মানুষের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, যা তাকে বর্তমানের হাত থেকে মুক্তি দিলেও যন্ত্রণায় ডুবিয়ে রাখে। শরীর যেখানে আছে মন সেখানে থাকে না। হয়তো আজ মঙ্গলবার, কিন্তু আপনার প্রাণ পড়ে আছে বিগত কোনও এক বৃহস্পতিবারে কিংবা আসন্ন শীতের গন্ধে। বন্ধুর সঙ্গে চায়ের আড্ডায় বসেছেন, চা সাধারণ, আড্ডাও খুব আহামরি নয়, এমনকি বাইরের গোধূলিটুকুও যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন—তবু হঠাৎ একটা দশ বছর আগের বারান্দা মনে ভেসে এল। ব্যাস, বর্তমানের সেই কাপ, বন্ধু আর দিনক্ষণ সব এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ। আপনি তখন সেই অতীতের অলীক বারান্দার নাগরিক হয়ে বসে আছেন।
এই অনুভূতির অভিধানে অনেক নাম—আকাঙ্ক্ষা, বিরহ, হাহাকার কিংবা কী-যেন-পেলুম-না-র অদ্ভুত আর্তি। শব্দের ছদ্মবেশ যা-ই হোক না কেন, যন্ত্রণার ধরনটা কিন্তু একই। ইংরেজি একে সুন্দর নাম দিয়েছে, longing।
হাতের কাছের মুহূর্তটিকে এমন নিষ্ঠুর কুশলতায় হরণ করে নেওয়ার ক্ষমতা এই পৃথিবীর খুব কম জিনিসেরই আছে।
আপনার সামনে যে মানুষটি বসে আছে, তাকে দেখার বদলে আপনি ভাবছেন যে মানুষটি নেই তাকে। যে বাড়িতে থাকছেন, তার জানলা দিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছে অন্য কোথাও নিশ্চয়ই প্রকৃত জীবন ঘটছে। যে বয়সে আছেন সেটাকে নিয়ে বিরক্ত, কুড়িতে চল্লিশ চেয়েছিলেন, চল্লিশে কুড়ি ফেরত চাইছেন। মানুষ সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটাকে এমন ভাবে চালায় যেন রেলের রিজার্ভেশন কাউন্টার। যে টিকিটটা হাতে আছে সেটা পছন্দ নয়, যে ট্রেন চলে গেছে সেটাতেই আসলে উঠতে হত।
কিন্তু মুশকিল হল, এই একই আকাঙ্ক্ষা না থাকলে মানুষের সভ্যতার অর্ধেক জিনিসই হত না।
মানুষ অর্থ খুঁজেছে বলেই শিল্প হয়েছে। দেওয়ালে বাইসন আঁকা থেকে শুরু করে বাখ, রবীন্দ্রনাথ, ভ্যান গঘ, ভার্জিনিয়া উল্ফ, ঋত্বিক ঘটক পর্যন্ত বিপুল কারবারটা দাঁড়িয়ে আছে এই প্রশ্নের ওপর: যা চোখে দেখছি, জীবন কি কেবল এটুকুই?
মানুষ সত্য চেয়েছে বলেই বিজ্ঞান। আপেল পড়ছে দেখে সবাই যদি বলত, পড়ুক বাবা, আমাদের কী, তা হলে নিউটনের ব্যবসা বিশেষ এগোত না। নক্ষত্র দেখে কেউ বলেছে দেবতা, কেউ বলেছে আগুন, কেউ আবার বেয়াড়া হয়ে হিসেব কষেছে ওটার দূরত্ব কত। সত্যের জন্য এই অস্বস্তিই শেষ পর্যন্ত টেলিস্কোপ বানিয়েছে, অণুবীক্ষণ বানিয়েছে, ডিএনএ খুলেছে, মহাবিশ্বের বয়স মাপতে বসেছে।
আর অনুরাগের সেই চিরন্তন হাহাকার?



