মায়ের মুখ
মা বললেন, আমার চুল পড়লে অসুবিধা নাই। আমার মেয়ের চুল যেন না পড়ে।
মায়ের মুখের বাঁ পাশে প্রথমে একটা ছোট কালো দাগ হয়েছিল।
দাগটা দেখতে তিলের মতো। মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এই বয়সে নতুন তিল গজায়?
আমি বললাম, গজাতে পারে।
মা বললেন, তুই ডাক্তার?
না।
তাহলে ডাক্তারদের মতো কথা বলছিস কেন?
মা বিরক্ত মুখে আয়না নামিয়ে রাখলেন। আয়নাটা গোল। চারপাশে লাল প্লাস্টিকের ফুল আঁকা। আমার বয়স যখন দশ, তখন নিউমার্কেট থেকে আয়নাটা কিনেছিলেন। দাম ছিল পঁয়ত্রিশ টাকা। দোকানদার চেয়েছিল চল্লিশ। মা পাঁচ টাকা কমিয়েছিলেন এবং বাসায় ফিরে সারাদিন বলেছিলেন, লোকটা আমাকে ঠকিয়েছে।
আয়নাটা এখনো আছে।
শুধু আয়নায় যে মুখটা দেখা যায়, সেই মুখটা বদলে গেছে।
প্রথম ডাক্তার বললেন, চিন্তার কিছু নেই। দ্বিতীয় ডাক্তার বললেন, পরীক্ষা করা দরকার। তৃতীয় ডাক্তার রিপোর্ট দেখে চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
ডাক্তাররা খারাপ খবর দেওয়ার আগে চশমা খুলে রাখেন কেন, কে জানে। হয়তো চশমা পরে থাকলে রোগীর চোখের দিকে তাকাতে হয়। চশমা খুলে ফেললে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যায়। অস্পষ্ট মানুষের কাছে কঠিন কথা বলা সহজ।
ডাক্তার বললেন, স্কিন ম্যালিগন্যান্সি।
মা বললেন, বাংলায় বলেন।
ডাক্তার বাংলায় বললেন।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, চুল পড়ে যাবে?
ডাক্তার একটু অবাক হলেন। বললেন, চিকিৎসার ধরন দেখে বলা যাবে।
মা বললেন, আমার চুল পড়লে অসুবিধা নাই। আমার মেয়ের চুল যেন না পড়ে।
ডাক্তার হাসলেন না। আমি হাসলাম। মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হাসছিস কেন?
আমি বললাম, কিছু না।
মা বললেন, কিছু না হলে মানুষ হাসে না। পাগলরা হাসে।
সেদিন হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় মা ফুচকা খেতে চাইলেন। রাস্তার পাশে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন ফুচকা খেলাম। মা ঝাল বেশি দিতে বললেন। তারপর একটার পর একটা ফুচকা মুখে দিয়ে বললেন, ক্যানসার হলে কি ঝাল খাওয়া নিষেধ?
আমি বললাম, জানি না।
তুই কিছুই জানিস না।
হুঁ।
শুধু শুধু সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিস কেন?
আমি বললাম, তোমার সঙ্গে ঘুরতে ভালো লাগে।
মা বললেন, মিথ্যা কথা। আমার সঙ্গে ঘুরতে কারও ভালো লাগে না। আমি বেশি কথা বলি।
কথাটা সত্যি। মা বেশি কথা বলতেন। রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বলতেন। সবজিওয়ালার সঙ্গে কথা বলতেন। বাসার সামনে যে বৃদ্ধ ভিক্ষুক বসে থাকত, তার সঙ্গে কথা বলতেন। বৃদ্ধ একদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিল, আম্মাজান, দুই টাকা দেন। জীবনী জানতে চান কেন?
মায়ের অসুখ বাড়ার পর কথা বলা কমে গেল।
মুখের কালো দাগটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। বাঁ গালের চামড়া শক্ত হয়ে উঠল। ঠোঁটের এক পাশ নিচে নেমে গেল। চোখের নিচে ক্ষত হলো। ক্ষত থেকে এক ধরনের গন্ধ বের হতো। হাসপাতালের নার্স বলেছিলেন, এই গন্ধের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।
মানুষ সবকিছুর সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়।
রক্তের সঙ্গে।
পচা ওষুধের গন্ধের সঙ্গে।
রাত তিনটায় ব্যথায় মায়ের গোঙানির সঙ্গে।
প্রতিদিন নতুন করে বদলে যাওয়া একটি পরিচিত মুখের সঙ্গে।
আমি ক্ষত পরিষ্কার করতাম। তুলা ভিজিয়ে আস্তে আস্তে মুছতাম। মা চোখ বন্ধ করে বলতেন, ব্যথা লাগছে না।
আমি বলতাম, আমি তো জিজ্ঞেস করিনি।
মা বলতেন, জিজ্ঞেস করবি, এই জন্যে আগেই বললাম।
কখনো ব্যথা খুব বেশি হলে আমার কবজি চেপে ধরতেন। তাঁর আঙুলে তখন শক্তি ছিল না। তবু আমার মনে হতো, কেউ লোহার সাঁড়াশি দিয়ে হাত ধরে আছে।
ক্ষত পরিষ্কার করার সময় ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে হতো। মা চাইতেন না পাশের বাসার কেউ দেখে ফেলে। জানালা বন্ধ করলে ঘর গরম হয়ে যেত। ফ্যানের বাতাসে ওষুধের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
আমি একদিন বললাম, জানালা খুলে দিই?
মা বললেন, না।
গরম লাগছে।
লাগুক।
দম বন্ধ হয়ে আসছে।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মানুষের চোখের চেয়ে বন্ধ ঘর ভালো।
আমি বললাম, সবাই খারাপভাবে দেখে না।
মা বললেন, তুই এখনো মানুষ চিনিস না।
আমি তখন ভাবতাম, মা অসুখের কারণে তিক্ত হয়ে গেছেন। পরে বুঝলাম, তিনি ঠিকই মানুষ চিনেছিলেন।
অসুখের প্রথম দিকে আত্মীয়স্বজন অনেক আসত। কেউ ফল নিয়ে আসত। কেউ স্যুপ। কেউ জমজমের পানি। কেউ একটা তাবিজ এনে বলত, সাত দিন গলায় রাখলে শুকিয়ে যাবে।
কী শুকিয়ে যাবে, তা পরিষ্কার করে বলত না।
ক্যানসার?
ক্ষত?
নাকি মা নিজেই?
মা সবার সঙ্গে কথা বলতেন। হাসার চেষ্টা করতেন। তাঁর ঠোঁটের এক পাশ নড়ত, অন্য পাশ নড়ত না। হাসিটা দেখে মনে হতো, মুখের ভেতর কেউ দড়ি বেঁধে টান দিয়েছে।
কিছুদিন পর আসা কমে গেল।
ফলের ঝুড়ি বন্ধ হলো।
টেলিফোন বন্ধ হলো।
যারা নিয়মিত খবর নিত, তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মানুষের ব্যস্ততা অসুখের চেয়েও রহস্যময়। কারও ছেলের পরীক্ষা। কারও অফিসে অডিট। কারও বাসা বদল। কারও কোমরে ব্যথা। একজন বললেন, তোমার মাকে দেখতে গেলে আমার সারারাত ঘুম হয় না। আমি খুব নরম মনের মানুষ।
আমি বললাম, না এলেই ভালো।
তিনি আহত গলায় বললেন, তুমি কি রাগ করলে?
না।
রাগ করেছ। তোমাদের এই সময় মাথা ঠিক থাকে না।
আমি টেলিফোন রেখে দিলাম।
তারপর আবার মানুষ আসতে শুরু করল।
এই আসা আগের আসার মতো ছিল না।
মায়ের মুখের ক্ষত তখন অনেক বড় হয়েছে। বাঁ চোখ পুরোপুরি বন্ধ। নাকের পাশে কালচে মাংস জমেছে। ডাক্তার নিয়মিত ড্রেসিং করতে বলেছেন। মুখের এক পাশ ঢেকে রাখার জন্যে পাতলা সাদা কাপড় ব্যবহার করতাম।
খবর কীভাবে ছড়াল জানি না। হয়তো কেউ বলেছে, ভাবির মুখটা একেবারে চেনা যায় না। কেউ বলেছে, ভয়াবহ অবস্থা। কেউ নিশ্চয়ই গলা নামিয়ে বলেছে, জীবনে এরকম জিনিস দেখি নাই।
তারপর মানুষ দেখতে এলো।
তারা দরজায় দাঁড়িয়ে দুঃখী গলায় বলত, আপাকে একটু দেখে যাই।
আমি বলতাম, মা ঘুমাচ্ছেন।
এক মিনিট দেখেই চলে যাব।
শরীর ভালো না।
এই জন্যেই তো দেখতে এসেছি।
তারা ঘরে ঢুকে বিছানার কাছে বসত। প্রথমে মায়ের হাত ধরত। তারপর তাদের চোখ চলে যেত মুখের কাপড়ের দিকে। কেউ কথা বলতে বলতে ঘাড় বাঁকাত। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে অন্য পাশ থেকে দেখার চেষ্টা করত। কেউ বলত, কাপড়টা মুখে কেন? গরম লাগে না?
মা বলতেন, লাগে।
তাহলে সরিয়ে রাখেন।
মা বলতেন, থাক।
একদিন মায়ের দূরসম্পর্কের এক চাচাতো বোন এলেন। সঙ্গে তাঁর বড় মেয়ে। মেয়েটির বয়স ত্রিশের মতো। সে ঘরে ঢুকেই মোবাইল ফোন হাতে নিল।
আমি বললাম, ফোনটা রাখুন।
মেয়েটি বলল, সময় দেখছিলাম।
ঘড়ি দেয়ালে আছে।
সে লজ্জা পেল না। বরং বিরক্ত হলো।
মায়ের পাশে বসে চাচাতো বোন বললেন, দেখি আপা, ক্ষতটা কত দূর গেছে?
মা চুপ করে রইলেন।
তিনি আবার বললেন, আমরা তো আপন মানুষ। আমাদের কাছে লজ্জা কী?
মা আমার দিকে তাকালেন।
সেই তাকানোর অর্থ আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম।
আমি বললাম, মা এখন বিশ্রাম নেবে। আপনারা উঠুন।
চাচাতো বোন অবাক হয়ে বললেন, এইমাত্র তো এলাম।
আমি বললাম, দেখা হয়ে গেছে।
তিনি বললেন, তোমার ব্যবহার খুব খারাপ হয়ে গেছে।
আমি বললাম, হতে পারে।
আমরা কি শত্রু?
আমি জবাব দিলাম না।
তিনি গলা নিচু করে বললেন, মানুষ অসুখে পড়লে আত্মীয়স্বজনই তো পাশে থাকে।
আমি বললাম, পাশে থাকা আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা এক জিনিস না।
ঘর হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
মায়ের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অক্সিজেন কনসেনট্রেটর থেকে হুঁ হুঁ শব্দ আসছে। বাইরে একজন ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছে, পুরোনো লোহা ভাঙা মোবাইল বিক্রি করবেন।
চাচাতো বোনের বড় মেয়ে বলল, আমরা কি সার্কাস দেখতে এসেছি?
আমি তার দিকে তাকালাম।
সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
চাচাতো বোন বললেন, চল। অপমানিত হওয়ার জন্যে আসিনি।
তাঁরা চলে গেলেন।
দরজা বন্ধ করার পর আমার হাত কাঁপছিল। বুকের ভেতর ধকধক করছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি খুব খারাপ কাজ করেছি। আত্মীয়দের অপমান করেছি। অসুস্থ মায়ের জন্যে মানুষের দোয়া দরকার। আমি সেই দোয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছি।
আমি মায়ের পাশে এসে বসলাম।
মা বললেন, তুই ঠিক করেছিস।
আমি বললাম, কী ঠিক করেছি?
ওদের বের করে দিয়েছিস।
আমি বললাম, ওরা তোমাকে দেখতে এসেছিল।
মা বললেন, না। ওরা আমার অসুখ দেখতে এসেছিল।
আমি কিছু বললাম না।
মা বললেন, মানুষের দোষও দিতে পারিস না। ভয়ঙ্কর জিনিস মানুষ দেখতে চায়। দেখে মনে মনে ভাবে, যাক, আমার তো হয় নাই।
আমি বললাম, তুমি এসব কথা বলো না।
মা বললেন, তুই রাগ করেছিস?
হুঁ।
কার ওপর?
সবার ওপর।
আমার ওপরও?
তোমার ওপর কেন?
মা চোখ বন্ধ করে বললেন, আমার ওপরও রাগ কর। আমি তোকে খুব কষ্ট দিচ্ছি।
আমি মায়ের হাত ধরলাম। হাতটা ঠান্ডা। চামড়ার নিচে শুধু হাড়। এই হাত দিয়ে মা একসময় আমার চুল বাঁধতেন। জ্বর হলে কপালে পানি দিতেন। স্কুলে যাবার আগে ভাত মেখে মুখে তুলে দিতেন। আমি খেতে না চাইলে বলতেন, শেষ লোকমা। তাঁর শেষ লোকমা কখনো শেষ হতো না।
আমি বললাম, তুমি আমাকে কোনো কষ্ট দিচ্ছ না।
মা বললেন, মিথ্যা কথা বলিস না। মিথ্যা বললে মানুষের মুখ শুকিয়ে যায়।
আমি বললাম, আমার মুখ এমনিতেই শুকনা।
মা শব্দ করে হাসার চেষ্টা করলেন। হাসতে গিয়ে কাশলেন। ক্ষত থেকে অল্প রক্ত বের হলো।
আমি তাড়াতাড়ি তুলা আনলাম।
মা বললেন, জানালাটা খুলে দে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, মানুষ দেখবে।
দেখুক।
কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, না, বন্ধই থাক।
আমি জানালা বন্ধ করে দিলাম।
সেদিন রাতে আমি কাগজে বড় করে লিখলাম:
রোগী গুরুতর অসুস্থ। দেখা করা নিষেধ।
কাগজটা দরজায় লাগিয়ে দিলাম।
পরদিন দুপুরে খালা এসে কাগজ দেখে রেগে গেলেন।
বললেন, মানুষ কি জেলখানায় আছে?
আমি বললাম, না।
তাহলে দেখা করা নিষেধ কেন?
মা ক্লান্ত হয়ে যায়।
খালা গলা নামিয়ে বললেন, আসল কথা বল। তুই কাউকে দেখতে দিতে চাস না।
আমি বললাম, হ্যাঁ।
কেন?
আমি বললাম, সবাই দেখতে আসে না।
খালা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
হয়তো গেছে।
তুই একা একা কতদিন সামলাবি?
যতদিন লাগে।
খালা চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, বিপদে মানুষ চেনা যায়।
আমি মনে মনে বললাম, ঠিকই বলেছেন।
তারপর আমাদের বাড়ি শান্ত হয়ে গেল।
কেউ এলেই আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম। ফল রেখে যেত। খাবার রেখে যেত। দোয়ার কথা বলে চলে যেত। ঘরের ভেতর ঢুকতে দিতাম না।
শুধু একজনকে ঢুকতে দিতাম। পাশের বাসার বৃদ্ধা রহিমা খালা। তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসতেন। মায়ের পাশে বসে পাখা করতেন। কোনো প্রশ্ন করতেন না। ক্ষতের দিকে তাকাতেন না। মায়ের হাতের নখ কেটে দিতেন। মাঝে মাঝে মাথায় নারকেল তেল মাখিয়ে দিতেন।
মা বলতেন, রহিমা, তোমার তো বাসায় কাজ আছে।
রহিমা খালা বলতেন, কাজ সবসময়ই থাকে।
তোমার নাতিরা খুঁজবে।
খুঁজুক।
তুমি আমার মুখ দেখে ভয় পাও না?
রহিমা খালা বলতেন, তোমার মুখের মধ্যে কী আছে যে ভয় পাব?
মা বলতেন, আয়না দিলে বুঝতে।
রহিমা খালা বলতেন, আয়না মিথ্যা কথা বলে।
মা বলতেন, এই বয়সে নতুন দর্শন শিখেছ?
রহিমা খালা বলতেন, দর্শন না। চোখে কম দেখি।
মা হাসতেন।
রহিমা খালা মায়ের মুখ মুছে দিতেন।
মানুষের বড় বড় ভালোবাসা নিয়ে অনেক কথা আছে। মা দিবস আছে। কবিতা আছে। ছবির নিচে লেখা থাকে, মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। এসব কথার শব্দ অনেক।
রহিমা খালার ভালোবাসার কোনো শব্দ ছিল না।
তিনি আসতেন। বসতেন। কাজ করতেন। চলে যেতেন।
মায়ের শেষ রাতেও তিনি ছিলেন।
সেদিন মা সারাক্ষণ অস্থির ছিলেন। বারবার বলছিলেন, মুখের কাপড়টা ঠিক করে দে। কেউ এলে যেন না দেখে।
আমি বললাম, কেউ আসবে না।
মা বললেন, মানুষ মৃত্যুর খবর পেলে আসে।
এখনো তো তুমি মরো নাই।
আসবেই।
রাত দেড়টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। অক্সিজেনের মেশিন বন্ধ হয়ে গেল। আমরা সিলিন্ডার চালু করলাম। মোমবাতির আলোয় দেয়ালে আমাদের ছায়া পড়ল।
মায়ের ছায়াটা খুব ছোট দেখাচ্ছিল।
একসময় তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন।
আমি মুখ নামিয়ে নিলাম।
মা বললেন, তুই কি আমার মুখে হাত দিতে ঘেন্না পাস?
আমি বললাম, না।
তাহলে হাত দে।
আমি ক্ষতবিক্ষত গালের ওপর হাত রাখলাম। জায়গাটা গরম। খুব গরম।
মা চোখ বন্ধ করলেন।
বললেন, ছোটবেলায় তোর জ্বর হলে তুই আমার হাত গালে চেপে ধরে ঘুমাতিস।
আমার মনে নেই।
আমার আছে।
তারপর অনেকক্ষণ কোনো কথা হলো না।
রহিমা খালা পাখা করছিলেন। মোমবাতির শিখা কাঁপছিল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। খুব হালকা বৃষ্টি। টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল।
ভোরের দিকে মা একবার চোখ খুললেন।
বললেন, ঘরে এত মানুষ কেন?
ঘরে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না।
আমি বললাম, কেউ নেই মা।
মা অবাক হয়ে বললেন, তাহলে ভালো।
তারপর বললেন, মুখটা মুছে দে।
আমি ভেজা তুলা দিয়ে মায়ের মুখ মুছলাম।
খুব আস্তে।
যেন ব্যথা না লাগে।
মুছতে মুছতে একসময় বুঝলাম, মায়ের আর ব্যথা লাগছে না।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না।
সকাল আটটার মধ্যে বাড়ি ভরে গেল। যারা মাসের পর মাস আসেনি, তারাও এল। কেউ কাঁদল। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেউ বলল, শেষবার মুখটা দেখি।
আমি মায়ের মুখ সাদা কাপড়ে ঢেকে রেখেছিলাম।
একজন বললেন, মুখ ঢেকে রেখেছ কেন?
আমি বললাম, মা এটাই চেয়েছিল।
শেষবার দেখতে দাও।
আমি কাপড় সরালাম না।
আরেকজন বললেন, মৃত মানুষের আবার লজ্জা কী?
আমি বললাম, লজ্জা মায়ের না। লজ্জা আমাদের।
লোকটি আমার কথা বুঝল না।
বোঝার কথাও না।
আমি মায়ের পাশে বসে তাঁর মুখের কাপড়টা ঠিক করে দিলাম। বাইরে অনেক মানুষ। অনেক কথা। অনেক কান্না। অনেক উৎসুক চোখ।
ঘরের ভেতর রহিমা খালা চুপচাপ বসে ছিলেন।
তিনি একবারও মায়ের মুখ দেখতে চাইলেন না।
শুধু মায়ের শক্ত হয়ে আসা হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বসে রইলেন।
তখন আমার মনে হলো, অসুখ মানুষের শরীর খুলে দেয়। মৃত্যু তার চেয়েও বেশি কিছু করে। মানুষের ভেতরটা খুলে দেয়।
কেউ আসে মুখ দেখতে।
কেউ আসে গল্প নিয়ে ফিরে যেতে।
আর কেউ কেউ একটি হাত ধরে বসে থাকে।
পৃথিবী টিকে আছে শেষের মানুষগুলোর জন্যে।



