কবিতার কোনো সুনির্দিষ্ট আভিধানিক অর্থ থাক বা না থাক, তার একটি ক্ষমতা আছে যা অভিধানের কলামে ধরা পড়ে না, কোনো যুক্তিবাদী ব্যাখ্যার কাঠামোতেও পুরোপুরি বন্দি হয় না; সেই ক্ষমতার জোরেই কবিতা বিশ্লেষণী মনের প্রহরা এড়িয়ে হৃদয়ের অন্তঃপুরে প্রবেশ করে, যেন অনুমতির দরকার নেই, যেন সে তার নিজস্ব অধিকারেই সেখানে পৌঁছয়। এই কারণেই কবিতা পড়া আর কবিতা বোঝা এক জিনিস নয়; বোঝার চেষ্টায় আমরা যেখানে থামি, কবিতা ঠিক সেখান থেকেই তার কাজ শুরু করে। আমাদের দেশের আলঙ্কারিকরা বহু আগেই এই দ্বৈততার দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন। তাঁরা কাব্যের দুই প্রকার অর্থের কথা বলেছেন; একটি তার বাচ্যার্থ, যাকে বলা যায় প্রকাশ্য, উচ্চারিত, ভাষার শরীরে লেগে থাকা অর্থ; আরেকটি তার ব্যঙ্গার্থ, অর্থাৎ ধ্বনি, যা শব্দের আড়ালে থেকে, শব্দকে অতিক্রম করে, পাঠকের চেতনায় ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। সেই বাচ্যার্থ প্রয়োজনীয় হলেও চূড়ান্ত নয়; রসবাদীদের মতে এই দুই অর্থের মধ্যে প্রভেদ কেবল পরিমাণগত নয়, গুণগতও, এতটাই মৌলিক যে প্রথমটিকে তাঁরা লৌকিক এবং দ্বিতীয়টিকে অলৌকিক বলে চিহ্নিত করতে দ্বিধা করেননি।
এই অলৌকিকতার কথাটা আধুনিক কানে কিছুটা অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে, কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এর মধ্যে কোনো কুসংস্কার নেই, আছে কাব্যানুভবের একটি সূক্ষ্ম সত্য। কবিতা যখন সত্যিই কবিতা হয়ে ওঠে, তখন সে অনুভব সৃষ্টি করে; সে শুধু কী বলা হলো তা জানায় না, বরং কী বলা গেল না, কী বলা অসম্ভব ছিল, সেই নীরবতাকেও পাঠকের কাছে উপস্থিত করে। এইখানেই ধ্বনির কাজ, এইখানেই কবিতার প্রেমের সঙ্গে মিল। প্রেম যেমন সরাসরি বলা যায় না, কবিতাও তেমনি সরাসরি বোঝানো যায় না; উভয় ক্ষেত্রেই ইঙ্গিত, আভাস, নীরবতা, সংযম, অতিশয়ের মাঝখানে সত্যের বাস।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আজ বাংলা কবিতার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে কবিতা মোটেও বিদ্রোহের হাতিয়ার নয়; আবার কেবল আত্মমগ্ন সৌন্দর্যচর্চা বা গীতল আবেগের আশ্রয়ও নয়। বরং এই কবিতা নানা বিপরীত প্রবণতার মধ্য দিয়ে নিজের ভাষা খুঁজে নিয়েছে। একদিকে আছে তীব্র মনন, বিতর্ক, সংশয়, ক্লান্তি; অন্যদিকে আছে নিঃশব্দ বিস্ময়, প্রকৃতির সঙ্গে একান্ত সংলাপ, প্রেমের অনির্বচনীয় আকুতি। আধুনিকতার প্রকৃত লক্ষণই হলো এই বহুত্ব, এই অসমমিতি, এই পরস্পরবিরোধের সহাবস্থান।
সমালোচকরা প্রায়ই যুগ, আন্দোলন, প্রবণতা দিয়ে কবিতাকে চিহ্নিত করতে চান। এতে একটি সুবিধা আছে, ইতিহাস লেখার সুবিধা। কিন্তু এতে একটি বড় ক্ষতিও আছে; কবিতার জীবন্ত সত্তা, তার স্বতন্ত্র স্বর, তার ব্যক্তিগত ঝুঁকি, অনেক সময়ই আড়ালে চলে যায়। একই সময়ে জন্ম নেওয়া কবিরাও যে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে বাস করতে পারেন, এই সত্য মেনে নিতে সমালোচনার মন সবসময় প্রস্তুত থাকে না। অথচ পাঠকের অভিজ্ঞতা প্রায়ই বলে দেয়, এক কবির কাছে যা দুর্বোধ্য বা শীতল, অন্য কবির কাছে তা গভীরভাবে স্পর্শকাতর; এক কবির নীরবতা যেখানে শূন্য বলে মনে হয়, অন্য কবির নীরবতা সেখানে অর্থে টইটম্বুর।
এই কারণেই যুগ সংকলনের উদ্দেশ্য যদি কেবল প্রতিনিধিত্ব করা হয়, তাহলে সে কাজ যান্ত্রিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় পাঠকের সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তোলা, তাকে বিভিন্ন স্বরের সঙ্গে পরিচিত করানো, তাহলে সেখানে অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও একটি সৎ প্রয়াস সম্ভব। কোনো যুগের কবিতাকে এক কথায় ধরা যায় না, কোনো আন্দোলনের চরিত্র এক বাক্যে নির্ণয় করা যায় না। ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, একই আন্দোলনের ভেতরেই কত বিপরীত প্রবণতা সক্রিয় থাকে, কত আত্মবিরোধী স্রোত পাশাপাশি বয়ে চলে। সাহিত্য সেই জটিলতারই প্রতিফলন, মানুষের চিত্তের নির্যাস বলেই সে কোনো সরল সূত্র মানে না।
বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও তাই। এখানে বিদ্রোহ আছে, কিন্তু তার পাশেই আছে স্বপ্নে আত্মসমর্পণ; নাস্তিকতার তীক্ষ্ণ উচ্চারণের পাশেই আছে বিশ্বাসের নতুন ভাষা; রোমাণ্টিকতার বিরোধিতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের জন্য হাহাকার। একই কবির রচনাতেও কখনো কখনো এই বিপরীত সুরগুলো শোনা যায়। ফলে আধুনিক কবিতাকে কোনো একক চিহ্নে শনাক্ত করতে গেলে বোধের বিকৃতি অনিবার্য।
তবু যদি কিছু বলতে হয়, তবে এটুকু বলা যায়; রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় যে নতুন সুরের আবির্ভাব, আধুনিক কবিরাই তার প্রধান বাহক। এবং এই নতুনত্ব একরকমের নয়; প্রত্যেক কবিই নিজের মতো করে নতুন, নিজের মতো করেই স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেই আধুনিক কবিতার শক্তি, এবং পাঠকের প্রকৃত লাভও সেখানেই; যদি তিনি কোনো ফর্মুলার খোঁজ না করে, সংবেদনশীল মন নিয়ে কবিতার মুখোমুখি হতে রাজি থাকেন।
এই দৃষ্টিতে কবিতা পড়ার অর্থ নিজের অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করা। কবিতা আমাদের শেখায়, সব কথা বলা যায় না, সব অর্থ ধরা পড়ে না; তবু সেই না-বলা,অধরা অংশটাই অনেক সময় সবচেয়ে সত্য। এইখানেই কবিতার সঙ্গে প্রেমের মিল, এইখানেই তার অলৌকিকতা; যা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির নাম নয়, বরং মানুষের অনুভবের গভীরতারই আরেক নাম।


