ব্যক্তিগতভাবে একজন একজন করে মানুষকে দেখলে মানুষ বিষয়ে আশাবাদী হওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। কোনো মানুষের মুখে বুদ্ধির দীপ্তি দেখি, কারো শরীরের রেখায় একটা সামঞ্জস্য, কারো কথায় এমন স্বচ্ছতা যে তার সঙ্গে দশ মিনিট কথা বললেই নিজের মনটাও যেন খানিকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। কেউ হাসলে ভালো লাগে, কেউ ঘরে ঢুকলে ঘরটা প্রাণ পায়, কারো সঙ্গে বসে এক কাপ চা খেতে খেতে মনে হয়, মানুষ নামের প্রাণীটি পৃথিবীতে জন্মেছে ভালোই হয়েছে।
আমি নিজেও মানুষকে এইভাবেই দেখতে ভালোবাসি। একজন মানুষ। একটি মুখ। একটি স্বতন্ত্র মস্তিষ্ক। তার নিজস্ব স্মৃতি, লজ্জা, অভিমান, ভয়, যুক্তি, ভালোবাসা, রাগ, দুর্বলতা। তার জন্মের একটি ইতিহাস আছে, তার বেড়ে ওঠার একটি পরিবেশ আছে, তার জীবনের কতগুলো হারানো বিকেল আছে যার কথা অন্য কেউ জানে না। তার একটি নির্দিষ্ট কণ্ঠস্বর আছে। পৃথিবীর আটশো কোটি মানুষের মধ্যে হুবহু তার মতো আর একজন নেই।
কিন্তু সেই মানুষটিকেই যখন ভিড়ের মধ্যে দেখি, তখন ব্যাপারটা আশ্চর্যভাবে বদলে যায়। কেন?
যে মানুষটি একা অবস্থায় যুক্তি দিতে পারে, ভিড়ের মধ্যে গিয়ে সে অনেক সময় যুক্তিহীন হয়ে ওঠে কেন? যে মানুষটি একা অবস্থায় একটি আহত কুকুর দেখে থেমে যেতে পারে, সেই মানুষই কখনো হাজার লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একজন মানুষকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে উত্তেজিত হতে পারে কী করে? যে মানুষটি নিজের সন্তানের সামান্য অপমানে ক্ষুব্ধ হয়, সে-ই কীভাবে জনতার মধ্যে মিশে অন্য কারো সন্তানকে অপমান করার আনন্দে শরিক হয়?
মানুষ কি ভিড়ের মধ্যে নিজের কিছু অংশ সাময়িকভাবে ত্যাগ করে? মনে হয় করে।
অনেক মানুষ এক জায়গায় জড়ো হলেই তো ভিড় হয় না। ট্রেনের কামরাতেও অনেক মানুষ থাকে। হাসপাতালে থাকে। বইমেলায় থাকে। বিমানবন্দরে থাকে। রাস্তার মোড়ে থাকে। সেই জনসমাবেশ সব সময় বিপজ্জনক নয়। বিপদটা শুরু হয় যখন বহু মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন উত্তেজনা প্রবাহিত হতে থাকে এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধির উপরে সেই উত্তেজনা অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
একজন একা মানুষ তখন আর একা মানুষটি থাকে না।
সে হয়ে যায় ‘আমরা’।
এই ‘আমরা’ শব্দটি বড়ো অদ্ভুত।
মানুষের সভ্যতার বহু সুন্দর কাজ এই ‘আমরা’ করেছে। দুর্যোগে মানুষ মানুষকে বাঁচিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে, স্বাধীনতার জন্য লড়েছে, দুর্ভিক্ষে খাবার ভাগ করেছে, অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছে। অতএব সমষ্টিকে সন্দেহ করলেই বিচার সম্পূর্ণ হয় না।
কিন্তু এই একই ‘আমরা’ যখন নিজের পরিচয় রক্ষা করার জন্য একটি ‘ওরা’ তৈরি করে, তখনই সমস্যার সূত্রপাত।
আমরা ভালো। ওরা খারাপ। আমরা দেশপ্রেমিক। ওরা বিশ্বাসঘাতক। আমরা ধার্মিক। ওরা অধার্মিক। আমরা সভ্য। ওরা অসভ্য। আমরা শুদ্ধ। ওরা অপবিত্র।
এবার ব্যক্তিমানুষটিকে আর চিনতে হয় না। তার নাম কী, সে কী করেছে, তার অপরাধ কী, সে আদৌ কোনো অপরাধ করেছে কি না, এসব প্রশ্ন ক্রমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। সে কোন দলে, কোন ধর্মে, কোন জাতিতে, কোন ভাষায়, কোন রাজনৈতিক শিবিরে, এই পরিচয়ই যথেষ্ট। এখানেই ভয়।
আমরা অনেক সময় বলে থাকি, মানুষকে ভালোবাসি। কবিরাও বলেছেন। কত কবিতা, কত গান, কত দর্শন মানুষের জয়গান গেয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় মানুষের জীবন, নগর, প্রেম, সৌন্দর্য নানা রূপে ফিরে আসে। আমাদের বাংলা কবিতায় বারবার ফুলের স্নিগ্ধতা, চাঁদের আলো, মানুষের প্রতি মমতা পাশাপাশি বসেছে। ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের বহুল উচ্চারিত পংক্তি,
‘শুনহ মানুষ ভাই!
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ,
স্রষ্টা আছে বা নাই।’
আমি নিজেও মানুষের জয়গান শুনতে চাই।
কিন্তু একটু থামি। কোন মানুষ? একজন মানুষ? না মানুষের ভিড়? দুয়ের চরিত্র কি এক?
একজন মানুষকে ভালোবাসা তুলনামূলক সহজ। তার চোখ আছে, মুখ আছে, দুঃখ আছে। আপনি তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সে ভুল করলে প্রশ্ন করতে পারেন। সে কাঁদলে তার কাঁধে হাত রাখতে পারেন।
‘মানবতা’ নামের যে বিশাল বিমূর্ত পিণ্ডটির কথা আমরা বলি, তার কোনো মুখ নেই। ফলে তার দায়ও নেই।
যে মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে স্নেহশীল পিতা, দায়িত্ববান স্বামী, বন্ধুর বিপদে নির্ভরযোগ্য, তিনিই রাজনৈতিক মিছিলে গিয়ে এমন স্লোগান দিতে পারেন যার বাস্তব অর্থ দাঁড়ায় অচেনা কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু কামনা করা। বাড়ি ফিরে আবার সন্তানকে কোলে নেবেন। এটা কী করে সম্ভব? মানুষ কি তখন ভণ্ড? সবসময় নয়।
মানুষের মন একই সঙ্গে বহু পরস্পরবিরোধী বিশ্বাস ধারণ করতে পারে। ব্যক্তি হিসেবে যে নৈতিকতা সে মানে, দলের সদস্য হিসেবে অন্য নৈতিকতা মেনে নেয়। নিজের আচরণের দায় তখন নিজের উপর থাকে না। চারদিকে আরও পাঁচশো লোক একই কাজ করছে। অতএব অপরাধটাও যেন পাঁচশো ভাগ হয়ে গেল।
সুবিধেটা এখানেই। একলা দাঁড়িয়ে একজন মানুষের গায়ে আগুন দেওয়া কঠিন। পাঁচ হাজার মানুষ ‘আগুন দাও’ বলে চিৎকার করলে কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। কারণ তখন মানুষ নিজেকে বলে, আমি তো একা করছি না। আমি শুধু সঙ্গে আছি। এই ‘শুধু সঙ্গে থাকা’ পৃথিবীর ইতিহাসে কত ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিয়েছে তার হিসাব করা কঠিন।
ভেবে দেখুন, গণহত্যা কখনো এক ব্যক্তির হাতে সম্পন্ন হয় না। দাঙ্গাও নয়। রাজনৈতিক নিপীড়নও নয়। একজন পরিকল্পনা করতে পারে, কয়েকজন নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া বৃহৎ নিষ্ঠুরতা সম্ভব হয় না।
তাহলে সেই হাজার মানুষ কি প্রত্যেকেই জন্মগতভাবে নিষ্ঠুর? সম্ভবত নয়। তাদের অনেকেই হয়তো স্বাভাবিক জীবনে আমাদের মতোই। সকালে চা খায়, সন্তানের স্কুল নিয়ে চিন্তা করে, অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনে, ছুটির দিনে বাজারে যায়। তবু তারা অংশ নেয়। কেন? ভয় একটি কারণ। দলের বাইরে পড়ে যাওয়ার ভয়।
মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী। আমরা ভাবতে ভালোবাসি, আমাদের মতামত আমাদের নিজের। প্রকৃতপক্ষে আমাদের অনেক মতই আশপাশের মানুষ অনুমোদন করবে কি না, সেই হিসাব কষে গড়ে ওঠে। দশজন একটি কথা বললে একাদশ ব্যক্তি দ্বিমত করার আগে দুবার ভাবে। হাজার মানুষ বললে আরো বেশি ভাবে।
আর যদি সেই ভিড় উত্তেজিত হয়? তখন দ্বিমত করা বিপজ্জনক। ফলে যে মানুষ মনে মনে সন্দেহ করছে সেও চুপ থাকে। তার পাশের মানুষটি সেই নীরবতাকে সম্মতি বলে ধরে নেয়। এভাবেই ভিড় নিজের সত্য তৈরি করে। এখানে আর একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। ভিড়ের স্মৃতি ছোট। ব্যক্তিমানুষের স্মৃতি দীর্ঘ হতে পারে। আপনি কাউকে অন্যায়ভাবে অপমান করলে রাতে শুয়ে তার মুখ মনে পড়তে পারে। অপরাধবোধ হতে পারে। ভিড়ের অপরাধবোধ নেই। কারণ ঘটনার পর ভিড় ভেঙে যায়। সন্ধ্যার পর সবাই বাড়ি ফিরে যায়। যে লোকটি দুপুরে উত্তেজিত জনতার সঙ্গে একটি দোকানে ইট ছুড়েছিল, রাতে সে টেলিভিশনের সামনে বসে ভাত খাচ্ছে। তার পাশে সন্তান। দুপুরের মানুষ আর রাতের মানুষ কি একই? জৈবিকভাবে অবশ্যই। নৈতিকভাবে? সেখানেই প্রশ্ন।
বুদ্ধদেব বসুর ‘ক্লাইভ স্ট্রীটে চাঁদ’ মনে পড়তে পারে। নগরজীবনের মধ্যে মানুষ কত দ্রুত একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়। অফিসের পথে মানুষের স্রোত, ট্রাম, বাস, হিসাব, সময়, বেতন, দপ্তর, আবার সন্ধ্যায় প্রত্যাবর্তন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় অসংখ্য স্বতন্ত্র জীব নয়, একটি বিশাল জীবন্ত যন্ত্র চলছে।
আমার এই জায়গাটিতেই বিস্ময়। একজন একজন করে ধরলে প্রত্যেকেই আলাদা। দূর থেকে দেখলে সবাই একই দিকে যাচ্ছে। এই দৃশ্য কখনো সুন্দরও হতে পারে। আবার কখনো ক্লান্তিকর।
একটি ব্যস্ত রেলস্টেশনে কয়েক হাজার মানুষ দেখুন। সবাই যাচ্ছে। কারো হাতে ব্যাগ, কারো কোলে শিশু, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ দৌড়াচ্ছে। প্রত্যেকের আলাদা গন্তব্য। কিন্তু উপর থেকে দেখলে তারা যেন রক্তপ্রবাহের কণিকা। মানুষ তখন সংখ্যা। আর সংখ্যা হয়ে যাওয়াটাই বিপজ্জনক। কারণ সংখ্যা কাঁদে না।
একজন মানুষ মারা গেলে তার নাম থাকে। তার ঘর থাকে। তার জামা আলমারিতে ঝুলে থাকে। তার ফোনে অসমাপ্ত কথোপকথন থাকে। দশ হাজার মানুষ মারা গেলে সংবাদে লেখা হয় ‘দশ হাজার নিহত’। মানুষ সংখ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনুভূতিও বদলে যায়। একজন শিশুর মৃত্যু আমাদের বিচলিত করে। দশ হাজার শিশুর মৃত্যু পরিসংখ্যান হয়ে যেতে পারে। এটা মানুষের মনেরই সীমাবদ্ধতা।
অতএব আমরা যখন বলি ‘আমি মানুষকে ভালোবাসি’, তখন একটু পরীক্ষা করা দরকার আমরা কাকে ভালোবাসছি। মানুষ নামের আদর্শ ধারণাকে? না বাস্তব মানুষকে? বাস্তব মানুষ কিন্তু সহজ নয়। সে সবসময় মনোরম নয়। তার শরীর অসুস্থ হয়। সে বিরক্তিকর হতে পারে। তার রাজনৈতিক মত আমার বিপরীত হতে পারে। তার ধর্ম, ভাষা, রুচি, পোশাক, যৌনতা, খাদ্যাভ্যাস আমার অপছন্দ হতে পারে।
তবু মানুষকে ভালোবাসার পরীক্ষা সেখানেই। যে আমার মতো, তাকে ভালোবাসা খুব বড়ো নৈতিক কৃতিত্ব নয়। যে আমার মতো নয়, তার মানুষ হিসেবে অধিকার মেনে নিতে পারছি কি? ‘সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ’ বলাটা সহজ। কিন্তু যখন আমার ধর্মের সঙ্গে একজন মানুষের মত বিরোধ হয়? তখন কে উপরে? মানুষ? না আমার ধর্মীয় অনুভূতি? যখন আমার রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে? তখন? মানুষ? না দল? যখন রাষ্ট্রের স্বার্থের নামে নিরপরাধ মানুষ মরছে? তখন? যখন নারীর স্বাধীনতার সঙ্গে পরিবারের সম্মান’-এর সংঘর্ষ হয়? তখন? যখন নিম্নবর্গের একজন মানুষের অধিকার আমার সামাজিক সুবিধাকে আঘাত করে? তখন? মানুষকে শ্রেষ্ঠ বলার সত্যতা এসব জায়গাতেই পরীক্ষা হয়। না হলে কবিতা বলা হয় মাত্র। খারাপ কবিতা নয়। প্রয়োজনীয় কবিতা। কিন্তু নৈতিক বাস্তবতা কবিতার চেয়ে কঠিন।
মানুষের আর একটি প্রবণতা আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজেকে স্বাধীনচেতা মনে করি, অথচ সামাজিক অনুমোদনের জন্য আমাদের আকাঙ্ক্ষা বিপুল। কেন ভাইরাল হয়? কেন গুজব ছড়ায়? কেন একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হঠাৎ কোটি মানুষের মুখের ভাষা হয়ে যায়? কেন সামাজিক মাধ্যমে একই বাক্য হাজার মানুষ সামান্য শব্দ বদলে লিখতে থাকে? কারণ মানুষ অনুকরণ করে। অনুকরণ সভ্যতারও ভিত্তি। শিশু ভাষা শেখে অনুকরণ করে। কারিগরি শেখে। সামাজিক আচরণ শেখে। কিন্তু সেই শক্তিটিই ভিড়ের মধ্যে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একজন দৌড়ালে আমরা জিজ্ঞেস করি, লোকটি দৌড়াচ্ছে কেন। পঞ্চাশজন দৌড়ালে আমরাও দৌড়াতে শুরু করি। কারণ তখন প্রশ্ন করার অবকাশ কমে যায়।
মানুষের এই স্বভাব রাজনৈতিক নেতারা জানেন, ধর্মীয় প্রচারকরা জানেন, বিজ্ঞাপন নির্মাতারা জানেন, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও জানে। একটি মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো কঠিন। একটি ভিড়কে আবেগ দিয়ে চালানো তুলনামূলক সহজ। সেজন্য ইতিহাসে যারা মানুষের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তারা ব্যক্তিমানুষের স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকে খুব পছন্দ করেনি।
প্রশ্ন করা মানুষ বিপজ্জনক। ভিড় অনুগত হলে সুবিধা। স্লোগান তাই যুক্তির চেয়ে ছোট। স্লোগানে ব্যাখ্যা থাকে না। প্রশ্ন থাকে না। শুধু নির্দেশ থাকে। চল। ভাঙো। মারো। বাঁচাও। জয়। ধিক্কার।
কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে গেলে সময় লাগে। আমি যার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছি তার পাশে পাঁচ মিনিট বসে কথা বললে বিপদ হতে পারে। জানতে পারি তারও একটি মেয়ে আছে। সেও বাবার চিকিৎসা নিয়ে চিন্তিত। সেও রাতে ঘুমাতে পারে না। তারও প্রিয় গান আছে। তখন তাকে ঘৃণা করা কঠিন হয়ে যায়। এই কারণে যুদ্ধের জন্য শত্রুকে মানুষ হিসেবে দেখানো যায় না। তাকে একটি নাম দিতে হয়। একটি জাতি। একটি ধর্ম। একটি অবমাননাকর বিশেষণ। তার ব্যক্তিত্ব মুছে দিতে হয়। তারপর হত্যা সহজ।
মহাভারতেও আমরা বারবার দেখি নামের সঙ্গে বিশেষণ জুড়ে দিয়ে চরিত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। কে ‘ধর্মাত্মা’, কে ‘দুরাত্মা’, কে ‘মহাত্মা’, কে ‘পাপিষ্ঠ’। কিন্তু কাজগুলো পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন জাগে, বিশেষণটি পেলেন কী করে? বিশেষণ কি ঘটনার বিচার থেকে এসেছে, না বিশেষণ দিয়েই আমাদের ঘটনার বিচার করতে শেখানো হয়েছে?
আজও আমরা একই কাজ করি। একজন মানুষকে ‘দেশদ্রোহী’ বললাম। ব্যস। এবার তার কথার বিচার করার প্রয়োজন অনেকের কাছেই ফুরিয়ে যায়। ‘নাস্তিক’ বললাম। ‘মৌলবাদী’ বললাম। ‘বাম’ বললাম। ‘ডান’ বললাম। ‘অশিক্ষিত’ বললাম। ‘এলিট’ বললাম। বিশেষণটি মানুষটিকে গিলে খেল। তারপর ভিড়ের কাজ সহজ।
তাই আমার কাছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। এটা একটি সম্ভাবনা। মানুষের মধ্যে বুদ্ধি আছে, কিন্তু নির্বুদ্ধিতাও আছে। মমতা আছে, নিষ্ঠুরতাও আছে। সাহস আছে, কাপুরুষতাও আছে। যুক্তি আছে, কুসংস্কারও আছে। স্বাধীনতা কামনা করে, আবার সুযোগ পেলে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এই বিপরীত শক্তিগুলো নিয়েই মানুষ। তবু আমি মানুষ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরাশ হতে পারি না। কেননা সেই ভিড়ের মধ্য থেকেই কখনো একজন বেরিয়ে আসে। বলে, না। সবাই যখন একটি নিরপরাধ মানুষকে মারছে, একজন তাকে বাঁচাতে যায়। সবাই যখন চুপ, একজন প্রশ্ন করে। সবাই যখন মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে, একজন বলে, প্রমাণ কোথায়?
সেই একজনের মধ্যে আবার ব্যক্তিমানুষ ফিরে আসে। আমার মনে হয় সভ্যতার আসল লড়াইটা এখানেই। মানুষ বনাম মানুষ নয়। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরের ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে আমাদের ভিতরের ভিড়ের লড়াই। আমি কি নিজের বিচার করবো? না অন্যরা যা বলছে তাই বলবো? আমি কি একজন অপরিচিত মানুষের মুখ দেখবো? না তার পরিচয়ের লেবেল দেখবো? আমি কি প্রশ্ন করবো? না স্লোগান দেবো?
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের মস্তিষ্কটুকু নিজের কাছে রাখা খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সেখানেই। তাই কেউ যখন বলেন, ‘আমি মানুষের জয়গান গাই, মানুষকে ভালোবাসি’, আমি তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে চাই। কিন্তু সঙ্গে একটি ছোট প্রশ্ন জুড়ে দিতে ইচ্ছে করে।
কোন মানুষকে? আমার মতো মানুষকে? আমার দলের মানুষকে? আমার ধর্মের মানুষকে? আমার দেশের মানুষকে? না কেবল মানুষ বলেই মানুষকে? শেষ প্রশ্নটিই কঠিন। আর সেখানেই সমস্ত কথা এসে দাঁড়ায়।
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ, স্রষ্টা থাকুন বা না-ই থাকুন, বাক্যটি সুন্দর। কিন্তু মানুষের উপরে যখন দল, ধর্ম, জাতি, রাষ্ট্র, নেতা, মতবাদ, পরিচয়, প্রতিশোধ, ভয় এবং ভিড়কে আমরা নিজেরাই বসিয়ে দিই, তখন সেই শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় থাকে?
ব্যক্তিমানুষকে দেখলে এখনো আমার আশা হয়। ভিড় দেখলে ভয় হয়। সম্ভবত সেই ভয় মানুষকে ঘৃণা করার ভয় নয়। মানুষ যেন নিজের মুখটি হারিয়ে না ফেলে, সেই ভয়। পৃথিবীতে ‘মানবতা’ নামে আলাদা কোনো প্রাণী হাঁটে না। হাঁটে একজন একজন মানুষ। প্রশ্ন হলো, সে কি নিজের পায়ে হাঁটছে? না ভিড় তাকে নিয়ে যাচ্ছে?


