পদাতিক থেকে ‘আমার বাংলা’: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আত্মপরিচয়ের অন্তর্যাত্রা
‘পদাতিক’ থেকে ‘আমার বাংলা’; এই যাত্রাপথ আসলে এক অন্তর্যাত্রা। নাগরিকতা থেকে মাটির দিকে, কোলাহল থেকে নীরবতার দিকে, বাহ্য পরিচয় থেকে অন্তর পরিচয়ের দিকে।
পদাতিক-নামটি উচ্চারণ করলেই বাংলা কাব্যের এক বিশেষ সময়, এক বিশেষ মনোভঙ্গি, এক বিশেষ পথচলার ইতিহাস আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল কবি নন, তিনি ছিলেন চলমান এক চেতনার নাম, এমন কণ্ঠ যা শহুরে অলিন্দে জন্ম নিয়েও গ্রাম-গঞ্জের মাটি স্পর্শ করে নিজের স্বরকে পুনর্গঠিত করেছে। তাঁর আত্মপ্রকাশের মুহূর্তেই বাঙালি পাঠক অনুভব করেছিলেন, এখানে কোনও অভিনয় নেই, কোনও কৃত্রিম বিপ্লবী ভঙ্গি নেই; আছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দাহ, ভাষার মধ্যে জীবনের উষ্ণতা, এবং শব্দ-অর্থের এক আন্তরিক সংলাপ।
‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থ তাঁকে যে পরিচয় দিয়েছিল, তা ছিল সংগ্রামের, পথে নামার, মিছিলে মিশে যাওয়ার। কিন্তু এই পদাতিক হয়ে ওঠা ছিল আত্ম-অন্বেষণের একটি দীর্ঘ প্রস্তুতি। নাগরিক সাহিত্যজগতের মুখরতা, আড্ডা-সমালোচনার কোলাহল, খ্যাতির সম্ভাব্য আলোকবৃত্ত; সব কিছু থেকে তিনি এক সময় সরে দাঁড়ালেন। এই সরে দাঁড়ানো ছিল আত্মনির্বাসন, এক ধরনের সচেতন অজ্ঞাতবাস। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, কাগজে-কলমে মানুষের কথা বলা যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরে না ঢুকলে মানুষের ভাষা অর্জিত হয় না।
এই দীর্ঘ পরিভ্রমণে তিনি বাংলার পথে-ঘাটে-মাঠে ঘুরেছেন, শ্রমিকের ঘামে, কৃষকের নির্জন ক্লান্তিতে, বস্তির শিশুর চোখে, প্রান্তিক মানুষের অনুচ্চারিত বেদনায় নিজের কাব্যের উৎস খুঁজেছেন। এখানে কবি একজন সহযাত্রী। মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বঞ্চনা-অভিমান; সব কিছু তিনি কেবল নোট নেননি, হৃদয়ের মধ্যে ধারণ করেছেন। এই ধারণের প্রক্রিয়াই তাঁকে নতুন ঐশ্বর্যের সন্ধান দিয়েছে। যে ঐশ্বর্য অর্থে নয়, অভিজ্ঞতায়; যে ঐশ্বর্য অলঙ্কারে নয়, আত্মীয়তায়।
এই অভিজ্ঞতার সমাহারেই রচিত হয় ‘আমার বাংলা’। এটি কোনও ভৌগোলিক বিবরণ বা কোনও রোমান্টিক দেশপ্রেমের উচ্চারণ নয়; বরং এক গভীর পরিচয়-সাধনার দলিল। দেশকে জানা মানে কেবল মানচিত্র জানা নয়, মানুষের মুখ পড়তে শেখা। ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের বহুত্বের মধ্যে যে জটিল স্রোত, তার সঙ্গে নিজের সত্তাকে মিলিয়ে নেওয়া। ‘আমার বাংলা’ সেই মিলনের কাব্য, যেখানে কবি নিজেকে খুঁজে পান মানুষের মধ্যে, আর মানুষ তাঁকে গ্রহণ করে আত্মীয়রূপে।
বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে দেশকে জানা, মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, এই সাধনা কি কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব? না, এটি সাহিত্যিকের নৈতিক অনুশীলনও। সাহিত্য যদি পাঠক ও সমাজের মধ্যে সেতু হয়, তবে সেই সেতুর পাটাতন নির্মিত হয় অভিজ্ঞতার কাঠামো দিয়ে। কল্পনা সেখানে প্রয়োজনীয়, কিন্তু কল্পনার ভিত হতে হয় বাস্তবের মাটিতে প্রোথিত। সুভাষের পদাতিক-জীবন সেই ভিত নির্মাণের ইতিহাস।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যে যে দেশচেতনা, তা সংকীর্ণ জাত্যাভিমান নয়। সেখানে মানুষ মুখ্য, রাষ্ট্র বা শাসন নয়। তাঁর পদাতিক সত্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সাহিত্য যদি মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তবে তাকে প্রথমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই পাশে দাঁড়ানো উচ্চকিত স্লোগান নয়, নীরব সঙ্গ। শব্দের আগে শ্রবণ, বক্তব্যের আগে বোঝাপড়া।
আমরা যখন বলি, একটি আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠিত হলো; এই স্বীকৃতির মধ্যে আছে এক ধরনের তৃপ্তি, আবার দায়ও। কারণ আত্মীয়তা মানে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা। কবি আমাদের কাছে যেমন তাঁর জীবন-উৎসের সন্ধান উন্মুক্ত করেন, তেমনই পাঠকেরও দায়িত্ব থাকে সেই উৎসের কাছে পৌঁছনোর প্রয়াস নেওয়া। সাহিত্য তখন আর একমুখী উচ্চারণ থাকে না, হয়ে ওঠে সংলাপ।
আজকের দ্রুতগামী সময়ে, যখন শব্দ অনেক সময় আবরণ, অলঙ্কার, কিংবা প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন সুভাষের পদাতিক-পরিচয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা তার শক্তি অর্জন করে জীবন থেকে। গ্রন্থের দুই মলাটের ভেতরে যে অক্ষরসমুদ্র, তার তরঙ্গ তখনই সত্যিকার অর্থে স্পন্দিত হয়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মাটি, মানুষ, এবং মননের আন্তরিকতা।
এই কারণেই সুভাষ মুখোপাধ্যায় এক প্রক্রিয়া। আত্মপরিচয়ের সেই দীর্ঘ সাধনা, যেখানে কবি নিজেকে খুঁজে পান মানুষের মধ্যে, আর মানুষ তাঁর কাব্যে নিজের প্রতিফলন দেখে। এই প্রতিফলনই সাহিত্যের স্থায়ী শক্তি; সময় বদলায়, কিন্তু আত্মীয়তার এই বোধ অম্লান থাকে।
‘পদাতিক’ থেকে ‘আমার বাংলা’; এই যাত্রাপথ আসলে এক অন্তর্যাত্রা। নাগরিকতা থেকে মাটির দিকে, কোলাহল থেকে নীরবতার দিকে, বাহ্য পরিচয় থেকে অন্তর পরিচয়ের দিকে। এই যাত্রার সাক্ষী হয়ে আমরা সাহিত্য ও জীবনের সেই গভীর সম্পর্ককে পুনরায় চিনে নিই, যা আলো-অন্ধকারের মাঝখানে আমাদের পথ দেখায়।
রিটন খান
বইটির ডাউনলোড লিঙ্ক কমেন্টে।
আমার বাংলা - সুভাষ মুখোপাধ্যায়




https://www.mediafire.com/file_premium/tkgjew9vysn4lsi/