পুপে
শিশুটি দেখতে নাকি ঠিক ডল-পুতুলের মতো; টুকটুকে রং, গোলাপি গাল, বড় বড় চোখ। আশ্রমের সকলের কোলে কোলে ঘুরে বেড়াত।




পুপে—এই নামটির মধ্যেই যেন একটি নরম শব্দ বাজে। বাংলার মাটি থেকে জন্ম নয়, শব্দটি ফরাসি; অর্থ পুতুল। আর যে কন্যাটির নাম পুপে, সে-ও জন্মসূত্রে বাঙালি নয়, গুজরাটি। তবু ভাগ্যের লেখায় সে এসে জুড়ে গেল এক বাঙালি পরিবারের অন্তঃপুরে, যার আঙিনায় তখন ইতিহাস হাঁটে, কবিতা জন্ম নেয়, অথচ মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা থাকে নিঃশব্দ।
শিশুটি দেখতে নাকি ঠিক ডল-পুতুলের মতো; টুকটুকে রং, গোলাপি গাল, বড় বড় চোখ। আশ্রমের সকলের কোলে কোলে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু শিশুর পক্ষে যে আদর-যত্ন সবচেয়ে জরুরি, সেই মাতৃস্নেহ তখন অনিশ্চিত। মাতা কঠিন রোগে আক্রান্ত, শারীরিকভাবে দুর্বল। নবজাত কন্যার পরিচর্যা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। রুগ্ণা স্ত্রী ও অসহায় শিশুকে নিয়ে পিতা বিপর্যস্ত। ব্যক্তিগত সংসারের ভাঙাচোরা উদ্বেগ তখন বৃহত্তর এক সম্প্রদায়ের বুকে এসে ঠাঁই পেল।
সেদিনের শান্তিনিকেতন শিক্ষাকেন্দ্রের পাশাপাশি সেখানে আপন-পরের কড়া সীমারেখা ছিল না। আশ্রম-গৃহিণীরা মিলে শিশুটিকে নিজেদের সন্তানের মতো দেখভাল করলেন। “আশ্রম-কন্যা” শব্দটির বাস্তব অর্থ যেন এইখানেই। প্রতিমা দেবী তখন সকলের বৌঠান, কার্যত আশ্রমমাতা। দেশ-বিদেশের অতিথি-আপ্যায়নে তিনি ব্যস্ত, গৃহস্থালির শৃঙ্খলায় তিনি দৃঢ়, অথচ অন্তরের গভীরে একটি অপূর্ণতা ছিল; নিজস্ব সন্তানের অভাব।
রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী নিঃসন্তান। তাঁদের ঘর বড়, আলোকিত, তবু যেন শূন্য। এমন সময় এই নয়নলোভন কন্যাশিশুটি যেন অনাহূত অথচ প্রত্যাশিত এক আলো হয়ে এল। ভাবলেন; যদি পিতা-মাতার সম্মতি মেলে, তবে এই শিশুটিকে বুকে তুলে নেবেন। সম্মতি মিলল। কারণ, শিশুটির জৈবিক মায়ের জীবন বিপন্ন; সন্তানের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।
এইভাবে পুপে এল উত্তরায়ণে। ঘর পেল, নাম পেল, পরিচয় পেল। পিতা-মাতা নিশ্চিন্ত হলেন; প্রতিমা দেবী ও রথীন্দ্রনাথের জীবনে নেমে এল এক অপ্রত্যাশিত আনন্দ। আর দাদামশায়—রবীন্দ্রনাথ—এই ঘটনায় যেন নিজের এক আদর্শের বাস্তব রূপ দেখলেন। দূরকে নিকট করা, পরকে আপন করা; এই তো তাঁর স্বপ্ন। শান্তিনিকেতনের জীবন কেবল পঠন-পাঠনের আয়োজন নয়; চাওয়া-পাওয়া, দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষকে সম্পূর্ণ করে তোলার প্রয়াস।
পুপের নতুন নাম হল নন্দিনী। দাদামশায় নাম দিলেন। রাজেন্দ্রনন্দিনী নয়—রথীন্দ্র-নন্দিনী। নামের মধ্যেই রয়ে গেল এক সম্পর্কের স্নেহচিহ্ন। আনন্দদায়িনী নন্দিনী, রবীন্দ্রনাথের হৃদয়-নন্দিনীও বটে।
শিশুর জন্য কবিতা তিনি আগেও লিখেছেন। সেখানে খোকা-রাজাই প্রাধান্য পেয়েছে। কেউ জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন; যখন সেই কবিতাগুলি লেখা, তখন খোকা-মহারাজই সিংহাসনে। এবার এল খুকু-মহারাণী। তিন বছরের প্রিয়ার মন পাবার জন্য দাদামশায়ের ব্যাকুলতা দেখা গেল। মুখে মুখে ছড়া, হঠাৎ বানানো গল্প, নাতনীর হুকুমে রচিত কল্পলোক; সব জমা হয়ে রইল রবীন্দ্রসাহিত্যের ভাণ্ডারে। নন্দিনীর উপস্থিতি সেই সাহিত্যকে নিঃশব্দে সমৃদ্ধ করল। পরোক্ষ অবদান; তবু অবদান।
প্রতিমা দেবীকে সবাই দেখেছে অতিথিপরায়ণা গৃহিণী হিসেবে। কিন্তু পুপের আগমনে তাঁকে দেখা গেল অন্য রূপে; স্নেহময়ী মা। শিশুর জ্বর, খাওয়া, ঘুম, আবদার; সবকিছুর প্রতি তাঁর নিবিড় দৃষ্টি। রথীন্দ্রনাথ কর্মব্যস্ত, স্বল্পভাষী মানুষ। কথায় আবেগ প্রকাশ করতেন না। কিন্তু কন্যার আবদার মেটাতে তিনি যে কতখানি নরম ছিলেন, তা বাইরের লোকের অজানা। অন্তরে স্নেহের যে ফল্গুধারা ছিল, পুপে এসে তার মুখ খুলে দিল।
পুপে বড় হলেন। দাদামশায় একদিন বলেছিলেন; তিন বছরের প্রিয়া হবে বিশ বছরের মেয়ে। ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হল। বিয়ে-থা করে তিনি সংসারী হলেন। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিতে রয়ে গেল উত্তরায়ণের বারান্দা, প্রতিমা দেবীর হাতের ছোঁয়া, রথীন্দ্রনাথের নীরব স্নেহ, আর দাদামশায়ের কোলের উষ্ণতা।
পরে তিনি যখন নিজের জীবনের কথা লিখলেন, তখন শুধু ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা নয়, এক সামাজিক পরীক্ষার কথাও উঠে এল। তিনি পেয়েছেন দাদামশায়ের কাছ থেকে কল্পনার পরিধি, প্রতিমা দেবীর কাছ থেকে মমতার শৃঙ্খলা, রথীন্দ্রনাথের কাছ থেকে নিরুচ্চার দায়িত্ববোধ। আর শান্তিনিকেতনের কাছ থেকে পেয়েছেন এক বৃহত্তর পরিচয়; যেখানে জন্ম নয়, গ্রহণই আসল; রক্ত নয়, সম্পর্কই স্থায়ী।
পুপে নামটি ফরাসি হোক, তার রক্ত গুজরাটি হোক—শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে উঠলেন এক বাঙালি কন্যা, এক আশ্রম-নন্দিনী। তাঁর শৈশব স্মৃতি এক যুগের মানবিক আদর্শের দলিল।


