাতের জন্য দায়ী অতিরিক্ত আবেগ; সেই একই সংবেদনশীলতা, যেটাকে বিপ্লবী দার্শনিকেরা, বিশেষ করে Jean-Jacques Rousseau, মহিমান্বিত করেছিলেন। বিদ্রূপটা এখানেই শেষ নয়। Maximilien Robespierre নিজে কোমল অনুভূতির ভাষায় কথা বলতেন, যখন গিলোটিন অবিরাম নামছে। বার্তাটা পরিষ্কার হয়ে গেল; যুক্তিহীন আবেগ মানেই বিশৃঙ্খলা।
এই মানসিক মোড়বদলের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ Mary Wollstonecraft। ১৭৮৮ সালে তিনি sensibility–কে আত্মার সবচেয়ে সূক্ষ্ম অনুভূতি বলে দাবী করেন। কিন্তু চার বছরের মধ্যেই তাঁর অবস্থান পুরো উল্টো। নারীর অধিকারের পক্ষে লেখা তাঁর বিপ্লবী গ্রন্থে তিনি নরমতা আর কোমলতাকে সরাসরি দুর্বলতা বলে খারিজ করলেন। আবেগ আর আর মুক্তির ভাষা নয়, সন্দেহের বিষয়।
এরপর এল ‘নয়া পুরুষত্ব’-এর যুগ। সাহস, আত্মসংযম, আর সব কিছুর উপরে আবেগ সংযম। দুর্বলতা দেখানো যাবে না, কাঁদা চলবে না। এই নীতিবাক্যগুলো কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রগঠনেই থামেনি, সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ইচ্ছে করেই এই আবেগহীনতা ব্যবহার করত নিজেদের শাসিত মানুষের থেকে দূরত্ব তৈরির জন্যে।
ভারতের রাজারা যখন নিজেদের রাজ্য হারানোর সময় দরকষাকষিতে কাঁদতেন, ব্রিটিশ অফিসারদের চোখে সেটা করুণা নয়, তাচ্ছিল্য। প্রতিটা অশ্রু পড়ত ‘অযোগ্যতা’র প্রমাণ হিসেবে। এই ব্যাখ্যাই আরও দমনকে ন্যায্য করে তুলত। আবেগ এখানে ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠল।
তবু উনিশ শতকের মাঝামাঝি আরেকটা সাংস্কৃতিক স্রোত দেখা দিল। সমালোচকেরা আর আবেগী সাহিত্যকে শুধু কাঁদুনি আর আত্মমগ্ন বলে উড়িয়ে দিচ্ছিল না। এবার তাদের ভয় হচ্ছিল; এগুলো কাজ করছে। বিশেষ করে Charles Dickens–এর মতো লেখকদের নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হল। ভালোমন্দের স্পষ্ট মানবিক গল্প দিয়ে তিনি পাঠকের উপর অসম্ভব প্রভাব ফেলছেন; এই অভিযোগ উঠল। এক সমালোচক খোলাখুলি লিখলেন, ডিকেন্সের লেখা তরুণ পাঠকের উপর রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কারণ নতুন সাক্ষর হওয়া শ্রমজীবীরা তখন সংসদ, আদালত আর ওয়ার্কহাউস সংস্কারের কথা ভাবতে শুরু করেছে। আটলান্টিকের ওপারে পরিস্থিতি আরও তীব্র। Harriet Beecher Stowe, Uncle Tom’s Cabin–এর লেখক, দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এমন প্রতিরোধের মুখে পড়লেন যে “Anti-Tom” উপন্যাস নামে গোটা এক নতুন ঘরানা তৈরি হল। সেখানে বলা হল, দাসপ্রথা ঈশ্বরনির্দিষ্ট, আর দাসেরা নাকি সুখেই আছে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত স্টোর পক্ষেই রায় দিল, কিন্তু তখনকার লড়াই ছিল বিষাক্ত।
এরপর এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। উনিশ শতকের পুরুষত্বের আদর্শ যেন চূড়ান্ত পরীক্ষায় নামল। Oscar Wilde–এর ছেলে সাইরিলের মতো তরুণেরা নিজেদের ‘পুরুষ’ প্রমাণ করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ প্রাণ হারাল। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দিল, এই আদর্শ কতটা ফাঁপা আর কতটা চড়া মূল্যের। ডিকেন্সকে ঘিরে সমালোচকদের যে আপত্তি শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম নিল এক সাংস্কৃতিক বিভাজন, যা আজও টিকে আছে। একদিকে এমন শিল্প, যা হৃদয় নাড়িয়ে মানুষকে কাজে নামাতে চায়। অন্যদিকে এমন শিল্প, যা আবেগকে সন্দেহ করে, আর নিখুঁত ফর্মকেই চূড়ান্ত মূল্য মনে করে। ইতিহাস দেখিয়েছে, এই টানাপড়েন কোনোদিনই মেটে না; শুধু রূপ বদলায়।
বিশ শতকের গোড়ায় শিল্পজগতে এক নতুন ভূমিকম্প ঘটল। কী শিল্প, আর কী শিল্প নয়—এই সংজ্ঞাই নতুন করে লেখা হল। আর এই নতুন যুগে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠল মানুষের অনুভূতি। কিশোর Pablo Picasso–এর কথাই ধরুন । বয়স মাত্র ষোলো। বিশাল এক ক্যানভাসে সে আঁকছে Science and Charity—একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক মরণাপন্ন রোগীর পাশে বসে আছেন। ছবিটায় চিকিৎসকের সহমর্মিতা এমন সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়েছে যে আজও সেটা চোখে লাগে। পিকাসো সারা জীবন এই কাজটা নিয়ে গর্ব করেছেন। কিন্তু পরের প্রজন্মের সমালোচকেরা এই আন্তরিকতাকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করল। ছবিটাকে বলা হল “sanctimonious”; অতি নীতিবাগীশ, অতিরিক্ত হৃদয়ঘেঁষা।
এই আক্রমণটা ছিল পরিকল্পিত। আধুনিকতাবাদী সমালোচক Clive Bell আবেগের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে টেনে আনলেন বাস্তবানুগ শিল্পী Luke Fildes–এর The Doctor ছবিটা। বেলের যুক্তি ছিল নির্মম—সত্যিকারের শিল্প মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। শিল্পের কাজ রং, আকার আর স্থানিক সম্পর্ক নিয়ে। সহানুভূতি, ভক্তি, ভালোবাসা; এগুলো নাকি দূষণ, যা শিল্পকে তার শুদ্ধ, বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতা থেকে নামিয়ে আনে।
এই ভণ্ডামিটা চোখে পড়ে যখন জানা যায়, বহু মহান আধুনিক শিল্পী নিজেরাই এই তথাকথিত আবেগী শিল্পে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। Vincent van Gogh প্রায় দশ বছর ধরে লুক ফিল্ডসের একটি উডকাট নিজের কাছে রেখেছিলেন। সেই ছবির আবেগ তাঁকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে সেটাই পরে তাঁর বিখ্যাত Yellow Chair–এর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। এক প্রজন্মের শিল্পীরা যেটাকে গভীর শক্তিশালী বলে মনে করেছিলেন, পরের প্রজন্মের সমালোচকেরা সেটাকেই বললেন নকল আবেগ, সস্তা নাটক।
কিন্তু এই নান্দনিক বিপ্লবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও কুৎসিত, নগ্ন শ্রেণিঅহংকার। লেখক Arnold Bennett সংবেদনশীল উপন্যাস লিখেছেন, আবার আধুনিক শিল্পীদেরও সমর্থন করেছেন—Anton Chekhov থেকে পিকাসো পর্যন্ত। তবু ব্লুমসবারি গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে লাগাতার আক্রমণ করেছেন ভালগার বলে। তাদের চোখে সাধারণ পাঠকের জনপ্রিয়তা মানেই নিম্নমানের কাজ।
এই মানসিকতা সবচেয়ে স্পষ্ট Virginia Woolf ও তাঁর দল। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, সাধারণ মানুষ যদি কোনো লেখা ভালোবাসে, তবে সেটা নিশ্চয়ই গভীর নয়। আবেগের প্রতি এই ঠান্ডা অবজ্ঞা শুধু সাহিত্যেই থামেনি। এর রাজনৈতিক ফলও ছিল অন্ধকার। এই বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদ, ইউজেনিক্স আর গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণার দিকে ঝুঁকেছিলেন।
এর চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ইতালীয় কবি Filippo Tommaso Marinetti–র Futurist Manifesto–তে। সেখানে যুদ্ধকে বলা হল “the world’s only hygiene”—পৃথিবীর একমাত্র শুদ্ধিকরণ। মানুষের অনুভূতিকে অস্বীকার করার শেষ পরিণতিটা এখানে স্পষ্ট—সহিংসতা, কঠোরতা, আর সাধারণ মানবজীবনের প্রতি বিপজ্জনক অবজ্ঞা। এইভাবে আবেগকে তাড়াতে গিয়ে আধুনিকতাবাদী প্রকল্প আসলে মানুষকেই দূরে সরিয়ে দিল। শিল্প বাঁচল কি না, সে বিতর্ক আলাদা। কিন্তু যে জিনিসটা হারিয়ে গেল, সেটা হল শিল্প আর মানুষের মধ্যেকার সহজ, কিন্তু জরুরি সম্পর্ক—অনুভূতির সম্পর্ক।
১৯৬৭ সালে কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্রিটেনে তিনটে বড় বদল ঘটে গেল। সমকামিতা অপরাধের তালিকা থেকে বাদ পড়ল, গর্ভপাত বৈধ হল, আর মৃত্যুদণ্ড উঠে গেল। দু’বছর পর বিবাহবিচ্ছেদের আইন শিথিল হল। একসঙ্গে ধরলে, এটাকে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় নৈতিক রূপান্তর বলা যায়। প্রশ্ন হল, এত দ্রুত কীভাবে সম্ভব হল? দার্শনিক তর্ক দিয়ে নয়। আরও সরলভাবে বললে, সাধারণ মানুষ কঠোর আইনে ভোগা মানুষদের জন্য সহানুভূতি বোধ করতে শুরু করেছিল।
এই পরিবর্তনের প্রতীকী ঘটনা ১৯৫৪ সালের Montagu case। লর্ড মন্টাগু ও আরও দু’জনকে সম্মতিক্রমে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িত থাকার জন্য জেলে পাঠানো হয়। এই শাস্তির মানবিক মূল্যটা যখন সামনে আসে, তখন জনমত নড়তে শুরু করে। ১৯৫৭ সালে সমকামিতা অপরাধমুক্ত করার পক্ষে সমর্থন ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে। মানুষ আইন নয়, মানুষকেই দেখতে শুরু করেছিল।
একই ধারা দেখা যায় অন্য ক্ষেত্রেও। মৃত্যুদণ্ড উঠে যায় তখনই, যখন ভুল রায়ে ফাঁসির ঘটনা; বিশেষ করে Timothy Evans–এর মতো কেস; অন্যায়কে অস্বীকার করা অসম্ভব করে তোলে। বিবাহবিচ্ছেদ সংস্কার সম্ভব হয় যখন মানুষ নিজের বন্ধু, পরিচিতদের নিঃসঙ্গ, ভালোবাসাহীন দাম্পত্যে আটকে থাকতে দেখে। বিমূর্ত নীতি নয়, পরিচিত মুখ; এইটাই আইনের গতি বদলায়।
ধীরে ধীরে সমাজ শিখল সহানুভূতির সীমানা বাড়াতে হবে। রক্ষণশীলরা বিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। নৈতিক শিথিলতা নাকি বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে। কিন্তু পরের তিরিশ বছরে দেখা গেল উল্টো চিত্র। হত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চুরি, ডাকাতি, সহিংস অপরাধ সবই কম। যে নৈতিক ধসের কথা বলা হচ্ছিল, তার কোনো বাস্তব প্রমাণ মিলল না।
১৯৯৭ সালে Princess Diana–র মৃত্যু এই বিভাজনটা আবার স্পষ্ট করে দিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রকাশ্যে কাঁদল, এটাকে স্বাভাবিক শোক বলে দেখল। আবার অনেকে একে বলল “আবেগের কার্নিভাল”—অশোভন, বিপজ্জনক আবেগপ্রবণতা। জাতি যেন দু’ভাগ হয়ে গেল। একদল মনে করল প্রকাশ্য আবেগ মানবিকতার চিহ্ন, আরেকদল ভাবল এটা দুর্বলতা।
এই একই বিভাজন আজও চলছে। আপত্তিকর শব্দ, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার মান্য করা, সেফ স্পেস—এসবকে তারা দেখছে বাড়াবাড়ি হিসেবে। তাদের আদর্শে আছে কঠোরতা, শৃঙ্খলা, আত্মসংযম, সহানুভূতি সেখানে সন্দেহজনক। কিন্তু যে সমাজ আবেগ অনুভব করতে পারে, সে দুর্বল নয়—সে বিস্তৃত হয়। অন্যের জন্য অনুভব করার ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণে আবেগকে জায়গা দেওয়া, প্রয়োজনে কাঁদতে পারা; এগুলো সভ্যতার লক্ষণ, যেখানে আরও বেশি মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখা শেখা হচ্ছে। অসম্পূর্ণ, দ্বিধায় ভরা হলেও এই শেখাটা বাস্তব। আবেগ মানব অগ্রগতির চালিকাশক্তির মধ্যেই সে আছে। ইতিহাস এগিয়েছে কাঁদতে কাঁদতেই—আর সেখানেই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।



