টিমবুক্তু: আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক শহর
ভোরবেলা কিংবা গোধূলিতে, ধীরে ধীরে। লোহার ট্রাঙ্কে ভরে বইগুলি ছড়িয়ে দেওয়া হল শহরের বিভিন্ন পরিবারের ঘরে।
পাঠ্যবইয়ে নায়ক বলতে আমরা বুঝি হাতে সাধারণত তলোয়ার, অথবা মাইক্রোফোন। খুব কমই কারও হাতে থাকে ধুলো ধরা পাণ্ডুলিপি। অথচ ২০১২ সালে সাহারার কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন শহর টিমবুক্তু প্রমাণ করেছিল, ইতিহাস রক্ষা করার জন্য কখনও কখনও বন্দুক নয়, প্রয়োজন হয় ট্রাঙ্কভর্তি বইয়ের।








সেই বছর যখন উগ্র ইসলামি জিহাদি গোষ্ঠীগুলি শহরটি দখল করে নেয়, তারা শুধু প্রশাসন নয়, স্মৃতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। মাজার ভাঙা যায়, বই পোড়ানো যায়, শাস্ত্র নিষিদ্ধ করা যায়; এ এক পুরোনো কৌশল। ইতিহাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সব সময় আগুন দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু টিমবুক্তু কেবল মরুভূমির শহর নয়। মধ্যযুগে এটি ছিল জ্ঞানের এক উন্মুক্ত দরজা। বাণিজ্যপথ ধরে যেমন সোনা ও লবণ আসত, তেমনি আসত ছাত্র, আলেম, পণ্ডিত। মাদ্রাসা ও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে জমত হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি; জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা, আইন, দর্শন, কবিতা, ধর্মতত্ত্ব। মরুভূমির মধ্যে এমন বৈচিত্র্য অনেকের কল্পনার বাইরে।
এই পাণ্ডুলিপিগুলি ছিল পশ্চিম আফ্রিকার বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রমাণ। আফ্রিকা তো শুধুমাত্র মৌখিক ঐতিহ্যের মহাদেশ নয়, বরং লিখিত জ্ঞানচর্চারও দীর্ঘ ইতিহাস আছে; তার সাক্ষ্য বহন করত এই দলিলগুলি। বহু গবেষক এদের গুরুত্ব তুলনা করেন বিশ্বের অন্য বিখ্যাত সংরক্ষণাগারের সঙ্গে। পার্থক্য শুধু একটাই; এগুলো কোনও এক বিশাল জাদুঘরে বন্দি ছিল না। পরিবারে পরিবারে, ব্যক্তিগত সংগ্রহে, প্রজন্মান্তরে এগুলি বেঁচে ছিল।
আবদেল কাদের হাইদারা; টিমবুক্তুতে জন্ম, টিমবুক্তুতেই বড় হওয়া। তাঁর জীবনের ভিত গড়ে উঠেছিল বইয়ের স্তূপের পাশে। তিনি ছিলেন শহরের বৃহত্তম ব্যক্তিগত পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের মালিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার সংগঠন SAVAMA-র প্রতিষ্ঠাতা। শহর দখল হওয়ার পর অনেকেই পালিয়েছিলেন। হাইদারা পালালেন না। বরং তিনি একটি অসম্ভব পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন; সব পাণ্ডুলিপি সরিয়ে ফেলতে হবে, আগুনের হাত থেকে।
প্রথম ধাপ ছিল নিঃশব্দ, চুপচাপ। জনসমক্ষে থাকা গ্রন্থাগার থেকে পাণ্ডুলিপিগুলি সরিয়ে নেওয়া হল। ভোরবেলা কিংবা গোধূলিতে, ধীরে ধীরে। লোহার ট্রাঙ্কে ভরে বইগুলি ছড়িয়ে দেওয়া হল শহরের বিভিন্ন পরিবারের ঘরে। এই কৌশল ছিল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী যেসব পরিবার নিজের ঘরে পাণ্ডুলিপি আগলে রেখেছে, তাদের হাতেই আবার দায়িত্ব ফিরল। কাজটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, এবং সম্পূর্ণ গোপন।
শহরের ভেতর লুকিয়ে রাখাই যথেষ্ট ছিল না। উগ্রপন্থীরা ইতিমধ্যে কিছু গ্রন্থাগারে আগুন ধরিয়েছিল। শারিয়া আইনের কড়াকড়ি চাপিয়ে দিয়ে তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল; এই ধরনের জ্ঞানচর্চা তাদের পছন্দ নয়। তাই দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল: শহরের বাইরে বই সরানো।
এই অপারেশন সিনেমাকেও হাড় মানায়। ছিল গাধার গাড়ি, ঠেলাগাড়ি, পুরোনো গাড়ির সিটের নিচে লুকোনো বাক্স, আর নাইজার নদীর ওপর ধীরগতির নৌকা। হাইদারার ভাতিজা সহ বহু তরুণ স্বেচ্ছাসেবক রাতের আঁধারে বাক্স বয়ে নিয়ে গেছেন। প্রতিটি চেকপয়েন্ট ছিল সম্ভাব্য বিপর্যয়। প্রতিটি যাত্রা মানে ধরা পড়ার আশঙ্কা। পরিকল্পনাটি ছিল তিন ধাপে: টিমবুক্তু শহরের ভেতরে সেফহাউসে সরিয়ে রাখা। মরুভূমির রাস্তা পেরিয়ে রাজধানী বামাকোতে পৌঁছানো। যখন উত্তরাঞ্চল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হল, তখন স্থলপথ ছেড়ে নাইজার নদীপথে সরে যাওয়া।
এই ধৈর্যশীল প্রচেষ্টার ফল ছিল অবিশ্বাস্য। অনুমান করা হয়, প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পাণ্ডুলিপি নিরাপদে বামাকো পৌঁছায়। কয়েক হাজার হারায় আগুনে বা লুটে; কিন্তু বৃহৎ ঐতিহ্য বেঁচে যায়। হাইদারার কৃতিত্ব অসীম। তিনি অস্ত্র হাতে নেননি। তিনি ইতিহাস হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর ঝুঁকি ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু দায় ছিল সামষ্টিক। বই তো কেবল কাগজ নয়। বই মানে ধারণা, বিতর্ক, গণনা, কবিতা, সন্দেহ, যুক্তি। কোনও সভ্যতার আত্মা অনেক সময় বন্দুকের শব্দে নয়, বরং কালি-কলমে টিকে থাকে।
হাইদারা একবার বলেছিলেন; এই পাণ্ডুলিপি হারালে শুধু মালির নয়, সমগ্র মানবতার ক্ষতি হত। কারণ জ্ঞান শুধু দেশের সম্পত্তি নয়। ইতিহাস পুড়িয়ে ফেলা সহজ। সংরক্ষণ করা কঠিন। আর কঠিন কাজটিই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। নিঃশব্দে।
রিটন খান


