একটা অঙ্ক আছে। প্রায় একশো বছর ধরে পৃথিবীর তাবড় গণিতবিদেরা তার সঙ্গে কুস্তি লড়ছেন। কেউ তার ঘাড় ধরেছেন, কেউ পা, কেউ একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে খানিকটা কাবু করে ভেবেছেন, এই বার বুঝি চিৎপাত। কিন্তু অঙ্কটি দিব্যি বহাল তবিয়তে। জন ন্যাশ এসেছেন, লুই নিরেনবার্গ এসেছেন, লুই কাফারেল্লি এসেছেন। অঙ্কটি প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখে নিয়ে আবার আগের মতো বসে পড়েছে।
হঠাৎ খবর এল, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই অঙ্কের সমাধান করে ফেলেছে।
এবং তার পরেই, যথারীতি, আর-একটি অঙ্কের জন্ম। এই অঙ্কটা গণিতের বইয়ে নেই। এর প্রশ্ন, তা হলে গণিতবিদদের কী হবে?
বিশেষত যে ছেলেটি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করেছে, যে মেয়েটি পাঁচ বছর ধরে একটি উপপাদ্যের পিছনে মাথা খুঁড়ে চলেছে, তাদের পক্ষে খবরটি বিশেষ স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা নয়। একটি যন্ত্র যদি পৃথিবীর কয়েক প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের নাগালের বাইরে থাকা সমস্যা সমাধান করে ফেলে, তা হলে তাদের এত দিনের পড়াশোনা, সাধনা, প্রতিভা, ভবিষ্যৎ, সব কিছুর দাম কত?
প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তর দিতে হলে আগে দেখতে হবে, যন্ত্রটি ঠিক কোন অঙ্কের উত্তর দিয়েছে। কারণ গণিতে প্রশ্নের একটি শব্দ এদিক-ওদিক হয়ে গেলে উত্তরের চরিত্র আমূল বদলে যেতে পারে। আইনজীবীর চুক্তিপত্রে যেমন, গণিতবিদের উপপাদ্যেও তেমন। একটি শর্তের ফাঁক দিয়ে আস্ত হাতি বেরিয়ে যেতে পারে।
প্রথমে অঙ্কটা একটু বুঝে নেওয়া যাক।
আপনি এক কাপ চায়ে চামচ ঘোরাচ্ছেন। চা ঘুরছে। চামচ সরিয়ে নিলেও কিছুক্ষণ সেই ঘূর্ণি থাকে, তার পর ধীরে ধীরে থেমে যায়। নদীর জল পাথরে ধাক্কা খেয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আকাশে মেঘ জমছে, বাতাস বইছে, সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে। এই সমস্ত ঘটনার পিছনে তরল ও গ্যাসের গতিবিদ্যা কাজ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্লদ-লুই নাভিয়ার এবং জর্জ গ্যাব্রিয়েল স্টোকস যে সমীকরণগুলির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, সেগুলি দিয়ে এই প্রবাহের গতি বোঝার চেষ্টা করা হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে বিমান নির্মাণ, সমুদ্রবিজ্ঞান থেকে টার্বুলেন্স বা অশান্ত প্রবাহের গবেষণা, বহু ক্ষেত্রেই নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের ভূমিকা রয়েছে।
সমীকরণগুলির মধ্যে একাধিক প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করে। তরল নিজের গতির কারণে এগোয়, চাপের পার্থক্য তাকে চালিত করে, সান্দ্রতা (Viscosity) গতির তারতম্য মসৃণ করতে চায়। বাইরে থেকে কোনও বল প্রয়োগ করা হলে তার প্রভাবও হিসেবের মধ্যে ঢুকতে পারে।
গোলমাল বাধে তিন মাত্রায়।
একটি ঘূর্ণি কেবল ঘুরেই চলে না, সে লম্বাও হতে পারে। ঘূর্ণি প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে তার ঘূর্ণনের তীব্রতা বাড়তে পারে। আবার সান্দ্রতা সেই তীব্রতাকে ছড়িয়ে দিতে চায়। এই দুই প্রবণতার জটিল প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন।
ধরুন, কোনও তরলের প্রবাহ শুরুতে সম্পূর্ণ মসৃণ। কোথাও বেগের অস্বাভাবিক লাফ নেই, কোনও বিন্দুতে অসীম গতি নেই। তা হলে ভবিষ্যতেও কি সেই মসৃণতা বজায় থাকবে?
নাকি এমন একটি মুহূর্ত আসতে পারে, যখন সমীকরণ অনুযায়ী কোনও অত্যন্ত ক্ষুদ্র অঞ্চলে তরলের বেগ অসীমের দিকে ছুটবে?
গণিতের ভাষায় এই ধরনের বিপর্যয়কে বলা হয় ব্লো-আপ বা সিঙ্গুলারিটি।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার থাকা দরকার। বাস্তবের জলের কোনও অণু সত্যি সত্যি অসীম বেগে ছুটবে, এমন দাবি কেউ করছেন না। অসীম বেগের সম্ভাবনা একটি গাণিতিক মডেলের বৈশিষ্ট্য। মডেলটি এমন অবস্থায় পৌঁছলে বাস্তবের পদার্থবিজ্ঞানের আরও সূক্ষ্ম প্রভাব বিবেচনা করার দরকার হতে পারে।
অর্থাৎ, একটি সমীকরণ বাস্তব জগতের আচরণ কত দূর পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণনা করতে পারে, সেই প্রশ্নও এখানে জড়িয়ে রয়েছে।
২০০০ সালে ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট গণিতের সাতটি সমস্যাকে সহস্রাব্দের সমস্যা বা Millennium Prize Problems হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। প্রতিটির জন্য ঘোষণা করা হয় দশ লক্ষ মার্কিন ডলারের পুরস্কার।
নাভিয়ার-স্টোকসের অস্তিত্ব ও মসৃণতার প্রশ্ন ছিল সেই সাতটির একটি।
এর আগে গ্রিগরি পেরেলমান পয়াঁকারে অনুমানের সমাধান করেছিলেন। রিচার্ড হ্যামিলটনের রিচি ফ্লো-সংক্রান্ত কাজকে কাজে লাগিয়ে ২০০২-০৩ সালে তিনি যে প্রমাণ তৈরি করেন, তা গণিতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পেরেলমান শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুরস্কার গ্রহণ করেননি।
তার পর বহু বছর পেরিয়ে গেল।
২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর OpenAI ঘোষণা করল, তাদের একটি অভ্যন্তরীণ, তখনও প্রকাশ না-করা মডেল নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যার একটি অনুমোদিত বিকল্প সমাধানের প্রমাণ তৈরি করেছে।
কোম্পানির বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় দশ হাজার এআই এজেন্ট একযোগে কাজ করেছিল। এজেন্ট বলতে এখানে এমন সফটওয়্যার-ব্যবস্থাকে বোঝানো হচ্ছে, যারা মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন গাণিতিক পথ অনুসন্ধান করতে, কোড চালাতে এবং নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করতে পারে। প্রায় ৮৮ ঘণ্টার অনুসন্ধানের পরে সমাধানটি পাওয়া যায়। তার পর আরও প্রায় ১৭ ঘণ্টা ব্যয় হয় Lean নামের প্রুফ অ্যাসিস্ট্যান্টে প্রমাণটির আনুষ্ঠানিক যাচাই সম্পন্ন করতে।
একটি গবেষণার জন্য বিপুল গণনাশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বার্তা বিনিময় হয়েছে। একটি যন্ত্রব্যবস্থা বহু দিনের অমীমাংসিত সমস্যার জন্য গাণিতিক প্রমাণ হাজির করেছে।
ঘটনাটির গুরুত্ব অস্বীকার করার বিশেষ উপায় নেই। তবে সেপ্টেম্বরের ঘোষণার সময় এটিকে ক্লে পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। OpenAI নিজেও পুরস্কার দাবি না-করার কথা জানিয়েছে।
কিন্তু দশ হাজার এজেন্ট ঠিক কোন সমস্যাটির সমাধান করল?
সেইখানেই আসল গল্প।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ সের্গিউ ক্লাইনারম্যান এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি তুলেছেন।
মূল সহস্রাব্দ সমস্যাটির আনুষ্ঠানিক বিবরণ তৈরি করেছিলেন গণিতবিদ চার্লস ফেফারম্যান। সেখানে সমাধানের একাধিক সম্ভাব্য পথ রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে এমন একটি পথও ছিল, যেখানে তরলের উপর বাইরে থেকে একটি মসৃণ বল প্রয়োগ করে সমীকরণের বিপর্যয় দেখানো যেতে পারে।
এই বাহ্যিক বলকে বলা হচ্ছে ফোর্সিং।
ব্যাপারটা বোঝার জন্য আবার চায়ের কাপে ফিরি।
এক কাপ চা টেবিলে রাখা আছে। আপনি চামচ সরিয়ে নিয়েছেন। চায়ের ভিতরে যে গতি ইতিমধ্যে রয়েছে, সেই গতি নিজের নিয়মে কীভাবে বিকশিত হবে, সেটা একটি প্রশ্ন।
এ বার ধরুন, একজন অত্যন্ত কুশলী ব্যক্তি চায়ের মধ্যে বিশেষভাবে তৈরি একটি যন্ত্র বসিয়ে দিলেন। যন্ত্রটি এমনভাবে চাকে নাড়াচ্ছে যে কোনও একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলের গতি ক্রমশ বেড়েই চলল। বাইরে থেকে প্রয়োগ করা বলটিও নিয়মিত ও মসৃণ রইল।
দুটি পরিস্থিতির গাণিতিক শর্ত আলাদা।
OpenAI-এর প্রকাশিত প্রমাণটি দ্বিতীয় ধরনের। সেখানে তরলটি শুরুতে সম্পূর্ণ স্থির। বাইরে থেকে অত্যন্ত বিশেষভাবে নির্মিত একটি মসৃণ বল প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেই বলের প্রভাবে সীমিত সময়ের মধ্যে প্রবাহের বেগ অসীমের দিকে চলে যাচ্ছে। অথচ গোটা ব্যবস্থার গতিশক্তি সসীম থাকছে।
শেষের শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বেগের মান অসীমের দিকে চলে গেলেই গোটা তরলের শক্তি অসীম হতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। অসাধারণ বেশি বেগ যদি ক্রমশ ছোট হয়ে আসা একটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়, তা হলে মোট শক্তি সসীম থাকতে পারে।
আরও কঠিন শর্ত হল, তরলের বেগের এই বিপর্যয়ের সময়েও বাইরে থেকে প্রয়োগ করা বলটিকে মসৃণ থাকতে হবে। ইচ্ছেমতো অসীম বল ঢুকিয়ে দিয়ে অঙ্কটিকে কাবু করার সুযোগ নেই।
যন্ত্রের নির্মিত উদাহরণটি এই শর্ত পূরণের দাবি করে।
ক্লে ইনস্টিটিউটের মূল বিবরণে এই ধরনের সমাধানের অনুমতি ছিল বলেই প্রমাণটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে প্রশ্নটি অধিকাংশ গণিতবিদের মূল কৌতূহলের কেন্দ্রে ছিল, অর্থাৎ কোনও বাহ্যিক বল ছাড়াই মসৃণ তরল নিজের গতিতে বিপর্যস্ত হতে পারে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এর থেকে পাওয়া যায়নি।
ক্লাইনারম্যানের মতে, ফেফারম্যানের মূল সমস্যা নির্ধারণের সময় এই বিকল্পটি রাখা একটি ভুল ছিল।
তাঁর আপত্তির কারণও রয়েছে। গণিতের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া এবং সেই প্রশ্নের পিছনে যে মৌলিক কৌতূহল কাজ করছিল, তার সন্তোষজনক মীমাংসা হওয়া, দুটি বিষয় সব সময় একই নয়।
একটি অঙ্কের উত্তর ঠিক হতে পারে। তবু সেই উত্তর থেকে আরও বড় অঙ্কটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে যেতে পারে।
এ বার প্রশ্ন উঠতে পারে, তা হলে এত দিন ধরে গণিতবিদেরা কী বিশ্বাস করতেন?
এক সময় বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, শুরুতে মসৃণ কোনও তরলকে নিজের মতো চলতে দিলে সে চিরকাল মসৃণই থাকবে। সান্দ্রতা প্রবাহের তীব্র তারতম্যকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কোথাও এমন অনিয়ন্ত্রিত বিপর্যয় ঘটবে না, যাতে সমীকরণের সমাধান অসীম বেগের দিকে চলে যায়।
ধারণাটির পক্ষে বাস্তব জগতের একটি বড় সাক্ষ্যও আছে।
একশো বছরের বেশি সময় ধরে তরল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। কম্পিউটারে অজস্র সিমুলেশন চালানো হয়েছে। ঘূর্ণি, অশান্ত প্রবাহ, নানা ধরনের চরম পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের এই বিশেষ ধরনের অসীম বেগের ঘটনা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়নি।
তা হলে কি ধরে নেব, এমন ঘটনা ঘটতেই পারে না?
এখানে গণিতের সঙ্গে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আপনি এক কোটি সাদা রাজহাঁস দেখতে পারেন। কিন্তু তাতে সমস্ত রাজহাঁস সাদা, এই দাবির গাণিতিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। একটি কালো রাজহাঁসই দাবিটিকে খারিজ করে দিতে পারে।
নাভিয়ার-স্টোকসের ক্ষেত্রেও একই অসুবিধা। লক্ষ লক্ষ সিমুলেশনে কোনও বিপর্যয় দেখা না-গেলেও তাতে সমস্ত সম্ভাব্য প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
কারণ এখানে যে ব্যতিক্রমটি খোঁজা হচ্ছে, সেটি অবিশ্বাস্য রকমের সূক্ষ্ম হতে পারে।
হয়তো এমন একটি বিশেষ প্রাথমিক অবস্থা রয়েছে, যেখানে তরলের প্রবাহ ধীরে ধীরে এমন এক চরম পরিস্থিতিতে পৌঁছয় যে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অঞ্চলে বেগ অসীমের দিকে চলে যায়। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থাটি সামান্য বদলে দিলেই বিপর্যয়টি আর ঘটে না।
তাহলে?
আপনি পরীক্ষাগারে সেই অবস্থা তৈরি করতে পারবেন না। কম্পিউটারেও হয়তো পারবেন না। কম্পিউটারের গণনায় নির্দিষ্ট মাত্রার সূক্ষ্মতা থাকে। কোনও সংখ্যার পরে কত ঘর দশমিক পর্যন্ত হিসেব করা হবে, তার সীমা রয়েছে। অত্যন্ত অস্থিতিশীল ঘটনায় সেই সামান্য সংখ্যাগত বিচ্যুতিই ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।
ফলে একটি গাণিতিক ঘটনা বাস্তব পরীক্ষায় বারবার অধরা থেকে যেতে পারে।
ক্লাইনারম্যান মনে করেন, বাহ্যিক বল ছাড়া প্রবাহের বিপর্যয় অসম্ভব, এমন বিশ্বাস সম্ভবত ভুল। তিনি যে প্রজন্মের গণিতবিদদের কথা বলছেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে প্রমাণ খুঁজে না-পাওয়ার পরে উল্টো সম্ভাবনাটিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন।
এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। প্রমাণ খুঁজে না-পাওয়া নিজেই বিপরীত দাবির প্রমাণ নয়। ক্লাইনারম্যান তাঁর গাণিতিক অভিজ্ঞতা এবং সমস্যাটির চরিত্র থেকে একটি সম্ভাবনার কথা বলছেন। অমীমাংসিত প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিতই রয়েছে।
অর্থাৎ, গণিতবিদেরা এমন একটি ঘটনার সন্ধান করছেন, যা হয়তো সমীকরণের জগতে সম্ভব, অথচ বাস্তবের পরীক্ষাগারে তার দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বেশ মজার পরিস্থিতি।
প্রকৃতি যেন বলছে, আমার জলে এ-সব কাণ্ড তোমরা দেখোনি।
গণিত বলছে, তাতে কী? আমার সমীকরণে এমন কাণ্ড ঘটার সুযোগ আছে কি না, সেটা আগে প্রমাণ করো।
আর গণিতবিদ মাথা চুলকে ভাবছেন, দুজনের কথাই তো ফেলতে পারছি না!
এইখান থেকে ক্লাইনারম্যান আরও একটি সম্ভাবনার কথা তুলেছেন।
তিনি বহু বছর আগেই যুক্তি দিয়েছিলেন, নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণে সমাধান থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলি এত অস্থিতিশীল হতে পারে যে বাস্তব পরীক্ষা বা সাধারণ সংখ্যাগত গণনায় তাদের ধরা সম্ভব হবে না।
ধরুন, একটি পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় একটি বল রাখা হয়েছে।
বলটিকে নিখুঁতভাবে ঠিক একটি বিশেষ বিন্দুতে রাখলে হয়তো সেটি সাময়িকভাবে স্থির থাকতে পারে। কিন্তু সামান্য এদিক-ওদিক হলেই গড়িয়ে পড়বে।
এ বার সেই রকম একটি পরিস্থিতি কল্পনা করুন তরলের প্রাথমিক অবস্থার ক্ষেত্রে। নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় বিপর্যয় সম্ভব, আশপাশের বিপুল সংখ্যক অবস্থায় প্রবাহ মসৃণ।
তাহলে আমাদের সামনে দুটি আলাদা প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে।
প্রথম প্রশ্ন, প্রত্যেকটি সম্ভাব্য মসৃণ প্রাথমিক অবস্থা থেকে কি চিরকাল মসৃণ প্রবাহ পাওয়া যাবে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, ব্যতিক্রমী কিছু প্রাথমিক অবস্থা বাদ দিলে বাকি সমস্ত মসৃণ অবস্থা থেকে কি চিরকাল মসৃণ প্রবাহ পাওয়া যাবে?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি প্রকৃতির সাধারণ আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানে ‘ব্যতিক্রমী’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিও অবশ্য গণিতের ভাষায় নির্দিষ্ট করতে হবে। কোনও সেটকে ব্যতিক্রমী বলার জন্য শুধু এইটুকু বলা চলে না যে সেটিতে অদ্ভুত কিছু অবস্থা রয়েছে। সেটটির আকার, গঠন অথবা অন্য কোনও উপযুক্ত গাণিতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে হবে।
ক্লাইনারম্যানের অনুমান, এ ধরনের একটি নিয়ম ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে। তা হলে তরলগতিবিদ্যার তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে।
কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, সেই লক্ষ্য এখনও অনেক দূরে।
এআই যদি কখনও এই কাজে সাহায্য করে, তা অবশ্যই স্বাগত। আপাতত যন্ত্রের পাওয়া প্রমাণটি সেখানে পৌঁছয়নি।
এই প্রসঙ্গে একটি সাধারণ অভ্যাসের কথা মনে পড়ে আমার।
কোনও ঘটনা যদি আমরা বারবার দেখতে পাই, তাকে নিয়ম বলে ধরে নিই। আর কোনও ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলে তাকে অগ্রাহ্য করার প্রলোভন জন্মায়।
গণিতের কাছে সেই প্রলোভন বিশেষ সুবিধে করতে পারে না।
একটি ব্যতিক্রমই একটি সর্বজনীন দাবিকে ভেঙে দিতে পারে। আবার সেই ব্যতিক্রমের প্রকৃতি বোঝার মধ্য দিয়েই জন্ম নিতে পারে আরও গভীর একটি সাধারণ নিয়ম।
কোনও কোনও সময়, অঙ্কের আসল কাজটি শুরু হয় তার একটি উত্তর পাওয়ার পরে।
এ বার যন্ত্রের প্রসঙ্গে ফিরি।
OpenAI-এর এআই কীভাবে কাজ করেছিল, তার প্রকাশিত বিবরণ থেকে মোটামুটি একটি ছবি পাওয়া যায়।
বিভিন্ন এজেন্টকে সমস্যার বিভিন্ন রূপ দেওয়া হয়েছিল। কেউ সম্ভাব্য প্রমাণের পথ খুঁজেছে, কেউ তৈরি করেছে বিশেষ গাণিতিক নির্মাণ, কেউ চালিয়েছে কোড, কেউ আবার অন্য এজেন্টের ফলাফল থেকে নতুন ধারণা নিয়ে এগিয়েছে।
OpenAI প্রথমে সংশ্লিষ্ট অয়লার সমীকরণের একটি সমস্যায় অগ্রগতি পাওয়ার কথা জানায়। নাভিয়ার-স্টোকসের সঙ্গে অয়লার সমীকরণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সান্দ্রতার প্রভাব বাদ দিলে যে সমীকরণ পাওয়া যায়, সেটিই অয়লার সমীকরণ।
ওই প্রাথমিক ফলাফলের পরে আরও বেশি এজেন্টকে নাভিয়ার-স্টোকসের সমস্যায় নিয়োগ করা হয়। বিভিন্ন দলের কার্যকর ধারণাগুলি একত্র করে নতুন অনুসন্ধান চালানো হয়।
শেষ পর্যন্ত একটি বিশেষ নির্মাণ পাওয়া যায়। তার গাণিতিক প্রমাণ তৈরি হয়। পরে সেটিকে Lean-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করার কাজ সম্পন্ন হয় বলে OpenAI জানিয়েছে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো।
যন্ত্রটি প্রচলিত গাণিতিক ভাষা, পূর্ববর্তী গবেষণা, পরিচিত পদ্ধতি এবং বিপুল গণনাশক্তির সাহায্যে অনুসন্ধান চালিয়েছে। একটি বিশেষ ধরনের উদাহরণ নির্মাণ করেছে।
এমন একটি উদাহরণ, যা মানুষের পক্ষে খুঁজে বার করতে বহুদিনের শ্রম লাগতে পারত, অথবা আদৌ পাওয়া সম্ভব হত কি না, আমরা জানি না।
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান ক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
গণিতবিদ একটি বিশেষ ধরনের নির্মাণের সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সম্ভাব্য নির্মাণের সংখ্যা এত বেশি, তার জটিলতা এত বিপুল যে এক জীবনে সব দিক খতিয়ে দেখা অসম্ভব। যন্ত্র সেই অনুসন্ধানকে অসাধারণ গতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
একজন দাবাড়ু পঞ্চাশটি চাল ভেবে দেখলেন। কম্পিউটার লক্ষ লক্ষ সম্ভাব্য অবস্থান পরীক্ষা করল।
অবশ্য গণিত দাবা নয়। দাবায় নিয়মগুলি নির্দিষ্ট, জেতার লক্ষ্যও নির্দিষ্ট। গণিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়, নতুন সংজ্ঞা জন্মায়, আগে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হওয়া কোনও ধারণা হঠাৎ কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
আর সেই কারণেই যন্ত্রের সাফল্যের পরেও গণিতবিদের কাজ নিয়ে আলোচনা শেষ হচ্ছে না।
বরং এখান থেকেই আলোচনাটির একটি নতুন অধ্যায় শুরু।
ক্লাইনারম্যান একটি উপমা ব্যবহার করেছেন।
ধরুন, বিরাট একটি খড়ের গাদা। তার মধ্যে একটি সূচ হারিয়ে গেছে। একজন মানুষ খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। যন্ত্র এসে অসাধারণ দক্ষতায় সূচটি বার করে দিল।
খুব ভাল কথা।
কিন্তু খড়ের গাদাটি কে তৈরি করেছিল? সেখানে সূচ থাকার সম্ভাবনা কে বুঝেছিল? কোন গাদায় খুঁজতে হবে, আর কোন গাদা ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে হবে, সেই সিদ্ধান্তই বা কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলিও গণিতের অন্তর্গত।
অঙ্কের ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে, যখন সমাধানের চেয়েও গভীর অবদান এসেছে প্রশ্নটির নতুন বিন্যাস থেকে।
পয়াঁকারে অনুমানের (Poincaré Conjecture) কথাই ধরা যাক।
পেরেলমানের প্রমাণের পিছনে ছিল রিচার্ড হ্যামিলটনের রিচি ফ্লো-সংক্রান্ত গবেষণা। জ্যামিতিক কাঠামোকে একটি বিশেষ প্রবাহের মাধ্যমে বোঝার ধারণা সমস্যাটির সমাধানে নতুন পথ খুলে দিয়েছিল।
একটি প্রশ্নকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে আগে অদৃশ্য থাকা সম্ভাবনা চোখে পড়ে, গণিতের একটি মৌলিক কাজ।
নাভিয়ার-স্টোকসের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার ছাপ রয়েছে।
একটি আনুষ্ঠানিক সমস্যার অনুমোদিত বিকল্পের প্রমাণ পাওয়া গেল। তার পরেই ক্লাইনারম্যানের মতো গণিতবিদ প্রশ্ন তুলছেন, আমরা আসলে কোন সমস্যাটির উত্তর জানতে চেয়েছিলাম?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব সামান্য নয়।
কারণ আনুষ্ঠানিক সমস্যাটির একটি অনুমোদিত সমাধান পাওয়ার পরেও তরলের স্বাভাবিক, বাহ্যিক বলহীন প্রবাহ সম্পর্কে মৌলিক কৌতূহলটি রয়ে গেছে।
গণিতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় তাই কয়েকটি কাজকে আলাদা করে দেখতে হবে। বিশেষ উদাহরণ নির্মাণ, সম্ভাব্য প্রমাণ অনুসন্ধান, প্রমাণ যাচাই, নতুন ধারণা তৈরি, সমস্যার প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ এবং ফলাফলের বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝা।
যন্ত্র ইতিমধ্যেই এই কাজগুলির কয়েকটিতে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা দেখিয়েছে। ভবিষ্যতে তার ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে বর্তমান সাফল্য থেকে প্রতিটি কাজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না।
ক্লাইনারম্যানের বক্তব্য, কোন প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কোন ধরনের উত্তর আমাদের বোঝাপড়াকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই বিচার এখনও মানুষের গাণিতিক সাধনার কেন্দ্রে রয়েছে।
এই বক্তব্যের মধ্যেও একটি সময়গত সীমা আছে। তিনি বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কথা বলছেন। এআইয়ের ক্ষমতা কত দূর যাবে, তার চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না।
কিন্তু একটি কথা এখনই বলা যায়। গণিতের ইতিহাসে নতুন যন্ত্রের আবির্ভাব বারবার পুরোনো কাজের ধরন বদলে দিয়েছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন গবেষণার প্রশ্নও জন্ম নিয়েছে।
কম্পিউটার আসার পরে গণনামূলক গণিতের বিস্তার ঘটেছে। কম্পিউটার-সহায়তায় প্রমাণের নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। এখন এআই আরও একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা হাজির করছে।
তাতে একজন গণিতবিদের দৈনন্দিন কাজ কেমন হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ বার সেই তরুণ গবেষকের কাছে ফিরি, যিনি খবরটি শুনে চিন্তায় পড়েছেন।
তিনি হয়তো জীবনের বেশ কয়েক বছর ব্যয় করেছেন একটি সমস্যার পিছনে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কাগজে অঙ্ক কষেছেন। বিকেলে সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। রাতে বাড়ি ফিরে মনে হয়েছে, এই বার একটা সূত্র পাওয়া গেছে। পরদিন সকালে দেখা গেছে, সূত্রটি ভুল।
এর মধ্যে আচমকা হাজির হল একটি এআই ব্যবস্থা। কয়েক দিনের মধ্যে এমন এক সমস্যার প্রমাণ তৈরি করল, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে অমীমাংসিত ছিল।
তরুণটির উদ্বেগকে উড়িয়ে দেওয়া চলে না।
গবেষণার প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রত্যেকেই যদি কোনও এক সময় সিদ্ধান্ত নেয় যে মানুষের বদলে যন্ত্রকে দিয়ে অনেক কম সময়ে অধিকাংশ কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব, তা হলে পেশাগত কাঠামো বদলাতে পারে। গবেষকের কাজের ধরন, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতির নিয়মও বদলাতে পারে।
আরও একটি সমস্যা রয়েছে।
যন্ত্র কোনও গবেষকের অপ্রকাশিত ধারণা ব্যবহার করে ফলাফল তৈরি করলে কৃতিত্ব কার প্রাপ্য? একটি প্রমাণ নির্মাণে মানুষের পূর্ববর্তী গবেষণার অবদান কতখানি? যে প্রতিষ্ঠান বিপুল গণনাশক্তি সরবরাহ করেছে, তার ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
নাভিয়ার-স্টোকসের ঘোষণার পরেও গবেষণার কৃতিত্ব এবং অপ্রকাশিত কাজের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং অন্যদের উদ্বেগের জবাবে OpenAI জানিয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বাকমাস্টারের Codex-এ দেওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট মডেলের ফলাফলকে প্রভাবিত করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকদের দাবি এবং কোম্পানির বক্তব্যের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।
অতএব উদ্বেগের কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। গণিতচর্চার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করারও প্রয়োজন রয়েছে।
তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের চাকরির সংখ্যা ভবিষ্যতে কত হবে, আর মানুষ আদৌ গণিতচর্চা করবে কি না, এই দুটি প্রশ্নের উত্তর এক নয়।
ক্লাইনারম্যানের কাছে তরুণ গবেষকদের মূল প্রশ্নটি আরও গভীর। তাঁরা জানতে চাইছেন, মানুষের গাণিতিক চিন্তার কোনও প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি?
তাঁর উত্তর, থাকবে।
তিনি মনে করেন, নতুন প্রশ্ন নির্মাণ, সমস্যার অর্থ নির্ধারণ এবং গাণিতিক সত্যের বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝার কাজ মানুষ করে যাবে।
যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ তৈরির ক্ষমতা যত বাড়বে, সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কী বোঝার চেষ্টা করা উচিত, তার গুরুত্বও বাড়তে পারে।
একজন গবেষক হয়তো দশ বছর ধরে কোনও নির্দিষ্ট নির্মাণ খুঁজবেন না। তিনি যন্ত্রের সাহায্যে বহু সম্ভাবনা পরীক্ষা করবেন। প্রমাণের কোন অংশটি নতুন ধারণা দিচ্ছে, কোন ফলাফল অন্য সমস্যায় কাজে লাগতে পারে, তা বিশ্লেষণ করবেন।
তাঁর গবেষণার পরিধি বদলাবে। নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অঙ্কের সঙ্গে যন্ত্রের সহযোগিতার নতুন পদ্ধতি শিখতে হবে।
এই সম্ভাবনায় উত্তেজনা যেমন আছে, অনিশ্চয়তাও রয়েছে।
কিন্তু মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অনিশ্চয়তা নতুন কিছু নয়। নিউটনের পরে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন ফুরিয়ে যায়নি। আইনস্টাইনের পরে নিউটনকে পড়ানো বন্ধ হয়নি। একটি নতুন তত্ত্ব পুরোনো জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, আবার গবেষণার নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, তা সময়ই বলবে। আপাতত তার সাফল্য আমাদের গণিতের উদ্দেশ্য এবং গবেষকের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এই সমস্ত আলোচনার মধ্যে একটি মজার ব্যাপার প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়।
যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গণিতবিদেরা এত চিন্তিত, তার নিজের জন্মের পিছনেই রয়েছে গণিতের বিপুল অবদান।
একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে রৈখিক বীজগণিত লাগে। মডেলের প্রশিক্ষণে ক্যালকুলাস ও অপটিমাইজেশনের ভূমিকা রয়েছে। অনিশ্চয়তা, সম্ভাবনা এবং পরিসংখ্যানের ধারণা ছাড়া আধুনিক মেশিন লার্নিংয়ের অনেক পদ্ধতিই নির্মাণ করা যেত না।
সংখ্যাকে বহুমাত্রিক ভেক্টরের মাধ্যমে প্রকাশ করা, ম্যাট্রিক্সের সাহায্যে গণনা করা, কোনও ফাংশনের পরিবর্তনের হার নির্ধারণ করা, প্রশিক্ষণের সময় প্যারামিটার সংশোধন করা, প্রতিটি ধাপেই গাণিতিক ধারণা কাজ করছে।
যন্ত্রটি যে ভাষায় শিখছে, হিসেব করছে এবং নিজের ফলাফল তৈরি করছে, সেই ভাষার একটি বড় অংশ নির্মাণ করেছেন গণিতবিদেরাই।
এখানে একটি ঐতিহাসিক পরিহাস রয়েছে।
মানুষ অঙ্ক কষে এমন একটি যন্ত্র তৈরি করল, যা এখন মানুষের অঙ্ক কষার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
এই ঘটনার সঙ্গে মানুষের অন্যান্য আবিষ্কারেরও মিল আছে। আমরা এমন যন্ত্র তৈরি করেছি, যা আমাদের চেয়ে দ্রুত দৌড়তে পারে, বেশি ভার তুলতে পারে, আরও নিখুঁতভাবে কোনও বিশেষ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। প্রতিটি আবিষ্কারের পরে মানুষের কাজের প্রকৃতি কিছুটা বদলেছে।
কিন্তু গণিতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে আরও একটি বিষয় রয়েছে।
মানুষ অঙ্ক করে কৌতূহল থেকে। কোনও আপাত-অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জীবনের বহু বছর ব্যয় করে। কেন একটি উপপাদ্য সত্য, কোন ধারণার সঙ্গে তার সম্পর্ক, কোন অদ্ভুত ব্যতিক্রম আমাদের সাধারণ বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করছে, এই সমস্ত প্রশ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
একজন গণিতবিদ হয়তো একটি প্রমাণের শেষ লাইনে পৌঁছে আনন্দ পান। আবার সেই প্রমাণের মাঝখানে হঠাৎ যে নতুন সম্পর্কটি আবিষ্কার করলেন, তার জন্যও আনন্দ পান।
আরও মজার কথা, অনেক সময় প্রমাণটির শেষ লাইনের চেয়ে মাঝখানের আবিষ্কারই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্লাইনারম্যানের বক্তব্য এইখানেই এসে দাঁড়ায়। গণিতের মধ্যে যন্ত্রের অবদান বাড়তে পারে। কিন্তু মানুষের গাণিতিক অনুসন্ধানের অবসান ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ভিত্তি বর্তমান সাফল্যে পাওয়া যাচ্ছে না।
এআইয়ের ব্যবহার এবং অপব্যবহার নিয়ে বহু উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণার স্বচ্ছতা, কৃতিত্বের বণ্টন, গণনাশক্তির অসম প্রাপ্যতা, পেশাগত পরিবর্তন, সবই গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের গণিতচর্চা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
নাভিয়ার-স্টোকসের ঘটনাটির দিকে আর-এক বার তাকানো যাক।
একটি যন্ত্র দশ হাজার এজেন্ট নিয়ে বিপুল অনুসন্ধান চালাল। একটি আনুষ্ঠানিক সমস্যার অনুমোদিত বিকল্প সমাধানের প্রমাণ তৈরি করল। গণিতবিদেরা তার গুরুত্ব স্বীকার করলেন।
তার পর একজন গণিতবিদ বললেন, চমৎকার। এ বার যে সমস্যাটি নিয়ে আমাদের মূল কৌতূহল ছিল, তার দিকে ফিরে তাকানো যাক।
বাইরে থেকে কোনও বল প্রয়োগ না-করলে তরল কী করবে?
সব সময় মসৃণ থাকবে?
কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত হবে?
ব্যতিক্রমী কিছু অবস্থায় বিপর্যয় ঘটলেও সাধারণ অবস্থায় কি মসৃণতার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও আমাদের জানা নেই।
সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনও এআই ব্যবস্থা এগুলির সমাধানেও সাহায্য করবে। হয়তো এমন কোনও নির্মাণ খুঁজে পাবে, যা মানুষের চিন্তার বাইরে ছিল। হয়তো এমন একটি প্রমাণ তৈরি করবে, যার তাৎপর্য বুঝতে মানুষেরই বহু বছর লেগে যাবে।
আর সেই বোঝার চেষ্টার মধ্যেও গণিতচর্চা চলবে।
কারণ গণিতের ইতিহাসে প্রতিটি বড় সমাধানের পরে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। যে প্রশ্নটি এত দিন সমস্ত মনোযোগ অধিকার করে ছিল, সেটি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরও কয়েকটি প্রশ্ন দেখা যায়।
পেরেলমান পয়াঁকারে অনুমানের সমাধান করলেন। তাতে জ্যামিতি ও টোপোলজির গবেষণা থেমে থাকেনি।
এআই নাভিয়ার-স্টোকসের একটি অনুমোদিত সমস্যার সমাধান হাজির করেছে। সেই সাফল্য আমাদের তরলগতিবিদ্যার আরও কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
আজ যে তরুণ গণিতবিদ যন্ত্রের ক্ষমতা দেখে আতঙ্কিত, তাঁর সামনে তাই নতুন এক কাজের সম্ভাবনাও রয়েছে।
তিনি হয়তো ভবিষ্যতে এআইকে দিয়ে এমন সব অঙ্ক কষাবেন, যা তাঁর পূর্বসূরিরা কল্পনাও করতে পারেননি। আবার যন্ত্রের প্রতিটি ফলাফলের সামনে তাঁকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, এর থেকে আমরা কী শিখলাম? কোন নতুন ধারণা পেলাম? এর পরে কোন প্রশ্নটি করা উচিত?
অঙ্কের উত্তর পাওয়ার আনন্দ অপরিসীম।
কিন্তু যে মানুষ প্রথম প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁর কৌতূহলটি একটু মনে করে দেখুন।
এক কাপ চা ঘুরছে। মানুষ তাকিয়ে রয়েছে। জল কেন এভাবে ঘোরে? কতক্ষণ ঘুরবে? কোথাও কি এমন কিছু ঘটতে পারে, যা আমাদের সমীকরণ দিয়ে বোঝা যায় না?
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে সেই কৌতূহল থেকে কত সমীকরণ, কত গবেষণা, কত আবিষ্কার।
এখন যন্ত্র এসে একটি কঠিন উত্তর দিয়েছে।
মানুষ আবার চায়ের কাপের দিকে তাকাবে।
তার পর সম্ভবত জিজ্ঞেস করবে, আচ্ছা, আর-একটা কথা বলো তো।
রিটন খান
ঘটনাটির প্রযুক্তিগত বিবরণের জন্য OpenAI-এর ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর গবেষণা অনুসরণ করা হয়েছে।



