I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
আমার রোসালিয়া-ঘোর এখনো কাটেনি। তার কাছে পৌঁছাতে পাহাড়প্রমাণ একটা দিন বেয়ে উঠেছি আমরা, শিকাগোর বিশ হাজার ভক্তের সবাই। দাপটের সঙ্গে পা ফেলতে ফেলতে, দাঁত বের করে হাসতে হাসতে, চোখে তারাচিহ্ন ফুটিয়ে তুলে সে তাদের চিৎকারকে জাদুর আলখাল্লার মতো নিজের চারপাশে মেলে ধরল। আর তার ভাঁজের মধ্যে সবাইকে বানিয়ে ফেলল খরগোশ কিংবা ফুলদানিভরা টিউলিপ। সাদা ক্রিনোলিনের ফুলে ওঠা ঘের। চিৎকার। কত কিছু যে বুঝতে হবে। সে একবার শ্বাস নিলেই গোটা দর্শকদল চেঁচিয়ে উঠছে, যেন নখ দিয়ে সে প্রত্যেকের শিরদাঁড়া আঁচড়ে দিচ্ছে, একেকটা শিরদাঁড়া আলাদা করে। ওই কণ্ঠের অসাধ্য কিছু নেই। আর সেই কণ্ঠকে ধারণ করতে তার মঞ্চসত্তা পাপড়ি মেলে। ঈশ্বর জানেন কতগুলো শহর ঘুরে বেড়ানোর এক সফরে, প্রতি রাতে এভাবে বিশ হাজার মানুষকে প্রেমে ফেলে দেওয়া। ভেবে দেখুন তো। আমি তো পারি না।
শোনা যায়, ফ্লামেঙ্কোই ছিল তার প্রথম মোহ। বার্সেলোনার তায়ের দে মুসিকস আর পরে এস্কোলা সুপেরিয়র দে মুসিকা দে কাতালুনিয়ায় পড়েছে সে। তারপর ফ্লামেঙ্কোর অন্ধকারের সঙ্গে চেনা ইলেকট্রনিক বাজনা আর নিজের কোলোরাতুরার কারুকাজে মোড়া উচ্চস্বর মিশিয়ে বানিয়েছে চমকে দেওয়ার মতো পপ গান। শিকাগোয় তার শেষ পর্বের একেবারে শেষে গাইল দুটো ফ্লামেঙ্কো-পপ গান। সঙ্গে পা ঠোকার প্রাণঘাতী তাল আর হাততালির যুদ্ধ। গলাটা এক বিস্ময়। ফ্লামেঙ্কো যে গলায় বয়সের ছাপ চায়, এ তো জানা কথা। তার গলায় এখনো কী করে যেন কিশোরীর উজ্জ্বলতা রয়ে গেছে। কয়েক বছরের মধ্যে এই গলা বিস্ময়কর থেকে অলৌকিক হয়ে উঠতে পারে। সাউন্ড সিস্টেমের উন্মাদ আঘাত পেরিয়ে তা ওপরে ওঠে, মহাশূন্যে ছুড়ে দেওয়া রুপালি তিরের মতো। ওরা চিৎকার করে, তা আরও ওপরে ওঠে, ওরা চিৎকার করে, তা আরও ওপরে ওঠে। দর্শকদের আসন থেকে তার দিকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে নিখাদ আরাধনা। হাত বাড়িয়ে যেন এই আরাধনার গায়ে হাত বোলানো যায়, কোনো প্রাণীর মতো সে দুলে দুলে ঘুরছে আর নিজের রূপ দেখাচ্ছে গোটা হলজুড়ে (খেলার হল, সাধারণত বাস্কেটবল হয়)। কয়েকজন ভক্ত মঞ্চের কিনারায় সারি বেঁধে তাকে ছুঁয়ে কাঁদছে। বেশির ভাগই নিজেদের আসনের জায়গায় থাকে। দাঁড়িয়ে থাকে আর চিৎকার করে। কথাটা আরেকবার বলি। কনসার্টের পুরো দুই ঘণ্টা এই মানুষগুলোর প্রত্যেকে (সি. আর আমি বাদে) নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে একটানা চিৎকার করে যায়।
এমন শব্দ আমি জীবনে শুনিনি।
গানের কথার মানে থেকেই কি এই চিৎকার? বুঝতে পারি না। নানা ভাষার গানের কথাগুলো মঞ্চের ওপরের পর্দায় হুবহু ভেসে ওঠে। আমি যেখানে বসেছি, সেখান থেকে পর্দার অর্ধেকটাই শুধু দেখা যায়। অনেকটা দেখে মনে হয়, দুঃসাহসী সব রূপক গুগল ট্রান্সলেটে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তবে বিচার করার জন্য আমি খুব যোগ্য লোক নই। মূল ভাষায় যে আরও ভালো শোনায়, তাতে সন্দেহ নেই। তবু ‘মিও ক্রিস্তো পিয়াঞ্জে দিয়ামান্তি’র এমন একটা স্তবকে এসে হোঁচট খাই:
তুমি সবচেয়ে সুন্দর ঘূর্ণিঝড়
আমার চোখে যত পড়েছে
সবচেয়ে সুন্দর ডলমেনগুলো
তোমার জন্য মাথা তুলে দাঁড়াত
পরে বাড়িতে ফিরে অভিধানে ডলমেন শব্দটা খুঁজলাম: ‘দুই বা তার বেশি খাড়া পাথরের ওপর একটি পাথরের পাত বসিয়ে বানানো প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা; বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে পাওয়া যায়; সমাধি বলে মনে করা হয়।’
ছবিটার অস্বস্তি তবু থেকে যায়।
একই রকম অস্বস্তি হয় (আমার অন্তত) পপ গানের কায়দার সঙ্গে চিরাচরিত মরমি আবেগকে এক সুতোয় গাঁথতে দেখেও। সিমোন ভেইয়ের মতো কারও মরমি উপলব্ধি আর সাধ্বীর মতো জীবনাদর্শের প্রতি রোসালিয়ার গভীর টান আছে, সেটা বোঝা যায়। তার গানের কথায় মাঝেমধ্যে ভেইয়ের কথা প্রায় হুবহু শোনা যায়। ঈশ্বরের পাশাপাশি খ্রিষ্টের কথাও বলে সে, বলে আত্মত্যাগের কথা, মুক্তির কথা। এই ধর্মভাবের তলায় কি বিশ্বাসের কোনো ভিত আছে? বুঝতে পারি না। মনে হয় না কারও তাতে কিছু যায় আসে। ধর্মের আধার হয়ে ওঠা তার নিজের রূপটাকেই মানুষ দেখতে চায়, আবেগের সমুদ্রে আঘাতে আঘাতে যা প্রায় কাবু। গানের কথার অনেকখানিতে কষ্ট দেওয়া আর কষ্ট পাওয়ার যৌনসুখের হালকা ছোঁয়া, সব নড়াচড়ায় প্রকট যৌনতা। নাচের সঙ্গীরা তার গায়ে নিজেদের জড়িয়ে দেয়, আবার তাদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়, তাদের তেমন গুরুত্ব নেই। তার কণ্ঠই তাদের একেবারে ধরাশায়ী করে দেয়।
আবার ভিডিও ছাড়া রোসালিয়ার অনুষ্ঠান কল্পনা করাও কঠিন। বাস্কেটবল হলের একেবারে ওপরের দিকে বসলে রোসালিয়া আর তার নাচের সঙ্গীদের দেখাবে অনেক, অনেক, অনেক নিচের মঞ্চে কয়েকটা শরীরের ছোট্ট এক নকশার মতো। সময়টা খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক আর জায়গাটা এথেন্সের দিওনিসোসের থিয়েটার হলেও একই ব্যাপার হতো। সেখানে সম্ভবত পনেরো থেকে ষোলো হাজার দর্শকের সামনে অভিনয় চলত, সবাই নিচে মাঝখানের ছোট্ট অভিনয়চত্বর, অর্কেস্ট্রার দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু সেই প্রাচীন অভিনেতারা মুখোশ পরত। তাদের কাজ ছিল পৌরাণিক চরিত্র হয়ে ওঠা। তাদের নিজস্ব কোনো মুখ ছিল না। রোসালিয়ার মুখটা তার পেছনে সব সময় ছয় ফুট উঁচু করে দেখানো হচ্ছে। আমার সামনের দর্শকেরা দাঁড়িয়েই থাকে বলে আমি তাকে বেশির ভাগ সময় ভিডিওতেই দেখি। তার মুখ, তার নাট্যমঞ্চ, খারাপ প্রেমের লেখা মুছে আবার লেখা তার পাণ্ডুলিপি। আবেগের বিপুল ঐশ্বর্য তার ওপর দিয়ে বন্যার মতো বয়ে যায়, প্রযুক্তির নিজস্ব কায়দায় পৌরাণিক। স্বীকার করছি, এভাবে ভিডিওয় নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়াটা কেমন যেন গা-বাঁচানো মনে হয়। ভিডিও ব্যাপারটা কি একটু বেশিই সহজ? মনোযোগ দেওয়ার উপায় হিসেবে? এর জন্য আমাকে খাটতে হয় না। অথচ আমি খাটতে চেয়েছিলাম, তার জন্য খাটতে চেয়েছিলাম, তার বীরত্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে চেয়েছিলাম।
যারা আমাদের আনন্দ দেয়, তাদের কাছে আমরা বীরত্ব চাই। চাই, নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার এক চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে তারা আত্মাহুতি দিক। কেউ এত জোরে গাইতে পারে না, অথচ সে গায়। কেউ এত জোর দিয়ে এতক্ষণ নাচতে পারে না, অথচ সে নেচেই চলে। এত তীব্র ভালোবাসা পেয়েও কেউ বেঁচে থাকতে পারে না, অথচ তাকে দেখতে দেখতে নিংড়ে নেওয়া স্পঞ্জের দশা হয় আমাদেরই। বুক ধড়ফড় করে, একটু ভয়ও লাগে, এরপর কী?
তবু একটা কথা অস্বীকার করার উপায় নেই: হলজুড়ে মানুষগুলো যে কী ভীষণ খুশি। হলজুড়ে তারা চিৎকার করে, চিৎকার করে, চিৎকার করে। মানুষকে খুশি দেখতে ভালো লাগে, সি. বারবার বলছে। কীসে মানুষ খুশি হয়, আমি সব সময় সেটা বোঝার চেষ্টা করি।
আমার কি তাকে হিংসা হয়? অবশ্যই হয়। নারীর মোহময়তা আর শক্তির তেত্রিশ বছর বয়সি এক জীবন্ত রূপ সে। ঠোঁট ফুলিয়ে রাখতে জানে, ভঙ্গি করতে জানে, নিজের মোহিনী ভঙ্গিকেই ব্যঙ্গ করে দেখাতে জানে। এই হলো নতুন নারীবাদ। ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করে। বিয়র্ক অন্য প্রজাতির রূপ ধরে নারীত্ব থেকে হারিয়ে যায়, রোসালিয়া ঢোকে নারী হওয়ারই আরও গভীরে, খুঁড়ে খুঁড়ে ঢোকে। ফ্লামেঙ্কোর ক্ষতবিক্ষত রূপ পেরিয়ে শক্তির এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে তার নিজেকে নতুন লাগে। তারপর মাথা পেছনে ছুড়ে দিয়ে সে হাসে, যেন বাতাসে উড়ে ওঠা পাল। নিজেকে নতুন লাগা তার চাই। ঘরের সবার এখন সেটাই চাই। হিংসা ছুড়ে ফেলা হয় মেঝেতে। সবার উপলব্ধি উঠে যায় অন্য এক স্তরে। তুলনা করে না কেউ, শুধু আরাধনা করে। তার কখনো দম ফুরোয় না, দম ফুরোয় আমাদের। দস্তানার মতো তোমাকে উল্টে দেয় সে, ভেতরটা বাইরে এনে ফেলে।
কিংবা তোমার ভেতরের হট্টগোলের গভীরে হাত বাড়ায় সে, তার বোকামি ঠেলে সরিয়ে দেয়। কারণ তোমার গভীরতম বাসনাটা তো বেশ বোকা, তাই না, ওই যে তার এত ফাঁকফোকর, স্ববিরোধ আর দুর্বল বিশেষণ, যতক্ষণ না কেউ এসে একেবারে ঠিক জায়গাটিতে পড়ে? তার কণ্ঠ তিরের মতো এসে পড়ে সেখানে। তোমার ভেতরের আসল উত্তাপটা খুঁজে পায় তার কণ্ঠ। কিংবা আসল শীতলতাটা। কিংবা আসল আসলটাকেই। একে কি আমরা এই নামেই ডাকি? গান গাওয়াটা আসলে কী? কেন তা আমাদের ভেদ করে যায়? তার জবাবে দর্শক হিসেবে শুধু আরও হইচই করা হয়তো ভুল। কিন্তু তা করার একটা অধিবিদ্যাগত চাপ আছে। আমিও সেটা টের পেয়েছিলাম, যদিও চিৎকার করিনি। চিৎকারে তেমন ভালো নই।
রোসালিয়ার দর্শক: সাধারণভাবে এই মানুষগুলোর মধ্যে আমি কোনো স্বস্তি পাই না। কখনো কখনো অসাধারণ কোনো পরিবেশনা দেখতে দেখতে দর্শকদের মধ্যে একটা সখ্য গড়ে ওঠে। মনে হয়, এই তো আমরা সবাই মিলে এই প্রতিভার ঢেউয়ে উঠছি-নামছি, একসঙ্গে দাঁড় টানছি। এখানে তেমন কোনো মেজাজ নেই। এখানে প্রত্যেকে একা একা রোসালিয়ার প্রেমে পড়েছে। তার সঙ্গে নিজের জীবনটা কেমন হবে, সেই জীবন তাকে একান্ত নিজের মতো করে কীভাবে বাঁচাবে, সেই কল্পনায় ব্যস্ত। অনুষ্ঠান শেষে আমরা সবাই যখন পাতালরেলের কড়া আলোয় ভেসে থাকা প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, তখন (সি. এটা খেয়াল করেছে, এ ধরনের ব্যাপারই ও খেয়াল করে) নেই কোনো মিলিত উল্লাস, নেই সবার ভাগের কোনো ক্ষত। রাতটা নিস্তরঙ্গ, ভাঁজ করে তুলে রাখা। ইয়ারবাড ঠিক করতে করতে প্রত্যেকে আপন ভাবনায় ডুবে যায়।
ভাষান্তর: রিটন খান



