পিঁপড়েটা ডুবছে, আপনি কী করবেন?
এই চিন্তাটাকে আমি বলি সম্ভাবনার হিসাব। ইংরেজরা বলে probabilistic approach।
সেদিন বৃষ্টির পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু বারান্দার এক কোণে টবের নীচে একটু জল জমে আছে। সেই জলের মধ্যে একটা পিঁপড়ে পড়েছে। হাত-পা ছুড়ছে। পিঁপড়ের আবার হাত-পা কোনটা, সে আমি জীববিদ্যার মাস্টার নই, মোট কথা প্রাণপণে বাঁচবার চেষ্টা করছে।
আমি দাঁড়িয়ে দেখছি।
আমার হাতে কফির কাপ। সামনে মোবাইল ফোন। পৃথিবীতে তখন নানা গুরুতর ব্যাপার চলছে। যুদ্ধ চলছে, নির্বাচন চলছে, শেয়ারবাজার উঠছে-নামছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে টপকে যাবে কি না সেই নিয়ে পৃথিবীর বড় বড় মাথারা মাথা ঘামাচ্ছেন। আর আমার সামনে এক পিঁপড়ে এক চামচ জলে ডুবে মরছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি পিঁপড়েটাকে বাঁচাব?
বাড়ির কেউ পাশে থাকলে বলবে, “তোমার কি আর কোনও কাজ নাই?”
কথাটাও মিথ্যে নয়। একটা পিঁপড়ে। পৃথিবীতে আনুমানিক কত পিঁপড়ে আছে সে হিসাব করতে গেলে আমার ক্যালকুলেটরও সম্ভবত চাকরি ছেড়ে দেবে। প্রতিদিন কত পিঁপড়ে পায়ের নীচে পড়ে, কত পোকা গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ধাক্কা খায়, কত মশা আমরা বিনা বিচারে থাপ্পড় মেরে শেষ করে দিই। সেখানে একটি পিঁপড়েকে বাঁচিয়ে আমার কী এমন মহাভারত উদ্ধার হবে?
কিন্তু আমার সমস্যা অন্য জায়গায়।
আমি জানি না পিঁপড়েটার অভিজ্ঞতা কী।
তার ভয় লাগে কি না, ব্যথা লাগে কি না, তার কোনও রকম সচেতনতা আছে কি না, কিংবা তার ভেতরের জগত বলে আদৌ কিছু আছে কি না, এ-সব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আমার হাতে নেই। বিজ্ঞান এখানে অনেক কিছু জানে, আবার অনেক কিছু এখনও জানে না। প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্র, আচরণ, ব্যথা এড়ানোর প্রবণতা, শেখার ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। কীটপতঙ্গের অভিজ্ঞতার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্কও চলছে।
আমার সামনে তাই মজার একটা হিসাব দাঁড়াল।
ধরুন পিঁপড়ের কোনও অনুভূতিই নেই। তাকে বাঁচালাম। আমার ক্ষতি কী?
একটা শুকনো পাতা এগিয়ে দিতে আমার লাগল পাঁচ সেকেন্ড।
আবার ধরুন তার কোনও রকম অনুভূতি আছে। খুব সামান্য হলেও আছে। সে ভয় বা যন্ত্রণার মতো কোনও অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাহলে ওই পাঁচ সেকেন্ডে আমি হয়তো একটি জীবের জন্য যথেষ্ট বড় একটা কাজ করে ফেললাম।
এই জায়গাটাতেই সম্ভাবনার (probabilistic) হিসাবটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
আমরা ভুল না নির্ভুল প্রশ্নে খুব নিশ্চয়তা চাই। শতভাগ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত যেন কিছু করার দায় নেই। ব্যাপারটা অনেকটা বাড়ির ছাদ থেকে ধোঁয়া উঠছে দেখে বসে থাকার মতো। আপনি বললেন, “আগুন লেগেছে তার সায়েন্টিফিক প্রুফ কই?”
পাশের লোক বলল, “আগুন না-ও হতে পারে।”
আপনি বললেন, “তাহলে ফায়ার ব্রিগেড ডাকব না।”
পাঁচ মিনিট পরে দুজনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়ি পুড়তে দেখছেন।
সিদ্ধান্ত সবসময় আদালতের রায়ের মতো হয় না। অনেক সময় আমাদের অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে চলতে হয়।
আমার ছেলেবেলায় ঢাকায় বর্ষার সময় নালা-নর্দমায় কত পিঁপড়ে, ফড়িং, গুবরে পোকা ভেসে যেতে দেখেছি। তখন এসব নিয়ে কোনও দর্শন ছিল না। পিঁপড়েকে বাঁচালে বাঁচালাম, না-বাঁচালে তারও কোনও হিসাব নেই। শিশুরা অনেক সময় বড়দের চেয়ে এ ব্যাপারে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। তারা একটা পোকাকে উলটে পড়ে থাকতে দেখলে আঙুল দিয়ে সোজা করে দেয়। তারপর পাঁচ মিনিট বাদে সেই একই ছেলে আরেকটা পোকাকে কৌতূহলবশে দেশলাইয়ের বাক্সে পুরে রাখে। নীতিশাস্ত্র তখনও পুরো ইনস্টল হয়নি, বেটা ভার্সন চলছে।
বড় হয়ে আমরা বরং উল্টো বিপদে পড়ি। অতি বুদ্ধিমান হয়ে যাই।
একজন বলবেন, “পিঁপড়ের নার্ভাস সিস্টেম খুব সরল।”
আরেকজন বলবেন, “Sentience-এর threshold কোথায় সেট করবেন?”
তৃতীয়জন বলবেন, “এভাবে চললে তো ব্যাকটেরিয়া নিয়েও ভাবতে হবে।”
চতুর্থজন তখন সম্ভবত চা খেতে চলে গেছেন।
যেখানে আমার খরচ প্রায় শূন্য, আর অপর জীবটির উপকার হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের চেয়ে কিছুটা বেশি, সেখানে আমি কেন সামান্য সতর্ক হব না?
এই চিন্তাটাকে আমি বলি সম্ভাবনার হিসাব। ইংরেজরা বলে probabilistic approach।
আমাদের জীবনে এমন হিসাব আমরা সারাক্ষণ করি।
বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ত্রিশ শতাংশ শুনে ছাতা নিয়ে বেরোই। বাড়িতে গ্যাসের গন্ধ পেলে “শতভাগ নিশ্চিত নই” বলে দেশলাই জ্বালাই না। ডাক্তার যদি বলেন, কোনও লক্ষণ গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে, আমরা সাধারণত বলি না, “একশো শতাংশ প্রমাণ হলে ফোন দেবেন।”
কারণ সম্ভাবনা আর ক্ষতির মাত্রা, দুটো একসঙ্গে বিবেচনা করি।
অথচ অন্য প্রাণীর বেলায় আমরা প্রায়ই দাবি করি পূর্ণ নিশ্চয়তা।
আমাদের সুবিধামতো বিজ্ঞানকে তখন সাক্ষী বানাই।
“প্রমাণ করেন ও কষ্ট পায়।”
এই দাবির মধ্যে একটা বিপজ্জনক ব্যাপার আছে। কারণ ইতিহাসে মানুষ বহুবার এমন সব প্রাণী, এমনকি মানুষকেও, নৈতিক বৃত্তের বাইরে রেখেছে যাদের অনুভূতি আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট বলে মনে হয়।
এক সময় শিশুরা কতটা ব্যথা অনুভব করে, প্রাণীরা কেমন যন্ত্রণা অনুভব করে, কোন জনগোষ্ঠীকে কতটা মানুষ হিসেবে গণ্য করা হবে, এসব নিয়েও অমানবিক ধারণা প্রচলিত ছিল। আমাদের নৈতিক ইতিহাসের একটা বড় অংশ হচ্ছে বৃত্তটা একটু একটু করে বড় হওয়ার ইতিহাস।
আগে “আমার পরিবার”।
তারপর “আমার গোত্র”।
তারপর “আমার জাতি”।
তারপর “মানুষ”।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই বৃত্ত আর কতদূর যাবে।
পশু পর্যন্ত?
পাখি?
মাছ?
অক্টোপাস?
মৌমাছি?
পিঁপড়ে?
এই প্রশ্ন শুনে অনেকেই হয়তো হাসবেন।
আমারও পায়।
আমি যদি কোনও আড্ডায় খুব গম্ভীর মুখে বলি, “বন্ধুগণ, আজ আমাদের পিঁপড়ের নৈতিক অবস্থান নিয়ে ভাবতে হবে”, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাকে সম্ভবত আড্ডা থেকে বহিষ্কার করা হবে। একজন হয়তো বলবে, “আগে মানুষের অবস্থা ঠিক করেন।”
এটাও আমাদের প্রিয় যুক্তি।
মানুষের সমস্যা আছে বলে অন্য কোনও সমস্যার দিকে তাকানো যাবে না।
কিন্তু মানুষ তো এমন প্রাণী যে একই দিনে বহু কাজ করে। সকালে সন্তানের স্কুলের ফি দেয়, দুপুরে অফিস করে, বিকেলে বন্ধুকে ফোন করে, রাতে একটা আহত কুকুরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। নৈতিকতার জন্য আলাদা একটা মাত্র চেয়ার নেই যে সেখানে মানুষ বসলে পিঁপড়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
বরং ছোট ছোট আচরণ আমাদের চরিত্রের অভ্যাস তৈরি করে।
একটা পিঁপড়েকে না-মারা কোনও বিশাল মানবিক কীর্তি নয়। এর জন্য পদকও পাওয়া যাবে না। ফেসবুকে লিখলে বরং বিপদ, দশজন বলবে “শো অফ”।
কিন্তু আমি যদি এমন অভ্যাস করি যে অকারণে কোনও জীবকে কষ্ট দেব না, যেখানে সামান্য চেষ্টা করে ক্ষতি কমানো যায় সেখানে চেষ্টা করব, তাহলে সেই অভ্যাসটা অন্য জায়গাতেও আমার সঙ্গে যাবে।
নৈতিকতা অনেকটা অভিনয়ের মতো। স্টেজে উঠে হঠাৎ তৈরি হয় না। রিহার্সাল লাগে।
মানুষ বড় সিদ্ধান্তের সময় যে চরিত্র দেখায়, তার অনেকটাই ছোট সিদ্ধান্তে তৈরি হয়ে গেছে।
রাস্তার কুকুরটাকে লাথি না-মারা।
গাছের ডালে বসে থাকা পাখিটাকে ছেলেকে দিয়ে ঢিল না-ছোড়ানো।
ঘরে ঢুকে পড়া মাকড়সাকে মেরে না-ফেলে বাইরে ছেড়ে দেওয়া।
বৃষ্টির জলে ভাসতে থাকা পিঁপড়ের সামনে শুকনো কাঠি রাখা।
এসব কাজের মূল্য প্রত্যেকটির ফলের চেয়ে অভ্যাসে অনেক সময় বেশি।
এখন এখান থেকে ব্যাপারটা একটু বড় করি।
ধরুন insect farming।
পৃথিবীর নানা জায়গায় খাদ্য, পশুখাদ্য, প্রোটিন উৎপাদন এবং অন্যান্য কাজে বিপুল সংখ্যক কীটপতঙ্গ পালনের ধারণা বাড়ছে। একটি গরুর খামারে হাজার প্রাণী থাকতে পারে। কীটের খামারে সংখ্যা যেতে পারে কোটি, শতকোটি, তারও বেশি।
এখন যদি আমরা নিশ্চিত হতাম যে কীটপতঙ্গের কোনও subjective experience নেই, তাহলে নৈতিক সমস্যার একটা বড় অংশ বাদ যেত।
কিন্তু যদি সামান্য সম্ভাবনাও থাকে যে কিছু প্রজাতির কীট ব্যথা, ভয়, distress-এর কোনও মৌলিক রূপ অনুভব করে, তাহলে সংখ্যার কারণে হিসাবটা ভয়ংকর বড় হয়ে যায়।
একটা পিঁপড়ের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ছোট।
একশো কোটি প্রাণীর ক্ষেত্রে সেই ছোট সম্ভাবনার নৈতিক ওজন আর ছোট থাকে না।
এই জায়গায় আমাদের স্বাভাবিক intuition একটু বিপদে পড়ে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক সংখ্যা বোঝার জন্য খুব সুবিধাজনক যন্ত্র নয়।
একটি আহত কুকুর দেখলে বুক কেঁপে ওঠে।
দশ হাজার অদৃশ্য প্রাণীর suffering শুনলে আমরা কাঁধ ঝাঁকি।
একজন শিশুর ছবি আমাদের নাড়া দেয়, একটা পরিসংখ্যান দেয় না।
সংখ্যা যত বড় হয়, অনুভূতি তত ছোট হয়। ব্যাপারটা অঙ্কের দোষ নয়, আমাদের মস্তিষ্কের।
এই একই সমস্যার আরেকটা সংস্করণ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও সামনে দাঁড়াচ্ছে।
ধরুন ভবিষ্যতের কোনও AI system সত্যিই সচেতন হতে পারে কি না আমরা জানি না।
আজকের সিস্টেম সচেতন কি না, কিংবা ভবিষ্যতে সচেতনতার মতো কোনও অবস্থায় পৌঁছতে পারবে কি না, প্রশ্নটা বিশাল এবং অনিশ্চিত। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি কোটি কোটি digital agent তৈরি হয়, আর তাদের subjective experience থাকার সম্ভাবনা সামান্যও থাকে, তাহলে আমাদের আজকের design choice, training method, deployment policy একদিন নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই সম্ভাবনা আজ অদ্ভুত শোনায়।
পিঁপড়ের নৈতিকতা নিয়েও একসময় অনেকের কাছে একই রকম অদ্ভুত লাগতে পারে।
আমাদের বিপদ হল, কোনও প্রশ্ন অদ্ভুত শোনালেই আমরা ধরে নিই সেটা অর্থহীন।
ইতিহাস এ বিষয়ে আমাদের বিশেষ ভরসা দেয় না।
মানুষ বহুবার এমন সব ব্যাপার নিয়ে হেসেছে যা পরে ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই probabilistic ethics-এর বড় গুণ আমার কাছে এইখানে। এটি আমাকে বলে না যে প্রতিটি পোকাকে মানুষের সমান অধিকার দিতে হবে। প্রতিটি uncertainty-কে certainty বানিয়েও ফেলে না। বরং বলে, সন্দেহের পরিমাণ অনুযায়ী সতর্কতার পরিমাণ ঠিক করো।
সম্ভাবনা খুব কম হলে দায়িত্বও ছোট হতে পারে।
সম্ভাবনা বাড়লে দায়িত্ব বাড়বে।
সম্ভাব্য ক্ষতি যদি বিশাল হয়, অল্প সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এই যুক্তি আইন ও নীতিনির্ধারণে খুব কাজে লাগতে পারে।
ধরুন কোনও শিল্পে কোটি কোটি কীটপতঙ্গ ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার হয়তো বলতে পারে, আমরা এখনও নিশ্চিত নই এরা ব্যথা অনুভব করে কি না, কিন্তু কিছু welfare standard রাখা খুব ব্যয়বহুল নয়। তাহলে unnecessarily cruel production method এড়ানো যায় কি না দেখা হোক।
কোনও গবেষণাগারে প্রাণীর nervous system নিয়ে নতুন evidence এলে policy update করা যায়।
AI development-এর ক্ষেত্রেও একই নীতি কাজে লাগতে পারে। এখনই কোনও metaphysical সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার দরকার নেই। কিন্তু future systems-এর moral status নিয়ে গবেষণা রাখা, সম্ভাব্য digital suffering-এর indicator তৈরি করা, architecture এবং training procedure নিয়ে সতর্ক থাকা অযৌক্তিক হবে না।
আমাদের নৈতিকতার একটা বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমরা প্রায়ই বিপদ পুরোপুরি প্রমাণ হওয়ার পর সতর্ক হই।
তখন অবশ্য সতর্ক হওয়ার সুবিধা কমে গেছে।
বাংলায় একটা কথা আছে, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।
মানুষের সভ্যতাও মাঝে মাঝে ওই নীতিতেই চলে।
আগে দূষণ করি, পরে বুঝি সমস্যা হয়েছে।
আগে একটা species শেষ করি, পরে conservation fund করি।
আগে technology ছাড়ি, পরে ethics committee বসাই।
আগে বাড়ি পুড়ুক, তারপর smoke alarm কিনব।
তারপর সেই smoke alarm-এর বাক্সে লেখা থাকবে, “For your safety.”
মানুষ বড় মজার জীব।
কিন্তু আমার কাছে probabilistic approach-এর সবচেয়ে সুন্দর দিকটা রাষ্ট্রনীতি নয়।
সেটা ওই বারান্দার পিঁপড়ে।
কারণ রাষ্ট্রের আইন আমি আজ দুপুরে বদলাতে পারব না।
বিশ্বের insect farming industry-ও আমার কথা শুনে কাল সকাল থেকে production বন্ধ করবে না।
AI lab-গুলোর board meeting-এ আমার চেয়ার নেই।
কিন্তু আমার সামনে একটা পিঁপড়ে ডুবছে।
সেখানে আমার ক্ষমতা আছে।
খুব ছোট ক্ষমতা।
পাঁচ সেকেন্ডের ক্ষমতা।
একটা শুকনো পাতার ক্ষমতা।
আমরা অনেক সময় পৃথিবীর বিরাট সমস্যা দেখে অসহায় হয়ে যাই। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, প্রাণীকল্যাণ, প্রযুক্তির ঝুঁকি, দারিদ্র্য। সব এত বড় যে নিজের কাজটাকে অর্থহীন মনে হয়।
“আমি একা কী করব?”
প্রশ্নটা যুক্তিসঙ্গত।
কিন্তু সংস্কৃতি এমনই এক অদ্ভুত জিনিস, যা শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি “আমি একা” দিয়ে তৈরি।
একজন মানুষ রাস্তায় আবর্জনা না ফেললে পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যায় না।
কিন্তু দশ কোটি মানুষ একই অভ্যাস করলে শহরের চরিত্র বদলে যায়।
একজন মানুষ প্রাণীর প্রতি অকারণ নিষ্ঠুরতা এড়িয়ে গেলে আইন বদলায় না।
কিন্তু একটা প্রজন্ম যদি প্রাণীদের অন্য চোখে দেখতে শেখে, আইনও পরে তার পেছনে হাঁটে।
আইন অনেক সময় নৈতিক সংস্কৃতির শেষের দিকের যাত্রী।
আগে মানুষের মন বদলায়।
তারপর ভাষা বদলায়।
তারপর সামাজিক রীতি।
তারপর প্রতিষ্ঠান।
তারপর একদিন সংসদে কেউ দাঁড়িয়ে বলে, “আমাদের আইন পরিবর্তন করা দরকার।”
সবাই তখন ভাবে আইনের মাধ্যমেই পরিবর্তন শুরু হল।
আসলে পরিবর্তন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। হয়তো কোনও বাচ্চা রাস্তা থেকে আহত পাখিটাকে তুলে বাড়িতে এনেছিল, আর তার মা বলেছিলেন, “ফেলে দিও না, একটু জল দাও।”
আমরা জানি না কোন ছোট শিক্ষা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
তাই সেই পিঁপড়েটার কাছে আবার ফিরি।
আমি শেষ পর্যন্ত শুকনো একটা পাতা এগিয়ে দিলাম।
পিঁপড়েটা উঠল।
একটু থেমে রইল।
তারপর নিজের কাজে চলে গেল।
আমাকে ধন্যবাদ দিল না।
ফেসবুকে পোস্টও করল না, “Today a kind human saved my life.”
তার পরিবার থাকলে তাদের কাছেও সম্ভবত ঘটনাটা বলেনি।
পিঁপড়েদের autobiography আছে কি না আমি জানি না। থাকলে হয়তো ঘটনাটা লিখত, “আজ এক বিশাল প্রাণী আমার সামনে একটা পাতা ফেলেছিল। উদ্দেশ্য ভালো ছিল কি না সন্দেহ আছে। মানুষ জাতিকে বিশ্বাস করা কঠিন।”
আমি আবার কফির কাপ হাতে নিলাম।
পৃথিবীর নৈতিক সমস্যাগুলো আগের মতোই রয়ে গেল।
AI-এর ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।
কীটপতঙ্গ কতটা সচেতন, তাও জানলাম না।
মানবসভ্যতার কোনও বিরাট অগ্রগতিও হল না।
শুধু একটা পিঁপড়ারে ডুবতে দেইনি।
আমার কাছে আপাতত সেটুকুই যথেষ্ট।
কারণ আমরা যখন নিশ্চিত নই কোনও প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ কি না, আর তাকে সাহায্য করার খরচ প্রায় কিছুই নয়, তখন সামান্য দয়ার পক্ষে ভুল করাটাই বোধহয় নিরাপদ।
জীবন আমাদের খুব কম ক্ষেত্রেই শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়।
কিন্তু অনেক সময় একটা শুকনো পাতার জন্য শতভাগ নিশ্চয়তার দরকারও পড়ে না।
সকলের মঙ্গল হোক!


