যতীন সরকারের একটা ভিডিও দেখলাম সেখানে উনি বলেছেন, “যারা লেখাপড়া কম জানে তারাই বেশি লেখে।”
আমরা যারা বইপত্র নিয়ে দিনরাত ঘাঁটাঘাঁটি করি, তাদের কানে কথাটা পড়লে একটু আরামও লাগে। অনেকের মনে হয়, আহা, আমি যে আজকাল কিছু লিখতে পারছি না, তার কারণ নিশ্চয়ই আমার জ্ঞান বেড়ে গেছে। জ্ঞানের ভারে কলম উঠছে না। আর যে লোকটা আমার মতো প্রতিদিন চারখানা পোস্ট লিখছে, তার বেচারার লেখাপড়া কম। আমার আসলেই লেখা পড়া কম। আমি SSC পাশ।
কিন্তু এমন একটা যুক্তি চালু হয়ে গেলে লেখকদের বড় সুবিধা হয়। কেউ জিজ্ঞেস করল, “নতুন লেখা কই?” আমি চশমাটা একটু নাকের ডগায় নামিয়ে বলতে পারি, “ভাই, আজকাল বেশি পড়ে ফেলেছি।” ব্যস। সাহিত্যিক মর্যাদাও রইল, আলস্যটাও ধরা পড়ল না।
কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, কথাটা রসিকতা হিসেবে চমৎকার হলেও সাধারণ সত্য হিসেবে দাঁড় করানো কঠিন। কারণ লেখাপড়া আর লেখা এক জিনিস নয়। আবার এ দুটো একেবারে আলাদাও নয়। একজন মানুষ কতটা পড়েছেন, কতটা শিখেছেন, কতটা ভেবেছেন এবং কতটা লিখছেন, এই চারটা জিনিসের সম্পর্ক খুব জটিল। সেখানে একটা সোজা লাঠি দিয়ে দাগ টেনে বলা যায় না, যে বেশি জানে সে কম লেখে, আর যে কম জানে সে বেশি লেখে।
তা হলে রবীন্দ্রনাথের কী হবে? লোকটি জীবনভর পড়লেন, শিখলেন, লিখলেন। কবিতা লিখে ক্ষান্ত হলেন না, গল্প লিখলেন, উপন্যাস লিখলেন, নাটক লিখলেন, প্রবন্ধ লিখলেন, চিঠি লিখলেন, গান লিখলেন। জমিদারি দেখতে গিয়ে নৌকায় বসেও লিখলেন। জাপান গেলেন, আমেরিকা গেলেন, রাশিয়া গেলেন, সেখান থেকেও লিখলেন। এত লিখেছেন যে তাঁর রচনাবলি দেখলে আমার মতো সাধারণ মানুষের প্রথমে সাহিত্যপ্রীতি হয়, পরে কোমরে ব্যথা হয়।
তিনি কি লেখাপড়া কম জানতেন?
বঙ্কিমচন্দ্র কম জানতেন?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর?
বের্ট্রান্ড রাসেল?
সার্ত্র?
উমবের্তো একো?
এরিস্টটল?
এরা তো পড়াশোনা করতে করতে এমন জায়গায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে আমরা বই খুলে সূচিপত্র দেখে চা খেতে চলে যাই। অথচ লিখেছেনও বিপুল।
আবার এমন অনেকে আছেন, যাঁরা লেখাপড়া খুব বেশি জানেন না এবং লেখেনও না। পৃথিবীর অধিকাংশ অল্পশিক্ষিত মানুষ সারাদিন ফেসবুকে প্রবন্ধ লিখে বেড়ান না। তাঁরা দোকান চালান, বাস চালান, জমিতে কাজ করেন, সন্তান মানুষ করেন, অফিস করেন, বাজার করেন, রাতে ঘুমান। অতএব অল্প পড়াশোনা নিজে থেকে মানুষের ভেতরে কলমের কারখানা তৈরি করে না। ।
আসল ব্যাপারটা সম্ভবত অন্য জায়গায়।
মানুষ বেশি লেখে কয়েকটি কারণে। কারও বলার তাগিদ বেশি। কারও আত্মবিশ্বাস বেশি। কারও আত্মসংশয় কম। কারও পেশাই লেখা। কারও মাথায় প্রতিদিন নতুন প্রশ্ন আসে। কেউ নিজের ভাবনা পরিষ্কার করার জন্য লেখে। কেউ মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য লেখে। কেউ খ্যাতির জন্য লেখে। কেউ রাগে লেখে। কেউ প্রেমে লেখে। কেউ প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরে আরও বেশি লেখে।
শেষের দলটাই বিপজ্জনক।
তাদের হাতে সময়ও থাকে, বিষয়ও থাকে।
আরেকটা ব্যাপার আছে, যেটাকে মনোবিজ্ঞানে Dunning-Kruger effect বলা হয়। কোনো বিষয়ে খুব সামান্য জানা মানুষ কখনো কখনো নিজের জ্ঞানের সীমাটা বুঝতে পারে না। তখন তার আত্মবিশ্বাস প্রবল হয়। সে দশ মিনিট ইউটিউব দেখে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বুঝে ফেলে, তিনখানা রিল দেখে নারীবাদ বুঝে ফেলে, একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ে কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে মতামত দেয়।
এই দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি।
কিন্তু এখান থেকে যদি সিদ্ধান্ত নিই, যারা বেশি লেখে তারা কম জানে, তাহলে আবার একই বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল করবো। কয়েকজন অতিবিশ্বাসী অজ্ঞ মানুষকে দেখে সব লেখককে অজ্ঞ ঘোষণা করা যায় না। বরং অনেক সময় ব্যাপারটা উলটো।
যে মানুষ বেশি জানে, তার লেখার বিষয়ও বেশি। একজন ইতিহাসবিদ একটা পুরোনো রাস্তা দেখলে শুধু কি রাস্তা দেখেন? তিনি দেখেন সেই রাস্তার সঙ্গে সাম্রাজ্য, বাণিজ্য, অভিবাসন, যুদ্ধ, শ্রেণি, নগরায়ণ। একজন ভাষাবিদ চায়ের দোকানের কথাবার্তার মধ্যেও উচ্চারণ, শব্দের বিবর্তন, সামাজিক পরিচয় দেখতে পান। একজন ঔপন্যাসিক বাসে দুজন মানুষের ঝগড়া দেখে বাড়ি ফিরে বিশ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন।
আমি ওই একই বাসে থাকলে হয়তো শুধু ভাবব, “ড্রাইভার এসি কমায় না কেন?”
জ্ঞান পৃথিবীকে ছোট করে না বরং পৃথিবীর ভিতরের আরও পৃথিবী খুলে দেয়।
অবশ্য বেশি জানার একটা বিপদ আছে।
যে যত জানে, সে তত নিজের অজানার পরিমাণ বুঝতে পারে।
সক্রেটিসের নামে যে বিখ্যাত ধারণাটা চালু আছে, তার মর্মও এই: জ্ঞান মানুষকে নিজের অজ্ঞতার খবর দেয়। তখন লেখক একটা বাক্য লেখে, তারপর থামে। ভাবছে, ঠিক বললাম তো? আরেকটা বই দেখি। বই দেখতে গিয়ে আরেকটা বইয়ের রেফারেন্স পেল। সেটা পড়তে গিয়ে তিনটা প্রবন্ধ পেল। তিনটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
রাতে মিতালী জিজ্ঞেস করল, “লেখা কতদূর?”
লেখক বলল, “বিষয়টা আরও জটিল হয়ে গেছে।”
মিতালী বলল, “আমি সকালেই বুঝেছিলাম।”
এই কারণে গভীর জ্ঞান কখনো কখনো লেখার গতি কমাতে পারে। কারণ জ্ঞান দায়িত্ব বাড়ায়। আপনি যত বেশি জানবেন, তত কম নিশ্চিন্তে চূড়ান্ত কথা বলতে পারবেন।
কিন্তু ধীর লেখা আর কম লেখা এক কথা নয়।
একজন গবেষক দশ বছরে একটা বই লিখতে পারেন। সেই একটা বই পরবর্তী একশো বছর মানুষ পড়বে।
আর আমার মতো মানুষ দিনে সাতটা পোস্ট দিতে পারেন, সন্ধ্যার পর নিজেরই মনে থাকবে না সকালে কী লিখেছিলেন। লেখার পরিমাণ দিয়ে জ্ঞানের গভীরতা মাপার চেষ্টা তাই মানুষের বুদ্ধি মাপতে তার বাড়িতে কতগুলো কলম আছে তা গুনে দেখা।
আরেকটা সমস্যা হলো “লেখাপড়া” শব্দটার মধ্যেই। লেখাপড়া বলতে আমরা কী বুঝছি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি?
বই পড়া?
জীবনের অভিজ্ঞতা?
লোকজ জ্ঞান?
পেশাগত দক্ষতা?
ঢাকার রাস্তার এক রিকশাওয়ালা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, কিন্তু মানুষের চরিত্র, দরদাম, ভাষা আর হাস্যরস সম্পর্কে তাঁর এমন জ্ঞান থাকতে পারে যা কোনো অধ্যাপকের নেই। বইয়ের শিক্ষাকে ছোট করছি না। শুধু বলছি বইয়ের বাইরের জ্ঞানকেও অদৃশ্য করা যায় না।
সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক লেখক ছিলেন যাঁদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি ছিল না। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, ভাষাবোধ এবং মানুষ বোঝার ক্ষমতা তাঁদের লেখক করেছে।
আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েও অনেকে এমন সব গদ্য লিখছেন যা পড়তে বসে পাঠক ভাবেন, লোকটা নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে বাক্যগুলো বানিয়েছে। তাই ডিগ্রি লেখার গ্যারান্টি দেয় না। আবার অল্প ডিগ্রিও খারাপ লেখার গ্যারান্টি নয়।
আমার আরও একটা ব্যাপারে আপত্তি। “কম জানে বলে বেশি লেখে” ধরনের বাক্য খুব সহজেই একটা সাংস্কৃতিক অহংকার তৈরি করে। যে কম লিখছে সে ভাবতে শুরু করে, আমি গভীর। যে বেশি লিখছে তাকে দেখে বলে, বুঝেছি, লোকটা জানে কম । এটা ভয়ংকর বিচার। অন্যের লেখা না পড়ে লেখকের জ্ঞানের সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পাঠকের কাজ একটু কঠিন। লেখা পড়ে বিচার করতে হয়।
লোকটা তথ্য ঠিক দিচ্ছে কি না।
যুক্তি টিকছে কি না।
নতুন কিছু দেখাতে পারছে কি না।
ভাষা পরিষ্কার কি না।
নিজের সীমা জানে কি না।
প্রমাণ ছাড়া বড় বড় কথা বলছে কি না।
এসব বিচার বাদ দিয়ে লেখার সংখ্যা গোনা খুব সহজ।
একজন ডাক্তার দিনে দশজন রোগী দেখলে আমরা বলি না, “ডাক্তারি কম জানে তাই এত রোগী দেখে।”
একজন সংগীতশিল্পী বছরে পঞ্চাশটা কনসার্ট করলে বলি না, “গান কম জানে তাই এত গায়।”
শুধু লেখকের বেলায় আশ্চর্য নিয়ম চালু হয়ে যায়। লোকটা বেশি লিখছে, সুতরাং কম জানে।
লেখা তো জ্ঞানের শত্রু নয়। লেখা নিজেই শেখার একটা পদ্ধতি।
আমি যখন কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে বসি, তখনই বুঝি বিষয়টা আসলে কত কম জানি। মাথার মধ্যে ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার মনে হচ্ছিল। কাগজে নামাতে গিয়ে দেখি তিন নম্বর প্যারায় এসে যুক্তির হাঁটু কাঁপছে।
লেখা তখন আয়না।
নিজের অজ্ঞতা দেখা যায়।
সেই অজ্ঞতা থেকে আবার পড়া শুরু হয়।
পড়া থেকে আবার লেখা।
ভালো লেখকের জীবন এই যাওয়া-আসার মধ্যেই কাটে।
পড়ছি বলে লিখছি।
লিখছি বলে আবার পড়ছি।
একটার সঙ্গে আরেকটার ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়ার কোনো দরকার নেই।
যতীন সরকারের উক্তিটাকে তাই আমি সর্বজনীন সত্য হিসেবে নিতে পারি না। বরং এটাকে একটা নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের ওপর ব্যঙ্গ হিসেবে দেখলে বেশি অর্থবহ হতে পারে। এমন মানুষ সত্যিই আছে যারা সামান্য জেনে অসামান্য নিশ্চয়তার সঙ্গে লিখে যায়। তাদের দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, জ্ঞানের প্রধান সমস্যা জ্ঞান নয়, ব্রেক।
কিন্তু একই পৃথিবীতে এমন মানুষও আছেন যাঁরা সারাজীবন পড়েছেন এবং সারাজীবন লিখেছেন। তাঁদের পড়া তাঁদের কলম থামায়নি। তাঁদের পড়া কলমের ভেতরে আরও প্রশ্ন ঢুকিয়েছে।
আমার আপত্তিটা তাই “বেশি লেখে” কথাটার বিরুদ্ধে নয়। বেশি লেখুক। হাজার পৃষ্ঠা লিখুক। প্রতিদিন লিখুক। সকালে লিখুক, রাতে লিখুক। লেখার বিচার হবে লেখার মধ্যে। কারণ দশ পৃষ্ঠা অজ্ঞতা যেমন সম্ভব, দশ হাজার পৃষ্ঠা প্রজ্ঞাও সম্ভব।
আর কেউ যদি বলে, “আমি অনেক জানি বলেই আজকাল লিখি না”, তার কথাও একটু সাবধানে শুনবেন।
লোকটা হয়তো সত্যিই জ্ঞানী।


