মারজান সাতরাপি: যে মেয়ে নিজের জীবন এঁকে ইতিহাস লিখেছিলেন
মারজান সাতরাপি রেখে গেলেন এমন এক কাজের জগৎ, যা বহু মানুষের কাছে ইরান, যুদ্ধ, মেয়েদের বেড়ে ওঠা, নির্বাসন আর পরিচয়ের রাজনীতি বোঝার প্রথম দরজা হয়ে থাকবে।
রিটন খান
মারজান সাতরাপি মারা গেছেন মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়সে। ইরানে জন্ম নেওয়া, পরে ফ্রান্সে বসবাস করা এই শিল্পীকে শুধু গ্রাফিক নভেলিস্ট, চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা লেখক বললে আসলে তাঁর কাজের পরিধিটা পুরো বোঝানো যায় না। মারজান ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি, শৈশবের ভয়, পরিবারের ভেতরের কথাবার্তা, নির্বাসনের একাকিত্ব, রাষ্ট্রের সহিংসতা আর মানুষের ছোট ছোট হাস্যকর মুহূর্তগুলোকে একসাথে ধরে এমন এক ভাষা তৈরি করেছিলেন, যেখানে ইতিহাস আর আত্মজীবনী আলাদা করে চেনা যায় না। তাঁর বিখ্যাত গ্রাফিক স্মৃতিগদ্য Persepolis শুধু ইরানের বিপ্লবের গল্প বলেনি, এটি বদলে দিয়েছিল মানুষ কমিকস বা গ্রাফিক নভেল নামের শিল্পমাধ্যমকে কীভাবে দেখে।
১৯৬৯ সালে ইরানের রাশত শহরে জন্ম নেওয়া মারজানের বেড়ে ওঠা তেহরানে, তাঁর পরিবারে রাজনীতি ছিল প্রতিদিনের জীবনের অংশ। তাঁর পরিবার ছিল বামপন্থী চিন্তায় প্রভাবিত, ধর্মনিরপেক্ষ, রাষ্ট্র আর সমাজ নিয়ে সচেতন। ছোট্ট মারজানের চারপাশে তখন বদলে যাচ্ছে একটি দেশ। ইরানি বিপ্লব আসছে, পুরনো ক্ষমতা ভাঙছে, নতুন ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে থেকে যাচ্ছে একই ভয়, একই নজরদারি, একই অনিশ্চয়তা। এরপর আসে ইরান-ইরাক যুদ্ধ। বোমার সাইরেন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, কারাগারের গল্প, ফিসফিস করে বলা রাজনৈতিক আলোচনা, ঘরের ভেতর সামোভারের পাশে বড়দের কথোপকথন, এই সবকিছু একদিন জায়গা নেয় Persepolis-এর সাদা-কালো পাতায়।
সেই বইয়ের ছোট্ট মারজি এক অদ্ভুত চরিত্র। সে একদিকে জেদি শিশু, অন্যদিকে বয়সের আগেই বড় হয়ে যাওয়া এক রাজনৈতিক মানুষ। সে দেখে তার চারপাশের পৃথিবী ছোট হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার নিজের চিন্তার জগৎ বড় হচ্ছে। মারজান খুব সহজ রেখায় আঁকতেন, কিন্তু সেই সহজতার ভেতর ছিল ধারালো পর্যবেক্ষণ। রাষ্ট্রীয় দমন, মানুষের ভয়, কৈশোরের বিদ্রোহ, বেঁচে থাকার হাস্যকর কৌশল, সবকিছুকে তিনি একই চোখে দেখতেন। কোথাও অতিরিক্ত আবেগ নেই, কোথাও নিজের জীবনের কষ্টকে প্রদর্শনী বানানোর চেষ্টা নেই।
মারজানের বড় শক্তি ছিল তিনি কাউকে সুবিধাজনক গল্প উপহার দিতে রাজি ছিলেন না। পশ্চিমা দুনিয়া অনেক সময় ইরানের নারীদের শুধু পর্দার আড়ালের অসহায় মুখ হিসেবে দেখতে চেয়েছে, আবার ইরানের রাষ্ট্র নিজের মতো করে বিপ্লব আর জাতির এক বীরত্বপূর্ণ গল্প তৈরি করতে চেয়েছে। মারজান এই দুই সরল গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষের জটিলতাকে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ইরানে বাবা-মায়েরা একই সঙ্গে সাহসী এবং দুর্বল, দেশ একই সঙ্গে ভালোবাসার এবং অসহনীয়, আর একজন মেয়ে একই সঙ্গে তেহরানে “বেশি পশ্চিমা” এবং ইউরোপে “বেশি ইরানি”।
নির্বাসন তাঁর কাছে ছিল এক ধরনের স্থায়ী দ্বৈত জীবন। শরীর থাকে এক জায়গায়, স্মৃতি পড়ে থাকে অন্য কোথাও। কৈশোরে ইরান ছাড়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন। লিখতেন ফরাসি ভাষায়, কিন্তু বারবার ফিরে যেতেন পারস্যের স্মৃতিতে, সেই বাড়ি, সেই মানুষ, সেই হারানো সময়ের কাছে। তাঁর পরের বইগুলো, যেমন Persepolis 2, Embroideries, Chicken with Plums, এই একই প্রশ্নকে অন্যভাবে অনুসরণ করেছে: ব্যক্তিগত জীবন আসলে কতটা রাজনৈতিক?
Embroideries-এ দেখা যায় কয়েকজন ইরানি নারী বিকেলের চায়ের আড্ডায় প্রেম, যৌনতা, বিয়ে, পুরুষতন্ত্র আর সামাজিক ভণ্ডামি নিয়ে গল্প করছেন। বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ ঘরোয়া আলাপ মনে হতে পারে, কিন্তু সাতরাপির হাতে সেই ঘরের ভেতরের কথাই হয়ে ওঠে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ভাষা। নারীরা সেখানে হাসেন, রাগ করেন, ভুল করেন, নিজেদের ইচ্ছা আর হতাশা নিয়ে কথা বলেন।
Chicken with Plums-এ একজন শিল্পীর মৃত্যুর অপেক্ষা আসলে হয়ে ওঠে শিল্পীর ভেঙে পড়ার গল্প, এমন এক পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়ার গল্প যেখানে একসময় সৌন্দর্য আর অর্থ খুঁজে পাওয়া যেত। মারজানের সব কাজেই এই দ্বৈততা ছিল। হাসির পাশে হতাশা, কোমলতার পাশে নিষ্ঠুরতা, ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশে ইতিহাসের ভার। তাঁর আঁকা ছিল সরল, কিন্তু সেই সরল রেখার নিচে মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল।
যখন Persepolis চলচ্চিত্রে রূপ নেয়, তখন তাঁর ভাষা আরও বড় দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। অ্যানিমেশন হলেও ছবিটি কখনো নিজের রাজনৈতিক ধার হারায়নি। সেই একই সাদা-কালো বৈপরীত্য, শিশুর চোখে দেখা পৃথিবীর সরলতা আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয়াবহতা পাশাপাশি চলেছে। মারজান কখনো নিজেকে কোনো দেশের মুখপাত্র ভাবতে চাননি, কিন্তু সময় তাঁকে সেই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিল। পশ্চিমা সাংবাদিকেরা তাঁকে বারবার জিজ্ঞেস করেছে ইরান কী, ইরানের নারী কারা, ইরানের ভবিষ্যৎ কোথায়। তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে তিনি যেন বারবার বলেছেন, কোনো দেশকে তার সরকার দিয়ে পুরো বোঝা যায় না, তাকে বুঝতে হয় তার সাধারণ মানুষ দিয়ে, তাদের ভালোবাসা, ভুল, বিদ্রোহ, ভয় আর অসম্পূর্ণতা দিয়ে।
মারজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, হাস্যরস আর গভীরতা পরস্পরের শত্রু নয়। তাঁর সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তেও হঠাৎ হাসি চলে আসে। দাদি ব্রার ভেতর জুঁই ফুল রেখে সুগন্ধ ধরে রাখছেন, ছোট্ট মেয়ে সহপাঠীদের সামনে নিজেকে বড় বিপ্লবী দেখানোর চেষ্টা করছে, এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলো যে দমন-পীড়নের মধ্যেও মানুষ শুধু ভুক্তভোগী হয়ে থাকে না। মানুষ বিরক্ত হয়, প্রেমে পড়ে, মিথ্যা বলে, হাসে, বোকামি করে, স্বপ্ন দেখে।
বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রেও সাতরাপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন কমিকসকে অনেকেই “গুরুতর সাহিত্য” হিসেবে ভাবতে চাইত না। তিনি দেখিয়ে দিলেন কয়েকটি কালো রেখা, কয়েকটি মুখ, কয়েকটি ছোট প্যানেলের ভেতরেও একটি দেশের ইতিহাস, একটি বিপ্লবের ক্ষত, একটি মেয়ের বড় হয়ে ওঠা, নির্বাসনের দার্শনিক প্রশ্ন সবকিছু রাখা সম্ভব। তাঁর কাজ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় কুন্ডেরা, কোয়েটজি কিংবা মাহফুজের লেখার পাশে জায়গা পায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ইতিহাস বোঝানোর জন্য সবসময় হাজার পাতার বই লাগে না, কখনো কখনো একটি আঁকা শিশুমুখও একনায়কতন্ত্র সম্পর্কে অনেক বড় সত্য বলে দিতে পারে।
তাঁর পথ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পী, বিশেষ করে নারী এবং গ্লোবাল সাউথের লেখকরা নিজেদের গল্প বলার সাহস পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন নিজের জীবন, নিজের পরিবার, নিজের ভাষা, নিজের ক্ষতও সাহিত্যের বিষয় হতে পারে।
তবে সাতরাপি নিজেকে কখনো পবিত্র কোনো চরিত্রে বসাতে দেননি। তিনি ধূমপান করতেন, গালি দিতেন, নিজের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতেন, শিল্পের ক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করতেন। “রোল মডেল” হওয়ার আরামদায়ক আসন তাঁর পছন্দ ছিল না। তিনি বরং বলতেন, তিনি কোনো নায়ক নন, তিনি এমন একজন মানুষ যিনি নিরাপদ দূরত্ব থেকে গল্প বলার সুযোগ পেয়েছেন, যখন অন্যরা আসল বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়েছে। এই বিনয় আসলে তাঁর রাজনৈতিক সততার জায়গা ছিল। তিনি সবসময় পাঠকের চোখ ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের দিকে, যারা এখনো ইরানের ভেতরে আছেন, যাদের কাছে ইউরোপীয় নাগরিকত্ব নেই, আন্তর্জাতিক খ্যাতি নেই, কিন্তু প্রতিদিন সেই একই ইতিহাসের ভার নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
মারজান সাতরাপি রেখে গেলেন এমন এক কাজের জগৎ, যা বহু মানুষের কাছে ইরান, যুদ্ধ, মেয়েদের বেড়ে ওঠা, নির্বাসন আর পরিচয়ের রাজনীতি বোঝার প্রথম দরজা হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার শুধু বই বা চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি অসংখ্য তরুণ শিল্পীকে শিখিয়েছেন, নিজের এলোমেলো, অসম্পূর্ণ, দ্বিধায় ভরা জীবনও গল্প হওয়ার যোগ্য।
সাদা কাগজের ওপর কালো কালির রেখা দিয়ে তিনি ইতিহাসের ধূসর অঞ্চলগুলো এঁকেছিলেন। সেই রেখার ভেতর ছিল একটি মেয়ের মুখ, তেহরানের রাস্তা, হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি, আর এমন এক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, যার গল্প এখনো শেষ হয়নি।




