ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে কোথায় যায়?
আচ্ছা, ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে কোথায় যায়? এই প্রশ্নটা আমি বহুবার শুনেছি, অন্যের মুখে যেমন, নিজের ভেতরেও তেমন। প্রশ্নটি এত ব্যবহৃত যেন মানবসভ্যতা বহুদিন ধরে একই বাক্য ধার করে কাঁদছে। কিন্তু ব্যবহৃত বলেই তো তা মিথ্যে হয় না। বরং কিছু বাক্য আছে, মানুষের পুনরাবৃত্ত দুঃখেই তাদের সত্যতা প্রমাণিত হয়। কেউ যখন বলে, ভালোবাসা কোথায় গেল, সে আসলে ভূগোল জানতে চায় না। সে জানতে চায়, এতদিন যা ছিল জীবনের কেন্দ্র, আচমকা তা কীভাবে অনুপস্থিতির আরেক নামে পরিণত হল। যেন ঘরে সব আসবাব ঠিক আছে, জানালার পাশে একই আলো, টেবিলে একই কাপ, অথচ ঘরটি আর আগের ঘর নয়। এই সামান্য বদলই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করে। কারণ ভাঙনের শব্দ আমরা সামলাই, কিন্তু শব্দহীন পরিবর্তনের সঙ্গে মীমাংসা করা কঠিন।
আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, হারিয়ে যাওয়া জিনিস নিশ্চয়ই কোথাও যায়। কলম হারালে খাটের নিচে, বন্ধু হারালে অন্য শহরে, আর স্নেহ হারালে অভিমানের আড়ালে। পরে বুঝলাম, সব হারানো বস্তু স্থান পরিবর্তন করে না। কিছু কিছু জিনিস রূপ বদলায়। ভালোবাসারও বোধহয় তাই হয়। সে সব সময় চলে না গিয়ে, অনেক সময় বাসা বদলায়। যে স্নেহ একসময় শরীরের উত্তাপে ছিল, তা পরে স্মৃতির ভদ্র নির্জনতায় এসে বসে। যে আকুলতা একসময় দরজা বন্ধ করতে দিত না, সেটাই পরে একখানা বইয়ের প্রান্তে নীরব মন্তব্য হয়ে থাকে। যে মানুষটিকে ছাড়া একসময় পৃথিবী অকল্পনীয় মনে হত, তার নাম পরে জীবনের দীর্ঘ বাক্যের মধ্যে একটি কমা হয়ে দাঁড়ায়। বাক্যটি শেষ হয় না, কিন্তু ছন্দ বদলে যায়।
তবু ভাঙা হৃদয়ের কাছে এই ব্যাখ্যা খুব সান্ত্বনাদায়কও নয়। কারণ হৃদয়, বিশেষত আহত হৃদয়, রসায়নের ভাষা বোঝে না। তাকে যদি বলা হয় শক্তি নষ্ট হয় না, শুধু রূপান্তরিত হয়, সে বড়জোর একটু বিরক্ত হবে। মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কাছে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম সূত্রের খুব একটা সামাজিক ব্যবহার নেই। যে মানুষটি আজও রাতের শেষে শূন্য বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে, এত কথা, এত স্পর্শ, এত প্রতীক্ষা, এত প্রতিশ্রুতি, সেগুলো গেল কোথায়, তাকে বলা কঠিন যে কিছুই যায়নি, সব কেবল রূপ বদলেছে। কারণ তার অভিজ্ঞতায় তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যা ছিল তা নেই। আর মানুষ শেষ পর্যন্ত তত্ত্ব নয়, অনুপস্থিতিরই নাগরিক।
ভালোবাসা ভেঙে গেলে আমরা সাধারণত দুই রকম ভুল করি। এক, আমরা ভাবি সবটাই মিথ্যে ছিল। দুই, আমরা ভাবি সবটাই নষ্ট হয়ে গেল। আমার অভিজ্ঞতায় দুটো কথাই সমান বাড়াবাড়ি। যা একদিন সত্যি ছিল, পরে তা টেকেনি বলে তার পূর্বসত্য মুছে যায় না। বর্ষার বৃষ্টি থেমে গেলে কি আমরা বলি যে বৃষ্টি বলে কিছু ছিল না? কিংবা যৌবন ফুরোলে কি বলি যে যৌবন একপ্রকার গুজব? ভালোবাসাও তেমনই। অনেক সময় তার স্থায়িত্ব কম, কিন্তু তীব্রতা সত্যি। সে আমাদের ভেতরে কাজ করে, আমাদের স্বর বদলায়, রুচি বদলায়, ভয়ের ধরন বদলায়, এমনকি ভবিষ্যৎ কল্পনার ভাষাও বদলে দেয়। কারও সঙ্গে ভালোবেসে থাকা শেষ হয়ে গেলেও, সেই থাকার কালে আমরা যে মানুষে পরিণত হয়েছিলাম, সে তো আর পুরোপুরি মুছে যায় না। প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটলে তার সাথে জড়িয়ে থাকা সমস্ত কার্যকারণ ও যৌক্তিকতা পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায় না।
আমরা জানতে চাই, ভালোবাসা কোথায় গেল, যেন তা একটি পৃথক পদার্থ, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ভালোবাসা তো শুধু অনুভূতি নয়, সম্পর্কও বটে, আবার সম্পর্কের ভেতরে গড়ে ওঠা স্ব-চেতনাও বটে। সে অন্যের দিকে যায়, নিজের দিকে ফেরে, স্মৃতিতে জমে, লজ্জায় লুকোয়, ভাষায় থেকে যায়, কখনও তিক্ততায় নষ্ট হয়, কখনও কৃতজ্ঞতায় পরিণত হয়। আমি এমন বহু মানুষকে দেখেছি, যারা বিচ্ছেদের দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর একসময়ের প্রিয় মানুষটির প্রতি আর কোনো অনুরাগ অনুভব করে না। অথচ সেই মানুষটির কোনো দুঃসংবাদ কানে এলে তাদের বুকের ভেতরটা আজও এক অজানা হাহাকারে কেঁপে ওঠে। সেটা কী? দায়িত্ব নয়, অভ্যাসও নয়। সম্ভবত ভালোবাসার অবশিষ্ট নৈতিকতা। শরীর সরে গেছে, দৈনন্দিনতা সরে গেছে, কিন্তু একসময়ের নিবিড় সহাবস্থান মানুষের স্নায়ুতে এমনভাবে লেখা হয়ে যায় যে তা পুরোপুরি মোছা যায় না।
আবার এমনও হয়, ভালোবাসা যে রূপে ছিল সেই রূপে থাকার ক্ষমতা হারায়। মানুষ বদলায়। সময় বদলায়। একসময় যে-দুই জন একই দিকে তাকিয়ে ছিল, পরে দেখা যায় তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভবিষ্যৎ কল্পনা করছে। তখন সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার নামে অনেকেই শুধু তার মৃতদেহ বহন করে। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় প্রেম আছে, ভিতরে কেবল কর্তব্য, ভদ্রতা, ক্লান্তি, আর মাঝে মাঝে সামান্য রাগ, যা প্রকাশের শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থাকে অনেকে স্থায়িত্ব বলে ভুল করেন। আমি বরং এটাই বলব যে, মাঝেমধ্যে ভালোবাসার সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ সমাপ্তি লুকিয়ে থাকে তার প্রস্থানেই। প্রতিটি বিদায় মানেই যে কেবল বিশ্বাসভঙ্গ করা—তা কিন্তু নয়; বরং কিছু কিছু বিচ্ছেদ আসলে এক গভীর স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে এতে রোমান্টিক হওয়ার কিছু নেই। বিচ্ছেদ মানুষকে উদারও করে, কুৎসিতও করে। একসময়ের আদরের মানুষকে আমরা পরে বিচার করি হিসাবরক্ষকের মতো। কে কত দিল, কে কত নিল, কে আগে সরে গেল, কার দোষ ছিল বেশি। যেন সম্পর্ক নয়, ট্যাক্স অডিট চলছে। অথচ প্রেমের মধ্যে প্রবেশের সময় তো কেউ এমন হিসাব রাখে না। মানুষ প্রেমে পড়ে সাধারণত নিজের অভাব, কৌতূহল, আকর্ষণ, একাকীত্ব, দম্ভ, কোমলতা, সবকিছুর মিশ্রণে। বেরিয়ে আসে আরও জটিল হয়ে। কাজেই প্রেম ভেঙে গেলে কেবল অন্যকে দোষ দিলে নিজের অন্ধত্বের অংশটা আড়াল করা হয়। আবার সব দোষ নিজের কাঁধে নিলেও সত্যি বলা হয় না। প্রেমের ভাঙনে সরলরেখা খুব কমই থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে থাকে ভুল সময়, অসম প্রত্যাশা, অপরিণত অহং, না-বলা কথা, অতিরিক্ত বলা কথা, আর সেই পুরনো মানবীয় দুর্বলতা, আমরা যা দিতে পারি তার চেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলা।
আমার মনে হয়, ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে কোথায় যায়, তার একটা উত্তর স্মৃতিতে আছে, কিন্তু স্মৃতি একা নয়। স্মৃতি তো সংরক্ষণ করে, বিচার করে না। ভালোবাসার আসল পরিণতি অনেক সময় স্মৃতির চেয়েও গভীরে, চরিত্রে। আমরা যাকে ভালোবেসেছিলাম, তার কাছ থেকে যা পাই, তা শুধু কিছু ছবি বা বাক্য নয়। আমরা কিছু অভ্যাস পাই, কিছু ভয় পাই, কিছু ভাঙন পাই, কিছু সহনশীলতা পাই। কেউ শেখে চুপ করে পাশে বসে থাকা। কেউ শেখে দরজা বন্ধ করার শব্দও একধরনের ভাষা। কেউ শেখে, মানুষকে অধিকার করা যায় না। কেউ আবার, একটু দুঃখের সঙ্গে বলি, কিছু মানুষ বিরহের দহনে শেখে কাউকে আর পূর্ণ বিশ্বাস না করতে। প্রেম চলে গিয়েও আমাদের ভেতরে এক ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায়। আত্মার সংবিধান বদলে দেয়। এই কারণেই পুরনো প্রেম শেষ হলেও তা নিষ্প্রয়োজন নয়। পরাজিত যুদ্ধও মানচিত্র বদলায়।
আরও একটি কথা আছে, যা বললে অনেকের রোমান্টিক মন খারাপ হতে পারে। সব ভালোবাসা মহৎ নয়। সব ভাঙনও মহাকাব্যিক নয়। কিছু প্রেম কেবল সময় কাটানো, কিছু প্রেম আত্মমুগ্ধতার আয়না, কিছু প্রেম সামাজিক প্রশিক্ষণ, কিছু প্রেম নিছক ভয় যে একা থাকলে মানুষ কী ভাববে। এসবও আছে। মানুষের হৃদয়কে সব সময় মন্দির ভাবলে ভুল হবে, সেখানে বাজারও বসে, মেলা বসে, কখনও সস্তা নাটকও হয়। কিন্তু এই তুচ্ছতার মধ্যেও সত্যি প্রেমের সম্ভাবনা একেবারে নষ্ট হয় না। কারণ মানুষ অদ্ভুতভাবে অসম্পূর্ণ। সে অনেক ভঙ্গিতে ভুল করে, তবু তার সেরা আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি থেকেই যায় অন্যের কাছে সত্যিকারভাবে উপস্থিত হতে পারা। ভালোবাসা সেই প্রচেষ্টারই এক নাম, যদিও আমরা তাকে প্রায়ই অতিরিক্ত অলংকারে ঢেকে ফেলি।
তাই এখন যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ভালোবাসা কোথায় যায়, যখন সে ফুরিয়ে যায়, আমি বলব, সে পুরোপুরি কোথাও যায় না। সে ফিরে যায় তার উৎসগুলিতে। কিছুটা স্মৃতিতে, কিছুটা ভাষায়, কিছুটা অভ্যাসে, কিছুটা দেহের অদ্ভুত স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ায়, কিছুটা আমাদের ভবিষ্যৎ ভালোবাসার সক্ষমতা বা অক্ষমতায়। কিছুটা অবশ্য ক্ষয়ও হয়। মানুষের ভেতর সবকিছুই রক্ষা পায় না। কিছু জিনিস সত্যিই সময়ের লবণজলে গলে যায়। কিন্তু গলে যাওয়া আর অর্থহীন হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। সমুদ্রতটে শিশু যে বালুর দুর্গ বানায়, জোয়ারে তা ভেঙে যায় বলেই কি সেই বিকেলটি বৃথা? দুর্গ ছিল সাময়িক, কিন্তু বানানোর আনন্দ, মনোযোগ, হাতের স্পর্শ, ঢেউ এসে মুছে দেওয়ার বিস্ময়, এসবই তো তাকে বদলে দেয়। হয়তো প্রেমও তাই। আমরা তাকে পাথর ভেবে ভুল করি, অথচ তার প্রকৃতি জলের মতো। মানুষ তাই হেঁটে যায়। এক প্রেমের ধ্বংসাবশেষ থেকে আরেক প্রেমের সৃষ্টিকোলে।



