নদীর সঙ্গে নদীর একটা বোঝাপড়া তৈরি হয় ধীরে ধীরে
এখনও অবশ্য আমি সময়ের সঙ্গে পুরো মিটমাট করতে পারিনি। ডেডলাইন এলে অস্থির হই, অপচয় করলে অপরাধবোধ হয়, হঠাৎ পুরনো ছবি দেখে থমকে যাই।
সকালটা ছিল, হঠাৎ নেই। একটা কাজ শেষ করতে না করতেই আরেকটা কাজ মাথার ওপর। একটা বই পড়তে না পড়তেই আরেকটা বই। সময় যেন আমাকে বয়ে নিয়ে চলেছে, আমি কেবল তার ভেলায় বসে থাকা এক অসহায় যাত্রী। সময় নিয়ে আমার প্রথম দুশ্চিন্তার কথা মনে পড়লে এখন একটু হাসিই পায়। তখন মনে হত দিন যেন কেমন করে হাত ফসকে বেরিয়ে যায়।
অনেক পরে হোর্হে লুই বোর্হেসের সেই কথাগুলো পড়েছিলাম। তিনি লিখেছিলেন, সময় এক নদী, যা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু আমিও সেই নদী। সময় এক আগুন, যা আমাকে গ্রাস করে, কিন্তু আমিই সেই আগুন। কথাগুলো পড়ার পর মনে হয়েছিল, আহা, এ তো সময়কে উল্টো দিক থেকে দেখা। আমরা সময়ের ভেতর থাকি, কিন্তু সময়ও আমাদের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। তখনও অবশ্য কথাটা পুরো বুঝিনি। বোঝার জন্য বয়স লাগে, একটু ব্যর্থতা লাগে, একটু নির্জন দুপুর লাগে।
আমরা অধিকাংশ মানুষই বোর্হেস নই। আমরা সময়ের দর্শন রচনা করি না, সময়ের পেছনে দৌড়াই। বেঁচে আছি তাড়াহুড়োয়, কিন্তু বাঁচা শুরু করব বলে অপেক্ষা করি। জীবনের গোলকধাঁধায় হাঁটি অন্যমনস্কভাবে। এদিকে চারপাশে উৎপাদনশীলতার এক অদ্ভুত উপাসনা চলছে, যেখানে প্রতিটি মিনিটকে ফলপ্রসূ না করতে পারলে অপরাধবোধ হয়। ঘড়ির কাঁটা যেন শিরায় চেপে ধরা ছুরির মতো মনে হয়। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, এই বোধটাই সময়কে আরও কঠিন করে তোলে।
কিন্তু ব্যক্তিগত সময়ের ভেতরে আরেকটা সময় থাকে। আমাদের যুগ। যে সময়ে আমরা জন্মাই, ঠিক যেমন জন্মাই এক নির্দিষ্ট শরীর, মস্তিষ্ক আর পরিবার নিয়ে। এই যুগ বেছে নেওয়ার সুযোগ আমাদের ছিল না। জেমস বল্ডউইন শেক্সপিয়র নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা কথাই বলেছিলেন, যা আমাকে বহুবার ভাবিয়েছে তিনি লিখেছিলেন, শেক্সপিয়রের সময় নাকি আমাদের চেয়ে সহজ ছিল, অনেকে এমন বলেন। কিন্তু তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ যে সময়ের ভেতর দিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে, সেই সময় কখনও সহজ হয় না।
তারও আগে এমারসন আরেকটা কথা বলেছিলেন, যা অভিযোগকে একটু লজ্জায় ফেলে দেয়। এই সময়, অন্য সব সময়ের মতোই, খুব ভালো এক সময়, যদি আমরা জানি একে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, সময়কে ব্যবহার করা মানে কি তাকে নিয়ন্ত্রণ করা? নাকি তার স্রোতের সঙ্গে সাঁতার শেখা?
সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন হবে, সেটা ঠিক করতে না পারাই আমাদের বড় বিপদ। আমরা জানি না সময়কে কীভাবে ধরতে হয়, অথচ ভুলে যাই সময়ই আমাদের ধরে রেখেছে। পাবলো নেরুদার কবিতা পড়লে এই ভোলাটা টের পাওয়া যায়। তিনি স্মৃতির ভেতর দিয়ে সময়কে স্পর্শ করতেন।
তিনি লিখেছিলেন, তুমি মনে রাখবে সেই অদ্ভুত খাদ, যেখানে সুগন্ধ উঠত, আর জলমাখা অলসতায় মোড়া পাখি এসে বসত। মনে রাখবে মাটির উপহার, সোনালি কাদা, বুনো শিকড়, তলোয়ারের মতো কাঁটা। মনে রাখবে তুমি যে ফুলের তোড়া এনেছিলে, ছায়া আর নীরব জলের তোড়া। আর সময় তখন ছিল না কখনও, আবার চিরকাল। আমরা যাই যেখানে কিছুই প্রত্যাশিত নয়, অথচ সবকিছু অপেক্ষা করে থাকে।
এই কয়েকটি পঙক্তি পড়লেই বোঝা যায়, সময় ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, অনুভূতির স্তরে বাস করে।
আমি যত কবিতা পড়েছি, ততই মনে হয়েছে, সময় আসলে কবিতার প্রধান বিষয়। মানুষের জীবনের মূল সমস্যাও সময়। আর বেঁচে থাকার বিস্ময়কে বিশ্লেষণ করার সবচেয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্র সম্ভবত কবিতাই। নেরুদা তা জানতেন। তাঁর প্রেমের কবিতার নিচে, রাজনৈতিক কবিতার নিচে, প্রকৃতির কবিতার নিচে সময়ের এক অদৃশ্য স্রোত বয়ে যায়।
তিনি পাথরকে শ্রদ্ধা করতেন, কারণ পাথর সময়কে ছুঁয়েছে। একটি মিনিটকে শ্রদ্ধা করতেন, কারণ সে আমাদের বহন করা সময়নদীতে মিশে যাবে। তিনি সময়কে দেখেছেন উৎস হিসেবে, সমুদ্র হিসেবে। তারপর নিজের কবিতায় সেই সমুদ্র নির্মাণ করেছেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অস্থির সময়ে লেখা এক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, তুমি জানতে চেয়েছ সোনালি নখরের ভেতর ক্রাস্টেশিয়ান কী বোনে, সমুদ্র জানে। তুমি জানতে চাও স্বচ্ছ দেহের প্রাণীটি কিসের অপেক্ষায়, সে সময়ের অপেক্ষায়। তোমার মতো।
এই ‘তোমার মতো’ কথাটার মধ্যে এক ধরনের মমতা আছে। সময় কেবল দার্শনিক ধারণা নয়, জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
আরেকটি কবিতায় নেরুদা সময়কে ধরার প্রায় ব্যবহারিক নির্দেশ দিলেন। সময় দুটো নদীতে বিভক্ত। এক নদী পিছনে বয়ে যায়, বেঁচে থাকা জীবনকে গ্রাস করে। আরেক নদী সামনে এগোয়, তোমার জীবন উন্মুক্ত করে। এক সেকেন্ডের জন্য তারা মিলিত হয়। এখন। এই মুহূর্ত। এই বর্তমান তোমার হাতে।
তিনি বললেন, সময় দৌড়চ্ছে, পিছলাচ্ছে, জলপ্রপাতের মতো ঝরে পড়ছে। তবু এটা তোমার। একে ভালোবাসা দিয়ে বড় করো, দৃঢ়তায় বড় করো, সত্য আর ন্যায়ের সঙ্গ নিয়ে বড় করো। তখন সময়ের স্রোত গিটারের মতো সুর তুলবে। অতীতের দিকে মাথা নত করতে চাইলে স্বচ্ছ সময়ের ঝরনা তোমার পূর্ণতাকে প্রকাশ করবে। সময় আনন্দ।
আমি এই ‘সময় আনন্দ’ কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। সময়কে আমি চাপ হিসেবে চিনতাম, আনন্দ হিসেবে নয়। পরে বুঝেছি, হয়তো সময় নিজে আনন্দ নয়, কিন্তু সময়ের ভেতর সম্পূর্ণভাবে থাকা আনন্দের দরজা খুলে দেয়।
সময়ের ওপর ভরসা করার কবিতা আরও আছে। কখনও তারা বলে অপেক্ষা করো। কখনও বলে ক্ষতও সময়ের ভেতর নরম হয়। কখনও বলে, যা এখন অস্পষ্ট, সময় তাকে স্পষ্ট করে। এই বিশ্বাসটা আসলে আত্মসমর্পণ নয়, বরং এক ধরনের অন্তর্গত শৃঙ্খলা।
খলিল জিবরান সময়কে বন্ধু বানানোর কথা বলেছিলেন। তাঁর লেখায় সময় কোনো নিষ্ঠুর প্রহরী নয়, বরং নীরব সহচর। যে আমাদের তাড়া দেয় না, বরং হাঁটার গতি শিখিয়ে দেয়।
এখনও অবশ্য আমি সময়ের সঙ্গে পুরো মিটমাট করতে পারিনি। ডেডলাইন এলে অস্থির হই, অপচয় করলে অপরাধবোধ হয়, হঠাৎ পুরনো ছবি দেখে থমকে যাই। তবু মাঝেমধ্যে বিকেলের আলোয় বসে মনে হয়, সময় আমাকে কেবল বয়ে নিয়ে যাচ্ছে না। আমি নিজেও সময়ের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছি।
নদীর সঙ্গে নদীর একটা বোঝাপড়া তৈরি হয় ধীরে ধীরে। হয়তো জীবনও তেমনই।


