মানুষকে দম ফেলার সুযোগ দিতে হবে
ক্লাস বনাম আইডেন্টিটি—এই বিভাজনটা আসলে ভাঁওতা। শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া লিঙ্গ বা জাত নিপীড়ন টেকসইভাবে কমানো যায় না।
মার্ক্সের বক্তব্য কিন্তু খুব সোজা, কিন্তু তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল বানিয়ে ফেলা হয়েছে এখনো হয়। পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকেরা এটা করে। মার্ক্স বলেছেন শ্রেণিভিত্তিক সমাজ মানেই শোষণ। শোষণ কোনও ব্যক্তিগত বিষয় নয়। শোষণ হল কাঠামোগত। সমাজ যেভাবে উৎপাদন সংগঠিত করে, যেভাবে মানুষ বাঁচার উপকরণ পায় বা পায় না, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই শোষণ বসে থাকে। দাসপ্রথা, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ; সব ক’টাতেই শোষণ আছে। পার্থক্য শুধু, কে কীভাবে উদ্বৃত্ত শ্রমটা বের করে নিচ্ছে।
এখানেই মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি শেয়ার না করে পারছি না। ‘দাসপ্রথা আর মজুরিভিত্তিক শ্রমের ফারাকটা মানবিক নয়, পদ্ধতিগত’। কার উপর চাবুক পড়ছে, কার উপর চুক্তি। কিন্তু দু’ক্ষেত্রেই শ্রমিক তার শ্রমের সম্পূর্ণ ফল ভোগ করে না। আর এই আনপেইড সারপ্লাস লেবার বের করে নেওয়ার ধরনটাই ঠিক করে দেয় কে শাসক, কে শাসিত।
এটা বোঝা খুব জরুরি, কারণ তাতে একটা অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে। পুঁজিবাদ একমাত্র শোষণমূলক ব্যবস্থা নয়। সোভিয়েত-ধাঁচের ব্যুরোক্র্যাটিক সমাজেও শোষণ ছিল। সেখানে মালিক ছিল না ব্যক্তিগত পুঁজিপতি, ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যুরোক্রেসি। উৎপাদনের উপকরণ তাদের হাতে, উদ্বৃত্ত শ্রমও তাদের নিয়ন্ত্রণে। শ্রমিকের সামনে বিকল্প নেই। কাজ করো, না হলে বাঁচবে না। শুধু মালিকের নাম পাল্টেছে।
তবে এখানেই মার্ক্সবাদ থেমে যায় না। সব শোষণ একরকম নয়। পুঁজিবাদের একটা বিশেষ চরিত্র আছে; তার বাধ্যতামূলক বৃদ্ধি। প্রতিটি ফার্মকে, প্রতিটি কোম্পানিকে বাড়তেই হবে। না বাড়লে সে মরে যাবে। বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার মানেই লাভ বাড়ানো, খরচ কমানো, প্রযুক্তি বদলানো, উৎপাদন বাড়ানো। এই গ্রো অর ডাই যুক্তিটা দাসপ্রথা বা সামন্ততন্ত্রে ছিল না। ওগুলো ছিল স্থির। সংকট আসত উৎপাদন কম হলে। পুঁজিবাদের সংকট আসে বেশি উৎপাদন হলে। অতিরিক্ত পণ্য, বিক্রি নেই, মন্দা।
এই জায়গাটা বুঝতে পারলে অনেক সমকালীন বিতর্ক পরিষ্কার হয়ে যায়। যেমন, লিঙ্গ সম্পর্ক। পুঁজিবাদের মধ্যে নারী স্বাধীনতা অনেক বেড়েছে, আইনত, অর্থনৈতিক দিক থেকেও। কিন্তু যৌন সহিংসতা কমেনি। পরিচর্যা শ্রম আজও নারীর ঘাড়ে, বিনা মজুরিতে বা অতি কম মজুরিতে। এই আন পেইড কেয়ার ওয়ার্ক পুঁজির সরাসরি বিশ্লেষণে পড়ে না, কারণ ক্যাপিটাল বইটা লিখিতই হয়েছে পুঁজিবাদ কীভাবে চলে, সেটা বোঝাতে। মার্ক্স কোন গড নন তাই মার্ক্সকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং আমাদের বুঝতে হবে যে, সামাজিক পুনরুৎপাদন ছাড়া পুঁজিবাদ চলেই না। শ্রমশক্তি তো আকাশ থেকে পড়ে না।
এখন আপনারা প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, পুঁজিবাদের মধ্যে কি সম্পূর্ণ লিঙ্গসমতা সম্ভব? তাত্ত্বিকভাবে হ্যাঁ। বাস্তবে? প্রায় অসম্ভব। কারণ যতক্ষণ পরিচর্যা শ্রমকে সামাজিক দায়িত্ব বানানো হবে না, ততক্ষণ সেটা ব্যক্তিগত ঘরের ভিতরেই চাপা থাকবে। আর সেটা করলে মুনাফায় টান পড়বে। তাই কিছু দেশে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরি হলেও, নব্যউদারনীতির হাওয়ায় সেগুলোও কেটে ছেঁটে সাইজ ছোট করা হয়েছে। ফলে কয়েকজন নারী উপরে উঠেছেন, কিন্তু নারীসমাজের ভিতরে বৈষম্য বেড়েছে।
এই একই যুক্তি কিন্তু জাত ও বর্ণের ক্ষেত্রেও খাটে। ক্লাস বনাম আইডেন্টিটি—এই বিভাজনটা আসলে ভাঁওতা। শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া লিঙ্গ বা জাত নিপীড়ন টেকসইভাবে কমানো যায় না।
এর পরেই আসে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা—পরিবেশ। পুঁজিবাদের বৃদ্ধি-আবশ্যকতা আর টেকসই পরিবেশ একসঙ্গে থাকতে পারে না। এটা আমার মতামত নয়, কাঠামোগত সত্য। পরিবেশবাদীরা যদি এই জায়গাটা না বোঝেন, তাহলে তারা আসলে অন্য রকম ক্লাইমেট চেঞ্জ ডিনায়াল।
এই যুক্তি পোস্টকলোনিয়াল বিতর্কেও কাজে লাগে। বলা হয়, ভারত নাকি পুরো পুঁজিবাদী দেশ নয়। তাই মার্ক্স এখানে খাটে না। কিন্তু মার্ক্সবাদ কখনও বলেনি উন্নয়ন সবসময় একরকম হবে। বলেছেন কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য সর্বত্র থাকবে। লাভের তাগিদ, শোষণ, বাজার। ভারতে এগুলো আছে, বরং জাতপাতের মতো কাঠামো পুঁজির কাজ সহজ করে দিয়েছে।
চীন আর সোভিয়েত অন্য জিনিস। সেখানে বৃদ্ধি ছিল, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। তাই গোস্ট সিটি, গোস্ট কোম্পানি বানানো যায়। পুঁজিবাদে সেটা করা যায় না। চীন আজ হাইব্রিড। বাজার আর রাষ্ট্র একসঙ্গে। আর সেই মিশ্রণ পরিবেশের উপর ভয়াবহ চাপ ফেলছে।
সবশেষে আসে সমাজতন্ত্র। মার্ক্সের সমাজতন্ত্র খুব বাস্তব। উৎপাদনের উপকরণ থাকবে সমষ্টিগত ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে। শ্রমের ফল শ্রমিকই পাবে। মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ক হবে সচেতন, পরিকল্পিত। আর হ্যাঁ, কাজের সময় কমবে। মানুষকে দম ফেলার সুযোগ দিতে হবে।
আর এই জায়গা থেকেই decommodification অর্থাৎ কিছু জিনিসকে বাজারের বাইরে রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাবার; এসব বাজার থেকে বের না করলে বাকিটা অর্থহীন। সমাজতন্ত্র মানে শুধু মালিকানা বদল নয়। সামাজিক সম্পর্ক বদল। সেটা না বদলালে প্রযুক্তি, রাষ্ট্র, সবকিছু পাল্টেও শেষে আবার পুঁজিবাদেই ফিরে আসতে হবে।



