অনুগল্প
পড়ো ভিটা আসলে ফাঁকা নয়। সেখানে জমে আছে মানুষের অনুপস্থিতির পলেস্তারা, ভাঙা সিঁড়ির নীচে আটকে থাকা ইতিহাস, বেতঝোপের অন্ধকারে লুকোনো নজর, আর এক ছেলের স্থির দৃষ্টি।
পড়ো ভিটাটা যেন গ্রামের ব্যাকরণে হারিয়ে যাওয়া একটি বাক্য, যার কর্তা-ক্রিয়া-কর্ম সব উধাও, কিন্তু বিস্ময়বোধক চিহ্নটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। বহুদিন আগে মানুষজন উঠে গিয়েছে, অথচ মানুষের অনুপস্থিতিও যে একধরনের জোরালো উপস্থিতি, তা এখানে পা রাখলেই বোঝা যায়। ভাঙা দেওয়ালের গায়ে লতানো আগাছা এমনভাবে আঁকড়ে আছে, যেন শেষ গৃহস্থের স্মৃতি সে নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করছে। শুকনো কাঁঠালের পাতা মাটিতে ছড়ানো, আধখানা ইঁট উঁকি দিচ্ছে মাটির ভিতর থেকে; সব মিলিয়ে মনে হয়, একসময় এখানে হেঁসেলের ধোঁয়া উঠত, কাশির শব্দ ভেসে আসত, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলত। এখন শুধু হাওয়া। সেই হাওয়ায় ধুলো উড়ে না, উড়ে স্মৃতি।
ভিটা থেকে কিছুদূরে একটি ছোট দীঘি। জল আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। যেন জলও অবসর নিয়েছে। কেউ আর সিঁড়ি বেয়ে নেমে কলস ডুবায় না, কেউ হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে চুলে তেল দিয়ে মাথা ধোয় না, কেউ পুকুরঘাটে ঝগড়া করে না। যে সিঁড়ি একসময় বাঁধানো ছিল, আজ তার ফাটল ধরা গায়ে কৃষ্ণাভ শেওলা জমে আছে। পাথরের ধাপগুলো এমনভাবে ক্ষয়ে গেছে, যেন নিজের ধ্বংসও ভুলে বসে আছে। ধাপে ধাপে জল জমে থাকে, তাতে পোকামাকড় জন্মায়। কোথাও ইট সরে গিয়ে গর্ত, সেই গর্তে জমাট কাদা। কে জানে, কতদিন আগে কারা এই ঘাট বানিয়েছিল; তাদের নাম এখন শেওলার নিচে চাপা। ইতিহাস এখানে ফলকে লেখা নয়, ফাঙ্গাসে লেখা।
দীঘির তিনদিক জুড়ে বেতঝোপ। মস্ত মস্ত কঞ্চি, কাঁটা ঝোপ মাটি পর্যন্ত নেমে এসে আলোকে আটকে দিয়েছে। দিনের বেলাতেও সেখানে এক ধরনের অন্ধকার; চোখ সয়ে যায়, কিন্তু মন সয় না। ঝোপের ভিতর থেকে মাঝেমধ্যে ডানা ঝাপটার শব্দ; খুট, খুট। হয়তো শালিক, হয়তো কোনো নিশাচর পাখি দিনের আলোয় অস্থির। কিন্তু শব্দটুকু শুনলেই মনে হয়, কেউ যেন ভিতর থেকে দেখছে। মানুষ নেই, কিন্তু নজর আছে। যেন এই ভিটায় সিসিটিভি বসানো হয়েছে প্রকৃতির তরফে।
দীঘি আর ভিটার মাঝামাঝি একটি তেঁতুল গাছ। বয়সে প্রবীণ। গুঁড়ি মোটা, শেকড় মাটির উপর দিয়ে সাপের মত এগিয়ে গেছে। বিস্তর শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই পরিত্যক্ত জমির একমাত্র প্রহরী। সবেমাত্র তেঁতুলে পাক ধরেছে। ছড়ায় ছড়ায় ঝুলে থাকা তেঁতুলের ভারে একটি বড় ডাল নুয়ে পড়েছে, সেই ডাল প্রায় ভিটার উপর এসে ঠেকেছে। বাতাস লাগলেই কাঁচা-পাকা তেঁতুলের গন্ধ ভেসে আসে। সেই গন্ধে টক আছে, শুকনো মাটির স্বাদ আছে, আর আছে একধরনের অসমাপ্ত লোভ।
সেই ডালের ঠিক নিচে একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে। পরনে মলিন হাফপ্যান্ট, গায়ে ময়লা জামা, পা খালি। তার দৃষ্টি উপরের দিকে, কিন্তু শুধু তেঁতুলের দিকে নয়; আরও দূরে, আরও গভীরে। মাঝে মাঝে সে গিলছে, যেন মুখে টক স্বাদ কল্পনা করছে। কিন্তু হাত বাড়াচ্ছে না। এই হাত না বাড়ানোই আসল নাটক।
সে কি তেঁতুলের জন্য অপেক্ষা করছে? নাকি কারও অনুমতির? হয়তো বাড়িতে কড়া নির্দেশ আছে; এই ভিটায় না আসার। গ্রামের লোকেরা বলে, সন্ধ্যার পর এখানে ভূত দেখা যায়। কার ভূত, সে নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলে, এই ভিটার শেষ গৃহস্থের। কেউ বলে, দীঘিতে ডুবে যাওয়া এক বউয়ের। কেউ আবার বলে, এসব গল্প বানানো, আসল ভূত হচ্ছে পরিত্যক্ততার। ছেলেটা এসব শুনেছে কি না, কে জানে। কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তেঁতুল পড়বে; আর সে ধরবে। অথবা, কেউ আসবে; আর সে কথা বলবে।
বাতাস একবার জোরে এল। ডাল দুলল। দু-একটি তেঁতুল টুপ করে মাটিতে পড়ল। ছেলেটা চমকাল না। নীচে তাকালও না। তার চোখ তখনও উপরের দিকে। যেন সে ফলের পতনের দিকে নয়, আকাশের দিকে নজর রাখছে। মনে হল, সে তেঁতুলের জন্য অপেক্ষা করছে না। সে অপেক্ষা করছে; এই ভিটায় আবার কেউ বাস করবে কি না, সেই অদৃশ্য প্রশ্নের উত্তরের জন্য। অথবা, হয়তো সে অপেক্ষা করছে নিজের বড় হয়ে ওঠার। এই ভিটা যেমন একদিন ভরা ছিল, তেমনি একদিন সে-ও ভরে উঠবে; কোনো কণ্ঠে, কোনো দাবিতে, কোনো দখলে।
পড়ো ভিটা আসলে ফাঁকা নয়। সেখানে জমে আছে মানুষের অনুপস্থিতির পলেস্তারা, ভাঙা সিঁড়ির নীচে আটকে থাকা ইতিহাস, বেতঝোপের অন্ধকারে লুকোনো নজর, আর এক ছেলের স্থির দৃষ্টি। এইসব মিলে জায়গাটা এক ধরনের অসমাপ্ত উপন্যাস; যার শেষ লাইন এখনো লেখা হয়নি। হয়তো সেই লাইন লিখবে এই ছেলেটাই। অথবা, কেউই লিখবে না। তবু অপেক্ষা থাকবে।


