লুটের বদলে স্ট্র্যাটেজিক ইনভলভমেন্ট
সবকিছুই করা হচ্ছে ‘আইন’ আর ‘শৃঙ্খলা’র নামে। অথচ প্রশ্নটা খুব সোজা। একটি দেশ যদি নিজের সম্পদ নিজের বলে দাবি করতেই না পারে, তাহলে সার্বভৌমত্ব শব্দটার মানে কী?
মাদুরো কীভাবে ধরা পড়লেন, তাঁর স্ত্রীকে কীভাবে বিমানে তুলে নেওয়া হল, কোন রুটে কোন এজেন্সি কাজ করল—এই সব খুঁটিনাটি নিয়ে মিডিয়ার উৎসাহ বোঝা যায়। গোয়েন্দাগিরি সবসময়ই টিআরপি দেয়। কিন্তু আসল অস্বস্তিকর প্রশ্নটা হল, কীভাবে একটা দেশ কার্যত দখল হয়ে যায়, অথচ আগের সেই সরকারই দিব্যি কাজ চালিয়ে যায়। যেন বাড়িতে ঢুকে চাবিটা বদলে দিল কেউ, কিন্তু রান্নাঘরে আগের মানুষটাই তরকারি কাটছে।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ট্রাম্প খোলাখুলি বললেন, আমেরিকা অনির্দিষ্টকাল ভেনেজুয়েলা চালাবে। যত দিন না তাদের মনে হবে যে পরিবর্তনটি যথেষ্ট নিরাপদ, সঠিক এবং বিচক্ষণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আরও সরাসরি বললেন, তিনি নিজেই ভেনেজুয়েলার দায়িত্বে আছেন। এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার প্রো-ইউএস বিরোধীরা যতই দরজায় ধাক্কা দিক, তাদের পাত্তা দেওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ এখানে গণতন্ত্রের অভিনয় করারও দরকার নেই। আমেরিকা চাইছে দেশটা চালাতে, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে নয়, আইনকে পাশ কাটিয়ে। এটাকে দখল বলবে, না ব্যবস্থাপনা, কোন শব্দটা ব্যবহার করবে, সেটাই এখন একমাত্র বিতর্ক।
আরও মজার বিষয়, এই নতুন ব্যবস্থায় আমেরিকার ভরসা বিরোধী নেতারা নন, বরং মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেজ। কারণ বিরোধীরা কথা বলে, দাবি তোলে, সংবিধান টানে। প্রশাসনিক মেশিন চালাতে গেলে দরকার সেই লোক, যে বোতাম কোথায় চাপতে হয় জানে।
কেন এই অদ্ভুত আচরণ? উত্তরটা খুবই সোজা, তাই বোধহয় অস্বস্তিকর। আমেরিকার গণতন্ত্রে আগ্রহ নেই, জনগণের ইচ্ছেতেও নেই। আগ্রহ আছে তেলেত। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে আমেরিকা ভেরি স্ট্রংলি ইনভল্বড থাকবে। পৃথিবীর সেরা তেল কোম্পানিগুলো নেমে পড়বে। সস্তায় তেল যাবে মিত্রদের কাছে। এই ভাষায় ‘ক্ষমতা জনগণের হাতে ফেরত দেওয়া’ মানে হচ্ছে, উপনিবেশিক লুঠ নতুন প্যাকেটে পরিবেশন।
এই গল্পটা নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে, চাভেজের বহু আগে, ভেনেজুয়েলা তাদের তেল শিল্প জাতীয়করণ করেছিল। তখন দেশটা পশ্চিমা চোখে যথেষ্ট ‘নর্মাল’ গণতন্ত্র। এক্সনমোবিল-সহ বহু মার্কিন কোম্পানির সম্পত্তি তখনই রাষ্ট্রের হাতে যায়। ২০০৭ সালে চাভেজ শুধু শেষ অবশিষ্ট প্রাইভেট অপারেশনগুলো নিয়েছিলেন। অর্থাৎ যে জাতীয়করণকে আজ চুরি বলা হচ্ছে, সেটা তখন বিশ্বজুড়েই অর্থনৈতিক ডিকলোনাইজেশনের স্বীকৃত ধাপ ছিল।
এখন ট্রাম্প বলছেন, ভেনেজুয়েলা আমেরিকার তেল চুরি করেছে। এখানেই ভাষাটা হঠাৎ ফসকে যায়। একটি দেশ কীভাবে নিজের তেল চুরি করে? উত্তর একটাই: যদি ধরে নেওয়া হয়, তেলটা আদৌ সেই দেশের নয়। যদি ধরে নেওয়া হয়, মাটির নিচে যা আছে, তার মালিক সেই শক্তি, যে একদিন পাম্প বসাতে পারত, কিন্তু পারেনি। সেই না-পারার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই এখন দাবি উঠছে massive oil reserves বাজেয়াপ্ত করার।
এই আক্রমণ শুধু চাভেজ বা এক্সট্রিম লেফট-এর বিরুদ্ধে নয়। এটা ২০ শতকের গোটা ডিকলোনাইজেশন প্রকল্পের বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের যুক্তিতে শুধু তোলা তেল নয়, না-তোলা তেলও আমেরিকার সম্পত্তি। এই নৈতিক কসরত বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় দু’শো বছর আগে, হাইতির দিকে। দাস বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা পেয়েছিল তারা। কিন্তু তার দাম হিসেবে ফ্রান্সকে ক্ষতিপূরণ দিতে দিতে দেশটা আজও হাঁপাচ্ছে। স্বাধীনতার অপরাধের জরিমানা।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও চিত্রটি আলাদা নয়, শুধু শব্দগুলো আপডেটেড। বন্দুকের বদলে বিনিয়োগ, দখলের বদলে ‘রান করা’, লুটের বদলে ‘স্ট্র্যাটেজিক ইনভলভমেন্ট’। কিন্তু নীচের গল্পটা সেই পুরনোই। কেউ এসে বলছে, এই তেল তোমার নয়, কারণ তুমি সেটা আমাদের কথা মতো ব্যবহার করছ না।
সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হল, এই সবকিছুই করা হচ্ছে ‘আইন’ আর ‘শৃঙ্খলা’র নামে। অথচ প্রশ্নটা খুব সোজা। একটি দেশ যদি নিজের সম্পদ নিজের বলে দাবি করতেই না পারে, তাহলে সার্বভৌমত্ব শব্দটার মানে কী? আর যদি শক্তিশালী কেউ অনির্দিষ্টকাল চালানোর অধিকার নিজে থেকেই নিয়ে নিতে পারে, তাহলে দখল শব্দটা আমরা কবে ব্যবহার করব? নাকি সেটাও জাতীয়করণের মতোই ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি বলে চিহ্নিত হবে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আচরণও খুব শিক্ষণীয়। পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্র নিয়ে বিবৃতি দেয়, মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানায়, আবার একই সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা আর ভূরাজনৈতিক স্বার্থে আগের মতোই কাজ চালিয়ে যায়।



